মেন্যু
Menu

শরীয়ার অসম্ভাব্যতার বিপরীতে | ওভামির আনজুম

৮ জুন, ২০২৬

( শরিয়া নিয়ে ওভামির আনজুমের ৪ পর্বের সিরিজের এটি ৪র্থ পর্ব।)

প্রথম পর্ব - বিপন্ন শরীয়াহ্
দ্বিতীয় পর্ব - ইসলামি ইতিহাসের রূপরেখা
তৃতীয় পর্ব - দক্ষিণ এশিয়ায় শরীয়ার পুনরুজ্জীবন

আধুনিকতার হাতে শরীয়াহ্ 'নিহত' হয়েছে—এই বদ্ধমূল ধারণাটিকে শরীয়ার 'ক্লান্তি' বা অবসাদ নিয়ে ক্লাসিক্যাল যুগের শুরুর দিকের সেই বিতর্কের একটি পুনর্জাগরণ হিসেবে দেখা যেতে পারে। তবে এটি সেই আদি বিতর্কের ধারাবাহিকতা যেমন রক্ষা করে, তেমনি তা থেকে বিচ্যুতও হয়। আধুনিক রূপে, শরীয়ার অবসাদ বা মৃত্যুর প্রশ্নটি এখন আর ফকিহ বা আইনবিদদের দ্বারা আলোচিত হচ্ছে না, বরং এটি আলোচিত হচ্ছে পশ্চিমা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষিত ঐতিহাসিকদের দ্বারা। এখানে কেবল জ্ঞানতাত্ত্বিক (epistemology) বিষয়ই বিবেচ্য নয়, বরং একটি বৈশ্বিক ব্যবস্থার চাপিয়ে দেওয়া জাগতিক, অধিবিদ্যাগত এবং মনস্তাত্ত্বিক চ্যালেঞ্জগুলোও এর অন্তর্ভুক্ত—যে ব্যবস্থাটি বিদেশি এবং অনেকাংশেই বৈরী ও সেক্যুলার। তা সত্ত্বেও, আধুনিক এই বিতর্কটি জুওয়াইনির সেই উদ্বেগেরই প্রতিফলন ঘটায়, যেখানে তিনি শরীয়াহ্ টিকে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় শর্তাবলি বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কা করেছিলেন। এটি আধুনিক যুগের অনেক মুসলিম ফকিহদের অবস্থানের চেয়ে ভিন্ন; কারণ সেই ফকিহরা শরীয়াহ্-র বিলুপ্তির সম্ভাবনাকে সরাসরি নাকচ করে দেন এবং শরীয়ার চিরন্তনতা ও সুস্থতা সম্পর্কে এক ধরণের নিশ্চিন্ত বিশ্বাস নিয়ে কেবল ইজতিহাদ ও তাকলিদ সংক্রান্ত বিতর্কেই নিবিষ্ট থাকেন।

আমাদের সময়ের অন্যতম পণ্ডিত এবং চিন্তা-উদ্দীপক ব্যক্তিত্ব ওয়ায়েল হাল্লাক আধুনিকতার হাতে শরীয়ার মৃত্যু নিয়ে সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন। তিনি তাঁর ২০০৪ সালের প্রবন্ধ ‘ক্যান দ্য শরীয়াহ্ বি রিস্টোর্ড?’, ২০০৫ সালের প্রবন্ধ ‘হোয়াট ইজ শরীয়াহ্?’ এবং তাঁর সুপরিচিত গ্রন্থ 'দ্য ইমপসিবল স্টেট' (২০১২)-এ এই যুক্তি তুলে ধরেছেন। জুওয়াইনির মতো হাল্লাকও শরীয়াকে একটি উচ্চতর আইনশাস্ত্র হিসেবে কল্পনা করেন যার জন্য নির্দিষ্ট কিছু উন্নত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং প্রয়োগকারী সংস্থার প্রয়োজন। তাই তাঁর কাছে শরীয়ার মৃত্যুর অর্থ হলো এর প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক ভিত্তির বিনাশ। জুওয়াইনির মতোই তিনিও শরীয়ার অবস্থানকে কেবল ধর্মগ্রন্থের ‘কাঁচা’ রূপে কিংবা নবীজির হাদীস বা প্রথম প্রজন্মের তুলনামূলকভাবে অবিন্যস্ত উপলব্ধির মধ্যে খোঁজেন না; বরং তিনি একে দেখেন সেই সংহত রূপে যা হিজরি দ্বিতীয়/অষ্টম শতাব্দী এবং তৃতীয়/নবম শতাব্দীতে ব্যক্তিকেন্দ্রিক মাযহাবগুলোর উত্থানের মাধ্যমে আকার পেতে শুরু করেছিল। এই রূপটি পূর্ণতা পায় হিজরি চতুর্থ/দশম শতাব্দীতে।১ হাল্লাকের চরম ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গিতে, শরীয়াহ্ ছিল ‘সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং নৈতিক সম্পর্কের একটি জটিল সেট যা এক সহস্রাব্দেরও বেশি সময় ধরে ইসলামি ভূখণ্ডের সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে ছিল।’২ এটি ছিল একটি ‘ডিসকার্সিভ প্র্যাকটিস’ বা বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা যেখানে এই সম্পর্কগুলো অসংখ্য উপায়ে একে অপরের সাথে মিলিত হতো এবং একে অপরকে প্রভাবিত করত।৩ উল্লেখযোগ্যভাবে, এই চর্চার সাথে এমন সব প্রতিষ্ঠান জড়িত ছিল যা একে অপরকে প্রতিরোধ বা শক্তিশালী করত। শরীয়াহ্ তখন কেবল বিচার বিভাগীয় ব্যবস্থা বা আইনি মতবাদ ছিল না, বরং এটি ‘তার চারপাশের জগতের সাথে লম্বালম্বি ও আড়াআড়িভাবে এমনভাবে যুক্ত ছিল যা একই সাথে অর্থনৈতিক, সামাজিক, নৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক, সাংস্কৃতিক এবং কাব্যিক।’৫

শরীয়ার এই বিশাল ও ব্যাপক ধারণা থাকা সত্ত্বেও, হাল্লাক শেষ পর্যন্ত আইনবিদ বা ফকিহদেরই এই ব্যবস্থার মূল ভিত্তি বা লিঙ্কপিন হিসেবে চিহ্নিত করেন। এখানেই জুওয়াইনির সাথে তাঁর আধ্যাত্মিক ধারাবাহিকতা এবং শরীয়াহ্-কে একজন দক্ষ ফকিহ-র শৈল্পিক দক্ষতার (মালাকা) সাথে তুলনা করার বিষয়টি প্রকাশ পায়। তাঁর মতে, এই আইনবিদরাই ছিলেন সেই শিক্ষিত চিন্তাবিদ যারা একই সাথে ঐতিহাসিক, ধর্মতাত্ত্বিক, সাহিত্যিক এবং কবিও ছিলেন; যারা একদিকে রাজনৈতিক সত্য ও আদর্শ তৈরিতে অবদান রাখতেন, আবার অন্যদিকে ক্ষমতার সামনে নিজেদের সত্য নিয়ে দাঁড়াতেন।৬

তবে হাল্লাক শরীয়াকে ‘গণতন্ত্রীকরণ’ করতেও আগ্রহী। তিনি স্বীকার করেন যে ‘এর টেক্সট বা তাত্ত্বিক ব্যাখ্যাগুলো অবশ্যই আভিজাত্যপূর্ণ বা এলিট ঘরানার ছিল, কিন্তু এর বাকি সবকিছুই ছিল সাধারণ মানুষের জন্য।’৭ এর সাথে জড়িত ব্যক্তিবর্গ সমাজের সকল স্তর থেকে আসতেন এবং তারা মসজিদ, বাজার ও ঘরবাড়ির মতো সাধারণ ও জনাকীর্ণ জায়গায় কাজ করতেন।৮ হাল্লাক আধুনিক সমাজের সাথে তুলনা করে তাঁর বক্তব্যটি স্পষ্ট করেন; আধুনিক সমাজে সাধারণ মানুষ আইনি পেশা থেকে বিচ্ছিন্ন, যা তাদের কাছে বড়জোর দুর্বোধ্য বা খুব খারাপভাবে বললে অনৈতিক মনে হয়।৯ অন্যদিকে, ‘ঐতিহ্যবাহী মুসলিম সমাজ’ শরয়ী আইনি মূল্যবোধের মধ্যে ঠিক সেভাবেই প্রোথিত ছিল যেভাবে আদালত সমাজের নৈতিক জগতের মধ্যে প্রোথিত ছিল।১০ এটি এমন এক সমাজ ছিল যা ‘আইনি নীতি ও নৈতিকতাকে যাপন করত, কারণ এগুলোই ছিল সামাজিক আচরণের ধর্মীয় ভিত্তি।’১১ অন্য কথায়, শরীয়াহ্ এলিট বা আভিজাত্যপূর্ণ ছিল না কারণ এটি প্রকৃত অর্থেই মুসলিম সমাজের দ্বারা গঠিত হয়েছিল এবং সমাজকেই গঠন করেছিল।

শরীয়ার এই বিস্তারিত বিবরণ এটিকে এক ধরণের 'জীবন্ত প্রাণসত্তা' বা অর্গানিজম হিসেবে নতুন করে কল্পনা করে—যেখানে এর প্রতিটি অংশ 'সমগ্র'কে ধারণ করে এবং রক্ষা করে। তদুপরি, এই সমগ্রটি কোনো বিচ্ছিন্ন একক থেকে যুক্তিসিদ্ধভাবে(rationally) তৈরি করা হয়নি, বরং দীর্ঘদিনের সামাজিক চর্চার মাধ্যমে গড়ে উঠেছে; যা মূলত সংস্কৃতিরই নামান্তর। ফলে শরীয়াহ্ নিজেই একটি সম্পূর্ণ ‘এপিস্টেম’ বা জ্ঞানতাত্ত্বিক জগত হিসেবে আবির্ভূত হয়। আধুনিকতায় এর ‘কাঠামোগত মৃত্যু’ সহজে পুনরুদ্ধারযোগ্য নয়, কারণ আধুনিকতার শর্তগুলোই সেই সামাজিক মাটিকে সেই নৈতিক-জ্ঞানতাত্ত্বিক পুষ্টি থেকে বঞ্চিত করেছে যা শরীয়ার প্রতিষ্ঠান এবং নৈতিক সত্তাগুলোকে গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজন ছিল। হাল্লাক যেন ইঙ্গিত দিতে চাইছেন যে, আধুনিকতার সাথে শরীয়ার খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা করা অনেকটা সমুদ্রের জীবকে মরুভূমিতে বসবাসের অনুরোধ করার মতো।

নিশ্চিতভাবেই হাল্লাক এখানে সফল হয়েছেন যদি তাঁর লক্ষ্য হয় শরীয়াকে নৈতিকভাবে নিম্নতর বা অপ্রাসঙ্গিক হিসেবে দেখার পশ্চিমা আধিপত্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গিকে চ্যালেঞ্জ করা। তবুও, হাল্লাকের এই অর্গানিক (এবং গণতান্ত্রিক) বর্ণনার অন্তর্নিহিত যুক্তি—যেখানে সবকিছু সবকিছুকে টিকিয়ে রাখে—তা দক্ষ ফকীহদের বাইরে অন্যান্য সাধারণ মানুষের ভূমিকা সম্পর্কে তাঁর অসম্পূর্ণ বর্ণনার সাথে কিছুটা অসামঞ্জস্যপূর্ণ। তাঁর বর্ণিত শরীয়ার সেই সমতাবিষয়ক ধারণাটি আধুনিকতায় এর ধ্বংসের বর্ণনার মাধ্যমে আরও দুর্বল হয়ে পড়ে। হাল্লাকের মতে, যা শরীয়াকে সরিয়ে দিয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত নির্মূল করেছে তা হলো আধুনিক রাষ্ট্রের সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ—যার মাধ্যমে শরীয়ার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, যেমন আর্থিকভাবে স্বাধীন মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এবং সেই আইনি পরিবেশ ধ্বংস করা হয়েছে যা ফকীহ বা ইসলামী আইনবিদদের একটি পেশাদার গোষ্ঠী হিসেবে বেড়ে ওঠার সুযোগ দিত।১২ আধুনিক রাষ্ট্রের এই কাঠামোগত ধ্বংসলীলার ফলে শেষ পর্যন্ত ‘এই গোষ্ঠীটি [ফকীহ] একটি প্রজাতি হিসেবে বিলুপ্ত হয়ে গেছে’ এবং সেই সাথে বিলুপ্ত হয়েছে শরীয়াহ্।১৩ চূড়ান্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, সমাজের সেই ‘নৈতিক জগত’ যা আইনকে ভিত্তি দিত, তা ফকীহদের প্রতিষ্ঠানের মধ্যেই বিলীন হয়ে যায় এবং সেই ফকীহ শ্রেণী ছাড়া এটি টিকে থাকতে অক্ষম হয়ে পড়ে।

অথচ শরীয়াকে একটি ‘জীবন্ত প্রাণসত্তা’ হিসেবে দেখার এই ধারণাটিই আমাদের এমন কিছু প্রশ্ন করতে সাহায্য করে যা হাল্লাকের আদর্শিক বয়ানে উপেক্ষিত হয়েছে। হাল্লাকের নিজের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, ফকিহরা আইনি জ্ঞান তৈরি বা প্রচার করতে পারতেন না যদি না তারা সমাজের সেই আইনি-বহির্ভূত ‘নৈতিক জগতের’ মধ্যে প্রোথিত থাকতেন।১৪ অর্থাৎ, সমাজের সেই বিশাল ভিত্তি ছাড়া ফকিহদের পক্ষে আইন তৈরি করা সম্ভব হতো না। আবার এই ‘নৈতিক জগত’ রাজনৈতিক ব্যবস্থার সাথে অবিচ্ছেদ্য ছিল, যা হাল্লাকের বর্ণনায় আশ্চর্যজনকভাবে অনুপস্থিত। আরও সুনির্দিষ্টভাবে বললে, তিনি রাজনীতিকে আইনি ব্যবস্থার শত্রু হিসেবে কল্পনা করেছেন। আমি অন্য জায়গায় যুক্তি দিয়েছি যে, রাজনৈতিক ব্যবস্থাই কেবল আইনি ব্যবস্থা তৈরি করে না, বরং এটি একে টিকিয়েও রাখে, যেমনটি শরীয়ার ক্ষেত্রে ঘটেছিল।১৫

হাল্লাকের বর্ণিত শরীয়াহ্ রাজনীতির মাধ্যমে নেওয়া সামষ্টিক সিদ্ধান্ত এবং মানুষের সক্রিয় ভূমিকা (agency) থেকে বিচ্ছিন্ন। এটি কোনোভাবে একটি প্রতিষ্ঠান-বহির্ভূত সংস্কৃতির দ্বারা টিকে থাকে, অথচ আবার একে কেবল আইনবিদদের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই সংজ্ঞায়িত করা হয়। এর ফলে এটি কেবল আধুনিক পরিস্থিতিতেই অকল্পনীয় হয়ে ওঠে না, বরং ঐতিহাসিকভাবেও একে প্রমাণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। সমস্যাটি হয়তো হাল্লাকের ব্যবহৃত ‘অর্গানিক রূপক’-এর মধ্যে নয়, বরং রূপকটিকে তার যৌক্তিক সমাপ্তি পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর অনীহার মধ্যে। কোনো প্রাণীর বর্ণনা দিতে গিয়ে যদি কেউ কেবল তার খাদ্যাভ্যাস নিয়ে কথা বলে কিন্তু তার বংশবৃদ্ধি, স্নায়ুতন্ত্র বা কঙ্কালের গঠন এড়িয়ে যায়, তবে সে অবশ্যই খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু বাদ দিয়ে গেল।

তাই যদিও হাল্লাক জুওয়াইনির সেই ভঙ্গুর ও বিলুপ্তিপ্রবণ শরীয়ার ধারণাটি গ্রহণ করেছেন বলে মনে হয়, তাঁর নিজের কাঠামো অনুযায়ী এটি বাধ্যতামূলক নয়। কেউ ভাবতেই পারেন যদি তিনি শাহ ওয়ালিউল্লাহর আশাবাদ গ্রহণ করতেন তবে তাঁর বর্ণনা কেমন হতো। প্রকৃতপক্ষে, শরীয়ার একটি আশাবাদী এবং নবায়নযোগ্য ব্যাখ্যায় পৌঁছানোর জন্য আমাদের হাল্লাকের বর্ণনার বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। হাল্লাক নিজেই যুক্তি দেন যে, ফকিহরা সেই সমাজ ও সংস্কৃতি থেকেই উঠে এসেছিলেন যেটিকে তারা সেবা দিতেন। প্রকৃতপক্ষে, শরীয়ার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল এটি যে সামাজিক স্তরে প্রয়োগ করা হতো, সেই স্তর থেকেই এটি উৎপাদিত হতো।১৬ যদি এই সবই সত্য হয় এবং যদি ‘মুসলিম আদালত সেই নৈতিক সম্প্রদায়েরই ফসল হয় যাদের এটি সেবা দিত’ এবং ‘আইনের গ্রহীতারা নিজেরাই যদি নৈতিক জগতের উৎস হয়’,১৭ তবে কেন এই বিশাল জনগোষ্ঠী বা এই সম্প্রদায় শরীয়ার পতাকাবাহী হিসেবে গণ্য হবে না?

হাল্লাকের হতাশার স্পষ্ট কারণ হলো আধুনিক আধিপত্যবাদী রাষ্ট্রের সাথে শরীয়ার মৌলিক অসঙ্গতি সম্পর্কে তাঁর উপলব্ধি, যা নিঃসন্দেহে একটি গুরুতর উদ্বেগের বিষয়। কিন্তু হাল্লাকের বর্ণনার শূন্যতা হলো শরীয়ার প্রতিরোধ করার ক্ষমতার কোনো উল্লেখ না থাকা, যা মূলত এক শ্রেণীর কুশীলবদের (ফকীহ) ওপর অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়ার ফলাফল।১৮ হাল্লাকের এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার আরেকটি উপায় হলো প্রশ্ন করা—আজকের দিনে এই জাতি-রাষ্ট্র (nation-state) কি আসলেই ততটা অজেয় এবং স্থিতিশীল যতটা তিনি মনে করেন? দিগন্তে শাসনের নতুন সব রূপ উঁকি দিচ্ছে: বহুজাতিক কর্পোরেশন, উপজাতীয় মিলিশিয়া, সভ্যতা-ভিত্তিক রাষ্ট্র (civilizational states), সাইবারনেটিক ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি। এছাড়া নতুন সব প্রযুক্তি ও আন্দোলন বর্তমান ব্যবস্থার ভিত্তি কাঁপিয়ে দিচ্ছে এবং এক অজানা পৃথিবীর দিকে ইঙ্গিত করছে। একসময় প্রাক-আধুনিক যুগে শরীয়াহ্ যেমন রাজনৈতিক সীমানা ছাড়িয়ে একটি আধা-বৈশ্বিক ব্যবস্থায় স্বাচ্ছন্দ্যে টিকে ছিল, তেমনি এটি হয়তো একটি উত্তর-ওয়েস্টফালিয়ান (post-Westphalian) বিশ্বব্যবস্থায় টিকে থাকার জন্য অনন্যভাবে উপযুক্ত হতে পারে।

টীকা বা নোটসমূহ:

  1. ওয়ায়েল বি. হাল্লাক, "ক্যান দ্য শরীয়াহ বি রিস্টোর্ড?" (Can the Shariʿa be Restored?); গ্রন্থ: ইসলামিক ল অ্যান্ড দ্য চ্যালেঞ্জ অফ মডার্নিটি, সম্পাদক: ওয়াই. হাদ্দাদ এবং বি. স্টোওয়াসার (ওয়ালনাট ক্রিক: আলতামিরা প্রেস, ২০০৪), ২১-৫৩।

  2. ওয়ায়েল বি. হাল্লাক, "হোয়াট ইজ শরীয়াহ?" (What is Shari‘a?); ইয়ারবুক অফ ইসলামিক অ্যান্ড মিডল ইস্টার্ন ল অনলাইন ১২, নং ১ (২০০৫): ১৫৫।

  3. প্রাগুক্ত (পূর্বের সূত্র)।

  4. প্রাগুক্ত।

  5. প্রাগুক্ত, ১৫৫-১৫৬।

  6. প্রাগুক্ত, ১৫৬।

  7. প্রাগুক্ত।

  8. প্রাগুক্ত।

  9. প্রাগুক্ত, ১৫৮।

  10. প্রাগুক্ত।

  11. প্রাগুক্ত।

  12. প্রাগুক্ত, ১৬৯।

  13. প্রাগুক্ত।

  14. প্রাগুক্ত, ১৫৮।

  15. নিশ্চিতভাবেই, এই রূপরেখাটি 'আইন' (অর্থাৎ নবীজির মিশনের মাধ্যমে তৈরি হওয়া অনুজ্ঞা ও সম্প্রদায়) এবং 'আইনি ব্যবস্থা'র মধ্যে একটি পার্থক্য ধরে নেয়। আমি এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছি আমার পলিটিক্স, ল, অ্যান্ড কমিউনিটি ইন ইসলামিক থট: দ্য তাইমিয়ান মোমেন্ট গ্রন্থে (ক্যামব্রিজ, ইউকে: ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস, ২০১২)।

  16. হাল্লাক, "হোয়াট ইজ শরীয়াহ?", ১৫৯।

  17. প্রাগুক্ত, ১৫৮-১৫৯।

  18. উদাহরণের জন্য দেখুন: সামি এ. আইয়ুব, ল, এম্পায়ার, অ্যান্ড দ্য সুলতান: অটোমান (Law, Empire, and the Sultan: Ottoman)।


তরজমা করেছেন সিদ্দিকে আকবর।

মূল নিবন্ধ - https://islamiclaw.blog/2024/01/25/against-impossibility/