নয়া-উদারবাদের উৎপত্তি প্রসঙ্গে
এখনকার সময়টাকে আমরা নিওলিবারেল বা নয়া-উদারবাদী আধিপত্যের যুগ বলতে পারি। প্রশ্ন হচ্ছে, এই যুগে ক্রিটিকাল চিন্তা করা মানে আসলে কী? মানুষ ক্রিটিকাল সচেতনতা ধরে রাখতে পারবে - এটা কি আদৌ সম্ভব, যখন নিওলিবারেলিজমকে ‘ইতিহাসের শেষ গন্তব্য’১ বলে চালানো হয়?
মূল্যায়ন করতে গেলে আমাদের ফিরে যেতে হয় উৎসের দিকে। এখানে আমি বলতে চাই – নিওলিবারেলিজমের আসল উৎস হলো সেক্যুলারিজম। আমরা যদি নিওলিবারেলিজমকে বোঝার চেষ্টা করি, তাহলে তার এই সেক্যুলার ভিত্তিকে না বুঝে কোনো পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা দাঁড় করানো সম্ভব নয়। শুধু তাই নয়, নিওলিবারেলিজমকে যদি আমরা কেবল অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক সংকট হিসেবে দেখি, তাহলে ভুল করব। এর ভেতরে আছে একধরনের গভীর মেটাফিজিক্যাল প্রশ্ন। এখানে প্রশ্ন শুধু অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কিংবা রাজনৈতিক ক্ষমতার নয়, বরং মানুষ সম্পর্কে আমাদের সামগ্রিক ধারণার। আর যেহেতু নিওলিবারেল শাসনব্যবস্থা খুব চতুরভাবে তার ভিত্তি গোপন করে ফেলে এবং নিজেকে ‘প্রকৃতির নিয়ম’ বা ন্যাচারাল অর্ডার হিসেবে হাজির করে, তাই তার মেটাফিজিক্যাল উৎসকে উন্মোচন করা খুব জরুরি হয়ে ওঠে।
নিওলিবারেলিজম কী?
নিওলিবারেলিজমের মূল ধারণা হলো – বাজার স্বাভাবিক নিয়মে চলে, আর সেটাই নাকি প্রকৃতির নিয়ম। অ্যাডাম কটস্কো তার Neoliberalism’s Demons বইয়ে এই ধারার উৎপত্তি খুঁজে দেখান। তিনি দেখিয়েছেন, নিওলিবারেলিজম আসলে উনবিংশ শতকের ইউরোপের ক্লাসিকাল লিবারেলিজম বা laissez-faire অর্থনীতি থেকে আলাদা।
সেই সময়কার ধারণা ছিল – রাজনীতি আর অর্থনীতি একে অপরের থেকে আলাদা থাকবে, আর রাষ্ট্র বাজারে খুব একটা হস্তক্ষেপ করবে না। কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর এই আলাদা আর থাকা হল না। কারণ, বাজারের নেতিবাচক দিকগুলো সামলাতে তখন রাষ্ট্রকে জোর করে নামতে হলো। এর ফলেই তৈরি হলো সামাজিক গণতন্ত্রভিত্তিক মডেল, যেটিকে আমরা ‘ফোর্ডিজম’২ নামে জানি।
কিন্তু সত্তরের দশকের মাঝামাঝি এসে ফোর্ডিজম ভেঙে পড়তে শুরু করে। তখন সামনে ছিল দুটি পথ – একদিকে কল্যাণ রাষ্ট্রকে আরও শক্তিশালী করা, আরেকদিকে নিওলিবারেলিজমের দিকে ঝুঁকে পড়া।
নিওলিবারেলিজমকে এগিয়ে নিয়েছিলেন মার্গারেট থ্যাচার আর রোনাল্ড রিগ্যানের মতো নেতারা। তারা শুধু রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ কমাতে চাননি, বরং রাষ্ট্রের ক্ষমতা, প্রতিষ্ঠান, এমনকি সমাজকেও বাজারের নিয়মে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। এর মানে হলো – নতুন নতুন বাজার তৈরি করা (যেমন বেসরকারীকরণের মাধ্যমে) এবং প্রতিযোগিতার নিয়মকে জীবনের প্রায় সব ক্ষেত্রে ছড়িয়ে দেওয়া।
ফলাফল হলো – নিওলিবারেলিজম আর কেবল অর্থনৈতিক নীতি থাকল না, বরং হয়ে উঠল একটা লাইফস্টাইল। এর ভেতরে লুকিয়ে আছে নিজস্ব মেটাফিজিক্যাল অনুমান৩, যেটা আমাদের মানুষ হওয়ার ধারণাকেই বদলে দেয়।
ওয়েন্ডি ব্রাউন একে বোঝাতে গিয়ে বলেছেন – ‘নিওলিবারেল যুক্তি বাজারের মডেলকে এমন সব জায়গাতেও ছড়িয়ে দেয় যেখানে টাকা-পয়সার সম্পর্ক নেই। আর মানুষকে পুরোপুরি বাজারের অভিনেতা হিসেবে দাঁড় করায় – যেন মানুষ সর্বত্র, সবসময় কেবল অর্থনৈতিক প্রাণী, homo oeconomicus’।৪
অর্থাৎ, নিওলিবারেলিজম আমাদের সামাজিক জীবনকেও বাজারের নিয়মে সাজাতে চায়।
হোমো ইকোনমিকাস
নিওলিবারেল আধিপত্যে আক্রান্ত এক দুনিয়া থেকে উদ্ভূত হয় এক নতুন দেবতা, এক ‘দ্বিতীয় খোদা’ – যে মানুষ ও দুনিয়াকে তার নিজস্ব ধাঁচে পুনর্নির্মাণ করে। কুরআনে ব্যবহৃত হয়েছে শব্দ আত-তাগূত, যার অর্থ হলো সীমা লঙ্ঘনকারী। আত-তাগূতের ভ্রম হলো সে নাকি স্বয়ংসম্পূর্ণ (استغنا) – যেমন মুক্ত বাজারের মিথ। কুরআনে বলা হয়েছে: ‘কিন্তু মানুষ সীমা অতিক্রম করে, যখন সে ভাবে যে সে স্বয়ংসম্পূর্ণ’। (৯৬:৬-৭)৫। অনেক প্রাচীন তাফসিরবিদ এই স্বয়ংসম্পূর্ণতাকে সম্পদ সঞ্চয়ের সঙ্গে যুক্ত করেছেন।
মানবসত্তার অর্থনৈতিকীকরণের ফলে তৈরি হলো নতুন মানুষ। হোমো ইকোনমিকাস – যা এক নতুন ‘মূল অঙ্গীকার’ থেকে জন্ম নেওয়া। এটা এমন এক ‘অবিতর্কিত কাহিনি’, যার মাধ্যমে একটা জাতি জন্ম নেয় – বলা যায়, নিজেকে জন্ম দেয়’।৬ এটা ছিল এক ধরনের ‘সুসংবাদ,’ যেখানে টাকার মধ্যে ও টাকার বণ্টনে দেখা হচ্ছিল এক ‘অলৌকিক শক্তির ভাণ্ডার।’ টাকাকে পূজা করার মতো এই সংস্কৃতিতে অর্থ-কড়িকে দেওয়া হলো অস্তিত্বের শক্তি, আর অর্থের মালিকদের দেওয়া হলো একধরনের ‘অস্তিত্বগত মহিমা’। এর ফলে, ইউজিন ম্যাকারাহার (Eugene McCarraher) ভাষায়, সবকিছুর মূল্য নির্ধারিত হতে লাগল টাকার ‘ফাঁপা প্রাণবাদ’ থেকে।৭ এই অর্থনৈতিকীকরণের প্রক্রিয়াকে একধরনের [পুনঃ]সৃষ্টি হিসেবেই দেখা যায় – যার ভেতর মানুষকে কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের প্রতিচ্ছবি হিসেবে পুনর্নির্মাণ করা হয়।
আজকের হোমো ইকোনমিকাস সেই উদ্যোক্তামূলক বৈশিষ্ট্য ধরে রেখেছে, কিন্তু তাকে নতুনভাবে গড়ে তোলা হয়েছে ‘আর্থিকীকৃত মানবপুঁজি’ (financialized human capital) হিসেবে। তার কাজ হলো নিজের মধ্যে এমনভাবে বিনিয়োগ করা যা তার বাজারমূল্য বাড়ায়, কিংবা সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করে। এজন্য তাকে তার বাস্তব বা প্রতীকী ‘ক্রেডিট রেটিং’-এর দিকে সবসময় নজর রাখতে হয় – জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে।৮
নিওলিবারেলিজমের মেটাফিজিক্যাল দিগন্ত
নিওলিবারেলিজমের জন্ম হয়েছে সেক্যুলারিজমের গর্ভ থেকে। ‘স্বাধীন বাজার’-এর কথা বলার মানে হলো জগৎকে এমন এক পরিসর হিসেবে ভাবা, যার ব্যাখ্যা ও পরিচালনার জন্য কোনো অতিলৌকিক ভিত্তির প্রয়োজন নেই।। বাজারকে স্বাধীন সত্তা হিসেবে কল্পনা করার জন্য দরকার ছিল পৃথিবীকে এক বন্ধ ও স্বয়ংসম্পূর্ণ সত্তা হিসেবে কল্পনা করা – যেখানে ক্ষমতার উৎস ও কার্যকারিতা এই জগতের ভেতরেই নিহিত।
এমন ধারণা প্রতিষ্ঠার জন্য অতিলৌকিকতার সম্পূর্ণ বিলোপ জরুরি ছিল না—কেউ কেউ বলবেন, তা আদৌ সম্ভবও নয়। বরং যা ঘটেছে, তা হলো অতিলৌকিকতার স্থানচ্যুতি; আরও যথাযথভাবে বললে, তার যথার্থ অবস্থানকে ভুল জায়গায় প্রতিস্থাপন করা। এরিক ফোগেলিন (Eric Voegelin) বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে লিখেছেন:
এই প্রক্রিয়ায় অতিলৌকিক ভিত্তির কী পরিণতি ঘটেছে? বলা যায়, তাকে জাগতিক পরিসরে নামিয়ে আনা হয়েছে। ভিত্তির সন্ধান অবশ্য থেমে যায়নি; আমরা এখনও জানতে চাই, সবকিছুর উৎপত্তি কোথায়, কোথা থেকে সবকিছু আসে। কিন্তু যেহেতু আল্লাহ বা ঈশ্বর (ওহির ভাষায়) কিংবা অতীন্দ্রিয় সত্তা (দার্শনিক ভাষায়) সংশয়বাদীরা গ্রহণ করবে না, তাই তাদের অন্য কোথাও সেই ভিত্তি খুঁজে নিতে হয়’।৯
আধুনিক সেক্যুলারিজম এমন এক বিশ্ববীক্ষার সূচনা করে, যেখানে জগৎ নিজেই সম্ভাবনার এক স্বয়ংসম্পূর্ণ সমগ্র হিসেবে সার্বভৌমত্ব লাভ করে এবং অতিলৌকিকতার জায়গা দখল করে নেয়। অন্যভাবে বললে, বাজারকে একটা স্বায়ত্তশাসিত পরিসর হিসেবে কল্পনা করার জন্য ‘সেক্যুলার’ নামে একটা স্বতন্ত্র পরিসরও নির্মাণ করতে হয়েছে। এই অর্থে, ঈশ্বরের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক ক্রমশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার মধ্য দিয়েই সেক্যুলারিজমের জন্ম।
এই বিচ্ছিন্নতা মানুষের অস্তিত্বে এক গভীর সংকট তৈরি করে। সেই সংকটের মধ্যে মানুষ নিজের জন্য এমন এক বিকল্প জগৎ নির্মাণ করতে চায়, যা কেবল ‘যুক্তি ও নিয়ন্ত্রণযোগ্যতা’র ভিত্তিতে পরিচালিত হবে না, বরং যার ওপর সে পূর্ণ কর্তৃত্বও প্রতিষ্ঠা করতে পারবে।১০ ক্ষমতা তখন জাগতিক পরিসরের মধ্যেই বণ্টিত হবে, নতুন নতুন ক্ষেত্র তৈরি হবে—অর্থাৎ, সেগুলো নির্মিত হবে—এবং সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। আমার বক্তব্য হলো, নয়া-উদারবাদের বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় ভিত্তি ও মেটাফিজিকাল দিগন্ত নির্মাণে সেক্যুলারিজমই নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করেছে।
কিন্তু সেক্যুলার জগতে মানুষ যে বিচ্ছিন্নতার শিকার হয়েছিল, তা নিওলিবারেলিজমে ফিরে আসে আরও ভয়ংকর রূপে। নিওলিবারেলিজম এমন এক নতুন বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করে যেখানে নতুন মানুষ তথা হোমো ইকোনমিকাস নিজেকে খুঁজে পায় এক অনিশ্চিত অবস্থায়। ওয়েন্ডি ব্রাউনের ভাষায়,
‘যে মানুষকে নিজের কাছে এবং কোনো প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্রের কাছে মানবপুঁজি হিসেবে নির্মাণ করা হয়, সে প্রতিনিয়ত ব্যর্থতা, অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়া এবং পরিত্যক্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। নিজের সর্বোচ্চ দক্ষতা ও দায়িত্বশীলতা সত্ত্বেও সে এই পরিণতি এড়াতে পারে না’।১১
নৈতিকভাবে স্বাধীন মানুষ হওয়ার ব্যাপারে অর্থাৎ নিজের বিবেক ও যুক্তির ভিত্তিতে নিজেকে পরিচালিত করতে সক্ষম হওয়ার ব্যাপারে আধুনিকতার যে স্বপ্ন ছিল, তা নিওলিবারেল কল্পনায় মুছে যায়। হান্স ব্লুমেনবার্গের স্বপ্নের ‘স্ব-প্রত্যয়নশীল মানুষ’ সেখানে নেমে আসে নিছক মানবপুঁজিতে।মানুষের অস্তিত্বের লক্ষ্য তখন আর পূর্ণাঙ্গ জীবনযাপন কিংবা নিজের সম্ভাবনার বিকাশ নয়; বরং নিছক বেঁচে থাকা—যাকে ‘নিরেট জীবন’ (bare life) বলা হয়।১২
এখানে একটা গভীর বৈপরীত্য কাজ করে। নিওলিবারেলিজম একদিকে আধুনিকতার প্রকল্পকে তার চূড়ান্ত পরিণতির দিকে নিয়ে যায়; অন্যদিকে, সেই প্রকল্পের মৌলিক আদর্শগুলোকেই ভেতর থেকে ধ্বংস করে। আলী শরিয়তি এই প্রক্রিয়াকে বলেছিলেন ইস্তিহমার (استہمر) – যার অর্থ বুদ্ধিবৃত্তিক অবশতা বা চিন্তাশক্তিকে ভোঁতা করে দেওয়া।১৩ তাঁর বক্তব্য হলো, এসব প্রক্রিয়া মানুষকে তার অস্তিত্বগত ও রাজনৈতিক লক্ষ্য থেকে সরিয়ে রাখে। শরিয়তির কাছে মানুষ মূলত একটি রাজনৈতিক সত্তা–হোমো পলিটিকুস (Homo politicus)। তার চিন্তা ও কাজকর্ম আবর্তিত হয় সমষ্টিগত জীবন, সমাজের ভবিষ্যৎ এবং রাজনৈতিক সম্প্রদায়ের পরিণতিকে ঘিরে। মানুষের রাজনৈতিক উদ্বেগকে তার অস্তিত্বগত উদ্বেগ থেকে বিচ্ছিন্ন করে বোঝা যায় না। বরং নিজের অস্তিত্বের অর্থ ও উদ্দেশ্য অনুসন্ধানের যে প্রকল্প, রাজনীতির পরিসরেই তার পূর্ণতম প্রকাশ ঘটে।
অন্যভাবে বললে, রাজনৈতিক পরিসর এমন এক ক্ষেত্র, যেখানে চিন্তা বাস্তব কর্মে রূপ নেয়; নিছক বুদ্ধিবৃত্তিক উপলব্ধি তখন পরিণত হয় কার্যকর সামাজিক ও রাজনৈতিক চর্চায়। এই অর্থে, রাজনীতি থেকে মানুষের বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া আসলে তার অস্তিত্বের মৌলিক প্রশ্নগুলো থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া।
মোটকথা, যে সমস্যাকে আপাতদৃষ্টিতে অর্থনৈতিক কিংবা রাজনৈতিক বলে মনে হয়, তার মূলে আছে আরও গভীর এক মেটাফিজিকাল ও অস্তিত্বগত সংকট। নয়া-উদারবাদের সংকট তাই কেবল কোনো অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ব্যর্থতা কিংবা রাজনৈতিক কাঠামোর ত্রুটি নয়। এটা মানুষের অস্তিত্বের অর্থ, তার স্বাধীনতা এবং সমষ্টিগত জীবনে তার ভূমিকা নিয়ে এক মৌলিক সংকট।
নিওলিবারেলিজম ও মেটা-অর্ডার
এখন পর্যন্ত আলোচনায় আমি বলেছি – ধর্মনিরপেক্ষতা এবং তার মেটাফিজিক্যাল দিগন্তই হলো নিওলিবারেলিজমের উৎস। এবার আমি আরও এক ধাপ এগিয়ে বলতে চাই – নিওলিবারেলিজম ও ধর্মনিরপেক্ষতা উভয়ই দাঁড়িয়ে আছে এমন এক মেটা-অর্ডার-এর ওপর, যেটিকে কুরআন আখ্যা দিয়েছে ‘দুনিয়া’।
কুরআন পৃথিবীর প্রতি মানুষের দুই রকমের অস্তিত্বমূলক ঝোঁক বা দৃষ্টিভঙ্গির কথা বলে। একদিকে আছে দুনিয়া – যা আত্মকেন্দ্রিক, বিভ্রান্তিমূলক, নিজের ভেতরে আবদ্ধ, আর নিজেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ মনে করে – অতিলৌকিকের সঙ্গে যার কোনো সম্পর্ক নেই। অন্যদিকে আছে আলম, যার আক্ষরিক অর্থ হলো ‘নিদর্শন’। অন্যদিকে, আলাম (العالم) হলো এমন এক উন্মুক্ত জগৎ, যা অতিলৌকিকের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
বাজারের যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার দাবি, তার মেটাফিজিক্যাল যুক্তি ও বৈধতা আসলে মেলে দুনিয়ার এই আপাত স্বয়ংসম্পূর্ণতা থেকেই। বাজারের মতো দুনিয়াও নিজেকে এমন এক পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা হিসেবে হাজির করে, যার বাইরে আর কোনো কিছুর প্রয়োজন নেই। কিন্তু এই স্বয়ংসম্পূর্ণতা আসলে এক ধরনের ভ্রম ছাড়া আর কিছু নয়।
এর বিপরীতে আছে আলাম—যার আক্ষরিক অর্থ ‘নিদর্শন’। এটা এমন এক উন্মুক্ত জগৎ, যেটা নিজের মধ্যে আবদ্ধ নয়; বরং নিজের বাইরের কোনো বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করে। সেই বাস্তবতা হলো আল্লাহর বা খোদার উপস্থিতি। তাই আলামকে বুঝতে হলে তাকে শুধু তার দৃশ্যমান অস্তিত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না; এর মধ্য দিয়ে যে অতিলৌকিক বাস্তবতা প্রকাশ পায়, সেটিকেও বিবেচনায় নিতে হবে।
কোরআনের দৃষ্টিতে, দুনিয়া জগতের অসংখ্য ব্যবস্থার মধ্যে নিছক একটা ব্যবস্থা নয়। বরং এটা এমন এক সর্বব্যাপী কাঠামো, যার ওপর জাগতিক জীবনের অন্যান্য ব্যবস্থা গড়ে ওঠে এবং যার মধ্য দিয়েই তারা নিজেদের বৈধতা প্রতিষ্ঠা করে। এই অর্থে, দুনিয়াই নয়া-উদারবাদের উৎস এবং তাকে বৈধতা দেওয়ার সেই গভীরতর ব্যবস্থা।
এর ফল হলো মানুষ তার আদি সত্তা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, আল্লাহর সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিন্ন হয় এবং জগতের সঙ্গে তার আত্মিক সংযোগ হারিয়ে যায়। নয়া-উদারবাদ যে বিচ্ছিন্নতা তৈরি করে, তা কাটিয়ে উঠতে হলে শুধু অর্থনৈতিক নীতি বা রাজনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তন যথেষ্ট নয়। যেমনটা আমি অন্য জায়গাতেও বলেছি, এর জন্য প্রয়োজন জগতের বিরুদ্ধে, অর্থাৎ, এই সর্বব্যাপী ব্যবস্থা এবং দুনিয়ার বিরুদ্ধে, এক ধরনের বিদ্রোহ।১৪
তরজমা করেছেন সিদ্দিকে আকবর।