মেন্যু
Menu

ইসলামি ইতিহাসের রূপরেখা | ওভামির আনজুম

৮ জুন, ২০২৬

( শরিয়া নিয়ে ওভামির আনজুমের ৪ পর্বের সিরিজের এটি ২য় পর্ব। )

প্রথম পর্ব - বিপন্ন শরীয়াহ্
তৃতীয় পর্ব - দক্ষিণ এশিয়ায় শরীয়ার পুনরুজ্জীবন
চতুর্থ পর্ব - শরীয়ার অসম্ভাব্যতার বিপরীতে

ইসলামি ইতিহাসের রূপরেখাটি আমাদের কেমনভাবে কল্পনা করা উচিত? ইসলামের ভবিষ্যতের ওপরই বা এর প্রভাব কী?

পাশ্চাত্য ভেবেছিল ভবিষ্যৎ হবে ‘স্টার ওয়ার্স’ (Star Wars)-এর মতো, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে এটি সম্ভবত ‘ডুন’ (Dune)-এর মতোই হতে যাচ্ছে। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে ইংরেজ দার্শনিক জন গ্রে আমাদের ঐতিহাসিক পরিস্থিতির এই বিদ্রূপাত্মক কিন্তু উপযুক্ত বর্ণনা দিয়েছেন।1 যদিও বিংশ শতাব্দীর সম্ভবত সবচেয়ে প্রভাবশালী এই দুটি সায়েন্স ফিকশন গল্পের কাহিনী, শৈলী বা বিষয়বস্তুর মধ্যে কোনো মিল নেই, তবুও ভবিষ্যতের ক্ষেত্রে তাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে অন্তত একটি অদ্ভুত মিল রয়েছে। ‘স্টার ওয়ার্স’-এ অকালপক্ক বিদ্রোহী লুক স্কাইওয়াকার একটি প্রাচীন ধর্মীয় গোষ্ঠীতে দীক্ষিত হয় মহাকাশচারী এবং গ্রহ-বিধ্বংসী এক সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে লড়াই করতে; অন্যদিকে ‘ডুন’-এ একটি নব্য-সামন্ততান্ত্রিক আন্তঃনাক্ষত্রিক সাম্রাজ্যের ডিউক এবং ব্যারনরা একটি সম্পদশালী মরুভূমি গ্রহের দখল নিতে ধর্মযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। উভয় ক্ষেত্রেই মধ্যযুগীয় অতীত ‘প্রগতি’ বা উন্নতির রূপ নিয়ে ফিরে আসে। (অল্টারনেটিভ পাঠ হিসেবে ‘মধ্যযুগীয়’ মিথকে ডিমিস্টিফাই করে বিরাজমান ধোঁয়াশা দূর করতে এরুপ সক্রিয়তা বিদ্যায়তনের পরিধিতে নতুন চিন্তার উন্মেষ ঘটাতে সহায়ক) 

জনপ্রিয় এই ভবিষ্যৎ কল্পনাগুলোতে অতীতের এমন টিকে থাকা হয়তো ১৯৬০ এবং ৭০-এর দশকের পশ্চিমা পণ্ডিতদের কাছে বড়জোর একটি অদ্ভুত সেকেলে বিষয় বা নান্দনিক অলঙ্কার বলে মনে হতো, কারণ তারা তখন ধর্মনিরপেক্ষতার মন্ত্রে দীক্ষিত ছিলেন। তবে এখনকার প্রেক্ষাপটে সমাজবিজ্ঞানের ভবিষ্যৎবক্তাদের চেয়ে এই জনপ্রিয় সংস্কৃতির নিদর্শনগুলোকেই বেশি দূরদর্শী মনে হয়। কাল্পনিক কোনো চিন্তামূলক পরীক্ষা নয়, বরং এগুলো কোনোভাবে এমন এক সত্যকে আগেভাগেই অনুমান করেছিল যা প্রতি বছর আরও স্পষ্ট হচ্ছে: পোস্ট-পোস্ট-মডার্নিটি বা উত্তর-উত্তর-আধুনিকতা যে রূপই ধারণ করুক না কেন, তা ধর্মীয় অতীতের ছায়াতলেই ঘটবে।

ভবিষ্যতের পথে আমাদের অগ্রযাত্রার কল্পনা—এবং আমরা কেমন পৃথিবীতে বাস করছি, কী ধরনের কাজ করছি এবং কী ধরণের আশা নিজেদের মনে পোষণ করছি সে সম্পর্কে আমাদের বিশ্বাস—সবই একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আবু আল-মাআলি আল-জুওয়াইনি-র সেই হতাশাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি, যা দক্ষ আইনবিদদের (মুজতাহিদ) প্রয়াণের মাধ্যমে শরীয়ার বিলুপ্তিকে সম্ভব এমনকি আসন্ন বলে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল, তা ছিল মুতাযিলিদের আশাবাদের ঠিক বিপরীত। মুতাযিলিদের আশাবাদ গড়ে উঠেছিল নৈতিক মানদণ্ডের একটি বস্তুনিষ্ঠ উপলব্ধির ওপর, যা মানুষের সর্বোত্তম স্বার্থে কাজ করা আল্লাহর জন্য আবশ্যিক মনে করত। জুওয়াইনির নিজস্ব ঘরানার কিছু সদস্য এবং প্রায় সব অন্যান্য ধর্মতাত্ত্বিক সম্প্রদায় কোনো না কোনোভাবে আশাবাদকে গ্রহণ করেছিলেন, তবে তাদের ধর্মতাত্ত্বিক ভিত্তি ছিল ভিন্ন। আশাবাদের পক্ষে ঐতিহ্যবাদী অবস্থানটি তুলে ধরেছিলেন হাম্বলি আলেম আবু ইয়ালা (মৃত্যু ৪৫৮/১০৬৬) এবং আল-কালওয়াযানি (মৃত্যু ৫১১/১১১৬), যা পরবর্তীতে ইবনে তাইমিয়া (মৃত্যু ৭২৮/১৩২৮) আরও বিকশিত করেন। এরপর অ-হাম্বলি আলেমদের মধ্যে আল-শাতিবি (মৃত্যু ৭৯০/১৩৮৮) এবং আধুনিক যুগের শুরুতে ওয়ালিউল্লাহ দেহলভি (মৃত্যু ১১৭৬/১৭৬২) এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। দেহলভির শরয়ী আশাবাদের সম্পূর্ণ নতুন এবং চিত্তাকর্ষক রূপায়ন পরবর্তী একটি প্রবন্ধের মূল বিষয় হবে। জাইদি থেকে সুন্নি হওয়া পণ্ডিত আল-শাওকানি (মৃত্যু ১২৫০/১৮৩৪) এবং তাঁর উত্তরসূরিদের হাত ধরে এই যুক্তিটি আরও উগ্র রূপ ধারণ করে, যা মাযহাবের প্রয়োজনীয়তাকেই পুরোপুরি অস্বীকার করে।2 (ইসলামের ইতিহাসের বিবেচনাতেই আমরা এমন অনেক ধারা পূর্বেও দেখতে পারি যেখানে এই ধরনের মাযহাব-উত্তর চিন্তাভাবনার উন্মেষ ঘটেছিল এবং সেটা আর্লি-পিরিয়ড থেকে শুরু করে বিভিন্ন সময়ে সংস্কার পন্থী আন্দোলন যারা করেছেন তাদের ধ্যান-ধারণাতেও এমন চিন্তা ছিল (ইবনু হাজম, ইবনুল কাইয়্যিম, শাহ ওয়ালিউল্লাহ সহ প্রমুখ) । বিধায়, এটিকে উগ্র বলে চিহ্নিত করা সমস্যাজনক। খেয়াল রাখতে হবে, মাযহাব কোনো গিভেন বিষয় না, যা কিনা শরীয়াহ্ প্রণেতা ন্যস্ত করে থাকবে। এটি তেমন না, তথা চির-বিরাজমান হিসেবে মাযহাবকে ভাবাটা ভুল। পাশাপাশি, আরো খেয়াল রাখা যেতে পারে যে, মাযহাবের প্রয়োজনীয়তা কে অস্বীকার করা মানে এই নয় যে কোনো ধরনের ইসলাম বা শরিয়ত বিষয়ক প্রয়োজনীয়তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা। বরং এটি ইজতিহাদের দিকে অগ্রগামী হয়ে এখানে যে আরো অবারিত দিগন্ত রয়েছে সেই দিকে মানুষের দৃষ্টি নিয়ে যায়।) 

জুওয়াইনির লেখা থেকে আমরা তাঁর এই পতনবাদী প্রবণতার অন্তত দুটি আন্তঃসম্পর্কিত কারণ অনুমান করতে পারি। প্রথমটি হলো শরীয়াহ্ জ্ঞানের প্রতি আগ্রহ এবং এতে দক্ষতার ক্রমহ্রাসমানতা নিয়ে তাঁর নিজস্ব ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ। সম্ভবত প্রত্যেক শিক্ষকই তাঁর পরবর্তী প্রজন্মের প্রতি যে ধরণের পাণ্ডিত্যপূর্ণ হতাশা পোষণ করেন, এটিও অনেকটা সেরকম:

‘আমি শরীয়ার বিলুপ্তি, এর দায়িত্বে থাকাদের প্রয়াণ এবং এর প্রতি মানুষের অনাগ্রহ কল্পনা করেছি... আমি আরও দেখেছি যে, আইনি মাযহাবগুলোর মহান ইমামরা চলে যাওয়ার পর তাঁদের স্থলাভিষিক্ত হওয়ার মতো কেউ নেই এবং যারা জ্ঞান অন্বেষণ করে তারা ভাসাভাসা জ্ঞান নিয়েই সন্তুষ্ট... তাই আমি জানি যে, এই অবস্থা চলতে থাকলে শরীয়ার আলেমগণ শীঘ্রই বিলুপ্ত হয়ে যাবেন এবং তাঁদের কিতাবসমূহ ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।’3

জুওয়াইনি এখানে যে শব্দগুলো ব্যবহার করেছেন, তা মনে হয় একটি হাদীসেরই ভাবার্থ। তাঁর গ্রন্থের একেবারে শেষে, নিজের ঘরানার কিছু সংশয়বাদী সদস্যের বিরুদ্ধে বিলুপ্তির ধারণাটি প্রমাণ করতে গিয়ে তিনি স্পষ্টভাবে সেই ঐতিহ্যটি উদ্ধৃত করেন: ‘জ্ঞান এমনভাবে তুলে নেওয়া হবে যে, দুজন মানুষ একটি স্পষ্ট বিধান নিয়ে বিতর্ক করবে কিন্তু তারা এমন কাউকে খুঁজে পাবে না যে এই বিষয়ে আল্লাহর ফয়সালা জানে।’4 এই বর্ণনাটি হাদীস বিশেষজ্ঞদের কাছে নির্ভরযোগ্য হিসেবে গণ্য নয়, তবে অনুরূপ একটি হাদীস জুওয়াইনির বক্তব্যকে সমর্থন করে:

‘আল্লাহ [মানুষের স্মৃতি থেকে] জ্ঞান ছিনিয়ে নেবেন না, বরং আলেমদের মৃত্যুর মাধ্যমেই জ্ঞান তুলে নেবেন। ফলে কেবল মূর্খরাই অবশিষ্ট থাকবে, যাদের কাছে কোনো বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তারা নিজেদের মতানুসারে জবাব দেবে; ফলে তারা নিজেরাও পথভ্রষ্ট হবে এবং অন্যদেরও পথভ্রষ্ট করবে।’5 (এইখানে অবশ্য মাস-পাবলিক এনগেজমেন্ট এর বিষয়টা লক্ষ্যণীয় যে, সর্বকালের সর্ব যুগেই তাদের (সাধারণ জনগণ) মধ্যে একটা সাধারণ প্রবণতা ছিল যে তারা কোনো বিষয় জানতে হলে তারা সে বিষয়ে যে অভিজ্ঞ,  পাণ্ডিত্য অর্জন যারা করেছিল তাদের কাছ থেকে বিষয়গুলো জেনে নিতো। এই জায়গা থেকে অনেকে এটাও বলে থাকেন যে আসলে সাধারণ জনগণের কোনো মাযহাব নেই, থাকতে পারেনা। আম-পাবলিক যার থেকে প্রশ্ন করে জেনে নেবে তাঁর (তথা সেই আলিমের) মাযহাবই হচ্ছে সেই আম-পাবলিকের মাযহাব। মাযহাব-উত্তর ও প্রাক-মাযহাবে এধরণের বিপুল চিন্তা হাজির রয়েছে ইসলামের ইতিহাসে।) 

তবে জুওয়াইনি দৃশ্যত এই হাদীসগুলোর দ্বারা চালিত হননি, বরং তাঁর মূল চালিকাশক্তি ছিল ধর্মতাত্ত্বিক বিতর্ক—যেখানে তিনি নৈতিক জ্ঞানের ক্ষেত্রে ‘ভলান্টারিস্ট’ (voluntarist) দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন, যা মূলত ‘ডিভাইন কমান্ড থিওরি’ বা খোদায়ী ফরমানতত্ত্ব নামে পরিচিত।

জুওয়াইনির পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে প্রতিটি মাযহাবের হাদীস-অনুরাগী পণ্ডিতগণ এক বিশাল সংলাপে লিপ্ত হন, যার মূল রূপরেখা ইবনে হাজারের আল-বুখারীর বিখ্যাত ব্যাখ্যাগ্রন্থে পাওয়া যায়। এই বিতর্কটিকে মূলত তিনটি বৈশিষ্ট্যের বর্ণনার মধ্যে সমন্বয় করার চেষ্টা হিসেবে দেখা যেতে পারে:6

১. সেই হাদীসসমূহ যা প্রতিশ্রুতি দেয় যে, মুমিনদের একটি দল কিয়ামত পর্যন্ত সত্যের ওপর অটল থাকবে এবং তাদের বিরোধিতাকারী ও বিশ্বাসঘাতকদের বিরুদ্ধে আল্লাহর পথে লড়াই করবে। ২. সেই হাদীসসমূহ যা বলে যে আল্লাহ জ্ঞান তুলে নেবেন—আলেমদের স্মৃতিশক্তি কেড়ে নিয়ে নয়, বরং তাঁদের জায়গায় একদল ‘রায়’ বা মনগড়া মত প্রদানকারী লোকদের স্থলাভিষিক্ত করে। ৩. সেই হাদীসসমূহ যা কিয়ামতের আগের মহাপ্রলয়কারী ঘটনাবলি এবং সমস্ত মুমিনের মৃত্যু সম্পর্কে কথা বলে।

দ্বিতীয় দলভুক্ত (২) হাদীসগুলোকে হাদীসপন্থীদের দ্বারা ‘রায়’ বা যুক্তিপন্থীদের নিন্দা হিসেবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে (বুখারী যে অধ্যায়ে এটি রেখেছেন তা থেকে এটি স্পষ্ট)। বিকল্পভাবে, এটিকে আল-তাবারির মতো নির্দিষ্ট কোনো অঞ্চলের জন্য প্রযোজ্য বলে ধরা যেতে পারে (তবে ইবনে হাজার এটি নাকচ করে দিয়েছেন কারণ তৃতীয় দলভুক্ত (৩) হাদীসের ফলাফল সর্বজনীন)। এই আপত্তির জবাব দিয়েছেন ইবনে দাকিক আল-ঈদ (মৃত্যু ৭০২/১৩০২); তিনি যুক্তি দেন যে, শেষ জামানার অতিপ্রাকৃত ঘটনা সম্পর্কিত হাদীসগুলোকে ‘স্বাভাবিক’ সময়ের আলোচনা থেকে আলাদা রাখতে হবে।7 (প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে শেষ জামানার হাদিসের আলোচনা আসলে সেখানে একটা বড় ফ্যাক্টর হিসেবে উল্লেখ করা হয় যে ঈসা আলাইহিস সালামের পুনরাগমন এবং একই সাথে ইমাম মাহদির অবস্থানকাল। আর এরুপ বাস্তবতায় শেষ জামানার সে ক্ষণ নিয়ে আলাপ করতে গিয়ে মাযহাব-উত্তর বা ‘অনবরুদ্ধ ইজতিহাদি দ্বার’ চিন্তকরা কিছু জিজ্ঞাসার জবাব খুঁজবার চেষ্টা করেছেন। অবশেষে তারা মতামত হিসেবে ব্যক্ত করেন যে একই সাথে কিছুটা সময়ের তারতম্যে তারা হাজির থেকে প্রচলিত মাযহাবের কোন জায়গায় নিজেদেরকে লোকেট করবেন কিনা! সেস্থল হতে মাযহাবের কোনো স্কুল-অব-থটই সে ইমামদেরকে (মাহদি ও ঈসা আ.) তাদের অন্তর্গত বলে দাবি করে এমন নজরানা নেই। বরং কোনো বিদ্যমান ফিকহি মাযহাবের (হানাফি, মালিকি, শাফেয়ি, হাম্বলি) অনুসারী হিসেবে যে তারা আবির্ভূত হবেন না, বরং কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে সরাসরি ইজতিহাদ করে বিচার করবেন তা সকল মাযাহিবের বক্তব্য। কেননা তাঁদেরকে সাধারণ ফিকহি মাযহাবের কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখা হয় না। সুতরাং সেই জায়গা থেকে উত্তর-মাযহাব চিন্তাধারার সাথে তাদের (মাহদি ও ঈসা আ.) অ্যালাইনমেন্টটাই বেশি প্রকাশ্য) 

জুওয়াইনির মতো বিভিন্ন মাযহাবের অধিকাংশ মুসলিম পণ্ডিত ইতিহাসের একটি পতনবাদী এবং প্রগতি-বিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেছিলেন বলে মনে হয়—যেখানে প্রতিটি প্রজন্ম তার পূর্বসূরীর চেয়ে খারাপ। তবুও তারা ইতিহাসের এই রূপরেখাকে আরও জটিলভাবে ব্যাখ্যা করার পথ খুঁজে পেয়েছেন। এই পর্যায়ে আমরা এই জটিল দৃষ্টিভঙ্গি এবং তাদের টেক্সটগুলোর ওপর কেবল সংক্ষিপ্ত আলোকপাত করতে পারি (নিচের রিপোর্টগুলোর আলোচনার জন্য ইবনে হাজারের 'ফাতহুল বারী' দ্রষ্টব্য; এই শ্রেণীবিন্যাসটি আমার নিজের করা8):

  1. সুন্নি হাদীস ধারা অনুযায়ী, নবীর সমসাময়িক প্রথম প্রজন্ম (উম্মাহ) হলো সর্বশ্রেষ্ঠ প্রজন্ম, এরপর পরবর্তী দুই বা তিন প্রজন্ম; এরপর মিথ্যাচার সাধারণ হয়ে পড়বে। 

  2. হাদীস ঐতিহ্য অনুযায়ী, প্রতি শতাব্দীর শুরুতে দ্বীনের একজন ‘মুজাদ্দিদ’ বা সংস্কারক আসার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। (হাদীস আবশ্যিকভাবে "প্রতি শতাব্দীতে মাত্র একজন" মুজাদ্দিদ থাকবে এ কথা বলে না। মুজাদ্দিদ একজনও হতে পারেন, আবার একটি দল বা বিভিন্ন ক্ষেত্রে একাধিক সংস্কারকও হতে পারেন। উদাহরণস্বরূপ, ইমাম নববী এবং ইবনু হাজার আসকালানী সহ বহু আলেম যে মতামত ব্যক্ত করেছেন, "মুজাদ্দিদ" একজনও হতে পারেন, আবার একাধিক ব্যক্তির সমষ্টিও হতে পারেন। জালালুদ্দিন সুয়ূতীর মতে, কোনো শতাব্দীতে তাজদীদের কাজ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিভক্ত থাকতে পারে: একজন হাদীসে, একজন ফিকহে, একজন আকীদায়, একজন জিহাদ বা রাজনৈতিক নেতৃত্বে, আরেকজন দাওয়াহ ও আধ্যাত্মিক সংস্কারে। সেক্ষেত্রে সবাই মিলে সেই শতাব্দীর "মুজাদ্দিদ" হতে পারেন। ভাষাগতভাবেই হাদীসটি একজন ব্যক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।) 

  3. এমন হাদীস যা শ্রেষ্ঠ প্রজন্ম কোনটি তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে (যেমন: আমার উম্মত বৃষ্টির মতো, কেউ জানে না এর শুরুটা ভালো নাকি শেষটা), এবং অন্যান্য হাদীস যা পরবর্তী প্রজন্মের গুণাবলি বর্ণনা করে। 

  4. অন্যান্য বর্ণনা যা এই চিত্রটিকে আরও জটিল করে তোলে, যেমন—ইসলাম শুরুতে যেভাবে অপরিচিত (আগন্তুক) ছিল, তেমনি আবার অপরিচিত হয়ে পড়বে।

আমরা যদি এই ধারাগুলোতে বর্ণিত ইতিহাসের রূপরেখাটি মানচিত্রে সাজাই, তবে একটি জটিল চিত্র ফুটে ওঠে। (মাত্র উল্লেখ করা যে চারটি পয়েন্ট লেখক নিজে বের করেছেন তা পূর্বে বর্ণিত তিনটি ধারার হাদিসের বৈশিষ্ট্যের সাথেই সংযোজন করে লেখকের নিজেরগুলো তারপর হতে ক্রমান্বয় ধরে বলা হচ্ছে,) চতুর্থ দলভুক্ত (৪) হাদীসগুলো নিরবচ্ছিন্ন পতনের ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দেয়, কিন্তু গভীরভাবে পরীক্ষা করলে দেখা যায় সেগুলো কেবল তাৎক্ষণিক তিন বা চার প্রজন্মকে বোঝায়। পঞ্চম দলভুক্ত (৫) হাদীসগুলো উত্থান-পতনের একটি ভবিষ্যতের কথা বলে। ষষ্ঠ দলভুক্ত (৬) হাদীসগুলো পরবর্তী প্রজন্মের শ্রেষ্ঠত্বের সম্ভাবনা নির্দেশ করে; উম্মাহকে বৃষ্টির সাথে তুলনা করা হয়েছে, যার শেষটা শুরুর চেয়েও ভালো হতে পারে। সপ্তম দলভুক্ত (৭) হাদীসগুলো একটি উত্থান এবং তারপর পতনের কথা বলে, যার ফলে প্রকৃত মুমিনরা কোনো এক সময় আবার ‘আগন্তুক’ হয়ে পড়বে।

আমরা যদি কুরআনের দিকে তাকাই, তবে প্রথম দিকের প্রজন্মের গুণের উচ্চ প্রশংসা পাই—যাদের মধ্যে পরম ধার্মিক মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি হবে, আর পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে ধার্মিকদের সংখ্যা হবে কম (কুরআন ৫৬:১৩-১৪)। তবে মুফাসসিরগণ দ্বিধায় আছেন যে, এই আয়াতগুলো কি পূর্ববর্তী নবীদের উম্মতের তুলনায় মুহাম্মাদী উম্মতের কথা বলছে? অন্যরা মনে করেন আয়াতটি কেবল মুহাম্মাদী উম্মতকেই উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে এবং প্রথম দিকের মুসলিমদের শ্রেষ্ঠত্বের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।9 সামগ্রিকভাবে এই পাঠগুলো মুসলিমদের প্রথম প্রজন্মের অতুলনীয় শ্রেষ্ঠত্বের ইঙ্গিত দেয়, তবে এগুলো অবশ্যই নিরবচ্ছিন্ন পতনের কোনো চিরস্থায়ী ধারা বা প্যারাডাইম প্রতিষ্ঠা করে না।

সম্পূর্ণ এক না হলেও, এই পাঠগুলো এবং এ সংক্রান্ত আলোচনা শরীয়ার বিলুপ্তি নিয়ে আমাদের অনুসন্ধানের সাথে যুক্ত। কেউ ধরে নিতে পারেন যে, পরকালের উচ্চ মর্যাদা শরীয়ার জ্ঞানের সাথেই সম্পর্কিত এবং জ্ঞানের বিলুপ্তি মর্যাদার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তবে জুওয়াইনির মডেলে এটি এতটা সহজ নয়; কারণ শরীয়াহ্ একটি জ্ঞানের কাঠামো হিসেবে—যেভাবে জুওয়াইনি একে গুরুত্ব দিয়েছেন—সর্বশ্রেষ্ঠ প্রজন্মগুলোর বিদায়ের পরেই অস্তিত্ব লাভ করে। এটি জুওয়াইনির এই জেদ থেকেও স্পষ্ট যে, যদিও আবু বকর এবং উমরের মতো সাহাবীগণ জ্ঞান ও মর্যাদায় ইমাম শাফেয়ীর মতো মুজতাহিদদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ ছিলেন, তবুও কেবল পরবর্তী মুজতাহিদদের মাযহাবই অনুসরণ করা উচিত, কারণ সেগুলো সঠিকভাবে সুবিন্যস্ত। এই দ্বিধা জুওয়াইনি এবং শাস্ত্রীয় যুগের অন্যান্য পণ্ডিতদের মধ্যে স্পষ্টভাবে বিদ্যমান। আমি অন্য জায়গায় বিস্তারিতভাবে দেখিয়েছি যে, জুওয়াইনি (এবং তাঁর শিষ্য আল-গাজালিও (মৃত্যু ৫০৫/১১১১)) যুক্তি দেন যে পরবর্তী যুগের পণ্ডিতরা শ্রেষ্ঠ কারণ তাদের জ্ঞান অনেক বেশি সুবিন্যস্ত এবং দালিলিক; অথচ আবার অন্য লেখায় পূর্বসূরীদের (সালাফ) পথকেই বেশি গুণী এবং বুদ্ধিদীপ্ত বলে জোর দেন।[10]

সংক্ষেপে, ইসলামি ইতিহাসের রূপরেখাকে শাস্ত্রীয় ঐতিহ্যে কেবল একটি সরলরেখার মতো নিরবচ্ছিন্ন পতন হিসেবে দেখা হয়নি। শরীয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে জুওয়াইনির পতনবাদ এবং হতাশাবাদ মূলত জটিল ধর্মতাত্ত্বিক বিতর্কের মাধ্যমে চালিত হয়েছিল এবং তাঁর অন্যান্য প্রতিশ্রুতির কারণে তা মাঝেমধ্যে বাধাগ্রস্তও হয়েছিল।

শরীয়ার জীবন ও মৃত্যু নিয়ে সহস্রাব্দব্যাপী বিতর্কের এই প্রথম পর্বটি ছিল উচ্চমাত্রায় তাত্ত্বিক। কিছু বিশেষ মুহূর্ত ছাড়া—যেমন মঙ্গোলদের বাগদাদ বিজয়ের পরবর্তী শতাব্দীতে চেঙ্গিস খানের ‘ইয়াসা’ (মৌখিক আইন সংহিতা) যখন মুহাম্মাদী শরীয়ার সামনে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল—ইসলামি ভূখণ্ডে শরীয়ার প্রাধান্য নিয়ে কখনো সন্দেহ ছিল না। তাই এই বিতর্কের মূলে ছিল তাত্ত্বিক উদ্বেগ এবং উচ্চতর জল্পনা-কল্পনা, যা আংশিকভাবে জ্ঞানের বিলুপ্তি বা স্থায়িত্ব বিষয়ক হাদীসগুলো দ্বারা চালিত হয়েছিল। শরীয়াহ্-র ক্লান্তি এবং ‘ইজতিহাদের দরজা’ সংক্রান্ত সুপরিচিত বিতর্কগুলোকে সময়ের পরিবর্তনের সাথে শরীয়ার সামঞ্জস্য নিয়ে উদ্বেগের চেয়ে বরং এই ধরণের তাত্ত্বিক আলোচনার আগ্রহ হিসেবেই বোঝা উচিত।

তবে ইসলামের দ্বিতীয় সহস্রাব্দের শুরুতে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে। বিশেষ করে ইসলামি বিশ্বের প্রান্তিক অঞ্চলগুলোতে—যেমন মুঘল সম্রাট আকবরের (মৃত্যু ১০১৪/১৬০৫) শাসনকাল এবং আঠারো শতকের মাঝামাঝি মারাঠা বিজয়ের পরবর্তী ভারতে—শরীয়াহ্ আগের চেয়ে অনেক বেশি নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়ে। পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে যে উদ্বেগগুলো সর্বব্যাপী হয়ে ওঠার কথা ছিল, তা দিল্লির মহান পন্ডিত শাহ ওয়ালিউল্লাহর লেখায় শক্তিশালীভাবে প্রকাশিত হয়েছে। আমরা পরবর্তী প্রবন্ধে দেখব যে, একদিকে পুনরুজ্জীবন ও নবায়ন এবং অন্যদিকে সংস্কার ও পুনর্গঠনের ধারণাগুলো সেই সময় থেকে মুসলিম চিন্তা ও কর্মের প্রধান উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।


Notes:

[1] Novara Media, “Everything You Know About the Future is Wrong.,” interview by Aaron Bastani, Novara Media, YouTube, October 22, 2023, video, 1:29:09, https://www.youtube.com/watch?v=6rsGkfngA5M.

[2] See Ahmad Dallal, Islam without Europe: Traditions of Reform in Eighteenth-Century Islamic Thought (Chapel Hill: University of North Carolina Press, 2018); and Muhammad Khalid Masud, Islamic Legal Philosophy: A Study of Abū Isḥāq Al-Shāṭibī’s Life and Thought (Islamabad: Islamic Research Institute, 1977).

[3] Juwaynī, Ghiyāth al-umam, quoted in Wael B. Hallaq, “Was the Gate of Ijtihad Closed?,” International Journal of Middle East Studies 16, no. 1 (1984): 14.

[4] Abū al-Ma’alī al-Juwaynī, Ghiyāth al-umam fī ‘ltiyāth al-ẓulam, ed. ‘Abd al-‘Azīm al-Dīb (Qatar, [1401]), 523.

[5] Bukhārī 7307, K. al-Iʿtiṣām bi’l-kitāb wa’l-sunna.

[6] Ibn Ḥajar al-ʿAsqalānī, Fatḥ al-bārī (Egypt: al-Maktaba al-Salafiyya, 1380-90), 13:286–87.

[7] Ahmad Atif Ahmad, The Fatigue of the Sharīʿa, (London: Palgrave Macmillan, 2012), 124.

[8] Ibn Ḥajar, Fatḥ al-bārī, 7:3–7.

[9] Ibn ʿAṭiyya, al-Muḥarrar al-wajīz (Qatar: Wizārat al-awqāf, 1436/2015), 9:352–3, under verse 56:13–4.

[10] Ovamir Anjum, “Cultural Memory of the Pious Ancestors (Salaf) in al-Ghazālī,” Numen 58 (2011): 344–74.


তরজমা করেছেন সিদ্দিকে আকবর।

মূল নিবন্ধ - https://islamiclaw.blog/2024/01/11/the-shape-of-islamic-history/