জিন্নাহকে দায়মুক্তি দেওয়ার সময় এসেছে
(২০২৬ সালের ১৪ ই সেপ্টেম্বর দেশের তথাকথিত প্রগতিশীল গোষ্ঠীর প্রত্যক্ষ মদদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সংগ্রহশালা হতে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি ছিঁড়ে ফেলেন এক ব্যক্তি। এ ঘটনার সাথে ভারতের একটি ঘটনা সাদৃশ্যপূর্ণ। ১৯৩৮ সাল থেকে ভারতের আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের কক্ষে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি টাঙানো ছিল। কারণ, জিন্নাহ আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের আজীবন সদস্য। ২০১৮ সালে হিন্দু যুব বাহিনী নামক একটি উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদী সংগঠনের সন্ত্রাসীরা এ ছবিকে ইস্যু বানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের উপর হামলা চালায়। এ প্রেক্ষাপটে মুসলিম ছাত্রনেতা শারজিল ইমাম ভারতীয় নিউজ ওয়েবসাইট The Wire এ It's Time We Absolve Jinnah শিরোনামে একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেন। বাংলাদেশের তথাকথিত প্রগতিশীল গোষ্ঠী এবং ভারতের উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীর অপকর্মের প্রেক্ষাপটে নিবন্ধটি প্রাসঙ্গিক। - অনুবাদক)
ভারতীয় মিডিয়াতে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর প্রসঙ্গ আসলে ভারতীয় মুসলমানগণ উৎসাহের সহিত আধা-হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের (কংগ্রেস) খুশি করবার কাজে লেগে পড়েন। তারা পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতার সমালোচনা করেন; কীভাবে জিন্নাহ ভারত জাতিকে ক্ষতিগ্রস্ত ও বিভক্ত করেছেন! ২০০৫ সালে যখন লালকৃষ্ণ আদভানি জিন্নাহর মাজারে গমন করেছিলেন, তখন ভারতীয় মুসলমানদের প্রতিক্রিয়া এমনই ছিল। প্রায় এক দশক পর আলীগড় মুসলিম ইউনিভার্সিটির (এ.এম.ইউ.) ঘটনার ক্ষেত্রেও তারা একই রকম প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে।
আধুনিক ভারতীয় মানস এবং জিন্নাহর সম্পর্ক খুব জটিল। জিন্নাহর রাষ্ট্রচিন্তার কারণে ভারতীয় জাতীয়তাবাদী (কংগ্রেস) এবং হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের (আরএসএস, বিজেপি) সাথে জিন্নাহর সম্পর্ক রাগ ও ক্ষোভের।
তারা জিন্নাহকে একজন সাম্প্রদায়িক রাজনীতিবিদ হিসেবে দেখে থাকেন। তাদের দৃষ্টিতে জিন্নাহ একজন ক্ষমতালোভী শাসক, যিনি ভারতীয়দের ধর্মের ভিত্তিতে বিভক্ত করেছেন। ভারতীয় মুসলমানদের কয়েক প্রজন্ম ধরে এমনটাই জানানো হয়েছে। তবে তারা দেশভাগ ও জিন্নাহর কিছু স্মৃতি ধরে রেখেছে। তাদের অনেকের কাছে জিন্নাহ দেশভাগের জন্য দায়ী এবং একই সাথে তিনি মুসলিম ভারতের শ্রেষ্ঠ নেতাদের একজন, যিনি ভারতীয় মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ করার মাধ্যমে মুসলিম লীগকে একটি জাতীয় রাজনৈতিক দলে পরিণত করেছিলেন।
ভারতীয় মুসলমান মানসে জিন্নাহর এই পরস্পরবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি বিভিন্ন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে প্রকাশিত হয়েছে। আলীগড় মুসলিম ইউনিভার্সিটির ঘটনায় এই দৃষ্টিভঙ্গি আবার প্রকাশ পেয়েছে। ১৯৩৮ সাল হতে জিন্নাহর ছবিটি আলীগড়ে ছিল। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, জিন্নাহ মুসলিম ভারতের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের একজন। এসব স্ববিরোধী অবস্থান এবং ঘটনাসমূহ স্পষ্ট করে, ভারতের জনগণ দেশভাগের দশ বছর পূর্বের ঘটনাসমূহ এবং পাকিস্তান আন্দোলন সম্বন্ধে অবহিত নন। তারা ভারতীয় জাতীয়তাবাদের মিথ্যা প্রোপাগান্ডা দ্বারা প্রভাবিত। তারা ভারতীয় জাতীয়তাবাদের তোষামোদ করাকে সামাজিক দায়িত্ব মনে করেন।
জিন্নাহকে নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে বোঝা এবং ভারতীয় মুসলমানদের স্ববিরোধী অবস্থানের সমাধানের জন্য আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় দেশভাগ সম্পর্কিত একটি পূর্ণাঙ্গ আলোচনা অন্তর্ভুক্ত করা উচিত ছিল। যাই হোক, দেশভাগকালীন দাঙ্গার দায় জিন্নাহর উপর দিয়ে তার মতো ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বকে নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে দেখার সম্ভাবনা বিলীন করে দেওয়া হয়েছে। এই কাজটি করেছে কংগ্রেস। মুসলমানদের প্রকৃত দাবিসমূহ তারা মেনে নেয়নি। দাবিগুলোর মধ্যে একটি ছিল রাজনৈতিক আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের দাবি। এসব আড়াল করতেই তারা এসব মিথ্যা অপবাদ জিন্নাহর উপর দিয়ে থাকে।
কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের দ্বন্দ্ব
কংগ্রেস ‘এক জাতিতত্ত্ব’ বিষয়ে অনড় ছিল। ‘জাতি', ‘সমাজ' এবং ‘গণতন্ত্র’ সম্পর্কিত কোনো সূক্ষ্ম আলোচনায় তারা আসতে চাইত না। কংগ্রেস-মুসলিম লীগের দ্বন্দ্বের মূল ইস্যুসমূহ ছিল—মুসলিম প্রতিনিধিত্ব, পৃথক নির্বাচনী ব্যবস্থাপনা এবং কেন্দ্র-রাজ্যের ক্ষমতার ভারসাম্য। এই ইস্যুগুলোতে প্রায় দশ বছর যাবৎ মুসলিম রাজনৈতিক দলগুলো কংগ্রেসের তরফ থেকে নিশ্চয়তা চেয়ে আসছিল।
১৯৩৮ সালে জিন্নাহ লন্ডন হতে ফিরে আসেন এবং মুসলিম লীগের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তখন তিনি কংগ্রেসের নিকট হতে এই ইস্যুগুলোর সমাধান আশা করেছিলেন। জিন্নাহ কংগ্রেসের উপর পুনরায় বিশ্বাস আনলেন। তিনি আশা করেছিলেন, এর মাধ্যমে ভারতীয় মুসলমানগণ কংগ্রেসের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করতে শুরু করবে।
দেশভাগ নিয়ে আলোচনা করার সময় কখনোই এই তিনটি ইস্যু সামনে নিয়ে আসা হয় না। বরং বারবার ‘সাম্প্রদায়িকতা’, ‘প্যান-ইসলামিজম’, ‘নয়া মদিনা' এই আলাপসমূহ সামনে নিয়ে আসা হয়। সিংহভাগ মুসলিম রাজনৈতিক সংগঠনসমূহ আইনসভা, পাবলিক সার্ভিস এবং সামরিক ক্ষেত্রে মুসলমানদের প্রতিনিধিত্ব দাবি করছিল, যাতে তারা বৈষম্যের কারণে পিছিয়ে না পড়ে। বিভাগপূর্ব ভারতে এজন্যই মূলত মুসলিমরা উগ্র হিন্দুদের দ্বারা মব ভায়োলেন্সের শিকার হতো।
মুসলিম রাজনৈতিক দল ‘মোমিন কনফারেন্স’ মুসলিম প্রতিনিধিত্বের অধিকারের দাবি জানিয়েছিল। এর মাধ্যমে তারা মূলত পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বের অধিকার ও সুরক্ষার দাবি জানিয়েছিল। মুসলিম লীগের সভাপতি হিসেবে জিন্নাহ সাংবিধানিকভাবে সামরিক ক্ষেত্রে মুসলমানদের সুনির্দিষ্ট অংশীদারিত্ব দাবি করেছিলেন। জিন্নাহ ‘Political rights emanate from political might’ অর্থাৎ রাজনৈতিক শক্তিই রাজনৈতিক অধিকারের উৎস—এই নীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন। যদি দুইটি সমাজের মানুষ পরস্পরকে ‘সম্মান এবং ভয়' না করে, তবে যেকোনো চুক্তি বা সন্ধি শুধু কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুটি হলো, কংগ্রেসের রাষ্ট্রভাবনায় কেন্দ্রীয় সরকারের গুরুত্ব ছিল তুলনামূলক বেশি। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশসমূহ স্বায়ত্তশাসন দাবি করছিল, অপরদিকে কংগ্রেস দিল্লিতে একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষে ছিল। সে সময় ভারতে হিন্দুদের সংখ্যা ছিল মুসলমানদের তুলনায় তিন গুণ বেশি। এক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সংসদে কোনো আইনের পক্ষে-বিপক্ষে মতামত চাওয়া হলে, সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু সাংসদগণের তিন-চতুর্থাংশ ভোটে আইনটি পাস হয়ে যাবে। সকল মুসলিম সাংসদ এক হয়ে আইনটির বিরোধিতা করলেও আইনটি পাস হয়ে যাবে। আইনটি অবিভক্ত ভারতের রাষ্ট্রব্যবস্থায় প্রতিটি স্তরে প্রভাব ফেলবে এবং ভারতের সর্ববৃহৎ সংখ্যালঘু জাতি মুসলমানদের মতামতের কোনো মূল্য থাকবে না। জিন্নাহ এমন রাষ্ট্রব্যবস্থাকে গণতান্ত্রিক মনে করতেন না। তিনি এই বিষয়টিকে এভাবে দেখতেন—একটি জাতি (হিন্দু) অপর একটি জাতিকে (মুসলমান) শোষণ করছে ব্যালট বক্সের মাধ্যমে। এজন্য তিনি আইনসভায় মুসলমানদের ভেটো (বিরোধিতা) প্রদানের অধিকার দাবি করেছিলেন।
মুসলিম লীগের দাবিগুলো প্রাসঙ্গিক ও যৌক্তিক ছিল। কংগ্রেস এসব যৌক্তিক দাবিকে ‘সাম্প্রদায়িক দাবি’ হিসেবে আখ্যায়িত করল।
‘সাম্প্রদায়িকতা’ শব্দটিকে কংগ্রেস খুব নোংরাভাবে বিকৃত করেছে। ফলস্বরূপ, আমরা ‘সাম্প্রদায়িক’ শব্দটির প্রকৃত অর্থ ভুলে বসেছি। ‘সাম্প্রদায়িক’ শব্দটি সম্প্রদায়ের (Community) সাথে সম্পর্কযুক্ত এবং ঔপনিবেশিক আমলের চিন্তকগণ এটিকে এ অর্থেই ব্যবহার করতেন। কংগ্রেসের অপব্যাখ্যার কারণে আমরা ‘সাম্প্রদায়িক’ শব্দটিকে নেতিবাচকভাবে দেখে থাকি। সাম্প্রদায়িকতা বলতে অন্য সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ঘৃণা উৎপাদন বা অপপ্রচার চালানো বোঝায় না; সাম্প্রদায়িকতা অর্থ নিজেকে একটি সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত মনে করা।
সংখ্যালঘু অধিকার
ব্রিটিশ ভারতে অসংখ্য সম্প্রদায় (হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, জৈন প্রভৃতি) ও বর্ণের (দলিত, হরিজন প্রভৃতি) মানুষ বসবাস করত। ‘Imagined Communities’ গ্রন্থে বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসন জাতির যে সংজ্ঞা প্রদান করেছেন, সে সংজ্ঞানুযায়ী ‘ভারতীয় জাতি' বলতে কোনো কিছুর অস্তিত্ব নেই। জিন্নাহর মতে, ‘ভারতীয় জাতীয়তাবাদ’-এর বাস্তবায়ন বা ‘ভারতীয় জাতি' তখনই অস্তিত্ব লাভ করবে যখন সংখ্যালঘু গোষ্ঠীসমূহ নিরাপত্তা লাভ করবে। কংগ্রেস উল্টো সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষায় সোচ্চার এরকম একজন ব্যক্তি এবং তার দল অর্থাৎ ‘মুসলিম লীগ'-কে সাম্প্রদায়িক বলে মন্তব্য করে বসল। কংগ্রেস ‘সাম্প্রদায়িকতা’ শব্দটিকে বিকৃত করল এবং শব্দটিকে একটি নেতিবাচক অর্থ প্রদান করল। একইভাবে তারা ‘সেক্যুলারিজম’ শব্দটিরও একটি বিকৃত অর্থ তৈরি করল এবং মুসলমানদের সাংবিধানিক অধিকার ক্ষুণ্ন করার একটি মাধ্যম হিসেবে তারা সেক্যুলারিজম শব্দটিকে ব্যবহার করতে আরম্ভ করল।
কংগ্রেস এসব গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুকে ধামাচাপা দিয়ে বিভিন্ন অপ্রাসঙ্গিক আলাপ দিতে আরম্ভ করল। যেমন: সার্বভৌমত্ব, সম্প্রদায়-জাতির সম্পর্ক এবং ‘কওম' শব্দটি ইংরেজি অর্থ 'কমিউনিটি' হবে, না 'জাতি' হবে ইত্যাদি।
আমার প্রতিবেশী কি আমার হয়ে কোনো আইন পাস করতে পারে? শুধু এজন্য যে, সে আমার প্রতিবেশী—এক্ষেত্রে কি তার কোনো বৈধতার প্রয়োজন নেই? দুইটি ভিন্ন সম্প্রদায়কে কি একটি জাতি বলা যেতে পারে, যখন তারা পরস্পরের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয় না, একসঙ্গে বসে আহারও করে না? সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের (মুসলমান, শিখ, দলিত) বিরুদ্ধে সংখ্যাগুরুদের (হিন্দু) যখন তীব্র বিদ্বেষ স্পষ্ট, তখন শুধু সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত নেতাদের আশ্বাসের উপর বিশ্বাস করা কতটুকু যুক্তিযুক্ত? একটি শক্তিশালী কেন্দ্রশাসিত সরকার, যা এমন এক সম্প্রদায়ের মানুষদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, যারা মুসলমানদের তুলনায় সংখ্যায় তিন গুণ বেশি এবং সেখানে মুসলমানদের ভেটো (বিরোধিতা) প্রদানের কোনো সুযোগ নেই—এমন রাষ্ট্রব্যবস্থা সমর্থন করা কতটুকু যুক্তিযুক্ত? কেন্দ্রে তিন-চতুর্থাংশ মেজরিটি থাকায় একটি সম্প্রদায় কি একতরফাভাবে সংবিধান সংশোধন করতে পারে? এক্ষেত্রে উত্তর-পশ্চিম এবং পূর্বের প্রদেশসমূহের নিপীড়ন ও বৈষম্যের আশঙ্কা করে বিচ্ছিন্ন হওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়াটা কি যৌক্তিক নয়? ভারতীয় জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে এতগুলো যৌক্তিক প্রশ্ন থাকা সত্ত্বেও একজন অতি উদারপন্থী ব্যক্তিও উগ্র জাতীয়তাবাদীতে পরিণত হয় এবং হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের কথা বলতে আরম্ভ করে। আমার মতে, বর্তমান সময়ে এই প্রশ্নগুলো আরও বৃহৎ বিতর্ক বা আলোচনার সূচনা করবে। সামনের দিনগুলোতে ভারতীয় মুসলমানদের অবস্থা আরও খারাপ হবে এবং এ প্রশ্নগুলো বারবার উত্থাপিত হতে থাকবে।
জিন্নাহ ও মুসলিম লীগ
পুনরায় জিন্নাহর আলোচনায় ফিরে আসা যাক। মুসলিম লীগের সভাপতি থাকাকালীন জিন্নাহ দুইটি নির্বাচন পেয়েছিলেন। ১৯৩৭ সালে কংগ্রেস হিন্দুদের ঐক্যবদ্ধ করে ৭০% হিন্দু ভোট লাভ করে। মুসলিম ভোটগুলো ইউনিয়নিস্ট পার্টি, মুসলিম ইন্ডিপেনডেন্ট পার্টির মধ্যে ভাগ হয়ে যায়।
সে নির্বাচনে মুসলিম লীগ ছিল একমাত্র দল যা সারা ভারতজুড়ে ১০% মুসলিম ভোট লাভ করে। এ সময় কংগ্রেস মুসলিম রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে জোটবদ্ধ হতে অস্বীকৃতি জানায়। এমনকি কংগ্রেসের মুসলিম সদস্য এবং জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের নেতারাও মুসলিম রাজনৈতিক দলসমূহের বিরোধিতা করে লেখালেখি শুরু করেন। মুসলিম অধ্যুষিত প্রদেশসমূহে (যেমন: বিহার, উত্তরপ্রদেশ) মুসলিম নিপীড়ন বাড়তে থাকে। ফলস্বরূপ, মুসলমানদের মাঝে মুসলিম লীগের জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে।
মুসলিম লীগের সামনে অনেক প্রতিবন্ধকতা ছিল। মুসলিম লীগকে স্বয়ং মুসলিম রাজনৈতিক দলসমূহের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয়েছিল, কারণ সে সময় কংগ্রেস মুসলিম ভোট পেত না। এ সময় জিন্নাহ বিভিন্ন আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলসমূহের সাথে জোট গঠন করতে আরম্ভ করেন। এমনকি তিনি নিম্নবর্ণের হিন্দুদের নেতা এবং ভারতের সংবিধান প্রণেতা বি. আর. আম্বেদকারের সঙ্গে আলোচনায় বসেন। ১৯৩৮ সালের অক্টোবর মাসে আম্বেদকার ভাইসরয়ের নিকট জিন্নাহকে দলিতদের প্রতিনিধিত্ব করার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। আম্বেদকার ১৯৪৬ সালে বোম্বে হতে নির্বাচিত হয়ে গণপরিষদে যেতে পারেননি; তিনি পূর্ব বাংলার শিডিউলড কাস্টস ফেডারেশন এবং মুসলিম লীগের ভোটে গণপরিষদে গিয়েছিলেন।
১৯৪৬ সালে ব্রিটিশরা ভারত ছাড়ার প্রস্তুতি গ্রহণ করে। ‘৪৬-এর নির্বাচনে ব্রিটিশ ভারতের প্রায় ৮০% মুসলিম ভোট জিন্নাহর কৌশলের কারণে মুসলিম লীগ পেয়ে যায়। এই ভয়টাই কংগ্রেস পেয়েছিল। তারা মুসলমানদের ভোট না পেয়েও নিজেদের মুসলিম প্রতিনিধি দাবি করত।
জিন্নাহ মুসলমানদের সত্যিকার প্রতিনিধি হিসেবে আবির্ভূত হলেন। সকল মুসলিম রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি হিসেবে জিন্নাহ সেই পুরোনো দাবিসমূহ (সংখ্যালঘুদের পৃথক নির্বাচনী ব্যবস্থা, কেন্দ্র-রাজ্যের ক্ষমতা প্রভৃতি) পুনরায় উত্থাপন করলেন। এসব দাবি কংগ্রেস বরাবরের মতো প্রত্যাখ্যান করল। কংগ্রেস প্রথমে ক্যাবিনেট মিশন প্ল্যান মেনে নিলেও পরবর্তীতে তা প্রত্যাখ্যান করে। মাওলানা আবুল কালাম আজাদের ইন্ডিয়া উইনস ফ্রিডম গ্রন্থে এ সংক্রান্ত বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ভারতের মুসলমানদের সামনে দুইটি পথ ছিল: (১) গৃহযুদ্ধ এবং (২) দেশভাগ।
বিভক্ত ভারতে জিন্নাহ
বিভাগ-পরবর্তী ভারতে জিন্নাহ সংক্রান্ত আলোচনাসমূহ হলো: জিন্নাহর অধার্মিকতা, তার সাম্প্রদায়িকতা, ব্রিটিশদের ‘ভাগ করো, শাসন করো’ নীতির প্রতি তার সমর্থন, পাকিস্তান বানিয়ে তিনি কীভাবে ভারতের মুসলমানদের দুর্বল করে দিয়েছেন ইত্যাদি।
কে ধার্মিক, আর কে ধার্মিক নয়—এটা পরিমাপের কোনো আদর্শ মানদণ্ড আমাদের হাতে নেই। জিন্নাহর বক্তৃতা-বিবৃতিসমূহ দেখলেই বোঝা যায়, ইসলামী আইন, ইসলামী সমাজব্যবস্থা এবং সমসাময়িক মুসলমানদের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে তার জানাশোনা কতটুকু ছিল। অনেকে অভিযোগ করে থাকেন, ঔপনিবেশিক শিক্ষার কারণে তিনি ভারতের প্রকৃত অবস্থা বুঝতে অক্ষম ছিলেন। যাই হোক, এ অভিযোগ ভিত্তিহীন; কারণ সে সময়ের অধিকাংশ নেতাই ঔপনিবেশিক শিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন।
জিন্নাহ যে সাম্প্রদায়িকতার কথা বলেছেন সেটি ইতিবাচক ছিল। বর্তমান সময়ে এসে এই শব্দের ব্যবহার দেখে জিন্নাহর সাম্প্রদায়িকতাকে বোঝা সম্ভব নয়। তিনি ভারতীয় জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী ছিলেন না। তিনি মনে করতেন, ভারতে অসংখ্য জাতি বসবাস করে। ভারতের অসংখ্য জাতিসমূহের মাঝে তিনি একটি জাতির (মুসলমান) প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন এবং এর মাধ্যমে তিনি অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়সমূহের অধিকার রক্ষার প্রতিনিধি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল।
সাম্প্রদায়িকতার অভিযোগটি বারবার আসে এবং একই সাথে এটি আলাদা নির্বাচনী ব্যবস্থার মতো বিষয়গুলোকে সামনে নিয়ে আসে। এ নিয়ে পূর্বে আমরা আলোচনা করেছি। মোমিন কনফারেন্সের মতো মুসলিম রাজনৈতিক দলসমূহ পৃথক নির্বাচনী ব্যবস্থা বাতিল করে দেওয়ার ফলে বিলুপ্ত হয়ে যায়। একই সাথে কংগ্রেস পিছিয়ে পড়া মুসলমানদের সুরক্ষার বিষয়টিকেও ধামাচাপা দিতে সক্ষম হয়।
অপরদিকে পাকিস্তানে হিন্দুদের পৃথক নির্বাচনী ব্যবস্থা থাকায় ১৯৫৪ সালের পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক নির্বাচনে পাকিস্তান কংগ্রেস ৩০টি আসনে জয়ী হয়েছিল। এটা সত্য যে, ব্রিটিশরা মুসলমান এবং হিন্দুদের মাঝে বিভাজন তৈরি করত। এর অর্থ এই নয় যে, পৃথক নির্বাচনী ব্যবস্থা, সার্বভৌমত্ব, জাতীয়তার প্রশ্নগুলো অপ্রাসঙ্গিক। অনেকে এসব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নকে ‘অভিজাত মুসলমানদের ক্ষমতা অর্জনের উপায়' হিসেবে চালিয়ে দেয়।
জিন্নাহ ও ভারতীয় মুসলিম
দেশভাগের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত মুসলমানরা তাদের দুর্বল করে দেওয়ার জন্য জিন্নাহকে দায়ী করে আসছে। এটা সত্য যে, দেশভাগের ফলে মুসলমানরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিন্তু এর দায় জিন্নাহর উপর দেওয়াটা অযৌক্তিক। এটি ঐতিহাসিকভাবেও ভিত্তিহীন। জিন্নাহ বলেছিলেন, আমরা ১৫% হই আর ২৫%—এসব বিষয় নয়; আমাদের নিরাপত্তা সাংবিধানিকভাবে নিশ্চিত করতে হবে। কংগ্রেসের রাষ্ট্রব্যবস্থায় হিন্দুদের হাতে ক্ষমতা পুঞ্জীভূত করবার সকল ব্যবস্থা করে রাখা ছিল। কর্তৃত্ববাদী হিন্দুদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত একটি কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে থাকার চাইতে মুসলিম অধ্যুষিত প্রদেশসমূহ বিচ্ছিন্ন হওয়ার সিদ্ধান্তে আসল। তাদের নিকট অন্য কোনো উপায় ছিল না। সুতরাং, দেশভাগের দায় তাদের নয়; কংগ্রেস কর্তৃক সৃষ্ট পরিস্থিতির ফলে তারা এ সিদ্ধান্তে আসতে বাধ্য হয়েছিল।
দ্বিতীয়ত, দেশভাগ-পরবর্তী সময়ে ভারতের মুসলমানদের কষ্টদায়ক পরিস্থিতির জন্যও জিন্নাহ দায়ী নন। ভারতের উগ্র ডানপন্থী হিন্দু গোষ্ঠী এবং রাষ্ট্রব্যবস্থা মুসলিম হত্যা এবং নিপীড়নের জন্য দায়ী। এই রাষ্ট্রব্যবস্থা মুসলমানদের সকল প্রকার অধিকার থেকে বঞ্চিত করে আসছে। জিন্নাহর পাকিস্তানে আলাদা নির্বাচনী ব্যবস্থা আছে, যেটি ভারতে নেই। জিন্নাহ ভারতীয় মুসলমানদের ক্ষতি করেননি; মুসলমানদের ক্ষতিগ্রস্ত করেছে কংগ্রেস এবং তাদের উত্তরসূরি বিজেপি।
সে সময় জিন্নাহ যেসকল প্রশ্ন উত্থাপন করেছিলেন সেগুলো আজও প্রাসঙ্গিক। পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ধর্মীয় সংখ্যালঘু গোষ্ঠী হিসেবে ভারতীয় মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় ভিক্টিম। ভারতের অবরুদ্ধ মুসলমানদের রাজনৈতিক সংগ্রাম সামনের দিনগুলোতে প্লুরাল ডেমোক্রেসির সংজ্ঞা নির্ধারণ করবে।
আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকা জিন্নাহর ছবিটি পুনর্বাসিত করতে হবে। দরকার হলে আমাদের এমন আরও ছবি স্থাপন করতে হবে।
তরজমা করেছেন খন্দকার আবু শিহাব ।
মূল নিবন্ধ - https://m.thewire.in/article/communalism/aligarh-muslim-university-jinnah-portrait/amp