মেন্যু
Menu

ফিকহুল মিজান : ইনসানিয়্যাত ও হারিয়ে যাওয়া ভারসাম্য

৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

বর্তমান বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি এবং এর সুরতহাল নিয়ে আলোচনার আগে আমাদের জেনে নেওয়া দরকার ‘ফিকহুল মিজান’ কী।

‘ফিকহুল মিজান’ মূলত একটি সুক্ষ্ম জ্ঞান। এই জ্ঞানের ভিত্তি হলো—

• প্রতিটি বিষয়েরই একটি নির্দিষ্ট ‘মিজান’ (পরিমাপক) ও নিজস্ব ওজন রয়েছে।

• শরিয়তের প্রতিটি বিষয়ের রয়েছে আলাদা ‘মিজান’। এক বিষয়ের মিজান দিয়ে যদি অন্য বিষয় বা এক অধ্যায়ের মিজান দিয়ে যদি অন্য কোনো অধ্যায়কে ওজন করা হয়; তবে মিজানের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়। এই কারণেই পবিত্র কুরআনে কিয়ামতের দিনের পরম ন্যায়বিচারকে বোঝাতে বহুবচন শব্দ ‘মাওয়াজিন’ (একাধিক মিজান) ব্যবহার করা হয়েছে। কারণ, আল্লাহ তায়ালা মুমিনকে বিচার করবেন মুমিন হিসেবে তার নির্দিষ্ট ‘মিজান’ অনুযায়ী। আর অবাধ্য ও জালিম কাফির—যার কাছে দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছেছে এবং সে তা অহংকার করে প্রত্যাখ্যান করেছে—তাকে বিচার করা হবে তার নির্দিষ্ট ‘মিজান’ অনুযায়ী। আবার যে কাফিরের কাছে দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছায়নি, তার বিচার হবে ভিন্ন মিজানে। এভাবে প্রত্যেকেই নিজ নিজ ‘মিজান’ অনুযায়ী বিচারের মুখোমুখি হবে। এমনকি কুরআনে যেখানে ‘মিজান’ শব্দটি একবচনে এসেছে, সেখানেও এর দ্বারা ‘মিজান’-এর জিনসকে বোঝানো হয়েছে, যা একবচন ও বহুবচন উভয়কেই শামিল করে।

• শরিয়তের প্রতিটি বিধানের রয়েছে আলাদা আলাদা ওজন।

• মুকাল্লাফের প্রতিটি কাজের রয়েছে আলাদা আলাদা ওজন।

• প্রতিটি ব্যক্তির রয়েছে আলাদা ওজন।

• প্রতিটি সময়ের রয়েছে আলাদা ওজন।

• প্রতিটি স্থানের রয়েছে আলাদা মর্যাদা ও ওজন।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, সাধারণ মানুষের চেয়ে অনুকরণযোগ্য আলিমদের ভুলের ওজন বা গুনাহ অনেক বেশি ভারী। ঠিক তেমনিভাবে, রমজান মাসের ইবাদত কিংবা হারাম শরিফের ইবাদতের ওজন বা সওয়াব অন্য যেকোনো সময় বা স্থানের ইবাদতের চেয়ে অনেক বেশি ভারী ও মর্যাদাপূর্ণ।

আকিদার মিজান আর শরিয়তের হুকুম-আহকামের মিজান এক নয়। অদৃশ্য জগতের (গাইব) মিজান আর দৃশ্যমান জগতের মিজান ভিন্ন। ইবাদতের মিজান ও সামাজিক আচারের (আদাত) মিজান আলাদা। তেমনিভাবে, জিহাদের মিজান আর দাওয়াত, সন্ধি ও শান্তিপূর্ণ অবস্থার মিজান এক নয়। এভাবেই ইসলামের প্রতিটি বিষয়েরই রয়েছে স্বতন্ত্র মিজান।

পদ্ধতিগত নীতিমালা

প্রতিটি বিষয়কে যদি তার নিজস্ব মিজান অনুযায়ী ওজন করা না হয়, তাহলে ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়। আর এর ফলে সেই ওজনের ওপর ভিত্তি করে নেওয়া সিদ্ধান্ত ও ফলাফলেও ভুল হয়।

কিছু উদাহরণ

আকিদার মিজান আর শরিয়তের বিধানের মিজান এক নয়। অদৃশ্য জগতের (গাইব) মিজান আর দৃশ্যমান জগতের মিজান ভিন্ন। ইবাদতের মিজান ও সামাজিক আচারের (আদাত) মিজান আলাদা। তেমনিভাবে, জিহাদের মিজান আর দাওয়াত, সন্ধি ও শান্তিপূর্ণ অবস্থার মিজান এক নয়। এভাবেই ইসলামের প্রতিটি বিষয়েরই রয়েছে স্বতন্ত্র মিজান। ঠিক যেভাবে বস্তুগত জগতের মিজানগুলোও ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। যেমন—গণিতের মিজান আর ভূতত্ত্বের মিজান এক নয়; আবার বিদ্যুৎ ও পানির মিজানও সম্পূর্ণ আলাদা।

• কুল্লিয়্যাতের ওজন আর জুযয়িয়্যাতের ওজন এক নয়।

• মাকাসিদের ওজন আর উপায় বা পন্থার (ওসায়িল) ওজন আলাদা।

• ব্যভিচারের (যিনা) পাপের যে ওজন, তা কেবল দৃষ্টিপাত বা একান্ত আলাপচারিতার (খালওয়াত) ওজনের সমান নয়।

• আল্লাহর সাথে শিরক করার যে ভয়াবহ ওজন, তা অন্য কোনো কবিরা গুনাহের ওজনের মতো নয়।

• কবিরা গুনাহের ওজন আর সাধারণ হারামের ওজন এক নয়।

• কুরআন-হাদিসের স্পষ্ট নস দ্বারা প্রমাণিত হারামের ওজন আর মাকরুহের ওজন আলাদা।

• ফরজের ওজন আর ওয়াজিবের ওজন এক নয়; আবার ওয়াজিবের ওজন আর মুস্তাহাবের ওজনও ভিন্ন।

আসলে সব ভারসাম্য রক্ষা বা নষ্ট হওয়ার মূল গোড়া হলো মানুষের চিন্তা। চিন্তার মিজানই যদি ত্রুটিপূর্ণ হয় এবং তা যদি উভয় পাল্লাকে সমানভাবে ধরে রাখতে না পারে, তবে তার প্রভাব ও ফলাফলও ত্রুটিপূর্ণ হতে বাধ্য।

আসলে ‘ফিকহুল মিজান’, ‘ফিকহুল মুওয়াযানাত’ (তুলনার ফিকহ) এবং ‘ফিকহুল আওলায়িয়্যাত’ (অগ্রাধিকারের ফিকহ) এক জিনিস নয়; যদিও এদের মধ্যে রয়েছে গভীর ও অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক। ফিকহুল মিজানের জ্ঞান ইসলামের গভীর বোঝাপড়া ও সমঝদারির দরজা পুরোপুরি খুলে দেয়। এই জ্ঞান না থাকলে চিন্তাভাবনা ও বোঝাপড়ায় জট লেগে যায়, বিশৃঙ্খলা তৈরি হয় এবং মানুষের ওপর অন্যায় ও জুলুমের পথ সুগম হয়।

অন্য এক দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়, আমরা মানুষেরা মাটির তৈরি। জমিন থেকে তৈরি। তাই এই জমিনের বেশিরভাগ বৈশিষ্ট্যই আমাদের মধ্যে বিদ্যমান। জমিন অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো—এটি ‘জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি’ (যাওজ), যা দুটি ডানা বা দুটি পাল্লার ওপর ভর করে টিকে থাকে। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন—

'পবিত্র মহান সেই সত্তা, যিনি জোড়া সৃষ্টি করেছেন সবকিছুর—উদ্ভিদ, মানুষ এবং তারা নিজেরাও যা জানে না, তার মধ্য থেকে।' সূরা ইয়াসিন : ৩৬

এই কারণেই পৃথিবীর ভারসাম্য এই জোড়ার ওপর, বরং এর প্রতিটি উপাদান ও অণু-পরমাণুর জোড়ার ওপর নির্ভরশীল। আল্লাহ তায়ালা বলেন—

'...আর আমি তাতে প্রত্যেক (পৃথিবীতে) প্রতিটি জিনিস উৎপন্ন করেছি ওজনসমেত (সুপরিমিতভাবে)।' সূরা হিজর : ১৯

এরই ভিত্তিতে বলা যায়, পৃথিবী যেমন জোড়াবদ্ধ, মানুষও তেমনি জোড়াবদ্ধ। আর মানুষের ওপর যে ইলাহি কালাম বা রিসালাত অবতীর্ণ হয়েছে, তাও এই মহাবিশ্বের দ্বিমুখী বা জোড়াবদ্ধ চিন্তাধারাকেই ধারণ করে। এই চিন্তাধারার মূল ভিত্তি হলো—এটা একই সাথে দুনিয়া ও আখিরাত, রুহ (আত্মা) ও বস্তু (পদার্থ), যুদ্ধ ও শান্তি এবং ন্যায়বিচার ও ইহসানের সব দাবি পূরণ করা। এই কারণেই হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) পবিত্র কুরআনের আয়াত—'শপথ জোড়ের ও বেজোড়ের' (সূরা ফজর : ৩)—এর ব্যাখ্যায় বলেছেন—

'একমাত্র আল্লাহ তায়ালাই হলেন বেজোড় (একক), আর তিনি ছাড়া বাকি সবকিছুই জোড়।'

কিন্তু মানুষ যখনই একচোখা বা একমুখী দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেছে, তখনই সব ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গেছে। যেমন—বস্তুবাদীরা কেবল বস্তু আর এই দুনিয়াকেই চেনে। ফলে এক পাল্লার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা তাদের ‘জীবন-মিজান’টি বিকল হয়ে পড়েছে। এর পরিণতিতে আল্লাহ, পরকাল এবং মানুষের জীবনে প্রভাব বিস্তারকারী রুহানি মূল্যবোধের নুর মুছে গেছে। আর তখনই জন্ম নেয় অবাধ্যতা ও জুলুম। কারণ, তাদের সামনে তখন আকিদার কোনো বাধা থাকে না, আখলাকের কোনো লাগাম থাকে না এবং পরকালের কোনো ভয়ও অবশিষ্ট থাকে না। একইভাবে যারা কেবল বৈরাগ্য বা আধ্যাত্মিকতা নিয়ে মেতে ছিল, তাদের ভারসাম্যও নষ্ট হয়ে গেছে। কারণ তাদের মিজানটি কেবল রুহের পাল্লার ওপর ভর করে ছিল। ফলে তারা দুনিয়া, সভ্যতার অগ্রগতি, উন্নয়ন, বিজ্ঞান ও সৃজনশীলতার দৌড়ে পিছিয়ে পড়েছে।

আসলে সব ভারসাম্য রক্ষা বা নষ্ট হওয়ার মূল গোড়া হলো মানুষের চিন্তা। চিন্তার মিজানই যদি ত্রুটিপূর্ণ হয় এবং তা যদি উভয় পাল্লাকে সমানভাবে ধরে রাখতে না পারে, তবে তার প্রভাব ও ফলাফলও ত্রুটিপূর্ণ হতে বাধ্য।

আর এই কারণেই আজ আমরা দেখছি, গোটা বিশ্ব বা এর বেশিরভাগ অংশই রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক অস্থিরতায় ভুগছে। আজ বুদ্ধিবৃত্তি ও বাস্তবতার ময়দানে সন্ত্রাসবাদ এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা এক মহা বিপদের সংকেত দিচ্ছে। বিশ্বের উন্নত, অনুন্নত কিংবা মধ্যম সারির—সব দেশেই আজ আমরা চরম বেদনাদায়ক পরিস্থিতি দেখছি। যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সন্ত্রাস, ভয়ভীতি আর হাজার হাজার নিরীহ মানুষের প্রাণ কেড়ে নেওয়া বোমাবাজির হাত থেকে আজ কোনো রাষ্ট্রই নিরাপদ নয়। ইরাক, সিরিয়া, ইয়েমেন, লিবিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আজ এই ধ্বংসলীলা চলছে।

এইসব সমস্যা, যুদ্ধ আর ফিতনা-ফ্যাসাদের কারণে আজ মানুষের মনে ভয়, উদ্বেগ এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে। এর ওপর আবার নতুন সংকট যোগ করেছে মানসিক অস্থিরতা। বৈষয়িক চাহিদার আতিশয্য আর রুহানিয়াতের শূন্যতার কারণে আজ বিশ্বের ৩৫ শতাংশের বেশি মানুষ উদ্বেগ ও মানসিক কষ্টে ভুগছে। তারা ভেতরের চেয়ে বাইরের চাকচিক্যকেই বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে।

মানবাধিকার লঙ্ঘন, মানুষের নিরাপত্তা ও অস্তিত্বের ওপর আঘাত এবং এই হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ কেবল উল্লেখিত যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ নেই। বরং তা আজ বিশ্বের অধিকাংশ দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। পৃথিবীর বড় বড় গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে আজ বর্ণবাদের বিস্তার দেখা যাচ্ছে। ফিলিস্তিনের কুদস, পশ্চিম তীর ও গাজায় দখলদার নিপীড়ক জায়নবাদীদের অপরাধ ও নির্যাতন দিন দিন বেড়েই চলেছে।

একইভাবে আমরা মিয়ানমারে (বার্মা) মজলুম রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর জাতিগত ও ধর্মীয় নিধনযজ্ঞ দেখেছি। জাতিসংঘ যাদেরকে পৃথিবীর সবচেয়ে নির্যাতিত, নিপীড়িত ও বাস্তুচ্যুত জাতি হিসেবে ঘোষণা করেছে, বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারীদের হাতে তারা নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে। এমনকি নিজ দেশেই এই জনগোষ্ঠী গণহত্যা ও জোরপূর্বক দেশান্তরের মুখোমুখি হয়েছে। আর যারা এই জাহান্নাম থেকে কোনোমতে প্রাণ হাতে নিয়ে পালিয়ে যেতে পেরেছে, তারা পড়েছে ক্ষুধা, মৃত্যু ও ইজ্জতহানির মুখে। এমনকি অপরাধী চক্র ও দালালেরা তাদের শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কেনাবেচার ব্যবসাও ফেঁদে বসেছে। ঠিক একই রকম নির্মম পরিস্থিতি আজ চীনের উইঘুর মুসলিম ভাইদের বেলাতেও দেখা যাচ্ছে।

একইভাবে আমরা মধ্য আফ্রিকাতেও মুসলমানদের ওপর সুপরিকল্পিত আগ্রাসন দেখতে পাচ্ছি। সেখানে খ্রিষ্টধর্মের অনুসারীরা হত্যা, অগ্নিসংযোগ ও জোরপূর্বক দেশান্তরের মাধ্যমে মুসলমানদের পুরোপুরি নির্মূল করার চেষ্টা চালাচ্ছে। পাশাপাশী সার্বরা মুসলমানদের ওপর যে যুদ্ধাপরাধ ও বর্বরতা চালিয়েছিল, তাও আমরা ভুলে যাইনি, যা মানবতার ইতিহাসে এক কলঙ্কজনক অধ্যায়।

অন্যদিকে, আইএস (ইসলামিক স্টেট) ও আল কায়েদার মতো কিছু চরমপন্থী দল ইসলামের নামে সন্ত্রাস ও বোমা হামলা চালাচ্ছে। অথচ এদের কর্মকাণ্ড ইসলামের রহমত, আখলাক ও মানবিক মূল্যবোধ থেকে সম্পূর্ণ দূরে। এরা মুসলমান ও অমুসলিম সবাইকে নির্বিচারে হত্যা করছে। শস্যক্ষেত, মানুষের বংশধারা ও ঐতিহাসিক ঐতিহ্য ধ্বংস করছে এবং পৃথিবীতে ফাসাদ সৃষ্টি করে বেড়াচ্ছে।

আসলে আজ সংলাপ, আলোচনা ও যুক্তির জায়গাটুকু দখল করে নিয়েছে সহিংসতা, ধ্বংসযজ্ঞ আর বাস্তুচ্যুতির নির্মম ভাষা। যুক্তির শক্তির ওপর আজ জেঁকে বসেছে শক্তির যুক্তি। সহনশীলতা, সন্ধি, সমঝোতা, পুণ্য ও কল্যাণের পথে পারস্পরিক সহযোগিতা এবং মানুষের কল্যাণের মহৎ আদর্শ আজ ঢাকা পড়ে গেছে যুদ্ধ, হুমকি আর ভীতির সংস্কৃতির নিচে।

এইসব সমস্যা, যুদ্ধ আর ফিতনা-ফ্যাসাদের কারণে আজ মানুষের মনে ভয়, উদ্বেগ এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে। এর ওপর আবার নতুন সংকট যোগ করেছে মানসিক অস্থিরতা। বৈষয়িক চাহিদার আতিশয্য আর রুহানিয়াতের শূন্যতার কারণে আজ বিশ্বের ৩৫ শতাংশের বেশি মানুষ উদ্বেগ ও মানসিক কষ্টে ভুগছে। তারা ভেতরের চেয়ে বাইরের চাকচিক্যকেই বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে।

এর পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে এখন নতুন করে নাৎসিবাদ ও বর্ণবাদের উগ্রতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। আসমানি কিতাবের অনুসারী কিংবা মানব-রচিত ধর্মের অনুসারী—সবার মধ্যেই আজ ঘৃণা, কট্টরতা ও চরমপন্থী কথাবার্তার বিস্তার ঘটছে। এর মূল কারণ হলো, প্রতিষ্ঠিত ধর্মগুলোর নেতারা এই সমস্যাগুলো সমাধানে একসাথে কাজ করছেন না। অথচ এই ধরনের বৈশ্বিক সংকটের পূর্ণাঙ্গ সমাধান কেবল ধর্মই দিতে পারে। এর জন্য প্রয়োজন বিভিন্ন ধর্মের আলিম, পুরোহিত ও পণ্ডিতদের একতাবদ্ধ হওয়া এবং একটি সাধারণ ও ন্যায়সঙ্গত ইস্যুতে একমত হওয়া। যেমনটি মহান আল্লাহ তায়ালা বলেছেন—

'বলুন, হে কিতাবিগণ! তোমরা এমন এক কথার দিকে এসো, যা আমাদের ও তোমাদের মধ্যে সমান; তা হলো—আমরা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করব না, তাঁর সাথে কোনো কিছুকে শরিক করব না এবং আমাদের কেউ আল্লাহকে ছেড়ে একে অপরকে রব হিসেবে গ্রহণ করব না। তারপর যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে তোমরা বলো—তোমরা সাক্ষী থাকো যে, নিশ্চয়ই আমরা মুসলমান (আত্মসমর্পণকারী)।' সূরা আলে ইমরান : ৬৪

বর্তমানে যা কিছুই ঘটুক না কেন, সকল আসমানি ধর্মের মূল নীতিই কিন্তু বর্ণবাদ, উগ্র জাতীয়তাবাদ, শারীরিক, মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে। ধর্ম কখনোই মানুষের ক্ষতি করা বা আল্লাহর দেওয়া মানবাধিকার ক্ষুণ্ন করা সমর্থন করে না।

তাই আজকের দিনে আমাদের প্রধান দায়িত্ব হলো, সব ধর্মের মানুষ এক হয়ে বর্ণবাদ ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো—তা যেখান থেকেই আসুক না কেন। কারণ, বর্ণবাদ মূলত মানবতার শত্রু, তাই একে প্রতিরোধ করতেই হবে। আর সন্ত্রাসবাদের আসলে কোনো ধর্ম নেই। আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও এই সন্ত্রাসবাদ তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে। তাছাড়া, সব ধর্মের অনুসারীদের মধ্যেই এর প্রকাশ ঘটেছে। আমরা দেখেছি অর্থোডক্স খ্রিষ্টান সার্বদের সন্ত্রাসবাদ, মধ্য আফ্রিকায় ক্যাথলিক খ্রিষ্টানদের সহিংসতা, ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ঘটে যাওয়া হামলা, মিয়ানমার ও ভারতে বৌদ্ধ ও হিন্দুদের উগ্রতা এবং মুসলমান নামধারী কিছু চরমপন্থী দলের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড।

তিউনিসিয়া, মিশরসহ অন্যান্য দেশে যখন ‘আরব বসন্ত’ সফল হয়েছিল, তখন এই সন্ত্রাসী দলগুলোর তৎপরতা ও নড়াচড়া অনেকটাই কমে গিয়েছিল। কারণ, চোখের সামনে সফলতার আলো দেখে যুবকদের মন থেকে সব হতাশা দূর হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে যখন সেই বিপ্লব ও বৈধ সরকারকে হটিয়ে দেওয়া হলো, তখন চরমপন্থী দলগুলো আবার নতুন শক্তিতে জেগে উঠল।

আর এই কারণেই আলিম হিসেবে আমাদের প্রধান দায়িত্ব হলো মানুষের সামনে এই বিষয়গুলো স্পষ্ট করা—

• সন্ত্রাসবাদের কোনো ধর্ম নেই। কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের ওপর এর দায় চাপানো বা সেই ধর্মকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো একেবারেই অনুচিত।

• আমাদের এই সন্ত্রাসী দলগুলোর আসল চেহারা, মুখোশ উন্মোচন করতে হবে। আমাদের স্পষ্ট জানাতে হবে যে, এদের শীর্ষ নেতারা আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর হাতের পুতুল। আর সাধারণ যুবকেরা হলো তাদের প্রধান শিকার। তাই এই বিভ্রান্ত যুবকদের উগ্রবাদীদের হাত থেকে বাঁচানো আমাদের কর্তব্য।

• সব ধর্মের নেতৃবৃন্দকে পারস্পরিক সহযোগিতা ও সমন্বয় আরও বাড়াতে হবে। এর মাধ্যমে সন্ত্রাসবাদের ভয়াবহতা এবং ধর্মের সাথে এর দূরতম সম্পর্ক না থাকার বিষয়টি তুলে ধরতে হবে।

• ধর্মের প্রকৃত রূপ মানুষের সামনে তুলে ধরা প্রয়োজন। নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা যে কোনো ধর্ম, আকল বা আইন সমর্থন করে না—তা স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিতে হবে।

• ধর্মীয় উগ্রবাদের মূল কারণগুলো দূর করতে আমাদের সবাইকে আপ্রাণ চেষ্টা করতে হবে। সমাজে জেঁকে বসা জুলুম, স্বৈরতন্ত্র, দারিদ্র্য ও বেকারত্বই এই উগ্রবাদের জন্ম দেয়। তাই এর সমাধান কেবল সামরিক বা নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। বরং সবচেয়ে বেশি জোর দিতে হবে ধর্মীয় ও বুদ্ধিবৃত্তিক সংস্কারের ওপর। আরবিতে একটি প্রবাদ আছে—‘লোহা দিয়েই লোহা কাটতে হয়’। ঠিক তেমনি, ভুল চিন্তাভাবনাকে কেবল সঠিক চিন্তাভাবনা দিয়েই খণ্ডন করা সম্ভব।

• অতীতের সব অভিজ্ঞতা প্রমাণ করেছে যে, চরমপন্থী চিন্তাভাবনাকে কেবল গায়ের জোর বা শক্তি দিয়ে দমন করা যায় না। আবার একে অন্য কোনো চরমপন্থী চিন্তা দিয়েও সংশোধন করা অসম্ভব। তাই ধর্মীয় চরমপন্থাকে কখনো সেকুলার চরমপন্থা দিয়ে মোকাবিলা করা যাবে না।

আরেকটি বিষয় সবাইকে মনে রাখতে হবে। মুসলিম বিশ্বে বর্তমানে একটি বিশাল ইসলামি পুনর্জাগরণ (সহওয়া) চলছে। একে জোর করে চেপে রাখা বা পুরোপুরি মুছে ফেলা অসম্ভব। তাই আমাদের সবার দায়িত্ব হলো এই পুনর্জাগরণকে সঠিক ও ভারসাম্যপূর্ণ পথ দেখানো। আর এই শূন্যতা পূরণের জন্য আমাদের উচিত ভারসাম্যপূর্ণ (মু’তাদিল) দলগুলোকে সমর্থন দেওয়া। তা না হলে এই অঞ্চল আরও বড় ধরনের অশান্তির আগুনে জ্বলে উঠবে।

একটি বিষয় সবার জানা দরকার। তিউনিসিয়া, মিশরসহ অন্যান্য দেশে যখন ‘আরব বসন্ত’ সফল হয়েছিল, তখন এই সন্ত্রাসী দলগুলোর তৎপরতা ও নড়াচড়া অনেকটাই কমে গিয়েছিল। কারণ, চোখের সামনে সফলতার আলো দেখে যুবকদের মন থেকে সব হতাশা দূর হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে যখন সেই বিপ্লব ও বৈধ সরকারকে হটিয়ে দেওয়া হলো, তখন চরমপন্থী দলগুলো আবার নতুন শক্তিতে জেগে উঠল। এর ফলেই আইএসের (দায়েশ) মতো দলের জন্ম হলো, যারা আল কায়েদার চেয়েও অনেক বেশি উগ্র ও রক্তপিপাসু।

আজ আমরা এক কঠিন দোমাথায় এসে দাঁড়িয়েছি। এখন হয় বিশ্বের এই হরেক রকমের সংকট আরও ভয়াবহ রূপ নেবে, না হয় দুনিয়ার আকলবান ও বুদ্ধিমান মানুষেরা একজোট হয়ে প্রজ্ঞা, পারস্পরিক আলোচনা এবং উত্তম পন্থায় বিতর্কের মাধ্যমে এই সমস্যাগুলোর সমাধান করবেন। ভুল চিন্তার অবসান ঘটাতে হবে সঠিক চিন্তা দিয়ে। যুবসমাজের সমস্যাগুলোর স্থায়ী ও টেকসই সমাধান খুঁজে বের করতে হবে।

আসলে এই সংকটের আসল ও স্থায়ী সমাধান হলো রাজনৈতিক ব্যবস্থার সংস্কার করা। মুসলিম দেশগুলোর জনগণের ওপর কোনো শাসন চাপিয়ে দেওয়া যাবে না, বরং নিজেদের শাসক নিজেরা বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা থাকতে হবে। দেশ পরিচালনার দায়িত্বে এমন মানুষদের আসতে হবে যারা আল্লাহ তায়ালাকে ভয় করেন। তারা নিজেরা যেমন আর্থিক, প্রশাসনিক ও সামাজিক দুর্নীতিতে জড়াবেন না, তেমনি ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও কার্যকর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে সব ধরনের দুর্নীতি কঠোরভাবে দমন করবেন। আর তখনই জনগণের সম্পদ কেবল জনগণের কল্যাণেই খরচ হবে।

এই রাজনৈতিক সততার সাথে যদি একটি সামগ্রিক উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা যায়, তবে সমাজ থেকে দারিদ্র্য ও বেকারত্বের অভিশাপ পুরোপুরি দূর হবে, অথবা অন্তত অনেকটাই কমে আসবে। আর এই পদক্ষেপগুলোই চরমপন্থা ও সন্ত্রাসবাদের উৎসগুলোকে চিরতরে নিঃশেষ করে দিতে অবদান রাখবে। এর পাশাপাশি ফিলিস্তিন সংকটেরও একটি স্থায়ী সমাধান করতে হবে। কারণ ফিলিস্তিন ইস্যুটিই আরব ও মুসলিম উম্মাহর ক্ষোভের প্রধান উৎস। অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে জায়নবাদীদের রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডই মূলত মুসলিম বিশ্বে উগ্রবাদের জন্ম দিচ্ছে।

উগ্রপন্থা ও ‘মিজান’

আইএস বা দায়েশপন্থীদের শরিয়তের ‘মিজান’ পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। তারা ইসলামকে কেবল কিতালের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলেছে। তারা কিতাল সংক্রান্ত কিছু আয়াতের ওপর ভিত্তি করে কেবল যুদ্ধের পাল্লাটিকেই আঁকড়ে ধরেছে। এমনকি এর মধ্যে একটি আয়াতকে তারা ‘আয়তুস সাইফ’ বা তরবারির আয়াত নাম দিয়েছে। তাদের দাবি—এই একটি আয়াত নাকি শান্তি, সন্ধি ও সহাবস্থান সংক্রান্ত কুরআনের ১২৪টি আয়াতকে মানসুখ করে দিয়েছে! অথচ কিতাল সংক্রান্ত এই আয়াতগুলোর মূল মাকসাদ হলো কেবল শত্রুতা ও আগ্রাসনকে প্রতিহত করা, যা মূলত যুদ্ধের মিজানের অন্তর্ভুক্ত। অন্যদিকে, অমুসলিমদের সাথে সদ্ব্যবহার, ইহসান, কোমলতা ও উত্তম কথা বলার নির্দেশ দিয়ে যে শত শত আয়াত এসেছে, তা হলো ইসলামের অন্য পাল্লা। একে বলা হয়—শান্তি, দাওয়াত ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের মিজান।

একইভাবে, অমুসলিম উগ্র ও বর্ণবাদীদেরও মানবিক মিজান সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। এর পাশাপাশি তাদের ঈমান, আখলাক ও নৈতিক মূল্যবোধের মিজানও ভেঙে পড়েছে।

তরজমা করেছেন মু. সাজ্জাদ হুসাইন খাঁন।