মেন্যু
Menu

‘বিজ্ঞান’ প্রসঙ্গে | হাসান স্পাইকার

৩১ অক্টোবর, ২০২৬

‘বিজ্ঞান’ (Science) শব্দটি আধুনিক বিজ্ঞানের সমার্থক হয়ে উঠেছে খুব বেশি দিন হয়নি। উনিশ শতকের শেষভাগ পর্যন্ত একে বলা হতো ‘প্রাকৃতিক দর্শন’ (Natural Philosophy)। ফলে নামের দিক থেকেও এটা অধিবিদ্যা বা মেটাফিজিক্সের সাথে সম্পর্ক বজায় রেখেছিল। লাতিন scientia শব্দের আদি অর্থ ছিল প্রমাণনির্ভর জ্ঞান। একসময় মেটাফিজিক্সকেই সবচেয়ে ‘বৈজ্ঞানিক’ জ্ঞানশাখা হিসেবে বিবেচনা করা হতো। কারণ, এর নীতিমালা ও সিদ্ধান্ত ছিল সুস্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট; অন্যান্য জ্ঞানশাখা এর ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠত, অথচ অন্য কোনো জ্ঞানশাখার পক্ষে এর মৌলিক ভিত্তি পরিবর্তন করা সম্ভব ছিল না।

ইসলামি জ্ঞানতত্ত্বে ‘ইলম’ (عِلْم)-এর নানা সংজ্ঞা রয়েছে। সেগুলোর মধ্যে এখানে সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক হলো এমন একটা সংজ্ঞা, যা নিছক উপলব্ধি কিংবা অভিজ্ঞতাকে নয়, বরং (প্রচলিত অর্থে) বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান ও চিন্তাচর্চার মধ্য দিয়ে অর্জিত তাত্ত্বিক নিশ্চয়তাকে বোঝায়। সংজ্ঞাটি হলো:

صِفَةٌ تُوجِبُ تَمْيِيزًا بَيْنَ الْمَعَانِي لَا يَحْتَمِلُ النَّقِيضَ

অর্থাৎ, এমন এক গুণ বা অবস্থা, যা বিভিন্ন অর্থের মধ্যে এমন পার্থক্য নির্ণয় করতে সক্ষম, যার বিপরীত হওয়ার কোনো অবকাশ নেই।

এই সংজ্ঞা থেকে বোঝা যায়, ‘বিজ্ঞান’ বলতে মূলত এমন জ্ঞানকেই বোঝানো হতো, যার বিষয়বস্তু সার্বজনীন এবং যা বুদ্ধিবৃত্তিক উপলব্ধির মাধ্যমে অর্জিত হয়; নিছক অভিজ্ঞতা বা ব্যবহারিক প্রয়োগের মাধ্যমে নয়। উপনিবেশ-পূর্ব যুগে উলামারাই ছিলেন জ্ঞানচর্চার বিভিন্ন শাখার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তদাতা। কারণ, তাঁরা এমন একটা স্তরবিন্যস্ত জ্ঞানকাঠামোর অন্তর্ভুক্ত ছিলেন, যার সর্বোচ্চ স্তরে অবস্থান করত অধিবিদ্যাগত ধর্মতত্ত্ব (Metaphysical Theology)।

কিন্তু আজ নানা সামাজিক, রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক কারণে–যেসব ক্ষেত্রে যুক্তির ভূমিকা সামান্যই–অধিকাংশ মুসলিম এই দ্বিখণ্ডিত জ্ঞানকাঠামোকে পুরোপুরি মেনে নিয়েছে। এই কাঠামোয় ‘ধর্মীয় বিজ্ঞান’ ও ‘প্রাকৃতিক বিজ্ঞান’ দুটি সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন জ্ঞানশাখা, যাদের মধ্যে কোনো যোগসূত্র থাকার কথা নয়। আজ আরব বিশ্বের কোনো দেশে গেলে দেখা যাবে, সাধারণ মানুষের কাছে ‘উলামা’ (العُلَمَاء) বলতে মূলত আধুনিক বিজ্ঞানীদেরই বোঝায়; স্টিফেন হকিংয়ের মতো ব্যক্তিরাই এর পরিচিত উদাহরণ। আরবি ‘ইলম’ (عِلْم) শব্দটির অর্থও অনেকটা সংকুচিত ও পরিবর্তিত হয়ে গেছে, ঠিক যেমন একসময় ইংরেজি ‘Science’ শব্দটির ক্ষেত্রে ঘটেছিল। এই অর্থগত দখলদারত্ব আমাদের চিন্তার দৈন্যকেই প্রকাশ করে। কারণ, প্রাকৃতিক বিজ্ঞান–যাকে একসময় ‘প্রাকৃতিক দর্শন’ বলা হতো–গড়ে উঠেছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক দার্শনিক প্রেক্ষাপটে। ষোড়শ থেকে অষ্টাদশ শতকের ইউরোপীয় বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের মধ্য দিয়ে এর বিকাশ ঘটে। সে সময় প্রকৃতির ব্যাখ্যা থেকে আনুষ্ঠানিক কারণ (Formal Causality) ও চূড়ান্ত কারণের (Final Causality) ধারণাকে কঠোরভাবে বাদ দেওয়া হয়। একই সাথে প্রকৃতির যে বৈশিষ্ট্যগুলোকে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের উপযোগী বলে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল, সেগুলোও সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে তথাকথিত ‘প্রাথমিক গুণাবলি’র (Primary Qualities) মধ্যে–অর্থাৎ বস্তুর মূলত পরিমাণগত বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে।

প্রাচীন প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের সাথে তুলনা করলে দেখা যায়, এই নতুন ও দ্বিখণ্ডিত ‘বিজ্ঞান’ কখনোই ইসলামি জ্ঞানকাঠামোর সাথে সমালোচনামূলক সংলাপের মধ্য দিয়ে সমন্বিত হতে পারেনি। উপনিবেশবাদের তোলপাড়ের মধ্যে অবশিষ্ট উলামারা বরং তাঁদের জ্ঞানপরম্পরার মৌলিক নীতিগুলো রক্ষা করতেই ব্যস্ত ছিলেন। এর অনিবার্য পরিণতিতে প্রাকৃতিক জগতের সামগ্রিক অধ্যয়ন ক্রমে চলে যায় নতুন প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের অন্ধ অনুসারীদের হাতে। মুসলিম বিশ্বে তখন গড়ে উঠছিল নতুন নতুন সেকুলার স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়। সেখানকার শিক্ষিত, নবীন এক শ্রেণি সহজেই আধুনিক বিজ্ঞানের নিরপেক্ষতার দাবিকে গ্রহণ করে নেয় এবং প্রাকৃতিক জগতের অধ্যয়নে নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে।

আধুনিক বিজ্ঞানের একটা মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো, এটা আদতে মোটেও নিরপেক্ষ নয়। বরং এর প্রধান মনোযোগ কার্যকারিতা ও প্রযুক্তির ওপর–অর্থাৎ নির্দিষ্ট কোনো উদ্দেশ্য অর্জনের উপায় খুঁজে বের করা। এমনকি বিজ্ঞানের প্রভাবশালী দার্শনিকদের অনেকেই মনে করেন, আধুনিক বিজ্ঞান বস্তুজগতের প্রকৃত স্বরূপ বা অন্তর্নিহিত প্রকৃতি অনুসন্ধান করে না।

এই দ্বিখণ্ডিত ও অসংলগ্ন দৃষ্টিভঙ্গির মোকাবিলায় এখনই জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। আধুনিক যুগে ‘উলুম’ (علوم) এবং ‘আলিম’ (عَالِم) বলতে কী বোঝায়, সেই প্রচলিত সংজ্ঞা ও ধারণাকে আমাদের নতুন করে প্রশ্ন করতে হবে এবং সেগুলো পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিতে হবে। উলামাদের আধুনিক প্রাকৃতিক বিজ্ঞান অধ্যয়ন করতে হবে; এর পেছনে ক্রিয়াশীল দার্শনিক অনুমান, ভিত্তি ও পরিণতিগুলো বুঝতে হবে। বিশেষ করে, কোনো বৈজ্ঞানিক ‘মডেল’ কখন নিছক ব্যবহারিক প্রয়োজনে কাজে লাগানো হচ্ছে, আর কখন তাকে বাস্তব জগতের প্রকৃত স্বরূপের প্রতিফলন বলে ধরে নেওয়া হচ্ছে–এই পার্থক্যটি তাঁদের বুঝতে হবে। বিষয়টি মনে রাখা জরুরি যে, অধিকাংশ আধুনিক বিজ্ঞানীই এই পার্থক্য সম্পর্কে সচেতন নন। এর একটা বড় কারণ তাঁদের দার্শনিক প্রশিক্ষণের অভাব। এমনকি তাঁরা অনেক সময় নিজেদের গবেষণার ক্ষেত্রটির প্রকৃত সীমা ও দার্শনিক ভিত্তি সম্পর্কেও স্পষ্ট ধারণা রাখেন না।

কোভিড মহামারির সময়কার অন্ধকারাচ্ছন্ন লকডাউনের দিনগুলোতে আমরা দেখেছি, ‘বিজ্ঞান’ (Science) যেন আকাশ থেকে নেমে আসা কোনো দেবতার মতো ব্যক্তিসত্তা লাভ করেছে। অথচ এই ‘বিজ্ঞান’ই বারবার নিজের অবস্থান বদলেছে। তার নির্দেশনাগুলোকে অনেক সময় এমনভাবে হাজির করা হয়েছে, যেন সেগুলো অভ্রান্ত কোনো ঐশীবাণী, যার সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ নেই। ‘বিজ্ঞান অনুসরণের’ এই আহ্বান শেষ পর্যন্ত কোভিড টিকাবিষয়ক বিতর্ক ও বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে বড় বড় ওষুধ প্রস্তুতকারী কোম্পানির স্বার্থের সাথে একাকার হয়ে যায়। তবে বিজ্ঞান ও ব্যবসার এই ঘনিষ্ঠতা নতুন কিছু নয়। বরং এটা ছিল তাদের দীর্ঘদিনের মধুর সম্পর্কেরই সাম্প্রতিকতম পর্ব। এই সম্পর্কের সূত্রপাত মূলত ফ্রান্সিস বেকনের হাত ধরে। তিনিই প্রথম সরকারকে পরামর্শ দিয়েছিলেন, বস্তুগত ক্ষমতা ও সামর্থ্য বাড়ানোর উপায় হিসেবে বিজ্ঞানে বিনিয়োগ করা উচিত। পরবর্তী ইতিহাসে দেখা গেছে, বেকনের এই দৃষ্টিভঙ্গি শিল্পবিপ্লবের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছিল।

‘বিজ্ঞান’ সম্পর্কে সুস্থ ও সচেতন সংশয়বোধ আরও জোরালো হয় যখন আমরা জনপ্রিয় বিজ্ঞানচর্চার সাথে প্রকৃত বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের ফারাকটি লক্ষ করি। জনপ্রিয় বিজ্ঞানের পাঠক ও ভোক্তাদের কল্পনায় যেসব তত্ত্বের যে বাস্তব রূপ তৈরি হয়েছে, সেগুলোর সাথে তত্ত্বগুলোর প্রকৃত অবস্থার প্রায়ই বিস্তর ব্যবধান থাকে। অথচ অনেক তত্ত্বই আদতে অস্থায়ী, এমনকি পর্যাপ্ত ভিত্তিহীন। এগুলোর কোনো কোনোটি জটিল গাণিতিক মডেল মাত্র, যেগুলো নিয়ে কয়েক দশকের গবেষণার পরও বাস্তব জগতে অস্তিত্বের পক্ষে কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায়নি। স্ট্রিং থিওরি এর একটা উদাহরণ। আবার কিছু তত্ত্বের প্রমাণ পাওয়া কার্যত অসম্ভব বলেই বিবেচিত হয়; মাল্টিভার্স তত্ত্ব তার একটা উদাহরণ। তা সত্ত্বেও সাধারণ মানুষের কল্পনায় এসব তত্ত্ব এমনভাবে জায়গা করে নিয়েছে, যেন বহু মাত্রিক জগৎ বা অসংখ্য মহাবিশ্বের অস্তিত্ব ইতিমধ্যেই প্রমাণিত সত্য। আশ্চর্যের বিষয়, বিজ্ঞানীরাও অনেক সময় এই ভুল ধারণা দূর করার ব্যাপারে বিশেষ উদ্যোগী হন না।

এ ধরনের অসংখ্য উদাহরণের মধ্যে একটা বিশেষভাবে হাস্যকর হলো সেইসব ‘বিজ্ঞানবিশ্বাসী’ মানুষের ধারণা, যাঁরা মনে করেন, একসময় ‘শ্রোডিঙ্গারের বিড়াল’ নামে সত্যিই একটা বিড়াল ছিল, যেটি কোনো এক গবেষণাগারে একই সাথে জীবিত ও মৃত অবস্থায় ছিল। বিজ্ঞানের অলৌকিক ক্ষমতার কী চমৎকার নিদর্শন!

অথচ বাস্তবে এমন কোনো বিড়ালের অস্তিত্ব কখনোই ছিল না। ‘শ্রোডিঙ্গারের বিড়াল’ ছিল নিছক একটা চিন্তা-পরীক্ষা (Thought Experiment)। কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের কোপেনহেগেন ব্যাখ্যার আপাত অযৌক্তিকতা তুলে ধরতেই এই পরীক্ষার অবতারণা। ওই ব্যাখ্যা অনুসারে, তাত্ত্বিকভাবে একটা বিড়াল একই সাথে জীবিত ও মৃত অবস্থায় থাকতে পারে। অর্থাৎ, সাধারণ মানুষের মধ্যে যে জনপ্রিয় ধারণাটি প্রচলিত, প্রকৃত বিষয়টি তার প্রায় সম্পূর্ণ বিপরীত।

আরেকটি বহুল প্রচলিত ভ্রান্ত ধারণা হলো, বিজ্ঞানদার্শনিকেরা যেসব সত্তাকে ‘তাত্ত্বিক সত্তা’ (Theoretical Entities) কিংবা ‘অপর্যবেক্ষণযোগ্য সত্তা’ (Unobservable Entities) বলে অভিহিত করেন–যেমন কোয়ার্ক, ইলেকট্রন, এমনকি পরমাণু–সেগুলো বাস্তব জগতে স্বতন্ত্র অস্তিত্বসম্পন্ন বস্তু; অর্থাৎ সেগুলোর বাস্তব অস্তিত্ব নিয়ে কোনো প্রশ্নই নেই। ইলেকট্রন অবশ্য ক্লাউড চেম্বারের মতো যন্ত্রের সাহায্যে শনাক্ত করা যায়, যদিও সরাসরি দেখা সম্ভব নয়। কিন্তু এসব সত্তার অস্তিত্ব আদৌ কী অর্থে বাস্তব, তা নিয়ে বিজ্ঞানদার্শনিকদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক চলছে। একদিকে রয়েছেন বৈজ্ঞানিক বাস্তববাদীরা (Scientific Realists), অন্যদিকে প্রতিবাস্তববাদীরা (Anti-realists)।

প্রতিবাস্তববাদীদের অন্যতম প্রধান আপত্তি হলো তত্ত্বের Under-determination বা পর্যবেক্ষণগত তথ্যের ভিত্তিতে তত্ত্বের অনির্ণেয়তার সমস্যা। এর অর্থ, একই পর্যবেক্ষণলব্ধ তথ্যকে ব্যাখ্যা করার জন্য একাধিক, এমনকি পরস্পরবিরোধী তত্ত্বও দাঁড় করানো সম্ভব। এর একটা কারণ হলো, তত্ত্বে উল্লিখিত অনেক সত্তাই সরাসরি পর্যবেক্ষণযোগ্য নয়। ফলে সেসব সত্তার পরিবর্তে বিকল্প কোনো সত্তা কল্পনা করেও একই পর্যবেক্ষণকে ব্যাখ্যা করা সম্ভব। এই দার্শনিক অবস্থানের অন্যতম বিশিষ্ট প্রবক্তা ল্যারি লডান (Larry Laudan)। তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ A Confutation of Convergent Realism-এ তিনি দেখিয়েছেন, বিজ্ঞানের ইতিহাসে এমন বহু তত্ত্ব ছিল, যেগুলো একসময় প্রমাণসমর্থিত ও কার্যকর বলে বিবেচিত হতো। অথচ সেসব তত্ত্বে যেসব অদৃশ্য সত্তার অস্তিত্বের কথা বলা হয়েছিল, পরবর্তী বিজ্ঞান সেগুলোকেই কাল্পনিক বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। ফ্লজিস্টন (Phlogiston) তার একটা উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।

হ্যাঁ, বৈজ্ঞানিক ‘তথ্য’ (Scientific Facts) অবশ্যই রয়েছে। যেমন, জ্যোতির্বিজ্ঞানে কপারনিকাসের সূর্যকেন্দ্রিক মডেল টলেমির ভূকেন্দ্রিক মডেলের তুলনায় অনেক বেশি নির্ভুল। কিন্তু সাধারণ মানুষের মধ্যে যে ধারণা প্রচলিত (বৈজ্ঞানিক সত্যগুলো বুঝি সরাসরি পর্যবেক্ষণের মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে) তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভুল।

আমার এক ব্যক্তিগত শিক্ষক ছিলেন ড. ইউসুফ ইসমাইল। তাঁর কাছ থেকেই আমি পদার্থবিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের কিছু প্রাথমিক পাঠ নিয়েছিলাম। তিনি আমাকে ধাপে ধাপে দেখিয়েছিলেন, কীভাবে একটা বৈজ্ঞানিক মডেল থেকে আরেকটি মডেলে পৌঁছানো যায়। সেই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আমি উপলব্ধি করি, এর পেছনে কত বিপুল গাণিতিক শ্রম ও জটিল হিসাব-নিকাশ জড়িয়ে থাকে। তিনি দেখিয়েছিলেন, কপারনিকাসের মডেল টলেমীয় মডেলের ‘ইকুয়ান্ট’ (Equant) সমস্যাটি দূর করে এবং গ্রহের ‘পশ্চাদগামী গতি’ (Retrograde Motion) ব্যাখ্যা করতে পৃথক কোনো জটিল ব্যবস্থা না রেখে আপেক্ষিক গতির ধারণাকে কাজে লাগায়। এ কারণে কপারনিকাসের মডেল নিঃসন্দেহে অধিক নির্ভুল ও কার্যকর হয়ে ওঠে। তবে একই সাথে এটাও মনে রাখা দরকার যে, টলেমির মডেল মোটেই আদিম বা অপরিণত কোনো ব্যবস্থা ছিল না। নিজস্ব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ঘটনাবলি ব্যাখ্যা করা এবং ভবিষ্যৎ অবস্থান সম্পর্কে পূর্বাভাস দেওয়ার ক্ষেত্রে এর যথেষ্ট কার্যকারিতা ছিল।

সবশেষে বলা যায়, ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকের বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের সময় আধুনিক বিজ্ঞান যে দার্শনিক দিকনির্দেশনা গ্রহণ করেছিল, আমাদের যুগে ‘ফিজিক্যালিজম’ (Physicalism)-এর মতো এক অদ্ভুত, অন্তঃসারশূন্য ও যুক্তিবিবর্জিত মতবাদকে তথাকথিত ‘বৈজ্ঞানিক সত্য’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা তারই পরিণতি। এর পেছনে কাজ করেছে বিজ্ঞানের সেই প্রাথমিক প্রবণতা, যা প্রকৃতির কেবল ‘প্রাথমিক গুণাবলি’ (Primary Qualities)–অর্থাৎ পরিমাণগত বৈশিষ্ট্য–নিয়ে আগ্রহী ছিল এবং ‘চূড়ান্ত কারণ’ (Final Causes) বা উদ্দেশ্যগত কারণের ধারণাকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছিল। এই দৃষ্টিভঙ্গির ধারাবাহিকতায় এমন এক পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে, যেখানে পদার্থবাদ বা ফিজিক্যালিজম–যার সাথে পরীক্ষণযোগ্য বিজ্ঞানের সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই–আমাদের যুগের একধরনের ‘বৈজ্ঞানিক ধর্মমত’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।

এই মতবাদের মূল বক্তব্য হলো: চেতনা (Consciousness) আসলে মস্তিষ্কের কার্যকলাপের উপজাত মাত্র। সুতরাং চেতনাকে পুরোপুরি মস্তিষ্কের জৈবিক অবস্থার মধ্যেই ব্যাখ্যা করা সম্ভব।

কিন্তু এই দাবি মেনে নিলেও একটা মৌলিক প্রশ্ন থেকে যায়। চেতনা যে কেবল মস্তিষ্কের কার্যকলাপের ফল, তা জানা কিংবা স্বীকার করার প্রক্রিয়াটিও তো চেতনার মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়। অর্থাৎ, আমরা যখন বলি ‘চেতনা কেবল মস্তিষ্কের একটা অবস্থা’, তখন সেই বক্তব্যটিও প্রকাশিত হচ্ছে একটা সচেতন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। ফলে বক্তব্যটি যে চেতনাকে মস্তিষ্কের কার্যকলাপে সীমাবদ্ধ করছে, সেই বক্তব্যের সত্যতা নির্ধারণের ক্ষেত্রেও চেতনাকেই অবলম্বন করতে হচ্ছে।

এখানেই সমস্যাটির মৌলিক দিকটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কেউ যখন বলে, ‘Epiphenomenalism is true’ কিংবা ‘Epiphenomenalism is false’–উভয় ক্ষেত্রেই তার মস্তিষ্কে নির্দিষ্ট কিছু নিউরন নির্দিষ্ট ছন্দ ও কম্পাঙ্কে সক্রিয় হয়। কিন্তু মস্তিষ্কের এই বৈদ্যুতিক সংকেতগুলোর নিজেদের কোনো সত্যমূল্য (Truth Value) নেই। কারণ, কোনো বক্তব্য সত্য না মিথ্যা–তা নির্ধারণ করা সচেতন অভিজ্ঞতারই একটা বৈশিষ্ট্য। নিছক স্নায়বিক সংকেতের নয়।

এখন, এপিফেনোমেনালিস্ট (Epiphenomenalist) যদি এসব যুক্তির পরিপ্রেক্ষিতে স্বীকার করেন যে ‘সত্য’ বলে আসলে কোনো কিছুরই অস্তিত্ব নেই, তাহলে নিশ্চিন্তেই বলা যায়, এমন একটা তত্ত্ব নিয়ে অতিরিক্ত উদ্বিগ্ন হওয়ার প্রয়োজন নেই, যার প্রবক্তারাই তার সত্যতায় বিশ্বাস করেন না। কিন্তু তিনি যদি নিজের তত্ত্বকে বস্তুনিষ্ঠ ও আক্ষরিক অর্থেই সত্য বলে দাবি করতে চান, তাহলে তাঁকে অনিবার্যভাবে মেনে নিতে হবে যে বাস্তবতা–বিশেষত ‘পদার্থ’ বা মানবমস্তিষ্ক–নিজেই কোনো না কোনোভাবে চেতনার দিকে নির্দেশ করে। অর্থাৎ, চেতনা নিছক ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নয়; বাস্তবতার জ্ঞানযোগ্য গঠনকে যথাযথভাবে উপলব্ধি ও প্রতিফলিত করার এক অন্তর্নিহিত ক্ষমতাও বটে।

মস্তিষ্ক যদি সত্যকে জানতে, উপলব্ধি করতে ও প্রতিফলিত করতে পারে, তাহলে তাকে নিছক ‘পদার্থ’ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। কারণ, সত্যকে ধারণ করার ক্ষমতা যে সত্তার রয়েছে, তাকে নিছক ভৌত বস্তুতে সীমাবদ্ধ করা সম্ভব নয়; তার মধ্যে বুদ্ধিবৃত্তিক ও চেতনাগত বৈশিষ্ট্যেরও প্রকাশ ঘটে। সুতরাং, যে তত্ত্ব চেতনাকে মস্তিষ্কের উপজাত বলে ঘোষণা করে, শেষ পর্যন্ত সেই তত্ত্বই নিজের ভিত্তি দুর্বল করে ফেলে। কেননা, সত্যকে স্বীকার করার প্রক্রিয়াই যদি চেতনার ওপর নির্ভরশীল হয়, তাহলে বাস্তবতাকেও কেবল ‘পদার্থ’ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। ‘ভৌত’ (Physical) ধারণাটি তখন নিজেরই নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করে যায়।

নিঃসন্দেহে, এখানেই আধুনিক ‘বিজ্ঞান’-ধারণা এবং তার নিজস্ব পদ্ধতিগত অঙ্গীকারগুলোর মধ্যে সবচেয়ে মৌলিক সংঘাতটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একদিকে ‘প্রকৃতি’ থেকে মন বা চেতনাকে নির্বাসিত করার হাস্যকর প্রচেষ্টা, অন্যদিকে বিজ্ঞানের প্রতিটি কর্মকাণ্ডে মানব-জ্ঞাতার (Human Knower) অনিবার্য উপস্থিতিকে অস্বীকার করা। এই দ্বিখণ্ডনের বীজ আধুনিক বিজ্ঞানের জন্মলগ্নেই–অর্থাৎ বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের সময়–রোপিত হয়েছিল। ‘প্রাথমিক গুণাবলি’ (Primary Qualities)-এর প্রতি আসক্তি এবং ‘চূড়ান্ত কারণ’ (Final Causes)-এর প্রতি বিদ্বেষের মধ্য দিয়ে তা বিজ্ঞানের ভিত্তিতে গেঁথে যায়। সেই প্রবণতা আজও রয়ে গেছে। তাই আধুনিক বিজ্ঞানে সামান্য কিছু ‘মেটাফিজিকাল’ (Metaphysical) সংশোধন আনলেই চলবে না; আমাদের প্রয়োজন একেবারে গোড়া থেকে নতুন করে ভিত্তি নির্মাণ করা।

অবশ্য, এমন পরিবর্তন সহজ হবে বলে মনে করা নিছক সরলবিশ্বাস। আদৌ তা সম্ভব কি না, তা নিয়েও যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। আর বিজ্ঞানের প্রযুক্তিগত সাফল্য? তা নিয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। এই সাফল্য অব্যাহত থাকবে, আর আমরাও আগের মতোই উৎসাহের সাথে তার সুফল ভোগ করব–অনেক সময় যথেষ্ট চিন্তাভাবনা না করেই।

কিন্তু আমরা যেমন দেখেছি, কোনো প্রযুক্তিকে কার্যকর করে তুলতে বাস্তবতা সম্পর্কে বিজ্ঞানের ধারণা যথার্থ হওয়া মোটেই জরুরি নয়। বিজ্ঞানের যন্ত্রনির্ভর সাফল্য নিঃসন্দেহে তার কার্যকারিতা প্রমাণ করেছে। কিন্তু একে জ্ঞানতাত্ত্বিক সাফল্য বলা যায় না। বাস্তবতার প্রকৃত স্বরূপ তুলে ধরার ক্ষেত্রে তার সাফল্য সামান্যই; নৈতিক দিকনির্দেশনা দেওয়ার ক্ষেত্রে তো আরও সামান্য।

তরজমা করেছেন সিদ্দিকে আকবর।

মূল নিবন্ধ- https://www.hasanspiker.com/reflections/blog-post-title-two-4yb5e