দরবেশ ও তরবারি : হালের সুফি-সাধক মিথ বনাম ঐতিহাসিক বাস্তবতা
‘ওয়ার অন টেরর’ ধাঁচের রেটোরিক সবসময় সালাফি জিহাদিদের বিরুদ্ধে পরিচালিত হয়নি। একসময় এর লক্ষ্যবস্তু ছিল সুফি মুসলিমরা। আজকের দিনে সুফিবাদকে সাধারণত রাজনৈতিক নীরবতা এবং নম্র শান্তিবাদের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। এমন বাস্তবতায় বিশ্বাস করা কঠিন যে, ঔপনিবেশিক যুগে এটাকেই ‘ইসলামি হুমকি’র কেন্দ্র হিসেবে দেখা হতো।
মুসলিম বিশ্বের আধুনিক যুগের অধিকাংশ না হলেও, বহু সামরিক সংগ্রামের শিকড় খুঁজলে দেখা যায় সেগুলো কোনো না কোনো সুফি নেতা বা তরিকার সঙ্গে যুক্ত। ধর্মতাত্ত্বিক পল হেক-এর ভাষায়, ‘সুফিবাদের তরিকগুলো উনিশ শতকে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধে নেতৃত্ব দিয়েছিল–যেমন উত্তর আফ্রিকায় ফরাসিদের বিরুদ্ধে এবং উত্তর ককেশাসে রাশিয়ানদের বিরুদ্ধে। কিছু নেটওয়ার্ক আবার উপনিবেশ-উত্তর রাষ্ট্রগুলোর বিরুদ্ধেও প্রতিরোধ গড়ে তোলে, যে রাষ্ট্রগুলো স্থানীয় সমাজকে জোরপূর্বক সেক্যুলার করার চেষ্টা করছিল–যেমন তুর্কি প্রজাতন্ত্রের প্রারম্ভিক বছরগুলোতে এবং ১৯৮২-পূর্ব সিরিয়ায়।’[1] খুব কম লোকই এটা জানে যে, আধুনিক তুরস্ক প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপটে নকশবন্দি গোষ্ঠীগুলো আগ্রাসী সেক্যুলারকরণ নীতির বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল একটা বিদ্রোহের মাধ্যমে, যা আতাতুর্কের সেনাবাহিনী মাত্র দুই মাসের মধ্যেই কঠোরভাবে দমন করে।
অবশ্য, সুফি যোদ্ধাদের যুগে ‘সুফি’ লেবেলটি নিজেই একপ্রকার বিভ্রান্তিকর ছিল। প্রাক-ঔপনিবেশিক যুগে সুফিবাদ ছিল মূলধারার ইসলামী বিশ্বাস ও অনুশীলনের একটা স্বাভাবিক প্রকাশমাত্র। সমকালীন বিশিষ্ট গবেষক হামিদ আলগার লিখেছেন, ‘অনুশীলনকারীদের দৃষ্টিতে তাসাওউফ ইসলামের নিজস্ব অস্তিত্বের সাথে লীন হয়ে আছে।’[2] যেমন একজন প্রাক-ঔপনিবেশিক মুসলিম কোনো ফিকহি মাযহাব বা আকিদার কোনো ধারাকে অনুসরণ করতেন, তেমনি আধ্যাত্মিক পরিশুদ্ধি (তাযকিয়া)-র জন্য একটা সিলসিলা (বা তরিকা) অনুসরণ করাও ছিল মূলধারার চর্চা। ফলে, অতীতের সুফি যোদ্ধারা নিজেদেরকে কেবলমাত্র সাধারণ মুসলিম হিসেবেই দেখতেন–এর বেশি কিছু নয়।
সুফিবাদকে ইসলামের কেন্দ্র থেকে শ্রেণিগতভাবে বিচ্ছিন্ন করার পেছনে একটা কৌশলগত উদ্দেশ্য কাজ করেছিল। সুফিবাদের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনামূলক প্রচারণা প্রথমে দেখা যায় ঔপনিবেশিক আর্কাইভগুলোতে, তারপরে তা প্রতিফলিত হয় সুফিবিরোধী মুসলিমদের লেখায়। সুফিবাদের শক্তিতে উদ্বিগ্ন হয়ে ঔপনিবেশিক প্রভুরা সুফিদের একটা ‘রহস্যবাদী উপগোষ্ঠী (mystical sect) হিসেবে পুনর্নির্মাণ করে–যেন তারা ইসলামের ভেতরের একটা বিচ্যুতি। এর ফলে ওয়াহাবি এবং সালাফি’র মতো সুফিবিরোধী ধারাগুলো শক্তিশালী হয়ে ওঠে এবং তাদের বক্তব্যও স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য হয়ে যায়। বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে আধ্যাত্মিকভাবে দেউলিয়াকৃত একধরনের ইসলামই ক্রমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে, আর সুফিবাদের জগৎ সরে যায় একপ্রকার নিষ্ক্রিয় অদৃশ্যতায়। ফলে মুসলিম প্রতিরোধের সম্মিলিত অতীত বিকৃত, বিকলাঙ্গ এবং বিস্মৃত হয়ে পড়ে।
সুফিবাদের রাজনৈতিক স্পন্দন আরও দুর্বল হয়ে পড়ে যখন বিংশ শতাব্দীর সেক্যুলার জাতিরাষ্ট্রগুলো সক্রিয়ভাবে নির্ধারণ করতে শুরু করে–ধর্মীয় প্রকাশের কোন রূপগুলো গ্রহণযোগ্য, এবং কোন ‘ইসলাম’ বৈধ। এর ফলে একটা অনুগত সুন্নি আলেমশ্রেণি তৈরি হয়, যেখানে সুফিদেরকে হয় বিদআতী বা ভ্রান্ত, নয়তো নিছক নীরবতাবাদী হিসেবে প্রান্তিক করে দেওয়া হয়। সুফিবাদকে ‘ভাল’ ইসলাম হিসেবে পুনর্গঠন করা এবং অন্যান্য সব প্রকাশকে ‘খারাপ’ ইসলাম হিসেবে চিহ্নিত করার মাধ্যমে মুসলিমদের অভ্যন্তরীণ বিভাজন গভীরভাবে প্রোথিত হয়ে যায়। এর একটা ফল হলো–সমসাময়িক সুফিবাদের অনেক রূপই দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং বিদ্যমান বাস্তবতার প্রতি একপ্রকার অনিচ্ছুক আত্মসমর্পণ প্রদর্শন করছে। ‘সুফি’ শব্দটি এখন ঘূর্ণায়মান দরবেশ, রুমির কবিতা এবং শান্ত স্বভাবের সংযমী সাধকদের চিত্রকে ফুটিয়ে তুলে–যুদ্ধ বা প্রতিরোধের চিত্র খুব কমই সামনে আসে। আধ্যাত্মিকতাকে প্রায় সহিংসতা বা ভায়োলেন্সের বিপরীতধর্মী হিসেবে দেখা হয়।
এই দৃষ্টিভঙ্গি আমেরিকান পপ কালচারের সঙ্গে তীব্র বৈপরীত্য সৃষ্টি করে, যেখানে আধ্যাত্মিকতা ও যুদ্ধের মধ্যে ইতিবাচক সম্পর্ক খুবই সাধারণ। উদাহরণ হিসেবে ধরা যেতে পারে হারবার্টের Dune, আকাশে লাফিয়ে ওঠা সামুরাই গুরু, কিংবা জেডাই নাইটদের (Jedi Knights) চিত্র। অবাক হওয়ার কিছু নেই যে, Star Wars নির্মাণের গবেষণা পর্যায়ে জর্জ লুকাস ক্যালিফোর্নিয়ার একটা সুফি তরিকার সঙ্গে পরামর্শ করেছিলেন, যা তাকে এই মহাকাব্যিক কাহিনিতে ইসলামী উপাদান অন্তর্ভুক্ত করতে প্রভাবিত করেছিল। ‘দ্য ফোর্স’ যদি আল্লাহর একক, সর্বব্যাপী ও সর্বগ্রাসী শক্তির প্রতীক হয়, কিংবা ইয়োদা (Yoda) যদি এক জ্ঞানী সুফি শায়খের প্রতিরূপ হয়–তাহলে সেখানে ইসলামী প্রতীকের উপস্থিতি স্পষ্ট। তবে এসব (সম্ভবত ইতিবাচক) ধার নেওয়া সত্ত্বেও, আধ্যাত্মিকতা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামের এই সম্পর্ক খুব কমই মুসলিমদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হিসেবে দেখা হয়; বরং তাদের সংগ্রামকে সচরাচর বৈধ বা ন্যায্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় না।
এই দৃষ্টিভঙ্গি আমেরিকান পপ কালচারের সঙ্গে বৈপরীত্য তৈরি করে, যেখানে আধ্যাত্মিকতা ও যুদ্ধের মধ্যে ইতিবাচক সম্পর্কের রয়েছে প্রচুর। হারবার্টের Dune, আকাশে লাফিয়ে ওঠা সামুরাই গুরু, কিংবা জেডাই নাইটদের কথা ভাবলেই তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
আজ দৃশ্যমান না হলেও, রাষ্ট্রীয় দমননীতির বিরুদ্ধে সমসাময়িক সংগ্রামগুলোর পেছনে সুফি প্রতিরোধের একটা সমৃদ্ধ ইতিহাস নীরবে অনুরণিত হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে উইঘুরদের কথা ধরা যেতে পারে। চীনা কমিউনিস্ট পার্টির হাতে তাদের যে অন্তরীণ ও দমন-পীড়নের শিকার হতে হচ্ছে, তার ঐতিহাসিক শিকড় রয়েছে উনবিংশ শতাব্দীর ছিং (Qing) রাজবংশের সময়ে, যখন পূর্ব তুর্কিস্তান শাসন করতেন খোজারা (Khojas)–যারা ছিলেন মধ্য এশিয়ার খ্যাতিমান নকশবন্দি সুফি শিক্ষক আহমদ কাসানির (মৃত্যু ১৫৪২) বংশধর। কোকন্দের খোজা ওয়ালি খান (Khoja Wali Khan)-এর মতো ব্যক্তিদের সম্পর্কে আমরা খুব কমই জানি; যিনি ১৮৫৭ সালের রমজানে তারাবির নামাজ আদায়ের পর একটা চীনা গ্যারিসনে আক্রমণ চালিয়ে তাদের কমান্ডারকে হত্যা করেন। যদিও ওয়ালি খানের শাসন ছিল নির্মম এবং স্বল্পস্থায়ী, তবুও চীনা কমিউনিস্ট পার্টি এই সুফি প্রতিরোধের ইতিহাস সম্পর্কে অজ্ঞ বা বিস্মৃত নয়। কিন্তু এর বিপরীতে, আজকের দিনে খুব কম মুসলিমই এই ইতিহাস সম্পর্কে অবগত।
ওয়ালি খানের বিদ্রোহের প্রায় দুই দশক আগে, আরেকজন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ নকশবন্দি সুফি নেতা ককেশাস অঞ্চলে রুশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন - ইমাম শামিল (মৃত্যু ১৮৭১) । তার ব্যক্তিত্বের মহিমা এবং প্রতিকূল পরিবেশেও শরিয়াহ প্রতিষ্ঠার অটল অঙ্গীকারের জন্য তিনি সুপরিচিত ছিলেন। তবে তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য ছিল–দাগেস্তানি এবং চেচেন মুসলিমদের মতো বিভিন্ন গোষ্ঠীকে একত্রিত করে রুশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা, যা ইতিহাসে ‘ককেশীয় যুদ্ধ’ নামে পরিচিত। আজও ইমাম শামিল বিশ্বজুড়ে ককেশীয় প্রবাসীদের কাছে গভীর শ্রদ্ধার পাত্র, এবং এমনকি সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেতরে গোপন ‘অবৈধ’ সুফি গোষ্ঠীগুলোর নীরব প্রতিরোধকেও তিনি অনুপ্রাণিত করেছিলেন।
১৮২৫ সালের হজের সময় ইমাম শামিল সাক্ষাৎ এবং অনেকের মতে অনুপ্রাণিতও করেছিলেন আরেক তরুণ নেতাকে, যার জীবনও কেটেছিল সশস্ত্র সংগ্রামে – আমির আবদুল কাদির আল-জাযায়েরি (মৃত্যু ১৮৮৩)। তারা দুজনই বিদেশি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের কৌশল নিয়ে আলোচনা করেন। পাঁচ বছর পর ফ্রান্স আলজেরিয়ায় আক্রমণ চালায়, এবং মাত্র ২৪ বছর বয়সে আবদুল কাদির ফরাসি ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে আলজেরীয় প্রতিরোধের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেন। কাদিরিয়া সুফি তরিকার প্রতিনিধি হিসেবে–যার সিলসিলা দ্বাদশ শতাব্দীর শায়খ আবদুল কাদির জিলানির দিকে গিয়ে পৌঁছায়–এবং নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর বংশধর হিসেবে, তিনি সমগ্র আলজেরিয়াকে একত্রিত করে ফরাসিদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধে উদ্বুদ্ধ করতে সক্ষম হন।
এই প্রতিরোধ কেবল পুরুষদের দ্বারা পরিচালিত হয়নি: লাল্লা ফাতমা ন’সুমের (Lalla Fatma N’Soumer, মৃত্যু ১৮৬৩)-এর মতো সুফি নারীরাও ফরাসিদের বিরুদ্ধে একাধিক যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন। ফাতমা ন’সুমেরকে ফরাসিরা বন্দী করে এবং ছয় বছর পর বন্দিদশাতেই তার মৃত্যু হয়। সুফি নারী-পুরুষের নেতৃত্বে চলমান এই দীর্ঘস্থায়ী আলজেরীয় প্রতিরোধে ক্ষুব্ধ হয়ে ফরাসি জেনারেল বুজো (General Bugeaud) হুমকি দিয়ে বলেন: “আমি তোমাদের পাহাড়ে ঢুকব, তোমাদের গ্রাম আর ফসল জ্বালিয়ে দেব, তোমাদের ফলের গাছ কেটে ফেলব।”
পশ্চিম আফ্রিকাতেও ফরাসি ঔপনিবেশিকরা সুফি প্রতিরোধের মুখোমুখি হয়েছিল। আধুনিক সেনেগাল অঞ্চলে শায়খ উমর ফুতি তাল (Shaykh Umar Futi Tal) ৫৫ বছর ধরে তিজানিয়া সুফি তরিকার জন্য শিক্ষা প্রদান ও একটা সমাজ গড়ে তুলতে ব্যয় করেছিলেন–এরপর ফরাসি ঔপনিবেশিক অনুপ্রবেশ তাকে সামরিক প্রতিরোধের জীবনে ঠেলে দেয়।
পশ্চিম আফ্রিকায় ফরাসিদের বিরুদ্ধে এই প্রতিরোধের আরেক বর্ণনায় বলা হয়, শায়খ উমর ফুতি তাল-এর আধ্যাত্মিক ক্ষমতা–তার বেলায়ত (আল্লাহর সঙ্গে বন্ধুত্ব বা নৈকট্য)–এতটাই শক্তিশালী ছিল যে, তিনি নাকি শুধু এক দৃষ্টিতেই শত্রু যোদ্ধাকে ধ্বংস করে দিতে পারতেন। যথার্থভাবেই, তার প্রিয় তিজানি জিকিরটির নাম ছিল ‘হিজব আল-সাইফ’ (Hizb al-Sayf - ‘তরবারির খোপ’), এবং তার বিখ্যাত গ্রন্থের শিরোনামও তাৎপর্যপূর্ণ: ‘রহমানের সৈন্যদের বর্শা বনাম অভিশপ্ত শয়তানের সৈন্যদের বর্শা’ (Spears of the League of the Merciful against the Spears of the League of Satan the Accursed)। তবে শিরোনাম দেখে যেটা মনে হয়, এটা কোনো সামরিক নির্দেশিকা নয়; বরং এটা সুফি নৈতিকতার একটা সংকলন–যেখানে উত্তম চরিত্র গঠন এবং আল্লাহকে চেনার তাৎপর্য (মা‘রিফত- ma‘rifa) নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। ফুতি তাল-এর কাছে এই রূপক অস্ত্রশস্ত্রের তাৎপর্য ছিল গভীরভাবে মেটাফিজিক্যাল–যা তার পার্থিব শত্রুদের বাস্তব অস্ত্রের চেয়েও অধিক গুরুত্বপূর্ণ। ফুতি তাল-এর মতো সুফি যোদ্ধাদের শক্তির উৎস ছিল আল্লাহর প্রতি অবিচল আস্থা–যিনি সর্বোচ্চ গালিব (বিজয়ী)। এক হাদিসে আল্লাহ বলেন: “যে আমার কোনো ওলির (বন্ধু) প্রতি শত্রুতা পোষণ করে, আমি তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করি।”
তাদের ওপর নির্মমতা সত্ত্বেও ইউরোপীয় ঔপনিবেশিকরা সুফিদের যুদ্ধ-নৈতিকতাকে পরিবর্তন করতে পারেনি। বিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্নে ইতালির লিবিয়া দখলের মুখে উত্তর আফ্রিকায় আরেকটি প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। সেনুসি তরিকার প্রধান ব্যক্তিত্ব শায়খ ওমর আল-মুখতার–যিনি ‘মরুসিংহ’ (Lion of the Desert) নামে পরিচিত–প্রায় বিশ বছর ধরে ইতালীয় ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে লিবীয় প্রতিরোধ সংগঠিত ও নেতৃত্ব দেন। যারা তাদের বন্দিদের প্রতি কোনো দয়া দেখাত না, সেই ইতালীয়দের নির্মম অভিযানের বিপরীতে, ওমর আল-মুখতার ইসলামী ফিকহের সেই নীতিকে মেনে চলেন–যেখানে যুদ্ধে বন্দিদের হত্যা নিষিদ্ধ। তার অনুসারীরা যখন জানতে চাইলেন কেন তিনি ইতালীয় বন্দিদের হত্যা করেন না, তিনি জবাব দেন: ‘তারা আমাদের শিক্ষক নয়।’ তার এই নৈতিক অবস্থানের প্রতিদান অবশ্য তিনি পাননি। শেষ পর্যন্ত ইতালীয়রা তাকে বন্দী করে এবং ১৯৩১ সালে প্রকাশ্যে ফাঁসি দেয়।
এই সব ব্যক্তিত্বের অনেকের ক্ষেত্রেই জ্ঞান অন্বেষণ, জিকির (আল্লাহর স্মরণ) এবং সমাজ গঠনই ছিল প্রধান অগ্রাধিকার–যুদ্ধজীবন নয়। কিন্তু যুদ্ধ তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল, এবং তারা নিজেদের জীবনকে মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে ফেলে ‘ছোট জিহাদ’ (lesser jihad) বেছে নিয়েছিলেন। উদাহরণ হিসেবে সিরিয়ার শায়খ ইজ্জুদ্দিন আল-কাসসাম (মৃত্যু ১৯৩৫)-এর কথা ধরা যেতে পারে। তিনি ইতালীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লিবিয়াকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে নিজের মাতৃভূমি সিরিয়ায় অবস্থিত জাওয়িয়া (সুফি কেন্দ্র) ছেড়ে যান; পরবর্তীতে ফিলিস্তিনে সশস্ত্র প্রতিরোধের নেতৃত্ব দিতে সেখানে যান, যেখানে তিনি স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন এবং হাইফায় নিয়মিত মাওলিদ সমাবেশ প্রতিষ্ঠা করেন। এই আলেমদের ইসলামী শিক্ষার প্রতি অঙ্গীকার তাদেরকে এই জীবনকে পরীক্ষা ও বিপদের ক্ষেত্র হিসেবে দেখতে শেখায়–যা নবীদের জীবন এবং নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর পরিবারবর্গের জীবনের প্রতিফলন, যেখানে ইমাম হুসাইন-এর নেতৃত্বে ইসলামের প্রারম্ভিক যুগেই তারা অকথ্য সহিংসতার মুখোমুখি হয়েছিলেন।
আরও কিছু অনুপ্রেরণার উৎসও ছিল। সাধক ব্যক্তিত্ব যেমন ইবরাহিম ইবন আদহাম (মৃত্যু ৭৭৮) এবং আবদুল্লাহ ইবন আল-মুবারক (মৃত্যু ৭৯৭)–হ্যারি নিল (Harry Neale)-এর মতে, যিনি প্রাচীন সুফি যোদ্ধা-সাধকদের ওপর একটা গ্রন্থ রচনা করেছেন–’সুফিদের সাহসী মুজাহিদ হিসেবে উপস্থাপনের প্রধান মডেল সরবরাহ করেছিলেন।' এই অতীতের দৃষ্টান্তগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে উনবিংশ শতাব্দীর মুসলিম যোদ্ধারা জানতেন, ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে দমননীতি যতই কঠোর হোক না কেন, অন্যায়কারী শেষ পর্যন্ত কখনোই প্রকৃত অর্থে বিজয়ী হয় না। এই দৃঢ় বিশ্বাসই তাদের অন্যায়ের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিকে গড়ে তুলেছিল এবং তাদের প্রতিরোধকে শক্তি জুগিয়েছিল।
উনবিংশ শতাব্দীর দক্ষিণ এশিয়াতেও সুফি-নেতৃত্বাধীন উপনিবেশ-বিরোধী আন্দোলন ব্যাপক ছিল। ফজলে হক খয়রাবাদী (মৃত্যু ১৮৬১)-এর মতো ব্যক্তিত্ব ১৮৫৭ সালে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে জিহাদের ফতোয়া জারি করেন, আর তিতু মীর (মৃত্যু ১৮৩১)–যিনি একজন দক্ষ ব্যায়ামবিদ ও কুস্তিগীর ছিলেন–বাংলা অঞ্চলে তার সহযোদ্ধাদের বাঁশের লাঠি ব্যবহার করে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রশিক্ষণ দেন।
দক্ষিণ এশিয়ায় এই সুফি প্রতিরোধ আরও বিস্তৃত রূপ নেয়। সৈয়দ আহমদ বারেলভীর জিহাদি বক্তৃতায় প্রভাবিত হয়ে তিতু মীর হাজার হাজার কৃষিশ্রমিককে যোদ্ধা হিসেবে সংগঠিত করেছিলেন এবং ব্রিটিশ আগ্রাসন ঠেকাতে একটা বিশাল বাঁশের দুর্গ নির্মাণ করেছিলেন। কিন্তু তাদের সাহসী প্রতিরোধ সত্ত্বেও, সেই সরল বাঁশের দুর্গ ব্রিটিশদের বিধ্বংসী কামানের আঘাতে ভেঙে পড়ে, এবং তিতু মীরসহ তার শত শত সঙ্গী বেয়নেটের আঘাতে নিহত হন। তবুও, সাধক-ব্যক্তিত্ব, সুফি তরিকা এবং দরগাহগুলো ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যের জন্য দীর্ঘদিন হুমকি হয়ে রয়ে যায়। সুফিবাদের একটা বিশেষ শক্তি ছিল–এটা দক্ষিণ এশীয় সমাজের বিভিন্ন স্তরকে অন্তর্ভুক্ত করতে পারত, ফলে ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোর ধর্মীয়, জাতিগত-ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক বিভাজনের ভিত্তিতে তৈরি করা শ্রেণিবিন্যাস ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানাত।
তবে সুফিবাদের ব্যানারে পরিচালিত এই নীতিনিষ্ঠ প্রতিরোধ সবসময় সহিংসতার আশ্রয় নেয়নি। বরং আত্মরক্ষামূলক সহিংসতাকে ‘ক্ষুদ্র জিহাদ’ (lesser jihad) হিসেবে দেখা হতো–আত্মার জিহাদ এবং কলম ও জিহ্বার জিহাদের তুলনায় তা ছিল গৌণ। একটা হাদিসে নবী মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, ‘সর্বোত্তম জিহাদ হলো কোনো অত্যাচারী শাসকের সামনে সত্য কথা বলা।’ কিন্তু এই আদর্শ থেকে অনেক দূরে সরে গিয়ে আজকের দিনে বহু খ্যাতিমান সুফি ব্যক্তিত্ব মধ্যপ্রাচ্যের স্বৈরশাসকদের সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য কাজ করেন এবং পশ্চিমা সরকার ও তাদের মিত্রদের ‘সফট পাওয়ার’-এর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতে কোনো সমস্যা দেখেন না।
অধিকাংশ সুফি যোদ্ধার ক্ষেত্রে তাদের যুদ্ধ ছিল অদৃশ্য। এর আধুনিক যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উদাহরণ হলেন শায়খ আহমাদু বাম্বা এমবাকে (Shaykh Ahmadou Bamba Mbacke, মৃত্যু ১৯২৭), যিনি এক ফোঁটা রক্ত না ঝরিয়েই সেনেগালে ফরাসি ঔপনিবেশিক শক্তিকে আতঙ্কিত করে তুলেছিলেন। তিনি মুরিদিয়্যা নামে সেনেগালের অন্যতম বৃহৎ সুফি তরিকা প্রতিষ্ঠা করেন এবং জীবনের অধিকাংশ সময় নির্বাসন ও গৃহবন্দিত্বে কাটানো সত্ত্বেও ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে অহিংস প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। একজন গভীর পাণ্ডিত্যসম্পন্ন আলেম হিসেবে তিনি প্রায় ‘সাত টন’ সমপরিমাণ গবেষণা ও কবিতা রচনা করেছেন বলে পরিচিত। আরবি ভাষায় রচিত একটা বিখ্যাত কবিতায় তিনি লিখেছেন:
You have exiled me, accusing me of jihad […]
Well, your words about me are true […]
For verily for the sake of Allah the majestic, I am struggling.
তোমরা আমাকে নির্বাসিত করেছ, জিহাদের অভিযোগ এনে […]
আসলে, তুমি আমার সম্পর্কে যা বলেছ তা সত্য […]
কারণ নিঃসন্দেহে মহান আল্লাহর জন্যই আমি সংগ্রাম করছি।
বাম্বা এবং অন্যান্য সুফি যোদ্ধাদের কাছে সবচেয়ে কঠিন যুদ্ধের ক্ষেত্র ছিল মানুষের নিজের আত্মা। কিন্তু তারা এটাও জানতেন–যদি এই অভ্যন্তরীণ সংগ্রাম পৃথিবীর অন্যায়ের বিরুদ্ধে কোনো বাস্তব প্রতিরোধে রূপ না নেয়, তবে তা ভণ্ডামিতে পরিণত হয়।
ইতিহাসজুড়ে এ ধরনের নীতিনিষ্ঠ মুসলিম যোদ্ধাদের আরও অসংখ্য কাহিনি রয়েছে, যাদের কর্মকাণ্ড গভীর নৈতিক বিশ্বাস থেকে উৎসারিত হয়েছিল। ওহি এবং মা‘রিফা (আল্লাহর জ্ঞান)-এর মাধ্যমে তারা বুঝতে পেরেছিলেন যে ইতিহাসের ফেরাউন এবং ইয়াজিদরা একধরনের চিরন্তন, পুনরাবৃত্তিমূলক প্রতীক–ফলে কুরআনের সেই প্রতিশ্রুতি সত্য বলে প্রতীয়মান হয়: আল্লাহ অল্পসংখ্যককে বৃদ্ধি করতে পারেন, দুর্বলদের শক্তিশালী করতে পারেন এবং নির্যাতিতদের বিজয় দান করতে পারেন।
সমসাময়িক সুফি গোষ্ঠীগুলো এই ইতিহাস থেকে অনেকাংশে নিজেদের চেতনা বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে–যদিও এই ইতিহাস ইসলামভীতি এবং ইসলামে ন্যায়বিচারের সন্ধানকে ঘিরে মুসলিমদের মধ্যকার বিভ্রান্তিকর মনোভাব–উভয়ের বিরুদ্ধে একটা শক্তিশালী প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করতে পারে। ন্যায় প্রতিরোধের প্রতি এই প্রাজ্ঞ যোদ্ধাদের অঙ্গীকার এসেছিল সুফিবাদের প্রতি তাদের অঙ্গীকার থেকেই–তার বিপরীতে নয়।
তরজমা করেছেন সিদ্দিকে আকবর
ফুটনোট :
[1] Heck, Paul. “The politics of Sufism: Is there one?” In C. Raudvere & L. Stenberg (Eds.). Sufism Today: Heritage and Tradition in the Global Community (pp. 13–30). London: I.B. Tauris, 2010.
[2] Algar, Hamid. “A Brief History of the Naqshbandi Order.” In Naqshbandis: Cheminements et situation actuelle d’un ordre mystique musulman, edited by Marc Gaborieau, Alexandre Popovic, and Thierry Zarcone. Istanbul and Paris: Editions Isis, 1990.
মূল নিবন্ধ - https://themaydan.com/2023/01/the-saint-and-the-sword/