দক্ষিণ এশিয়ায় শরীয়ার পুনরুজ্জীবন | ওভামির আনজুম
( শরিয়া নিয়ে ওভামির আনজুমের ৪ পর্বের সিরিজের এটি ৩য় পর্ব।)
প্রথম পর্ব - বিপন্ন শরীয়াহ্
দ্বিতীয় পর্ব - ইসলামি ইতিহাসের রূপরেখা
চতুর্থ পর্ব - শরীয়ার অসম্ভাব্যতার বিপরীতে
‘খোদায়ী আইনসমূহ প্রাথমিক ও অপরিহার্যভাবে মানুষের প্রচলিত প্রথা বা লোকরীতিগুলোকে [রসম] বিবেচনায় নেয়; আসমানি বিধানগুলোতে এগুলো নিয়েই আলোচনা ও ইঙ্গিত করা হয়। এই প্রথাগুলো তৈরি হওয়ার পেছনে কিছু কারণ থাকে, যেমন—জ্ঞানী ব্যক্তিদের দ্বারা এগুলো আবিষ্কৃত হওয়া কিংবা আল্লাহর পক্ষ থেকে ইলহাম বা অনুপ্রেরণা পাওয়া।’1
মুসলিম সাম্রাজ্যগুলোর ভাগ্য বিপর্যয়ের সাথে সাথে যখন শরিয়তের বিলুপ্তি একটি বাস্তব সম্ভাবনা হয়ে দাঁড়াল, তখন বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুটি অদ্ভুতভাবে শরিয়তের 'মৃত্যু' থেকে এর 'নবজীবন'-এর দিকে সরে গেল। তাত্ত্বিক অনুসন্ধানের পরিবর্তে গুরুত্ব পেল ব্যবহারিক বা প্রায়োগিক বিষয়গুলো। বলা যেতে পারে, মধ্যযুগীয় এবং আধুনিক—এই দুই মহাসমুদ্রের মিলন ঘটেছিল শাহ ওয়ালিউল্লাহর ব্যক্তিত্বে। আঠারো শতকের এই মহান পণ্ডিত ভেঙে পড়া মুঘল সাম্রাজ্যের প্রেক্ষাপটে ইসলামি জ্ঞানের এক উচ্চাভিলাষী সংশ্লেষণ (synthesis) তৈরি করেছিলেন। এখানে 'আধুনিক' বলতে আমি মুসলিম সংস্কারবাদের মেজাজকে বুঝিয়েছি, পশ্চিমা উপনিবেশবাদের প্রতিক্রিয়াকে নয়; কারণ ওয়ালিউল্লাহ এই নতুন (পশ্চিমা) হুমকির দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন বা এটি সম্পর্কে জানতেন এমন কোনো ইঙ্গিত নেই। তবুও, তিনি ছিলেন আসন্ন সময়ের অন্যতম দূরদর্শী পথপ্রদর্শক, ইসলামি ইতিহাসের বিগত সহস্রাব্দের একজন শ্রেষ্ঠ পর্যবেক্ষক এবং এর প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ শাখায় দক্ষ। সেই হিসেবে, তাঁর কাজ আধুনিক ইসলামি ইতিহাসকে কেবল পাশ্চাত্যের ইতিহাসের একটি পাদটীকা হিসেবে দেখার ধারণার বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী যুক্তি। আমরা তাঁর মধ্যে শরীয়াহ্-র পুনরুজ্জীবনের যে তাগিদ দেখি, তা ওহীকে বোঝার সঠিক পদ্ধতি বা বিদেশি দর্শনের কলুষিত প্রভাবের মতো হাজার বছরের পুরনো তাত্ত্বিক বিতর্ক থেকে আসেনি; বরং তা এসেছিল শরীয়াহ্-র টিকে থাকা এবং এর যৌক্তিক গ্রহণযোগ্যতার অভ্যন্তরীণ হুমকি থেকে।
উপরের উদ্ধৃতিটি নির্দেশ করে যে, ওয়ালিউল্লাহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে জুওয়াইনি থেকে ভিন্ন মত পোষণ করেন। তাঁর কাছে শরীয়াহ্ কোনো বিচ্ছিন্ন বা স্বয়ংসম্পূর্ণ (sui generis) বিষয় নয় যা মানুষের বুদ্ধি বা ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা ছাড়াই আকাশ থেকে পাঠানো হয়েছে; কিংবা এটি এমন কোনো কোড নয় যার জ্ঞান কেবল নির্দিষ্ট কিছু মাযহাবের পাঠ্যসূচিতে সীমাবদ্ধ। উদ্ধৃতিটির পরবর্তী অংশে ব্যাখ্যা করা হয়েছে যে, মানুষের স্বভাবজাত প্রকৃতির (ফিতরাত) সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ উত্তম রীতিনীতিগুলো কেবল ওহীর মাধ্যমেই নয়, বরং আরও কিছু উপাদানের মাধ্যমে পরিচিত, প্রতিষ্ঠিত এবং সংরক্ষিত হয়। এর মধ্যে রয়েছে জ্ঞানী ব্যক্তিদের দ্বারা সেগুলোর আবিষ্কার, শক্তিশালী রাজাদের মাধ্যমে প্রচার এবং যুগে যুগে মানুষের অন্তরের সাক্ষ্য। এই কাঠামোতে, শরীয়াহ্-র জ্ঞান বা ইজতিহাদে সক্ষম আলেম—কেউই পুরোপুরি বিলুপ্ত হতে পারে না। মানুষের প্রকৃতি, প্রজ্ঞা এবং অভিজ্ঞতা আল্লাহর দেওয়া সেই প্রতিশ্রুতির অতিরিক্ত গ্যারান্টি প্রদান করে যা শেষ ওহীকে রক্ষার কথা বলে।
ওয়ালিউল্লাহর সমন্বিত প্রকল্পের মূলে ছিল ইসলামি আইন এবং সামগ্রিকভাবে ধর্মীয় আচার-আচরণে ‘হাদীস’কে পুনরায় কেন্দ্রে নিয়ে আসা। এর সাথে সেই ধারণাটি যুক্ত ছিল—যা প্রায়ই হাম্বলি ও শাফেয়ী মাযহাবের সাথে সম্পর্কিত—যে নবীজির 'সুন্নাহ' হবে সমস্ত ইসলামি আইনের ভিত্তি। ওয়ালিউল্লাহর এই পদক্ষেপের অর্থ হতে পারে যে, সুন্নি চার মাযহাবের আইনি সিদ্ধান্তগুলো নবীজির হাদীসের সাথে মিল বা অমিলের ভিত্তিতে সংশোধন করা সম্ভব। {এখানেই মূলত সংস্কারক হিসেবে “এজেন্সি সহকারে” শাহ ওয়ালিউল্লাহ এর “বৈধ ইন্টারভেনশন”, এবং তার অবদান হলো, ক্রোনোলোজি অনুসারে তার পরবর্তীতে “হাল্লাকের যে পাঠ” আনজুম উপস্থাপন করেছেন (সিরিজের পূর্ববর্তী প্রবন্ধে আলোচিত) তার ক্রিটিক এবং একইসঙ্গে “ইজতিহাদের দ্বার যে উন্মুক্ত” সে প্রস্তাবনাই ওয়ালিউল্লাহ স্বয়ং স্বীকার ও চর্চার মাধ্যমে সে মতের অনুসরণ করে নজির স্থাপন করেছেন} তবে ওহীকে মানুষের প্রকৃতি ও ইতিহাসের থেকে একটি নিরবচ্ছিন্ন সংলাপ হিসেবে দেখার যে দৃষ্টিভঙ্গির কথা আগে বলা হয়েছে, তার প্রেক্ষিতে উৎসে ফিরে যাওয়ার (returning to the sources) এই ধারণাটিকে আরও সূক্ষ্মভাবে বোঝা যেতে পারে। ওহী এবং মানুষের বাস্তবতার এই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে ওয়ালিউল্লাহ তাঁর একটি মূল পরিভাষা দিয়ে বুঝিয়েছেন: 'ইরতিফাক' (irtifāq)। মার্সিয়া হারম্যানসেন এর বিভিন্ন অর্থ করেছেন— ‘সামাজিক কাজ’, ‘উপকার’ বা 'সভ্যতার সহায়তা’। অন্যান্য পণ্ডিতরা এর তরজমা করেছেন ‘মানবিক বিষয়াদির কার্যকর ব্যবস্থাপনা’, ‘সামাজিক প্রতিষ্ঠান’, ‘মানব সমাজের বিবর্তনের ধাপ’, ‘সভ্যতা ও এর উপকরণ’ এবং ‘প্রাকৃতিক আইনের একটি তত্ত্ব’।2 সংক্ষেপে বলতে গেলে, সামাজিক বিবর্তনের বিভিন্ন পর্যায়ে মানুষের সমৃদ্ধির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ অভ্যাস ও ব্যবস্থাকেই 'ইরতিফাক' বলা হয়। এটি একটি অসাধারণ উদ্ভাবনী এবং জটিল ধারণা যা একই সাথে বর্ণনামূলক এবং আদর্শিক দিকগুলোকে ধারণ করে। তর্জমার এই বৈচিত্র্যই বলে দেয় যে, ওয়ালিউল্লাহ শব্দটির কোনো সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা দেননি।
ওয়ালিউল্লাহ পরবর্তীতে মধ্যযুগীয় রক্ষণশীল ধারার বাইরে গিয়ে 'তালফিক' (talfīq)-এর সুযোগ তৈরি করেছিলেন—অর্থাৎ কেবল একটি মাযহাবের ওপর কড়াকড়িভাবে সীমাবদ্ধ না থেকে বিভিন্ন মাযহাব থেকে বিধান গ্রহণ করা। এমনকি তিনি সাধারণ মুসলিমদেরও এই স্বাধীনতা দেওয়ার পক্ষপাতী ছিলেন যে কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে তারা কোন আইনি বিধানটি অনুসরণ করবেন। এটি ছিল সাধারণ মানুষের জন্য একটি সীমিত পর্যায়ের 'ইজতিহাদ' সমর্থন করার মতো,3 (এস্থল হতেই বোঝা যায়, ওয়ালিউল্লাহ ইজতিহাদের পুনরুজ্জীবনের ধারাতে কতটা সক্রিয়তা অবলম্বন করেছেন এবং শরিয়তের পুনরুজ্জীবন দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে ব্যক্ত করতে বিশেষত ভারতীয় উপমহাদেশের প্রেক্ষিতে তা বোঝাতে নিয়ে যে মূলত ইজিতিহাদেরই পুনরুজ্জীবনকে ইঙ্গিত করা হচ্ছে তা স্পষ্ট) যা জুওয়াইনি এবং তাঁর সমসাময়িক অধিকাংশ পণ্ডিতদের কঠোর 'তাকলিদ' বা অন্ধ অনুকরণের নির্দেশের বিপরীত। (এর প্রাসঙ্গিক পাঠ হিসেবে অনেকগুলো বিষয়ই উঠে আসতে পারে, অন্যতম হলো, উপমহাদেশীয় বাস্তবতায় এখানে যে শরিয়ত পুনরুজ্জীবিত হচ্ছে, নতুন রুপে জীবন লাভের দ্বারপ্রান্তে উপস্থিত হয়ে ‘ইরতিফাক’ ধারণাকে পোক্ত করছে তা দৃশ্যমান) ওয়ালিউল্লাহ তাঁর এই অবস্থানকে রক্ষা করেছেন মাযহাবগুলোর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণের মাধ্যমে। তিনি এ বিষয়ে 'আল-ইনসাফ ফি বায়ান সাবাব আল-ইখতিলাফ' নামে একটি বইও লিখেছিলেন, যেখানে তিনি শরীয়ার বিকাশের প্রাথমিক ইতিহাস পুনর্গঠন করে দেখিয়েছেন যে আইনি মাযহাবগুলো মূলত সময়ের প্রয়োজনে গড়ে উঠেছিল।
একটি ক্ষেত্রে জুওয়াইনি এবং ওয়ালিউল্লাহর মধ্যে বেশ মিল পাওয়া যায়। পরবর্তী মধ্যযুগীয় ইসলামের রাজনীতি-বিমুখতার বিপরীতে ওয়ালিউল্লাহ রাজনীতি ও ক্ষমতার প্রতি মনোযোগ ফিরিয়ে আনেন, যা পরবর্তী সমস্ত পুনর্জাগরণবাদী চিন্তার একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়ায়। রাজনৈতিক ধর্মতত্ত্ব (Political theology) ওয়ালিউল্লাহর চিন্তার কেন্দ্রে ছিল। তিনি ইবনে খালদুন-এর মতো মানব সমাজের কাজ, তাদের উত্থান এবং পতনের ‘আধা-সমাজতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা’ দিয়েছেন।4 তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে তিনি আধুনিক লেখকদের থেকে আলাদা। ওয়ালিউল্লাহর মতে, নবী এবং তাঁদের উত্তরসূরিরা—যারা মানব ইতিহাসের অক্ষশক্তি—আইন ও প্রথা সংশোধন বা প্রবর্তনের মাধ্যমে মানব সমাজকে পরিচালনা করেন। হেলেনিস্টিক দর্শন বা ভারত-পারস্যের উপদেশমূলক ঐতিহ্যের মতো ওয়ালিউল্লাহর সামাজিক জগতও স্পষ্টভাবে দুই ভাগে বিভক্ত—একদিকে সাধারণ মানুষ (যাদের কাছে আইনি বিধানের প্রকৃত যুক্তিগুলো পৌঁছানো কঠিন), আর অন্যদিকে আধ্যাত্মিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক অভিজাত শ্রেণী (যাদের কাছে এই যুক্তিগুলো স্পষ্ট হতে পারে)।5 দার্শনিকদের মতো তিনিও নবী বা খলিফার কাজকে একটি যৌক্তিক ছকের মাধ্যমে বৈধতা দেন যেখানে সাধারণ মানুষকে দক্ষতার সাথে পরিচালনা করার প্রয়োজন পড়ে। এখানে তিনি প্রারম্ভিক সুন্নি ঐতিহ্যের (যেখানে শাসকের আচরণ উম্মাহ বা আলেমের নজরদারিতে থাকে) এবং আধুনিক মুসলিম চিন্তার (যেখানে শাসনতান্ত্রিক বা গণতান্ত্রিক উদ্বেগ শাসককে নিয়ন্ত্রণ করে) উভয় পথ থেকেই সরে এসেছেন। ওয়ালিউল্লাহর মতে, একজন শাসকের মর্যাদা তাঁকে সাধারণ আইনের ঊর্ধ্বে রাখে; এমনকি শাসক যদি মনে করেন যে তাঁর কোনো ভুল নীতি রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক হবে, তবে তিনি সেটিকে সঠিক বলে চালিয়ে দেওয়ার অধিকার রাখেন। {মূলত এখানে তিনি ইসলামি তুরাছের ধারা হতেই তার প্রামাণ্যতা স্থাপন করেছেন যেখানে শাসকের আনুগত্যের প্রতি বলা হয়েছে এবং সেটা যদি নবী কিংবা স্রষ্টার আদেশের বিপরীত না হয় তবে তা অবশ্য পালনীয় (যদিও আপাত বিচারে তা কোন ভুল নীতি হয় কিন্তু বিরাট রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের সহায়ক হলে সেটি সঠিক বলে বিবেচিত হবে) ও তখনকার সময় ও স্থানের প্রেক্ষিতে নতুন ভাবে এসবকে উপস্থাপনের মাধ্যমে তিনি ইজতিহাদকেই জনজীবনে নিয়ে এসেছেন}
ওয়ালিউল্লাহ দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় প্রতিটি ধর্মীয় ধারাকে প্রভাবিত করেছেন—যার মধ্যে হানাফি দেওবন্দি, বেরলভি এবং আহলে হাদীস অন্তর্ভুক্ত।6 ইজতিহাদের ওপর তাঁর জোর এবং শরীয়াহ্-র ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণের পদ্ধতিটি সাইয়িদ আহমদ খান এবং সাম্প্রতিককালের ফজলুর রহমানের মতো আধুনিকতাবাদীদের ধর্মীয় চিন্তার জন্য একটি তাত্ত্বিক ভিত্তি প্রদান করেছিল।7 ফজলুর রহমান ওয়ালিউল্লাহকে তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক পূর্বপুরুষ মনে করতেন এবং তাঁরই ছাত্রী মার্সিয়া হারম্যানসেন প্রথম ওয়ালিউল্লাহর বিখ্যাত গ্রন্থ 'হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ' ইংরেজিতে অনুবাদ করেন। ফজলুর রহমান ওয়ালিউল্লাহকে ‘মুসলিম আধুনিকতাবাদের প্রতিষ্ঠাতা’ এবং একজন উদ্ভাবনী সংস্কারক হিসেবে প্রশংসা করেছেন।8 ওয়ালিউল্লাহর ইতিহাস দর্শন—যেখানে ইতিহাসকে একটি ‘গতিশীল বিবর্তনীয় প্রক্রিয়া’ হিসেবে দেখা হয়—তাতে অনুপ্রাণিত হয়ে ফজলুর রহমান পশ্চিমা ব্যাখ্যামূলক পদ্ধতির (hermeneutics) আলোকে আইনি সংস্কারের একটি কর্মসূচি তৈরির চেষ্টা করেছিলেন।9 তাঁর লক্ষ্য ছিল ইসলামি তুরাছকে একপাশে রেখে সরাসরি মূল উৎসগুলোর (কুরআন ও সুন্নাহ) দিকে ফিরে যাওয়া এবং আধুনিক পশ্চিমা জ্ঞানের আলোকে নতুন ব্যাখ্যা দাঁড় করানো। এভাবেই ফজলুর রহমান ঐতিহাসিকভাবে প্রতিষ্ঠিত ইজতিহাদের মাধ্যমে ওয়ালিউল্লাহর আইনি সংস্কারের কাজটিকে এগিয়ে নিতে চেয়েছিলেন।
ফজলুর রহমানের এই প্রকল্পটি শরীয়ার পুনর্কল্পনার সুযোগ এবং ঝুঁকি — উভয়কেই সামনে নিয়ে আসে। তুরাছকে না ভেঙে একে কতটা প্রসারিত করা সম্ভব? বিচ্ছিন্নতার সহিংসতা না ঘটিয়ে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ধারণাগুলোকে কতটা টানা যায়? আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—নিজের তুরাছকে চাঙ্গা করার জন্য বিদেশি ঐতিহ্যের সাহায্য নেওয়া এবং বিদেশি ঐতিহ্যের সারবস্তু ও কুসংস্কারগুলো নিজের বলে আমদানি করার মধ্যে পার্থক্য করার উপায় কী?
ফজলুর রহমানকে ইসলামকে সংস্কার বা পুনরুজ্জীবিত করতে আগ্রহী একদল আধুনিক শিক্ষিত মুসলিম বুদ্ধিজীবীর অগ্রদূত হিসেবে দেখা যেতে পারে। ১৯৮৮ সালে তাঁর মৃত্যুর পর থেকে এই শ্রেণীর পরিধি কেবল বেড়েছে। তারা পশ্চিমা একাডেমির ‘ইসলামিক স্টাডিজ’ এবং প্রথাগত মাদ্রাসার ‘ইসলামি উলুম’ বা শাস্ত্রগুলোর মধ্যকার সীমানা ঝাপসা করে দিয়েছেন, যার ফলে একজন ব্যক্তিকে ‘আলেম’ হিসেবে গণ্য হওয়ার শাস্ত্রীয় মাপকাঠিগুলো চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। মেগান আব্বাস তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কীভাবে ইসলামি জ্ঞানের সক্রিয় উৎপাদক এবং ধর্মীয় কর্তৃত্বের নির্ধারক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বিশেষ করে ইন্দোনেশিয়ায়, ফজলুর রহমান এবং অন্যান্য শিক্ষাবিদ যারা বিদেশে সেক্যুলার বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলাম নিয়ে পড়াশোনা করেছেন, তারা দেশের রাজনীতি ও ধর্মে উল্লেখযোগ্য প্রভাব অর্জন করেছিলেন।10 তবে মুসলিম বিশ্বের খুব কম জায়গাতেই রহমানের মতো আধুনিকতাবাদীরা প্রাধান্য বিস্তার করতে পেরেছেন। মিশরের মতো দেশগুলোর উদাহরণে দেখা যায় যে, মধ্যপন্থা অবলম্বনকারী সংস্কারপন্থীরাই মুসলিম সমাজ গঠনে তুলনামূলকভাবে বেশি সফল হয়েছেন।11 প্রকৃতপক্ষে, দক্ষিণ এশীয় আধুনিকতাবাদীদের প্রভাব তাঁদের প্রেরণা ওয়ালিউল্লাহর চেয়ে অনেক কম ছিল। ওয়ালিউল্লাহর চিন্তাধারার মধ্যে যে বৈচিত্র্যময় উদারতা ছিল, তা যেমন অনেক নতুন চিন্তার জন্ম দিয়েছিল, তেমনি হয়তো এটি তাঁর চিন্তার কোনো একক বা সুসংগত 'স্কুল অফ থট' গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আজকের দিনে ভারতের প্রায় প্রতিটি ইসলামি দল ওয়ালিউল্লাহকে নিজেদের বলে দাবি করে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রত্যেকেই তাঁর বিশাল জ্ঞানভাণ্ডার থেকে বেছে বেছে কেবল নিজেদের সুবিধামতো অংশটুকুই গ্রহণ করেছে।
শরীয়ার কথিত মৃত্যুর পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে যখন আমরা ভাবি, তখন ওয়ালিউল্লাহ এবং তাঁর দক্ষিণ এশীয় শিষ্যদের উদাহরণটি শিক্ষণীয়। তাঁর এবং সমসাময়িক সংস্কারকদের উদ্বেগগুলো ঔপনিবেশিক আমলের আগের মুসলিম ঐতিহ্যের গতিশীলতাকে চিহ্নিত করে। বাহ্যিকভাবে হয়তো পুরনো শরীয়াভিত্তিক সমাজ এবং এর প্রতিষ্ঠানগুলো অদৃশ্য হয়ে গেছে। সবদিকেই মুসলমানরা রাজনৈতিক আধিপত্য হারিয়েছে এবং অস্তিত্বের সংকটের মুখোমুখি। তবুও, শরীয়াহ্ শিক্ষার মান বা এর প্রতিষ্ঠানগুলোর সংহতি নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও আশাবাদী হওয়ার কারণ আছে। উদাহরণস্বরূপ—মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উত্থান এবং তুরাছের পক্ষে কাজ করা বিশাল গণআন্দোলন, ধর্মীয় রাজনীতি, মাদ্রাসা-কলেজ এবং ধর্মীয় মিডিয়ার প্রসারের কথা বলা যেতে পারে। এই উন্নয়নগুলো দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসের যেকোনো সময়ের চেয়ে ধর্মীয় অংশগ্রহণকে বাড়িয়ে দিয়েছে—অন্তত অনুসারী ও একনিষ্ঠ শিক্ষার্থীর সংখ্যার বিচারে। ওয়ালিউল্লাহ এই নতুন 'ইরতিফাক'-কে যে পুরোপুরি নাখোশ হয়ে দেখতেন, তা নিশ্চিত নয়।
তাই শরীয়ার ময়নাতদন্তের রিপোর্ট বা শোকগাথা না লিখে বরং যে পণ্ডিতগণ এর পতনের কথা বলেন, তাঁরা শরীয়াহ্ কীভাবে আরও শক্তিশালী এবং প্রাণবন্ত হতে পারে তা নিয়ে অনুসন্ধান করতে পারেন। বিশাল ঐতিহাসিক ভাঙন বা বিপর্যয়ের মুখেও জীবিত অনুসারী ও আইনবিদদের চেষ্টার মাধ্যমে যে জগত তারা গড়ে তুলেছেন, তা গভীর মনোযোগের দাবি রাখে। ইসলামি আইন পালনের জন্য বর্তমান মুসলিমদের যে অবিচল ইচ্ছা, তা বিবেচনায় না নিয়ে এর ভাগ্য বা বিবর্তন নিয়ে কোনো আলোচনাই পূর্ণাঙ্গ হতে পারে না।
টীকা বা নোটসমূহ:
শাহ ওয়ালিউল্লাহ, হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (The Conclusive Argument from God); অনুবাদ: মার্সিয়া কে. হারম্যানসেন (লাইডেন: ই.জে. ব্রিল, ১৯৯৬), ১৪২।
প্রাগুক্ত (পূর্বের বই), পৃষ্টা ১৯।
প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ২৩।
মুহাম্মদ কাসিম জামান, ‘পলিটিক্যাল পাওয়ার, রিলিজিয়াস অথরিটি, অ্যান্ড দ্য ক্যালিফেইট ইন এইটটিন্থ-সেঞ্চুরি ইন্ডিয়ান ইসলামিক থট,’ জার্নাল অফ দ্য রয়্যাল এশিয়াটিক সোসাইটি ৩০, নং ২ (২০২০): ৩১৬।
প্রাগুক্ত।
১৮৫৭ সালের ব্যর্থ স্বাধীনতা যুদ্ধের পর ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে ইসলামি (হানাফি) তুরাছ সংরক্ষণের জন্য ১৮৬৭ সালে ভারতে দেওবন্দ মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। দৃশ্যত এটি একটি ঐতিহ্যবাহী মাদ্রাসা হলেও, এটি ব্রিটিশ কলেজগুলোর প্রশাসনিক ও শিক্ষা কাঠামো অনুসরণ করেছিল। বিস্তারিত দেখুন: বারবারা মেটকাফ, ইসলামিক রিভাইভাল ইন ব্রিটিশ ইন্ডিয়া: দেওবন্দ, ১৮৬০-১৯০০ (প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটি প্রেস, ১৯৮২); এবং ইনগ্রাম ব্র্যানন, রিভাইভাল ফ্রম বিলো: দ্য দেওবন্দ মুভমেন্ট অ্যান্ড গ্লোবাল ইসলাম (ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া প্রেস, ২০১৮)। দেওবন্দ মাদ্রাসার সমসাময়িক সময়েই 'আহলে হাদীস' একটি স্বতন্ত্র গোষ্ঠী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। তারা সরাসরি ধর্মগ্রন্থ (কুরআন ও হাদীস) ব্যাখ্যার পক্ষে সওয়াল করেন এবং চার মাযহাবের আইনগত কর্তৃত্বকে গৌণ মনে করেন। দেওবন্দীদের মতো তারাও শাহ ওয়ালিউল্লাহকে নিজেদের আদর্শ হিসেবে দাবি করেন—দেখুন আজিজ আহমদ, ইসলামিক মডার্নিজম ইন ইন্ডিয়া অ্যান্ড পাকিস্তান (১৮৫৭-১৯৬৪) (লন্ডন: অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, ১৯৬৭), ১১৪, ১৯৮। আরও দেখুন: এম. ইকরাম চাঘতাই সম্পাদিত, শাহ ওয়ালিউল্লাহ: হিজ রিলিজিয়াস অ্যান্ড পলিটিক্যাল থট (১৭০৩-১৭৬২) (লাহোর: সাং-ই-মীল পাবলিকেশন্স, ২০০৫), ৫৪৬।
দেখুন আজিজ আহমদ, ইসলামিক মডার্নিজম ইন ইন্ডিয়া অ্যান্ড পাকিস্তান, ৪০-৪১ এবং স্টাডিজ ইন ইসলামিক কালচার ইন দ্য ইন্ডিয়ান এনভায়রনমেন্ট (অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, ১৯৬৪), ২০৫। স্যার সাইয়িদ আহমদ খানের সমসাময়িক বেশ কিছু আধুনিকতাবাদী চিন্তাবিদ—চেরাগ আলী, মহসিন আল-মুলক, মমতাজ আলী, আমির আলী—আইনশাস্ত্র, লিঙ্গ সমতা এবং ইতিহাসতত্ত্বের মতো নানা ক্ষেত্রে নতুনত্ব আনতে শাহ ওয়ালিউল্লাহর ধারণাগুলো ব্যবহার করেছিলেন। দেখুন: আহমদ, ইসলামিক মডার্নিজম ইন ইন্ডিয়া অ্যান্ড পাকিস্তান, ৫৯, ৭০, ৯৬।
ফজলুর রহমান, ‘থিঙ্কার অফ ক্রাইসিস: শাহ ওয়ালী-উল্লাহ,’ পাকিস্তান কোয়ার্টারলি ৬, নং ২ (১৯৫৬): ৪৪।
প্রাগুক্ত।
মেগান আব্বাস, হুজ ইসলাম? দ্য ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটি অ্যান্ড মডার্ন ইসলামিক থট ইন ইন্দোনেশিয়া (স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, ২০২১)।
দেখুন ইন্দিরা ফক গেসিঙ্ক, ইসলামিক রিফর্ম অ্যান্ড কনজারভেটিজম: আল-আজহার অ্যান্ড দ্য ইভোলিউশন অফ মডার্ন সুন্নি ইসলাম (ব্লুমসবারি পাবলিশিং, ২০১৪)।
তরজমা করেছেন সিদ্দিকে আকবর।
মূল নিবন্ধ - https://islamiclaw.blog/2024/01/18/resuscitating-the-shari%ca%bfa-in-south-asia/