রিসালাতুস সুফিয়্যাহ ওয়াল ফুকারা (সুফি ও ফকির সম্পর্কে)
‘সূফিয়্যাহ’ (সুফিবাদ বা সুফি সম্প্রদায়) শব্দটি ইসলামের প্রথম তিন শতাব্দীতে মশহুর ছিলো না। এর ব্যবহার ও আলোচনা পরবর্তীকালে প্রসিদ্ধি পায়। বহু ইমাম ও শায়খের কাছ থেকে এই শব্দ ব্যবহার বা এ নিয়ে কথা বলার বর্ননা পাওয়া যায়। যেমন ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল, আবু সুলাইমান আদ দারানী প্রমুখ।
এছাড়াও বর্ণিত আছে হজরত সুফিয়ান সাওরীও এ ব্যাপারে কথা বলেছেন। আর কেউ কেউ হাসান বসরী থেকেও এ নিয়ে কথা বলার ব্যাপারে উল্লেখ করেছেন।
‘সুফি’ শব্দের ব্যুৎপত্তি:
‘সুফি’ শব্দটি কোন অর্থ বা কিসের প্রতি সম্বন্ধিত, এ নিয়ে মতভেদ আছে। কারণ এটি ‘নিসবত’ বা সম্বন্ধসূচক নামের অন্তর্ভুক্ত; যেমন ‘কুরাইশি’ (কুরাইশ বংশের দিকে সম্বন্ধিত), ‘মাদানি’ (মদিনার দিকে সম্বন্ধিত) ইত্যাদি।
বলা হয়, সুফি শব্দটি আহলুস্-সুফ্ফাহ (মসজিদে নববীর বারান্দাবাসী সাহাবীগণ)-এর দিকে সম্বন্ধযুক্ত। কিন্তু এটি ভুল। কারণ যদি তা-ই হতো, তাহলে শব্দটি হতো “সুফ্ফী” (صُفِّي)।
আরও বলা হয়, এটি আল্লাহর সম্মুখে প্রথম সফে দাঁড়ানোর সঙ্গে সম্পর্কিত। এটিও ভুল। কারণ যদি তা-ই হতো, তাহলে শব্দটি হতো “সাফ্ফী” (صَفِّي)।
আরও বলা হয়, এটি আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যকার নির্বাচিত বা বিশুদ্ধ লোকদের (সাফওয়াহ) দিকে সম্বন্ধযুক্ত। এটিও ভুল। কারণ যদি তা-ই হতো, তাহলে শব্দটি হতো “সাফাওয়ী” (صَفَوِي)।
আরও বলা হয়ে থাকে যে, এটি “সূফাহ ইবনে বিশর ইবনে আদ্দ ইবনে তাবিখাহ” নামক এক আরব গোত্রের দিকে সম্বন্ধযুক্ত। এই গোত্র প্রাচীন যুগ থেকে মক্কার নিকটে বসবাস করতো। কিছু দরবেশ ও তাপশ শ্রেণীর লোকেদের তাদের দিকে নিসবত (সম্বন্ধ) করা হতো।
যদিও শব্দগত দিক থেকে এটি সম্বন্ধ করণের সাথে মিল রাখে, তবু এটিও দুর্বল মত। কারণ এই গোত্র অধিকাংশ দরবেশ ও তাপশের কাছে পরিচিত বা প্রসিদ্ধ ছিলো না। তাছাড়া যদি সত্যিই দরবেশ বা তাপশ শ্রেণীকে এই গোত্রের দিকে সম্বন্ধযুক্ত করা হতো, তাহলে তো সাহাবী, তাবেয়ী ও তাবে-তাবেয়ীদের যুগেই এ ধরনের সম্বন্ধ করণ বেশি প্রচলিত হওয়ার কথা ছিলো। তাছাড়া, যারা নিজেদেরকে সুফি নামে পরিচয় দিতেন, তাদের অধিকাংশই এই গোত্রকে চিনতেন না এবং ইসলামে অস্তিত্ব ছিলো না, জাহেলী যুগের এমন একটি গোত্রের সঙ্গে তারা নিজেদের সম্পর্কিত করাও পছন্দ করতেন না।
সুফীবাদের প্রাথমিক উৎপত্তি
বলা হয়েছে: আর এটিই প্রসিদ্ধ মত, যে, “সুফী” শব্দটি সূফ বা পশমী বস্ত্র পরিধানের সঙ্গে সম্পর্কিত। কেননা সর্বপ্রথম বসরা নগরীতেই সুফীবাদের আবির্ভাব ঘটে। আর সূফীদের জন্য সর্বপ্রথম একটি ছোট আশ্রম (দুয়াইরাহ) নির্মাণ করেছিলেন আব্দুল ওয়াহেদ ইবনু যায়েদের কিছু সাথী। আর আব্দুল ওয়াহেদ ইবনু যায়েদ ছিলেন হাসান বসরির সাথীদের একজন।
বসরা নগরীর লোকদের মধ্যে যুহদ (দুনিয়াবিমুখতা), ইবাদত, আল্লাহভীতি ইত্যাদিতে এমন অতিরঞ্জন ছিলো, যা অন্য কোনো নগরবাসীদের মধ্যে দেখা যেতো না। এ কারণেই বলা হতো:
فقه كوفي وعبادة بصرية
“ফিকহ হলো কুফার বৈশিষ্ট্য, আর ইবাদত হলো বসরার বৈশিষ্ট্য।”
পশমী পোশাক (সূফ)-কে প্রাধান্য দেওয়া
আবুশ শাইখ আল-আসবাহানী তাঁর সনদে মুহাম্মদ ইবনু সীরিন থেকে বর্ণনা করেন যে, তাঁর কাছে খবর পৌঁছেছিলো যে, কিছু লোক পশমী পোশাককে বিশেষ মর্যাদা দেয়। তখন তিনি বলেন:
“কিছু লোক পশমী পোশাক পছন্দ করে এবং বলে যে তারা মারইয়ামপুত্র ঈসা আ. -এর অনুসরণ করছে। অথচ আমাদের নিকট আমাদের নবীর পথনির্দেশই অধিক প্রিয়। আর নবী সা. তুলা ও অন্যান্য ধরনের পোশাক পরিধান করতেন।” অথবা এ ধরনেরই কিছু কথা তিনি বলেছেন।
বসরাবাসীদের ইবাদত সম্পর্কে যা বর্ণিত হয়েছে
এ কারণেই এ বিষয়ে যে অতিরঞ্জনের কথা বর্ণিত হয়েছে, তার অধিকাংশই বসরার ইবাদতগুজার লোকদের ব্যাপারে। যেমন, কুরআন তিলাওয়াত শুনে কারো মৃত্যু হওয়া বা অজ্ঞান হয়ে পড়ার ঘটনা ইত্যাদি।
উদাহরণস্বরূপ, যুরারাহ ইবনে আওফার ঘটনা। তিনি বসরার কাযি ছিলেন। একদিন ফজরের নামাজে তিনি এই আয়াত তেলাওয়াত করলেন:
فَإِذَا نُقِرَ فِى ٱلنَّاقُورِ
“অতঃপর যখন শিঙ্গায় ফুঁক দেয়া হবে।” [মুদ্দাসসির: ৮]
তারপর তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন।
অনুরূপভাবে আবু যুহাইর আল-আ’মার ঘটনাও রয়েছে, যে, সালিহ আল-মুররি তাঁর সামনে কুরআন তেলাওয়াত করলে তিনি মারা যান। এ ধরনের আরও কিছু লোকের কথাও বর্ণিত হয়েছে, যারা তাঁর তেলাওয়াত শুনে মৃত্যুবরণ করেছিলেন। সূফীদের মধ্যে এমন কিছু দলও ছিলো, যারা কুরআন শুনে সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ত। অথচ সাহাবীগণের মধ্যে এ ধরনের অবস্থা (হাল) কারো ছিলো না।
যারা ইবাদতে অতিরঞ্জনের বিরোধিতা করতেন
যখন এ বিষয়টি প্রকাশ পেলো, সয়লাব হলো, অর্থাৎ কুরআন শুনে সংজ্ঞা হারানো, তখন সাহাবী ও তাবেয়ীদের একটি দল এর বিরোধিতা করেন। যেমন, আসমা বিনতে আবি বকর রাযি., আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইর রাযি., মুহাম্মদ ইবনু সীরিন রহ. প্রমুখ।
যারা এ বিষয়ের বিরোধিতা করেছিলেন, তাদের আপত্তির দুটি দিক ছিলো:
তাদের কেউ কেউ মনে করতেন, এসব ছিলো কৃত্রিমতা ও লোক দেখানো আচরণ। মুহাম্মদ ইবনু সীরিন রহ. থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন:
“যারা কুরআন শুনে অজ্ঞান হয়ে যায়, তাদের সঙ্গে আমাদের পার্থক্য নির্ণয়ের জন্য, তাদের কাউকে দেয়ালের উপর বসিয়ে কুরআন তেলাওয়াত করা হোক, যদি সে পড়ে যায়, তবে সে সত্যবাদী।”
আবার কেউ কেউ এজন্য আপত্তি করেন যে, তারা এটিকে বিদআত মনে করতেন, যা সাহাবীগণের পরিচিত আদর্শ ও পথের বিরোধী। যেমনটি আসমা রাযি. ও তাঁর পুত্র আবদুল্লাহ ইবনুয যুবাইর রাযি. থেকে বর্ণিত হয়েছে।
তবে জমহুর আলেমের মত হলো, এদের কারো উপর যদি এ ধরনের অবস্থা অনিচ্ছাকৃতভাবে প্রবল হয়ে আসে, তাহলে তাকে এজন্য দোষারোপ করা হবে না। যদিও যে ব্যক্তি (এই অবস্থার সম্মুখীন হলে) স্থির ও সংযত থাকতে পারে, তার অবস্থা অধিকতর কামেল এবং অধিকতর উত্তম। এ কারণেই যখন আহমদ ইবনে হাম্বলকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হইয়েছিলো, তিনি তখন বলেন:
“ইয়াহইয়া ইবনে সাইদ আল-কাত্তানের সামনে কুরআন তেলাওয়াত করা হলে তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়েন। যদি কেউ নিজের থেকে এ অবস্থা প্রতিহত করতে সক্ষম হতেন, তবে ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদই তা করতে পারতেন। কারণ আমি তাঁর চেয়ে অধিক জ্ঞানী ও আকলবান আর কাউকে দেখিনি।” এবং তিনি এ ধরনের আরো কিছু কথা উল্লেখ করে।
এছাড়াও ইমাম শাফেয়ী সম্পর্কে বর্ণিত আছে যে, তাঁরও এমন অবস্থা হয়েছিলো। অনুরূপভাবে আলি ইবনে ফুদাইল ইবনে ইয়াদের ঘটনাও প্রসিদ্ধ। মোটকথা, এ ধরনের ঘটনা বহু লোকদের ক্ষেত্রেই ঘটেছে, যাদের সততা ও ইখলাসের ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।
কুরআন শ্রবণের সময় সাহাবাদের বিভিন্ন অবস্থা (হাল)
তবে কুরআন শ্রবণের সময় সাহাবাদের যেসকল অবস্থার (হাল) কথা পাওয়া যায়, সেগুলো মূলতো কুরআনে বর্ণিত অবস্থাগুলোই। অর্থাৎ হৃদয় ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়া, চোখ অশ্রুশিক্ত হয়ে যাওয়া এবং শরীর কেঁপে ওঠা বা শরীরের লোম খাড়া হয়ে যাওয়া ইত্যাদি।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِنَّمَا ٱلْمُؤْمِنُونَ ٱلَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ ٱللَّهُ وَجِلَتْ قُلُوبُهُمْ وَإِذَا تُلِيَتْ عَلَيْهِمْ ءَايَـٰتُهُۥ زَادَتْهُمْ إِيمَـٰنًا وَعَلَىٰ رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ إِنَّمَا ٱلْمُؤْمِنُونَ ٱلَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ ٱللَّهُ وَجِلَتْ قُلُوبُهُمْ وَإِذَا تُلِيَتْ عَلَيْهِمْ ءَايَـٰتُهُۥ زَادَتْهُمْ إِيمَـٰنًا وَعَلَىٰ رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ
“মুমিন তো তারা, যাদের অন্তরসমূহ কেঁপে উঠে যখন আল্লাহকে স্মরণ করা হয়। আর যখন তাদের উপর তাঁর আয়াতসমূহ পাঠ করা হয় তখন তা তাদের ঈমান বৃদ্ধি করে এবং যারা তাদের রবের উপরই ভরসা করে।” [আনফাল: ২]
আল্লাহ আরো বলেন:
ٱللَّهُ نَزَّلَ أَحْسَنَ ٱلْحَدِيثِ كِتَـٰبًا مُّتَشَـٰبِهًا مَّثَانِىَ تَقْشَعِرُّ مِنْهُ جُلُودُ ٱلَّذِينَ يَخْشَوْنَ رَبَّهُمْ ثُمَّ تَلِينُ جُلُودُهُمْ وَقُلُوبُهُمْ إِلَىٰ ذِكْرِ ٱللَّهِۚ
“আল্লাহ নাযিল করেছেন উত্তম বাণী সম্বলিত কিতাব যা সুসামঞ্জস্য1 এবং যা পুনঃ পুনঃ আবৃত্তি করা হয়। এতে, যারা তাদের রবকে ভয় করে, তাদের শরীর শিউরে ওঠে, তারপর তাদের দেহ, মন বিনম্র হয়ে আল্লাহর স্মরণে ঝুঁকে পড়ে।” [যুমার: ২৩]
তিনি আরো বলেন:
إِذَا تُتْلَىٰ عَلَيْهِمْ ءَايَـٰتُ ٱلرَّحْمَـٰنِ خَرُّواْ سُجَّدًا وَبُكِيًّا ۩
“যখন তাদের কাছে পরম করুণাময়ের আয়াতসমূহ পাঠ করা হত, তারা কাঁদতে কাঁদতে সিজদায় লুটিয়ে পড়ত। [সাজদাহ]” [মারইয়াম: ৫৮]
তিনি আরো বলেন:
وَإِذَا سَمِعُواْ مَآ أُنزِلَ إِلَى ٱلرَّسُولِ تَرَىٰٓ أَعْيُنَهُمْ تَفِيضُ مِنَ ٱلدَّمْعِ مِمَّا عَرَفُواْ مِنَ ٱلْحَقِّۖ
“আর রাসূলের প্রতি যা নাযিল করা হয়েছে যখন তারা তা শুনে, তুমি দেখবে তাদের চক্ষু অশ্রুতে ভেসে যাচ্ছে, কারণ তারা সত্য হতে জেনেছে।” [মায়েদা: ৮৩]
তিনি আরো বলেন:
وَيَخِرُّوۡنَ لِلۡاَذۡقَانِ يَبۡكُوۡنَ وَيَزِيۡدُهُمۡ خُشُوۡعًا ۩
“‘আর তারা কাঁদতে কাঁদতে লুটিয়ে পড়ে এবং এটা তাদের বিনয় বৃদ্ধি করে’। [সাজদাহ]” [আল-ইসরা: ১০৯]
যাদের অন্তর কঠিন হয়ে গেছে, যাদের কলবের উপর মরিচা জমেছে এবং যাদের মাঝে দীনের ব্যাপারে দূরত্ব ও অনীহা দেখা গিয়েছে, যা কিনা স্বয়ং নিন্দনীয়, কখনও কখনও তারা এসে এ ধরনের লোকদের2 অবস্থার সমালোচনা করে। বাস্তবেই তারা এমনটি করে থাকে।
আবার কিছু লোক মনে করে, তাদের এই ধরনের অবস্থাই সবচেয়ে উত্তম, কামেল ও উচ্চতম অবস্থা। কিন্তু এ বিষয়ে উভয় চরমপন্থাই নিন্দনীয়।
কুরআন শ্রবণের সময় মানুষের অবস্থা (হাল)
বরং এখানে তিনটি স্তর রয়েছে:
প্রথম স্তর: সেই ব্যক্তির অবস্থা, যে নিজের উপর জুলুমকারী (যালিম লি নাফসিহি)। যার হৃদয় কঠোর। কুরআন শ্রবণ বা আল্লাহর স্মরণে তার সেই কঠোর হৃদয় কোমল হয় না। এদের মধ্যে ইহুদিদের এক ধরণের সাদৃশ্য রয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেছেন:
ثُمَّ قَسَتْ قُلُوبُكُم مِّنۢ بَعْدِ ذَٲلِكَ فَهِىَ كَٱلْحِجَارَةِ أَوْ أَشَدُّ قَسْوَةًۚ وَإِنَّ مِنَ ٱلْحِجَارَةِ لَمَا يَتَفَجَّرُ مِنْهُ ٱلْأَنْهَـٰرُۚ وَإِنَّ مِنْهَا لَمَا يَشَّقَّقُ فَيَخْرُجُ مِنْهُ ٱلْمَآءُۚ وَإِنَّ مِنْهَا لَمَا يَهْبِطُ مِنْ خَشْيَةِ ٱللَّهِۗ وَمَا ٱللَّهُ بِغَـٰفِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ.
“অতঃপর তোমাদের অন্তরসমূহ এর পরে কঠিন হয়ে গেল যেন তা পাথরের মত কিংবা তার চেয়েও শক্ত। আর নিশ্চয় পাথরের মধ্যে কিছু আছে, যা থেকে নহর উৎসারিত হয়। আর নিশ্চয় তার মধ্যে কিছু আছে যা চূর্ণ হয়। ফলে তা থেকে পানি বের হয়। আর নিশ্চয় তার মধ্যে কিছু আছে যা আল্লাহর ভয়ে ধ্বসে পড়ে। আর আল্লাহ তোমরা যা কর, সে সম্পর্কে গাফেল নন।” [আল-বাকারা: ৭৪]
আল্লাহ তাআলা আরো বলেন:
اَلَمۡ یَاۡنِ لِلَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡۤا اَنۡ تَخۡشَعَ قُلُوۡبُہُمۡ لِذِکۡرِ اللّٰہِ وَمَا نَزَلَ مِنَ الۡحَقِّ ۙ وَلَا یَکُوۡنُوۡا کَالَّذِیۡنَ اُوۡتُوا الۡکِتٰبَ مِنۡ قَبۡلُ فَطَالَ عَلَیۡہِمُ الۡاَمَدُ فَقَسَتۡ قُلُوۡبُہُمۡ ؕ وَکَثِیۡرٌ مِّنۡہُمۡ فٰسِقُوۡنَ
“যারা ঈমান এনেছে, তাদের জন্য কি এখনও সেই সময় আসেনি যে, আল্লাহর স্মরণে এবং যে সত্য অবতীর্ণ হয়েছে তাতে তাদের অন্তর বিগলিত হবে? এবং তারা তাদের মত হবে না, যাদেরকে পূর্বে কিতাব দেওয়া হয়েছিল অতঃপর যখন তাদের উপর দিয়ে দীর্ঘকাল অতিক্রান্ত হল, তখন তাদের অন্তর শক্ত হয়ে গেল এবং (আজ) তাদের অধিকাংশই অবাধ্য।” [আল-হাদীদ: ১৬]
দ্বিতীয় স্তর: এটি সেই মুত্তাকি মুমিন ব্যক্তির অবস্থা, যার অন্তর তার উপর আগত (আধ্যাত্মিক) ব্যাপারগুলো বহন করার ব্যাপারে দুর্বল ও অক্ষম। তাইতো সে সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলে। সে এমন যে, কখনও মৃত্যুর ন্যায় অচেতনতা, আবার কখনোবা সাময়িক মূর্ছা তাকে গ্রাস করে। এটি ঘটে আগত অনুভূতির তীব্রতার কারণে এবং কলবের তা বহন করার ব্যাপারে দুর্বলতা ও অক্ষমতার কারণে।
এ ধরনের অবস্থা কখনও এমন লোকের মাঝেও দেখা যায়, যে পার্থিব কোনো বিষয় নিয়ে এতটাই আনন্দিত হয়, কিংবা এতোটাই ভয়, দুঃখ বা ভালোবাসায় আক্রান্ত, যে, সেটা তাকে কখনো অবধি হত্যা করে ফেলে, কখনো অসুস্থ করে ফেলে, আবার কখনোবা তার জ্ঞান-বুদ্ধি নষ্ট করে দেয়।
মূর্তি-উপাসকদের মাঝেও এমন লোক পাওয়া যায়, যাদেরকে ইশক বা প্রেমাসক্তি অসুস্থ করে ফেলে, কিংবা হত্যা করে ফেলে বা পাগল বানিয়ে দেয়। অন্যদের ক্ষেত্রেও একই ধরণের অবস্থা দেখা যায়। এসব কেবল সেই সব ব্যক্তির ক্ষেত্রেই ঘটে, যাদের অন্তরে কোনো বিষয় এতটাই প্রবলভাবে হাজির হয় যে, তা প্রতিরোধ করার মতো শক্তি ও সামর্থ তাদের আত্মার থাকে না। তা প্রতিরোধে অক্ষম হয়ে পড়ে স্বীয় আত্মা। এটি অনেকটা সেই কারণগুলোর মতো, যেগুলো মানুষের শরীরে আক্রমণ করে তাকে অসুস্থ করে ফেলে, কিংবা হত্যা করে ফেলে কিংবা তাদের কারো উপর তা সম্পূর্ণভাবে প্রভাব বিস্তার করে তাঁর শরীরকে কাবু করে ফেলে। অতএব, যদি তাদের পক্ষ থেকে কোনো প্রকার অবহেলা বা সীমালঙ্ঘন না ঘটে থাকে, তবে তাদের উপর আপতিত কোনো বিষয়ে তাদের কোনো গুনাহ হবে না। তাই, তাদেরকে তোহমত বা নিন্দা করার কোনো সুযোগ নেই। যেমন কেউ যদি শরিয়ত সম্মত পদ্ধতিতে কুরআন শ্রবণ করে এবং (সেই অবস্থা প্রতিরোধে) যা করণীয় তাতে অবহেলা না করে, (তাহলে সেটি আপতিত হলে তার উপর কোনো নিন্দা বা তোহমত করা যাবে না।)
ফানা বা আত্মবিলুপ্তির অবস্থা (مقام الفناء)
অনুরূপভাবে, মানুষের অন্তরে এমন কিছু অবস্থা আসে, যাকে কেউ কেউ “সুকর” (আধ্যাত্মিক মত্ততা), “ফানা” (আত্মবিলুপ্তি) ইত্যাদি নামে অভিহিত করে। এগুলো এমন অবস্থা, যেগুলো মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধিকে তার স্বীয় ইচ্ছার বাইরে আচ্ছন্ন করে ফেলে। যদি এগুলোর কারণ (সবব) শরীয়তে নিষিদ্ধ না হয়, তাহলে সেই মত্ত ব্যক্তি নিন্দনীয় নয়। বরং সে ওযরগ্রস্ত। কারণ, মত্ত ব্যক্তির ভালো-মন্দ পার্থক্য করার ক্ষমতা থাকে না।
অনুরূপভাবে কখনো কখনো এ অবস্থা মদ বা গাঁজার মতো নেশাজাতীয় বস্তু (সবব) গ্রহণের কারণেও হয়ে থাকে। মুসলমানদের মাঝে এ ধরনের নেশা হারাম হওয়ার ব্যাপারে কোনো মতভেদ নেই। আর যে ব্যক্তি এসব নেশা বা নেশাদ্রব্যকে হালাল মনে করে, সে কাফির।
আবার কখনও মূর্তির প্রতি মানুষের আসক্তি ও প্রেম থেকেও এমন অবস্থা সৃষ্টি হতে পারে। যেমন বলা হয়েছে:
ﺳﻜﺮاﻥ: ﺳﻜﺮ ﻫﻮﻯ ﻭﺳﻜﺮ ﻣﺪاﻣﺔ * ﻭﻣﺘﻰ ﺇﻓﺎﻗﺔ ﻣﻦ ﺑﻪ ﺳﻜﺮاﻥ
“(তার মাঝে রয়েছে) নেশা: প্রেম ও মদের নেশা
যার মাঝে নেশা আছে তার হুঁশ কবে ফিরবে?”
এ ধরনের অবস্থা নিন্দনীয়, কেননা এর সববই (কারণ) হারাম।
সামা’ (السماع) বা সুরেলা শব্দ শ্রবণ
কখনও সুরেলা ও মুগ্ধকর শব্দ শোনার কারণেও এ ধরনের মত্ততা বা উন্মাদনা সৃষ্টি হতে পারে। এটিও নিন্দনীয়। কারণ, মানুষের জন্য এমন শব্দ শোনা বৈধ নয়, যা শুনতে শরিয়ত তাকে আদেশ দেয় নি অথচ সেটা তার আকলকে লোপ করে দেয়। কেননা আকলবুদ্ধি লোপসাধন স্বয়ং হারাম।
যদি কোনো শরীয়তবিরোধী কারণে কেউ এই অবস্থায় (আকল লোপের) উপনীত হয়, তখন তা হারাম বলে গণ্য হবে। এ অবস্থার মধ্যে যেই আত্মিক বা আধ্যাত্যিক স্বাদ কিংবা আনন্দ হাসিল হয়, এমনকি যদি তার মধ্যে ঈমানের কিছু দিক বিদ্যমান থাকেও, তবু তা আকল লোপ পাওয়ার দরুণ যে ক্ষতি হয় তার তুলনা নস্যি। আল্লাহ আমাদের কলব ও রুহকে এমন কোনো ঈমানী আনন্দ বা স্বাদ গ্রহণের অনুমতি দেননি, যা আমাদের আকলকে লোপ করে দেয়। তবে ঐ ব্যক্তির অবস্থা ভিন্ন, যার আকল কোনো শরীয়তসম্মত কারণের দরুণ অথবা এমন কোনো আকস্মিক কারণে বিলোপ হয়ে গেছে, যা প্রতিরোধ করার কোনো উপায় তার ছিলো না।
কখনো কখনো এমন কারণেও সুকর বা মত্ততা সৃষ্টি হতে পারে, যেখানে বান্দার কোনো হাত থাকে না। যেমন সে এমন কোনো শব্দ বা সুর শুনলো, যা শোনার উদ্দেশ্য তার ছিল না, তা তার অন্তরের গোপন অনুভূতিকে জাগিয়ে তুললো এবং স্থির হৃদয়কে আন্দোলিত করলো, বা অনুরূপ কিছু। এ ক্ষেত্রে তার কোনো দোষ নেই। আর আকল লোপ পাওয়া অবস্থায় তার থেকে যা কিছু প্রকাশ পায়, সে ব্যাপারেও সে ওজরপ্রাপ্য।
কারণ, যার আকল কোনো হারাম কারণে নয় বরং অন্য কারণে লোপ পায়, যেমন অজ্ঞান ব্যক্তি, পাগল ইত্যাদি, তার উপর থেকে কলম উঠিয়ে নেওয়া হয়।
নেশাগ্রস্ত ব্যক্তি কি শরয়ীভাবে দায়বদ্ধ (মুকাল্লাফ)?
মদপানের কারণে যে ব্যক্তির আকল লোপ পেয়েছে, আকল লোপ পাওয়া অবস্থায় সে কি শরয়ীভাবে দায়বদ্ধ (মুকাল্লাফ) থাকবে?
এ বিষয়ে দুটি মশহুর মত রয়েছে।3
এবং এমত অবস্থায় প্রদত্ত তালাক কার্যকর হবে কি না, এ বিষয়েও প্রসিদ্ধ বিবাদ আছে।4
আর “বানজ” (এক প্রকার চেতনানাশক গুল্ম বা ওষুধ) দ্বারা যে ব্যক্তির জ্ঞান হারায়, সে নেশাগ্রস্ত ব্যক্তির হুকুমের মাঝে শামিল হবে। যেমনটি ইমাম শাফেয়ী ও ইমাম আহমদের অনুসারীদের মাঝে কেউ কেউ বলেছেন।
এছাড়া বলা হয়েছে, বানজ ও মদের মাঝে পার্থক্য করা হবে। কারণ মদ কামনা করা হয়, কিন্তু বানজ কামনা করা হয় না। এ কারণেই শরীয়ত মদের ক্ষেত্রে হদ্দ (নির্ধারিত শাস্তি) আরোপ করেছে, কিন্তু বানজের ক্ষেত্রে করেনি। এটিই ইমাম আহমদ থেকে স্পষ্ট বর্ণিত মত এবং ইমাম আবু হানীফার মাযহাব এটাই।
বুদ্ধিমান পাগল (عقلاء المجانين)
এদের মধ্যে এমন লোকও আছে, যার উপর আধ্যাত্মিক প্রতিক্রিয়া (الوارد) এতটাই প্রবল হয়ে আসে যে, সে পাগলসদৃশ হয়ে যায়। কখনও এটি তার উপর চড়াও হওয়া প্রবল বিভ্রান্তি বা বিকারের আধিক্যের কারণে ঘটে, আবার কখনও অন্য কোনো কারণে।
এদের মাঝে এমন কিছু বুদ্ধিমান পাগল (عقلاء المجانين) আছে, যাদেরকে দরবেশদের (নুসসাক) অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য করা হয়। কখনও কখনও তাদেরকে “মুওয়াল্লাহীন” (আধ্যাত্মিকভাবে প্রবল আকর্ষণে আচ্ছন্ন ও উদ্ভান্ত) বলা হয়।
কিছু আলেম তাদের সম্পর্কে বলেছেন: এরা এমন একটি দল, যাদেরকে আল্লাহ আকল ও আহওয়াল (আধ্যাত্মিক অবস্থা) দান করেছেন, এরপর তিনি তাদের আকল উঠিয়ে নিয়েছেন এবং সেই আহওয়ালগুলো সরিয়ে নিয়েছেন, তবে (আকল) উঠিয়ে নেওয়ার দরুণ তাদের উপর যা ফরজ ছিলো তা অবশিষ্ট রেখেছেন।5
কাজেই এই ধরণের আহওয়াল বা অবস্থাগুলো, যেমন অজ্ঞান হয়ে পড়া, মৃত্যুসদৃশ অবস্থা, উন্মাদনা, মদ্যপানের মতো বিভোরতা (সুকর), বা ‘ফানা’ (আত্মবিলোপের অনুভূতি), এমনকি ব্যক্তির স্বীয় অস্তিত্বের অনুভূতি হারিয়ে ফেলা ইত্যাদি, এগুলো যদি শরিয়তসম্মত কারণ থেকে উদ্ভূত হয় এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি যদি সত্যবাদী ও আন্তরিক হয় এবং তা প্রতিরোধে অক্ষম হয়, তবে সে তার অর্জিত নেক আমল এবং ঈমানের জন্য প্রশংসিত হবে আর যে বিষয়ে সে অক্ষম, এবং যা তার ইচ্ছার বাইরে ঘটেছে, সে বিষয়ে সে ওজরপ্রাপ্ত হবে।
এমন লোকেরা তাদের তুলনায় অধিকতর কামেল, যারা তাদের ইমানের ঘাটতি ও অনুরূপ অন্যান্য কারণে এদের স্তরে পৌঁছতে পারে নি। যেমন: আল্লাহ যা ভালোবাসেন তা তারা পরিত্যাগ করে এবং যা অপছন্দ করেন তা তারা করে। (অথচ এই সকল লোকেরা এর বিপরীত।)
(তৃতীয় স্তর:)6 কিন্তু যার আকল অক্ষত থাকে, লোপ পায় না। অথচ সে তাদের সমপরিমাণ ইমান হাসিল করেছে কিংবা তার চেয়েও অধিকতর কামেল ইমান অর্জন করেছে, সে তাদের চেয়ে উত্তম।
এটি সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুমের অবস্থা। এবং এটি আমাদের নবী মুহাম্মাদ সা. -এর অবস্থাও বটে। তিনি মি’রাজের রাতে আসমানে আরোহন করেছিলেন এবং আল্লাহ তাঁকে যা দেখানোর তা দেখিয়েছিলেন, তবুও তিনি সকালে এমন অবস্থায় ফিরে আসেন, যেমনটি আগের রাতে ছিলেন। তার অবস্থায় কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। সুতরাং তাঁর অবস্থা মূসা আ. -এর অবস্থার চেয়ে উত্তম। কারণ মূসা আ. তাঁর প্রভুর তাজাল্লি পাহাড়ের ওপর প্রকাশিত হবার পর অচেতন হয়ে পড়েছিলেন। যদিও মূসা আ. -এর অবস্থা অত্যন্ত সম্মানিত, উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন ও ফজিলতপূর্ণ, তবুও মুহাম্মাদ সা. -এর অবস্থা আরও কামেল, উচ্চতর ও শ্রেষ্ঠ।
উপরের আলোচনার উদ্দেশ্য হলো, এই সব বিষয়, যেগুলোর মধ্যে ইবাদত ও আধ্যাত্মিক অবস্থার (আহওয়ালের) বৃদ্ধির বিষয়টি নিহিত রয়েছে, এসব মূলতো বসরা থেকে প্রসার লাভ করেছিল, কারণ সেখানে আল্লাহভীতির তীব্রতা হাজির ছিলো।
যেমন উতবা আল-গুলাম ও আতা আস-সুলামী এবং তাদের অনুরূপ অন্যদের যে খোদাভীতির বর্ণনা তারা করে, তা সত্যিই বিরাট ব্যাপার। নিঃসন্দেহে তাদের অবস্থা সেই ব্যক্তিদের চেয়ে অধিকতর উত্তম, কামেল ও শ্রেষ্ঠ, যাদের অন্তরে আল্লাহভীতি তাদের সমান কিংবা তাদের চেয়ে বেশি নেই।
ভয়ের ক্ষেত্রে ভারসাম্য (الاقتصاد في الخوف)
যে ব্যক্তি ভারসাম্যপূর্ণভাবে আল্লাহকে ভয় করে, এবং সেই ভয় তাকে আল্লাহর পছন্দের কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করে এবং আল্লাহর অপছন্দের কাজ থেকে বিরত রাখে, এ ধরণের অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি ছাড়া, তবে তার অবস্থা (হাল) অধিক কামেল ও উত্তম। এটি ওই লোকেদের অবস্থার (হাল) চেয়েও উত্তম। আর এটাই ছিলো সাহাবায়ে কেরামের অবস্থা।
বর্ণিত আছে যে, হজরত আতা আস-সুলামী রহ. -কে মৃত্যুর পর স্বপ্নে দেখা গিয়েছিল। তাকে জিজ্ঞেস করা হলো: “আল্লাহ তোমার সাথে কী আচরণ করেছেন?”
তিনি বললেন:
“তিনি আমাকে বললেন: হে আতা, তুমি কি আমার ব্যাপারে এত বেশি ভয় করতে লজ্জাবোধ করোনি? তুমি কি জানতে না যে আমি অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু?”
বসরা ও কুফা
অনুরূপভাবে, এ ধরনের লোকদের ব্যাপারে যে সকল আধ্যাত্মিক অবস্থার (আহওয়াল) বর্ণনা পাওয়া যায়, যেমন তাদের যুহদ (দুনিয়াবিমুখতা), ওয়ারা (পরহেজগারিতা), ইবাদত ইত্যাদি, এসবের মধ্যে কখনও সাহাবায়ে কেরামের অবস্থা এবং রাসূলুল্লাহ সা. এর সুন্নাহর তুলনায় কিছু বিষয়ে অতিরঞ্জন পাওয়া যায়। এই সকল বিষয়ে মানুষ সাধারণত দুটি চরম্পন্থি ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। একদল এসব লোকদের নিন্দা করে এবং তাদেরকে ছোট করে দেখে। কখনও তারা এ বিষয়ে সীমা লঙ্ঘনও করে ফেলে। অন্যদল আবার তাদের প্রশংসায় বাড়াবাড়ি করে ফেলে এবং এই পথকেই সবচে কামেল ও সর্বোচ্চ পথ বলে মনে করে।
প্রকৃত সত্য হলো: এ সকল লোকেরা তাদের ইবাদত ও আধ্যাত্মিক অবস্থাগুলোর (আহওয়াল) ক্ষেত্রে মুজতাহিদ। যেমন তাদের প্রতিবেশী কুফাবাসীরা বিচার-ব্যবস্থা, শাসনকার্য ইত্যাদি বিষয়ে মুজতাহিদ ছিলেন। কুফাবাসীদের মধ্যেও এমন রায় উদ্ভূত হয়েছিলো, যাতে সুন্নাহর বিরোধিতা ছিলো এবং যা অধিকাংশ মানুষ অপছন্দ করতো।
ওই সকল কুফীদের ব্যাপারে আহলুল ফিকহ ওয়ার রায়ের শ্রেষ্ঠ আলেমদের মাঝে দুইটি দল দেখা যায়:
একদল তাদেরকে নিন্দা করে এবং নিন্দায় সীমালঙ্ঘন করে ফেলে। আরেক দল তাদের প্রশংসায় অতিরঞ্জন করে, এমনকি তাদেরকে অন্যদের চেয়ে অধিক ফিকহের জ্ঞান সম্পন্ন মনে করে এবং কখনও কখনও সাহাবায়ে কেরামের উপরও তাদেরকে প্রাধান্য দিয়ে ফেলে। যেমন করে অতিরঞ্জনকারীরা (গুলাত) ওই ইবাদতকারী লোকদেরকে সাহাবাদের উপর প্রাধান্য দিয়ে থাকে। মোটকথা এই বিষয়ে মানুষ নানা ভাগে বিভক্ত।
সর্বোত্তম তরিকা
সঠিক মত হলো: মুসলমানদের জন্য এই বিশ্বাস রাখা কর্তব্য যে, সর্বোত্তম কথা হলো আল্লাহর কালাম, সর্বোত্তম পথ হলো মুহাম্মদ সা. -এর পথ, সর্বোত্তম যুগ হলো সেই যুগ, যেই যুগে তিনি প্রেরিত হয়েছেন, এবং আল্লাহর দিকে পৌঁছানোর সর্বোত্তম পথ হলো সেই পথ, যার উপর তিনি ও তাঁর সাহাবাগণ ছিলেন।
এ থেকে বোঝা যায়, মুমিনদের উপর আবশ্যক হলো নিজেদের সামর্থ্য ও সাধ্য অনুযায়ী আল্লাহকে ভয় করা। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেন:
فَٱتَّقُواْ ٱللَّهَ مَا ٱسْتَطَعْتُمْ
“কাজেই তোমরা আল্লাহকে তোমাদের সাধ্যমত ভয় করো।” [আত-তাগাবুন: ১৬]।
রাসূল সা. বলেন:
وإذا أمرتُكم بأمرٍ فأتوا منه ما استَطَعْتُم.
“আমি যখন তোমাদের কোনো বিষয়ে আদেশ দিই, তখন তোমরা তা থেকে যতটুকু পারো তা পালন করো।”
আল্লাহ তাআলা আরো বলেছেন:
لَا يُكَلِّفُ ٱللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَاۚ
“আল্লাহ কোন ব্যক্তিকে তার সামর্থ্যের বাইরে দায়িত্ব দেন না।” [আল-বাকারা: ২৮৬]
নিঃসন্দেহে অনেক মুমিন, যারা পরহেজগার আল্লাহর ওলি, তারা সাহাবাদের মতো পূর্ণ জ্ঞান ও ঈমানের স্তরে পৌঁছাতে পারেন না। ফলে তারা যতটুকু সম্ভব আল্লাহকে ভয় করে এবং নিজেদের সাধ্য অনুযায়ী তাঁর আনুগত্য করে। এ অবস্থায় তাদের থেকে ভুল হওয়াটা স্বাভাবিক, কখনো জ্ঞান ও বক্তব্যে, আবার কখনো কাজ (আ’মাল) ও আধ্যাত্মিক অবস্থায় (আহওয়াল)। তবুও তারা তাদের আনুগত্যের কারণে সওয়াব পায় এবং তাদের গুনাহ ক্ষমা করা হয়।
আল্লাহ তাআলা বলেছেন:
ءَامَنَ ٱلرَّسُولُ بِمَآ أُنزِلَ إِلَيْهِ مِن رَّبِّهِۦ وَٱلْمُؤْمِنُونَۚ كُلٌّ ءَامَنَ بِٱللَّهِ وَمَلَـٰٓئِكَتِهِۦ وَكُتُبِهِۦ وَرُسُلِهِۦ لَا نُفَرِّقُ بَيْنَ أَحَدٍ مِّن رُّسُلِهِۦۚ وَقَالُواْ سَمِعْنَا وَأَطَعْنَاۖ غُفْرَانَكَ رَبَّنَا وَإِلَيْكَ ٱلْمَصِير لَا يُكَلِّفُ ٱللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَاۚ لَهَا مَا كَسَبَتْ وَعَلَيْهَا مَا ٱكْتَسَبَتْۗ رَبَّنَا لَا تُؤَاخِذْنَآ إِن نَّسِينَآ أَوْ أَخْطَأْنَاۚ
“রাসূল তার নিকট তার রবের পক্ষ থেকে নাজিলকৃত বিষয়ের প্রতি ঈমান এনেছে, আর মুমিনগণও। প্রত্যেকে ঈমান এনেছে আল্লাহর উপর, তাঁর ফেরেশতাকুল, কিতাবসমূহ ও তাঁর রাসূলগণের উপর, আমরা তাঁর রাসূলগণের কারও মধ্যে তারতম্য করি না। আর তারা বলে, আমরা শুনলাম এবং মানলাম। হে আমাদের রব! আমরা আপনারই ক্ষমা প্রার্থনা করি, আর আপনার দিকেই প্রত্যাবর্তনস্থল। আল্লাহ কোন ব্যক্তিকে তার সামর্থ্যের বাইরে দায়িত্ব দেন না। সে যা অর্জন করে তা তার জন্যই এবং সে যা কামাই করে তা তার উপরই বর্তাবে। হে আমাদের রব! আমরা যদি ভুলে যাই, অথবা ভুল করি তাহলে আপনি আমাদেরকে পাকড়াও করবেন না।” [আল-বাকারা: ২৮৫-২৮৬]
এর জবাবে আল্লাহ বলেন: “ঠিক আছে, আমি তা কবুল করলাম।”
অতএব, যে ব্যক্তি কোনো আলেম বা ফকীহের পথকে, অথবা কোনো আবেদ বা দরবেশের পথকে সাহাবাদের পথের চেয়ে উত্তম মনে করে, সে ভুলের মধ্যে আছে, সে পথভ্রষ্ট ও বিদআতী।
অনুরূপভাবে, যে ব্যক্তি আনুগত্য ও ইবাদতের বিষয়ে ইজতিহাদকারী এমন প্রত্যেক ব্যক্তিকে (যে কিছু বিষয়ে ভুল করেছে) সম্পূর্ণভাবে নিন্দিত, ত্রুটিপূর্ণ ও ঘৃণিত মনে করে, সেও ভুলের মধ্যে আছে, সে পথভ্রষ্ট ও বিদআতি।
তাছাড়া মানুষ ভালোবাসা ও ঘৃণা, বন্ধুত্ব ও শত্রুতার ক্ষেত্রেও ইজতিহাদ করে, কখনো তারা সঠিক হয়, কখনো ভুল করে। অনেক মানুষ আছে তারা যখন কারও ভালো দিক জানতে পারে, তখন তাকে সম্পূর্ণভাবে ভালোবাসে এবং তার খারাপ দিক উপেক্ষা করে। আবার যখন কারও খারাপ দিক জানতে পারে, তখন তাকে সম্পূর্ণভাবে ঘৃণা করে এবং তার ভালো দিক উপেক্ষা করে। এটি বিদাতী, খারিজি, মুতাজিলা এবং মুরজিয়াদের কাজ। তারা এসবের কথা বলে।
আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআত বলে: কিতাব, সুন্নাহ এবং ইজমা যে বিষয়ের নির্দেশ করে তা হলো, আল্লাহর ওয়াদা ও তাঁর অনুগ্রহে একজন মুমিন তার নেক আমলের কারণে সওয়াবের যোগ্যও হয়, আবার তার পাপের কারণে শাস্তির যোগ্যও হয়। একই ব্যক্তির মধ্যে এমন বিষয় একত্রিত হতে পারে যার কারণে সে একদিকে পুরস্কৃত হতে পারে এবং অন্যদিকে শাস্তিপ্রাপ্ত হতে পারে। একদিকে প্রশংসিত হতে পারে, অন্যদিকে নিন্দিত হতে। একদিকে ভালোবাসা পেতে পারে, আবার ঘৃণিতও হতে পারে। এটাই বাস্তব সত্য।
সিদ্দীকগণ
এটা যেহেতু জানা কথা যে, বসরা ছিলো তাসাউফের উৎসস্থল, সেখানে এমন কিছু মানুষ ছিলেন যারা ইবাদত ও যুহদের পথে এমন কিছু বিষয় অনুসরন করতেন, যেখানে তারা ইজতিহাদ করতেন, যেমন দেখা যায় কুফায়ও এমন লোক ছিলেন, যারা ফিকহ ও ইলমের পথে এমন কিছু বিষয় অনুসরণ করতেন, যেখানে তারা ইজতিহাদ করতেন। বসরার এই লোকগুলোকে একটি বাহ্যিক পোশাকের দিকে সম্পৃক্ত করা হতো, আর তা হলো পশমি পোশাক (লিবাসুস সূফ), সে জন্য তাদের কাউকে সূফি বলা হতো। তবে তাদের তরিকা বা পন্থা পশমি পোশাক পরিধানের সাথে শর্তযুক্ত ছিলো না, এবং তারা এটাকে আবশ্যকও করেননি বা এর নির্দেশও দেননি। বরং তাদের বাহ্যিক অবস্থার কারণে তাদেরকে এই নামে সম্বোধন করা হতো।
এছাড়া তাদের নিকট তাসাওউফের কিছু সুপরিচিত হাকীকত ও আধ্যাত্মিক অবস্থা (আহওয়াল) রয়েছে। তারা তাসাউফের সংজ্ঞা, পদ্ধতি ও ধরণ সম্পর্কে আলোচনা করেছেন।
যেমন তাদের কেউ বলেছেন:
“সূফি সেই ব্যক্তি, যে পঙ্কিলতা (অপবিত্রতা) থেকে পরিশুদ্ধ হয়েছে, (যার অন্তর আল্লাহর) চিন্তায় পরিপূর্ণ হয়েছে, এবং যার কাছে স্বর্ণ ও পাথর সমান।”
আবার বলা হয়েছে:
“তাসাওউফ হলো অন্তরের আধ্যাত্মিক অবস্থা বা অনুভূতিগুলো গোপন রাখা এবং নিজের ব্যাপারে (অহমিকামূলক) দাবি এবং অনুরূপ বিষয় ত্যাগ করা।”
তারা সূফি শব্দ দ্বারা মূলত সিদ্দীকের অর্থ উদ্দেশ্য করে থাকে। আর নবীদের পরে সৃষ্টির মধ্যে সর্বোত্তম হলেন সিদ্দীকগণ। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন:
فَأُوْلَـٰٓئِكَ مَعَ ٱلَّذِينَ أَنْعَمَ ٱللَّهُ عَلَيْهِم مِّنَ ٱلنَّبِيِّــۧنَ وَٱلصِّدِّيقِينَ وَٱلشُّهَدَآءِ وَٱلصَّـٰلِحِينَۚ وَحَسُنَ أُوْلَـٰٓئِكَ رَفِيقًا.
“তারা তাদের সাথে থাকবে, আল্লাহ যাদের উপর অনুগ্রহ করেছেন নবী, সিদ্দীক, শহীদ ও সৎকর্মশীলদের মধ্য থেকে। আর সাথী হিসেবে তারা হবে উত্তম।” [আন-নিসা: ৬৯]
এ কারণেই তাদের মতে নবীদের পরে সূফিদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ আর কেউ নেই। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সূফি হলেন সিদ্দীকদেরই একটি শ্রেণি। অর্থাৎ তারা এমন সিদ্দীক, যারা নিজেদের ইজতিহাদ অনুযায়ী যুহদ (দুনিয়াবিমুখতা) ও ইবাদতে বিশেষভাবে আত্মনিয়োগ করেছেন। যেনো তিনি এ বিশেষ পথের (তথা তাসাউফের) একজন সিদ্দীক। যেমন বলা হয় “আলেমদের সিদ্দীক (সিদ্দীকুল ওলামা)” অথবা “শাসকদের সিদ্দীক (সিদ্দীকুল উমারা)”। সুতরাং তিনি সাধারণ সিদ্দীক (সিদ্দিকে মুতলাক) এর তুলনায় বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন, তবে সেই কামেল সিদ্দীকদের স্তরের নিচের স্তরে তার অবস্থান, যাদের সিদ্দীকিয়্যাত পূর্ণতা লাভ করেছে। আর তারা হলেন সাহাবিগণ, তাবিয়ীগণ এবং তাবে-তাবিয়ীগণ।
অতএব, যখন বসরার এসব যাহিদ ও আবিদদের ব্যাপারে বলা হয় যে তারা “সিদ্দীক”, তখন তা ঠিক তেমনি, যেমন কুফার ফকিহ ও ইমামদের সম্পর্কেও বলা হয় যে তারা “সিদ্দীক”। তাদের প্রত্যেকেই আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্যের যে পথ নিজেদের ইজতিহাদ অনুযায়ী অনুসরণ করেছেন, সে অনুযায়ী সিদ্দীক হিসেবে গণ্য হন। কখনও কখনও তারা নিজেদের যুগের সর্বশ্রেষ্ঠ সিদ্দীকদের অন্তর্ভুক্তও হতে পারেন। ফলে তারা তাদের সময়ের সর্বাধিক কামেল সিদ্দীক বলে বিবেচিত হন। তবে প্রথম যুগের সিদ্দীকগণ তাদের চেয়ে অধিক কামেল বা পূর্ণতর ছিলেন।
সিদ্দীকদের বিভিন্ন স্তর থাকে
সিদ্দীকদের অনেকগুলো স্তর ও প্রকার রয়েছে। এ কারণেই তাদের প্রত্যেকের এমন একটি বিশেষ আধ্যাত্মিক অবস্থা (হাল) ও ইবাদতের ধরন (صنف) থাকে, যা তিনি অপরিহার্য করে নেন, নিখুঁতভাবে পালন করেন এবং তা আয়ত্ত করেন। যদিও অন্য কোনো ধরণের (صنف) ক্ষেত্রে অন্য অনেকে থাকতে পারেন, যারা কিনা তার চাইতে অধিক কামেল ও শ্রেষ্ঠ।
তাদের অনেকের মাঝে ইজতিহাদ ও তা নিয়ে মতভেদের কারণে মানুষেরা তাদের তরিকা বা পন্থা সম্পর্কে মতভেদে লিপ্ত হয়েছে। একদল লোক সূফিগণ ও তাসাওউফের নিন্দা করেছে এবং বলেছে: তারা বিদআতী, সুন্নাহ থেকে বিচ্যুত।
এ বিষয়ে এক দল ইমাম থেকে বহু পরিচিত বক্তব্য নকলকৃত হয়েছে, এবং আহলুল ফিকহ ওয়াল কালামদের বহু দল এ ক্ষেত্রে তাদের অনুসরণ করেছে।
অন্যদিকে আরেক দল তাদের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করেছে এবং দাবি করেছে যে নবীদের পরে তারাই সৃষ্টির মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বাধিক কামেল।
এই ক্ষেত্রে দুই পক্ষের চরমপন্থাই নিন্দনীয়।
সঠিক মত হলো, তারা আল্লাহর ইবাদত ও আনুগত্যের ক্ষেত্রে ইজতিহাদকারী মানুষ, যেভাবে আল্লাহর আনুগত্যশীল অন্যান্য লোকেরা ইজতিহাদ করে থাকে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ নিজ নিজ ইজতিহাদের পরিমাণ অনুযায়ী অগ্রগামী ও আল্লাহর নৈকট্যশীল। আবার তাদের মধ্যে কেউ আছে মধ্যমপন্থী, যারা আহলুল ইয়ামিন বা ডানপন্থীদের অন্তর্ভুক্ত।
উভয় শ্রেণির মধ্যেই এমন লোকজন রয়েছে, যারা ইজতিহাদ করতে গিয়ে ভুল করে। আবার এমনও রয়েছে, যারা গুনাহ করে, তারপর তওবা করে অথবা তওবা করে না। আর তাদের সাথে নিজেদেরকে সম্পর্কযুক্ত করা এমন কিছু লোকও আছে, যারা নিজেদের ওপর জুলুম করে এবং নিজেদের প্রতিপালকের অবাধ্য।
তাসাউফে অনুপ্রবেশকারী যিন্দীকগণ
বিদআতী ও যিন্দীকদের কিছু দলও নিজেদেরকে সূফিদের সাথে সম্পৃক্ত করেছে। কিন্তু তাসাউফের বিশুদ্ধ ধারার আলেমদের মতে তারা প্রকৃত সূফিদের অন্তর্ভুক্ত নয়, যেমন মানসুর আল-হাল্লাজ।7 তাসাউফের অধিকাংশ শায়খ তাকে অস্বীকার করেছেন এবং তাকে এ পথ থেকে খারিজ করে দিয়েছেন, যেমন আল-জুনাইদ ইবনু মুহাম্মদ, যিনি সাইয়েদুত তাইফা (سيد الطائفة) হিসেবে পরিচিত ছিলেন, এছাড়াও আরও অনেকে। যেমনটি উল্লেখ করেছেন আবু আবদুর রহমান আস-সুলামী তাঁর “তাবাকাতুস সুফিয়্যাহ” কিতাবে। এছাড়াও হাফেজ আবু বকর আল-খতীব আল-বাগদাদী তাঁর “তারীখু বাগদাদ” কিতাবে এটি উল্লেখ করেছেন।
সূফিদের বিভিন্ন শ্রেণি
এটাই ছিলো তাসাওউফের মূল। পরে তা বিভিন্ন শাখা ও প্রকারে বিভক্ত হয়ে যায়। ফলে সূফিরা তিন প্রকারে পরিণত হয়:
(১) হাকিকতের সুফি (صوفية الحقائق): যারা আল্লাহর মারিফাত ও আধ্যাত্মিক সত্যের অধিকারী।
(২) রিযিকভোগী সুফি (صوفية الأرزاق): যারা জীবিকা ও দুনিয়াবি সুবিধার উদ্দেশ্যে সুফিবাদের সাথে যুক্ত।
(৩) রসমী সুফি (صوفية الرسم): যারা কেবল বাহ্যিক রীতি-নীতি ও আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ।
হাকিকতের সুফি, এরা হলো সেইসব সুফি, আমরা যাদের বর্ণনা পূর্বে করেছি।
রিযিকভোগী সুফি, এরা হলো তারা যাদের জন্য খানকাহ বা ইত্যাদির ওয়াকফ ও অনুদান নির্ধারিত থাকে। এদের জন্য হাকীকতের অধিকারী হওয়া শর্ত নয়, কারণ প্রকৃত হাকীকতের অধিকারী মানুষ খুবই বিরল। বরং অধিকাংশ আহলে হাকীকত সাধারণত খানকাহকেন্দ্রিক পরিচয়ে পরিচিত হন না।
তবে এই শ্রেণীর মধ্যে তিনটি শর্ত থাকা আবশ্যক:
প্রথম শর্ত হলো: শরয়ী আদালত (integrity) থাকা। অর্থাৎ ফরজসমূহ আদায় করা এবং হারাম বিষয়গুলো থেকে বেঁচে থাকা।
দ্বিতীয় শর্ত হলো: আহলে তরিকত তথা হকপন্থী সুফিদের তরিকার আদবসমূহ মেনে চলা। আর এ আদব বলতে অধিকাংশ সময় শরিয়তসম্মত আদবই উদ্দেশ্য। পক্ষান্তরে, বিদআতভিত্তিক ও মনগড়া আদবের প্রতি কোনো গুরুত্ব দেওয়া যাবে না।
তৃতীয় শর্ত হলো: তাদের কেউই অতিরিক্ত দুনিয়াবি সম্পদ ও ভোগ-বিলাসের প্রতি আসক্ত হবে না। সুতরাং যে ব্যক্তি সম্পদ সঞ্চয়ে লিপ্ত, অথবা উত্তম চরিত্র হাসিল করেনি, শরিয়তসম্মত আদব মেনে চলে না, কিংবা ফাসিক, সে এ মর্যাদার উপযুক্ত হবে না।
আর রসমি বা বাহ্যিক সূফি বলতে বুঝায়, যারা শুধু সুফি পরিচয়ের সাথে সম্পৃক্ত করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। তাদের চিন্তার কেন্দ্রতে থাকে বিশেষ লেবাস, কতগুলো মনগড়া আদব কায়দা কিংবা অনুরূপ বিষয়াদি। সূফিদের মধ্যে এদের অবস্থা ঠিক তাদের মতো, যারা কেবল আলেম বা মুজাহিদদের পোশাক-পরিচ্ছদ, কিছু কথা ও কিছু কাজ অনুকরণের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকে। যার ফলে অজ্ঞ লোকেরা ধারণা করে, বোধ হয় প্রকৃতপক্ষে তারা ঐ শ্রেণির লোক, অথচ বাস্তবে তারা তাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।
কুরআনে ফকির8 শব্দের ব্যবহার
“ফকির” শব্দটি আল্লাহর কিতাব ও রাসূলুল্লাহ সা. এর সুন্নাহতে এসেছে। তবে কুরআন ও সুন্নাহতে এ শব্দ দ্বারা সেই ফকিরকেই ব্যক্তিকেই বোঝানো হয়েছে, যে ধনীর বিপরীত।
ফকীর ও ফকিরির বিভিন্ন প্রকার আছে। এর মধ্যে এমন ফকিরি (দারিদ্র) আছে, যার কারণে যাকাত গ্রহণ করা বৈধ হয়। আর এর বিপরীত হলো এমন সম্পদশালী হওয়া (غنى), যা যাকাত গ্রহণকে নিষিদ্ধ করে। যেমন নবী সা. বলেছেন:
لا تَحِلُّ الصَّدَقةُ لغَنيٍّ ولا لقَويٍّ مُكتَسِبٍ
“ধনী ব্যক্তি এবং উপার্জনে সক্ষম শক্তিশালী ব্যক্তির জন্য সদকা (যাকাত) হালাল নয়।”
আর অধিকাংশ আলেমের মতে, যে সম্পদশালী হওয়াটা (غنى) যাকাত ফরজ করে, তা এর থেকে ভিন্ন। যেমন ইমাম মালিক ইবনে আনাস, আশ-শাফিঈ এবং আহমদ ইবন হাম্বলের মত। তাদের মতে, নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়াই যাকাত ফরজ হওয়ার কারণ। এ কারণে তাদের মতে এমনও হতে পারে যে, কোনো ব্যক্তির ওপর যাকাত ফরজ হয়েছে, অথচ তার জন্য যাকাত গ্রহণ করাও বৈধ। এটি ইমাম আবু হানিফার মতের বিপরীত।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা কুরআনের বিভিন্ন স্থানে ফকীরদের কথা উল্লেখ করেছেন। তবে যাকাত পাওয়ার উপযুক্ত ফকীরদের কথা এক আয়াতে এবং ‘ফাই’ এর উপযুক্ত ফকীরদের কথা আরেক আয়াতে উল্লেখ করেছেন।
প্রথম আয়াতে আল্লাহ বলেন:
إِن تُبْدُواْ ٱلصَّدَقَـٰتِ فَنِعِمَّا هِىَۖ وَإِن تُخْفُوهَا وَتُؤْتُوهَا ٱلْفُقَرَآءَ فَهُوَ خَيْرٌ لَّكُمْۚ وَيُكَفِّرُ عَنكُم مِّن سَيِّـَٔـاتِكُمْۗ وَٱللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرٌ لَّيْسَ عَلَيْكَ هُدَٮٰهُمْ وَلَـٰكِنَّ ٱللَّهَ يَهْدِى مَن يَشَآءُۗ وَمَا تُنفِقُواْ مِنْ خَيْرٍ فَلِأَنفُسِكُمْۚ وَمَا تُنفِقُونَ إِلَّا ٱبْتِغَآءَ وَجْهِ ٱللَّهِۚ وَمَا تُنفِقُواْ مِنْ خَيْرٍ يُوَفَّ إِلَيْكُمْ وَأَنتُمْ لَا تُظْلَمُونَ لِلْفُقَرَآءِ ٱلَّذِينَ أُحْصِرُواْ فِى سَبِيلِ ٱللَّهِ لَا يَسْتَطِيعُونَ ضَرْبًا فِى ٱلْأَرْضِ يَحْسَبُهُمُ ٱلْجَاهِلُ أَغْنِيَآءَ مِنَ ٱلتَّعَفُّفِ تَعْرِفُهُم بِسِيمَـٰهُمْ لَا يَسْــَٔلُونَ ٱلنَّاسَ إِلْحَافًاۗ
“তোমরা যদি সদাকা প্রকাশ কর, তবে তা উত্তম। আর যদি তা গোপন কর এবং ফকীরদেরকে তা দাও, তাহলে তাও তোমাদের জন্য উত্তম এবং তিনি তোমাদের গুনাহসমূহ মুছে দেবেন। আর তোমরা যে আমল কর, আল্লাহ সে সম্পর্কে সম্যক অবহিত। তাদেরকে হিদায়াত করার দায়িত্ব তোমার নয়, কিন্তু আল্লাহ যাকে চান হিদায়াত করেন এবং তোমরা যে সম্পদ ব্যয় কর, তা তোমাদের নিজদের জন্যই। আর তোমরা তো আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে ব্যয় কর এবং তোমরা কোন উত্তম ব্যয় করলে তা তোমাদেরকে পরিপূর্ণভাবে দেয়া হবে। আর তোমাদের প্রতি যুলম করা হবে না। (সদাকা) সেসব দরিদ্রের জন্য যারা আল্লাহর রাস্তায় আটকে গিয়েছে, তারা যমীনে চলতে পারে না। না চাওয়ার কারণে অনবগত ব্যক্তি তাদেরকে অভাবমুক্ত মনে করে। তুমি তাদেরকে চিনতে পারবে তাদের চিহ্ন দ্বারা। তারা মানুষের কাছে নাছোড় হয়ে চায় না।” [বাকারা: ২৭১-২৭৩]
আর দ্বিতীয় আয়াতে আল্লাহ বলেন:
مَّآ أَفَآءَ ٱللَّهُ عَلَىٰ رَسُولِهِۦ مِنْ أَهْلِ ٱلْقُرَىٰ فَلِلَّهِ وَلِلرَّسُولِ وَلِذِى ٱلْقُرْبَىٰ وَٱلْيَتَـٰمَىٰ وَٱلْمَسَـٰكِينِ وَٱبْنِ ٱلسَّبِيلِ كَىْ لَا يَكُونَ دُولَةًۢ بَيْنَ ٱلْأَغْنِيَآءِ مِنكُمْ ۚ وَمَآ ءَاتَىٰكُمُ ٱلرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَىٰكُمْ عَنْهُ فَٱنتَهُوا۟ ۚ وَٱتَّقُوا۟ ٱللَّهَ ۖ إِنَّ ٱللَّهَ شَدِيدُ ٱلْعِقَابِ لِلْفُقَرَآءِ ٱلْمُهَـٰجِرِينَ ٱلَّذِينَ أُخْرِجُوا۟ مِن دِيَـٰرِهِمْ وَأَمْوَٰلِهِمْ يَبْتَغُونَ فَضْلًۭا مِّنَ ٱللَّهِ وَرِضْوَٰنًۭا وَيَنصُرُونَ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥٓ ۚ أُو۟لَـٰٓئِكَ هُمُ ٱلصَّـٰدِقُونَ
“এসব জনপদের দখলমুক্ত করে যে জিনিসই আল্লাহ তাঁর রসূলকে ফিরিয়ে দেন তা আল্লাহ, রসূল, আত্মীয়স্বজন, ইয়াতীম, মিসকীন এবং মুসাফিরদের জন্য। যাতে তা তোমাদের সম্পদশালীদের মধ্যেই কেবল আবর্তিত হতে না থাকে। রসূল যা কিছু তোমাদের দেন তা গ্রহণ করো এবং যে জিনিস থেকে তিনি তোমাদের বিরত রাখেন তা থেকে বিরত থাকো। আল্লাহকে ভয় করো। আল্লাহ কঠোর শাস্তিদাতা। (তাছাড়াও এ সম্পদ) সেই সব গরীব মুহাজিরদের জন্য যারা নিজেদের ঘর-বাড়ী ও বিষয়-সম্পদ থেকে বহিষ্কৃত হয়েছে। ১৬ এসব লোক চায় আল্লাহর মেহেরবানী এবং সন্তুষ্টি। আর প্রস্তুত থাকে আল্লাহ ও তার রসূলকে সাহায্য সহযোগিতা করার জন্য। এরাই হলো সত্যবাদী ও ন্যায়পরায়ণ লোক।” [হাশর: ৭-৮]
সবরকারী ফকির ও শোকরকারী ধনী
এই ফকিরদের মধ্যে এমন ব্যক্তিও থাকতে পারে, যারা অনেক ধনী ব্যক্তির চেয়ে উত্তম। আবার ধনীদের মধ্যেও এমন ব্যক্তি থাকতে পারে, যারা তাদের অনেকের চেয়ে উত্তম। তাই মানুষ এ বিষয়ে মতভেদ করেছে যে, তাদের মাঝে কে উত্তম? সবরকারী ফকির ও শোকরকারী ধনী!
সঠিক মত হলো, তাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি, যে তাদের মাঝে সবচে বেশি তাকওয়াবান। যদি তাকওয়ার ক্ষেত্রে তারা সমান হয়, তবে মর্যাদার ক্ষেত্রেও তারা সমান হবে, যেমনটি আমরা অন্যত্র ব্যাখ্যা করেছি। তবে, ফকিররা ধনীদের আগে জান্নাতে প্রবেশ করবে, কারণ তাদের হিসাব নেই। কিন্তু ধনীদের হিসাব নেওয়া হবে। যার নেক আমল কোনো ফকির আদমির নেক আমলের চেয়ে বেশি হবে, জান্নাতে তার মর্যাদা উচ্চতর হবে, যদিও সে পরে প্রবেশ করবে। আর যার নেক আমল কম হবে, তার মর্যাদাও তার চেয়ে নিম্নতর হবে।
যুহদ ও ফকিরি
কিন্তু যেহেতু যুহদের বিষয়টি ফকিরি বা দারিদ্র্যের ক্ষেত্রে অধিক সম্পর্কযুক্ত, তাই অনেকের পরিভাষায় ফিকিরি পরিণত হয়েছে একটি যুহদের পথ বা পন্থা হিসেবে, যা মূলত তাসাউফেরই অন্তর্ভুক্ত।
যদি বলা হয়, “এর মধ্যে ফকিরি আছে” বা “ফকিরি নেই”, তাহলে এখানে ফকিরি বলতে সম্পদ না থাকা বোঝানো হয় না, বরং এর দ্বারা সেই অর্থই উদ্দেশ্য, যা ‘সূফী’ শব্দের মাধ্যমে বুঝানো হয়, যেমন মারেফত, আহওয়াল, আখলাক, আদব ইত্যাদি।
ফকির ও সূফী
এই পরিভাষার ভিত্তিতে আলেমগণ মতভেদ করেছেন, তাদের মধ্যে কে উত্তম: ফকির নাকি সূফী?
একদল সূফীকে উত্তম বলেছেন, যেমন শিহাবুদ্দিন আবু হাফস আস-সুহরাওয়ার্দী প্রমুখ। আবার আরেকদল ফকিরকে উত্তম বলেছেন, আর এ মত বহু দলের মাঝেই প্রচলিত। কখনো কখনো একটা দল যাওয়িয়া কেন্দ্রিক হবার দরুন একটা নামে পরিচিত হতো, আরেকদল খানকাহ কেন্দ্রিক হওয়ায় অন্য নামে পরিচিত হতো। আর অধিকাংশ মানুষ ফকির পরিচয়কেই অধিক প্রাধান্য দিয়েছেন।
অলি আউলিগণ
সুনির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে, এ দুইজনের মধ্যে সেই ব্যক্তিই শ্রেষ্ঠ, যে অধিক তাকওয়াবান। অতএব, যদি কোনো সুফি আল্লাহভীতিতে অধিক অগ্রসর হয়, তবে সে অন্যজনের তুলনায় শ্রেষ্ঠ হবে। আর তা হবে এভাবে যে, সে আল্লাহ যেসব কাজ ভালোবাসেন সেগুলো অধিক পরিমাণে পালন করে এবং যেসব বিষয় তিনি অপছন্দ করেন সেগুলো অধিকভাবে পরিত্যাগ করে। এ অবস্থায় সে ফকিরের তুলনায় উত্তম হবে।
যদি উভয় ব্যক্তিই আল্লাহর পছন্দনীয় কাজ সম্পাদনে ও অপছন্দনীয় কাজ বর্জনের ক্ষেত্রে সমান হয়, তবে তারা উভয়েই মর্যাদার দিক থেকে সমান হবে।
আল্লাহর ওলি হলেন তারা যারা মুত্তাকি মুমিন বান্দা। তাদেরকে কেউ ফকির, কেউ সূফী, কেউ ফকিহ, কেউ আলেম, কেউ ব্যবসায়ী, কেউ সৈনিক, কেউ কারিগর, কেউ শাসক, কেউ হাকিম অথবা অন্য যেকোনো নামে অভিহিত করা হোক না কেনো।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
أَلَآ إِنَّ أَوْلِيَآءَ ٱللَّهِ لَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ وَكَانُواْ يَتَّقُونَ
“জেনে রেখ, আল্লাহর ওয়ালিদের কোন ভয় নেই আর তারা দুঃখিতও হবে না। যারা ঈমান আনে আর তাকওয়া অবলম্বন করে।” [ইউনুস: ৬২-৬৩]
সহিহ বুখারিতে আবু হুরাইরা রাযি. হতে বর্ণিত আছে, নবী সা. বলেন: আল্লাহ তাআলা বলেন:
“যে ব্যক্তি আমার কোনো ওলির সঙ্গে শত্রুতা পোষণ করে, সে যেনো আমার মুখামুখি যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। আমার বান্দা আমি তার উপর যা ফরজ করেছি তার অনুরূপ অন্য কিছু দ্বারা আমার নৈকট্য অর্জন করতে পারে না। আর আমার বান্দা নফল ইবাদতের মাধ্যমে আমার নিকটবর্তী হতে থাকে, যতক্ষণ না আমি তাকে ভালোবাসি। যখন আমি তাকে ভালোবাসি, তখন আমি তার কান হয়ে যাই, যার মাধ্যমে সে শোনে। তার চোখ হয়ে যাই, যার মাধ্যমে সে দেখে। তার হাত হয়ে যাই, যার মাধ্যমে সে ধরে। এবং তার পা হয়ে যাই, যার মাধ্যমে সে চলে। ফলে আমার জন্যই সে শোনে, আমার জন্যই সে দেখে, আমার জন্যই ধরে এবং আমার জন্যই চলে। যদি সে আমার কাছে কিছু চায়, আমি অবশ্যই তাকে দান করি, যদি সে আমার আশ্রয় চায়, আমি অবশ্যই তাকে আশ্রয় দিই। আমি কোনো কাজ করতে এত দ্বিধা করি না যতটা আমার মুমিন বান্দার জান কবজ করতে দ্বিধা করি, সে মৃত্যুকে অপছন্দ করে, আর আমি তাকে কষ্ট দিতে অপছন্দ করি। কিন্তু তার জন্য মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী।”
এই হাদিসে আল্লাহর ওলিদের বিভিন্ন শ্রেণীর বর্ণনা করা হয়েছে, যেমন মুকতাসিদ (মধ্যপন্থী), আসহাবুল ইয়ামীন (ডানের লোক), মুকাররাবীন (নিকটবর্তী), এবং সাবিকীন (অগ্রগামী)। প্রথম শ্রেণি হলো তারা, যারা ফরজ ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর নিকটবর্তী হয়। দ্বিতীয় শ্রেণি হলো তারা, যারা ফরজের পর নফল ইবাদতের মাধ্যমে তাঁর নিকটবর্তী হয়। তারা অবিরত নফল ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর ভালোবাসা অর্জন করে।
যেমনটি আল্লাহ তাআলা বলেছেন, আর এ দুই শ্রেণির কথা আল্লাহ তাঁর কিতাবে বিভিন্ন স্থানে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন:
ثُمَّ أَوْرَثْنَا ٱلْكِتَـٰبَ ٱلَّذِينَ ٱصْطَفَيْنَا مِنْ عِبَادِنَاۖ فَمِنْهُمْ ظَالِمٌ لِّنَفْسِهِۦ وَمِنْهُم مُّقْتَصِدٌ وَمِنْهُمْ سَابِقُۢ بِٱلْخَيْرَٲتِ.
“অতঃপর আমি এ কিতাবটির উত্তরাধীকারী করেছি আমার বান্দাদের মধ্যে তাদেরকে, যাদেরকে আমি মনোনীত করেছি। তারপর তাদের কেউ কেউ নিজের প্রতি যুলমকারী এবং কেউ কেউ মধ্যপন্থা অবলম্বনকারী। আবার তাদের কেউ কেউ কল্যাণকর কাজে অগ্রগামী।” [ফাতির: ৩২]
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন:
إِنَّ ٱلْأَبْرَارَ لَفِى نَعِيمٍ عَلَى ٱلْأَرَآئِكِ يَنظُرُونَ تَعْرِفُ فِى وُجُوهِهِمْ نَضْرَةَ ٱلنَّعِيمِ يُسْقَوْنَ مِن رَّحِيقٍ مَّخْتُومٍ خِتَـٰمُهُۥ مِسْكٌۚ وَفِى ذَٲلِكَ فَلْيَتَنَافَسِ ٱلْمُتَنَـٰفِسُونَ وَمِزَاجُهُۥ مِن تَسْنِيمٍ عَيْنًا يَشْرَبُ بِهَا ٱلْمُقَرَّبُونَ
“নিশ্চয় নেককাররাই থাকবে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের মধ্যে। সুসজ্জিত আসনে বসে তারা দেখতে থাকবে। তুমি তাদের চেহারাসমূহে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের লাবণ্যতা দেখতে পাবে। তাদেরকে সীলমোহর করা বিশুদ্ধ পানীয় থেকে পান করানো হবে। তার মোহর হবে মিসক। আর প্রতিযোগিতাকারীদের উচিৎ এ বিষয়ে প্রতিযোগিতা করা। আর তার মিশ্রণ হবে তাসনীম থেকে। তা এক ঝর্ণা, যা থেকে নৈকট্যপ্রাপ্তরা পান করবে।” [আল-মুতাফফিফিন: ২২-২৮]
হজরত ইবনে আব্বাস রাযি. বলেছেন: “মুকাররাবীন বান্দারা তা (তাসনিম ঝর্ণা) থেকে সরাসরি পান করবে। আর আসহাবুল ইয়ামীন (ডান দিকের লোকেরা) তা (রাহিকের সাথে) মিশ্রিত অবস্থায় পান করবে।”
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَيُسْقَوْنَ فِيهَا كَأْسًا كَانَ مِزَاجُهَا زَنجَبِيلاً عَيْنًا فِيهَا تُسَمَّىٰ سَلْسَبِيلاً
“সেখানে তাদেরকে পান করানো হবে পাত্রভরা আদা-মিশ্রিত সুরা, সেখানকার এক ঝর্ণা যার নাম হবে সালসাবীল।” [আল-ইনসান: ১৭-১৮]
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন:
فَأَصْحَـٰبُ ٱلْمَيْمَنَةِ مَآ أَصْحَـٰبُ ٱلْمَيْمَنَةِ وَأَصْحَـٰبُ ٱلْمَشْــَٔمَةِ مَآ أَصْحَـٰبُ ٱلْمَشْــَٔمَةِ وَٱلسَّـٰبِقُونَ ٱلسَّـٰبِقُونَ أُوْلَـٰٓئِكَ ٱلْمُقَرَّبُونَ
“সুতরাং ডান পার্শ্বের দল, ডান পার্শ্বের দলটি কত সৌভাগ্যবান! আর বাম পার্শ্বের দল, বাম পার্শ্বের দলটি কত হতভাগ্য! আর অগ্রগামীরাই অগ্রগামী। তারাই মুকাররাবুন।” [আল-ওয়াকিয়াহ: ৮-১১]
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন:
فَأَمَّآ إِن كَانَ مِنَ ٱلْمُقَرَّبِينَ فَرَوْحٌ وَرَيْحَانٌ وَجَنَّتُ نَعِيمٍ وَأَمَّآ إِن كَانَ مِنْ أَصْحَـٰبِ ٱلْيَمِي وَأَمَّآ إِن كَانَ مِنْ أَصْحَـٰبِ ٱلْيَمِينِ فَسَلَـٰمٌ لَّكَ مِنْ أَصْحَـٰبِ ٱلْيَمِينِ.
“অতঃপর সে যদি নৈকট্যপ্রাপ্তদের অন্যতম হয়, তবে তার জন্য থাকবে বিশ্রাম, উত্তম জীবনোপকরণ ও সুখময় জান্নাত। আর সে যদি হয় ডানদিকের একজন, তবে (তাকে বলা হবে), ‘তোমাকে সালাম, যেহেতু তুমি ডানদিকের একজন’।” [আল-ওয়াকিয়াহ: ৮৮-৯১]
এই রিসালায় এমন কিছু বিষয় আছে, যেগুলোর বিস্তারিত ব্যাখ্যা ও দীর্ঘ আলোচনার দাবি রাখে, যা এখানে বিস্তৃতভাবে উপস্থাপন করা সম্ভব নয়। আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞাত।
হাল ও মাকাম বিষয়ে ইমাম ইবনুল কাইয়িম রহ.9
সুলুক (আল্লাহর পথে আত্মিক সফর)-এর অধিকারীদের মধ্যে মাকামসমূহের (আত্মিক স্তরসমূহের) সংখ্যা ও ক্রমবিন্যাস নিয়ে অনেক মতভেদ রয়েছে। প্রত্যেকে তার আত্মিক সফরের মঞ্জিল বা স্তরসমূহ ও সুলুকের অবস্থা বর্ণনা করেছেন। তারা আত্মিক সফরের কিছু মনজিল বা স্তর সম্পর্কে এ বিষয়ে মতভেদ করেছেন, যে, সেগুলো কি আহওয়াল (আত্মিক অবস্থা)-এর অন্তর্ভুক্ত কিনা?
মাকাম (আধ্যাত্মিক স্তর) ও হাল (আধ্যাত্মিক অবস্থা) এর মধ্যে পার্থক্য হলো: মাকাম হলো অর্জিত (কাসবী) আর হাল হলো ঐশ্বরিকভাবে প্রদত্ত (ওহবী)।
কিছু সুফি বলেন, আহওয়াল মাকামের ফল; আর মাকাম হলো আমলের ফল। সুতরাং যেই স্বীয় আমলকে সংশোধন করবে, আমলে উন্নতি সাধন করবে, তার মাকাম তত উচ্চ হবে; আর যার মাকাম যত উচ্চ, তার হালও তত মহান হবে।
তারা যে বিষয়গুলো নিয়ে এখতেলাফ করেছেন, তার মধ্যে অন্যতম হলো রিদা (আল্লাহর তিক্ত ফয়সালার উপর অন্তরের সন্তুষ্টি) কি হাল, নাকি মাকাম?
এ বিষয়ে খোরাসানের সুফিগণ ও ইরাকের সুফিগণের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
কিছু শায়খ এভাবে একটা সুরাহা করেছেন যে, রিদা যদি কাসবের মাধ্যমে হাসিল হয়, তবে তা মাকাম। তা না হলে (অর্থাৎ ঐশ্বরিকভাবে প্রাপ্ত হলে) সেটা হাল।
তবে এক্ষেত্রে সঠিক হল হলো, ওয়ারিদাত (আল্লাহর পক্ষ থেকে আগত আধ্যাত্মিক প্রেরণা) ও মুনাজালাত (রুহানি অবতরণসমূহ) গুলো তাদের বিভিন্ন অবস্থার ভিত্তিতে বিভিন্ন নামে পরিচিত হয়।
এসব যখন প্রথম প্রকাশ পেতে শুরু করে, তখন সেগুলোকে বলা হয় লাওয়ামি’ (ঝলক), বাওয়ারিক (বিদ্যুতের ঝলকানি) এবং লাওয়াইহ (দূর থেকে দৃশ্যমান আভাস)। যেমন দূর থেকে বিদ্যুতের ঝলক দেখা যায় এবং মুহূর্তের জন্য আলোর আভা প্রকাশিত হয়।
যখন সেই ওয়ারিদাত (অনুপ্রেরণাগুলো) তার (সালিকের) নিকট নেমে আসে এবং সে এগুলোর প্রত্যক্ষ স্বাদ ও অনুভূতি লাভ করে, তখন সেগুলোকে বলা হয় আহওয়াল। (এগুলো অস্থায়ী।)
আর যখন তা হৃদয়ে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায় এবং স্থায়ী রূপ ধারণ করে, তখন তাকে বলা হয় মাকাম।
অতএব, এগুলো শুরুতে লাওয়ামি’, মধ্য পর্যায়ে হাল, আর শেষ পর্যায়ে মাকাম।
কাজেই যা কিছুই ঝলক (বারিক বা লামি’), সেটিই প্রকৃতপক্ষে হাল। আর যা কিছুই হাল, সেটিই প্রকৃতপক্ষে মাকাম। এই একই জিনিশের নামকরণগুলো করা হয় হৃদয়ের সঙ্গে তার সম্পর্ক, হৃদয়ে তার প্রকাশের ধরন এবং হৃদয়ে তার স্থায়িত্বের মাত্রা বিবেচনা করে।
কখনো কখনো একজন সালিক তার অর্জিত মাকাম থেকেও বিচ্যুত হয়ে যেতে পারে, যেমন মানুষ গায়ের পোশাক খুলে ফেলে। তখন সে তার পূর্ববর্তী স্তরের নিচে নেমে যায়। এরপর সে হয়তো আবার সেই মাকামে ফিরে আসতে পারে, আবার নাও ফিরে আসতে পারে।
কিছু মাকাম এমন আছে, যা দুটি মাকামকে ধারণ করে; আবার কিছু মাকাম এমন আছে, যা তার চেয়েও অধিক সংখ্যক মাকামকে ধারণ করে। এমনও কিছু মাকাম রয়েছে, যার মধ্যে সকল মাকামই অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। ফলে কোনো ব্যক্তি তখনই প্রকৃত অর্থে সেই মাকামের অধিকারী বলে বিবেচিত হবে, যখন তার মধ্যে ঐ সকল মাকামের গুণাবলি একত্রিত হবে।
যেমন তাওবা এর মধ্যে মুহাসাবা (আত্মসমালোচনা) এবং খাওফ (আল্লাহভীতি)-এর মাকাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। কেননা, এ দুটি ছাড়া তাওবার অস্তিত্ব কল্পনাই করা যায় না।
তদ্রূপ তাওয়াক্কুল (আল্লাহর ওপর নির্ভরতা) এর মধ্যে তাফওয়ীয (নিজের বিষয় আল্লাহর হাতে সোপর্দ করা), ইস্তিআনাহ (আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা) এবং রিদা (আল্লাহর ফয়সালার প্রতি সন্তুষ্টি) এর মাকামসমূহ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এগুলো ছাড়া তাওয়াক্কুলের অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না।
একইভাবে রাজা (আল্লাহর রহমতের আশা) এর মধ্যে খাওফ (ভয়), ইরাদা (আল্লাহর দিকে অগ্রসর হওয়ার দৃঢ় সংকল্প) ইত্যাদি এর মাকাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এই প্রতিটি মাকামের ক্ষেত্রে সালিকগণ দুই শ্রেণিতে বিভক্ত:
১. আবরার (সৎকর্মশীল নেককারগণ)
২. মুকাররাবুন (আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্ত বান্দাগণ)
আবরারগণ এসব মাকামের নিম্নস্তরে অবস্থান করেন, আর মুকাররাবুনগণ অবস্থান করেন তার সর্বোচ্চ শিখরে। ঈমানের সমস্ত স্তরের ক্ষেত্রে একই অবস্থা বিদ্যমান।
এই দুই শ্রেণির প্রত্যেকের মধ্যে মর্যাদা, স্তর ও শ্রেষ্ঠত্বের যে বিপুল তারতম্য রয়েছে, তা আল্লাহ ছাড়া আর কেউ সম্পূর্ণরূপে গণনা করতে পারবে না।
তারা সালিকদের তিনটি ভাগে বিভক্ত করেছে সাধারণ (আম), বিশেষ (খাস) এবং বিশেষের বিশেষ (খাসসুল-খাস)।
এই তিন ভাগে বিভক্ত করার প্রচলন মূলত এ কারণে যে, ফানা (আত্মবিলোপ)-কে আত্মিক পথের সমাপ্তি ও তাসাউফের অনুসারীদের সেই প্রতীক হিসেবে গন্য করা, যার দিকে তারা সর্বশক্তি দিয়ে অগ্রসর হতে চান। ইনশাআল্লাহ, আমরা শীঘ্রই এ বিষয়ে আলোচনা করব।
ফানারও বিভিন্ন প্রকার রয়েছে। এর কিছু প্রশংসনীয়, কিছু নিন্দনীয়; আবার কিছু আছে অন্যগুলোর তুলনায় অধিক উৎকৃষ্ট। তাসাউফের শাইখদের এ বিষয়ে ইঙ্গিত রয়েছে এবং তাদের আলোচনার প্রধান কেন্দ্র এটাই।
তবুও, প্রতিটি লেখক বা শায়খ যে মাকামসমূহের ক্রমবিন্যাসের দিকে ইঙ্গিত করেন বা উপস্থাপন করেন, তা সম্পূর্ণভাবে ব্যক্তিগত রায় ও ভিত্তিহীন দাবিমুক্ত নয়।
কারণ যখন একজন বান্দা ইসলামের বন্ধন দৃঢ়ভাবে ধারণ করে এবং তাতে পূর্ণরূপে প্রবেশ করে, তখন সে এর বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ তাতপর্যগুলি, এর মাকামসমূহ ও হালগুলোকে গ্রহণ করে। তার জন্য ঈমানের প্রতিটি বন্ধন ও ফরজ বিধানের মধ্যেই এমন হাল ও মাকাম থাকে, যা তাকে অর্জন করাই লাগে। যখনই সে একটি ফরজ আদায় করে, তখন তার সামনে আরেকটি ফরজ এসে উপস্থিত হয়। আর যখনই সে একটি মাকাম অতিক্রম করে, তখন সে আরেকটি মাকামের মুখোমুখি হয়।
কখনো কখনো কোনো কোনো সালিকের আত্মিক সফরের একেবারে শুরুতেই তার সামনে সর্বোচ্চ মাকাম ও হালসমূহ প্রকাশিত হয়ে যায়। তখন তার অন্তরে মাহাব্বত (ভালোবাসা), রিদা (সন্তুষ্টি), উনস (ঘনিষ্ঠতা) ও তুমা’নিনাহ (প্রশান্তি) এর হাল উন্মোচিত হয়ে যায়, যা অনেক সময় সফরের শেষ পর্যায়ে পৌঁছানো সালিকও অর্জন করতে পারে না। অন্যদিকে যাত্রার শেষ পর্যায়ে থাকা সালিকের জন্য বাসীরাহ (অন্তর্দৃষ্টি), তাওবা (অনুতাপ) এবং মুহাসাবা (আত্মসমালোচনা)-এর মতো বিষয়গুলো শুরু পর্যায়ের সালিকের চেয়েও অধিক প্রয়োজন। তাই সুলুকের ক্ষেত্রে কোনো সার্বজনীন ও বাধ্যতামূলক এমন কোনো ক্রম নেই, (যা কিনা সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য হতে পারে।)
আমরা পূর্বেই উল্লেখ করেছি যে, তারা তাওবাকে যে মাকামসমূহের প্রথমে রেখেছেন, অথচ প্রকৃতপক্ষে তা আরেফগণের (আল্লাহ-জ্ঞানীদের) চূড়ান্ত লক্ষ্য এবং আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্ত ওলিদের শেষ পর্যায়। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, তাদের শেষ পর্যায়ে মুহাসাবাহ (আত্মসমালোচনা) এর প্রয়োজন শুরু পর্যায়ের তুলনায় আরও বেশি।
অতএব, এই মাকামসমূহ সম্পর্কে আলোচনার সর্বোত্তম পদ্ধতি হলো, প্রাথমিক যুগের সুফি শাইখগনের পদ্ধতি অনুসরণ। অর্থাৎ প্রতিটি মাকাম স্বতন্ত্রভাবে আলোচনা করা। প্রত্যেকটির প্রকৃত রূপ বর্ণনা করা, উদ্ভবের কারণ ও যেসকল আত্মিক আপদ (আফাত) তা অর্জনে বাধা দেয়, তা থেকে বিচ্যুত করে, সেগুলো উল্লেখ করা এবং পাশাপাশি সেগুলোর সাধারণ ও বিশেষ দিকসমূহ বর্ণনা করা।
সুলুকের ইমামগনের আলোচনা এই পদ্ধতির উপর ভিত্তি করেই। যারা এ বিষয়টি অনুধাবন করেছেন, যেমন সাহল ইবনে আব্দুল্লাহ আত-তুস্তারী, আবু তালিব আল-মাক্কী, জুনাইদ ইবনে মুহাম্মদ আল বাগদাদি, আবু উসমান আন-নিশাপুরী, ইয়াহইয়া ইবনে মু’আয আর-রাযী, এবং এদের চেয়েও উচ্চ তবকার ব্যক্তিত্ব, যেমন আবু সুলাইমান আদ-দারানী, আউন ইবনে আব্দুল্লাহ, যিনি “হাকীমুল উম্মাহ” (উম্মতের প্রাজ্ঞ ব্যক্তি) নামে পরিচিত ছিলেন, এবং তাঁদের সমপর্যায়ের অন্যান্য মনীষীগণ, তাঁরা হৃদয়ের আমল ও আত্মিক অবস্থাসমূহ (আহওয়াল) সম্পর্কে বিস্তারিত, সামগ্রিক, সুস্পষ্ট ও ব্যাপক আলোচনা করেছেন। অথচ তাঁরা মাকামসমূহকে নির্দিষ্ট সংখ্যায় অনুযায়ী শ্রেণিবদ্ধ বা সীমাবদ্ধ করেননি।
কারণ তাঁরা এ ধরনের শ্রেণিবিন্যাসের চেয়ে অনেক ঊর্ধ্বে ছিলেন। তাঁদের লক্ষ্য ও সাধনা ছিল আরও মহান ও মর্যাদাপূর্ণ। তাঁদের প্রধান মনোযোগ ছিল হিকমাহ (প্রজ্ঞা) ও মা’রিফাহ (আল্লাহর গভীর পরিচয়) অর্জন, হৃদয়ের পবিত্রতা, নফসের পরিশুদ্ধি এবং আচরণ ও মুয়ামালাত পরিশুদ্ধ করণের প্রতি। এই কারণে তাদের কথা কম। কিন্তু তাতে বরকত ছিলো। আর পরবর্তীদের কথা বেশি ও দীর্ঘ হলেও তাতে বরকত ছিল তুলনামূলক কম।
তবে বর্তমান যুগের (এমনকি প্রত্যেক যুগের) মানুষদের সঙ্গে তাদের নিজস্ব পরিভাষা অনুযায়ী কথা বলা জরুরি। কারণ তারা প্রথম যুগের সালাফদের কাছ থেকে সরাসরি সুলুক, বক্তব্য, উপদেশ ও জীবন পদ্ধতি গ্রহণের মতো শক্তি রাখে না। যদি তাদের সামনে ওইসকল সালাফদের পথ ও অবস্থা প্রকাশ করা হয়, তবে তারা তা বিশ্বাস করবে না এবং তাদের কাছে মনে হবে এটা বোধ হয় সাধারণ মানুষের সুলুক। তারা বলবে, বিশেষ ব্যক্তিদের ভিন্ন সুলুক রয়েছে। এটি ঠিক সেরকম, যেমন পথভ্রষ্ট মুতাকাল্লিমগণ (কালামশাস্ত্রবিদ) এবং তাদের অজ্ঞ অনুসারীরা বলে থাকে: “পূর্ববর্তীরা নিরাপদ পথে ছিলেন, কিন্তু আমাদের পথ অধিক জ্ঞানসমৃদ্ধ।”
অনুরূপভাবে, ফিকহের দিকে নিজেকে সম্পৃক্তকারী এমন কিছু লোক, যারা পূর্বসূরিদের প্রকৃত মর্যাদা উপলব্ধি করতে পারেনি, তারা বলে: “তাঁরা (সালাফগণ) ফিকহের শাখা-প্রশাখা এস্তেম্বাত (উদ্ভাবন), নীতিমালা প্রণয়ন ও বিধানসমূহ সুসংবদ্ধ করার জন্য অবসর পাননি। কারণ তারা অন্য বিষয়ে ব্যস্ত ছিলেন। পক্ষান্তরে পরবর্তীরা এ কাজের জন্য সময় ও মনোযোগ দিয়েছেন, ফলে তারা ফিকহে অধিক জ্ঞানী হয়েছেন।”
এই সকল লোক সালাফদের প্রকৃত মর্যাদা, তাদের জ্ঞানের গভীরতা, তাদের কৃত্তিমতামুক্ত স্বভাব এবং তাদের পূর্ণ অন্তর্দৃষ্টির প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে অজ্ঞতার চাদরে আচ্ছাদিত।
আল্লাহর কসম! পরবর্তী যুগের লোকেরা পূর্ববর্তীদের ওপর যদি কোনো বিষয়ে অগ্রগামী হয়ে থাকে, তবে তা কেবল অতিরিক্ত কৃত্রিমতা এবং এমনসব গৌণ বিষয় নিয়ে ব্যস্ত থাকার ক্ষেত্রে, যেগুলোর উসুল রক্ষা করা, মৌলিক নীতিমালা প্রণয়ন এবং সুসংহত ভিত্তি প্রতিষ্ঠাই ছিল সেই সালাফদের প্রধান লক্ষ্য। এছাড়া তাঁদের সাধনা সর্বদা প্রতিটি বিষয়ে সর্বোচ্চ সাফল্য ও উৎকর্ষ হাসিলের প্রতি নিবদ্ধ ছিল।
সুতরাং পরবর্তীদের চিন্তা-ভাবনার ধারা এক ধরনের, আর সালাফদের ধারা আরেক ধরণের। আল্লাহ সবকিছুর জন্য স্থির করেছেন সুনির্দিষ্ট মাত্ৰা।
টীকা
1 মুজাহিদ বলেন, পুরো কুরআনই সামঞ্জস্যপূর্ণ পুনঃ পুনঃ পঠিত। কাতাদাহ বলেন, এক আয়াত অন্য আয়াতের মত। দাহহাক বলেন, কুরআনে কোন কথাকে বারবার বলা হয়েছে যাতে করে তাদের রবের কথা বুঝা সহজ হয়। হাসান বসরী বলেন, কোন সুরায় একটি আয়াত আসলে অন্য সুরায় অনুরূপ আয়াত পাওয়া যায়। আব্দুর রহমান ইবন যায়েদ ইবন আসলাম বলেন, বারবার নিয়ে আসা হয়েছে যেমন মূসাকে কুরআনে বারবার উল্লেখ করা হয়েছে, অনুরূপ সালেহ, হূদ ও অন্যান্য নবীদেরকেও। [ইবন কাসীর] কাতাদা বলেন, এখানে ফরয বিষয়াদি, বিচারিক বিষয়াদি ও শরীআত নির্ধারিত সীমারেখার কথা বারবার এসেছে। [তাবারী] (তাফসিরে যাকারিয়া)
2 সাহাবাদের পূর্বে বর্ণিত লোকেদের...
3 উসুলিদের মতে সে এমত অবস্থায় মুকাল্লাফ থাকবে না। আর শাফেয়ী সহ অন্যান্যদের মতে সে মুকাল্লাফ থাকবে। বিস্তারিত দেখুন যারকাশীর “বাহরে মুহিতে” ২/৬৮।
4 কেউ বলেছেন তালাক হবে, কেউ বলেছেন হবে না। বিস্তারিত দেখুন প্রাগুক্ত উৎসে।
5 এই নুসখায় (রিসালাতুস সূফিয়্যাহ ওয়াল ফুকারা) এবারতটি এইভাবে আছে:
قال فيهم بعض العلماء : هؤلاء قوم أعطاهم الله عقولا وأحوالا ، فسلب عقولهم وأسقط أحوالهم ، وأبقى ما فرض لما سلب .
যার অর্থ: “কিছু আলেম তাদের সম্পর্কে বলেছেন: এরা এমন একটি দল, যাদেরকে আল্লাহ আকল ও আহওয়াল (আধ্যাত্মিক অবস্থা) দান করেছেন, এরপর তিনি তাদের আকল উঠিয়ে নিয়েছেন এবং সেই আহওয়ালগুলো সরিয়ে নিয়েছেন, তবে (আকল) উঠিয়ে নেওয়ার দরুণ তাদের উপর যা ফরজ দায়িত্ব ছিলো তা অবশিষ্ট রেখেছেন।”
কিন্তু মাজমুউল ফাতাওয়ায় এবারতটি তিন জায়গায় এসেছে।
প্রথম এবারত (১০/৩৪১):
قال فيهم بعض العلماء : هؤلاء قوم أعطاهم الله عقولا وأحوالا ، فسلب عقولهم وترك أحوالهم وأسقط ما فرض لما سلب .
“কিছু আলেম তাঁদের সম্পর্কে বলেছেন: এরা এমন এক দল, যাদেরকে আল্লাহ আকল ও আহওয়াল দান করেছেন। অতঃপর তিনি তাদের আকল কেড়ে নিয়েছেন, কিন্তু তাদের আহওয়ালগুলো রেখে দিয়েছেন; আর যা (আকল) কেড়ে নেওয়া হয়েছে, তার কারণে আরোপিত দায়িত্বসমূহও রহিত করে দিলেন।”
দ্বিতীয় এবারত (১০/৩৪৯):
ﻫﺆﻻء ﻗﻮﻡ ﺃﻋﻄﺎﻫﻢ اﻟﻠﻪ ﻋﻘﻮﻻ ﻭﺃﺣﻮاﻻ؛ ﻓﺴﻠﺐ ﻋﻘﻮﻟﻬﻢ ﻭﺃﺑﻘﻰ ﺃﺣﻮاﻟﻬﻢ ﻭﺃﺳﻘﻂ ﻣﺎ ﻓﺮﺽ ﺑﻤﺎ ﺳﻠﺐ.
“এরা এমন এক দল, যাদেরকে আল্লাহ আকল ও আহওয়াল দান করেছিলেন। অতঃপর তিনি তাদের আকল কেড়ে নিলেন, কিন্তু তাদের আহওয়াল্গুলো বহাল রাখলেন। আর যা কেড়ে নেওয়া হয়েছে, তার সঙ্গে সম্পর্কিত ফরয দায়িত্বসমূহও রহিত করে দিলেন।”
তৃতীয় এবারত (১১/১২):
ﻫﺆﻻء ﻗﻮﻡ ﺃﻋﻄﺎﻫﻢ اﻟﻠﻪ ﻋﻘﻮﻻ ﻭﺃﺣﻮاﻻ؛ ﻓﺴﻠﺐ ﻋﻘﻮﻟﻬﻢ ﻭﺃﺳﻘﻂ ﻣﺎ ﻓﺮﺽ ﺑﻤﺎ ﺳﻠﺐ.
“এরা এমন এক দল, যাদেরকে আল্লাহ আকল ও আহওয়াল দান করেছিলেন। অতঃপর তিনি তাদের আকল কেড়ে নিলেন এবং যা কেড়ে নেওয়া হয়েছে তার কারণে আরোফিত দায়িত্বসমূহ রহিত করে দিলেন।”
আমাদের এই নুসখার এবারতটি বিশুদ্ধ নয়। -অনুবাদক
6 আল-মানার: “এটি তৃতীয় স্তর, এবং এটিই সর্বোচ্চ স্তর। তবে এখানে স্তরের সংখ্যাটি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি।”
7 বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গির জন্য শাইখুল হাদিস মাওলানা মুহাম্মদ জাকারিয়া কান্ধলভী রহ. হজরত মানসুর আল হাল্লাজের ব্যপারে হাকিমুল উম্মাত মাওলানা আশরাফ আলি থানভি রহ. -এর বক্তব্য উদ্ধৃত করে যে আলোচনা করেছেন, তা এ ক্ষেত্রে দেখা যেতে পারে। এছাড়াও মাওলানা জাফর আহমদ উসমানী রহ. শাইখ মনসুর আল-হাল্লাজ সম্পর্কে একটি বিস্তারিত গ্রন্থ রচনা করেছেন, যেখানে তাঁর ব্যাপারে একটি ভিন্নধর্মী দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করা হয়েছে। সেটিও এ ক্ষেত্রে দেখা যেতে পারে। (ইংরেজি অনুবাদক)
8 পরবর্তী যুগের আলেমদের পরিভাষায় “ফকির” বলতে সেই সালিক বা পথিককে বোঝানো হয়, যে আল্লাহ তাআলার দিকে অগ্রসর হয়। অনুরূপভাবে তাদের পরিভাষায় সে সুফিও। তবে তাদের মধ্যে কেউ কেউ “সুফি” পরিচয়কে “ফকির”-এর ওপর প্রাধান্য দেয়। কারণ তাদের মতে সুফি হলো সেই ব্যক্তি, যে নিজের ভেতর ও বাহির উভয়কে পরিশুদ্ধ করেছে। আবার কেউ “ফকির” পরিচয়কে অগ্রাধিকার দেয়। কারণ তাদের মতে ফকির হলো সে ব্যক্তি, যে (দুনিয়াবি) সকল সম্পর্ক ছিন্ন করেছে এবং বাহ্যিক জীবনে কেবল একান্ত দরকারি বিষয় ছাড়া অন্য কিছুতে ব্যস্ত থাকে না। তবে এসব মূলত পরিভাষাগত ও শব্দগত বিতর্ক মাত্র।
সঠিক বিশ্লেষণ হলো, এ দুটি নাম দ্বারা যে প্রশংসনীয় অর্থ উদ্দেশ্য করা হয়, তা মূলত “সিদ্দীক”, “আল্লাহর ওলি”, “সালেহ বান্দা” ইত্যাদি, এগুলো সেইসব নামের মাঝেই দাখিল, যেগুলো কুরআন ও সুন্নাহে এসেছে। সুতরাং কোনো ব্যক্তি যদি এসব নববী ও শরয়ি গুণাবলির অন্তর্ভুক্ত হয়, তখন কুরআন সুন্নাহয় বর্ণিত মর্যাদা ও বিধান তার ওপর প্রযোজ্য হবে।
আর যেসব বিষয়ের মাধ্যমে মানুষ এসব নামকে বিশেষ মর্যাদার প্রতীক বানায়, যেমন কাউকে এমন কারণে শ্রেষ্ঠ মনে করা, যা প্রকৃতপক্ষে শ্রেষ্ঠত্বের কারণ নয়, অথবা কোনো ব্যক্তিকে ওলি গণ্য করা এবং এ ধরনের অন্যান্য বিষয়, যেগুলোর মাধ্যমে দ্বীন ও দুনিয়ায় উচ্চ মর্যাদা সাব্যস্ত হয়, এসব শরিয়তের দৃষ্টিতে ভিত্তিহীন ও অগ্রহণযোগ্য। তবে যদি এসবকে মুবাহ বা বৈধ পার্থিব বিষয়াদির মধ্যে ধরা হয়, যেমন বিভিন্ন পেশা বা কারিগরি কাজ, তাহলে তাতে দোষ নেই, শর্ত হলো, এই সব মুবাহ বিষয়াদিকে মুস্তাহাব কাজ মনে করা যাবে না। আর এসবের সঙ্গে যদি আল্লাহর দ্বীনে অপছন্দনীয় বিষয়াদি যুক্ত হয়ে যায়, যেমন বিভিন্ন বিদআত বা পাপাচারের রূপ, তাহলে শরিয়তের নির্দেশ অনুযায়ী সেগুলো থেকে নিষেধ করা অবশ্যকর্তব্য। (মাজমূ আল ফাতাওয়া ১১/৭০)
9 ইবনুল কাইয়িম রহ. তাঁর মাদারিজুস সালিকিন (১/৫৪-৬৯)
মাকাম (আধ্যাত্মিক স্তর) ও হাল (আধ্যাত্মিক অবস্থা) এর মধ্যে পার্থক্য হলো: মাকাম হলো অর্জিত (কাসবী) আর হাল হলো ঐশ্বরিকভাবে প্রদত্ত (ওহবী)।
কিছু সুফি বলেন, আহওয়াল মাকামের ফল; আর মাকাম হলো আমলের ফল। সুতরাং যেই স্বীয় আমলকে সংশোধন করবে, আমলে উন্নতি সাধন করবে, তার মাকাম তত উচ্চ হবে; আর যার মাকাম যত উচ্চ, তার হালও তত মহান হবে।
তারা যে বিষয়গুলো নিয়ে এখতেলাফ করেছেন, তার মধ্যে অন্যতম হলো রিদা (আল্লাহর তিক্ত ফয়সালার উপর অন্তরের সন্তুষ্টি) কি হাল, নাকি মাকাম?
এ বিষয়ে খোরাসানের সুফিগণ ও ইরাকের সুফিগণের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
কিছু শায়খ এভাবে একটা সুরাহা করেছেন যে, রিদা যদি কাসবের মাধ্যমে হাসিল হয়, তবে তা মাকাম। তা না হলে (অর্থাৎ ঐশ্বরিকভাবে প্রাপ্ত হলে) সেটা হাল।
তবে এক্ষেত্রে সঠিক হল হলো, ওয়ারিদাত (আল্লাহর পক্ষ থেকে আগত আধ্যাত্মিক প্রেরণা) ও মুনাজালাত (রুহানি অবতরণসমূহ) গুলো তাদের বিভিন্ন অবস্থার ভিত্তিতে বিভিন্ন নামে পরিচিত হয়।
এসব যখন প্রথম প্রকাশ পেতে শুরু করে, তখন সেগুলোকে বলা হয় লাওয়ামি’ (ঝলক), বাওয়ারিক (বিদ্যুতের ঝলকানি) এবং লাওয়াইহ (দূর থেকে দৃশ্যমান আভাস)। যেমন দূর থেকে বিদ্যুতের ঝলক দেখা যায় এবং মুহূর্তের জন্য আলোর আভা প্রকাশিত হয়।
যখন সেই ওয়ারিদাত (অনুপ্রেরণাগুলো) তার (সালিকের) নিকট নেমে আসে এবং সে এগুলোর প্রত্যক্ষ স্বাদ ও অনুভূতি লাভ করে, তখন সেগুলোকে বলা হয় আহওয়াল। (এগুলো অস্থায়ী।)
আর যখন তা হৃদয়ে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায় এবং স্থায়ী রূপ ধারণ করে, তখন তাকে বলা হয় মাকাম।
অতএব, এগুলো শুরুতে লাওয়ামি’, মধ্য পর্যায়ে হাল, আর শেষ পর্যায়ে মাকাম।
কাজেই যা কিছুই ঝলক (বারিক বা লামি’), সেটিই প্রকৃতপক্ষে হাল। আর যা কিছুই হাল, সেটিই প্রকৃতপক্ষে মাকাম। এই একই জিনিশের নামকরণগুলো করা হয় হৃদয়ের সঙ্গে তার সম্পর্ক, হৃদয়ে তার প্রকাশের ধরন এবং হৃদয়ে তার স্থায়িত্বের মাত্রা বিবেচনা করে।
কখনো কখনো একজন সালিক তার অর্জিত মাকাম থেকেও বিচ্যুত হয়ে যেতে পারে, যেমন মানুষ গায়ের পোশাক খুলে ফেলে। তখন সে তার পূর্ববর্তী স্তরের নিচে নেমে যায়। এরপর সে হয়তো আবার সেই মাকামে ফিরে আসতে পারে, আবার নাও ফিরে আসতে পারে।
কিছু মাকাম এমন আছে, যা দুটি মাকামকে ধারণ করে; আবার কিছু মাকাম এমন আছে, যা তার চেয়েও অধিক সংখ্যক মাকামকে ধারণ করে। এমনও কিছু মাকাম রয়েছে, যার মধ্যে সকল মাকামই অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। ফলে কোনো ব্যক্তি তখনই প্রকৃত অর্থে সেই মাকামের অধিকারী বলে বিবেচিত হবে, যখন তার মধ্যে ঐ সকল মাকামের গুণাবলি একত্রিত হবে।
যেমন তাওবা এর মধ্যে মুহাসাবা (আত্মসমালোচনা) এবং খাওফ (আল্লাহভীতি)-এর মাকাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। কেননা, এ দুটি ছাড়া তাওবার অস্তিত্ব কল্পনাই করা যায় না।
তদ্রূপ তাওয়াক্কুল (আল্লাহর ওপর নির্ভরতা) এর মধ্যে তাফওয়ীয (নিজের বিষয় আল্লাহর হাতে সোপর্দ করা), ইস্তিআনাহ (আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা) এবং রিদা (আল্লাহর ফয়সালার প্রতি সন্তুষ্টি) এর মাকামসমূহ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এগুলো ছাড়া তাওয়াক্কুলের অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না।
একইভাবে রাজা (আল্লাহর রহমতের আশা) এর মধ্যে খাওফ (ভয়), ইরাদা (আল্লাহর দিকে অগ্রসর হওয়ার দৃঢ় সংকল্প) ইত্যাদি এর মাকাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এই প্রতিটি মাকামের ক্ষেত্রে সালিকগণ দুই শ্রেণিতে বিভক্ত:
১. আবরার (সৎকর্মশীল নেককারগণ)
২. মুকাররাবুন (আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্ত বান্দাগণ)
আবরারগণ এসব মাকামের নিম্নস্তরে অবস্থান করেন, আর মুকাররাবুনগণ অবস্থান করেন তার সর্বোচ্চ শিখরে। ঈমানের সমস্ত স্তরের ক্ষেত্রে একই অবস্থা বিদ্যমান।
এই দুই শ্রেণির প্রত্যেকের মধ্যে মর্যাদা, স্তর ও শ্রেষ্ঠত্বের যে বিপুল তারতম্য রয়েছে, তা আল্লাহ ছাড়া আর কেউ সম্পূর্ণরূপে গণনা করতে পারবে না।
তারা সালিকদের তিনটি ভাগে বিভক্ত করেছে সাধারণ (আম), বিশেষ (খাস) এবং বিশেষের বিশেষ (খাসসুল-খাস)।
এই তিন ভাগে বিভক্ত করার প্রচলন মূলত এ কারণে যে, ফানা (আত্মবিলোপ)-কে আত্মিক পথের সমাপ্তি ও তাসাউফের অনুসারীদের সেই প্রতীক হিসেবে গন্য করা, যার দিকে তারা সর্বশক্তি দিয়ে অগ্রসর হতে চান। ইনশাআল্লাহ, আমরা শীঘ্রই এ বিষয়ে আলোচনা করব।
ফানারও বিভিন্ন প্রকার রয়েছে। এর কিছু প্রশংসনীয়, কিছু নিন্দনীয়; আবার কিছু আছে অন্যগুলোর তুলনায় অধিক উৎকৃষ্ট। তাসাউফের শাইখদের এ বিষয়ে ইঙ্গিত রয়েছে এবং তাদের আলোচনার প্রধান কেন্দ্র এটাই।
তবুও, প্রতিটি লেখক বা শায়খ যে মাকামসমূহের ক্রমবিন্যাসের দিকে ইঙ্গিত করেন বা উপস্থাপন করেন, তা সম্পূর্ণভাবে ব্যক্তিগত রায় ও ভিত্তিহীন দাবিমুক্ত নয়।
কারণ যখন একজন বান্দা ইসলামের বন্ধন দৃঢ়ভাবে ধারণ করে এবং তাতে পূর্ণরূপে প্রবেশ করে, তখন সে এর বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ তাতপর্যগুলি, এর মাকামসমূহ ও হালগুলোকে গ্রহণ করে। তার জন্য ঈমানের প্রতিটি বন্ধন ও ফরজ বিধানের মধ্যেই এমন হাল ও মাকাম থাকে, যা তাকে অর্জন করাই লাগে। যখনই সে একটি ফরজ আদায় করে, তখন তার সামনে আরেকটি ফরজ এসে উপস্থিত হয়। আর যখনই সে একটি মাকাম অতিক্রম করে, তখন সে আরেকটি মাকামের মুখোমুখি হয়।
কখনো কখনো কোনো কোনো সালিকের আত্মিক সফরের একেবারে শুরুতেই তার সামনে সর্বোচ্চ মাকাম ও হালসমূহ প্রকাশিত হয়ে যায়। তখন তার অন্তরে মাহাব্বত (ভালোবাসা), রিদা (সন্তুষ্টি), উনস (ঘনিষ্ঠতা) ও তুমা’নিনাহ (প্রশান্তি) এর হাল উন্মোচিত হয়ে যায়, যা অনেক সময় সফরের শেষ পর্যায়ে পৌঁছানো সালিকও অর্জন করতে পারে না। অন্যদিকে যাত্রার শেষ পর্যায়ে থাকা সালিকের জন্য বাসীরাহ (অন্তর্দৃষ্টি), তাওবা (অনুতাপ) এবং মুহাসাবা (আত্মসমালোচনা)-এর মতো বিষয়গুলো শুরু পর্যায়ের সালিকের চেয়েও অধিক প্রয়োজন। তাই সুলুকের ক্ষেত্রে কোনো সার্বজনীন ও বাধ্যতামূলক এমন কোনো ক্রম নেই, (যা কিনা সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য হতে পারে।)
আমরা পূর্বেই উল্লেখ করেছি যে, তারা তাওবাকে যে মাকামসমূহের প্রথমে রেখেছেন, অথচ প্রকৃতপক্ষে তা আরেফগণের (আল্লাহ-জ্ঞানীদের) চূড়ান্ত লক্ষ্য এবং আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্ত ওলিদের শেষ পর্যায়। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, তাদের শেষ পর্যায়ে মুহাসাবাহ (আত্মসমালোচনা) এর প্রয়োজন শুরু পর্যায়ের তুলনায় আরও বেশি।
অতএব, এই মাকামসমূহ সম্পর্কে আলোচনার সর্বোত্তম পদ্ধতি হলো, প্রাথমিক যুগের সুফি শাইখগনের পদ্ধতি অনুসরণ। অর্থাৎ প্রতিটি মাকাম স্বতন্ত্রভাবে আলোচনা করা। প্রত্যেকটির প্রকৃত রূপ বর্ণনা করা, উদ্ভবের কারণ ও যেসকল আত্মিক আপদ (আফাত) তা অর্জনে বাধা দেয়, তা থেকে বিচ্যুত করে, সেগুলো উল্লেখ করা এবং পাশাপাশি সেগুলোর সাধারণ ও বিশেষ দিকসমূহ বর্ণনা করা।
সুলুকের ইমামগনের আলোচনা এই পদ্ধতির উপর ভিত্তি করেই। যারা এ বিষয়টি অনুধাবন করেছেন, যেমন সাহল ইবনে আব্দুল্লাহ আত-তুস্তারী, আবু তালিব আল-মাক্কী, জুনাইদ ইবনে মুহাম্মদ আল বাগদাদি, আবু উসমান আন-নিশাপুরী, ইয়াহইয়া ইবনে মু’আয আর-রাযী, এবং এদের চেয়েও উচ্চ তবকার ব্যক্তিত্ব, যেমন আবু সুলাইমান আদ-দারানী, আউন ইবনে আব্দুল্লাহ, যিনি “হাকীমুল উম্মাহ” (উম্মতের প্রাজ্ঞ ব্যক্তি) নামে পরিচিত ছিলেন, এবং তাঁদের সমপর্যায়ের অন্যান্য মনীষীগণ, তাঁরা হৃদয়ের আমল ও আত্মিক অবস্থাসমূহ (আহওয়াল) সম্পর্কে বিস্তারিত, সামগ্রিক, সুস্পষ্ট ও ব্যাপক আলোচনা করেছেন। অথচ তাঁরা মাকামসমূহকে নির্দিষ্ট সংখ্যায় অনুযায়ী শ্রেণিবদ্ধ বা সীমাবদ্ধ করেননি।
কারণ তাঁরা এ ধরনের শ্রেণিবিন্যাসের চেয়ে অনেক ঊর্ধ্বে ছিলেন। তাঁদের লক্ষ্য ও সাধনা ছিল আরও মহান ও মর্যাদাপূর্ণ। তাঁদের প্রধান মনোযোগ ছিল হিকমাহ (প্রজ্ঞা) ও মা’রিফাহ (আল্লাহর গভীর পরিচয়) অর্জন, হৃদয়ের পবিত্রতা, নফসের পরিশুদ্ধি এবং আচরণ ও মুয়ামালাত পরিশুদ্ধ করণের প্রতি। এই কারণে তাদের কথা কম। কিন্তু তাতে বরকত ছিলো। আর পরবর্তীদের কথা বেশি ও দীর্ঘ হলেও তাতে বরকত ছিল তুলনামূলক কম।
তবে বর্তমান যুগের (এমনকি প্রত্যেক যুগের) মানুষদের সঙ্গে তাদের নিজস্ব পরিভাষা অনুযায়ী কথা বলা জরুরি। কারণ তারা প্রথম যুগের সালাফদের কাছ থেকে সরাসরি সুলুক, বক্তব্য, উপদেশ ও জীবন পদ্ধতি গ্রহণের মতো শক্তি রাখে না। যদি তাদের সামনে ওইসকল সালাফদের পথ ও অবস্থা প্রকাশ করা হয়, তবে তারা তা বিশ্বাস করবে না এবং তাদের কাছে মনে হবে এটা বোধ হয় সাধারণ মানুষের সুলুক। তারা বলবে, বিশেষ ব্যক্তিদের ভিন্ন সুলুক রয়েছে। এটি ঠিক সেরকম, যেমন পথভ্রষ্ট মুতাকাল্লিমগণ (কালামশাস্ত্রবিদ) এবং তাদের অজ্ঞ অনুসারীরা বলে থাকে: “পূর্ববর্তীরা নিরাপদ পথে ছিলেন, কিন্তু আমাদের পথ অধিক জ্ঞানসমৃদ্ধ।”
অনুরূপভাবে, ফিকহের দিকে নিজেকে সম্পৃক্তকারী এমন কিছু লোক, যারা পূর্বসূরিদের প্রকৃত মর্যাদা উপলব্ধি করতে পারেনি, তারা বলে: “তাঁরা (সালাফগণ) ফিকহের শাখা-প্রশাখা এস্তেম্বাত (উদ্ভাবন), নীতিমালা প্রণয়ন ও বিধানসমূহ সুসংবদ্ধ করার জন্য অবসর পাননি। কারণ তারা অন্য বিষয়ে ব্যস্ত ছিলেন। পক্ষান্তরে পরবর্তীরা এ কাজের জন্য সময় ও মনোযোগ দিয়েছেন, ফলে তারা ফিকহে অধিক জ্ঞানী হয়েছেন।”
এই সকল লোক সালাফদের প্রকৃত মর্যাদা, তাদের জ্ঞানের গভীরতা, তাদের কৃত্তিমতামুক্ত স্বভাব এবং তাদের পূর্ণ অন্তর্দৃষ্টির প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে অজ্ঞতার চাদরে আচ্ছাদিত।
আল্লাহর কসম! পরবর্তী যুগের লোকেরা পূর্ববর্তীদের ওপর যদি কোনো বিষয়ে অগ্রগামী হয়ে থাকে, তবে তা কেবল অতিরিক্ত কৃত্রিমতা এবং এমনসব গৌণ বিষয় নিয়ে ব্যস্ত থাকার ক্ষেত্রে, যেগুলোর উসুল রক্ষা করা, মৌলিক নীতিমালা প্রণয়ন এবং সুসংহত ভিত্তি প্রতিষ্ঠাই ছিল সেই সালাফদের প্রধান লক্ষ্য। এছাড়া তাঁদের সাধনা সর্বদা প্রতিটি বিষয়ে সর্বোচ্চ সাফল্য ও উৎকর্ষ হাসিলের প্রতি নিবদ্ধ ছিল।
সুতরাং পরবর্তীদের চিন্তা-ভাবনার ধারা এক ধরনের, আর সালাফদের ধারা আরেক ধরণের। আল্লাহ সবকিছুর জন্য স্থির করেছেন সুনির্দিষ্ট মাত্ৰা।
***
তরজমা করেছেন নাঈম আল-ইসলাম সজীব