মেন্যু
Menu

ইসলামী ঐতিহ্য : তৃতীয় কিস্তি (আধুনিকতা) | ওভামির আনজুম

৩ আগস্ট, ২০২৫

বিগত পর্বে (২য় কিস্তিতে) আমরা আলোচনা করেছিলাম কেন ইসলামী ঐতিহ্যকে উপেক্ষা করা হয়েছে, বিশেষ করে সাম্প্রতিক কয়েক শতকে। প্রথম বাধা ছিল অজ্ঞতাপ্রসূত গোষ্ঠীতান্ত্রিকতা (যা “নিশাপুর সিনড্রোম” নামে পরিচিত), এবং অন্যত্র তা ছিল ইসলামী মূল্যবোধকে রাজতান্ত্রিক শাসনের স্থায়িত্বের জন্য বলি দেওয়া (“উমাইয়া সিনড্রোম”)। এই একই সমস্যা বর্তমানেও প্রযোজ্য।

দ্বিতীয় বাধা : আধুনিকতা

কেন পৃথিবীর ইসলামী ঐতিহ্যের প্রয়োজন?

পৃথিবীর কেন ইসলামী ঐতিহ্যের প্রয়োজন—তা ব্যাখ্যায় যত কারণ বা যুক্তিই তুলে ধরা হোক না কেন, আমার বিশ্বাস, সেগুলো এই ঐতিহ্যের প্রকৃত গুরুত্ব ও তাৎপর্য পুরোপুরি উপলব্ধি করতে সক্ষম হবে না।

এটি অনেকটা মানুষকে নিঃশ্বাস নিতে থাকার জরুরত বোঝানোর মতো। সাধারণত কেউ নিঃশ্বাস বন্ধ করার কথা ভাবেন না, এবং কঠিন পরিস্থিতি না হলে কেউ এর প্রয়োজনীয়তা মনে করিয়ে দেওয়ার দরকার পড়ে না। ইসলাম হলো এমন একটি পদ্ধতি, যা মুসলমানরা অতীতে যেভাবে জীবনযাপন করতেন এবং আজও অনেকেই এভাবে জীবন যাপন করেন—যেন পাখিরা আকাশে উড়ে বেড়ায় বা মাছ পানিতে সাঁতার কাটে। তারা এই জীবনযাত্রা সম্পর্কে সচেতনভাবে চিন্তা না করেও এটি অনুসরণ করেন।

ইসলামের প্রথম যুগের বেশিরভাগ মুসলমান ইসলামি ঐতিহ্যের ভেতরে থেকেই চিন্তা করতেন ও কাজ করতেন, এটি নিয়ে আলাদা করে ভাবতেন না। তাহলে কেন এ নিয়ে এখন কথা বলার প্রয়োজন? কারণ সেই “বাতাস” এবং “পানি” আজ অনেকটাই বদলে গেছে। চিন্তা না করে শ্বাস নেওয়া, পান করা এবং ব্যবহার করা (আক্ষরিক এবং রূপক অর্থে) প্রকৃতপক্ষে পুরো মানবজাতিকে বিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে এসেছে।

একটু ব্যাখ্যা করি। আজকের পৃথিবী অনেক ভিন্ন। গত দুই শতকে মানুষের জীবনের প্রতিটি দিকেই পরিবর্তনের গতি বহুগুণ বেড়েছে। বললে বাড়িয়ে বলা হবে না যে, এই অবিরাম “নতুনত্বে” তথা আধুনিকতায় পৃথিবী কিছু ক্ষেত্রে গত পাঁচ হাজার বছরের তুলনায় বেশি পরিবর্তিত হয়েছে।

ধারাবাহিক পরিবর্তনের সূচনা

এই পরিবর্তনের সূচনা হয় পশ্চিমে। এটি শুধু বিজ্ঞানের পদ্ধতিগত উন্নতি, পদার্থবিজ্ঞানের আবিষ্কার, এবং সৃষ্টির বিশাল শক্তিগুলোর কিছুটা নিয়ন্ত্রণ-ই নিয়ে আসেনি; বরং সঙ্গে নিয়ে এসেছে ঔপনিবেশিকতা, পুঁজিবাদ, এবং আধুনিক জাতি-রাষ্ট্রের ত্রিভুজীয় সম্পর্ক।

অবিরাম পরিবর্তনের মাধ্যমে জ্ঞান ও অস্তিত্বের এক অনিবার্যভাবে উন্নত অবস্থার দিকে এগিয়ে যাওয়ার যে ধারণা—যাকে আমরা “অগ্রগতি” বলি —একটি অর্থে কল্পিত হলেও, এটি বর্তমানে একটি বাস্তবতা এবং এক ধরণের কাঙ্ক্ষিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মানব টিকে থাকার সক্ষমতা (যেমন আধুনিক চিকিৎসা) ও প্রকৃতির শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা সম্পর্কে যে অসাধারণ জ্ঞান ও অগ্রগতি আধুনিকতা এনেছে, তা অস্বীকার না করেও আজকের পৃথিবী উপলব্ধি করতে শুরু করেছে যে, আধুনিকতা আমাদের সবাইকে ধ্বংসের পথে নিয়ে গেছে।

শোষণ থেকে ধ্বংসের উৎপত্তি

আধুনিক পুঁজিবাদী শক্তিগুলোর দ্বারা পৃথিবীর সম্পদের উন্মাদনার মতো শোষণ এবং এর ফলে সৃষ্টির ভারসাম্য ধ্বংস করা, গত শতাব্দীতে একটি বিধ্বংসী জলবায়ু পরিবর্তন ডেকে এনেছে। বিজ্ঞান বলছে, এটি এখন প্রায় অপরিবর্তনীয়।

অর্থনৈতিক বৈষম্য আজ ইতিহাসে সবচেয়ে চরম অবস্থায় পৌঁছেছে, এবং আধুনিকতার সাংগঠনিক কাঠামোতে এটি এতটাই গভীরভাবে প্রোথিত যে, বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানগুলো—বিশেষত পুঁজিবাদ এবং এর সহায়ক আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার ধ্বংস ছাড়া এই বৈষম্য দূর করা অসম্ভব।

মজার ব্যাপার হলো, আধুনিক বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলোর (যেমন, যুক্তরাষ্ট্র) প্রধান বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদরাও এই একই সুপারিশ করেছেন। উদাহরণস্বরূপ, জেমস স্পেথের The Bridge at the End of the World বইটি এই বিষয়ে চিন্তা করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

আজকের দিনে বৈজ্ঞানিক ও অর্থনৈতিক তথ্য এবং সেগুলোর অপরিহার্য রাজনৈতিক অচলাবস্থার দিকে তাকিয়ে 'এই পরিস্থিতি থেকে কোনো উপায়ে পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব' এই বিশ্বাস করা একপ্রকার বড় ধরনের আশাবাদ (বা কেবল একান্ত বিশ্বাসের বিষয়)।

বিপর্যস্ত বিশ্ব থেকে আধুনিকায়নের চাপ

ইসলামী ঐতিহ্য নিয়ে আলোচনা করার সময় এই করুণ প্রবণতা এবং সম্ভবত আধুনিক সভ্যতার সমাপ্তি স্মরণ করা জরুরি। কারণ, বাস্তবতা হলো, ইসলামী ঐতিহ্যকে পশ্চিমাদের, মুসলিম সংস্কারকদের, এবং সাধারণ মুসলমানদের দ্বারা পশ্চিমা মানদণ্ডের কাছে বন্দি করে রাখা হয়েছে।

আগামী কয়েক দশকে পৃথিবী একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ নেবে। জলবায়ু, নিপীড়িত জনগণ এবং দরিদ্ররা, তাদের নিজস্ব বাস্তবতার নির্মম যুক্তি অনুসারে, প্রতিশোধ নিতে বাধ্য হবে বা, অন্যভাবে বললে, ভারসাম্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে বাধ্য হবে।

বিশেষ করে পশ্চিমা মুসলমানদের জন্য—যারা এই জটিলতার মধ্যে এবং শক্তিশালী প্রভাবশালী সংস্কৃতির মানদণ্ডের ধারাবাহিক মূল্যায়নের আওতায় বাস করেন—তাদের নিজেদের ঐতিহ্যকে বিচার, সংস্কার এবং আধুনিকায়নের চেষ্টা প্রায় বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পশ্চিমা মুসলমানরা খুব কমই উপলব্ধি করেন বা প্রকাশ্যে বলার সাহস পান যে, যেটির সাথে তারা নিজেদের অনবরত বিচার করছেন, সেটি একটি ধ্বংসাত্মক সংকটের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। এই সভ্যতা পুরো পৃথিবীকে এক করুণ, ব্যাপক আত্মহত্যার পথে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।

সামান্যতে সন্তুষ্টি বনাম ভারসাম্যের বিপর্যয়কর পুনর্গঠন

মানবজাতি আজ এক বিপজ্জনক প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে। এর প্রমাণ হলো জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত অনস্বীকার্য বৈজ্ঞানিক তথ্য, এবং পরমাণু বিপর্যয়, যুদ্ধ, ও একনায়কতন্ত্র নিয়ে যথার্থ ভয়। এই পরিস্থিতিতে একটি নতুন জীবনের পথ এবং আশার অত্যন্ত প্রয়োজন।

যে নতুন পথই হোক না কেন, তার কেন্দ্রে থাকতে হবে এমন একটি বিশ্বাস: সুখীভাবে অল্পতে বাঁচার চর্চা। এর সঙ্গে একটি মৌলিক উপলব্ধি থাকতে হবে—এই পৃথিবী কখনো বেহেশত হতে পারে না এবং হবে না। মানবজীবন বা এর বিবর্তন এমন কোনো শারীরিক-আত্মিক অবস্থায় পৌঁছাবে না যা পার্থিব সীমাবদ্ধতা ও সংগ্রামের ঊর্ধ্বে।

এই নতুন জীবনধারা, যা মূলত সন্তুষ্টি এবং পৃথিবীর জীবনের সীমাবদ্ধতা ও কষ্টকর প্রকৃতি উপলব্ধির ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠবে, যা আধুনিক জীবনের ঠিক বিপরীত।

ইসলামী ঐতিহ্যের আশীর্বাদ

ইসলামী ঐতিহ্যের ভেতরেই এমন সব সম্পদ সুস্পষ্টভাবে বিদ্যমান, এবং আমার বিশ্বাস, এটি এমনভাবে গঠিত যে, তা বিশ্বের প্রয়োজন এবং মানবতার আর্তচিৎকারের প্রতি সাড়া দেওয়ার জন্যই নির্দিষ্টভাবে প্রস্তুত। এই আহ্বান আগামী দশকে আরও প্রবল হবে, এবং এর প্রয়োজনীয়তাও ক্রমশ বাড়বে।

আধুনিক মানুষ, যারা সাধারণত আল্লাহ ও দুর্বলদের প্রতি ঔদ্ধত্য দেখায়, তারা এখন ক্রমশ ভেঙে পড়ছে, বিনীত হচ্ছে—এবং বিকল্পের সন্ধান করছে। তবে, আমি এটা বলতে চাই না যে ইসলামকে শুধুমাত্র পার্থিব সংকটের সমাধান হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। ইসলাম এমন কিছু নয় এবং একে এভাবে উপস্থাপন করা উচিত নয়, যেন এটি শুধুই পার্থিব সাফল্যের একটি উপায়। ইসলাম একটি দ্বীন, এবং পৃথিবীতে আল্লাহ প্রদত্ত রহমত, ভারসাম্য এবং আমাদের প্রতি তাঁর দেওয়া দায়িত্ব পূর্ণভাবে অর্জিত হতে পারে কেবল তাঁর প্রতি প্রকৃত ভক্তি ও আনুগত্যের মাধ্যমে।

তবু, মানুষের স্বভাবগত প্রবণতা হলো স্বল্পদৃষ্টি এবং তারা সত্য বা সর্বোচ্চ সত্যের (আল-হক) দ্বারা সহজেই প্রভাবিত হয় না। এই কারণেই আল্লাহ প্রায়শই কোনো সম্প্রদায়ের কাছে তাঁর বার্তা প্রেরণের আগে তাদের কাঁপিয়ে দেন দুঃখ-কষ্টের মাধ্যমে।

আল কুরআনে আল্লাহ বলেছেন—

وَمَآ أَرْسَلْنَا فِى قَرْيَةٍۢ مِّن نَّبِىٍّ إِلَّآ أَخَذْنَآ أَهْلَهَا بِٱلْبَأْسَآءِ وَٱلضَّرَّآءِ لَعَلَّهُمْ يَضَّرَّعُونَ. ثُمَّ بَدَّلْنَا مَكَانَ ٱلسَّيِّئَةِ ٱلْحَسَنَةَ حَتَّىٰ عَفَوا۟ وَّقَالُوا۟ قَدْ مَسَّ ءَابَآءَنَا ٱلضَّرَّآءُ وَٱلسَّرَّآءُ فَأَخَذْنَـٰهُم بَغْتَةًۭ وَهُمْ لَا يَشْعُرُونَ

“আমরা কখনো কোনো সম্প্রদায়ের কাছে রাসূল পাঠাইনি, তাদের দুঃখ-কষ্ট ও বিপর্যয়ের মাধ্যমে পরীক্ষা না করে, যাতে তারা নিজেদের অবনত করে। তারপর আমরা তাদের এই দুঃখ-কষ্টকে শান্তিতে রূপান্তরিত করেছি, যাতে তারা সমৃদ্ধ হয়। কিন্তু তারা বলেছে, আমাদের পূর্বপুরুষেরাও দুঃখ-কষ্ট ভোগ করেছে। এরপর, হঠাৎ করেই তাদের আমরা পাকড়াও করেছি, যখন তারা বুঝতে পারেনি।” সূরা আল-আরাফ : ৯৪-৯৫

সংকট : লুকানো আশীর্বাদ

আমেরিকান মুসলমানদের জন্য, কুরআনের এই আয়াতের সত্যতা একটি বাস্তব অভিজ্ঞতা। এটি নিছক কাকতালীয় নয় যে, আমাদের কালো ভাইয়েরা—যারা শতাব্দী ধরে দাসত্ব, অপমান, এবং নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, তারাই আমেরিকায় ইসলামের দিকে প্রথম ঝুঁকেছিলেন।

তদ্রূপ, আমেরিকায় (এবং সম্ভবত অন্যত্রও) কারাগারে থাকা লোকেরা ইসলাম গ্রহণের প্রতি বেশি আগ্রহী। কারণ তাদের জীবন তখন সংকটে পড়ে এবং তারা নিজেদের একটি নির্জন অবস্থায় আবিষ্কার করেন, যেখানে দুনিয়ার ঝুঁট-ঝামেলাগুলো তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ কমে যায়।

এ সময় তারা নিজেদের জীবন এবং দুনিয়া সম্পর্কে নতুন করে ভাবার সুযোগ পান। তারা যুক্তি দেন, পুনর্বিবেচনা করেন, এবং নিজেদের চিন্তাগুলো নিয়ে ভাবতে শুরু করেন। তখন তারা উপলব্ধি করেন ভারসাম্যের একটি নতুন পথ, আশার নতুন আলো, এবং সর্বোপরি চূড়ান্ত করুণা, ন্যায়বিচার ও বিজয়ের ধারণা। এই উপলব্ধি তাদের এক প্রশান্তির দিকে নিয়ে যায়, যার নামই “ইসলাম”।

আমার কাছে মনে হয়, আজকের বিশ্বও একই ধরনের একটি পরিস্থিতি এবং সুযোগের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তাই বর্তমান সংকটগুলো—পরিবেশগত বা অর্থনৈতিক—যদিও গুরুতর এবং করুণ, তবুও এটি “গোপনে লুকানো একটি আশীর্বাদ” হতে পারে।

আধুনিক মানুষ, যারা সাধারণত আল্লাহ ও দুর্বলদের প্রতি ঔদ্ধত্য দেখায়, তারা এখন ক্রমশ ভেঙে পড়ছে, বিনীত হচ্ছে—এবং বিকল্পের সন্ধান করছে।

আধুনিক সমাজে দাওয়াহ

তাহলে আর কতদিন আমরা যারা “মানবজাতির জন্য সাক্ষী” (শাহাদাহ) হিসাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত, তারা বিভ্রান্ত, আত্মপক্ষ সমর্থনে ব্যস্ত, এবং নীরব থাকব?

বিশেষ করে পশ্চিমা (এবং পশ্চিমা প্রভাবে নিমজ্জিত) মুসলিম সমাজের জন্য, আমাদের সময় এসেছে আমাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা বোঝার। আমাদের সহযাত্রী ও প্রতিবেশীদের জন্য এই সুযোগকে কাজে লাগানো অত্যন্ত জরুরি। আমাদের দায়িত্ব হলো আমাদের সমাজে নবীদের ভূমিকাকে গ্রহণ করা—উঠে দাঁড়ানো এবং সতর্ক করা।

পরবর্তী কিস্তি পড়ুন।

তরজমা করেছেন সিদ্দিকে আকবর।

মূল নিবন্ধ : Islamic Tradition (3) | Modernity | Dr. Uwaymir Anjum