মেন্যু
Menu

ইসলামী ঐতিহ্য : দ্বিতীয় কিস্তি | ওভামির আনজুম

৩ ডিসেম্বর, ২০২৪

প্রথম কিস্তি পড়ুন

ইসলামী ঐতিহ্যের ধারক ও বাহকদের সাথে পরিচিত হওয়ার পর এবং কুরআন-সুন্নাহ বোঝা ও আমল করার ব্যাপারে তাদের ব্যবহৃত পরিভাষাগত হাতিয়ার ও লেখনীর সাথে পরিচিত হওয়ার পর আমাদের এখন দেখতে হবে ইসলামী ঐতিহ্যের পথে অন্তরায় হিসেবে কাজ করছে কোন ব্যাপারগুলো।

ঘরের শত্রু: নিশাপুর ও উমাইয়া সিন্ড্রোম

নিশাপুর সিন্ড্রোম

নিশাপুর বস্তুত হিজরী চতুর্থ থেকে ষষ্ঠ শতকে (ঈসায়ী এক হাজার থেকে বারো শতকে) সারা দুনিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোর মধ্যে একটা। শহরটি ইরানের উত্তর-পূর্ব অংশে চীনগামী পুরাতন সিল্ক রোডের পাশেই অবস্থিত। শহরটি হানাফি এবং শাফেয়িদের মধ্যে তীব্র দ্বন্দ্বের কারণে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। (দেখুন: Al-Ḥakam Al-Naysâbûri’s, Târîkh Naysâbûr in Richard Bulliet’s The Patricians of Nishapur, Harvard University Press, 1972)

হ্যাঁ, এটা ঠিক যে, এই পারস্পরিক দ্বন্দ্ব ও ঘৃণার পেছনে শরয়ী মতবিরোধ ছাড়াও আরো অনেক বিষয় জড়িত ছিল৷ তবে অত্যন্ত দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে তখন আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের শব্দাবলির ব্যাখ্যা সংকীর্ণ পরিচয়-গঠন ও সংকীর্ণ স্বার্থের উৎস হয়ে ওঠে; অথচ বহু বাহ্যিক চ্যালেঞ্জের মুখে উম্মাহর ঐক্যের বিষয়টা ছিল অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ।

আরো দুঃখের ব্যাপার হচ্ছে, নিশাপুরের ট্র্যাজেডি ইসলামী ইতিহাসে ব্যতিক্রমী কিছু নয়। এটি নিয়মিতভাবেই ঘটে চলছে, যার ফলে এখানে এটাকে “নিশাপুর সিন্ড্রোম” বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। যাইহোক, মুসলিম বিশ্বের ধর্মীয় অংশে অজ্ঞতাপ্রসূত ফেরকাবাজি আজ অতীতের সবচেয়ে খারাপ অবস্থাকেও ছাড়িয়ে গেছে।

আমি এটাকে ‘নিশাপুর সিন্ড্রোম’ বলি এই কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার জন্য যে, আমাদের সমস্যা শুধু আধুনিকতা নয়, বরং সংকীর্ণ ফেরকাবাজির ফলও ভয়াবহ হতে পারে; সেটা ফিকহী বা আকিদাগত যে নামেই অভিহিত হোক না কেন!

যেহেতু আমি ইসলামী ঐতিহ্যের দিকে ফিরে যাওয়ার পক্ষে কথা বলছি, তাই আমি সংকীর্ণমনা ও অন্ধভাবে ঐতিহ্যের প্রতি অঙ্গীকারাবদ্ধ হওয়ার সবচেয়ে ক্ষতিকর দিকগুলোও প্রকাশ করতে চাই। একইসাথে, আমি জোর দিয়ে বলতে চাই যে, ভুলভাবে “ঐতিহ্যবাদ” নামে পরিচিত এই ধরনের প্রবণতার বিরুদ্ধে লড়াই করে এটা দূর করা প্রয়োজন। তবে অন্যদিকে, সবকিছুকে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া অর্থাৎ “গোসলের পানির সাথে সাথে সন্তানকেও ফেলে দেওয়া” হবে একটি চরম ভুল।

উমাইয়া সিন্ড্রোম

এটাকে বলা চলে নিশাপুর সিন্ড্রোমের বিপরীত প্রবণতা। যদি নিশাপুর সিন্ড্রোম হয় নগণ্য তাত্ত্বিক বিরোধের কারণে উম্মাহ এবং এর সম্মিলিত স্বার্থকে জলাঞ্জলি দেওয়া, তবে উমাইয়া সিন্ড্রোম হচ্ছে— ঐক্য, ভূখণ্ড রক্ষা ও প্রতিরোধ বা অন্যান্য রাজনৈতিক স্বার্থের অজুহাতে ইসলামের মৌলিক মূলনীতি বিসর্জন দেওয়া।

খিলাফতে রাশেদার অবসানের পর উমাইয়ারা ৪২ থেকে ১৩২ হিজরি পর্যন্ত প্রায় এক শতাব্দী ধরে মুসলিম বিশ্ব শাসন করেছিল। এই শাসন শুরু হয় আমিরে মুয়াবিয়ার (রাঃ) তুলনামূলকভাবে শান্তিপূর্ণ তবে বিতর্কিত রাজতন্ত্র দিয়ে কিন্তু শেষ হয় খিলাফত-ব্যাপী বিরাজমান অস্থিরতার মধ্য দিয়ে। অবশেষে ক্ষমতা দখল করে আব্বাসীরা।

উমাইয়াদের শাসন সময়কালে তাদের মধ্যে বেশ কিছু প্রজ্ঞাবান শাসকও শাসন করেছিলেন। এক্ষেত্রে ‘ইসলামের পঞ্চম খলিফা’ হিসেবে পরিচিত উমর বিন আব্দুল আযিযের (রহঃ) নাম উল্লেখ করতে হয়।

অধিকাংশ উমাইয়া শাসক যদিও অধার্মিক ছিলেন না, কিন্তু তারা বেশি চিন্তিত ছিলেন এমন এক ‘ঐক্য’ নিয়ে। এই ঐক্য মুসলমানদের রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী রাখতে এবং তাদের ইসলামী সাম্রাজ্যের ক্রমবর্ধমান বিকাশ অব্যাহত রাখতে সহায়তা করেছিল ঠিকই, কিন্তু এর জন্য উমাইয়ারা ইসলামের অত্যন্ত মৌলিক কিছু নীতির ব্যাপারে আপোষ করতেও দ্বিধা করেননি। যেমন: শুরা (পরামর্শ), মুসাওয়াত (সাম্য), আদল (ন্যায়বিচার), তাকওয়া (আল্লাহভীতি) এবং কিয়াম (মূল্যবোধ)— ইসলামের এসব মূলনীতি উপেক্ষিত হয়েছিল উল্লেখযোগ্যভাবে।

রাজতান্ত্রিক শাসনের বিরোধীদের উপর নিপীড়ন

এটা ঠিক যে, উমাইয়া শাসকরা ধার্মিক ছিলেন, এমনকি অনেকে তাদের সময়ের সবচেয়ে বিখ্যাত ফকিহদের মতো যোগ্যও ছিলেন। কিন্তু অবশ্যই তাদের ধার্মিকতার একটা সীমাবদ্ধতা ছিল। মুসলমানদের ঐক্যের দোহাই দিয়ে তারা আহলে বাইত ও রাসূলুল্লাহর (সাঃ) সাহাবী ছাড়াও অনেক আলেমদেরকে তাদের শাসনের বিরোধিতা করার কারণে নিপীড়ন করে, এমনকি অনেককে হত্যাও করে।

তারা তাদের পরিবারতান্ত্রিক ক্ষমতা শক্তিশালী করার জন্য শূরা বা পরামর্শ পরিত্যাগ করে। কিন্তু অনেক মুসলমান খেলাফত থেকে রাজতন্ত্রের এই পরিবর্তনকে সহজে মেনে নিতে পারে নি। উমাইয়া যুগের ইতিহাস বিদ্রোহে ভরপুর। তাদের ৯০ বছরের শাসনামলে প্রায় ডজনখানেক বিদ্রোহ হয়, যার বেশিরভাগই পরামর্শব্যবস্থা (শূরা) এবং খেলাফত ব্যবস্থার পুনরুদ্ধারের জন্য। এমনকি নবীজির (সাঃ) ঘনিষ্ঠ সাহাবী আবদুল্লাহ বিন জুবায়ের (রাঃ)-এর বিদ্রোহ প্রায় সফলই হয়ে গিয়েছিল।

উমাইয়ারা তাদের সাম্রাজ্য সম্প্রসারণের জন্য সশস্ত্র জিহাদ জারি রাখে। তবে তা অনেকটা তাদের অভ্যন্তরীণ সমস্যা থেকে জনগণের মনোযোগ হটানোর জন্য এবং খেলাফতের নীতি থেকে তাদের বিচ্যুতিকে বৈধ করার জন্যই। উমর ইবনে আবদুল আজিজ যখন আড়াই বছরের জন্য খলিফা হন, তখন তিনি মুসলিম সৈন্যদের রক্তক্ষয়ী বাইজেন্টাইন সীমান্ত থেকে সরে আসার নির্দেশ দেন এবং শূরা (পরামর্শ), মুসাওয়াত (সমতা) এবং আদলের (ন্যায়বিচার) ইসলামী আদর্শে ফিরিয়ে নিয়ে আসেন।

সীমার ভেতরে থেকেই ঐক্যের ভারসাম্য রক্ষা

গত একশো বছরে ট্রাডিশনাল ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলির মধ্যকার বিভাজনে হতাশ হয়ে অনেক মুসলমান ঐক্য ও রাজনৈতিক স্বার্থে সমস্ত পুরোনো দ্বন্দ্ব, এমনকি মৌলিক নীতিসহ সমস্ত ঐতিহ্যগত বিরোধকে এড়াতে চান। এটা অবশ্য একটি যৌক্তিক কথা যে, মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ হওয়া সত্যিই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে ঐক্যের দোহাই দিয়ে এমন বিষয়গুলোকে উপেক্ষা করা কোনভাবেই সঙ্গত নয়, যেগুলো সমান গুরুত্বপূর্ণ বা এর চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

ইসলামের বড় বড় ইমামরা সকলেই ঐক্যের ব্যাপারে সবিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন (বিশেষত আমরা শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়ার কথা বলতে পারি, যিনি মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ করার প্রচেষ্টার জন্য খ্যাত)। তবে তাদের কেউই অন্তঃসারশূণ্য ঐক্যের জন্য তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক, আকিদাগত এবং আইনী বিষয়গুলোকে অবহেলা করেননি। একইভাবে আমরা দেখি, ইমাম গাজালি বিভিন্ন ব্যাখ্যার সহনশীলতাকে একটি সীমার মধ্যে উন্নীত করার জন্য ‘ফায়সালুত তাফরিকা’ রচনা করেছিলেন। কিন্তু তিনিও ফালাসিফা (দার্শনিক) ও বাতেনি গোষ্ঠীগুলো যখন মতভিন্নতার সকল সীমা পার করে ফেলে, তখন তাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের পক্ষেও সমর্থন দেন।

দিনশেষে, উমাইয়াদের স্বেচ্ছাচারিতা (দ্বীনবিচ্যুত কার্যকলাপ) আমাদের জন্য অনেক বড়ো বড়ো ক্ষতি বয়ে আনে, যার মধ্যে মুসলমানদের মাঝ থেকে শূরা (পরামর্শব্যবস্থা) এবং মুসাওয়াত (সাম্য) নীতির বিলোপ এবং নবীজির (ﷺ) নাতির শাহাদাত কম নয়। শুধু তা-ই নয়, উমাইয়া সিন্ড্রোম পরবর্তীতে সেই সকল সুবিধাবাদীদেরও প্রভাবিত করেছে, যারা সংকীর্ণ জাগতিক লাভের বিনিময়ে সত্যকে বিকিয়ে দেয় এবং ফলশ্রুতিতে উম্মাহর বিশাল ক্ষতি করে।

আমাদের সামনে চ্যালেঞ্জের বিষয় হচ্ছে— ইসলামী ঐতিহ্যের এমন একটি মধ্যমপন্থা খুঁজে বের করা, যা একইসাথে অন্ধ ফিরকাবাজি এবং এমন ঐক্যকেও পরিহার করবে, যা মুসলমানদের নির্ধারক মৌলিক মূল্যবোধ ও নীতিকেই বাদ দিতে চায়।

তৃতীয় কিস্তি পড়ুন।

তরজমা করেছেন সিদ্দিকে আকবর।

মূল নিবন্ধ : Islamic Tradition (2) | The Nishapur and Ummayyad Syndromes | Dr. Uwaymir Anjum