ইসলামী ঐতিহ্য : চতুর্থ কিস্তি (মতপার্থক্য ও বিনয়) | ওভামির আনজুম
আমরা তৃতীয় কিস্তি থেকে আরও এগিয়ে গিয়ে আলোচনা করবো- কিভাবে সাম্প্রতিক শতাব্দীগুলোতে আধুনিকতার চাপে অবহেলিত ইসলামী ঐতিহ্য আমাদের আবারও ইসলামের কার্যকর পথে ফিরিয়ে আনতে পারে।
দ্বিতীয় প্রতিবন্ধকতা : আধুনিকতা (চলমান)
ইসলামী ঐতিহ্যের গতিশীলতা
প্রথমেই, আমাদের মনে রাখা উচিত যে, আল্লাহ এই উম্মাহকে সঠিক পথে পরিচালিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আহলে সুন্নাহর আকিদার অন্যতম মূলনীতি হলো— মুসলিম উম্মাহ কখনো সমষ্টিগতভাবে ভুল পথে যেতে পারে না। তবে এই সুরক্ষা তখনই কার্যকর হবে যখন উম্মাহ সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজের নিষেধ (আমর বিল মা’রূফ ও নাহি আনিল মুনকার) পালনে সচেষ্ট থাকবে।
এই উম্মাহর জন্য পথনির্দেশ অব্যাহত থাকার অন্যতম প্রমাণ হলো— প্রথম যুগের মুসলমানদের বিশ্বাস ও চর্চার সংরক্ষণ। ইসলামের পঞ্চম খলিফা উমর ইবনে আব্দুল আজিজ (রহ.), এবং মহান ইমাম মালিক, ইমাম শাফি’ই (রহ.) সহ অনেক বিদ্বান নিম্নোক্ত কুরআনের আয়াত থেকে এটি নির্ধারণ করেছেন:
“আর কেউ যদি রাসুলের সঙ্গে বিরোধিতা করে, সঠিক পথ স্পষ্ট হওয়ার পরও এবং মুমিনদের পথ ছেড়ে অন্য পথ অনুসরণ করে, তবে আমরা তাকে সেই পথেই চালিত করব যা সে গ্রহণ করেছে এবং তাকে জাহান্নামে প্রবেশ করাবো। আর সেটি কতই না নিকৃষ্ট ঠিকানা!” - (সূরা আন-নিসা, ৪:১১৫)
এই বিশ্বাসকে ইসমাহ বা উম্মাহর “ভুল থেকে সুরক্ষা” বলা হয়, যা ইসলামী আইনের উৎস হিসেবে মুসলমানদের ইজমা’ (সম্মিলিত ঐক্যমত) গ্রহণযোগ্য হওয়ার ভিত্তি তৈরি করে।
কিভাবে বুঝবো আমরা পথভ্রষ্ট হইনি?
কিন্তু অনেকেই জানেন না যে, উম্মাহ কীভাবে পথভ্রষ্ট হওয়া থেকে রক্ষা পায়? যেহেতু নবী (সা.) ছাড়া কেউই ভুল-ত্রুটির ঊর্ধ্বে নন, তাহলে কিভাবে আল্লাহ উম্মাহকে সুরক্ষিত রাখেন? এই প্রশ্নের উত্তরে, শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) সর্বোত্তম ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন। তিনি বলেন, উম্মাহর সুরক্ষার মাধ্যম হলো— সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ পালনের বাধ্যবাধকতা।
আসুন, এই ব্যবস্থার কিছু ফলাফল আমরা বিশ্লেষণ করে দেখি।
এর ফলে উম্মাহর মধ্যে আত্ম-শুদ্ধি ও পারস্পরিক সংশোধনের ধারাবাহিকতা গড়ে ওঠে। এটি শুধু ব্যক্তিগত পর্যায়েই নয়, বরং বিভিন্ন দল, অঞ্চল, মাযহাব, শাসক ও আলেমদের মধ্যেও চলে। এই আত্ম-সমালোচনা ও পারস্পরিক সংশোধনের ধারা ইসলামী ঐতিহ্যের একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।
ইসলামী ঐতিহ্য কখনোই কেবল প্রাথমিক যুগের মুসলিম, বিশেষ করে যারা সরাসবি কুরআন শুনেছেন, তাদের সঠিক ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ এবং পরবর্তী প্রজন্মগুলোর বীরত্বপূর্ণ ও নেক কাজের দলিল নয়, বরং এটি একই সঙ্গে ভুল ব্যাখ্যা ও অপপ্রয়োগ, এবং পূর্বসূরিদের সচেতন বা অসচেতন বিচ্যুতি, বিভ্রান্তি ও ধারাবাহিক ভুল পদক্ষেপের দলিলও বটে।
কারণ মৌলিক ও সর্বসম্মত বিষয়ের বাইরে আমরা নিশ্চিতভাবে জানি না কে সম্পূর্ণ সঠিক ছিল। তাই কুরআন-সুন্নাহর আলোকে এবং ইতিহাসের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের নতুন করে পর্যালোচনা করতে হতে পারে যে, ইসলামী ঐতিহ্যের কোন অংশ নিঃসন্দেহে গ্রহণযোগ্য ও নির্ভুল।
সংস্কার ও আত্মশুদ্ধি কিভাবে বুঝবো?
এই শিক্ষার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো— ইসলামী ঐতিহ্য স্থির নয়, বরং এটি ধারাবাহিকভাবে বিকাশমান এবং নবায়নের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়। এজন্যই তাজদীদ বা পুনর্জাগরণের ধারণা ইসলাম ধর্মের সহজাত বৈশিষ্ট্য। তবে এটি ইসলামের সংস্কার নয়(যেভাবে আজকাল অনেকে, বিশেষ করে পশ্চিমা ও পাশ্চাত্যপ্রভাবিত মুসলিমরা, তা বোঝাতে চান), বরং ইসলামের আলোকে আমাদের নিজেদের সংস্কার। অবশ্য, পুনর্জাগরণ বা সংস্কারের পক্ষে তর্ক করার সময় আমাদের মধ্যে কেউ কেউ হয়তো অন্যদের বোঝাতে হবে যে, তাদের ইসলামি ঐতিহ্য বোঝার ধরণে ভুল আছে এবং তা সংস্কারের প্রয়োজন, অথবা দ্বীনের কিছু বিষয় অবহেলিত হয়ে গেছে এবং সেগুলোকে আবার জীবিত করে তোলা দরকার।
আমাদের মধ্যে এই বিষয়টা বোঝা দরকার, কারণ সুপরিচিত একটি হাদিস আছে— “প্রতিটি শতাব্দীর শুরুতে আল্লাহ এমন একজন (বা একদল) পাঠাবেন, যারা দ্বীনের পুনর্জাগরণ করবে” (আবু দাউদ)। এই হাদিসকে কেন্দ্র করে অনেক লেখা হয়েছে। তাই এ বিষয়ে আমি বিস্তারিত না গিয়ে, বরং ঐতিহ্যের এমন কিছু দিকের দিকে যাব যা তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব পায়।
ঐক্য ও বৈচিত্র্য এবং এদের সীমারেখা
আমরা জানি, ইসলামী উম্মাহ অনেক গোষ্ঠীতে বিভক্ত, ফলে ইসলামী ঐতিহ্যও অনেক গোষ্ঠীতে বিভক্ত। কিন্তু একে নেতিবাচকভাবে না দেখে বরং এটিকে আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাদের নিজেদের শুদ্ধ করার সুযোগ হিসেবে দেখা উচিত। তবে আমাদের ঐতিহ্যের ব্যাপক ও আন্তরিক অধ্যয়ন ছাড়া এটি অর্জন সম্ভব নয়।
বিভিন্ন মতভেদ ও তার প্রকারভেদ, এবং কোন্ ধরনের মতভেদ ইতিবাচক আর কোনটি নেতিবাচক—তা নিয়ে আলোচনায় যাওয়ার আগে আসুন আমরা এমন কিছু দেখি, যেগুলো সকল চিন্তাশীল মুসলিমের মনেই জাগে: আল্লাহ কেন ইসলামের বিষয়ে মতভেদ ও অস্পষ্টতা তৈরি হতে দেন?
কেন কুরআনের ব্যাখ্যায় এত পার্থক্য? কেন কিছু হাদিসকে আলেমরা ভিন্নভাবে মূল্যায়ন করেন? কেন সুন্নি-শিয়া বিভক্তি বিদ্যমান? কেন সুন্নি মুসলিমদের মধ্যে একদল কালাম কিংবা তাসাউফকে গ্রহণ করে, আর অন্যদল এগুলোকে ভ্রান্ত নব উদ্ভাবন মনে করে? কেন মুসলিম বিচারকদের মধ্যে এত মতভেদ বিদ্যমান? কেন ইসলামী আইন (ফিকহ)-এ এত পার্থক্য?
আমাদের মতপার্থক্য কীভাবে হৃদয় ও বুদ্ধিকে পরিশীলিত করে?
যদি ধর্ম সম্পর্কে এ ধরণের প্রশ্ন আপনাকে হতাশ করে তোলে, তাহলে আমি বলব, আপনার উদ্বেগ একেবারেই যথার্থ। এই বিভাজনের পেছনে অনেক ঐতিহাসিক, দার্শনিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণ ও ব্যাখ্যা রয়েছে, তবে এগুলো হতাশা পুরোপুরি দূর করতে পারে না। সত্য যদি সবসময় স্পষ্ট, স্বচ্ছ হতো—তাহলে হয়তো অনেক সহজ হতো। কিন্তু বাস্তবে, সেটা কি সত্যিই আমাদের জন্য সর্বোত্তম হতো? আমার বিশ্বাস, না। হতাশাজনক এবং অনেক সময় বেদনাদায়ক হলেও মতভেদ ও বিভ্রান্তি আল্লাহর পরিকল্পনারই একটি অংশ।
আমাদের জীবন ও ঈমানের পরীক্ষার অংশ হলো অনিশ্চয়তার মাঝে বিনয় ও দৃঢ়তা বজায় রাখা। আমরা এমন এক জগতে বাস করি যেখানে আবেগ ও সম্পর্ক থেকে শুরু করে অর্থনীতি ও সমাজব্যবস্থার অনেক কিছুই অনিশ্চয়তায় ঘেরা। তবুও, আমাদেরকে নৈতিকভাবে সঠিক কাজই করতে হয়।
ফিকহি মতভেদ, হাদীসের বর্ণনার বিভিন্ন মাত্রার নির্ভরযোগ্যতা, এবং কুরআনের ব্যাখ্যায় যে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়, তা একদিকে যেমন পরীক্ষা, অন্যদিকে তেমনি আমাদের জন্য একটি নৈতিক প্রশিক্ষণও বটে। আমাদের দায়িত্ব হলো—এই অনিশ্চয়তার মাঝে থেকেও সত্যকে খুঁজে নেওয়া, যেমন ধান থেকে চিটা আলাদা করা। একইসঙ্গে, যারা ভিন্নভাবে বা এমনকি ভুলভাবে সেই বাছাইয়ের চেষ্টা করছে, তাদের প্রতিও সম্মান বজায় রাখা।
এতে ইসলামি ধার্মিকতা ও নৈতিকতার প্রকৃতি রূপান্তরিত হয়। এটি শুধু অন্তরের নয়, বরং বুদ্ধিমত্তারও পরীক্ষা। একদিকে আমাদের বিনয়ী হতে হবে, অপরদিকে জানতে হবে সেই সীমারেখাও—যেখানে একজন বিশ্বাসীকে অবস্থান নিতে হয়, এবং এমন অনিশ্চয়তার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হয় যা ঈমান দুর্বল করে দিতে চায়।
মানুষকে যদি শুধু সাদা-কালো নির্দেশনা অনুসরণ করতে বলা হতো, তবে তা অত্যন্ত সহজ, নিষ্প্রাণ এবং আমাদের সৃষ্ট স্বভাবের পরিপন্থী হতো। সেই পথ আমাদের চারিত্রিক ও বৌদ্ধিক গুণাবলিকে পরিপক্ব করে তুলতে পারত না কেননা এগুলো জটিল নৈতিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়েই গড়ে উঠে।
বৈধ মতপার্থক্য
মতভেদগুলোর প্রকৃতি ও প্রকারভেদের দিকে নজর দিলে দেখা যায়, কিছু মতভেদ একেবারেই বৈধ এমনকি গ্রহণযোগ্য—যেমন, যেগুলোকে ফিকহি পরিভাষায় মাসায়িল আল-ইজতিহাদ বলা হয়, অর্থাৎ স্বতন্ত্র ও স্বাধীনভাবে চিন্তার পরিসরে পড়ে এমন বিষয়। অন্যদিকে, কিছু মতভেদ আছে যেগুলো বৈধ নয়।
অর্থাৎ, বিভিন্ন গোষ্ঠী যেসব মতপার্থক্যের ভিত্তিতে উদ্ভব হয়েছে, সেগুলোর কিছু কিছু বৈধ, এবং এগুলোকে ব্যাখ্যা করা যায় ইসলামী পণ্ডিতদের ব্যবহৃত একটি পরিভাষার মাধ্যমে—ইখতিলাফ আল-তানাওউ‘, অর্থাৎ “বৈচিত্র্যজনিত মতপার্থক্য”।
প্রকৃত অর্থে, এই ধরনের মতপার্থক্য নির্দিষ্ট মত বা আমলের ভিন্নতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে এবং তা অনিবার্যভাবে আলাদা গোষ্ঠী বা পরিচয়ের জন্ম দেয় না—যদিও বাস্তবে তা কখনো কখনো দিতে পারে, যেমনটি আমরা পরে দেখব।
এই মতবিরোধগুলো মূলত আল্লাহ তায়ালার সৃষ্টি-কৌশলেরই একটি অংশ। তা হলো, মানুষকে তিনি যেমন করেছেন—সংস্কৃতি, ভাষা, অভিজ্ঞতা, পছন্দ-অপছন্দ, স্বভাব ইত্যাদিতে ভিন্নতাসম্পন্ন—তেমন স্বভাবজাত ভিন্নতা থেকেই এসব মতপার্থক্যের উৎপত্তি ঘটে।
অবৈধ মতপার্থক্য
আরেক ধরণের মতবিরোধ রয়েছে যেগুলো গ্রহণযোগ্য নয়। এগুলো জন্ম নেয় ভুল বোঝা, অজ্ঞতা, বিদ্বেষ বা সীমালঙ্ঘন থেকে। কুরআনে বারবার উল্লেখ আছে পূর্ববর্তী ধর্মগ্রন্থপ্রাপ্ত জাতিগুলো বিদ্বেষবশত (বাগইয়ান বাইনাহুম) বিভেদে লিপ্ত হয়েছিল। এই বিভেদ হৃদয়ে ঘৃণা তৈরি করে এবং সাম্প্রদায়িকতা ও দলবাজির (তাফরিকা) জন্ম দেয়, যাকে কুরআন ও সুন্নাহ কঠোরভাবে নিষেধ করেছে। (যেমন, সূরা আলে ইমরান, ৩:১০৩-১০৫; সূরা আনআম, ৬:১৫৩; সূরা আশ-শূরা, ৪২:১৩। তাফরিকা শব্দটি কোরআনে আরেকটি প্রসঙ্গে ব্যবহৃত হয়েছে, যেখানে এটি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে আপোষহীন মতবিরোধের ফলে আলাদা হয়ে যাওয়ার অর্থে এসেছে। এটি এই শব্দটির বাস্তব বা স্পষ্ট তাৎপর্য আমাদের কাছে আরও পরিষ্কার করে তোলে (সূরা আন-নিসা, ৪:১৩০)। কুরআন আরও বলছে, আহলে কিতাবদের মধ্যে আল্লাহর জ্ঞানসম্পন্ন আসমানী কিতাব থাকার পরও বিদ্বেষের কারণে তাফরিকা বা বিভেদ তৈরি হয়েছে। (সূরা আশ-শুরা, ৪২:১৪; সূরা আল-বাইয়্যিনাহ, ৯৮:৪)।
তবে সব অবৈধ মতপার্থক্য বিদ্বেষ বা সীমালঙ্ঘনমূলক নয়। অনেক সময় অজ্ঞতা বা ভুল বুঝার কারণেও মানুষ ভুল মত ধারণ করে। এধরনের মত গ্রহণ কাউকে অপরিহার্যভাবে দোষারোপযোগ্য করে তোলে না, কারণ আন্তরিকতা থাকা সত্বেও ভুল হতে পারে। এই বাস্তবতাই একটি গুরুত্বপূর্ণ হাদীসে প্রতিফলিত হয়েছে, যা ইসলামী জ্ঞানের মূল ভিত্তিগুলোর একটি। নবী (সা.) বলেছেন:
“কোনো বিচারক ইজতিহাদ করে যদি সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়, তবে সে দ্বিগুণ পুরস্কার পাবে। আর যদি ভুল করে, তবে সে একগুণ পুরস্কার পাবে।” (মুসলিম)
নির্দ্বিধায় বলা যায়, মুমিনদের মধ্যে অবৈধ মতপার্থক্যের বড় একটি অংশই এ ধরনের। তাই নসিহা (সৎ পরামর্শ, আলাপ, সংশোধন) এবং আমর বিল মা’রুফ ও নাহি আনিল মুনকার (সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। এসব প্রয়োগে ভুল মত কমে আসে এবং একতা রক্ষা পায়।
এ ধরনের মতভেদে কোনো পক্ষ ভুল মত পোষণ করলেও, তা অনিবার্যভাবে তাদের ঈমানের পরিচয় কেড়ে নেয় না। যেমন আল্লাহ বলেন:
“আর যদি মুমিনদের দুটি দল পরস্পরের সঙ্গে লড়াই করে, তবে তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দাও। আর যদি তাদের একদল অপর দলের ওপর জুলুম করে, তবে জুলুমকারী দলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো, যতক্ষণ না তারা আল্লাহর আদেশে ফিরে আসে। … নিঃসন্দেহে মুমিনগণ পরস্পর ভাই ভাই, সুতরাং তোমরা তোমাদের দুই ভাইয়ের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা করো…” (সূরা হুজরাত, ৪৯:৯–১০)।
তবে কোনো দল যদি ভুল প্রমাণিত হওয়ার পরও মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ জামাআতে ফিরে না আসে, তখনই তারা মুমিনের মর্যাদা হারায়। (প্রাথমিক যুগের ফিকহবিদগণ এই প্রসঙ্গটি বিশেষভাবে আলোচনা করেছেন সেই চরম পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে, যেখানে কোনো দল কুরআন-হাদীসের ব্যাখ্যার (তাওইল) ভিত্তিতে মুসলিম শাসকের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করে—এদেরকে বলা হয় আহলুল বাগি বা বুঘাত।)
বৈধ ও অবৈধ মতপার্থক্যের সীমারেখা
একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতাবাণী মতভেদের ধরন ও তার ফলে গঠিত বিভিন্ন দলের প্রাথমিক শ্রেণিবিন্যাস—যেমন বৈচিত্র্যজনিত মতভেদ হলে বৈধ এবং বিভেদের উদ্দেশ্যে সৃষ্ট মতভেদ হলে অবৈধ—এই সরল বিভাজনকে জটিল করে তোলে। তা হলো:
যে মতভেদ শুরুতে বৈচিত্র্যের স্বাভাবিক প্রকাশ ছিল, তা যদি সীমালঙ্ঘন ও কু-প্রবৃত্তির দ্বারা পরিচালিত হয়, তবে তা মন্দ উদ্দেশ্যের হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। অন্যদিকে, যে মতভেদ শুরুতে ভুল ব্যাখ্যার ফল ছিল, তা আন্তরিক পরামর্শ ও বিনয়পূর্ণ মনোভাবের মাধ্যমে গভীরতর উপলব্ধির উৎস হয়ে উঠতে পারে।
ইনশাআল্লাহ, পরবর্তী অংশে আমরা ইসলামের ঐতিহ্যের চারটি ভিন্নধর্মী মতপার্থক্যের প্রথম রূপ বিশ্লেষণ করবো, যা আমাদের বুঝতে সহায়তা করবে— কখন মতপার্থক্য কল্যাণকর এবং কখন এটি ফিতনার কারণ হতে পারে।
তরজমা করেছেন সিদ্দিকে আকবর।
Main article - https://www.aljumuah.com/islamic-tradition-4-differences-of-opinion-and-humility-dr-uwaymir-anjum/