মেন্যু
Menu

ইসলামী ঐতিহ্য (৬/৬) | ওভামির আনজুম

১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

 

একতা ও বৈচিত্র্যের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং এ দুটির সীমা-পরিসীমা নিয়ে আমাদের আলোচনার ধারাবাহিকতায় (৫ম কিস্তি পড়ুন) আজ আমরা ইসলামী ঐতিহ্যে মতপার্থক্যের দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ ধারা, গতিপথ, সিলসিলা বা ‘ট্রাজেক্টরি’র ওপর আলোকপাত করব। প্রথমটির মতো দ্বিতীয়টিও ইতিবাচক, তবে তৃতীয় ও চতুর্থটি নেতিবাচক। স্মরণ করুন, প্রথম ধারাটি ছিল ‘বিতর্কের মাধ্যমে সত্যের অনুসন্ধান’—যার গর্ভ থেকে ইসলামী ফিকহের প্রচলিত মাযহাবগুলোর বিকাশ ঘটেছিল। বিভিন্ন মাযহাব এবং তাঁদের ইমামদের বুদ্ধিবৃত্তিক আদান-প্রদানের মধ্য দিয়েই ফিকহি পদ্ধতির ‘ভারসাম্য ও নিয়ন্ত্রণ’ (checks and balances) ব্যবস্থাটি গড়ে উঠেছিল।

 

সিলসিলা ২: বৈচিত্র্যের মধ্যেই সমৃদ্ধি

বৈচিত্র্য (তানাওউ) ও বিভক্তি (তাফরিকা)-র জটিল রসায়ন সম্পর্কে একটি সূক্ষ্ম অথচ প্রায়শই উপেক্ষিত বাস্তবতা হলো—যদি বৈধ ও স্বাভাবিক বৈচিত্র্যকে জোরপূর্বক কোনো কৃত্রিম বা অকালপক্ব সমাধানের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়, তবে তা হিতে বিপরীত হয়ে বিভক্তির জন্ম দিতে পারে।

 

বৈধ মতপার্থক্যের স্বীকৃতি

পূর্বোল্লিখিত উদাহরণগুলো থেকে স্পষ্ট যে, সালাফ বা সৎকর্মশীল পূর্ববর্তী ইমামরা যেমন ইসলামের মূলনীতির পরিপন্থী অবৈধ দাবিগুলোকে বরদাশত করেননি, তেমনি তাঁরা বৈধ ও যৌক্তিক মতপার্থক্যগুলোকে জোরপূর্বক একাকার করে ফেলারও ঘোর বিরোধী ছিলেন।

 

এর ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত মেলে ইমাম মালিক (রহ.) এর অবস্থানে। খলিফা আল-মানসুর এবং পরবর্তীকালে হারুন আর-রশিদ যখন ইমাম মালিকের রচিত হাদিস ও ফিকহ গ্রন্থ ‘আল-মুওয়াত্তা’ কে সমগ্র ইসলামী ভূখণ্ডে রাষ্ট্রীয় আইন হিসেবে বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব দেন, তখন ইমাম মালিক তা সযত্নে প্রত্যাখ্যান করেন। তাঁর যুক্তি ছিল—ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলের মানুষ সেসব অঞ্চলে বসতি স্থাপনকারী সাহাবি ও তাবে’ঈদের শিক্ষা ও আমল অনুসরণ করে আসছেন, যা তাদের জন্য বৈধ।

 

অন্যভাবে বলা যায়, ইমাম মালিক মুসলমানদের ওপর জবরদস্তিমূলক একরূপকতা (uniformity) চাপিয়ে দেওয়াকে অপছন্দ করতেন—এমনকি তা তাঁর নিজের মতের বিজয় হলেও। (এই ঘটনাটি আবু নুয়াইম আল-ইসফাহানি, ইবনু আবি হাতিম প্রমুখ বর্ণনা করেছেন; বিস্তারিত দেখুন: ইউ. এফ. আবদাল্লাহর পিএইচডি থিসিস, শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৭৮, পৃ. ১০০)।

 

অথচ এই একই ইমাম মালিক (রহ.), যিনি বৈধ মতপার্থক্যের ক্ষেত্রে এত উদার ছিলেন, তিনিই আবার ‘আহলুল আহওয়া’ বা খেয়াল-পূজারি সম্প্রদায়ের প্রশ্নে ছিলেন কঠোর। যারা আল্লাহ তা’আলার আরশে আসীন হওয়ার পদ্ধতির মতো নিষিদ্ধ তাত্ত্বিক বিষয় নিয়ে অহেতুক চুলচেরা বিশ্লেষণ করতো, তিনি তাদের নিজের দরস বা পাঠচক্র থেকে বের করে দিতেন।

 

সঠিক বোঝাপড়ার জন্য সময়ের প্রয়োজন

গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক নীতিগুলোর বিষয়ে বৈধ মতপার্থক্যের নির্যাসটুকু কেবল তখনই পুরোপুরি অনুধাবন করা সম্ভব, যখন দীর্ঘ সময় নিয়ে সেগুলোর ফলাফল পর্যবেক্ষণ করা হয়। চার বা ততোধিক ফিকহ এর স্কুল (মাযহাব) এর অস্তিত্বের মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহ ঠিক এই সুবিধাটিই লাভ করেছে।

 

একটি নির্দিষ্ট ইমামের প্রতিষ্ঠিত নীতির অধীনে কাজ করা কোনো একক গোষ্ঠী কোনো কারণে নির্দিষ্ট ইস্যুতে বা পরিস্থিতিতে পক্ষপাতদুষ্ট হতেই পারে। কিন্তু যখন একাধিক মাযহাব একই বিশ্বাস ও মিশনের অধীনে থেকেও ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলে এবং ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যাপদ্ধতির আলোকে স্বাধীনভাবে কাজ করে, তখন সবার একই ধরনের ভুল বা পক্ষপাতের শিকার হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না।

 

পারস্পরিক সংশোধনের কর্মপদ্ধতি

উদাহরণস্বরূপ, হানাফি মাযহাব সাধারণ বিধানকে (আম) বিশেষ বিধানের (খাস) ওপর এবং যুক্তিপূর্ণ বিশ্লেষণকে দুর্বল হাদিসের ওপর অগ্রাধিকার দেয়। অন্যদিকে শাফিঈ মাযহাব বিশেষ বিধানকে সাধারণ বিধানের ওপর প্রাধান্য দেয়। মূলত এই পদ্ধতিগুলো একে অপরের জন্য ‘চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স’ হিসেবে কাজ করে।

 

একইভাবে, মালিকি মাযহাব যেখানে মদিনাবাসীর ‘আমল’ বা নিরবচ্ছিন্ন ও জীবন্ত ঐতিহ্যকে প্রাধান্য দেয়, সেখানে হাম্বলি ও শাফিঈ মাযহাব নির্দিষ্ট সনদযুক্ত হাদিসকে (ইসনাদ) বেশি গুরুত্ব দেয়। এই বৈচিত্র্য একে অপরের ত্রুটি বিমোচনে সহায়ক ভূমিকা রাখে।

 

বিবাদের নিরসনই মুখ্য

তাত্ত্বিকভাবে সুন্নি মুসলমানরা এই মর্মে ঐকমত্য পোষণ করেন যে, উসূল বা মূলনীতির ব্যাখ্যায় প্রাথমিক যুগের ইমামদের মতপার্থক্যগুলো বৈধ এবং এর ফলে সৃষ্ট চারটি (বা ততোধিক) মাযহাবই সঠিক।

 

তবে বাস্তবে এই সহনশীলতা সবসময় রক্ষা করা হয়নি। মধ্যযুগে এ বিষয়ে অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও উদারনৈতিক রচনা হলো শায়খুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যার ‘রাফউল মালাম আনিল আইম্মাতিল আলাম’ (মহান ইমামদের ওপর থেকে অপবাদ মোচন)। মূলকথা হলো, বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা ও ব্যাখ্যার ভিন্নতা ততক্ষণ পর্যন্ত বৈধ, যতক্ষণ না তা ফিতনা, অনৈক্য এবং উম্মাহর মধ্যে দেওয়াল তুলে দিয়ে সংকীর্ণ গোষ্ঠীতন্ত্রের জন্ম দেয়।

 

সিলসিলা ৩: বিয়োগান্তক পরিণতি—অসহিষ্ণুতা ও অহেতুক সাম্প্রদায়িকতা

আগেই বলা হয়েছে, ইসলামী ঐতিহ্য কেবল ভালো লাগার মতো রোমান্টিক গল্পের সমষ্টি নয়; এটি ইতিহাসে আল্লাহর বাণীর সাথে মুসলমানদের বোঝাপড়া ও সংগ্রামের নির্মোহ দলিল। এতে ভালো, মন্দ ও অসুন্দর—সবই আছে।

 

অজ্ঞ ও অন্ধদের দ্বারা মতপার্থক্যের অপব্যবহার

সবচেয়ে জঘন্য প্রবণতাটি দেখা যায় তখন, যখন ইমাম ও বিজ্ঞ আলেমদের দ্বারা স্বীকৃত ‘বৈধ মতপার্থক্য’গুলোকে কিছু কট্টর অনুসারী বা স্বার্থান্বেষী নামধারী আলেম ‘অসহনীয়’ বা ‘বাতিল’ বলে প্রচার করে। (বলাই বাহুল্য, আলেমরাও পাপের ঊর্ধ্বে নন; তবে কুরআনের ভাষায় প্রকৃত আলেম বা জ্ঞানী তো তাঁরাই, যারা আল্লাহকে ভয় করেন)।

 

অন্যের ব্যাখ্যা বা মাযহাবকে অবৈধ ঘোষণা করা প্রায়শই আধিপত্য বিস্তার এবং নিজস্ব সংকীর্ণ দলীয় পরিচয় নির্মাণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়—যা শেষ পর্যন্ত ঘৃণা ও বিভেদ সৃষ্টি করে। এর উদাহরণ হলো সুন্নি মাযহাবগুলোর অভ্যন্তরীণ রেষারেষি, যাকে আমরা দ্বিতীয় পর্বে ‘নিশাপুর সিনড্রোম’ হিসেবে চিহ্নিত করেছিলাম।

 

অপ্রয়োজনীয় বিদ্বেষ

আমি একে বলি ‘অহেতুক সাম্প্রদায়িকতা’ (Gratuitous Sectarianism), কারণ এই বিভাজন অপরিহার্য ছিল না। এটি ইসলামী ইতিহাসের এক বড় ট্র্যাজেডি, যা মুসলমানদের পারস্পরিক সহাবস্থানের গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়কে বহুবার কলঙ্কিত করেছে। অবশ্য সুন্নি, শিয়া বা খারিজিদের মতো মৌলিক ও অমীমাংসিত মতপার্থক্যের কারণে সৃষ্ট সাম্প্রদায়িকতা ভিন্ন বিষয়, যা মোকাবিলার জন্য আমাদের ভিন্ন পন্থা শিখতে হবে।

 

সিলসিলা ৪: অন্তঃসারশূন্য ঐক্য এবং উগ্র সাম্প্রদায়িকতার দোলাচল

কিছু মতপার্থক্য নিশ্চিতভাবেই অবৈধ—যেমন কুরআন ও সুন্নাহর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এ ধরনের বিচ্যুতি সমাজে অবিচার ও ফাসাদ সৃষ্টি করে। কিন্তু জটিলতা তৈরি হয় তখন, যখন প্রশ্ন ওঠে—এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করার সঠিক পদ্ধতি কী?

 

অন্যায় ও বিভ্রান্তির মোকাবিলায় ব্যর্থতা

অনেকে স্বার্থরক্ষা বা উদাসীনতার কারণে স্পষ্ট ভুলের প্রতিবাদ করেন না, যা দ্বীনের নির্যাসকে লঘু করে দেয়। অথচ আল্লাহ যা শিখিয়েছেন, সেই সত্য জ্ঞান গোপন করা অন্যতম কবিরা গুনাহ। আল্লাহ বলেন:

“আমি যে সুস্পষ্ট নিদর্শন ও হেদায়েত নাজিল করেছি, মানুষের জন্য কিতাবে তা স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করার পরও যারা তা গোপন রাখে, আল্লাহ তাদের লানত দেন এবং লানতকারীরাও তাদের লানত দেয়।” [সূরা বাকারা, ২:১৫৯]

 

মহামিলন নাকি মহাবিপদ? হারুন (আ.)-এর সংকট

কিন্তু যদি এমন হয় যে, স্পষ্ট ভুলের প্রতিবাদ করতে গেলে কেবল ব্যক্তিগত ক্ষতিই নয়, বরং পুরো সম্প্রদায়ে বড় ধরনের ভাঙন বা ফিতনা সৃষ্টি হবে—তখন করণীয় কী? কুরআনে মূসা ও হারুন (আ.) এর ঘটনায় এর একটি চমৎকার উদাহরণ মেলে। মূসা (আ.) এর অনুপস্থিতিতে বনী ইসরাঈল যখন বাছুর পূজায় লিপ্ত হলো, তখন হারুন (আ.) নিষেধ করা সত্ত্বেও তারা থামল না। তখন হারুন (আ.) একটি উভয়সংকটে পড়লেন।

মূসা (আ.) ফিরে এসে হারুন (আ.) কে ভর্ৎসনা করে বললেন, “তুমি যখন দেখলে তারা পথভ্রষ্ট হয়েছে, তখন আমার অনুসরণ করা থেকে কিসে তোমাকে বিরত রাখল?” উত্তরে হারুন (আ.) বললেন, “হে আমার সহোদর! আমার দাড়ি বা চুল ধরবেন না। আমি আশঙ্কা করেছিলাম যে আপনি বলবেন: ‘তুমি বনী ইসরাঈলের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করেছ এবং আমার কথার অপেক্ষা করোনি’।” [সূরা ত্ব-হা, ২০:৯০-৯৪]

 

লক্ষ্য করুন, হারুন (আ.) শিরক হতে দেখেই তা বারণ করেছিলেন। কিন্তু যখন তারা থামল না, তিনি বুঝলেন—এই মুহূর্তে শক্তি প্রয়োগ করলে বনী ইসরাঈল দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যাবে এবং গৃহযুদ্ধ শুরু হতে পারে। মূসা (আ.) এর মতো চূড়ান্ত কর্তৃত্ব তাঁর ছিল না। তাই তিনি মূসা (আ.) এর ফিরে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করা এবং সাময়িকভাবে সবচেয়ে বড় পাপ (শিরক) সহ্য করে নেওয়াকেই ‘কম ক্ষতিকর’ মনে করলেন। তিনি ঐক্যের স্বার্থে সাময়িক আপস করলেন।

 

ফিতনা মোকাবিলার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা

সুতরাং, স্পষ্ট বিভ্রান্তি বা বিদআতের মুখোমুখি হয়েও অনেক সময় ঐক্যের স্বার্থে এবং উম্মাহর শক্তি অটুট রাখতে সহনশীলতা প্রদর্শন করতে হয়—হয়তো কেবল মৌখিক প্রতিবাদ বা অন্তরে ঘৃণা পোষণ করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে হয়।

 

দিনশেষে, এই সিদ্ধান্তগুলো কেবল মাসআলা জানার ওপর নির্ভর করে না; বরং এর জন্য প্রয়োজন প্রেক্ষাপট সম্পর্কে জ্ঞান, নিজের ক্ষমতা ও প্রভাবের সীমা বোঝা এবং ফলাফলের সঠিক মূল্যায়ন। হারুন (আ.) এর ঘটনা থেকে আমরা ‘ধৈর্য’ ও ‘প্রজ্ঞা’র সেই পাঠই পাই।

 

এটি কোনো ধরাবাঁধা ফর্মুলা নয়, বরং এটি ‘ইসলামী রাজনীতি’ বা সিয়াসাহ-এর অংশ—যেখানে ক্ষতি ও উপকারের (harm and benefit) তুলনামূলক হিসাব করতে হয়। বর্তমান জটিল বিশ্বে এর জন্য কেবল ধর্মীয় জ্ঞানই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন সমাজবিজ্ঞান ও ইতিহাসের গভীর পাঠ।

 

ইসলামী ঐতিহ্য পুনরুদ্ধার

এ কারণেই আমার মতে, ইসলামী ঐতিহ্যকে পুনরুজ্জীবিত করতে হলে আমাদের জন্য সমাজবিজ্ঞানের ইসলামী ধারা গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি।

 

“তোমরাই হলে শ্রেষ্ঠ উম্মত, মানবজাতির কল্যাণের জন্য যাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে; তোমরা সৎকাজের আদেশ দাও, অসৎকাজ থেকে নিষেধ করো এবং আল্লাহর ওপর বিশ্বাস রাখো।” [সূরা আলে ইমরান, ৩:১১০]

 

 তরজমা করেছেন সিদ্দিকে আকবর।

মূল নিবন্ধ দেখুন এখানে ।