মেন্যু
Menu

ইসলামী ঐতিহ্য (৫/৬) | ওভামির আনজুম

১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

 

ঐক্য ও বৈচিত্র্য এবং উভয়ের সীমারেখা বিষয়ক আমাদের আলোচনা অব্যাহত রেখে (চতুর্থ কিস্তির সূত্র ধরে), আমরা এখানে ইসলামী ঐতিহ্যের চারটি মতভিন্নতার সিলসিলার (Trajectories of Disagreement) প্রথমটি পর্যালোচনা করবো।

 

সিলসিলা ১: ইসলামী ঐতিহ্যের এক মহাকাব্যিক সাফল্য: বিতর্কের মধ্য দিয়ে সত্যের সন্ধান

 

প্রাথমিক দৃষ্টিতে কিছু মতভেদকে অবৈধ বা অনৈক্যের কারণ মনে হতে পারে। কিন্তু যখন সেগুলোকে সঠিক জ্ঞান এবং কুরআন-সুন্নাহর কষ্টিপাথরে বিচার করা হয়, এবং সব পক্ষের দলীলগুলো আদব ও শৃঙ্খলার সাথে উপস্থাপন করা হয়—তখন একটি সাধারণ ভিত্তি বা ‘মাশতারাক’ জমিন দৃশ্যমান হয়। পরিশেষে, একাধিক ভিন্ন মতকেও তখন শরঈ দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য বা ‘মাকবূল’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া সম্ভব হয়।

এর একটি উজ্জ্বল উদাহরণ হলো ফিকহী (ইসলামি আইনশাস্ত্র) মাসআলায় আমাদের পূর্ববর্তী সৎকর্মশীলগণের (সালাফ) মতপার্থক্য। যেমন—ব্যক্তিগত বুদ্ধিবৃত্তিক রায় (রা’য়) এবং মদীনার সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত আমল (আ‘মাল)-এর মর্যাদা নিয়ে যে বিতর্ক ছিল, পরবর্তীকালে তার একটি চমৎকার সমন্বয় (Synthesis) করা হয়েছে।

 

ঐতিহ্যবাদীদের আবির্ভাব

সৎপথপ্রাপ্ত খলিফাদের (খোলাফায়ে রাশেদার) পরবর্তী দুই থেকে তিন শতাব্দী পর্যন্ত ইসলামী ফিকহের কোনো সুনির্দিষ্ট মাযহাব বা আইনি কাঠামো ছিল না। সে সময় দ্বীনি জ্ঞান ছিল সর্বজনীন; শিক্ষা-দীক্ষা মূলত আবর্তিত হতো সাহাবিদের ছাত্র (তাবে’ঈ) এবং ছাত্রদের যারা ছাত্র তাদেরকে (তাবে-তাবে’ঈ) কেন্দ্র করে।

 

(১) আহল আল-আছার (আহলে আছার) বা হাদীসপন্থী ধারার উত্থান: মদীনাকে কেন্দ্র করে এমন কিছু ইলমি হালাকা বা চক্র গড়ে ওঠে, যারা নবীজি (সা.) ও সাহাবিদের বর্ণনার (আছার/রিওয়ায়াত) ওপর ভিত্তি করে জ্ঞানচর্চাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতেন। একারণে এই ধারার উলামায়ে কেরাম ‘আহলে আছার’ বা ‘ঐতিহ্যবাদী’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। ইসলামের দ্বিতীয় শতাব্দীতে এই চিন্তাধারা ইমাম মালেক (রহ.) এর মদীনার মাযহাব এবং ইমাম আওযায়ী (রহ.) এর দামেস্কের মাযহাবের মধ্য দিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়।

 

(২) আহল আর-রায় (আহলে রা’য়) বা যুক্তিনির্ভর ধারার উত্থান: দ্বিতীয় ধারাটির উদ্ভব ঘটে ইরাকের কুফায়। খলীফা উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) এর প্রতিষ্ঠিত এই নতুন নগরীটি ছিল মূলত মুজাহিদ ও মোহাজির আরব গোত্র এবং নওমুসলিম পারসিকদের আবাসস্থল। সীমান্তবর্তী জনপদ হওয়ায় কুফাবাসীকে এমন অনেক নব্য পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হতো, যা মক্কা-মদীনার মতো ধ্রুপদী ইসলামী কেন্দ্রগুলোতে সচরাচর দেখা যেত না।

সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) এবং তাঁর তাবে'ঈ ছাত্রদের শিক্ষার ওপর ভিত্তি করে কুফার ইলমি বলয় গড়ে ওঠে। তাঁরা কুরআন এবং সুপ্রসিদ্ধ হাদীসগুলোকে সামনে রেখে ‘আকলী’ বা বুদ্ধিবৃত্তিক ইজতিহাদের ওপর জোর দেন। ফলে তাঁরা ‘আহলে রা’য়’ বা ‘মতামতপন্থী’ হিসেবে পরিচিত হন। পরবর্তীকালে ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এর হাতে এই ধারাটি সুসংগঠিত রূপ লাভ করে।

 

(৩) প্রথম দুই শতাব্দীতে আহলে আছার ও আহলে রা’য়—উভয় গোষ্ঠীই তাদের মধ্যকার মতবিরোধকে অবৈধ এবং ফিতনার উৎস মনে করত। পরবর্তীতে এই দুই ধারারই কৃতী ও একনিষ্ঠ ছাত্র, ইমাম আশ-শাফিঈ (রহ.) এই বিরোধের একটি ঐতিহাসিক মীমাংসা করেন। তিনি উভয় পক্ষের বৈধ ও যুক্তিযুক্ত বিষয়গুলোকে সমন্বিত করেন, যার ফলশ্রুতিতে একটি নতুন মাযহাব ও চিন্তাপদ্ধতির জন্ম হয়।

 

যদিও কিছুটা ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায়, তবুও অন্য সুন্নি ফিকহী মাযহাবগুলোও এই তৃতীয় ধারা বা শাফিঈ-সমন্বয়কে গ্রহণ করে নেয়।

ইমাম শাফিঈ মদীনার আহলে আছারের রিওয়ায়াত-ভিত্তিক সংস্কৃতিকে ধারণ করেন, কিন্তু একইসাথে হাদীস গ্রহণের ক্ষেত্রে কঠোর ও সুশৃঙ্খল নীতিমালা প্রণয়ন করেন। তিনি ইমাম মালেকের অগাধ পাণ্ডিত্য ও তাকওয়ার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়েও তাঁর মাযহাবের সমালোচনা করেন এই বলে যে—নির্ভরযোগ্য সনদের চেয়ে মদীনার মানুষের প্রচলিত আমলের (আমলু আহলিল মদীনা) ওপর তাঁরা অধিক নির্ভর করছেন।

অন্যদিকে, তিনি কুফার আহলে রায়ের বুদ্ধিবৃত্তিক প্রবণতাকেও গ্রহণ করেন, তবে সেটিকে তিনি কুরআন ও সুন্নাহর নির্দেশনার আলোকে ‘কিয়াস’ (Analogical Reasoning) এর নিয়মে শৃঙ্খলিত করেন। ইমাম শাফিঈর এই সমন্বয় শেষ পর্যন্ত সব মাযহাবকেই প্রভাবিত করে।

 

চতুর্থ হিজরী/দশম খ্রিস্টাব্দ নাগাদ অধিকাংশ সুন্নি ফিকহী মাযহাব হাদীস ও কিয়াস—উভয়কেই অপরিহার্য উৎস হিসেবে মেনে নেয়। এটি ইতিহাসের বহু উদাহরণের একটি, যেখানে তীব্র মতবিরোধের পর একটি ফলপ্রসূ সমন্বয় সাধিত হয়েছে, যা সত্যকে উদ্ভাসিত করেছে এবং বিতর্কের সীমানা নির্ধারণ করে দিয়েছে।

 

পারস্পরিক সম্মান ও গ্রহণযোগ্যতা

প্রথম তিন শতাব্দীর সহনশীলতা ও সংলাপের রুহ বা আত্মা (যা অবশ্য সব ক্ষেত্রে বা সবার মধ্যে ছিল না) প্রাথমিক যুগের ইমামদের পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের মধ্য দিয়ে মূর্ত হয়ে ওঠে। এখানে ‘ইমাম’ বলতে কেবল চারজন প্রসিদ্ধ ইমামই নন, বরং তাঁদের উস্তাদ, উস্তাদদের উস্তাদ এবং তাঁদের হাজারো ছাত্রকেও বোঝানো হয়েছে।

স্মরণ রাখা জরুরি যে—মতভিন্নতা সহ্য করা এবং একে অপরকে সম্মান করার এই সক্ষমতা তৈরি হয়েছিল কারণ তাঁরা ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলোতে (Core of Islam) ঐকমত্য পোষণ করতেন, যা তাঁরা সাহাবি ও তাবে'ঈদের সূত্রে পেয়েছিলেন।

 

তবে, প্রাথমিক যুগের ইমামগণ তাদের প্রতি মোটেও সহনশীল ছিলেন না, যারা কুরআন ও সুন্নাহর সুস্পষ্ট সীমারেখা লঙ্ঘন করত। এই সীমারেখার বিস্তারিত তাত্ত্বিক আলোচনায় না গিয়েও ইমাম গাযযালী (রহ.) এর ‘ইহইয়াউ উলূমিদ্দীন’ থেকে কিছু উদাহরণ দেওয়া প্রাসঙ্গিক হবে।

 

ইমাম আশ-শাফিঈ একবার মু’তাযিলি কালাম পন্থী বিতার্কিক হাফস আল-ফারদ-এর সাথে বিতর্কে লিপ্ত হন। বিতর্ক শেষে তিনি মন্তব্য করেন:

“যে ব্যক্তি শিরক ছাড়া অন্য সমস্ত গুনাহ নিয়ে আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করে, সে ওই ব্যক্তির চেয়ে উত্তম, যে ‘ইলমুল কালাম’ এর কোনো একটি অংশ নিয়ে আল্লাহর সামনে দাঁড়ায়। আমি হাফসের মুখে এমন সব কথা শুনেছি, যা আমি উদ্ধৃত করতেও রাজি নই।”

 

আরেকবার কালামশাস্ত্র বিষয়ক একটি প্রশ্ন করা হলে ইমাম শাফিঈ রাগান্বিত হয়ে প্রশ্নকর্তাকে বলেন:

“এই বিষয়ে হাফস আল-ফারদ ও তার সাঙ্গপাঙ্গদের জিজ্ঞেস করো, আমাকে নয়। আল্লাহ ওদের লাঞ্ছিত করুন!”

 

এমনকি ইমাম শাফিঈ যখন মৃত্যুশয্যায়, তখন হাফস আল-ফারদ তাঁকে দেখতে এলে তিনি বলেন:

“আল্লাহ যেন তোমার কোনো রক্ষণাবেক্ষণ না করেন, তোমার প্রতি সদয় না হন, যতক্ষণ না তুমি তোমার ভ্রান্ত মতবাদ থেকে তওবা করো।” (ইহইয়াউ উলূমিদ্দীন, ১ম খণ্ড, কিতাব আল-‘ইলম)

প্রাথমিক যুগের ইমামদের দ্বারা ‘ইলমুল কালাম’ বা বিমূর্ত দর্শনকে প্রত্যাখ্যান করার এমন বহু ঘটনা ইতিহাসে পাওয়া যায়।

এই ঘটনাগুলো উল্লেখ করার উদ্দেশ্য হলো—মতবিরোধ মেনে নেওয়ার নীতিতে (Agree to disagree) একমত না হলে কোনো অর্থবহ বুদ্ধিবৃত্তিক সংলাপ বা যুক্তিতর্ক চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। মতভিন্নতা সহ্য করা অপরিহার্য, কিন্তু তা নির্ভর করে কিছু ‘মাশতারাক উসূল’ বা সাধারণ ভিত্তির ওপর, যা সব পক্ষ মেনে নেয়। আর সালাফ বা পূর্বসূরি ইমামদের কাছে সেই ‘রুলস অব এনগেজমেন্ট’ ছিল—যুক্তি যা-ই হোক, তা হতে হবে কুরআন ও সুন্নাহর ভিত্তিতে।

 

অবৈধ চরমপন্থা

আজকের দিনে, ইসলামী ঐতিহ্যের ভাষায় কথা বলতে গিয়ে অনেক মুসলমান দুটি চরমপন্থার শিকার হন।

একদিকে, অনেকে হয়ে পড়েন অসহিষ্ণু ও সংকীর্ণমনা। তাঁদের কাছে কেবল একটি নির্দিষ্ট অথরিটি, একটি মাযহাব বা একজন শায়েখই চূড়ান্ত সত্য, বাকি সব মূল্যহীন।

অন্যদিকে, অনেকের না আছে গভীর জ্ঞান, না আছে ইসলামের প্রতি নিষ্ঠাবান ঈমান। এরা কেবল নিজেদের পূর্বনির্ধারিত এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য ঐতিহ্যের পরিভাষাগুলোকে ব্যবহার করেন। ‘সহনশীলতা’ ও ‘বৈচিত্র্য’—এই বুলি আওড়ে তাঁরা ইসলামী ঐতিহ্যকে এমন এক আধুনিক ছাঁচে ফেলতে চান, যা কার্যত কোনো অপরিবর্তনীয় মূলনীতি বা ‘নন-নেগোশিয়েবল’ ভিত্তির তোয়াক্কা করে না।

 

এই দুই চরমপন্থার কারো কাছেই নব্য সমস্যার কোনো সমাধান নেই। কারণ প্রথমটিতে আছে কেবল স্থবিরতা (কোনো নতুন উদ্ভাবন নেই), আর দ্বিতীয়টিতে আছে বিভ্রান্তি (কোনো সত্য নেই)।

 

এখানকার মূল শিক্ষা হলো—একটি সুশৃঙ্খল ও মার্জিত বিতর্ক, সত্য উদ্ঘাটন, সংশয় নিরসন এবং ঐকমত্য গঠনে তখনই ভূমিকা রাখতে পারে, যখন তিনটি শর্ত পূরণ হয়:

(১) ইখলাস বা আন্তরিকতা এবং তার বাস্তব প্রয়োগ (সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধের মাধ্যমে);

(২) সঠিক ও বিশুদ্ধ জ্ঞানের একটি অংশীদারিত্বমূলক ভিত্তি;

(৩) যথেষ্ট পরিমাণ সাধারণ ভিত্তি বা ‘কমন গ্রাউন্ড’—অর্থাৎ পারস্পরিক বোঝাপড়া, সাংস্কৃতিক অভিন্নতা এবং সংবেদনশীলতা।

 

 তরজমা করেছেন সিদ্দিকে আকবর।

মূল নিবন্ধ দেখুন এখানে ।