ইউরোপের বাইরে কি কেউ আদৌ চিন্তা করতে পারে? | হামিদ দাবাশি
(হামিদ দাবাশির এই নিবন্ধটি ২০১৩ সালে আল জাজিরায় প্রকাশিত হয়েছিল। সময়ের পরিক্রমায় লেখার বিষয়বস্তু ও আলাপ এখন অনেকটাই আলোচিত এবং পরিচিত। )
আল জাজিরায় সম্প্রতি ইউরোপের বিখ্যাত দার্শনিক স্লাভয় জিজেককে নিয়ে একটি প্রশংসামূলক নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। নিবন্ধটির শুরুতেই লেখা ছিল:
‘There are many important and active philosophers today: Judith Butler in the United States, Simon Critchley in England, Victoria Camps in Spain, Jean-Luc Nancy in France, Chantal Mouffe in Belgium, Gianni Vattimo in Italy, Peter Sloterdijk in Germany and in Slovenia, Slavoj Zizek, not to mention others working in Brazil, Australia and China.’
'আজকের পৃথিবীতে বহু গুরুত্বপূর্ণ ও সক্রিয় দার্শনিক আছেন: যুক্তরাষ্ট্রে জুডিথ বাটলার, ইংল্যান্ডে সাইমন ক্রিচলি, স্পেনে ভিক্টোরিয়া ক্যাম্পস, ফ্রান্সে জাঁ-লুক নঁসি, বেলজিয়ামে শঁতাল মুফ, ইতালিতে জিয়ানি ভাত্তিমো, জার্মানিতে পিটার স্লোটারডিক এবং স্লোভেনিয়ায় স্লাভয় জিজেক। এ ছাড়া ব্রাজিল, অস্ট্রেলিয়া ও চীনে আরও অনেকে কাজ করছেন।'
এই একটি অনুচ্ছেদ পড়লেই স্পষ্ট হয়ে যায় যে লেখক যখন 'আজকের দর্শন' বলছেন, তিনি মূলত 'ইউরোপীয় দর্শন'কেই বোঝাচ্ছেন। দর্শনের সংজ্ঞা, তার বর্তমান রূপ এবং প্রতিনিধিত্বের অধিকার যেন কেবল ইউরোপেরই এক স্বাভাবিক একচেটিয়া সম্পত্তি।
উদাহরণ হিসেবে আসা মার্কিন মুলুকের দার্শনিক জুডিথ বাটলারও ইউরোপের সিলসিলায় জাক দেরিদা ও মিশেল ফুকোর ইউরোপীয় বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যের ছায়াতেই তাঁর লিঙ্গ ও যৌনতার নতুন ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছেন।
নিবন্ধে চীন ও ব্রাজিলের কথা যেমন এসেছে, তেমনি এসেছে অস্ট্রেলিয়ার প্রসঙ্গও, যা মূলত ইউরোপীয় সভ্যতারই একটি ভৌগোলিক সম্প্রসারণ। কিন্তু লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই দেশগুলোর নাম এসেছে কেবল দার্শনিকদের আবাসভূমি হিসেবে। সেখানকার একজন নির্দিষ্ট চিন্তাবিদের নামও লেখক উল্লেখ করার মতো পাননি, যিনি এই জাঁদরেল ইউরোপীয় দার্শনিকদের পাশে সমমর্যাদায় স্থান পেতে পারেন।
আমাদের আলোচ্য মোটেও এই নয় যে পশ্চিমা দার্শনিকদের চিন্তা বৈশ্বিক তাৎপর্যহীন। বরং আফ্রিকা থেকে ভারতের প্রত্যন্ত গ্রাম, লাতিন আমেরিকা কিংবা আরব বিশ্বের মানুষও তাঁদের কাছ থেকে নিজেদের বাস্তবতাকে নতুনভাবে বুঝতে শেখে।
তাছাড়া নিজের চিন্তার সর্বজনীনতার ওপর এমন প্রগাঢ় আস্থা না থাকলে কোনো দার্শনিকই মানবজাতির সামনে ভাবনা প্রকাশের সাহস পেতেন না, এবার আমাদের প্রকৃত প্রশ্নটি অন্য জায়গায়।
কেন ইউরোপীয় দর্শন শুধু 'দর্শন', আর আফ্রিকার দর্শন 'এথনোফিলোসফি'?
ইউরোপীয় দর্শনের এই দীর্ঘ ঐতিহ্যের বাইরে যাঁরা চিন্তা করেন, তাঁদের অবস্থান আসলে কোথায়? ঔপনিবেশিক ইতিহাসের কারণে ইউরোপীয় ভাষায় কিংবা একান্ত মাতৃভাষায় লেখা এশিয়া, আফ্রিকা বা লাতিন আমেরিকার চিন্তাবিদদের আমরা কীভাবে মূল্যায়ন করব? তাঁদের অনেকেই নিজ নিজ সমাজে হান্না আরেন্ট, জাঁ-পল সার্ত্র বা মিশেল ফুকোর মতোই প্রভাবশালী জনবুদ্ধিজীবী। গ্লোবাল মিডিয়ার এই যুগে ইউরোপীয় বলয়ের বাইরের এই চিন্তাবিদদের স্বীকৃতি দেওয়ার মাপকাঠি কী হবে?
দক্ষিণ এশিয়ার দিকে নজর দিলে অশীষ নন্দী, পার্থ চট্টোপাধ্যায়, গায়ত্রী স্পিভাক, রণজিৎ গুহ, হোমি ভাবা, সুদীপ্ত কবিরাজ, দীপেশ চক্রবর্তী কিংবা আকিল বিলগ্রামির মতো মানুষেরা যে স্বাতন্ত্র্যসচেতন বুদ্ধিবৃত্তিক ধারার প্রতিনিধিত্ব করেন, তাকে 'দর্শন' এবং তাঁদের 'দার্শনিক' বলা যাবে না কেন? যেখানে ইউরোপীয়দের ক্ষেত্রে শুধু 'চিন্তাবিদ' বলাই যথেষ্ট মনে করা হয়, সেখানে তাঁদের বেলায় কেনইবা 'দক্ষিণ এশীয় চিন্তাবিদ' বলে আলাদা তকমা দেওয়া হয়?
এই দ্বৈত মানদণ্ড শুধু দর্শন নয়, শিল্প ও সংস্কৃতিতেও সমান দৃশ্যমান। সুরসম্রাট মোৎসার্ট সুর মিলিয়ে হাঁচি দিলেও হয়তো তাকে সংগীত বলে উদযাপন করা হতো, অথচ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিকশিত ভারতীয় রাগসংগীতকে অবলীলায় 'এথনোমিউজিকোলজি' (নৃতাত্ত্বিক সংগীতচর্চা) বলা হয়। ভারতীয় সংগীত কি তবে 'সংগীত' নয়? যেখানে ইউরোপীয় সংগীতই স্বাভাবিক ও সার্বজনীন রূপ হিসেবে গণ্য হয়, সেখানে ভারতীয় সংগীতের সুরমূর্ছনা কেন নৃতত্ত্বের গবেষণার বস্তু ধরা হবে? একইভাবে লক্ষণীয় পশ্চিমা গবেষকেরা মাঠে গিয়ে ভারতীয় দর্শন পর্যবেক্ষণ করলেও একে সমমর্যাদার বৌদ্ধিক ঐতিহ্য হিসেবে কখনো মেনে নেননি।
দ্য গেজ: সেই একই নৃতাত্ত্বিক দৃষ্টি
এবার আফ্রিকার দিকে তাকানো যাক। হেনরি ওদেরা ওরুকা, ঙুগি ওয়া থিয়োঙ্গো কিংবা ওলে সোয়িঙ্কা থেকে শুরু করে চিনুয়া আচেবে, ওকোট পি'বিটেক, তাবান লো লিয়ং; কিংবা হালের আশিল এমবেম্বে, ইমানুয়েল চুকউদি এজে, সুলেইমান বাশির দিয়ান ও ভি. ওয়াই. মুদিম্বে - তাঁদের সবার চিন্তাকেই কেন 'এথনোফিলোসফি' (নৃতাত্ত্বিক দর্শন) বলে আলাদা করে রাখা হবে এবং ইউরোপীয় দর্শনকেই একমাত্র 'দর্শন' হিসেবে মানতে হবে? এই মানসিকতার এক চমৎকার প্রতীকী রূপ দেখা যায় নিউ ইয়র্কের ন্যাচারাল হিস্ট্রি জাদুঘরে, যা শন লেভির 'Night at the Museum (২০০৬)' চলচ্চিত্রের সুবাদে অনেকের কাছেই পরিচিত।
সেই জাদুঘরে কাচের প্রদর্শনীতে ট্যাক্সিডার্মি করা বন্য প্রাণীর পাশাপাশি বিভিন্ন অশ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠী ও তাদের সংস্কৃতিকে একই সারিতে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। অথচ শ্বেতাঙ্গ মানুষ ও তাদের সংস্কৃতিকে কোথাও কাচের বাক্সে দেখানো হয় না, কারণ তারা প্রদর্শনীর বস্তু নয় বরং করিডোর দিয়ে হেঁটে যাওয়া দর্শক। তারা অন্যদের দেখে, পর্যবেক্ষণ করে এবং শ্রেণিবদ্ধ করে। দেখার এই ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব সবসময় ইউরোপীয়দেরই থাকে এবং এই আধিপত্যবাদী কর্তৃত্বকেই তাত্ত্বিক ভাষায় 'The Gaze' (নৃতাত্ত্বিক আধিপত্যবাদী দৃষ্টি) বলা হয়।
আরব ও মুসলিম বিশ্বের আজমি বিশারা, সাদেক জালাল আল-আজম, ফাওয়াজ ত্রাবুলসি, আবদুল্লাহ লারুই, মিশেল কিলো কিংবা আবদুলকরিম সোরুশের ক্ষেত্রেও ঠিক একই দৃষ্টিভঙ্গি কাজ করে। জাপানের কোজিন কারাতানি, কিউবার রোবের্তো রেতামার কিংবা আমেরিকার কর্নেল ওয়েস্টের মতো যাঁদের চিন্তা ইউরোপীয় মহাদেশীয় দর্শনের ছকে পড়ে না, তাঁদের কাজও সমমর্যাদার বুদ্ধিবৃত্তিক সংলাপের অযোগ্য এবং দূর থেকে পর্যবেক্ষণযোগ্য নৃতাত্ত্বিক উপাদান হিসেবেই থেকে যায়।
ভূতুড়ে দম্ভ ও বিকল্প ভাষার অনুসন্ধান
ইউরোপকেন্দ্রিকতার এই সাম্রাজ্যিক অহংকার নতুন কিছু নয়। একাধিক বিলুপ্ত সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী হিসেবে ইউরোপীয়রা পৃথিবীকে নিজেদের দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখবে, সেটাই স্বাভাবিক। তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতা হয়তো লুপ্ত, কিন্তু অহংকারের ছায়া এখনও রয়ে গেছে। তাই তাদের কাছে নিজেদের দর্শনই একমাত্র 'দর্শন' এবং বাকিদের বুদ্ধিবৃত্তিক কাজকে বিখ্যাত দার্শনিক ইমানুয়েল লেভিনাস এর ন্যায় অবলীলায় কেবলই 'নাচ' বলে গণ্য করেন।
তবে আমাদের আসল কাজ ইউরোপকে দোষ দেওয়া নয়, বরং ইউরোপের বাইরের চিন্তা কীভাবে নিজের আত্মসচেতনতা অর্জন করবে তা খুঁজে বের করা। আফ্রিকা, এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার মানুষের বাস্তব জীবন-অভিজ্ঞতা থেকে এমন এক সর্বজনীন দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলা দরকার যা নিজস্ব শক্তিতে দাঁড়িয়ে থাকবে। আজ বিশ্বজুড়ে তৈরি হওয়া নতুন চিন্তার এই ধারার শিকড় অনেক গভীরে প্রোথিত। হোসে মার্তি, জামাল আল-দীন আল-আফগানি, এমে সেজার, ডব্লিউ. ই. বি. ডু বোইস, লিয়াং ছিছাও, ফ্রানজ ফ্যানন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কিংবা মহাত্মা গান্ধীর মতো পূর্বসূরিরা নিজ নিজ সমাজের অভিজ্ঞতা থেকে গোটা বিশ্বের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এমন অনেক ধারণাই তৈরি করেছেন। তাহলে তাঁদের চিন্তাকে কেন এথনোফিলোসফির ঘরে বন্দী করা হবে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের আবার ইউরোপেই ফিরতে হবে। তবে ইউরোপের ক্ষমতার কেন্দ্রে নয়, তার প্রান্তে; যেখানে আমাদের পথ দেখাবেন ইতালীয় চিন্তাবিদ আন্তোনিও গ্রামসি।
বিশ্বনাগরিক শ্রেণি হিসেবে বুদ্ধিজীবীরা
গ্রামসি তাঁর বিখ্যাত 'Prison Notebooks' গ্রন্থে ইমানুয়েল কান্টের 'Groundwork of the Metaphysics of Morals' বইয়ের একটি সুপরিচিত নৈতিক বিধান নিয়ে আলোচনা করেছেন, যা আমাদের বুঝতে সাহায্য করে একজন দার্শনিক কীভাবে নিজেকে সমগ্র মানবজাতির চিন্তার প্রতিনিধি ভাবতে পারেন। গ্রামসি লিখেছেন, কান্টের নীতি হলো এমনভাবে কাজ করা যাতে তোমার আচরণ একই পরিস্থিতিতে থাকা সব মানুষের জন্য আদেশ বা আদেশমূলক আদর্শ হতে পারে। তবে 'একই পরিস্থিতি' বলতে আসলে কী বোঝায় তা প্রথমবার শুনলে যতটা সহজ মনে হয়, আসলে ততটা নয়। গ্রন্থটির ইংরেজি সম্পাদক কুইন্টিন হোর এবং জেফ্রি নওয়েল স্মিথ দেখিয়েছেন যে গ্রামসি এখানে কান্টকে হুবহু উদ্ধৃত করেননি।
কান্টের মূল জার্মান বক্তব্য ছিল নিজের নীতিকে একই সঙ্গে সর্বজনীন আইন হিসেবে কামনা করা, যা তাঁর দর্শনে 'Categorical Imperative' (নিরঙ্কুশ আবশ্যিক বিধান) নামে পরিচিত। কিন্তু গ্রামসি ইচ্ছাকৃতভাবেই সেখানে 'একই পরিস্থিতি' কথাটি যোগ করেছিলেন, কারণ এই ছোট্ট সংযোজনটিই ছিল পশ্চিমা অহংকারের আসল রহস্য উন্মোচনের চাবিকাঠি।
কেন ইউরোপীয় চিন্তা নিজেকে 'সার্বজনীন' ভাবতে পারে?
গ্রামসির মতে কান্টের এই ধারণা এমন এক পৃথিবীকে কল্পনা করে যেখানে একটিমাত্র সংস্কৃতি এবং এক ধরনের বিশ্বজনীন সামাজিক ঐকমত্য বিরাজ করে। কান্ট যখন তাঁর নীতিকে সবার জন্য প্রযোজ্য বলে ঘোষণা করেন, তখন তিনি ধরেই নেন যে তাঁর বৌদ্ধিক জগৎই সমগ্র মানবজাতির সাধারণ অভিজ্ঞতার প্রতিনিধিত্ব করে। এই ধারণার জন্ম হয়েছিল তাঁর সময়ের কসমোপলিটন এনলাইটেনমেন্ট বা বিশ্বনাগরিক আলোকায়নের যুগ থেকে। সেই যুগে ইউরোপের বুদ্ধিজীবীরা নিজেদের কোনো নির্দিষ্ট দেশের নাগরিক না ভেবে সমগ্র মানবসভ্যতার প্রতিনিধি মনে করতেন।
গ্রামসির এই পর্যবেক্ষণটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন দার্শনিক তখনই নিজের চিন্তাকে 'সর্বজনীন সত্য' হিসেবে উপস্থাপন করতে পারেন, যখন তাঁর ভেতরে এই গভীর আত্মবিশ্বাস থাকে যে তাঁর নিজস্ব অভিজ্ঞতাই আসলে গোটা মানবজাতির অভিজ্ঞতা। ইউরোপীয় ফ্যাসিজমের কারাগারে বন্দী একজন দক্ষিণ ইতালীয় হিসেবে গ্রামসি আসলে পশ্চিমাদের এক চরম 'Chutzpah' (নির্লজ্জ ও দাপুটে স্পর্ধা) আবিষ্কার করেছিলেন। এই অহংকারই একজন চিন্তাবিদকে বিশ্বাস করায় যে তাঁর শহরের চত্বরই একমাত্র জনপরিসর এবং তিনি নিজেই বিশ্বস্বীকৃত জনবুদ্ধিজীবী। তিনি কেবল বিদ্যমান পৃথিবীর অংশ নন, বরং তিনি এমন একটি পৃথিবী নির্মাণ করতে চান যেখানে তাঁর নিজস্ব মূল্যবোধই সবার জন্য চূড়ান্ত আদর্শ হয়ে উঠবে।
সাম্রাজ্যের দম্ভের উর্ধ্বে একটি সমতল মাঠের ভবিষ্যৎ
এখানেই সাম্রাজ্য ও চিন্তার গভীর সম্পর্ক নিহিত। একটি শক্তিশালী সাম্রাজ্যের ভেতরে দাঁড়িয়ে জন্ম নেওয়া চিন্তা খুব সহজেই নিজেকে 'সার্বজনীন' বলে ভাবতে শেখে। রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যের কারণেই ইউরোপীয়রা নিজেদের দর্শনকে শুধু 'ইউরোপীয় দর্শন' না বলে 'দর্শন' হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিল। যে সাম্রাজ্যিক দম্ভ একদিন ইউরোকেন্দ্রিকতাকে সম্ভব করেছিল, আল জাজিরার ওই প্রশংসামূলক প্রতিবেদনগুলো মূলত সেই পুরোনো ইতিহাসেরই অতীত স্মৃতিমাত্র।
কিন্তু সেই একচেটিয়া অধিকারের দিন এখন ফুরিয়ে আসছে। পৃথিবীর নানা প্রান্তের মানুষ আজ নিজেদের ভাষায় ভাবছে এবং নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকে নতুন ধারণা তৈরি করছে। আফ্রিকা, এশিয়া, লাতিন আমেরিকা ও মুসলিম বিশ্বে আজ এমন অনেক চিন্তাবিদ, কবি ও শিল্পী উঠে এসেছেন যাঁদের চিন্তার শেকড় নিজস্ব সমাজে প্রোথিত হলেও তার তাৎপর্য গোটা পৃথিবীর জন্যই সমান প্রাসঙ্গিক।
এই মুক্তির জোয়ারের কাছে ইউরোপের পুরোনো আত্মগৌরব এখন চায়ের পেয়ালায় ঝড় তোলার মতোই মামুলি বিষয়। ইউরোপের কাছে বিশ্বকে শেখানোর এখনও অনেক কিছু আছে, তবে সেই শিক্ষা আর কোনো উঁচু আসন থেকে নয়, বরং তা হওয়া উচিত পারস্পরিক সম্মান ও সংলাপের ভিত্তিতে। তা হবে এমন একটি সমতল ও গণতান্ত্রিক মাঠ, যেখানে তাদের দর্শন হবে স্রেফ 'ইউরোপীয় দর্শন' এবং তাদের সংগীত হবে 'ইউরোপীয় সংগীত'। সেদিন কোনো সংবাদমাধ্যমকে ইউরোপীয় চিন্তাবিদকে আলাদা করে বিশ্বের জনবুদ্ধিজীবী বলে প্রচার করতে হবে না; কারণ তখন তাঁরা হবেন বিশ্বের অনেক গুরুত্বপূর্ণ চিন্তাবিদের মাঝে আর সবার মতোই একজন সাধারণ প্রতিনিধি,একমাত্র প্রতিনিধি তো নয়ই।
(ঈষৎ পরিমার্জিত)
তরজমা করেছেন মো: আবতাহী ইসলাম সাদাফ।
মূল নিবন্ধ পড়ুন আল জাজিরায়।