মেন্যু
Menu

গান শোনার বিধান | ইউসুফ আল কারযাভী

২৯ আগস্ট, ২০২৬

সাওয়াল: কিছু মানুষ সব ধরনের গান শোনা নিষিদ্ধ বলে মনে করে। তাদের দলিল হলো আল্লাহ তায়ালার এই বাণী: 

وَمِنَ ٱلنَّاسِ مَن يَشْتَرِى لَهْوَ ٱلْحَدِيثِ لِيُضِلَّ عَن سَبِيلِ ٱللَّهِ بِغَيْرِ عِلْمٍ وَيَتَّخِذَهَا هُزُوًا‌ۚ أُوْلَـٰٓئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ مُّهِينٌ

'আর মানুষের মধ্য থেকে কেউ কেউ না জেনে আল্লাহর পথ থেকে মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য বেহুদা কথা খরিদ করে, আর তারা ঐগুলোকে হাসি-ঠাট্টা হিসেবে গ্রহণ করে; তাদের জন্য রয়েছে লাঞ্ছনাকর আযাব।' [সূরা লুকমান: ৬] 

তাদের যুক্তি হলো, সাহাবাদের কেউ কেউ এখানে লাহওউল হাদিস (لَهْوَ ٱلْحَدِيثِ) বা বেহুদা কথা দ্বারা গান বুঝিয়েছেন।

তাদের আরেকটি দলিল হলো: 

وَإِذَا سَمِعُواْ ٱللَّغْوَ أَعْرَضُواْ عَنْهُ

'আর তারা যখন বেহুদা শোনে, তখন তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়।' [সূরা কাসাস: ৫৫] 

তাদের মতে গানও বেহুদা কথার শামিল। এই দুই আয়াতের ভিত্তিতে তাদের যুক্তি কি সঠিক? গান শোনার ব্যাপারে আপনার মতামত কী? 

এ বিষয়ে মানুষের মধ্যে যেহেতু অনেক মতভেদ ও দ্বন্দ্ব আছে, তাই এই গুরুতর বিষয়ে আপনি আমাদের একটা সিদ্ধান্ত দিন। আমাদের পক্ষ থেকে কৃতিজ্ঞতা জানবেন। আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন।

জবাব:

সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য। দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক আল্লাহর রাসূল সা., তাঁর পরিবার, সাহাবীগণ এবং কেয়ামত পর্যন্ত তাঁকে যারা অনুসরণ করবে তাদের উপর। গানের বিষয়টি বাদ্যযন্ত্রসহ হোক (অর্থাৎ মিউজিকসহ) বা ছাড়া হোক ইসলামের প্রাথমিক যুগ থেকেই এ নিয়ে ফোকাহায়ে কেরামের মাঝে বিতর্কের জন্ম নিয়েছে। কিছু বিষয়ে তারা একমত হয়েছে। আবার কিছু বিষয়ে তারা মতভেদ করেছেন।

তারা একমত হয়েছেন যে, যে গানে অশ্লীলতা, বেহায়াপনা থাকে কিংবা গোনাহ ও নাফরমানির প্রতি উৎসাহ থাকে তা হারাম; কারণ গান মূলত নিছক কথা। কাজেই কথা ভালো হলে ভালো, খারাপ হলে খারাপ। ইসলামী আদব ও শিষ্টাচারবিরোধী যে কোনো কথা হারাম। আর তার সাথে যদি সুর, তাল ও আবেগ যোগ হয়, তাহলে তো কথাই নেই!

এছাড়াও তারা একমত হয়েছে যে, এসব বিষয় থেকে মুক্ত গান, যেগুলো শরিয়তসম্মত আনন্দের অনুষ্ঠানগুলোতে গাওয়া হয়, সেগুলো জায়েয। যেমন: বিয়ে, দীর্ঘদিন পর কেউ ফিরে আসা, ঈদের দিন। এর পক্ষে সহীহ ও সরিহ (স্পষ্ট) দলিল রয়েছে।

এর বাইরে সবগুলো নিয়ে অনেক মতভেদ রয়েছে। কোনো কোনো আলেম সব গান জায়েজ বলেছেন, চাই বাদ্যযন্ত্র সহ হোক বা বাদে। বরং মুস্তাহাব হিসেবেও বিবেচনা করেছেন। কেউ আবার বাদ্যযন্ত্রসহ হারাম বলেছেন, কিন্তু বাদ্যযন্ত্র ছাড়া জায়েজ বলেছেন। আবার কেউ সম্পূর্ণটাই হারাম বলেছেন।

আমরা যেটা বলি এবং এই মতগুলোর মাঝে যেটা আমাদের সবচে মনঃপূত হয়েছে, সেটা হলো: গান সত্তাগতভাবে জায়েজ; কারণ কোনো জিনিসের মূল বিধান হলো বৈধতা, যতক্ষণ না সহীহ দলিল দ্বারা তা নিষিদ্ধ হয়। আর গান নিষিদ্ধ হওয়ার ব্যাপারে যা বর্ণিত হয়েছে, তার ক্ষেত্রে দুটো জিনিশ দেখা যায়, হয় সেগুলো সরিহ কিন্তু সহীহ না, নতুবা সহীহ কিন্তু সরিহ না। প্রশ্নের দুই আয়াতও এর উদাহরণ।

প্রথম আয়াত, وَمِنَ ٱلنَّاسِ مَن يَشْتَرِى لَهْوَ ٱلْحَدِيثِ  অর্থাৎ, আর মানুষের মধ্য থেকে কেউ কেউ বেহুদা কথা খরিদ করে। [সূরা লুকমান: ৬] কিছু সাহাবা-তাবেয়ী এটিকে গান হারামের দলিল বলেছেন। তাদের এই তাফসিরের ব্যাপারে আমাদের সবচে উত্তম জবাব হলো, মুহাল্লা থেকে উদ্ধৃত ইবনে হাজমের এই উদ্ধৃতি:

لا حجة في هذا لوجوه: أحدهما أنه لا حجة لأحد دون رسول الله صلى الله عليه وسلم. والثاني أنه قد خالفهم غيرهم من الصحابة والتابعين. والثالث أن نص الآية يبطل احتجاجهم، لأن الآية بها وصف (ومن الناس من يشتري لهو الحديث ليضل عن سبيل الله بغير علم، ويتخذها هزوًا) وهذه صفة من فعلها كان كافرًا بلا خلاف، ولو أن امرءاً اشترى مصحفًا ليضل به عن سبيل الله ويتخذها هزوًا لكان كافرًا، فهذا هو الذي ذمه الله تعالى، وما ذم قط عز وجل من اشترى لهو الحديث ليتلهى به، ويروح نفسه، لا ليضل عن سبيل الله تعالى. وكذلك من اشتغل عن الصلاة عامًدا بقراءة القرآن أو بقراءة السنن أو بحديث يتحدث به أو بغناء أو بغير ذلك فهذا فاسق عاص لله تعالى، ومن لم يضيع شيئًا من الفرائض اشتغالا بما ذكرنا فهو محسن.

'এর মাঝে কোনো হুজ্জত বা দলিল (এর অবকাশ) নেই কয়েকটি কারণে: প্রথমত: রাসূল সা. ছাড়া অন্য কারো কথা কারো জন্য চূড়ান্ত দলিল নয়। দ্বিতীয়ত: সাহাবা-তাবেয়ীদের মধ্যে অন্যরা (এক্ষেত্রে তাদের সাথে) দ্বিমত করেছেন। তৃতীয়ত: আয়াতের নসই তাদের এই দলিল গ্রহণকে বাতিল করে দেয়। কেননা আয়াত বলছে, “মানুষের মধ্য থেকে কেউ কেউ না জেনে আল্লাহর পথ থেকে মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য বেহুদা কথা খরিদ করে” অর্থাৎ এটা এমন গুণ, যে এটা করবে সে সর্বসম্মতিক্রমে কাফের হবে। যেমন যদি কেউ আল্লাহর পথ থেকে মানুষকে বিচ্যুত করার এবং সেটিকে উপহাস করার উদ্দেশ্যে কোনো মুসহাফ কিনে, তাহলে সে কাফির হয়ে যাবে। আল্লাহ এমন ব্যক্তিকেই নিন্দা করেছেন। 

কিন্তু তিনি কখনো এমন ব্যক্তিকে নিন্দা করেননি, যে ‘বেহুদা কথা’ কেবল বিনোদনের জন্য, নিজের মনকে প্রফুল্ল করার জন্য ক্রয় করে, আল্লাহর পথ থেকে মানুষকে বিচ্যুত করার উদ্দেশ্যে নয়। অনুরূপভাবে, কেউ যদি ইচ্ছাকৃতভাবে কুরআন তেলাওয়াত, হাদিস পাঠ, কোনো কথোপকথন, গান অথবা অন্য কোনো কাজে ব্যস্ত থাকার কারণে নামাজ থেকে গাফেল হয়, তাহলে সে ফাসিক এবং আল্লাহর অবাধ্য। পক্ষান্তরে, উপরোক্ত বিষয়গুলোর কোনো একটিতে ব্যস্ত থাকার কারণে যদি কেউ কোনো ফরজ কাজ নষ্ট না করে, তাহলে সে সৎকর্মশীল।'

দ্বিতীয় আয়াত: وَإِذَا سَمِعُواْ ٱللَّغْوَ أَعْرَضُواْ عَنْهُ অর্থাৎ, আর তারা যখন বেহুদা কথা শোনে, তখন তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। [সূরা কাসাস: ৫৫] এটি দিয়েও গান হারামের দলিল দেওয়ার বিষয়টি সুষ্ঠু নয়। কারণ, আয়াতের প্রেক্ষাপট দেখলে বোঝা যায় এখানে “ٱللَّغْو” দ্বারা উদ্দেশ্য অশোভন কথা, গালি-গালাজ ইত্যাদি। বাকী আয়াতাংশ এটাই বলে। পুরো আয়াতটি হলো: 

وَإِذَا سَمِعُواْ ٱللَّغْوَ أَعْرَضُواْ عَنْهُ وَقَالُواْ لَنَآ أَعْمَـٰلُنَا وَلَكُمْ أَعْمَـٰلُكُمْ سَلَـٰمٌ عَلَيْكُمْ لَا نَبْتَغِى ٱلْجَـٰهِلِي

'আর তারা যখন বেহুদা শোনে, তখন তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। এবং বলে, ‘আমাদের আমল আমাদের জন্য, আর তোমাদের আমল তোমাদের জন্য। তোমাদের প্রতি ‘সালাম’। আমরা অজ্ঞদের সাহচর্য চাই না’।'

এটা সূরা ফুরকানের ৬৩ নং আয়াতে রহমানের বান্দাদের বৈশিষ্ট্য এর মতো: وَإِذَا خَاطَبَهُمُ ٱلْجَـٰهِلُونَ قَالُواْ سَلَـٰمًا  অর্থাৎ, মূর্খরা সম্বোধন করলে তারা বলে সালাম।

এখানে যদি আমরা মেনেও নিই যে, এই আয়াতে ٱللَّغْوَ গানকেও অন্তর্ভুক্ত করে, তাহলেও আমরা দেখতে পাই যে, আয়াতটি এর শ্রবণ থেকে বিরত থাকার তারিফ করে, কিন্তু তা থেকে বিরত থাকা যে ফরজ বা অপরিহার্য, এমন কোনো বিষয় এতে নেই।

‘লাগভ’ (اللَّغْو) শব্দটি ‘বাতিল’ (الباطل) শব্দের মতোই এমন বিষয়কে বোঝায়, যাতে কোনো উপকার নেই। আর এমন কোনো বিষয় শোনা, যাতে কোনো উপকার নেই, তা সত্তাগতভাবে হারাম নয়, যতক্ষণ না এর কারণে কোনো হক নষ্ট হয় অথবা কোনো অবশ্যকীয় কর্তব্য থেকে বিরত থাকা হয়।

ইবনু জুরাইজ রহ. -এর ব্যাপারে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি সামা’ (السماع) এর ব্যাপারে অনুমতি দিতেন। তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হলো, “কেয়ামতের দিন এটিকে কি আপনার নেক আমলের অন্তর্ভুক্ত করে আনা হবে, নাকি আপনার গুনাহের আমলের অন্তর্ভুক্ত করে আনা হবে?”

তিনি বললেন, 'না, নেক আমলের অন্তর্ভুক্তও হবে না, গুনাহের আমলের অন্তর্ভুক্তও হবে না; কারণ এটি লাগভ (অর্থহীন কাজ)-এর অনুরূপ।'

আর আল্লাহ তাআলা বলেছেন:

لَا يُؤَاخِذُكُمُ اللَّهُ بِاللَّغْوِ فِي أَيْمَانِكُمْ

'তোমরা বেহুদা শপথ করলে আল্লাহ তোমাদের পাকড়াও করবেন না।' [সূরা আল-বাকারা: ২২৫]

ইমাম গাজালী রহ. বলেন: 

إذا كان ذكر اسم الله تعالى على الشيء عن طريق القسم من غير عقد عليه ولا تصميم والمخالفة فيه على أن لا فائدة فيه-لا يؤاخذ به، فكيف يؤاخذ بالشعر والرقص؟

'যদি কোনো বিষয়ে দৃঢ় ইচ্ছা বা অভিপ্রায় না থাকা সত্ত্বেও শুধু কথার ছলে আল্লাহর নামে শপথ করা এবং পরে সেই শপথের বিপরীত কাজ করা (যেহেতু এতে কোনো ফায়দা নেই) এর জন্য যদি আল্লাহ পাকড়াও না করেন, তাহলে কবিতা ও নৃত্যের কারণে কীভাবে পাকড়াও করা হবে?'

এর পাশাপাশি আমরা বলি: সব গান ‘লাগভ’ নয়। বরং গান তার সম্পাদনকারীর নিয়ত অনুযায়ী তার হুকুম বা বিধান লাভ করে। সৎ নিয়ত কোনো খেল-তামাশাকেও ইবাদতে পরিণত করতে পারে এবং রসিকতাকেও আনুগত্যের কাজে পরিণত করতে পারে। এর বিপরীতয়ে, অসৎ নিয়ত এমন কাজকেও নষ্ট করে দেয়, যার বাহ্যিক রূপ ইবাদতের হলেও অভ্যন্তরে থাকে রিয়া।

রাসুলুল্লাহ সা. বলেছেন:

إِنَّ اللهَ لَا يَنْظُرُ إِلَى صُوَرِكُمْ، وَلَكِنْ يَنْظُرُ إِلَى قُلُوبِكُمْ

'নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের বাহ্যিক অবয়বের দিকে তাকান না; বরং তিনি তোমাদের অন্তরের দিকে তাকান।

এখানে আমরা ইবনু হাজম রহ. -এর একটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য উদ্ধৃত করছি। তিনি আল-মুহাল্লা গ্রন্থে গান নিষিদ্ধকারীদের জবাব দিতে গিয়ে বলেছেন:

'তারা বলে, গান কি হকের অন্তর্ভুক্ত, নাকি হকের অন্তর্ভুক্ত নয়? এ দুটির বাইরে তৃতীয় কোনো কিছু হবার তো সম্ভাবননেই।

যেহেতু আল্লাহ তাআলা বলেছেন: 

فَمَاذَا بَعْدَ ٱلْحَقِّ إِلَّا ٱلضَّلَـٰلُ‌ۖ

'হকের পর ভ্রষ্টতা ছাড়া আর কী আছে?' [সূরা ইউনুস: ৩২]

এর জবাবে আমরা বলি, রাসুলুল্লাহ সা. বলেছেন:

إِنَّمَا الأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ، وَإِنَّمَا لِكُلِّ امْرِئٍ مَا نَوَى

'কাজ তো নিয়তের ওপরই নির্ভরশীল; আর প্রত্যেক ব্যক্তি তার নিয়ত অনুযায়ী ফল লাভ করবে।'

অতএব, যে ব্যক্তি আল্লাহর নাফরমানিতে সহায়তা লাভের উদ্দেশ্যে গান শোনে, সে ফাসিক। গান ছাড়া অন্যান্য যেকোনো কাজের ক্ষেত্রেও একই বিধান প্রযোজ্য।

আর যে ব্যক্তি নিজের মনকে প্রফুল্ল ও সতেজ করার উদ্দেশ্যে গান শোনে, যাতে এর মাধ্যমে সে আল্লাহর আনুগত্যে অধিক সক্ষমতা লাভ করতে পারে এবং সৎকাজে উৎসাহিত হয়, সে আল্লাহর অনুগত ও সৎকর্মশীল। আর তার এই কাজ হকেরই অন্তর্ভুক্ত।

আর যে ব্যক্তি এর মাধ্যমে আনুগত্যও উদ্দেশ্য করে না, অবাধ্যতাও উদ্দেশ্য করে না, তাহলে তা ‘লাগভ’ বা অনর্থক কাজ, যার ব্যাপারে সে ক্ষমা পেতে পারে। এর উদাহরণ হলো, কোনো ব্যক্তি শুধু বিনোদনের জন্য বাগানে ঘুরতে যাওয়া, নিজের বাড়ির দরজায় বসে পথচারীদের দেখা, নিজের পোশাক নীল, সবুজ বা অন্য কোনো রঙে রঞ্জিত করা, পা প্রসারিত করা ও গুটিয়ে নেওয়া এবং এ ধরনের অন্যান্য সাধারণ কাজ। (আল মুহাল্লা)

গানকে যারা হারাম বলে, তারা যে হাদিসগুলোকে নিজেদের মতের পক্ষে দলিল হিসেবে পেশ করেছেন, সেগুলো সবই নানা দিক থেকে সমালোচিত এবং জারহ এর যোগ্য। এই হাদিসগুলোর মাঝে এমন কোনো হাদিস নেই, যা সনদগত গ্রহণযোগ্যতা, অর্থগত দিক, অথবা উভয় দিক থেকে আপত্তির উর্ধে। কাজী আবু বকর ইবনুল আরাবি তাঁর “আল-আহকাম” গ্রন্থে বলেছেন: 

'গান হারাম হওয়ার ব্যাপারে কোনো হাদিস সহিহ প্রমাণিত হয়নি।'

একই কথা ইমাম গাজ্জালি এবং ইবনুন নাহভি 'আল-উমদাহ' কিতাবে বলেছেন। আর ইবনু হাজম বলেছেন: 'এ বিষয়ে যা কিছু বর্ণিত হয়েছে, সবই বাতিল ও জাল।'

সুতরাং গান হারাম হওয়ার দলিলগুলো যখন বাতিল হয়ে গেল, তখন গান সেই মূল বৈধতার নীতির ওপরই বহাল থাকে। বরং এমন কিছু সহিহ বর্ণনাও রয়েছে, যেগুলো গান বৈধ হওয়ার প্রমাণ বহন করে। এর মধ্যে আমরা শুধু সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হাদিসটিই উল্লেখ করছি:

আবু বকর রা. নবী সা. -এর কাছে, হযরত আয়েশা রা. -এর ঘরে প্রবেশ করলেন। তখন সেখানে দুজন মেয়ে গান গাইছিল। আবু বকর রা. তাদের ধমক দিয়ে বললেন, “আল্লাহর রাসুল সা. -এর ঘরে কি শয়তানের বাদ্যযন্ত্র?” 

তখন নবী সা. বললেন, 'তাদের ছেড়ে দাও, হে আবু বকর, কারণ এটি ঈদের দিন।'

এই হাদিসে ঈদের বাইরে গান গাওয়াকে নিষিদ্ধ করার কোনো বক্তব্য নেই। বরং এর অর্থ হলো, ঈদ এমন কিছু উপলক্ষের অন্তর্ভুক্ত, যেসব সময় গান ও অন্যান্য দোষহীন লাগভ এর মাধ্যমে আনন্দ প্রকাশ করা বৈধ ও প্রশংসনীয়।

তবে এই ফতোয়ার উপসংহারে আমরা অবশ্যই কিছু শর্ত ও বিধিনিষেধ উল্লেখ করতে ভুলবো না, যেগুলো অবশ্যই বিবেচনায় রাখতে হবে:

(ক) গানের বিষয়বস্তু অবশ্যই ইসলামী শিক্ষা ও আদব-আখলাকের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।

অতএব, যে গান বলে, এমন যে 'দুনিয়া একটি সিগারেট ও এক পেয়ালা [মদ]', তা ইসলামের শিক্ষার পরিপন্থী। কারণ ইসলাম মদকে শয়তানের অপবিত্র কাজ হিসেবে গণ্য করেছে এবং মদ্যপানকারী, মদ প্রস্তুতকারী, বিক্রেতা, বহনকারী এবং এর কাজে কোনোভাবে সহযোগিতা করে, এমন প্রত্যেককে নিন্দা ও ভর্ৎসনা করেছে।

অনুরূপভাবে, যে গান, যেমন 'বেপরোয়া চোখের মেয়ে তুমি', কোনো নারীর সৌন্দর্য বা আকর্ষণের প্রশংসা করে, সেটিও ইসলামের আদব-আখলাকের পরিপন্থী। কারণ কুরআন নির্দেশ দিয়েছে:

'মুমিন পুরুষদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে।' এবং:

'আর মুমিন নারীদের বলুন, তারাও যেন তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে।'

রাসুলুল্লাহ সা. বলেছেন:

'হে আলী, এক দৃষ্টির পর আরেক দৃষ্টি অনুসরণ করো না; প্রথম দৃষ্টি তোমার, আর দ্বিতীয় দৃষ্টি তোমার বিরুদ্ধে।' ইত্যাদি।

(খ) এরপর গান পরিবেশনের ধরনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এমনও হতে পারে যে, গানের বিষয়বস্তুতে কোনো আপত্তি নেই এবং তাতে নিষিদ্ধ কিছু নেই; কিন্তু গায়ক বা গায়িকা যদি কণ্ঠস্বরকে ইচ্ছাকৃতভাবে কোমল ও আবেদনময় করে, উত্তেজনা সৃষ্টি করার চেষ্টা করে, সুপ্ত যৌন বাসনাগুলোকে জাগিয়ে তুলতে চায় এবং অসুস্থ হৃদয়গুলোকে প্রলুব্ধ করার উদ্দেশ্য রাখে, তাহলে সেই গান হালালের গণ্ডি থেকে হারামের গণ্ডিতে চলে যেতে পারে। যেমন, বর্তমানে মানুষ যে ধরনের গান শোনে এবং শ্রোরা যে ধরনের গান গাওয়ার জন্য অনুরোধ করে, যেখানে গায়ক-গায়িকা বারবার 'ইয়া', 'ইয়োহ', 'ইয়েহ' ইত্যাদি আবেদনময়ী শব্দ উচ্চারণ করে।

এ প্রসঙ্গে নবী সা. -এর স্ত্রীদের উদ্দেশে আল্লাহর বাণীটি স্মরণ করা যেতে পারে:

'তোমরা এমন কোমল ও আকর্ষণীয় ভঙ্গিতে কথা বলো না, যাতে যার অন্তরে ব্যাধি রয়েছে সে লালসা পোষণ করে।'

(গ) এর পাশাপাশি, ইসলাম প্রত্যেক বিষয়ে বাড়াবাড়ি ও অপচয় নিষিদ্ধ করেছে, এমনকি ইবাদতের ক্ষেত্রেও। কাজেই লাগভের ক্ষেত্রে (যদি তা মুবাহও হয়), তাতে বাড়াবাড়ি এবং তার পেছনে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করাটা তো আরো নিষিদ্ধ হবে এটাই স্বাভাবিক। তাছাড়া এই অপচয় ও বাড়াবাড়িটা ইঙ্গিত করে যে, ওই লোকের হৃদয় ও মস্তিষ্ক গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য ও মহান লক্ষ্য থেকে শূন্য হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে এটি এমন কিছু হক নষ্ট করার প্রমাণও বটে, যেগুলোর ভাগটা মানুষের সংক্ষিপ্ত জীবনের মধ্যে বুঝে নেওয়া জরুরি ছিলো। 

ইবনুল মুকাফফা কতই না সত্য ও গভীর কথা বলেছেন:

ما رأيت إسرافًا إلا وبجانبه حق مضيع. 

'আমি যখনই কোনো অপচয় দেখেছি, তার পাশেই কোনো না কোনো নষ্ট হয়ে যাওয়া হক দেখতে পেয়েছি।'

(ঘ) উপরোক্ত সীমারেখাগুলো বিবেচনায় রাখার পরও শ্রোতা নিজেই নিজের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে উপযুক্ত। সুতরাং কোনো গান অথবা গানের কোনো বিশেষ ধরন, যদি তার প্রবৃত্তিকে উসকে দেয়, তাকে ফিতনা বা প্রলোভনের দিকে আকৃষ্ট করে এবং ইন্দ্রিয়সুখমূলক কল্পনার বিচিত্র জগতে ভাসিয়ে নিয়ে যায়, তাহলে তার জন্য সেই গান পরিহার করা উচিত। যে দরজা দিয়ে ফিতনার বাতাস তার কলব, দ্বীন ও আখলাকে প্রবেশ করতে পারে, সে দরজাও তার বন্ধ করে দেওয়া উচিত। এতে সে নিজেও শান্তি পাবে এবং অন্যদেরও শান্তিতে রাখবে।

এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, আমাদের বর্তমান যুগের অধিকাংশ গানে উপরোক্ত সবগুলো শর্ত একসঙ্গে পাওয়া যায় না। এর কারণ হলো, গানের ব্যাপক প্রচলন, বৈচিত্র্যময় ধরন ও বিষয়বস্তু, পরিবেশনের বিভিন্ন পদ্ধতি এবং এমন সব মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে এর গভীর সম্পর্ক, যারা দ্বীন, এর নৈতিকতা ও আদর্শ থেকে অনেক দূরে। তাই কোনো মুসলিমের উচিত নয় এসব গান প্রচার করা, এগুলোর জনপ্রিয়তা ও প্রসারে ভূমিকা রাখা কিংবা এগুলোর প্রভাবের পরিধি বাড়িয়ে দেওয়া। কারণ এর মাধ্যমে এসব গানের বিপথগামী ও ক্ষতিকর প্রভাব আরও বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।

এ কারণেই যে মুসলিম নিজের দ্বীনের ব্যাপারে সচেতন ও যত্নশীল, তার জন্য সবচে উত্তম হলো নিজের ক্ষেত্রে সতর্কতার নীতি অবলম্বন করা, সন্দেহযুক্ত বিষয়গুলো থেকে বেঁচে থাকা এবং এই ক্ষেত্র থেকে নিজেকে দূরে রাখা। কারণ এ ক্ষেত্রে অল্প কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া হারামের কোনো মিশ্রণ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত থাকা কঠিন।

যে ব্যক্তি এ ব্যাপারে কিছুটা শিথিলতার মত গ্রহণ করে, সে যেন নিজের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করে এবং যতটা সম্ভব এমন বিষয় বেছে নেয়, যা পাপের সম্ভাব্য জায়গাগুলো থেকে অধিকতর দূরে।

যদি বিষয়টি শুধু গান শোনা (السماع)-এর ক্ষেত্রেই এমন হয়, তাহলে গানকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করা (الاحتراف بالغناء)-এর ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও কঠিন ও আশঙ্কাজনক। কারণ, কথিত “শিল্পী পরিবেশের” সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়া একজন মুসলিমের দ্বীনের জন্য ঢের বিপদের। খুব কম মানুষই এমন পরিবেশ থেকে নিরাপদ ও অক্ষত অবস্থায় বেরিয়ে আসতে পারে।

এ কথা পুরুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। আর নারীর ক্ষেত্রে এই ফিতনা (তার দ্বারা অন্যের জন্য এবং তার নিজের জন্য) আরও বেশি। এজন্য আল্লাহ তাআলা নারীদের পোশাক, চলাফেরা ও কথাবার্তায় অধিকতর শালীনতা, সংযম ও পর্দাশীলতা অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছেন। এর উদ্দেশ্য হলো, পুরুষদেরকে তাদের প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার ফিতনা থেকে দূরে রাখা এবং নারীদেরকেও পুরুষদের ফিতনা থেকে রক্ষা করা; পাশাপাশি তাদেরকে মানুষের কটূক্তি, লোলুপ দৃষ্টি এবং অসুস্থ হৃদয়ের কামনা-বাসনা থেকে সুরক্ষিত রাখা।

আল্লাহ তাআলা বলেন:

ذَٲلِكَ أَدْنَىٰٓ أَن يُعْرَفْنَ فَلَا يُؤْذَيْنَۗ

'তাদেরকে চেনার ব্যাপারে এটাই সবচেয়ে কাছাকাছি পন্থা হবে। ফলে তাদেরকে কষ্ট দেয়া হবে না।' [সূরা আল-আহযাব: ৫৯]

তিনি আরো বলেন:

فَلَا تَخْضَعْنَ بِٱلْقَوْلِ فَيَطْمَعَ ٱلَّذِى فِى قَلْبِهِۦ مَرَضٌ

'তবে (পরপুরুষের সাথে) কোমল কণ্ঠে কথা বলো না, তাহলে যার অন্তরে ব্যাধি রয়েছে সে প্রলুব্ধ হয়।'

[সূরা আল-আহযাব: ৩২]

একজন মুসলিম নারীর পেশা হিসেবে গান গাওয়া তাকে এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন করতে পারে, যেখানে সে অন্যকে প্রলুব্ধ করতে পারে অথবা নিজেই প্রলুব্ধ হতে পারে। পাশাপাশি এটি তাকে এমন কিছু হারাম কাজে জড়িয়ে ফেলতে পারে, যেগুলো থেকে বেরিয়ে আসা বা নিজেকে রক্ষা করা তার পক্ষে খুবই কঠিন। যেমন, গান রচনা, রেকর্ডিং, চুক্তি সম্পাদন ইত্যাদির জন্য কোনো গায়রে-মাহরাম পুরুষের সঙ্গে নির্জনে অবস্থান করা; কিংবা এমনভাবে গায়রে-মাহরাম পুরুষদের সঙ্গে মেলামেশা করা, যা শরিয়ত অনুমোদন করে না। এমনকি বেপর্দা ও তথাকথিত “স্বাধীনচেতা” নারীদের সঙ্গেও মেলামেশা করা (তারা বংশগতভাবে মুসলিম হোক অথবা অমুসলিম) তাও হারাম।



তরজমা করেছেন নাইম আল-ইসলাম সজীব।