মেন্যু
Menu

বাবরি মসজিদ ধ্বংস এবং নেহরুভীয় সেকুলারিজমের ভূত | ইরফান আহমাদ

৬ জানুয়ারি, ২০২৫

২০২২ সালের ৬ ডিসেম্বর রাষ্ট্রীয় সহযোগিতায় অবৈধভাবে বাবরী মসজিদ ধ্বংসের ৩০ বছর পূর্ণ হলো। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে “নেহরুভীয় সেকুলারিজম” এর প্রচলিত মিথটি আবারও পর্যালোচনা করা জরুরি। এই পর্যালোচনা জরুরী মূলত দুটি কারণে। প্রথমত, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (VHP) এবং ভারতীয় জনতা পার্টি (BJP) এর নেতৃত্বে বাবরী মসজিদ ধ্বংসের যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তা ছিল জওহরলাল নেহরুর “সেকুলার” সরকারের বিরুদ্ধে। এই আন্দোলনের দাবী ছিল যে “সেক্যুলার” নেহরু সরকারের “মুসলিম তুষ্টিকরণের” (Muslim appeasement) কারণে মসজিদটি ধ্বংস করা প্রয়োজন। এখানে সেকুলারিজম মানে ছিল মুসলমানদের পক্ষে অবস্থান নেওয়া এবং হিন্দুদের স্বার্থের বিরুদ্ধে থাকা। চলচ্চিত্র নির্মাতা ভিভেক অগ্নিহোত্রী যেমনটা বলেছেন: “বাস্তবতা হলো, আপনি যখনই বলবেন সেকুলার, মানুষ (হিন্দুরা) মনে করবে আপনি হিন্দু-বিরোধী।”

দ্বিতীয়ত, হিন্দুত্ব-বিরোধী অনেকেই মসজিদ ধ্বংসকে “সেকুলারিজম” থেকে বিচ্যুতি বা পরিবর্তন হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। কিছু বিবরণে, বিশেষ করে জনপ্রিয় ঐতিহাসিক উইলিয়াম ডালরিম্পলের লেখায় বলা হয়েছে যে,  প্রতিটি মসজিদের গম্বুজে “ভারতের সহনশীলতা, গণতন্ত্র এবং সেকুলারিজমের যে ঐতিহ্য” প্রতিফলিত হতো, বাবরী মসজিদ ধ্বংসের মাধ্যমে এই ঐতিহ্য “ভেঙে চুরমার” হয়ে গিয়েছিল। যদিও আপাততদৃষ্টিতে BJP-VHP এবং তাদের বিরোধীরা একে অপরের প্রতিপক্ষ, তবুও তারা একটি বিষয়ে একমত: সেকুলারিজম। তাই একদিকে যেমন আমরা যেমন দেখি রাজনৈতিক মনোবিজ্ঞানী আশিস নন্দীর লেখা “এন্টি-সেকুলার ম্যানিফেস্টো” এবং অন্যদিকে তেমনি দেখি ঐতিহাসিক ইরফান হাবিবের “সেকুলারিজমকে রক্ষা” করার আহবান।

“রাজনৈতিক বিতর্ক, দৈনন্দিন সাংবাদিকতা এবং একাডেমিক আলোচনায় প্রায় প্রাকৃতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠা নেহরুভীয় সেকুলারিজমের ধারণাটি তাহলে কতটা সঠিক?”

মিথ ১ – স্বাধীন ভারত সবসময় সেকুলার ছিল

ভারতে সেক্যুলারিজম নিয়ে প্রথম মিথটি হলো, প্রধানত নেহরুর ভূমিকার কারণে, ভারত প্রজাতন্ত্র হিসেবে জন্মের মুহূর্ত থেকেই সাংবিধানিকভাবে সেকুলার ছিল। তবে সত্য হলো, “সেকুলার” শব্দটি নেহরুর মৃত্যুর অনেক বছর পর সাংবিধানে যোগ করা হয়, এবং নেহরু নিজে এই শব্দটি সাংবিধানে যোগ করার জন্য কোনো চেষ্টা করেননি। কেউ হয়তো যুক্তি দিতে পারেন যে এখানে সেক্যুলারিজম শব্দটি নয়, বরং এর চেতনাবোধই আসল, যা নেহরুর আমলে রাষ্ট্রে অনুসৃত হয়েছিল। কিন্তু এই যুক্তির ভিত্তিতে কেউ আবার পাল্টা প্রশ্ন করতে পারেন: যদি সাংবিধানে “সেকুলার” শব্দটি না রাখেই সেকুলার চেতনা বিকশিত হতে পারে, তাহলে কি সাংবিধানে “গণতান্ত্রিক” শব্দটি না রেখেও গণতান্ত্রিক চেতনা বিকশিত হতে পারে? তাহলে কেন সাংবিধানে “গণতান্ত্রিক” শব্দটি রাখা জরুরি মনে হলো, অথচ “সেকুলার” নয়?

“যদি সাংবিধানে “গণতান্ত্রিক” শব্দটির উপস্থিতি কাকতালীয় না হয়, তাহলে “সেকুলার” শব্দটির অনুপস্থিতিও কাকতালীয় নয়।”

এ থেকে এটি যুক্তিসঙ্গতভাবে বলা যায় যে, যদি “গণতান্ত্রিক” শব্দটির উপস্থিতি কাকতালীয় না হয়, তাহলে “সেকুলার” শব্দটির অনুপস্থিতিও কাকতালীয় নয়। কিছু বিজ্ঞ বিশ্লেষক বলে থাকেন যে, ইন্দিরা গান্ধী সরকার জরুরি অবস্থার সময় “সেকুলার” শব্দটি সংবিধানে যুক্ত করেছিল। কিন্তু তারা এ আলাপ তুলেন না যে, কেন শুধুমাত্র সেই সময়েই এটি করা হয়েছিল এবং আগে কেন নয়?

এর একটি সম্ভাব্য উত্তর হতে পারে যে, ১৯৭১ সালে পাকিস্তান বিভক্ত হয়ে দুটি জাতি-রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার পর, অর্থাৎ বাংলাদেশ পাকিস্তান থেকে স্বাধীন হওয়ার পর, ভারতীয়/হিন্দু জাতীয়তাবাদ এবং তার ক্ষমতাধর গোষ্ঠীগুলো আর পাকিস্তানী জাতীয়তাবাদ থেকে কোনো ধরনের হুমকি অনুভব করেনি। যে পাকিস্তানকে বল্লভভাই প্যাটেল “অসুস্থ অঙ্গ” হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন এবং যাকে ভারতীয়/হিন্দু জাতীয়তাবাদকে সুস্থ রাখতে কেটে ফেলা উচিত বলে মনে করতেন—সেটি এবার দুটি অংশে বিভক্ত হয়ে গেল। 

চমকপ্রদভাবে, বাংলাদেশ সৃষ্টিতে ইন্দিরা গান্ধীর ভূমিকার জন্য তার প্রতিপক্ষ অতল বিহারি বাজপেয়ী তাকে দেবী দুর্গা হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। এক্ষেত্রে ভারতকে একটি শারীরিক এবং আধ্যাত্মিক দেহ হিসেবে মনে করা হতো, যা দেবী গান্ধীর নেতৃত্ব পরিচালিত হচ্ছিল। মূল বিষয়টি আসলে এটা না যে বাজপেয়ী আসলেই গান্ধীকে এইভাবে আখ্যায়িত করেছিলেন কি না, বরং আসল কথা হলো এই মিথ যা গান্ধীর দল কংগ্রেস পার্টিও গর্বের সঙ্গে মেনে নিয়েছিল। তেমনি “উদারপন্থী” বিশ্লেষক করণ থাপারও এই মিথকে সমর্থন করেছেন।

মিথ ২ – “সেকুলার” নেহরুর মুসলিম তোষণ

নেহরুর সেকুলারিজমকে মুসলিম তোষণ হিসেবে দেখানো ভুল এবং বিভ্রান্তিকর। বাস্তবে নেহরু মুসলিমদের নয়, বরং হিন্দুদের তোষণ করেছিলেন। ১৯৪৭ সালের অক্টোবর মাসে নেহরুর প্রধানমন্ত্রীত্বের সময় এবং RSS-এর সক্রিয় ভূমিকার মধ্য দিয়ে “জম্মু গণহত্যা” সংঘটিত হয়, যেখানে “২,৩৭,০০০ মুসলমান”-কে হত্যা করা হয়েছিল। ১৯৪৮ সালের হায়দরাবাদে তথাকথিত “পুলিশ অভিযানে” প্রায় ৪০,০০০ বা তারও বেশি মুসলমানকে হত্যা করা হয়। নেহরুর সেকুলারিজম ১৯৪৯ সালে অবৈধভাবে বাবরি মসজিদের ভেতরে হিন্দু মূর্তি স্থাপনকারীদের সহায়তা করেছিল। নেহরুর প্রশাসন এই অপরাধমূলক কাজগুলোর বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি;  এই ঘটনাগুলো পরবর্তীতে ১৯৮০-এর দশকের শেষ এবং ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে দেশব্যাপী সহিংসতার পথকে সুগম করেছিল। এছাড়াও ১৯৫০ সালে “সেকুলার” নেহরু প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সোমনাথ মন্দির নির্মাণে সহায়তা করেছিলেন। ১৯৮০-এর দশকে অযোধ্যায় নৃবৈজ্ঞানিক গবেষণা করা ডাচ নৃবিজ্ঞানী পিটার ভ্যান ডার ভীর তার গুরুত্বপূর্ণ বই Religious Nationalism-এ এই তথ্যগুলো লিপিবদ্ধ করেছেন।

নেহরুর হিন্দু তোষণ এখানেই থেমে থাকেনি। তার  হিন্দু তোষণের আরেকটি উদাহরণ হলো গরু জবাইকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করে আইন প্রণয়ন করা। এটি বলে রাখা ভালো যে গরু জবাই নিয়ে প্রচলিত “গো-হত্যা” (cow-slaughter) শব্দটিও নিরপেক্ষ নয়, কারণ এটি ব্রাহ্মণ্য হিন্দু দৃষ্টিভঙ্গিকে অনুমোদন করে। অ-হিন্দু দৃষ্টিকোণ থেকে, এটি খাদ্যাভ্যাসের স্বাধীনতার বিষয়। ১৯৪৯ সালের নভেম্বরে সাংবিধানিক ধর্মীয় স্বাধীনতার মূলনীতিকে চ্যালেঞ্জ করে গণপরিষদ (Constituent Assembly) “গরু ও বাছুরের জবাই নিষিদ্ধ করার” প্রস্তাব গ্রহণ করে এবং তা রাজ্যের নীতিমালা নির্দেশিকার অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে। সে সময় নেহরু শুধুমাত্র দেশের প্রধানমন্ত্রীই ছিলেন না, বরং মোহনচাঁদ গান্ধী হত্যার পর তিনি দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং “ক্যারিশম্যাটিক” নেতাও ছিলেন। ঐতিহাসিক ইয়ান কপল্যান্ডের মতে, নেহরুর লেখা বা গণপরিষদের কার্যক্রমের কোনো সরকারি নথিতে গরু লবির (cow lobby) পরিকল্পনা ভঙ্গ করার লক্ষ্যে নেহরুর কোনো হস্তক্ষেপের চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায় না।

“ঐতিহাসিক ইয়ান কপল্যান্ডের মতে, নেহরুর প্রকাশিত লেখাগুলো বা গণপরিষদের কার্যবিবরণীতে এমন কোনো চিহ্ন নেই যা দেখায় যে তিনি গরু লবির পরিকল্পনা ভঙ্গ করার চেষ্টা করেছিলেন।”

নেহরু গণপরিষদের কংগ্রেস-বহির্ভূত সদস্যদের চাপে মুসলমান এবং অন্যান্যদের খাদ্যাভ্যাসের স্বাধীনতা হরণকে অনুমোদন করছিলেন— কেউ এমনটা ভাবার আগেই স্মরণ করিয়ে দেয়া ভালো যে, সেসময় গণপরিষদের ৮০% সদস্যই ছিলেন কংগ্রেসের। অন্যদিকে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পূর্ণ ক্ষমতার অধিকারী নেহরুর অধীনে ১৯৫০ সালের রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশের মাধ্যমে খ্রিস্টান ধর্ম বা ইসলামে ধর্মান্তরিত তফশিলী বা সুবিধাবঞ্চিত জাতিগোষ্ঠীগুলোর (Scheduled Castes) জন্য সংরক্ষিত সুবিধাকে (reservation benefits) বাতিল হয়েছিল। এই আদেশ স্পষ্টভাবে দেখায় যে, নেহরু ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রতি অনুরাগী ছিলেন না। তার প্রতিপক্ষদের মতো, নেহরুও ভারতকে প্রধানত হিন্দু হিসেবে দেখতেন।

উদাহরণস্বরূপ, নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানগুলোতে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থাকে বাতিল করা সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব গণপরিষদের পাস হওয়ার পর, নেহরু যে উচ্ছ্বাসের সাথে প্যাটেলকে জন্য অভিনন্দন জানিয়েছিলেন তা এখানে স্মরণ করা যেতে পারে । সেদিন এক মিনিটের ব্যবধানে নেহরু দুবার মন্তব্য করেছিলেন: গণতন্ত্রে “সংখ্যাগরিষ্ঠের ইচ্ছা ... প্রাধান্য পাবে।“ এখানে নেহরুর “সংখ্যাগরিষ্ঠ” শব্দের ব্যবহার কোনো প্রক্রিয়াগত অর্থে ছিল না (যেমন লিবারালিজম আশা করে), বরং এটি ছিল দৃশ্যতই ধর্মীয়।

মিথ ৩ – নেহরু একজন সংশয়বাদী এবং বিজ্ঞানমনস্ক ব্যক্তিত্ব ছিলেন

নেহরুভীয় ধর্মনিরপেক্ষতার মিথ পরীক্ষা করতে গিয়ে আমার মূল মনোযোগ ছিল একজন রাজনীতিবিদ ও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার পলিসি এবং আইন প্রণয়নে তার সরাসরি ও পরোক্ষ ভূমিকার উপর। কেননা এই ভূমিকা নাগরিকদের উপর জীবনকে গঠন করা কিংবা ধ্বংস করে দেয়ার মতো গভীর প্রভাব ফেলে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে নেহরুর কিছু সমর্থক দাবি করেন যে তিনি ব্যক্তি হিসেবে একজন সংশয়বাদী, যুক্তিবাদী এবং বৈজ্ঞানিক মানসিকতার অধিকারী ছিলেন, তাই তাকে ধর্মনিরপেক্ষ বলতে হবে। তবে এই যুক্তি বাস্তব প্রেক্ষাপটে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অপ্রাসঙ্গিক।

তবে ব্যক্তিগত পরিসরেও এক্ষেত্রে একটি দ্বন্দ্ব লক্ষ্য করা যায়, যা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা প্রায়শই এড়িয়ে যান। ফ্রিডম অ্যাট মিডনাইট বইয়ের ৩০৭ নম্বর পৃষ্ঠায়, ল্যারি কলিন্স এবং ডমিনিক লাপিয়ের ১৪ আগস্ট ১৯৪৭ সালের রাতে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনার বিবরণ দিয়েছেন। দুই সন্ন্যাসী (ব্রাহ্মণ তপস্বী) “নেহরুকে পবিত্র পানি ছিটিয়ে শুদ্ধ করেন, তার কপালে পবিত্র ছাই লাগান, তার হাতে তাদের রাজদণ্ড রাখেন এবং তাকে দেবতার কাপড়ে আচ্ছাদিত করেন…নেহরু সেদিন উচ্ছ্বসিত বিনয়ের সাথে তাদের কাছে নিজেকে সঁপে দেন।”

স্পষ্টতই এখানে আমার উদ্দেশ্য নেহরুর ধর্মীয় প্রথা পালনের সমালোচনা করা নয়। বরং নেহরুভীয় ধর্মনিরপেক্ষতার মিথ টিকিয়ে রাখতে এ ধরনের তথ্য মুছে ফেলা বা দমন করার বিষয়টিই আমার মূল বক্তব্য।

মূল লেখা:

(https://maktoobmedia.com/opinion/destruction-of-babri-masjid-and-phantom-of-nehruvian-secularism/)

তরজমা করেছেন হাসান আব্দুল্লাহ।