পশ্চিমা চিন্তার অন্ধ অনুকরণ | ইউসুফ আল কারযাভী
আমাদের এই জমানায় বহু ফতোয়ার বিকৃতির পেছনে মূখ্য যেই কারণগুলো রয়েছে, তার মাঝে অন্যতম হচ্ছে—অন্ধ অনুকরণ কিংবা বশ্যতা। আপনি চাইলে এটাও বলতে পারেন—“পশ্চিমা চিন্তা ও পশ্চিমা সভ্যতার প্রতি গোলামিভাব”। আমাদের লোকজন বর্তমানে পশ্চিমের সামনে এবং তাদের সভ্যতা ও তাদের চিন্তার সামনে হরহামেশাই একটা বাতিকে ভোগে, যেটাকে বলে “Inferiority complex”। তারা পশ্চিমকে ধরে নেয় কিবলা হিসেবে, ভেবে নেয় এমন ইমাম হিসেবে যাকে মানতেই হবে কিংবা এমন এক আদর্শ হিসেবে যা অনুকরণ করতেই হবে। আমাদের যেই চিন্তা (thoughts), মূল্যবোধ, আচার (rituals) ও ব্যবস্থাগুলো পশ্চিমের বিপরীতে যায়, তারা সেটাকে আমাদের সভ্যতার ত্রুটি হিসেবে বিবেচনা করে এবং আমাদের শরিয়াহর খুঁত হিসেবে ধরে নেয়। তারা ধরে নেয়, পশ্চিমারা কোনো কিছুর স্বীকৃতি দিলে সেটাই ঠিক, আর তারা যেটার বিরোধিতা করবে সেটাই ভুল!
পশ্চিমের সঠিকতার ব্যাপারে তাদের দলিল হচ্ছে—তাদের অর্জিত বস্তুগত আবিষ্কার, স্থাপত্যগত উন্নতি এবং বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি, যার মাধ্যমে তারা প্রকৃতির শক্তিগুলোকে বশীভূত করেছে, মানুষকে মহাকাশে অভিযানে পাঠিয়েছে এবং চাঁদের মাটিতে পা রাখতে সক্ষম করেছে।
যখন পশ্চিমারা মুসলিম দেশগুলোর ওপর তাদের সামরিক এবং রাজনৈতিক আধিপত্য কায়েম করেছিল, তারা তখন এমন অনেকের মনের মধ্যে এই চিন্তা ও ধারণাগুলো ঢুকিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিল এবং এমন কিছু প্রজন্ম তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিল, যারা পশ্চিমা সভ্যতার মন্দিরে উপাসনা করে, তাদের চিন্তা ও আদর্শগুলোকে তর্কাতীত (undisputed) হিসেবে কবুল করে নেয়। তারা যেমন তোতাপাখির পাখির মতো তাদের কথা হুবহু পুনরাবৃত্তি করে, তেমনি বানরের মতো তাদের কাজের হুবহু নকলও করে।
এতে কোনো সংশয় কিংবা বিবাদ নেই যে, পশ্চিমা উপনিবেশবাদ তার যে কীর্তি ও নিদর্শনগুলো রেখে গেছে, তা হলো আমাদের ভূখণ্ডগুলোতে তাদের সৃষ্ট সবচেয়ে নিকৃষ্ট চিজ এবং সেগুলোতে যে ক্ষতি ও সর্বনাশা দিক রয়েছে, তা আরও অধিকতর বিধ্বংসী ও মারাত্মক; কারণ তা এমন এক ক্ষতি, যা সম্পৃক্ত মানুষের সাথে, বস্তুর সাথে নয়।
ভূমির উপনিবেশায়ন মানুষকে উপনিবেশায়ন করার থেকে কম বিপজ্জনক ও কম ক্ষতিকর। এমন কি কোনো উপনিবেশায়ন আছে, যা মানুষের আকল ও কলবকে উপনিবেশায়ন করার থেকে বড়?
এই প্রকারের উপনিবেশায়ন ঔপনিবেশিক শক্তির স্থায়িত্ব নিশ্চিত করে, এমনকি যদি তার সৈন্য-সেনারা চলেও যায়—যতক্ষণ তার পরিকল্পনাগুলো কার্যকর থাকে, তার চিন্তা ও আচারগুলো বিরাজমান থাকে এবং তার আইন-কানুনগুলো কার্যকর থাকে।
এসবের থেকেও আরো মারাত্মক বিপজ্জনক ব্যাপার হলো, সমাজকে ওয়েস্টার্নাইজড করার জন্য এই অবস্থাকে জাস্টিফাইয়ের চেষ্টা চালানো, তার বৈধতা দানের কোশেশ করা, নানান উপায়ে মানুষের মনে সন্দেহের উদ্রেক এবং প্রমাণে হেরফেরের চেষ্টা চালানো।
আমাদের চেতনাকে ধ্বংসকারী বিষয়গুলোর মধ্যে অন্যতম হলো—পশ্চিমা চিন্তার দাসত্বে লিপ্ত, কিছু তথাকথিত ‘এলমে দ্বীনের’ ধারক ও ফতোয়াবাজের আবির্ভাব; যারা এমন সব আলোচনা ও ওয়াজ সৃষ্টি করে রাখে, যার ছত্রচ্ছায়ায় মুসলিম উম্মাহর পরিচয়, মাকসাদ ও অভিমুখ পরিবর্তনের মতো ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের জন্য পশ্চিমারা নির্ভরতার আশ্রয় খুঁজে পায়; এগুলোর ফাঁদে পড়াটা এই সকল আলিম বা ফতোয়াবাজরা টের পাক বা না পাক।
বিজ্ঞানের মানদণ্ডে এই দৃষ্টিভঙ্গি বা মনোভাব ভুল এবং দ্বীনের মানদণ্ডে শিরক, আখলাকের মানদণ্ডে বিকৃতি, জাতীয়তাবাদের মানদণ্ডে বিশ্বাসঘাতকতা। কারণ ইউরোপ তো পৃথিবীর জননী না আর ইউরোপের ইতিহাস মানেই পৃথিবীর ইতিহাস না। সাদাচামড়ার মানুষ জগতের হর্তাকর্তা না, পশ্চিমা সভ্যতা মানে সভ্যতার সর্বোৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত কিংবা আদর্শ না এবং পশ্চিমা চিন্তা মানেই বিশ্বজাহানের জন্য ঐশি প্রেরণার উৎস না।
পশ্চিমের নিজস্ব সভ্যতা, ট্রাডিশন, নিজস্ব চিন্তা ও মূল্যবোধ রয়েছে আর আমাদেরও রয়েছে নিজস্ব সভ্যতা, ট্রাডিশন, নিজস্ব চিন্তা-ফিকির ও মূল্যবোধ, যা আমাদের আকিদা দেকে উৎসারিত। আমরা পশ্চিমের পিছনে পিছনে ইঞ্চি ইঞ্চি ধরে অনুকরণ করে চলতে কিংবা তার সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে হাঁটতে বাধ্য নই। তারা সাপের গর্তে ঢুকলে আমরা তাতে ঢুকতে বাধ্য নই।
পশ্চিমের আইন-কানুন ও তাদের আইনি ব্যবস্থাগুলো (legislative systems) তাদের নিজস্ব জীবনদর্শনের উপর ভিত্তি করে রচিত, অস্তিত্বের ব্যাপারে, আল্লাহর ব্যাপারে এবং মানুষের ব্যাপারে তাদের সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গি এবং দ্বীন ও দুনিয়ার ব্যাপারে তাদের স্বীয় চিন্তার উপর ভিত্তি করে রচিত। আর এটা আমাদের দর্শন ও অস্তিত্ব, জীবন, আল্লাহ ও মানুষের ব্যাপারে আমরা মুসলিমরা যা চিন্তা করি, তার সম্পূর্ণ বিপরীত।
পশ্চিমারা বৈধতা দেয় বলে আমরা সুদভিত্তিক মুনাফাকে বৈধতা দিতে বাধ্য নই কিংবা মদ-জুয়াকে হালাল বলতে বাধ্য নই। কেবল পশ্চিমারা তালাক ও বহুবিবাহ নিষিদ্ধ করে বলেই আমাদের জন্য সেগুলোকে নিষিদ্ধ করা আবশ্যক নয়। পশ্চিমের দর্শন নারী-পুরুষের সমতাবিধান, সে কারণে আমাদের জন্য সবকিছুতে নারী পুরুষের মাঝে সমতা বিধান করা আবশ্যক না; কারণ যেহেতু সৃষ্টিগত দিক এবং আল্লাহ প্রদত্ত ফিতরাতই নারী পুরুষের মাঝে এই তফাৎ সৃষ্টি করেছে।
সম্ভবত আধা শতক বা সত্তর-পঁচাত্তর বছর আগে—যখন সামরিক, রাজনৈতিক এবং চিন্তাগত উপনিবেশবাদের কর্তৃত্ব ছিল—তখন যারা পশ্চিমের পথ অনুসরণ ও তার সভ্যতার ভালো-মন্দ, মিষ্টি-তিক্ত সবকিছুই গ্রহণ করার প্রতি আহ্বান করতো, যার কিছু ছিল পছন্দনীয় আর কিছু ছিল অপছন্দনীয়, কিছু ছিল প্রশংসনীয় আর কিছু ছিল নিন্দনীয়, তখন অবশ্য কিছু ওজর বা কৈফিয়ত ছিল।
কিন্তু বর্তমানে রাজনৈতিক উপনিবেশবাদ তার কর্তৃত্বের অবসান ঘটিয়ে লম্ব দেওয়ার পর, আমরা নিজেরা নিজেদের কর্তৃত্বের অধিকারী হওয়ার পর, সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণ আমাদের বহু গোপন ঐতিহ্য এবং আমাদের সভ্যতার বহু রত্নভাণ্ডার উন্মোচন করার পর এবং ইসলামী বিশ্বে শত শত কলম চিন্তা, আইনপ্রনয়ণ (legislation) ও দিকনির্দেশনার ক্ষেত্রে এই ঐতিহ্যের মূল্য (value) স্পষ্ট করে তুলে ধরার পর এখন আর পশ্চিমা চিন্তার প্রতি অন্ধঅনুকরণমূলক দাসত্ব চিন্তার ওপর বহাল থাকার কোনো ওজর নেই।
মুক্তবুদ্ধি সম্পন্ন স্বাধীনচেতা অকপট পশ্চিমারা নিজেরা নিজেদের সভ্যতার সমালোচনা শুরু করেছে এবং তার ত্রুটি এবং সংকীর্ণতার জায়গাগুলো উন্মোচন করতে শুরু করেছে। তারা সতর্ককারী হিসেবে তাদের সভ্যতা পতনের বিপদ সংকেত দিচ্ছে, যদি না সে নিজের সংস্কার করে। যদি সংস্কার না করা হয়, তবে এই সভ্যতার পতন ঘটবে বলে তারা আভাস দিচ্ছেন।
হয়তো আমাদের মধ্যে অনেকেই আছেন যারা কিনা এই আত্মসমালোচনার কিছু অংশ পড়েছেন, যেমন The Decline of the West কিতাবে Oswald Spengler এর সমালোচনা, Man, The Unknown কিতাবে Alexis Carrel এর সমালোচনা এবং ‘সভ্যতার পতন’ কিতাবে Colin Wilson এর সমালোচনা। এছাড়াও আরো অন্যান্য সমালোচক চিন্তাবিদরা রয়েছেন।
আমাদের মাঝে যারা পশ্চিমা চিন্তাধারার গোলাম রয়েছে, তারা এমন সব মানুষ, কোনো কিছুই তাদেরকে সন্তুষ্ট করতে পারে না এবং কোনো কিছু তাদেরকে সন্তুষ্ট করতে পারবে, এই চিন্তা তাদের মাথায়ও আসে না। তারা এমন এক ইসলাম চায়, যা তাদের অভিলাষ ও রুচির সাথে সংগতিপূর্ণ হবে কিংবা তা এমন ইসলাম হবে, যা তাদের মনোবাসনার সাথে মিলপূর্ণ হবে। আপনারা চাইলে এটাও বলতে পারেন—তাদের গুরু ওরিয়েন্টালিস্ট, মিশনারি ও কম্যুনিস্টদের মনোবাসনার অনুসারী ইসলাম। তারা চায় এমন ইসলাম, যা হবে পশ্চিমা কিংবা মার্কসবাদী—পুরোটাই হবে তাদের মতবাদ ও তাদের দর্শন অনুযায়ী। তারা বলে, ‘তোমরা ইমাম, ফকিহ, ব্যাখ্যাকার ও তাফসিরকারকদের মতামত গ্রহণ করো না। কারণ এগুলো মানুষের মতামত। আমরা কেবল গ্রহণ করব পবিত্র ওহি থেকে।’
কিন্তু ধরুন, আপনি যদি তাদের সাথে একমত হয়ে যান, তবে দেখবেন তারা বলবে, আমরা ওহীর কিছু অংশ গ্রহণ করি আর কিছু অংশ গ্রহণ করি না। আমরা কুরআন গ্রহণ করি কিন্তু হাদীস গ্রহণ করি না! কারণ এতে দুর্বল, জাল, এবং মারদুদ (rejected) হাদীস রয়েছে। অথবা, আমরা মুতাওয়াতির হাদীস গ্রহণ করি কিন্তু আহাদ হাদীস গ্রহণ করি না। অথবা, আমরা ফি’লী (কর্মগত) হাদীস গ্রহণ করি কিন্তু কাওলি (বাচনিক) হাদীস গ্রহণ করি না!
যদি তাদের এ কথাও মেনে নেওয়া হয়, তবে তারা বলবে, কুরআন নিজেই আরব পরিবেশের সীমিত অবস্থাগুলো ও ছোটখাটো বেদুইন সমাজের বিষয়াদি নিয়ে আলোচনা করে। সুতরাং আমাদের জন্য জরুরি হচ্ছে এর মধ্যে থেকে যা আমাদের উন্নতির সাথে যায়, তা গ্রহণ করা এবং যা যায় না, তা ত্যাগ করা!
কাজেই কুরআন যখন বলবে—
حُرِّمَتۡ عَلَیۡكُمُ الۡمَیۡتَۃُ وَ الدَّمُ وَ لَحۡمُ الۡخِنۡزِیۡرِ
“তোমাদের জন্য মৃত জন্তু, রক্ত ও শূকরের মাংস হারাম করা হয়েছে।” (সূরা মায়িদা : ৩)
কিংবা কুরআন যখন শুকুরের মাংসকে “অপবিত্র” হিসেবে আখ্যা দিবে, তখন তারা বলবে, কুরআন এটি বলেছে আগেকার অপুষ্টিকর শূকরদের ব্যাপারে। কিন্তু আজকালকের শূকররা সেরকম নয়—তারা আধুনিক ও যুগোপযোগী শূকর, অতীতের শূকরের মতো পশ্চাৎপদ নয়!
কুরআন যখন মিরাসের ব্যাপারে বলবে—
لِلذَّكَرِ مِثْلُ حَظِّ الأُنثَيَيْنِ
“পুরুষের অংশ দু’টি মহিলার অংশের সমান” (সূরা নিসা : ১১)
তখন তারা বলবে—এটা ছিলো সেই সময়কার, যখন মহিলারা কাজের জন্য বের হতো না এবং জীবনের বিভিন্ন ময়দানে তাদের অস্তিত্ব কিংবা অবস্থান তখনো নিশ্চিত হয়নি।
কিন্তু এখন মহিলাদের personality বা নিজস্বতা তৈরি হয়েছে এবং অর্থনৈতিক স্বাধীনতা সৃষ্টি হয়েছে, তাই পুরুষরা যেভাবে উত্তরাধিকার সম্পত্তি পায় তারাও সেভাবে পাওয়া দরকার। এখানে দুই লিঙ্গের মাঝে পার্থক্য করার সুযোগ নেই!
তাছাড়া কুরআন যখন বলবে—
إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالأَنصَابُ وَالأَزْلامُ رِجْسٌ مِّنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ
“মদ, জুয়া, মূর্তিপূজার বেদী ও ভাগ্য নির্ণয় করার শর তো কেবল ঘৃণার বস্তু, শয়তানের কাজ। কাজেই তোমরা সেগুলোকে বর্জন করো।” (সূরা মায়িদা : ৯০)
তখন তারা বলবে, কুরআন গরম পরিবেশে এটিকে হারাম করেছে কিন্তু যদি এটি ঠাণ্ডা পরিবেশে হতো, তবে সে ব্যাপারে কুরআনের অন্য অবস্থান হতো!
এর মানে, তারা আল্লাহ তায়ালার প্রতি তাঁর সৃষ্টির ব্যাপারে অজ্ঞতাকে সম্পৃক্ত করছে এবং তারা এটা বুঝাতে চাচ্ছে যে, তিনি কেবল তাই জানেন যা ঘটছে। আর তাকদিরে কী আছে এবং ভবিষ্যতের জন্য কী অপেক্ষা করছে, তা তিনি জানেন না এবং তার হিসাবও তিনি করেন না। তারা যা বলছে, আল্লাহ তায়ালা সেসবের অনেক অনেক উর্ধে—
قُلْ أَأَنتُمْ أَعْلَمُ أَمِ اللَّهُ
“আপনি বলুন তোমরা কী বেশি জানো, নাকি আল্লাহ?” (সূরা বাকারা : ১৪০)
أَلا يَعْلَمُ مَنْ خَلَقَ وَهُوَ اللَّطِيفُ الْخَبِيرُ
“যিনি সৃষ্টি করেছেন, তিনি কি জানেন না? অথচ তিনি সূক্ষ্মদর্শী, সম্যক অবহিত।”(সূরা মুলক : ১৪)
(প্রবন্ধটি ড. ইউসুফ আল কারযাভীর ‘তাকলীদুল ফিকর আল-গারবী’ শীর্ষক লেখার তরজমা, যা তাঁর লিখিত ‘আল-ফাতাওয়া বাইনাল ইনদিবাত ওয়াত তাসাইয়ুব’ কিতাব থেকে সংকলন করা হয়েছে।)
(তরজমা করেছেন নাইম আল-ইসলাম সজীব।)