ট্রান্সজেন্ডারিজম : মানব প্রকৃতির ফেরেশতাসুলভ দিকের লঙ্ঘন | হাসান স্পাইকার
আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে এই যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের জোড়ায় সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা পরস্পরের মধ্যে শান্তি পেতে পার, আর তিনি তোমাদের মধ্যে স্থাপন করেছেন ভালোবাসা ও করুণা। নিশ্চয় এতে নিদর্শনাবলী রয়েছে চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য। (কোরআন ৩০ : ২১)
আর পুরুষ নারীর মতো নয়। (কোরআন ৩ : ৩৬)
“মানুষ হলো ফেরেশতা ও পশুত্বসুলভ দিকের এক মিলনস্থল।”
এই কথাটাই মানব সত্তার আসল রূপ—যেটা আল-রাগিব আল-ইসফাহানি, ইমাম গাজালী ও শাহ ওয়ালীউল্লাহর (রহঃ) মতো ইসলামী জ্ঞানের মহান চিন্তাবিদরা আমাদের শিখিয়েছেন। আল্লাহ্র দেয়া শরিয়ত আর ইসলামী নৈতিক দর্শনের আলোকে আমরা এটা জানি যে, আমাদের মধ্যে এই বিশেষ গঠন বা প্রকৃতি (ফেরেশতাসুলভ ও পশুসুলভ দিক) থাকলেই শুধু মানব মর্যাদা অর্জন হয় না। বরং, আমাদের প্রকৃতির বিভিন্ন দিকগুলোকে সঠিকভাবে সাজিয়ে, নিজের ইচ্ছাশক্তিকে সঠিক পথে ব্যবহার করেই আমরা সেই আসল মানব মর্যাদায় পৌঁছাতে পারি।
তবে মানুষ কোনো স্থির বা বিচ্ছিন্ন সত্তা নয়, যারা গজদন্ত মিনারে বসে দুনিয়াকে দেখে (অর্থাৎ নিজের দেহ বা বাস্তবতা থেকে আলাদা হয়ে দূর থেকে পৃথিবীকে দেখে)। মানুষ হওয়া মানে হলো—দুই ধরনের পরিপূরক, একে-অপরকে পূর্ণ করে এমন প্রেমময় ব্যবস্থার একজন সক্রিয় অংশীদার হওয়া, যা স্বাভাবিকভাবেই দু’টি স্বতন্ত্র সত্তার মধ্যে হয়ে থাকে।১
মানব অস্তিত্বময়তার প্রাচীনতম সত্য হচ্ছে প্রতিটি মানুষ দুটি লিঙ্গের মধ্যে একটি এবং কেবল একটিকেই একই সময়ে উপস্থাপন করে (এমন একটি অভিজ্ঞতা যা আমরা প্রত্যেকেই কেবল মানুষ হওয়ার কারণে পাই)- আমরা দেখতে পাই যে, আমরা সৃষ্টির মৌলিকভাবে দ্বৈত প্রকৃতির অধিবিদ্যামূলক(metaphysical) নীতিগুলোর প্রতিনিধিত্ব করি। প্রকৃতপক্ষে, প্রতিটি মানুষকে এই দুটি ভূমিকার মধ্যে একটিতে নিক্ষেপ করা হয়। আমরা কেউ পছন্দ করে পুরুষ বা মহিলা হই না। এবং তাই, মানব মর্যাদা অর্জনের আরও একটি দিক হল পুরুষ বা মহিলা হিসাবে আমাদের যে ভূমিকা দেওয়া হয়েছে তা সৌন্দর্য এবং ইহসানের সাথে পালন করা।
আমাদের মানব মর্যাদার এই বিশেষ দিকটির যে গভীর মেটাফিজিক্যাল (অস্তিত্বগত) ভিত্তি রয়েছে, তা ইসলামী ঐতিহ্যের অনেক চিন্তাবিদ হয়তো উপেক্ষা করে গেছেন (তবে সবাই না)। হয়তো এর কারণ এই যে, আমাদের পূর্বপুরুষরা এমন কিছু বাস্তব ও স্বাভাবিক মানব সত্যকে নিয়ে তেমন জটিল তাত্ত্বিক আলোচনা করতেন না, বরং তারা নিজের জীবনে সেসব সত্যকে বাস্তব রূপ দিয়েই দেখাতেন ও পূর্ণতা দিতেন।
কিন্তু আজকের দিনে এই বিষয়টা, অর্থাৎ লিঙ্গের মেটাফিজিক্যাল ভিত্তি এবং তার বাস্তব অস্তিত্বগত মর্যাদা নিয়ে স্পষ্ট বোঝাপড়ায় আসা জরুরি হয়ে উঠেছে। কারণ, লিঙ্গের ওপর আক্রমণ আসলে আমাদের মানব প্রকৃতি ও মর্যাদার ওপরই আক্রমণ। অথচ এই আক্রমণ এমনভাবে পেশ করা হচ্ছে যেন এটা “স্বাধীন, নিজের ইচ্ছায় নিজেকে নির্মাণের অধিকারসম্পন্ন ব্যক্তি”র মর্যাদা উদযাপন।
একবিংশ শতাব্দীর প্রথম কয়েক দশকে আমরা দেখছি— লিঙ্গ নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে যেসব কথা বলা হচ্ছে, বা এটিকে ‘প্রবাহমান’ ও ‘পরিবর্তনশীল’ বলে যেভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে— তা এক ধরনের ধর্মীয় আচার বা রীতির মতোই হয়ে দাঁড়িয়েছে। এইসব কার্যকলাপ মূলত সমাজকে নতুনভাবে গড়ে তোলার এক এক্সপেরিমেন্ট, যেটা উত্তরাধুনিক যুগের অন্তিম সময়ের বুদ্ধিবৃত্তিক হতাশা থেকে উঠে এসেছে। এই পোস্টমডার্ন ধারা বাস্তব জগতে এমন এক ধারণা প্রয়োগ করতে চাইছে, যাতে সত্য-মিথ্যার মধ্যকার পার্থক্য বা 'অবিচ্ছিন্নতা'র ধারণা ভেঙে ফেলা যায়।
এই কারণে, আজকের দিনে ‘লিঙ্গ হলো সামাজিক নির্মাণ (social construct)’— এই কথাটি এমনভাবে বলা হয় যেন এটা কোনো ধর্মীয় বিশ্বাসের মতোই স্বীকৃত সত্য। এই ধারণা বেশিরভাগই আসে এমন সব মানুষের কাছ থেকে যারা আধুনিক শিক্ষার সবচেয়ে ‘উন্নত’ রূপ পেয়েছে, কিন্তু এই বিশ্বাসের পেছনে গভীর দার্শনিক যুক্তি বা চিন্তার অভাবই বেশি। এটা অনেকসময় শুধু আপেক্ষিক সহানুভূতি (relativistic compassion) বা একরকম মিথ্যা যা স্বাধীনতার নামে চাপিয়ে দেওয়া হয়। তাহলে কি এই ধারণা এমন এক ‘পবিত্র রহস্য’, যেটা আমাদের বিশ্বাস করতে হবে, এমনকি মানব অভিজ্ঞতা আর শরীরবিজ্ঞানের সব প্রমাণ এর বিপক্ষে গেলেও?
ইসলামি ঐতিহ্য থেকে পাওয়া স্বস্তিদায়ক সত্য হল যে লিঙ্গ আমাদের পাশবিক প্রকৃতি এবং আমাদের ফেরেশতা প্রকৃতি উভয় থেকেই উদ্ভূত হয়—প্রকৃতপক্ষে, পাশবিক প্রকৃতি ফেরেশতা প্রকৃতির দ্বারা প্রভাবিত। দুই লিঙ্গ নীতির একত্রিত হওয়া থেকে উদ্ভূত উৎপাদক প্রেম(generative love) কেবল সন্তানের জন্ম দেওয়া নয়, (অবশ্যই সেটা মহান এবং গুরুত্বপূর্ণ) বরং পরিপূরক গুণাবলীর বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিশ্বের আবাদ করা, যেগুলো শুধুমাত্র লিঙ্গ-নীতির শারীরিক নয়, বুদ্ধিবৃত্তিক মিলনের মাধ্যমেই সম্ভব। লিঙ্গ নীতির মধ্যে আছে গ্রহণশীল, সংবেদনশীল, লালনকারী, সহানুভূতিশীল, সুন্দর নারীসুলভ গুণাবলী যা জৈবিকভাবে নারীর উপর প্রাধান্যশীল, যদিও একচেটিয়াভাবে নারীর বৈশিষ্ট্য নয়; এবং আঞ্জামকারী, সক্রিয়, রক্ষাকারী, মহিমান্বিত পুরুষত্ব যা জৈবিকভাবে পুরুষের উপর প্রাধান্যশীল, যদিও একচেটিয়াভাবে পুরুষের বৈশিষ্ট্য নয়।২
এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আমরা দেখি যে মানব লিঙ্গের সাথে এমন জটিলতা জড়িত যা মৌলিক দৈহিক পার্থক্যকে ছাড়িয়ে যায়। যা আমাদের বিশ্বের তত্ত্বাবধায়ক (খলিফা) এবং অভিভাবক হিসাবে কাজ করার আমাদের অনন্য ক্ষমতা দেয়। পরস্পর পরিপূরক লিঙ্গের মিলনের মাধ্যমে যা কেবলমাত্র অর্জিত হতে পারে। সেই গুণাবলীর পরিপূরকতা মানবজাতির অনন্য প্রকৃতির পূর্বশর্ত হিসেবে কাজ করে, যা স্বর্গীয় ও পশুর মিলনস্থল হিসেবে বিবেচিত হয়, অর্থাৎ, এটি আমাদের পৃথিবীর দায়িত্বশীল হিসেবে আমাদের অনন্য অবস্থান থেকে উদ্ভূত, যেখানে আমরা যে ভারসাম্য এবং ঐকতান অর্জন করতে চাই তা প্রথমে বিপরীত গুণাবলীর মধ্যে ভারসাম্য অর্জনের মাধ্যমেই সম্ভব। চতুর্দশ শতাব্দীর মুসলিম ধর্মতত্ত্ববিদ আদুদ দীন আল-ইজির নীতিশাস্ত্রের উপর পরবর্তী অনেক মন্তব্যের মধ্যে এই নীতিটি গুরুত্বের সাথে সামনে আসে:
“মানুষের সৃষ্টির পেছনে যে প্রজ্ঞা রয়েছে— যে মানুষ সমস্ত জগতের সারসংক্ষেপ— তা হলো আল্লাহর প্রতিনিধিত্ব করা, যেমন কুরআনের আয়াত (২:৩০) -এ স্পষ্ট বলা হয়েছে: 'আমি পৃথিবীতে একজন প্রতিনিধি নিয়োগ করবো।' আর এটাই সুরা আহযাবের (৩৩:৭২) মূল বার্তা: 'আমি আসমান, জমিন ও পর্বতসমূহের কাছে আমানত পেশ করলাম, কিন্তু তারা তা বহন করতে ভীত হলো। আর মানুষ তা বহন করলো।' মানুষের এই প্রতিনিধিত্বের অধিকার পাওয়ার কারণ হলো—তার প্রকৃতির মধ্যে বিপরীত গুণাবলী গ্রহণ করার অসাধারণ সক্ষমতা, যার মাধ্যমে সে আল্লাহর বিপরীত নামগুলোর প্রকাশস্থল হতে পারে এবং বাহ্যিক ও আধ্যাত্মিক জগতের আবাদ, পরিচর্যা ও নির্মাণ করতে পারে।”৩
যদিও এই নীতি সরাসরি লিঙ্গকে মাথায় রেখে গঠিত হয়নি, এটি তবুও আমাদের লিঙ্গের দার্শনিক ভূমিকা এবং মানুষের খিলাফতের জন্য আল্লাহর পরিকল্পনায় এর ভূমিকা সম্পর্কে চিন্তা করা হলে এক উজ্জ্বল, শৈল্পিক এবং সন্দেহাতীত সত্য হিসেবে কাজ করে।৪ তবে, উনিশ ও বিংশ শতকে চার্লস ডারউইন, কার্ল মার্কস এবং সিগমুন্ড ফ্রয়েডের হাতে সমাজ ও মানুষের ধারণা পুনর্গঠিত হয় এমন এক দৃষ্টিকোণ থেকে, যা প্রকাশ্যে বা প্রচ্ছন্নভাবে বস্তুবাদ (materialism)-কে মেনে চলে। এর ফলে, লিঙ্গ, যৌনতা এবং পরিবার সম্পর্কে প্রথাগত ধারণাগুলোর এক বিপরীতমুখী পুনর্বিবেচনার সূচনা ঘটে। এই নতুন দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তি ছিল এমন একটি ধারণা— যে এই জগতে কোন ঈশ্বর নেই। কারণ, যেহেতু ঐতিহ্যগত দৃষ্টিভঙ্গিগুলো মূলত ধর্মতাত্ত্বিক (theological) ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে ছিল, তাই খোদাবিহীন জীবনের “মুক্তি” মানেই যেন সেই ঐতিহ্যগত বিশ্বাস ও কাঠামো থেকেও মুক্তি পাওয়া উচিত—যদিও ঐ ধারণাগুলো মানুষ ও সমাজের প্রকৃতিগত স্বভাবের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিল। এই পুরো প্রবণতা এক চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায় ফরাসি দার্শনিক জ্যঁ-পল সার্ত্রের দার্শনিক ব্যাখ্যায়, যেখানে তিনি সরাসরি ‘মানব প্রকৃতি’কেই বাতিল করে দেন। তাঁর যুক্তি ছিল—অস্তিত্ব (existence) সার্বিক রূপে মর্মের (essence)-এর আগে আসে।৫ অর্থাৎ, মানুষের কোনো নির্ধারিত প্রকৃতি নেই; মানুষ নিজের অস্তিত্বের অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়েই নিজেকে গড়ে তোলে।
তার আধ্যাত্মিক গুরু মার্ক্স আগেই ব্যাখ্যা করেছিলেন যে ধর্ম হলো “মানুষের মর্মের কাল্পনিক প্রকাশ”, কারণ “মানুষের মর্মের কোনো বাস্তব অস্তিত্ব নেই”।৬ “মানুষ কোনো বিমূর্ত সত্তা নয়, যে জগতের বাইরে বসে থাকে। মানুষই মানুষের জগৎ, রাষ্ট্র, সমাজ।৭” মার্ক্সের মতে, কোনো মূলগত বা সার্বজনীন মানব প্রকৃতি নেই। বরং, কেবল “মানুষের প্রকৃতির কাল-নির্দিষ্ট অনেক রূপ রয়েছে, যেমন সামন্তবাদ, পুঁজিবাদ, সমাজতন্ত্র ইত্যাদির জন্য নির্দিষ্ট মানব প্রকৃতি”। প্রকৃতপক্ষে, “মানুষের আসল প্রকৃতি হলো সামাজিক সম্পর্কগুলোর সামগ্রিকতা।” মার্ক্সের দৃষ্টিতে, মানুষের প্রকৃতি কোনো একক, অপরিবর্তনীয় সত্তা নয়, বরং মানুষের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার দ্বারা নির্ধারিত এবং গঠিত হয়। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, বিভিন্ন যুগে মানুষের প্রকৃতি ভিন্ন ভিন্নভাবে প্রকাশিত হয়, যা ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে সমাজের কাঠামো ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল।৮ মানব প্রকৃতি সম্পর্কে মার্কসের দৃষ্টিভঙ্গির ফলস্বরূপ তিনি একইভাবে লিঙ্গকে আরও বিকাশে সক্ষম একটি গতিশীল ধারণা হিসাবে দেখানোর চেষ্টা করেন।৯ এর কারণ হল “যেহেতু প্রকৃতি এবং সমাজ কোনোটাই স্থির সত্তা নয়। তাই ‘প্রাকৃতিক’ (natural) কী- তা নিয়ে কোনও আন্তঃঐতিহাসিক (trans-historical) বা কালোত্তীর্ণ ধারণা থাকতে পারে না। বরং, ‘প্রাকৃতিক’ এমন একটি ধারণা যা শুধুমাত্র নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক পরিস্থিতির জন্য প্রাসঙ্গিক হতে পারে।”১০
মানব প্রকৃতি বলতে কিছু না থাকলে বলা যায়, সেই প্রকৃতি থেকে উদ্ভূত দিকগুলো (যেমন লিঙ্গ) আরও বেশি অপ্রয়োজনীয় হওয়ার কথা। ইমানুয়েল কান্ট বলেন, ব্যক্তিগত স্বাধীনতার ক্ষেত্র কেবল আমাদের বিশ্বাস এবং ক্রিয়াকলাপকেই নয়, বরং আমাদের যুক্তি এবং প্রকৃতি সম্পর্কে আমাদের বোঝার ক্ষমতাও অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। এই দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের শুধু ধর্মীয় বিশ্বাস এবং প্রথাগত সামাজিক কাঠামোর গভীরভাবে ধারণ করা নীতিগুলোই নয়, আমাদের বাস্তবতার যে দিকগুলো একসময় অপরিবর্তনীয় বলে মনে করা হত সেগুলো নিয়েও প্রশ্ন তুলতে উৎসাহিত করে। বস্তুনিষ্ঠ দার্শনিক সত্য এবং নৈতিক দায়িত্ব এর কয়েকটি উদাহরণ। আরেকটি সম্পূর্ণ ভিন্ন উদাহরণ হল লিঙ্গ। সম্প্রতি মৌলিক মানব অস্তিত্বের এই রূপকে আপেক্ষিক, দৃষ্টিভঙ্গিগত, তরল, শোষণের হাতিয়ার বা এমনকি পুরোপুরি কাল্পনিক হিসেবে দেখানোর চেষ্টা চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে।
লৈঙ্গিক তারল্যের অগ্রদূতগণ
১৯৯০ সালে জুডিথ বাটলারের Gender Trouble বইটি (যা ২১শ শতকের প্রথম দশকে পাঠকদের মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল) যদি লৈঙ্গিক-তারল্য আন্দোলনের জন্য একটি মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়, তাহলে সার্ত্রের পার্টনার সিমোন দ্য বোভোয়ার প্রভাবশালী কাজ The Second Sex(1959) ছিল তার বীজ। আজকের সমাজ ব্যক্তিকে নানা ভাবে প্রভাবিত করে, একধরনের বাধ্যতামূলক উদারতাবাদের (coercive liberalism) প্রতি চাপ সৃষ্টি করে, যার ফলাফল হয় এক গোঁড়া সংখ্যাগরিষ্ঠ মানসিকতা, যেখানে মানব প্রকৃতির এবং লিঙ্গের পরিপূরকতার অস্বীকার হয়ে উঠে একটি মূল বিশ্বাস।
দ্য বোভোয়ার বিখ্যাত ভূমিকা লাইনগুলো তার প্রকল্পের একটি সার তুলে ধরে:
নারীত্ব কি ডিম্বাশয় থেকে নিঃসৃত কোনো কিছু? এটা কি কোনো প্লেটোনিক স্বর্গে স্থায়ীভাবে সংরক্ষিত কোনো আদর্শ? একটা ফুলে ওঠা লেইসের স্কার্ট পরলেই কি তা মাটিতে নেমে আসে?
যদিও কিছু নারী নারীত্বকে জীবনের আদর্শ হিসেবে আত্মস্থ করতে খুব উদ্যমী হয়ে ওঠেন, তথাপি এটির কোনো নির্দিষ্ট পেটেন্ট নেই। সাধারণত এটি এমনভাবে বর্ণিত হয় যেন তা কোনো ভবিষ্যদ্রষ্টার (clairvoyant) ধোঁয়াটে ও ঝকঝকে শব্দভাণ্ডার থেকে ধার করা ভাষা। সেন্ট থমাসের সময়ে নারীত্বকে এমন একটি সারসত্তা (essence) হিসেবে ধরা হতো যা নির্দিষ্ট ও নিশ্চিত— যেমন পোস্তদানার ঘুমপাড়ানি গুণ। কিন্তু এখন সেই ধরনের ধারণাগত চিন্তা (conceptualism) আর আগের জায়গায় নেই। জীববিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞান এখন আর বিশ্বাস করে না যে, নির্দিষ্ট কিছু গুণ (যেমন নারীত্ব, বা ইহুদি বা কৃষ্ণাঙ্গ সত্তা) চিরস্থায়ী ও অবিচল কোনো স্বভাব থেকে নির্ধারিত হয়। সমসাময়িক বিজ্ঞান এগুলোকে কোনো নির্দিষ্ট পরিস্থিতির প্রতিক্রিয়ায় গড়ে ওঠা গৌণ বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখে। তাই যদি আজ নারীত্ব বলে কিছু না থাকে, তাহলে হয়তো কখনোই ছিল না। তাহলে কি “নারী” শব্দটার কোনো অন্তর্নিহিত অর্থ নেই? এটাই হলো সেই দাবি যা আলোকিত যুগের দর্শন, যুক্তিবাদ ও নামবাদ (nominalism) অনুসরণকারীরা জোর দিয়ে করে থাকেন। তাদের মতে, “নারী” কেবল একজন মানুষের প্রতি একটি ইচ্ছাকৃত বা স্বেচ্ছাচারী নামমাত্র আরোপ; এর পেছনে কোনো চিরন্তন সত্য বা স্বতন্ত্র সত্তা নেই।
দ্য বোভোয়া এটা অস্বীকার করেন না যে, নারীদের অস্তিত্ব আছে, তার মতে তাদের অস্তিত্ব সামাজিক স্বীকৃতির(social construct) দ্বারা রূপায়িত হয়। তার বিখ্যাত উক্তি, “কেউ নারী হিসেবে জন্মগ্রহণ করে না, বরং একজন নারী হয়ে ওঠে।” এই ধারণাটি আমাদেরকে আজকের দিনে স্ব-নির্ধারণশীল ব্যক্তিগত(self-determining individual) স্বাধীনতার শীর্ষে নিয়ে যায়। যদিও ব্যক্তির একটি সহজাত মর্ম (essence) রয়েছে, তবে তাকে তার প্রকৃতির দ্বারা বাধ্য হতে হবে না।

একজন যুবক একটি মেয়েকে মদের পেয়ালা দিচ্ছে, যা সুফির ব্যাকুল আকুলতার রূপক, যা আল্লাহর সঙ্গে মিলিত হওয়ার পথে আবশ্যিক ধাপ। হেরাত বা ইরান, ১৬শ শতক; জলরঙ ও সোনালি রঙে কাগজে আঁকা। শিল্পী অজানা।
এটি ভাবা উচিত নয় যে, এই আত্ম-সৃষ্টি প্রক্রিয়ায় কেউ সামাজিক নির্মাণের জাল থেকে পালিয়ে বাস্তবে প্রবেশ করছে। বরং, যখন শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে স্থায়ী, অটল সত্তাগুলো, যেমন লিঙ্গ-প্রকৃতি এবং মানব-প্রকৃতি নির্বাসিত হয় তখন সবকিছুই সামাজিক নির্মাণ হয়ে যায়। সমসাময়িক লৈঙ্গিক-তারল্যের আরেক অগ্রদূত বাটলার, দ্য বোভোয়ার চেয়েও অনেক দূর আগ বাড়িয়ে যান। দ্য বোভোয়ার লিঙ্গ এবং যৌনতার মধ্যে পার্থক্যকে কাজে লাগিয়ে বাটলার বলেন যে, কেবল লিঙ্গই(gender) নয়, বরং যৌনতাও(sex; শারীরবৃত্তীয়ভাবে পুরুষ বা নারী হওয়া) একটি সামাজিক নির্মাণ।
কিন্তু আসুন আমরা কিছু সময়ের জন্য এই উদ্ধত, উচ্ছৃঙ্খল, বিরক্তিকর শারীরবৃত্তের বিষয়টিকে একপাশে রেখে পর্যালোচনায় নামি। (যদিও লিঙ্গ এবং যৌনতা উভয়ই অস্বীকার করা হোক বা না হোক - প্রকৃতপক্ষে, এই পার্থক্যটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, এবং বলা যায় যে দুটো একটি অমোচনীয় ঐক্যের ভিন্ন দিক) আমাদের সমাজে লিঙ্গ এবং যৌনতা ব্যক্তিগত পছন্দ - এই ধারণাটি প্রচার করার জন্য একটি ব্যাপক সামাজিক চাপ দেওয়া হয়েছে। এই ধারণাটি এতটাই বিস্তৃত যে, আমাদের বর্তমান উত্তর-আধুনিক বিশ্বে আদর্শগত লড়াই কতটা জরুরি তা আপনি বুঝতে না পারলে ব্যাখ্যা করা কঠিন, লিঙ্গ ধারণাও তার আদর্শগত ভিত্তি খুঁজে পেতে লড়াই করছে। মূলত, এটি বলে যে একজন পুরুষ বা মহিলা হওয়ার ক্ষেত্রে জীববিজ্ঞান বা কোনও দর্শনের চেয়ে ব্যক্তিগত পছন্দ বেশি জরুরী। মজার ব্যাপার, এই ধারণাটি ডি বোভোয়ার সেক্স এবং জেন্ডারের মধ্যে পার্থক্য থেকে এসেছে, যেমনটি বাটলার উল্লেখ করেছেন।
যদি এই পার্থক্যটি সব সময় ধরে মানা হয়, তাহলে বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে—কোনো নির্দিষ্ট যৌনতার অধীন (যেমন নারী বা পুরুষ) হওয়া কি আদৌ কোনো নির্দিষ্ট লিঙ্গে (যেমন নারীসুলভ বা পুরুষসুলভ আচরণ) রূপ নেয়ার জন্য জরুরি? যদি "নারী" হওয়া কেবল "নারী দেহ" থাকার একটি সাংস্কৃতিক ব্যাখ্যা হয়, আর যদি সেই ব্যাখ্যা নারীত্বের কোনো বাধ্যতামূলক ফল না হয়, তাহলে দেখা যায়, নারীদেহ কেবল "নারী" নামক লিঙ্গ গঠনের এক ঐচ্ছিক কেন্দ্রবিন্দু। এ কারণে এটাও নাকচ করার কোনো যুক্তি থাকে না যে, ওই নারীদেহ অন্য কোনো লিঙ্গ গঠনের কেন্দ্রবিন্দুও হতে পারে।১২
নারীবাদী মেটাফিজিশিয়ান নাতালী স্টলজার অনুসারে, “নামবাদ(nominalism) নারীবাদীদের মধ্যে অধিক জনপ্রিয় অবস্থান, এবং বাস্তববাদ(realism) সাধারণত অগ্রাহ্য করা হয়।”১৩ দ্য বোভোয়ার দ্বারা অনুপ্রাণিত র্যাডিকেল নারীবাদ মূলত এমন একটি ধারণার জন্ম দিয়েছে যা এখন নারীবাদের অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলেছে। লৈঙ্গিক-বাস্তববাদ(gender-realism) অন্যান্য অনেক ধারণার সাথে হারিয়ে যায় যা সুস্পষ্ট ও স্বতঃপ্রমাণিত, তবে এখন পুরানো “সাধারণ-জ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গি” হিসাবে দেখা হয়। লৈঙ্গিক-বাস্তববাদ হলো এই ধারণা যে, প্রতিটি লিঙ্গ মৌলিকভাবে আলাদা, স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত, এবং একটি বাস্তব, অপরিবর্তনীয় মর্ম(essence) রয়েছে, প্রতিটি ব্যক্তি কেবল একটি লিঙ্গকেই প্রকাশ করতে পারে।১৪ একাডেমিক পরিসরে লৈঙ্গিক-মর্মবাদের(gender-essentialism) বিরুদ্ধে গুরুতর প্রান্তিকীকরণ এবং বিরুদ্ধ পক্ষপাতের দীর্ঘ ইতিহাসের মধ্য দিয়ে ট্রান্সজেন্ডার মতবাদের ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা এসেছে।
এখানে মর্মের বিরুদ্ধে সাধারণ পক্ষপাতের বাইরেও একটি বিস্তৃত সমস্যা রয়েছে, যা অবশ্য উত্তর-আধুনিক চিন্তার একটি মূল দিক এবং লক এবং কান্টের মতো চিন্তাবিদদের দ্বারা আধুনিক যুগেও প্রস্তাবিত ছিল। এটি কেবল মর্মের ধারণা নিয়ে সন্দেহ করার বিষয় নয়। মূলত এখান থেকেই এসবের শুরু। কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে চরম আত্মনিয়ন্ত্রণের অন্যান্য চ্যালেঞ্জ যেমন অজাচার বা স্বেচ্ছামৃত্যুর মতো বিষয়গুলোর তুলনায় লৈঙ্গিক-তারল্যের বিরোধীদের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া কেন এত তীব্র এবং আক্রমণাত্মক? ঠিক কী কারণে এই লৈঙ্গিক নমনীয়তা, তারল্য এবং অস্থিতিশীলতার ধারণা তীব্রভাবে প্রচার করা হয়, যেন এটি একটি জীবন-মৃত্যুর বিষয়?
এর কারণ, এই পবিত্র রূপান্তর হলো মরণাপন্ন পোস্টমডার্ন ধর্মের সর্বোচ্চ আচার ও বলিদান - এটি পশ্চিমা বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যেরই একটি নাটকীয় সমাপ্তি, একটি অন্তিম সৎকার। অস্ত্রোপচার-পরবর্তী ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তি এই ধর্মের যোগাযোগকারী (Communicant), এবং তার ত্যাগ (যে সে তার “মৃত নাম” ত্যাগ করেছে আমাদের স্বাধীনতার জন্য) একটি প্রায়-ধর্মীয় অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। এটি এমন একটি চিহ্ন যার মাধ্যমে শুধুমাত্র আত্ম-সৃষ্টিকেই পূজা করা যায়, এবং যার মাধ্যমে একজন ব্যক্তির অসীম দার্শনিক স্বাধীনতা চোখের সামনে প্রকাশিত হয়—যেন এটি একমাত্র নির্মোহ ও চূড়ান্ত বাস্তবতা।
যৌনতা, লিঙ্গ ও কানের লতি
ভুয়া বা ছদ্ম-ধর্মীয় উন্মাদনা কোনোভাবেই সরল, চূড়ান্ত এবং নির্ভুল যুক্তিগুলোকে পরিবর্তন করতে পারে না যা আমাদের বিশ্বের গঠনকারী প্রতিষ্ঠান এবং প্রকৃতির বৈধতারূপে সাদামাটা সমাজ নির্মাণের বিরুদ্ধে।১৫ তবে এই যুক্তিগুলোর প্রকৃত শক্তি এবং অপরিহার্যতা বোঝার জন্য কিছু মৌলিক আধুনিক ধারণা পুনর্বিবেচনা করা দরকার হতে পারে। এই বুদ্ধিবৃত্তিক পুনরুদ্ধারের জন্য একটি ভালো শুরু হতে পারে লৈঙ্গিক-মর্মবাদের একজন অনন্য সমর্থক শার্লট উইটের বক্তব্য দিয়ে:
“কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, বা শ্রেণি সামাজিক উৎস বা সংজ্ঞা থেকে উদ্ভূত বলেই তার একটি মর্ম (essence) থাকতে পারে না - এই ধারণা ভুল।” ১৬
অন্যভাবে বললে, কোনো প্রকৃতি বা মর্মের অদৃশ্য মাত্রা থাকা মানেই এটি ব্যক্তিনিষ্ট(subjective), নির্মিত, অবাস্তব, বা অন্যভাবে বললে, এটি বস্তুবস্তু(objective) নয় - এমনটা বোঝায় না।১৭ তবে উইট স্পষ্ট করে বলেছেন যে লৈঙ্গিক-মর্মবাদ(gender essentialism) অনেক সমসাময়িক চিন্তাবিদদের কাছে সরল মনে হয় প্রধানত পশ্চিমা নারীদের দুর্দশার কারণে, যারা 'অসংগত সামাজিক ভূমিকায়' আছেন।১৮ তিনি একজন নারী চিকিৎসকের(যিনি একজন মা) উদাহরণ দেন, যিনি -
বাচ্চার কথা চিন্তা করে নাইট ডিউটিতে কাজ করতে অস্বীকৃতি জানাতে পারেন, এর মাধ্যমে তিনি তার মাতৃত্বের ভূমিকা এবং সামাজিক বা নৈতিক আদর্শ ও নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকাকে অগ্রাধিকার দেন। তার মাতৃত্বের ভূমিকা চিকিৎসকের ভূমিকার থেকে 'মহত্ত্ব' পায়, তবে এটি মানসিক দ্বন্দ্বের সম্ভাবনাকে অস্বীকার করে না। তাই, যদি পশ্চিমা নারীদের দুর্দশার একটি অংশ হয় বিরোধী সামাজিক নীতির ব্যাপারে দ্বন্দ্বের শিকার হওয়া, তাহলে এমন কোন সত্তা আছে যা উভয় ধরনের নীতির অধীনে পড়ে।১৯
অর্থাৎ, যে প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলোর মিশ্রণ (যেখানে লিঙ্গ ও যৌনতা অবিচ্ছেদ্য) ব্যক্তি বা মানুষের মনে এমন দ্বন্দ্ব তৈরি করে, তার একটি আলাদা বাস্তব ভিত্তি থাকতে হবে— বাস্তবে, তার অস্তিত্ব থাকতে হবে— যাতে এটি সম্ভব হতে পারে! বস্তুত, যদি যৌনতা এবং লিঙ্গের মধ্যে একটি বাস্তব পার্থক্য থাকেও (যদিও, আমরা আবারও বলছি, এগুলোর মধ্যে কেবল একটি দৃষ্টিভঙ্গিগত পার্থক্য রয়েছে), উইটের উদাহরণ স্পষ্টভাবে দেখায় যে নারীত্ব (লিঙ্গ, যা যৌনতার সামাজিক প্রকাশ) সম্পূর্ণরূপে সামাজিক নির্মাণে সংকুচিত করা যায় না। ব্যাপারটা আরো পরিষ্কার করার জন্য উদাহরণটা আরো ব্যাখ্যা করা যাক: একজন গর্ভবতী সার্জন একটি জীবন-মৃত্যুর ঝুঁকিপূর্ণ হৃদযন্ত্রের অস্ত্রোপচার করার সময় তার নিজের প্রসব বেদনা শুরু হয়। (উদাহরণটি অবশ্যই কাল্পনিক, কিন্তু বুঝার জন্য এটাই মূল বিষয়।) তিনি এমন একটি সংকটের মুখোমুখি হন যা তার পুরুষ সহকর্মীরা কখনোই মোকাবেলা করেন না। এটি তার লিঙ্গের সাথে সম্পর্কিত (যেহেতু হাসপাতালের অন্য চিকিৎসকদের মধ্যে এটি সামাজিক প্রশ্ন যে, সে জীবন-মৃত্যুর কোন পরিস্থিতিটার দিকে নজর দিবে, রোগীর অস্ত্রোপচার নাকি তার সন্তান জন্ম দেওয়া), যা তার সামাজিক পরিবেশ থেকে উদ্ভূত নয়, বরং তার এই প্রজনন ব্যবস্থা বা শারীরবৃত্তীয় কারণে যে, তিনি একজন নারী। এক কথায়, এটি তার নারী হওয়ার কারণে ঘটে। লিঙ্গ যৌনতার সামাজিক প্রকাশ হিসেবে এই সংকট তৈরি করে (যেখানে অবশ্যই, তার কাজ থেকে বের হয়ে সন্তান জন্ম দেওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প থাকে না)। আসলে, এটি দেখায় যে যৌনতা এবং লিঙ্গের মধ্যে কোনো প্রকৃত পার্থক্য নেই, তবে প্রথমটি শারীরতত্ত্বকে নির্দেশ করে এবং দ্বিতীয়টি তার প্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত ও সামাজিক বিষয়গুলোকে নির্দেশ করে। এটি অবিশ্বাস্য যে বর্তমান পরিস্থিতিতে এই উদাহরণ দিতে হচ্ছে, অথচ এটি একটি মৌলিক ও স্বতঃসিদ্ধ সত্য। কিন্তু আমাদের মানতে হবে যে, আমরা এখন আসলেই এমন এক দার্শনিক সমস্যায় পৌঁছেছি।
বর্তমান ছদ্ম-দার্শনিক(pseudo-metaphysical) চিন্তাধারায় লিঙ্গ নিয়ে বিস্তৃত পরিসরে মতামত রয়েছে। কিছু লোক মনে করেন, লিঙ্গ একটি সামাজিক নির্মাণ এবং এর কোনো জীববৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই (এরই চরম দৃষ্টিতে, যৌনতাও একটি সামাজিক নির্মাণ)। অন্যদিকে, অপসারণবাদীদের(abolitioists) মধ্যে রয়েছেন স্যলি হ্যাসলেঙ্গার, যিনি এমআইটির একজন নারীবাদী দার্শনিক, যিনি মনে করেন যে 'নিপীড়িত' শব্দটি নারীর সংজ্ঞার মূল বৈশিষ্ট্য। তাই তিনি একটি লিঙ্গহীন সমাজে বাস করার জন্য 'নারী' বর্গ পুরোপুরি বিলুপ্ত করতে চান। শার্লট উইট এবং তার সঙ্গীরা, যারা লিঙ্গের মর্মবাদকে সমর্থন করেন, তারা বলছেন যে লিঙ্গ হচ্ছে একটি সামাজিক ব্যক্তির নৈতিক ঐক্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ 'নীতি'২০, এবং দার্শনিক মারি মিকোলাও লিঙ্গের বাস্তবতাকে সমর্থন করে বলেন যে নারীদের বিলুপ্তি দিনশেষে খুব একটা ভালো ধারণা নয়।
এর বিপরীতে, মিকোলা নামবাদী দৃষ্টিভঙ্গিকে বর্ণনা করেন: “লিঙ্গকে সামাজিক নির্মাণ হিসেবে দেখলে… এটি বোঝায় যে নারীর অস্তিত্ব মন-পছন্দ বা সমাজের কর্মকাণ্ডের উপর নির্ভরশীল। তাই, লিঙ্গের ভিত্তি পরিবর্তন করে নারীদের মুছে ফেলা সম্ভব”।২১ মিকোলা দুটি সামাজিক নির্মাণের উদাহরণ ব্যবহার করেন, একজন নারী হওয়া (যা তার মতবিরোধীদের মতে একটি সামাজিক নির্মাণ) এবং একজন সংসদ সদস্য হওয়া (যা অন্তত আংশিকভাবে সামাজিক নির্মাণ হতে পারে)।২২ তিনি দুটি বাক্যের তুলনা করেন -
(১) ‘জনের দেহ দেখার পর আমি বুঝতে পারলাম সে একজন নারী,’ এবং
(২) ‘জনের দেহ দেখার পর আমি বুঝতে পারলাম সে একজন সংসদ সদস্য’২৩
এভাবে তিনি দেখান যে নারীত্বের একটি স্পষ্ট অস্তিত্বগত ভিত্তি আছে, যা সংসদ সদস্য হওয়ার মতো সামাজিক নির্মাণের নেই।
আমরা দেখেছি, জুডিথ বাটলার এমন স্পষ্ট সত্যে বিশ্বাসী নন। বুভোয়া যৌনতা এবং লিঙ্গের মধ্যে পার্থক্য নিশ্চিত করার পরও, তিনি এটা মেনে নিতে প্রস্তুত নন যে আমরা একটি নির্দিষ্ট যৌনতায় জন্মগ্রহণ করি। ফুকো এবং স্বঘোষিত লেসবিয়ান মেটেরিয়ালিস্ট মনিক উইটিগকে অনুসরণ করে যখন তিনি বলেন:
যে শারীরবৃত্তীয় পার্থক্যগুলো আমাদের মধ্যে বিদ্যমান, সেগুলো সাংস্কৃতিক ব্যাখ্যার আগে আসে না, বরং সেই পার্থক্যগুলোর নিজস্ব ব্যাখ্যাও এক ধরনের আদর্শগত অনুমান হিসেবে দেখা যায়। মানে, এগুলো সামাজিক ধ্যানধারণা দ্বারা প্রভাবিত। উদাহরণস্বরূপ, উইটিগ (Wittig) উল্লেখ করেছেন যে নবজাতকদের জন্মের পর যৌনতার ভিত্তিতে বিভক্ত করা হয়, যা আসলে সামাজিক প্রজননের উদ্দেশ্যে কাজ করে। তবে এটাই একমাত্র উপায় নয়। শিশুদের কান বা কানের লতির গঠনকে ভিত্তি করেও আলাদা করা যেত, বা বরং শারীরিক গঠনকে একেবারেই ভিত্তি না করেও এমন পার্থক্য করা যেতে পারত।২৪
এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যাচ্ছে, যে প্রজননের উপর মানবজাতির বেঁচে থাকা, মানব আন্তঃসম্পর্কের পরিপূরকতার সবচেয়ে মৌলিক দিকগুলোর বাস্তবায়ন এবং ফুকো, উইটিগ, এবং বাটলারের অস্তিত্ব নির্ভরশীল, জন্মগ্রহণকারী শিশুদের পার্থক্য নির্ধারণের জন্য কানের লতির গঠন থেকে তা কোনোভাবেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ বা বস্তুনিষ্ঠ মানদণ্ড নয়।
যদিও বাটলার যৌনতা ও লিঙ্গ নিয়ে পুরোপুরি বোঝাপড়ায় আসতে পারেন না, তিনি স্বীকার করেন যে আমাদের প্রত্যেকের কিছু আছে যাকে বলা হয় শরীর, যা আমাদের শুরু থেকেই থাকে। এই রহস্যময় শরীর কীভাবে সামাজিক নির্মাণের জাল থেকে পালাতে পারল তা আমরা জানি না, তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, “একজন ব্যক্তির শরীর শুরু থেকেই থাকে এবং তারপরে কেবল তার লিঙ্গ হয়ে ওঠে।” কিন্তু, এটিকে শরীর হিসেবে অভিহিত করা, যেমন কোনো ‘বিশুদ্ধ আত্ম-নির্ধারণের চরম স্বাধীন নির্মাণের অদ্বিতীয় কেন্দ্র’ নয় বরং সাধারণভাবে শরীর বলে চিহ্নিত করাও একটি প্রাথমিক সিদ্ধান্ত যা বিভিন্ন নৈতিক অনুমান এবং ধারণা দ্বারা প্রভাবিত। বাটলার এখানে একটি হতাশাজনকভাবে নির্মাণবাদী হয়ে উঠেছেন!
আমরা আবার শারীরবিদ্যার দিকে ফিরে যাই, বাটলারের দৃষ্টিকোণ থেকে “প্রকৃতির বিভ্রম” আমাদের বিশ্বাস করায় যে আমাদের শারীরিক পার্থক্যের জ্ঞান (এই ক্ষেত্রে তথাকথিত যৌনাঙ্গ সম্পর্কিত) একটি বস্তুনিষ্ঠ, পৃথক বাস্তবতার বিষয়ে সচেতনতার ইঙ্গিত দেয়, যার অন্তর্নিহিত এবং অপরিহার্য সামাজিক প্রভাব রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে, “যা আমরা শারীরিক ও সরাসরি উপলব্ধি মনে করি, তা কেবল একটি অত্যন্ত জটিল এবং পৌরাণিক নির্মাণ, একটি ‘কল্পিত রূপ’ যা শারীরিক বৈশিষ্ট্যগুলোকে পুনঃব্যাখ্যা করে (স্বয়ং বৈশিষ্ট্যগুলো অন্য যেকোনো বৈশিষ্ট্যের মতো নিরপেক্ষ, কিন্তু সমাজের দ্বারা চিহ্নিত) সম্পর্কের জালের মাধ্যমে সেগুলো উপলব্ধি করা হয়... আদতে সমাজে প্রকৃতি বলে কিছু নেই।”২৬
আরও প্রচলিত দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বলতে গেলে, এই ‘কাল্পনিক গঠন’ বা ‘পুরাণিক নির্মাণ’গুলো প্রতিটি ব্যক্তির অস্তিত্বের সৃষ্টি করেছে - এমনভাবে চিহ্নিত করার দরুণ একটি সমস্যা সৃষ্টি করেছে। কারণ একটি অস্তিত্বশীল বিষয়কে অনস্তিত্বশীল কিছু থেকে সৃষ্টি করা যায় না। একমাত্র এই ধারণা গ্রহণ করা যেতে পারে যে, যদি উইটিগ এবং বাটলার মনে করেন, মানব সত্তা বাস্তব। দুর্ভাগ্যবশত, এর অর্থ দাঁড়ায় এই সবখানে উপস্থিত ‘কাল্পনিক নির্মাণ’গুলোও আসলে কাল্পনিক নয়।
মার্ক্সের দৃষ্টিতে পরিবার
তারল্য তত্ত্বকে বাস্তবে প্রয়োগ করার এবং নারীবাদ, সমকামিতা এবং ট্রান্সজেন্ডারিজমের বিভিন্ন রূপের মাধ্যমে নতুন ধরনের ব্যক্তি স্বাধীনতার ধারণাকে বাস্তবায়িত করার চেষ্টা অনেকের কষ্ট এবং ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ভুক্তভোগীরা এমন এক সামাজিক পরিসর থেকে বঞ্চিত হয়েছেন যা তাদের জন্য অতীব প্রয়োজনীয়, যেমন পরিবার এবং পরিবারভিত্তিক সমাজ, যা মানবিক বিকাশের জন্য অপরিহার্য। ব্যক্তি যদি প্রাকৃতিক সীমাবদ্ধতাগুলো থেকে মুক্তি পায়, তাহলে তারা একটি উন্নত ও সন্তোষজনক বাস্তবতা খুঁজে পেতে পারে - এমন ধারণা আসলে ঐতিহ্যবাহী পরিবারের ওপর একটি দীর্ঘমেয়াদী আক্রমণের অংশ। গঠনবাদ(constructionism) তত্ত্বের মূল প্রবক্তারা এবং সেইসঙ্গে লিঙ্গ-তারল্য তত্ত্বের প্রবক্তারাও পরিবারকেই তাদের আক্রমণের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। মূলত, লিঙ্গ ভূমিকার সঙ্গে লিঙ্গ প্রকৃতির কোনো সম্পর্ক আছে, এমন ধারণাকে অস্বীকার করাই ছিল লিঙ্গ-বিরোধী বাস্তববাদের(gender anti-realism) মূল ভিত্তি। মার্ক্স যেমনটা শিখিয়েছিলেন, মানব প্রকৃতি শুধুমাত্র “সামাজিক সম্পর্কগুলোর সমষ্টি”। অতএব, মানব প্রকৃতি সামাজিক সম্পর্কগুলোকে কোনোভাবেই নির্ধারণ করে না, বরং সেই সম্পর্কগুলোই মানব প্রকৃতিকে প্রতিনিয়ত নতুন করে গড়ে তোলে।
এই পুনর্গঠন ও পুনঃসংজ্ঞায়নের প্রক্রিয়ায় মানব প্রকৃতিও ক্রমাগত পরিবর্তিত হতে থাকে।
ফ্রেডেরিক অ্যাঙ্গেলসের ১৮৮৪ সালে প্রকাশিত ‘The Origin of the Family’ বইটি মার্ক্সের মৃত্যুর এক বছর পর প্রকাশিত হয়। অ্যাঙ্গেলসের মতে, প্রথম শ্রেণীর সংগ্রাম হল দাম্পত্য জীবনে স্বামী এবং স্ত্রীর মধ্যে সংঘাত, এবং প্রথম শ্রেণীর শোষণ হল পুরুষের দ্বারা নারীর শোষণ।২৭ এই সম্পর্কের মধ্যে পুরুষ বুর্জোয়া এবং নারী প্রলেতারিয়েত।২৮ আধুনিক পরিবার স্ত্রীর ‘গৃহকর্মের গোপন বা প্রকাশ্য দাসত্ব’-এর উপর প্রতিষ্ঠিত, যেখানে স্ত্রীদের বিয়েতে বাধ্য করা হয় কারণ অবিবাহিত নারীদের অর্থনৈতিকভাবে পুরুষদের উপর নির্ভর করতে হয়। তাই ‘স্ত্রীর মুক্তির প্রথম শর্ত হল পুরো নারী সম্প্রদায়কেই পাবলিক ইন্ডাস্ট্রিতে টেনে আনা, এবং এর ফলে... একক স্ত্রী-স্বামী পরিবারকে সমাজের অর্থনৈতিক একক হিসেবে বিলোপ করা প্রয়োজন।২৯ যেহেতু প্রস্তাবিত সমাজতান্ত্রিক সমাজে সকল শিশু সমাজের দ্বারা পালন করা হবে, এমনকি বিবাহ বহির্ভূত জন্ম নেওয়া শিশুদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হবে, ফলে ব্যভিচারের ফলাফল নিয়ে নৈতিক ও অর্থনৈতিক উদ্বেগ থাকবে না আর ‘একটি মেয়েকে সেই পুরুষের প্রতি সম্পূর্ণ ভালবাসা থেকে নিজেকে সমর্পণ করতে’ বাধা দেবে না। অ্যাঙ্গেলস আগ্রহ নিয়ে বলেন যে, এটি ‘অবাধ যৌন সম্পর্কের ক্রমবর্ধমান বিকাশ’ ঘটাবে।৩০ পুঁজিবাদ উৎখাতের পর এঙ্গেলস এমন একটি সমাজের স্বপ্ন দেখেন,
যেখানে এমন প্রজন্মের পুরুষ থাকবে যারা জীবনে কখনও কোনও মহিলার সমর্পণ অর্থ বা অন্য কোনও সামাজিক ক্ষমতার হাতিয়ার দিয়ে কেনেনি; আর একটি প্রজন্মের মহিলা থাকবে যারা প্রকৃত ভালোবাসা ছাড়া অন্য কোনো কারণে নিজেকে পুরুষের কাছে উৎসর্গ করেনি, বা অর্থনৈতিক পরিণতির ভয়ে তাদের প্রেমিকের কাছে নিজেকে দিতে অস্বীকার করেনি। যখন এই ধরনের মানুষ পৃথিবীতে আসবে, তখন তারা বর্তমান সমাজের মানুষ কী করা উচিত বলে মনে করে তা নিয়ে বিশেষ চিন্তা করবে না; তারা নিজেরাই তাদের আচার-ব্যবহার এবং সেই অনুযায়ী তাদের নিজস্ব জনমত তৈরি করবে—এবং সেটাই হবে এর(শোষণের) শেষ।৩১
বর্তমানের মানুষ ভিক্টোরিয়ানদের যৌন নৈতিকতা কি ছিল তা সম্পর্কে খুব বেশি চিন্তা করে না। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এঙ্গেলসের কল্পনা করা “অন্তিম সমাপ্তি” কখনও বাস্তবায়িত হয়নি। বর্তমানে যে সংগঠিত এবং রাষ্ট্র অনুমোদিত যৌনসীমার মুক্তি আমরা দেখছি, যা ক্রমাগত বাড়ছে এবং জটিল হচ্ছে, তা উৎপাদনের মাধ্যমের মালিকানা পরিবর্তন ছাড়াই ঘটেছে। মহিলারা ব্যাপকভাবে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করেছেন, কিন্তু তারা অত্যধিক সামাজিক, কর্পোরেট, এবং মিডিয়া চাপের শর্তে নিপতিত হয়েছেন যাতে তারা পরিপূর্ণ, মুক্ত, আত্ম-অন্বেষণকারী, সর্বদা যৌনভাবে প্রস্তুত নারীদের মতো আচরণ করতে বাধ্য হন। আজকের যুগের উন্নত স্বেচ্ছাচারী ভোগবাদের কালে, এটি খুবই বাস্তবিক এবং বেদনাদায়ক যে নারীরা খুব কমই ‘সত্যিকারের ভালোবাসা’ দাবি করছে, যাতে তারা তাদের পরিচিত নয় এমন পুরুষদের কাছে নিজেদের সমর্পণ করতে পারে, এবং তারা নিঃসন্দেহে বদলা হিসেবে কিছুই পাচ্ছে না।
মার্কস লিখেছেন, যখন নারীরা শ্রমবাজারে প্রবেশ করল, তখন তারা তাদের ব্যক্তিগত জীবনে কিছু ক্ষমতা অর্জন করল কারণ তারা পরিবারের কল্যাণে অর্থনৈতিকভাবে অবদান রাখতে পারছিল... এর ফলে পরিবারের উপর একটি উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়ে... দীর্ঘ সময় কাজ এবং রাতে কাজ করা চিরায়ত পারিবারিক কাঠামোকে দুর্বল করতে শুরু করে, কারণ নারীরা তাদের কাজের মাধ্যমে কিছুটা ‘পুরুষালী’ হয়ে যাচ্ছিল এবং তাদের শিশুদের আগের মতো যত্ন নিতে পারছিল না। অন্যদিকে, মার্ক্স উল্লেখ করেন যে, এই ‘চরিত্রের অবক্ষয়’ এক ধরনের ‘উন্নত পরিবারের’ দিকে নিয়ে যায়, যেখানে নারীরা পুরুষদের সত্যিকার সমান হবে।৩২
মার্ক্সের অনেক বক্তব্য-ই দূরদর্শী হতে দেখা যায়, তবে এই ‘উন্নত পরিবারের’ ধারণাটি ইতিহাসে বাস্তবে পরিণত হয়নি। সত্যিকার অর্থে, নারীদের বাধ্যতামূলক ক্যারিয়ার এবং পুরুষের মত উপার্জনকারী ভূমিকার মধ্যে নিয়ে আসা নারীবাদী গবেষণায় জেন্ডার নমিনালিজমের(নামবাদ) প্রধান উদ্দীপক হিসেবে কাজ করেছে। এই পরিস্থিতি নারীবাদী আন্দোলনের জন্য প্রধান শত্রু হিসেবে তৈরি করেছে লৈঙ্গিক-তারল্যকে। নারীবাদী নামবাদীরা (nominalist) তাদের দার্শনিক অবস্থান দ্বারা লিঙ্গের একটি নমনীয় সংজ্ঞার উপর দৃঢ় নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে চান। তারা এটি ব্যবহার করে ঐতিহ্যগত নারীত্ব ও মাতৃত্বের স্বাভাবিকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চান, কিন্তু এখন হঠাৎ করে তাদের নিজেদের যুক্তি (যে ‘যাদের জন্মের সময় ‘পুরুষ’ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে’ তারা এই ‘নির্মাণ’কে নিজেদের ইচ্ছামতো গ্রহণ করতে পারে এবং এর মাধ্যমে ‘নারী’ হয়ে উঠতে পারে) এটার প্রসার দেখে হতাশ এবং উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছেন। তার চেয়েও খারাপ ব্যাপার হলো, তারা কখনো কল্পনাও করেননি যে এই লাগামহীন আদর্শ মৃতপ্রায় উত্তর-আধুনিকতার প্রধান আদর্শে পরিণত হবে। এটি তাদের বিশ্বাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ, কারণ লৈঙ্গিক তারল্য চরিত্রের স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি (self-determining arbitrarism) তাদের দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি, মূল্যবোধ এবং আদর্শের সবচেয়ে নিখুঁত প্রতিফলন।
বিষয়টি লক্ষণীয় যে, নতুন সমাজব্যবস্থার সমর্থকরা প্রায়ই অত্যন্ত আক্রমণাত্মকভাবে প্রতিক্রিয়া দেখান যখন কেউ তাদের মতের বিপরীতে কিছু বলে, এবং যুক্তিসঙ্গত বিতর্কে অংশগ্রহণ করার অক্ষমতাও প্রদর্শন করেন। ফলে অনেকেই যারা ভিন্ন মত পোষণ করেন, তারা তাদের মত প্রকাশ করতে ভয় পান। এই ভয় আরও তীব্র হয় যখন দেখা যায় যারা সামান্যতম অস্বস্তি প্রকাশ করেন বা ভিন্ন চিন্তাভাবনা করেন, তারা সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার আশঙ্কায় থাকেন, যেভাবে কয়েক বছরের মধ্যে মানব প্রকৃতি ও পরিবার সম্পর্কে পূর্বে স্বতঃসিদ্ধ সত্যগুলো সম্পূর্ণভাবে পরিত্যাগ করা হয়েছে। সমাজকে সমতল করা হচ্ছে, এবং ‘মিথ্যা’ হায়ারার্কির নয় বরং সকল প্রকার হায়ারার্কি বিলুপ্তির জন্য জোর দেয়া হচ্ছে। এখন আমাদেরকে বিশ্বাস করতে বলা হচ্ছে যে, লিঙ্গের পরিপূরকতা এবং সেই শারীরিক সম্পর্ক যা জীবন সৃষ্টি করে, তা কোনওভাবে লিঙ্গ ও যৌনতার এমন ধারণাগত বিকৃতির চেয়ে শ্রেষ্ঠ নয়, যা জীবনকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। এমন অত্যাচার মিডিয়া এবং রাষ্ট্র-সংজ্ঞায়িত সংখ্যাগরিষ্ঠ দ্বারা চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে, যেমনটা টোকভিল সতর্ক করেছিলেন।
যেমন ছিল বাস্তবতা
চলুন আমরা আবারও ফিরে যাই আমাদের ঐতিহ্যের উপকরণসমূহ থেকে প্রাপ্ত সেই আরোগ্যদায়ক ও মুক্তিদায়ক সত্যে। কেননা, লিঙ্গ তো আসলে পরস্পর-পরিপূরকতা ও সৃজনশীল মিলনের মূলনীতিরই দেহজগতে একটি প্রতিফলনমাত্র।
সৃষ্টির অধিবিদ্যাগত (metaphysical) ব্যাখ্যার কিছু গুরুত্বপূর্ণ সূত্র অনুযায়ী, আল্লাহ্ তাআলা তাঁর পরম প্রজ্ঞা ও স্বাধীন ইচ্ছায় স্থির করেন যে নিচের জাগতিক জগৎ (সাবলুনারি ওয়ার্ল্ড) উদ্ভবের জন্য এক ধরণের সৃজনশীল মিলনের পূর্বশর্ত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত থাকবে—এটি হচ্ছে সর্বোচ্চ সক্রিয় সৃষ্ট উপাদান "আল-কলম" (সর্বোচ্চ কলম বা প্রথম বুদ্ধি) ও সর্বোচ্চ প্রভাব গ্রহণকারী সৃষ্ট উপাদান "লাওহে মাহফূজ" (রক্ষিত ফলক বা সার্বজনীন আত্মা)-এর মধ্যে মিলন। এই দুই মূল উপাদানকে ইসলামী অধিবিদ্যায় আদিম ‘লিঙ্গ’ নীতি হিসেবেও দেখা হয়, যেগুলো অস্তিত্বের অধিবিদ্যাগত স্তরসমূহে বিভিন্নভাবে প্রকাশ পায়।
এই সৃজনশীল মিলনের মধ্য দিয়ে উদ্ভূত যে প্রেম—অর্থাৎ metaphysical nikāḥāt বা অধিবিদ্যাগত বিবাহ—তারা প্রকৃত আদর্শ রূপ হয়ে দাঁড়ায় আমাদের জগতে ঘটে যাওয়া শারীরিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সৃষ্টির জন্য। এই সৃষ্টির অন্যতম রূপ হলো নারী ও পুরুষের মধ্যকার বিবাহ, যা পারস্পরিক পরিপূরকতা ও সৃজনশীল মিলনের এক অনুপম বাস্তবায়ন।
পরস্পর পরিপূরক গুণাবলীর চর্চা, যার অভাব থাকলে এই জগতে স্থিতিশীলতা ও সঙ্গতি স্থাপন সম্ভব নয়, তা পুরুষ ও নারীর চিরায়ত লিঙ্গ ভূমিকাগুলোর মধ্যে একটি সুমহান সম্পর্কের উপর নির্ভর করে। একজন পুরুষকে তার পরিবারকে রক্ষা করতে হবে, অর্থাৎ, তাকে প্রমাণ করতে হবে যে সে একজন সরবরাহকারী, সক্রিয়, রক্ষক এবং মহিমান্বিত কওয়াম(যিনি রক্ষা করেন, বজায় রাখেন এবং সমর্থন দেন)।
মমত্ববোধের (ইনফি’আল) ধারণা (যা সংরক্ষিত ফলক((اللَّوْحُ الْمَحْفُوظُ) বা মহাজাগতিক আত্মার মাধ্যমে প্রকাশিত হয়) ইঙ্গিত দেয় যে এই বিশেষ পুরুষালি ভূমিকার ভারসাম্য রক্ষার জন্য এমন আরেকটি জীবনধারা প্রয়োজন যা একে পরিপূর্ণ করে। পুরুষের সক্রিয় নীতি শুধুমাত্র প্রক্রিয়াকে শুরু করতে পারে, কিন্তু নিজে থেকে জীবন দান ও লালনপালনের কাজ সম্পূর্ণ করতে পারে না। তাকে মানব অস্তিত্বের পরিপূরক, নারীর স্বভাবের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ সহচরত্ব খুঁজে নিতে হয়, যে আদর্শগতভাবে (যদিও একচেটিয়া নয়) গ্রহণশীল, সংবেদনশীল, লালনকারী, সহানুভূতিশীল, সুন্দর। একজন নারীকে তার ভূমিকা একজন পুরুষের মতো পালন করতে বলা, বা উল্টোটি করার চেষ্টা, মানব জীবনের অন্তর্নিহিত যে পরিপূরকতা আছে তা ক্ষুণ্ণ করে—যা প্রতিটি মানুষের প্রয়োজন। এতে স্বাভাবিক সুর হারিয়ে যায়। ভারসাম্য ভেঙে পড়ে।
লিঙ্গের আবির্ভাবের অন্তর্নিহিত প্রজ্ঞা ছিল -
শুধুমাত্র একই ধরনের অন্য এক সত্তার মধ্যে অন্তরঙ্গ ভালবাসার সন্ধান... যেন দেহজগতে, এই প্রাকৃতিক মিলনের মাধ্যমে, পরিপূর্ণ মানবসত্তা সেই আকারে বিদ্যমান হতে পারে, যা আল্লাহ ইচ্ছা করেছেন, যা সর্বোচ্চ কলম(الْقَلَمُ الأَعْلَى) এবং সংরক্ষিত ফলকের((اللَّوْحُ الْمَحْفُوظُ) সাদৃশ্য বহন করে।৩৪
তাহলে, লিঙ্গ কেবলমাত্র পরিপূরক এবং উৎপাদক মিলনের অধিবিদ্যক নীতিগুলোর বস্তু জগতে প্রকাশ যা খোদার সমস্ত সৃষ্টিকে ছড়িয়ে দেয়। এই ধরনের মিলনের মাধ্যমেই আমাদের সত্ত্বাগত অস্তিত্বের মাত্রা বিকশিত হয়, বিশ্বের আবাদ হয় এবং মহাবিশ্বের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন সম্ভব হয়, যা আমাদের অনন্য মানবিক পরিপূর্ণতা, মূল্য এবং মর্যাদার বিষয়। পৃথিবীর অস্তিত্ব এবং অখণ্ডতা লিঙ্গের বাস্তবসম্মত পরিপূরকতার উপর নির্ভরশীল, যা কোনভাবেই তরল বা পরিবর্তনযোগ্য নয়।
টীকা ও হদিস:
আরবীয় যুক্তিতে, মানব প্রকৃতি এবং লিঙ্গের মধ্যে সংযোগ কেবল একটি সত্যিকারের বিচ্ছিন্ন প্রস্তাবের মাধ্যমে বোঝা যায়, যা বলে যে “একজন মানুষ হয় পুরুষ অথবা মহিলা”। এর মানে হল যে কেউই পুরুষ এবং মহিলা উভয়ই একসাথে হতে পারে না, যা বাইজেন্ডারিজম। উপরন্তু, এজেন্ডারিজম, নন-বাইনারিজম এবং জেন্ডারকুইয়ারিজমের মতো ধারণা অনুযায়ী কেউই পুরুষ বা মহিলা কোনোটাই না হয়ে থাকতে পারে না। খুনসা/হিজড়া শব্দটি প্রায়শই “হার্মাফ্রোদিতি” হিসাবে অনুবাদ করা হয় যা তৃতীয় কোনো লিঙ্গ তৈরি করে না। বরং, এটি কেবল কাউকে পুরুষ বা মহিলা হিসাবে শ্রেণীবদ্ধ করার সময় বিভ্রান্তিকে বোঝায়। এর অর্থ পুরুষ এবং মহিলার মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য থেকে উদ্ভূত হয়েছে, যা একমাত্র বিভাগ যা এটির সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারে।
আপনি চাইলে তাদের যথাক্রমে ম্যাট্রিক্স এবং প্যাট্রিক্স বলতে পারেন। এই পরিভাষাগুলোর ব্যুৎপত্তিগত যোগ্যতা কোনও বৃত্তে আবদ্ধ্ব নয় কারণ এগুলো কার্যকারণ ব্যাখ্যার পরিবর্তে কেবল বর্ণনামূলক শব্দ হিসাবে ব্যবহৃত হয়।
আলাউদ্দিন আল-কাজেরুনি, শেরহুল-আহলাকিল-আদুদিয়ে (parallel Turkish/Arabic), ডাঃ ওমর তুর্কর (ইস্তাম্বুল, তুরস্কঃ ইনস্টিটিউট অফ রাইটিং ওয়ার্কসের রাষ্ট্রীয় প্রকাশনা, 2014), ৩০।
আমরা দর্শন চর্চা করছি, ব্যাখ্যা নয়; আরও সুনির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে, আমরা কেবলমাত্র এই পরিমাণে ব্যাখ্যা করছি যা আমাদের দার্শনিক যুক্তিতে কাজে লাগতে পারে। সর্বোপরি, ঐতিহ্যকে পুনরুজ্জীবিত করা কেবল পুরানো বিতর্কের পুনর্ব্যবহার বা কঠোর কর্তৃপক্ষের উপর নির্ভর হিসাবে দেখা উচিত নয়। বরং, আমাদের এই দিকগুলো দ্বারা সীমাবদ্ধ না হয়ে তাদের ব্যবহার করা উচিত। আমরা আজ যে চ্যালেঞ্জগুলোর মুখোমুখি হচ্ছি তার পরিপ্রেক্ষিতে এটি অপরিহার্য, যা আমাদের এমন যুক্তি তৈরি করতে দেয় যা সমসাময়িক প্রয়োজনের সাথে অনুরণিত হয়। সত্যিকারের বুদ্ধিবৃত্তিক অগ্রগতির জন্য সেক্যুলার একাডেমিক বিশ্বের মধ্যে নিছক শ্রেণীবিভাগ এবং ফসিল সংরক্ষণ দেখে বিভ্রান্ত হয়ে ব্যর্থ হওয়ার পরিবর্তে, আমাদের সময়ের চাহিদা পূরণ করে এমন যুক্তি উপস্থাপন করা অত্যন্ত জরুরি। যখন আমরা বুদ্ধিবৃত্তিক বিজ্ঞানকে(আকলিয়াত) সঞ্চারিত বিজ্ঞানে (নাকলিয়াত) রূপান্তরিত করি, তখন তা আমাদের বোধগম্যতা এবং বিকাশের জন্য উল্লেখযোগ্য পরিণতির ঝুঁকি তৈরি করে।
"অস্তিত্বকে সত্তার আগে বলা বলতে আমরা কী বুঝি? আমরা বলতে চাইছি যে, মানুষ সর্বপ্রথম অস্তিত্বে থাকে, নিজের মুখোমুখি হয়, জগতে উঠে আসে-এবং পরে নিজেকে সংজ্ঞায়িত করে। অস্তিত্ববাদী হিসাবে মানুষ যদি তাকে সংজ্ঞায়িত করতে না পারে, তবে এর কারণ হল, শুরুতে সে কিছুই নয়। পরবর্তী সময় পর্যন্ত সে কিছুই হবে না, এবং তারপর সে নিজেই তা-ই হবে যা সে নিজেই তৈরি করে। সুতরাং, কোনও মানব প্রকৃতি নেই, কারণ এর ধারণা করার মতো কোনও ঈশ্বর নেই। আছে মানুষই। এমন নয় যে, তিনি নিজেকে যা মনে করেন, তিনি তা-ই হন, বরং তিনি যা চান, এবং যেমন তিনি ইতিমধ্যেই অস্তিত্বের পরে নিজেকে কল্পনা করেন-যেমন তিনি অস্তিত্বের দিকে সেই লাফ দেওয়ার পরে হতে চান। মানুষ যা নিজে তৈরি করে তা ছাড়া আর কিছুই নয়।” - জঁ-পল সার্ত্রে, Existentialism and Humanism (London: Methuan, 1948), ২৮।
১৮৪৪ সালে জার্মান-ফ্রেঞ্চ জারবুকারে প্রকাশিত “Toward the Critique of Hegel’s Philosophy of Right,” থেকে উদ্ধৃতাংশ, যা কার্ল মার্কস এবং ফ্রেডরিক এঙ্গেলস, Basic Writings on Politics and Philosophy (New York: Doubleday, 1989), 302–3-এ পাওয়া যায়। আরেকটি অনুবাদে বলা হয়েছে, "এটি মানুষের অসাধারণ উপলব্ধি কারণ মানুষ কোনও সত্যিকারের বাস্তবতা অর্জন করতে পারেনি।" কার্ল মার্ক্স, Critique of Hegel’s Philosophy of Right, trans. Annette Jolin and Joseph O’Malley, ed. Joseph O’Malley (Cambridge: Cambridge University Press, 1970), 131, একটি রেন্ডারিং যা পরবর্তী সামাজিক নির্মাণবাদী চিন্তাভাবনার আরও সমৃদ্ধভাবে পরামর্শ দেয়।
মার্কস এবং এঙ্গেলস, Basic Writings on Politics and Philosophy, ৩০৩।
“Theses on Feuerbach IV,” in Karl Marx: Selected Writings in Sociology and Social Philosophy, ed. T. B. Bottomore and Maximilien Rubel (New York: McGraw-Hill, 1964), ৬৮।
হিদার এ. ব্রাউন, Marx on Gender and the Family: A Critical Study (Leiden: Brill, 2012), ২১১.
ব্রাউন, ২১৩।
সিমোন ডি বোভোয়া, Extracts from The Second Sex, trans. Constance Borde and Sheila Malovany-Chevallier (London: Vintage, 2015), ৪।
জুডিথ বাটলার, “Sex and Gender in Simone de Beauvoir’s Second Sex,” Yale French Studies 72 (1986): ৩৫-৪৯, ৩৫। বাটলার লিঙ্গের ননবাইনারি প্রকৃতি সম্পর্কে তার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিরও ব্যাখ্যা দেন। যেমন এই ধারণা যে, দুটিরও বেশি লিঙ্গ রয়েছে। “সিমোন ডি বোভোয়া ‘পুরুষ’ এবং ‘নারী’ ছাড়াও অন্যান্য লিঙ্গের সম্ভাবনার কথা বলেন না, তবুও তিনি জোর দেন যে এগুলো ঐতিহাসিক নির্মাণ যা প্রতিটি ক্ষেত্রে অবশ্যই ব্যক্তি দ্বারা নির্ধারণ করা উচিত। তা থেকে বলা যায় যে, একটি বাইনারি লিঙ্গ ব্যবস্থার কোনও সত্তাতাত্ত্বিক(ontological) প্রয়োজনীয়তা নেই।” (৪৭–৪৮)।
নাতালী স্টোলজার, “Different Women: Gender and the Realism-Nominalism Debate,” in Feminist Metaphysics: Explorations in the Ontology of Sex, Gender and the Self, শারলট উইটিগ, (Heidelberg, Germany: Springer, 2011), ২৭।
In The Metaphysics of Gender (Oxford: Oxford University Press, 2011), Witt identifies the core of this “common-sense”।
নারীবাদীদের জন্য লিঙ্গের সামাজিক নির্মাণবাদী ধারণার বিপক্ষে একটি ব্যবহারিক যুক্তি হতে পারে এই কঠিন সত্য যে, লিঙ্গ ‘সামাজিক নির্মাণ’ এই ধারণা থেকেই নারীবাদের প্রধান প্রতিপক্ষ, লিঙ্গ তরলতার ধারণা জন্ম নিয়েছে, যা প্রায়শই পুরো নারীবাদী প্রকল্পকে খারিজ করতে চেয়েছে। লিঙ্গ তরলতার ক্লাসিক উদাহরণ পাওয়া যায় বাটলারের বই Gender Trouble এর প্রথম পৃষ্ঠাগুলোতে (London: Routledge, 1990)।
উইট, Metaphysics of Gender, ৮।
এটি এটাও বোঝায় না যে সেই বিষয়টি নাফস আল-আমর এ বাস্তব নেই। আমাদের সময়ের এই গুরুত্বপূর্ণ সত্যটি বিস্তারিতভাবে বুঝতে, আমার বই Things as They Are: Nafs al-Amr and the Metaphysical Foundations of Objective Truth (আবু ধাবি: তাবাহ রিসার্চ, ২০২১; দ্বিতীয় সংস্করণ প্রস্তুতিতে [ক্যামব্রিজ: নিউ আন্দালুস, ২০২৩]) পড়ুন। বইটি এমন কিছু মতের বিরোধিতা করে যা নাফস আল-আমর কে মানব মনের কল্পিত ধারণা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করে, যা কোনো বাস্তব অস্তিত্ব বহন করে না (যেমন, সত্য কথা মিথ্যা কথার মতোই হবে), বরং এটাকে উচ্চতর মন বা অন্য কোনো ধারণার সঙ্গে সম্পর্কিত ভাবে। এমন ধারণা হাস্যকরভাবে নাফস আল-আমর এর গুরুত্বকেই বাদ দিয়ে দেয়। এই ধরণের চিন্তাভাবনা আমাদেরকে বড় দার্শনিক প্রশ্নের সঠিক উত্তর খুঁজে পেতে অসহায় করে দেয়। এর কারণ হল তারা এমন বিষয়গুলোকে উপেক্ষা করে, যা আমাদের চিন্তাভাবনা এবং বাস্তবতার মধ্যে সম্পর্ক খুঁজে বের করার জন্য দরকার।
দেখুন উইট-এর Metaphysics of Gender, ৮০।
উইট, ৮৪।
উইট, ৮৫।
মারি মিকোলা, “অন্টোলজিকাল কমিটমেন্টস, সেক্স অ্যান্ড জেন্ডার”, ইন ফেমিনিস্ট মেটাফিজিক্সঃ এক্সপ্লোরেশনস ইন দ্য অন্টোলজি অফ সেক্স, জেন্ডার অ্যান্ড দ্য সেলফ (হাইডেলবার্গ, জার্মানি: ২০১১), ৬৭।
যা সিনেটরের নেতৃত্ব ও শাসনের সাথে তুলনা করা যায়, যা কোনো অর্থপূর্ণভাবে সামাজিক নির্মাণ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। এই পয়েন্টটি আলোচনার সময় শেখ হামজা ইউসুফের কাছে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।
মিকোলা, “Ontological Commitments,” ৬৮।
বাটলার, “Sex and Gender,” 47. একইভাবে, ‘যে কেউ তার লিঙ্গ, এটি এখন সেক্স এবং লিঙ্গের মধ্যে পার্থক্যের চেয়ে বেশি কিছু বোঝাতে পারে। লিঙ্গ আর শারীরবৃত্ত দ্বারা নির্ধারিত নয়, বরং শারীরবৃত্ত লিঙ্গের সম্ভাবনার জন্য কোনো প্রয়োজনীয় সীমাবদ্ধতা তৈরি করে না।’ (৪৫)
বাটলার, ৩৯।
বাটলার, ১১-১২, ১৩।
ফ্রেড্রিক এঙ্গেলস, The Origin of the Family, Private Property and the State (London: Lawrence and Wishart, 1940), ৬৯।
এঙ্গেলস, (ঐ) ৭৯।
এঙ্গেলস, (ঐ) ৭৯, ৮০।
এঙ্গেলস, (ঐ) ৮২।
এঙ্গেলস, (ঐ) ৮৯-৯০।
ব্রাউন, Marx on Gender and the Family, ২১৫-২১৬।
যখন কেউ বিবেচনা করে যে আমাদের উত্তরাধুনিক বাস্তবতার এত বড় অংশের উত্থান এবং গঠনমূলক কারণ হিসেবে মার্ক্সের স্পষ্ট পরামর্শ ও বিধানের সরাসরি প্রভাবই মূলত কাজ করেছে, তখন এটি ততটা বিস্ময়কর মনে হয় না।
মুহিউদ্দিন ইবন আল-আরাবী, আল-ফুতূহাত আল-মাক্কিয়্যাহ, খণ্ড ১, সম্পাদনা: ’আব্দুল-’আজীজ সুলতান আল-মান্সূব (কায়রো: আল-মাজলিস আল-আ’লায়ি লিস-ছাক্বাফাহ), ৪৩৪। এই অনুচ্ছেদের অবশিষ্ট অংশে চমকপ্রদ অধিবিদ্যাগত গভীরতার এক বিশাল সমৃদ্ধি পাওয়া যাবে, তবে এখানে সেই আলোচনায় প্রবেশ উপযুক্ত নয়।
(অনুদিত ও ঈষৎ পরিমার্জিত। তরজমা করেছেন সিদ্দিকে আকবর।)
মূল নিবন্ধ : Transgenderism and the Violation of Our Angelic Nature