ইসলামি শিল্পকলার শ্বাশত মূল্যবোধ | টিটাস বার্কহার্ড
'ইসলামি শিল্পকলার বিকাশ ঘটেছে পূর্ব-বিদ্যমান বাইজেন্টাইন, মঙ্গোলিয়ান, পারস্য এবং হিন্দু অরিজিন বিভিন্ন উপাদান থেকে'— ইসলামি শিল্পকলার ব্যাপারে এই মূল্যায়ন নিয়ে অদ্যাবধি প্রচুর লেখাজোখা হয়েছে। কিন্তু, যে শক্তি নানান সভ্যতার নানাবিধ উপাদানগুলোকে সমন্বয় করে একটা স্বতন্ত্র শিল্পকলার জন্ম দিয়েছিল তার হাকিকত নিয়ে আলোচনা খুবই কম হয়েছে। স্থান এবং কালের ভিন্নতা থাকলেও ইসলামি শিল্পকর্মের মধ্যে যে একটা ঐকতান আছে তা কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। এটা এতটা স্পষ্ট যে, কেউ যদি কর্ডোভার মসজিদ অথবা সমরকন্দের বিখ্যাত মাদ্রাসা অবলোকন করেন, কিংবা মরক্কো বা চীনা তুর্কিস্তানে অবস্থিত কোনো এক ওলি-আউলিয়ার মাজার, তবে মনে হবে যেন এ সকল স্থাপত্যকর্ম থেকে একই আলো বিচ্ছুরিত হচ্ছে। তাহলে এই যে ঐকতান দেখা যাচ্ছে তার হাকিকত কী? একদিকে, ইসলামের শরিয়া আইন কিন্তু শিল্পের ক্ষেত্রে কোন বিশেষ ধারা ঠিক করে দেয় নাই; কেবল প্রকাশের ক্ষেত্রে কিছু সীমা টেনে দিয়েছে। কিন্তু এটাও সত্য যে সীমা আরোপ করলে সৃজনশীলতার বিকাশ হয় না। অন্যদিকে, এই ঐকতান কে স্রেফ ‘ধর্মীয় আবেগজাত’ হিসাবে ব্যাখ্যা করলেও ভুল হবে, যদিও প্রায়শই তা করা হয়। যাই হোক, আবেগ হয়তো মাত্রাগতভাবে গভীর হতে পারে, কিন্তু তা কখনো পুরো রূপজগতকে (world of forms) এমনভাবে নির্মাণ করতে পারে না যা একই সাথে উন্নত ও পরিমিত এবং অভিভূতকর ও নিখুঁত। ইসলামি শিল্পকলায় যে ঐকতান এবং সুবিন্যাস দেখা যায় তা আমাদেরকে স্ফটিকের (Crystal) ভিতরে কাজ করা প্রাকৃতিক নিয়মের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় এবং এটা কাকতালীয়ভাবে ঘটে না। ফলত, ইসলামি শিল্পকলায় এমন কিছু আছে যা স্পষ্টভাবে আবেগের শক্তিকে ছাড়িয়ে যায়। কারণ আবেগের স্বভাবই হচ্ছে অস্পষ্টতা এবং এটা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। ফলে, ইসলামি শিল্পকলার এ শক্তিকে আমরা ‘বৌদ্ধিক দৃষ্টি’ (Intellectual Vision) বলতে পারি যা তার মাঝে অন্তর্নিহিত থাকে। ‘বুদ্ধি’কে (Intellect) তার আদি অর্থে–একটি ফ্যাকাল্টি– হিসেবে গ্রহণ করলে তার পরিসর যুক্তি বা চিন্তা থেকে আরো বেশি ব্যাপক হয় যা সজ্ঞার (intuition) সাথে সম্পৃক্ত। আর এ সজ্ঞা থাকে টাইমলেস রিয়েলিটিতে। ইসলামি সিলসিলায় আকলের এমনও অর্থ আছে— বিশ্বাস পূর্ণতা পায় না, যদি না তা আকল (বুদ্ধি) দ্বারা আলোকিত হয়, কেবল আকল দ্বারাই তাওহীদের তাৎপর্য উপলব্ধি করা যায়। ফলে, ইসলামি শিল্পকলা সৌন্দর্যের মাপকাঠি লাভ করে প্রজ্ঞা থেকে।
শিল্পকলার ইতিহাস যেহেতু আধুনিক যুগের একটি শাস্ত্র তাই এটি স্বভাবতই আধুনিক বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখার মতো ইসলামি শিল্পকলাকে বিশ্লেষণধর্মী কাঠামো দিয়ে বিচার করে, অর্থাৎ পুরো বিষয়টাকে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, কাটা-ছেড়া এবং ঐতিহাসিক পরিস্থিতি ও প্রেক্ষাপটে রিডিউস করে বুঝতে চায়। ফলে, শিল্পে যা কিছু শাশ্বত— এবং ইসলামি শিল্পকলার মতো একটা স্যাক্রেড আর্ট যে সবসময় শাশ্বত উপাদান বহন করে— তা এ পদ্ধতির মাধ্যমে বাদ পরে যায়। কেউ হয়তো আপত্তি জানাতে পারে, সকল শিল্পই তো ফর্মের সমষ্টি, আর ফর্ম যেহেতু সীমার বাহিরে যেতে পারে না, ফলে তা অপরিহার্যভাবে সময়ের অধীন এবং ইতিহাসের অন্যান্য ঘটনাবলীর মতো বেড়ে ওঠে, বিকশিত হয়, বিকৃত হয় এবং পরিশেষে অবলুপ্ত হয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে শিল্পকলা শাস্ত্রটি অবশ্যই একটি ইতিহাসবিষয়ক বিদ্যা। কিন্তু, এটা অর্ধ-সত্য কথা। কারণ, ফর্ম যদিও সীমাবদ্ধ এবং সময়ের অধীন, তবুও তা শাশ্বত কিছু বয়ে নিয়ে যেতে পারে। এই অর্থে ফর্ম ঐতিহাসিক পরিস্থিতির উর্ধ্বে উঠে যায়। কেবল নিজের উৎপত্তির সময় নয়—যা আংশিকভাবে আধ্যাত্মিক মাত্রাযুক্ত—বরং পরবর্তীতে নিজেকে সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও এই বৈশিষ্ট্য দেখা যায় এবং সেটা ন্যূনতম মাত্রায় হলেও। কিছু কিছু ফর্ম তাদের শাশ্বত মহিমার কারণে যুগের সকল বস্তুগত ও মানসিক পরিবর্তনের মোকাবেলায়ও টিকে থাকে— সিলসিলা বলতে তো এটাই বুঝায়।
পক্ষান্তরে, শিল্পকলার আধুনিক ইতিহাস তার অধিকাংশ নান্দনিক মাপকাঠি প্রাচীন গ্রিক অথবা মধ্যযুগ পরবর্তী শিল্প থেকে গ্রহণ করেছে। তার সাম্প্রতিক বিবর্তন যাই হোক না কেন, এটি সবসময় ব্যক্তিকে শিল্পের আসল স্রষ্টা হিসেবে দেখে আসছে। এ দৃষ্টিকোণ থেকে, একটি শিল্পকর্ম ব্যক্তির ঐকান্তিকতাকে যতটুকু তুলে নিয়ে আসতে পারে ততটুকু শিল্প হিসাবে গণ্য হয়। অন্যদিকে, ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে– সৌন্দর্য মূলত সার্বিক সত্যের (Universal Truth) প্রকাশ।
তাই আধুনিক বিজ্ঞান ইসলামি শিল্পকলাকে বিচার করার ক্ষেত্রে প্রায়ই একধরনের নেতিবাচক সিদ্ধান্তে গিয়ে উপনীত হয়। ফলে এতে অবাক হওয়ার কিছু নাই। আমরা এমন নেতিবাচক সিদ্ধান্ত দেখি ইসলামি শিল্পকলার ব্যাপারে অনেক পাণ্ডিত্যপূর্ণ লেখাজোখায়, অবশ্য সেগুলোর মাঝে মাত্রাগত ভিন্নতা থাকলেও মূল বক্তব্য প্রায় একই। প্রায় বলা হয়, ইসলামি শিল্পকলা কেবল শুরুর পর্যায়ে সৃষ্টিশীল ছিল যখন এটি পূর্ববর্তী সভ্যতার লিগ্যাসিগুলোকে সমন্বয় ও রূপান্তর করেছিল, কিন্তু পরবর্তী কালে তা ধীরে ধীরে নিষ্ফলা নিয়ম-কানুনে পরিণত হয়ে যায়। আরো বলা হয় যে, এই নিয়ম-কানুনগুলো ইসলামের জাতিগত ভিন্নতা পুরোপুরি মুছে না ফেললেও দুঃখজনকভাবে শিল্পীর ব্যক্তিক সৃজনশীলতাকে রুদ্ধ করেছে। এটা আরও বেশি ঘটেছে প্রতিকৃতি (image) আকাঁর উপর ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার মাধ্যমে। ফলে, ইসলামি শিল্পকলা আর্টের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং গভীরতর পরিসর থেকে বঞ্চিত হয়েছে। অনেক তীব্র ভাষায় এ মতামতগুলো দিচ্ছি, এ কথা ভালো করে জেনেও যে, কম ইউরোপিয় স্কলাররাই এসব মতামতের সাথে একমত হবেন। তবুও, আমাদের এ মতামতগুলোর মুখোমুখি হওয়া প্রয়োজন যেন এগুলোর সীমাবদ্ধতা বিচার-বিশ্লেষণ করার মাধ্যমে আমরা ইসলামি শিল্পকলার আদতের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির হদিস করতে পারি।
প্রথমে আমরা উপর্যুক্ত অভিযোগগুলোর শেষটি নিয়ে আলোচনা করি, অর্থাৎ প্রতিকৃতি আঁকার উপর ধর্মীর নিষেধাজ্ঞা প্রসঙ্গে। এ নিষেধাজ্ঞাটির দুইটি দিক রয়েছে। একদিকে, কুরআনে পৌত্তিলকতাকে নিন্দা করা হয়েছে, ফলে সাধারণ মুসলমান দৃষ্টিকোণ থেকে আল্লাহকে যে কোন দৃশ্যরূপে হাজির করার ক্ষেত্রে এ নিন্দা প্রযোজ্য। কারণ আল্লাহর স্বরূপ এমন যে, তা ভাষা বা চিত্র—কোনো কিছুর মাধ্যমেই সম্পূর্ণভাবে প্রকাশযোগ্য নয়। অপরদিকে, রাসুলের বাণী অনুযায়ী, কোন প্রাণীর এবং বিশেষভাবে মানুষের প্রতিকৃতি তৈরি করার মাধ্যমে সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টিকর্মের অনুকরণ করতে চাওয়াটা অসার এবং এমনকি ব্লাসফেমাস কাজ। তবে এ নির্দেশটি সর্বদা এবং সর্বত্র কঠোরভাবে মানা হয়নি। কারণ এটি কাজের চেয়ে নিয়তের সাথে বেশি সম্পর্কিত। বিশেষভাবে পারস্য এবং ভারতীয় ট্রাডিশনে যুক্তি দেওয়া হতো যে, যদি কোনো চিত্র তার বাস্তব সত্তাকে হুবহু অনুকরণ করার দাবি না করে, কেবল তার ইঙ্গিত প্রকাশ করে, তা অনুমোদিত। তাই, পারসিয়ান অনুচিত্রে অ-মায়াময়ী (non-illusive) শৈলী তথা ছায়া এবং পার্সপেক্টিভ না থাকার এটি অন্যতম কারণ। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট যে, এ পর্যন্ত কোন মসজিদকে মানব আকৃতির (anthropomorphic) চিত্র দ্বারা সজ্জিত করা হয় নি।
ব্যাপারগুলোকে যদি আমরা ভাসাভাসা ভাবে দেখি, তাহলে আমাদের মাঝে ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গিকে পিউরিটানিজমের সাথে মিলিয়ে ফেলার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। পিউরিটানিজম সিম্বোলিজমকে তুচ্ছজ্ঞান করে, ফলে তা স্যাক্রেড আর্টকে মিথ্যা বলে খারিজ করে দেয়। সত্তার বিভিন্ন স্তরের মধ্যে সাদৃশ্যানুমান (কিয়াস) হচ্ছে সিম্বলিজমের ভিত্তি। যেহেতু সত্তা হচ্ছেন এক (আল-ওজুদু ওয়াহিদ), তাই যা কিছু অস্তিত্ববান, তা কোনো না কোনোভাবে তার চিরন্তন উৎসকে প্রতিবিম্বিত করে। ফলে, ইসলাম এ ঐশী আইনকে কোনভাবে তুচ্ছজ্ঞান করে না। বরং, কুরআন এটিকে হাজারও উপমায় প্রকাশ করেছে— 'এমন কিছু নেই যা তার সপ্রশংস প্রবিত্রতা ঘোষণা করে না' (আল কুরআন: ১৭: ৪৪)। ইসলাম মানুষের প্রতিকৃতি আঁকা নিষিদ্ধ করেছে সৃষ্টির পবিত্রতাকে অস্বীকার করার কারণে নয়; বরং ঠিক তার উল্টো কারণে। কুরআনের ভাষ্য অনুযায়ী, মানুষ হচ্ছে জগতে আল্লাহর প্রতিনিধি। নবী ব্যাখ্যা করেছেন যে, আল্লাহ আদমকে তার নিজের সুরতে সৃষ্টি করছেন, এখানে সুরত বলতে গুণগত সাদৃশ্য বুঝানো হয়েছে। যেহেতু, মানুষকে যে বৃত্তিসমূহ (faculty) দেওয়া হয়েছে সেগুলো আল্লাহর সাতটি গুণাবলীর প্রতিফলন করে, যথা:- জীবন, জ্ঞান, ইচ্ছা, শক্তি, শ্রবন, দর্শন এবং বাকশক্তি।
মনুষ্য প্রতিকৃতির প্রতি ইসলামি এবং খ্রিস্টীয় মনোভাবের মধ্যে তুলনা করলে আমরা বিষয়গুলো আরও স্পষ্টভাবে বুঝতে পারব। অনেকটা ইসলামি আদর্শ প্রভাবিত বাইজেন্টাইন আইকনোক্ল্যাজমের1 প্রতুত্তরে সপ্তম ওকুমেনিক কাউন্সিল গির্জায় উপাসনার ক্ষেত্রে যিশু বা মা মেরীর মূর্তি বা ছবি ব্যবহারের পক্ষে যে যুক্তি দিয়েছিল। তদের মতে, আল্লাহ সত্তাগতভাবে বর্ণনাতীত; তবে খোদায়ী কলমা (Divine Logos) যেহেতু মানব প্রকৃতি ধারণ করেছিলেন, তাই তিনি মানব প্রকৃতিকে পুনরায় তার আদিরূপে সুসংহত করেছেন এবং তার মাঝে ঐশ্বরিক সৌন্দর্য সহ প্রবেশ করেছেন। খ্রিস্টের মানবরূপকে হাজির করার মাধ্যমে শিল্পকর্ম আমাদেরকে যিশুরূপী ঈকোনো সন্দেহ নেই, এই দৃষ্টিভঙ্গি এবং ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গিরশ্বরের রহস্য স্মরণ করিয়ে দেয়। মধ্যে সূক্ষ্ম ফারাক আছে, তবুও উভয়ে একটা সাধারণ পাটাতনকে ইঙ্গিত করে। সেটি হচ্ছে মানুষের খোদাসুরতী (theomorphic) প্রকৃতি ।
এখানে এটা বলে রাখা ভালো, স্যাক্রেড আর্টের প্রতি খ্রিস্ট্রীয় দৃষ্টিভঙ্গির অন্যতম নিগুঢ় ব্যাখাটি দিয়েছেন শাইখুল আকবার মুহিউদ্দিন ইবনে আরাবী, যিনি তার ‘ফুতুহাতুল মাক্কিয়া’ বইয়ে লিখেছেন— 'বাইজেন্টাইনরা চিত্রকলাকে উৎকর্ষতার পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছে। কারণ সায়্যেদিনা ঈসার যে অনন্য চরিত্র (ফারদানিয়্যাহ) তার প্রতিকৃতির মাঝে দৃশ্যমান হয় তা খ্রিস্টানদের জন্য খোদায়ী ঐক্যের উপর নিবিষ্ট হওয়ার প্রধান অবলম্বন'। ফলে এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, প্রতিকৃতির প্রতীকী গুরুত্ব চিন্তাশীল মুসলিমদের কাছে অবোধ্য নয়, যদিও তারা কুরআনের বিধান অনুসারে সবসময় পবিত্রারোপিত প্রতিকৃতির (Sacred Images) ব্যবহারকে নাকচ করে এবং ‘তানজিহ’কে (সবকিছু ভিন্ন হলেও একই) ‘তাশবিহ’র (সবকিছু এক হলেও ভিন্ন) উপর প্রাধান্য দিয়ে থাকে।
এক দৃষ্টিকোণ থেকে, তানজিহ বা খোদায়ী বৈসাদৃশত্যা (ট্রান্সসেনডেন্স) মানুষের খোদাসুরতী প্রকৃতিকেও ধারণ করে। মূলত, আদমের খোদায়ী সুরতকে তৈরি করে সাতটি সার্বিক গুণাবলী,— জীবন, জ্ঞান, ইচ্ছা, শক্তি, শ্রবন, দর্শন এবং বাকশক্তি— এগুলো কোনো দৃশ্যমান চিত্রে প্রকাশ করা যায় না। কারণ প্রতিকৃতির কোন জীবন, জ্ঞান ও ক্ষমতা থাকে না, কিংবা এ সাতটি গুণাবলির কোনটিও থাকে না। ফলে প্রতিকৃতি মানুষকে তার দৈহিক মাত্রায় পর্যবসিত করে। যদিও মানুষের মধ্যে এই গুণাবলি সীমিত পরিসরে থাকে, তবুও সেগুলো ঐশী উপস্থিতির সম্ভাব্য বাহক হতে পারে। হাদিসে কুদসীতে বলা হয়েছে,.......আমি তার ঐ কান হয়ে যাই, যার দ্বারা সে শোনে, তার ঐ চোখ হয়ে যাই, যার দ্বারা সে দেখে.....'। ফলে মানুষের মাঝে এমন কিছু আছে যাকে কোন স্বাভাবিক প্রকাশরীতি বর্ণনা করতে পারে না। যেমন কুরআন বলে— 'আমরা আসমান, যমীন, ও পর্বতমালার প্রতি এ আমানত পেশ করেছিলাম, কিন্তু, তারা তা বহন করতে অস্বীকার করল এবং ভীত-শঙ্কিত হল, অথচ মানুষ তা বহন করল। নিশ্চয় সে বড়ই জালেম, অজ্ঞ' (আল-কুরআন: ৩৩: ৭২)। এই আমানত সাধারণ মানুষের মাঝে কেবল সম্ভাবনা-আকারে (Potential) থাকে, আর ইনসানে কামেল, নবী, রাসুল এবং আওলিয়াদের মাঝে বাস্তবিকভাবে (Actual) থাকে। এ আমানত তাদের অন্তর্দেশ থেকে বহির্দেশে প্রকাশিত হয় এবং সমগ্র অস্তিত্বে দীপ্ত হয়ে ওঠে। ফলে, মানুষের এই খোদায়ী আমানত ক্ষুণ্ণ হয়ে যায় কি না!— এই ভয়ে ইসলামি শিল্পকলা সবসময় নবী, রাসুল এবং আউলিয়াদেরকে ভিজ্যুয়াল ফর্মে নিয়ে আসার ব্যাপারে সঙ্কুচিত বোধ করে।
‘ইসলামি আইকনোক্ল্যাজমে’র2 বদলে ‘ইসলামি অ্যানিকোনিজম’3 বলা অধিক যথার্থ। কারণ, ইসলামে মূর্তির (Icon) অবর্তমানতার কেবল নেতিবাচক নয়; ইতিবাচক ভূমিকাও আছে। অন্তত ধর্মীয় প্রাঙ্গণের মধ্যে সকল নরত্বারোপিত (anthropomorphic) প্রতিকৃতি পরিহার করায় ইসলামি শিল্পকলা মানুষকে নিজের প্রকৃতিতে স্থিত হতে সাহায্য করে। ফলে সে তার সত্তাকে নিজের বাহিরে প্রজেকশন করার বদলে নিজের অস্তিত্বের কেন্দ্রে বিরাজ করে যেখানে সে একসঙ্গে আল্লাহর প্রতিনিধি এবং বান্দা। সামগ্রিকভাবে ইসলামি শিল্পকলার লক্ষ্য হচ্ছে এমন এক পরিবেশ সৃষ্টি করা যা মানুষকে তার আদি মর্যাদা অনুধাবন করতে সাহায্য করবে। তাই মূর্তি হতে পারে এমন সব কিছুকে ইসলামি শিল্পকলা পরিহার করে— এমনকি পুরোপুরি আপেক্ষিক এবং আপাতত পর্যায়েও। মানুষ এবং আল্লাহর অদৃশ্য উপস্থিতির মাঝে কোন কিছুই যেন প্রতিবন্ধক হয়ে না দাঁড়ায়— এটাই ইসলামি শিল্পকলার মূল উদ্দেশ্য।
তাই, ইসলামী শিল্পকলা স্থাপত্যে ফাঁকা জায়গা (void) রাখে যেন তার ভিতর দিয়ে জগতের সকল অশান্তি আর কামনা-বাসনার প্ররোচণা দূর হয়ে যায়। এবং স্থাপত্যে এমন এক সুবিন্যস্ততার সমাবেশ ঘটায় যা ভারসাম্য, নির্মলতা, প্রশান্তির পরিবেশ তৈরি করে। এ থেকে আমরা সরাসরি বুঝতে পারি যে, ইসলামে স্থাপত্যশিল্প কতটা গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান দখল করে আছে। যদিও রাসুল (সাঃ) বলেছেন, জমীনের পুরো উপরিভাগকে নামাজের জায়গা করে দেওয়ার মাধ্যমে আল্লাহ তার উম্মতকে অনুগ্রহ করেছেন। তথাপি স্থাপত্যশিল্পকেই দায়িত্ব নিতে হবে যেন জনবহুল অঞ্চলে প্রকৃতিবান্ধব বিশুদ্ধতা এবং শান্তির পরিবেশ পুনঃস্থাপনের ব্যবস্থা নিশ্চিত হয়। আর, প্রকৃতির অমলিন সৌন্দর্য সৃষ্টিকর্তার হাতের ছাপ বহন করছে। অবশ্য স্থাপত্যশিল্প মানবীয় বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে প্রকৃতিকে ভিন্নভাবে রূপ দেয়। ফলে প্রকৃতি অনেকটা সীমাবদ্ধ হয়ে যায়; তা ঠিক। তারপরেও ইসলামি স্থাপত্যশিল্প ব্যক্তিক আবেগের খামখেয়ালীপনা থেকে মুক্ত থাকে।
একজন মুমিন ব্যক্তি মসজিদে কখনো নিছক দর্শনার্থী না, বলতে গেলে তিনি নিজের ঘরে আসেন; তবে সাধারণ অর্থে নয়। আনুষঙ্গিক পরিবর্তনের কাজ সেরে যখন তিনি অজু করে পবিত্র হন এবং কুরআনের আয়াত তেলওয়াত করেন, তখন তিনি প্রতীকীরূপে আদমের ‘মাকামে’ প্রত্যাবর্তন করেন যা জগতের কেন্দ্রস্থল হিসাবে বিবেচিত। এই ধারণার ভিত্তিতে মুসলিম স্থপতিরা মসজিদের সর্বত্র এমন মগ্ন থাকার কেন্দ্র (মাকাম) স্থাপন করতে চেয়েছেন। তারই প্রয়াসে তারা ভিন্নধর্মী স্থাপত্যশৈলীর বিকাশ ঘটান—যেমন, মদীনার প্রাচীন মসজিদের মতো থামবিশিষ্ট অনুভূমিক মহল কিংবা তুরস্কের বৃত্তাকার গম্বুজ-নির্ভর স্থাপত্যরীতির মতো শৈলী। এ স্থাপত্যগুলোর অভ্যন্তরাংশে বসলে, সামনে বা উপরে, কোন দিকে আমাদের মনোযোগ চলে যায় না। কিংবা চারপাশের আবদ্ধ দেয়াল আমাদের মনকে চাপ দিয়ে ধরে না । মসজিদের স্থাপত্যশৈলী আসমান ও দুনিয়ার যাবতীয় দুশ্চিন্তা-পেরেশান থেকে আমাদেরকে মুক্ত রাখে—এমনটা বললে অত্যুক্তি হবে না।
অন্যদিকে একটি খ্রিস্টান বাসিলিকার স্থাপত্যরীতি এমন যে, তার বহিরাংশ থেকে আরম্ভ হওয়া চলাচল পথটি সোজা প্রধান বেদীতে গিয়ে থেমেছে। আর একটি খ্রিস্টান গম্বুজের ক্ষেত্রে দেখা যায় সেটি আকাশের দিকে উঠে গেছে অথবা বেদীর দিকে নেমে এসেছে। একটি গির্জার সামগ্রিক স্থাপত্যশৈলী বিশ্বাসীকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, বেদীর উপর রাখা ইউক্যারিস্ট4 থেকে ঐশী অস্তিত্ব উপস্থিত হয় যেভাবে অন্ধকারে আলো উদ্ভাসিত হয়। গির্জার ধর্মীয় আচার পরিচালনা কেন্দ্রের (liturgical center) মতো মসজিদে এমন কোনো ভাগ নেই। এর মিহরাবটি কেবল মক্কার দিক নির্দেশ করে। অধিকিন্তু, মসজিদের পুরো জায়গার স্থাপনা বিন্যাসটি এমনভাবে তৈরি করা হয় যেন একজন মুমিনের অনুভূত হয় তার চারপাশে খোদায়ী রহমত বিরাজ করছে।
তুরস্কের বিখ্যাত স্থপতি মিমার সিনান আদ্রিয়ানোপলের সোলায়মানি মসজিদকে নিখুঁত রূপে তৈরি করার জন্য হাইয়া সোফিয়ার নির্মিত স্থাপত্যনকশাটিকে যেভাবে ইসলামী দৃষ্টির আলোকে ছাঁচ দিয়েছিলেন—তা ছিল দেখার মতো ব্যাপার। হাইয়া সোফিয়ার বিশাল গম্বুজটি (cupola) দুটি অর্ধ-গম্বুজ (half cupola) দ্বারা আলম্বিত এবং আরো কয়েকটি ছোট গম্বুজাকৃতি ছাদবিশিষ্ট অর্ধবৃত্তাকার ভবনকোণ (apse) দ্বারা বিস্তৃত। পুরো অভ্যন্তর অংশটি গীর্জার প্রার্থনা অক্ষের (liturgical axis) আদলে প্রসারিত। অভ্যন্তর অংশের বিভিন্ন ভাগগুলো একরকম অসীম বিশালতায় গিয়ে পরস্পর মিলেছে। সিনান সোলায়মানি মসজিদের প্রধান গম্বুজটি (cupola) অষ্টভুজের উপর নির্মান করেন। অষ্টভূজটি আলম্বিত হয়ে আছে চার দিকের সমান্তরাল দেয়াল এবং চার পাশে কোনাকুনি ভাবে থাকা খিলানযুক্ত ছোট গুম্বুজাকৃতি ছাদবিশিষ্ট ভবন কোণসমূহের (apse) সাহায্যে। গুম্বুজটি নির্মানের জন্য তিনি এক ধরনের শানিত পাথর তৈরি করেছেন, যার নকশা রেখাগুলো ঢেউ খেলানো না; আবার সরুও না। যখন মুসলিম স্থপতিরা কোন খ্রিস্টান ব্যাসিলিকার দায়িত্ব পাওয়ার পর সেগুলোকে সম্প্রসারিত করত, তখন তারা সেটির অভ্যন্তর নকশায় পরিবর্তন আনতো যাতে দৈর্ঘটি প্রস্থে পরিণত হয়। এছাড়া, প্রায় মসজিদে খিলান সারিগুলো মূল জায়গাজুড়ে আড়াআড়িভাবে বিস্তৃত থাকে। সেগুলো ক্যাথেড্রালের নেভকে5 বেষ্টনী করা খিলান-সারির মতো নির্দিষ্ট এক দিকে বিস্তৃত না, ফলে সেগুলো জায়গার গতিময়তাকে একবারে না থামিয়ে ধীর গতিতে মন্থর করে দেয়, এভাবে মসজিদের খিলানসারি একজন মানুষকে শান্ত-স্থির হওয়ার আহ্বান জানায়।
মুসলিম স্থপতিরা খিলানসারির আকৃতির নকশার উপর অনেক যত্ন ও মনোযোগ দিতেন। অনেকে শুনে অবাক হবেন যে, খিলানসারির আরবী প্রতিশব্দ ‘রওয়াক’ বা ‘রিওয়াক’ যা সৌন্দর্য, কোমলতা এবং পবিত্রতার সমার্থক অর্থে সচারাচর ব্যবহৃত হয়। ইউরোপিয় স্থাপত্যরীতিতে প্রধানত দুই ধরনের খিলান ধারা দেখা যায়। প্রথমটি হচ্ছে রোমান খিলান ধারা যা সাধারণ, সুবিন্যস্ত এবং স্থির বৈশিষ্ট্যের। আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে গথিক খিলান ধারা যেটির পরোক্ষ উৎসমূল ইসলামি শিল্পরীতি। এ ধরনের খিলানধারার প্রসারতা উর্ধ্বগামী হয়। ইসলামী স্থাপত্যরীতিও বিভিন্ন ধরনের খিলান ধারা বিকশিত করেছে তন্মধ্যে দুটি ধারা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য— জাহাজের তলির আকৃতিতে পারসিক খিলান ধারা এবং ঘোড়ার পায়ের নালের আকৃতিতে মুরীয় খিলান ধারা যা অনেকটা সূচাগ্রবিশিষ্টও হয়ে থাকে। উভয় খিলান ধারা তাদের শৈলীতে উপর্যুক্ত বৈশিষ্ট্য যথা স্থিরতা ও লঘুতার সংমিশ্রন ঘটিয়েছে। পারস্য খিলানধারা একটি তেলচেরাগের উন্নীত শিখার মতো সহজে আর সাবলীলভাবে উপরে উঠে যায় মনে হয় যেন একই সাথে উদার ও বিনীত। আর মুরীয় খিলান ধারায় দেখা যায় যে, এর বিশাল প্রস্থকে আয়তাকার ফ্রেম দ্বারা ভারসাম্য করা হয়, যার মাধ্যমে স্থিতি এবং প্রশস্ততার সুসমন্বয় ঘটে। ফলে এর প্রভাবে সেখানে ধ্যানমগ্নতার পরিবেশ তৈরি হয় এবং জান্নাতি পরিবেশ বিরাজ করার ফলে স্থানটি আধ্যাত্মিকভাবে প্রসারিত হয়ে যাওয়ার প্রতিচ্ছবি মনে হয়। কুরআনের ভাষায়— 'আমরা কি আপনার বক্ষকে প্রশস্ত করে দেই নি?' (আল-কুরআন ৯৪: ০১)।
সুষম মাপ-জোখে নির্মিত একটি সাধারণ খিলানসারি কোন স্থানকে তার আয়তনগত মাত্রা থেকে গুণগত মাত্রায় রূপান্তরিত করার শক্তি রাখে। আর গুণগত মাত্রায় কোন স্থান নিছক দৈর্ঘ্য-প্রস্থ-উচ্চতার সমষ্টি না বরং তাকে অস্তিত্বের একটি মাকাম (ওয়াজদ) হিসেবে উপলব্ধি করা যায়। এভাবে, প্রথাগত স্থাপত্যরীতি আমাদেরকে ধ্যানমগ্ন করে।
মসজিদ এবং মুসলমানদের আবাসঘরের স্থাপত্যরীতির মধ্যে নকশাগত পার্থক্য থাকলেও শৈলীগত পার্থক্য নাই, কারণ প্রতিটি মুসলিম আবাসঘরই এক অর্থে ইবাদতের স্থান। যেখানেও মসজিদের মতো ইবাদত-বন্দেগী পালন করা হয়। সাধারণত, ইসলামে জীবনকে স্যাক্রেড এবং প্রোফেন পরিসরে বিভক্ত করা হয় না, যেমন একটি মুসলিম কমিউনিটি হুজুর শ্রেণী এবং সাধারণ মানুষে বিভাজিত না। যেকোন সুস্থ মস্তিষ্ক এবং নৈতিকতা সম্পন্ন মুসলমান ইমামের ভূমিকা পালন করতে পারে। ইসলামে জীবনের এই ঐক্যময়তা অভিন্ন জীবন কাঠামোর মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয়েছে। ফলে, মসজিদের অভ্যন্তর থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত আবাসঘর পর্যন্ত সর্বত্র এই কাঠামো ভারসাম্যতা, স্থিরতা এবং বিশুদ্ধতার নীতি বহন করে চলে। এর সাজ-শোভা কখনোই সংযমের পরিপন্থি হতে পারে না। মূলত, ইসলামী স্থাপত্যশিল্পে অলঙ্কাররীতি এমনভাবে তার ছন্দ আর সুশৃঙ্খল বিন্যাস ব্যবহার করেছে যাতে দেয়াল আর থামগুলো পরস্পর মিশে গিয়ে ফাঁকা জায়গা তৈরি হয় যেন পুরো জায়গায় আলো ছড়িয়ে যেতে পারে। ফলে মুসলিম অন্দরমহলের প্রধান বৈশিষ্ট্যসূচক হিসাবে পরিচিত সাদা দেয়াল ও মেঝের সৌন্দর্য আরও বৃদ্ধি পায়। তাছাড়া, মসজিদের মতো ঐতিহ্যবাহী মুসলিম ঘরগুলোতে কখনো জুতা পরে হাঁটা হয় না, আর রুমগুলোও আসবাবপত্র দিয়ে ভরা থাকে না।
প্রতিদিনের জীবনে ব্যবহৃত পোশাক যদি নির্ধারিত ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী উপযোগী না হয় তবে ইসলামি জীবনের ঐক্য অনেকটাই হারিয়ে যায়। বস্তুত, ইসলামের জন্য ইসলামি শিল্পকলা যে কাঠামো বিকশিত করেছে এর মাঝে পোশাকও আছে। পোশাক ও সাজসজ্জা ইসলামি শিল্পকলায় কম গুরুত্বপূর্ণ না; যেখানে কুরআন পরিষ্কারভাবে নির্দেশ দিচ্ছে — 'হে বনী আদম! প্রতেক নামাজের সময় তোমরা সাজসজ্জা পরিধান করে নাও' (আল কুরআন ০৭:৩১)। পুরুষদের ঐতিহ্যবাহী পোশাকের মাঝে নানান বৈচিত্র্য দেখা গেলেও মানুষকে আল্লাহর খলিফা এবং বান্দা হিসেবে যে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে তা এটি সবসময় ফুটিয়ে তোলে। তাই, পুরুষদের ঐতিহ্যবাহী পোশাককে একই সাথে মর্যাদাপূর্ণ ও সংযত, রাজকীয় এবং অনাড়ম্বরও বলা চলে। এ ধরনের পোশাক মানুষের পশুসুলভ প্রকৃতিকে গোপন রাখে, ব্যক্তিত্বকে উন্নত করে, ভাব-ভঙ্গিকে মর্যাদাশীল করে তোলে এবং নামাজে রুকু-সেজদার সময় উঠা-বসাকে সহজ করে। পক্ষান্তরে, যদিও আধুনিক ইউরোপিয় পোশাক-আশাক মানুষকে তার দাসত্ব থেকে মুক্ত করার দাবী করে, আদতে তা মানুষের আদি সম্মানকে অস্বীকার করে।
ইসলামি শিল্পকলা থেকে প্রতিকৃতি বাদ দেওয়ার ব্যাপারে শিয়া দেশগুলোর তুলনায় সুন্নি দেশগুলো অনেক কঠোর। অবশ্য এর ইতিবাচক তাৎপর্য আছে। কারণ ইসলামি শিল্পকলা মানুষের আদিসম্মান কে পুনরুদ্ধার করতে চায়; যে আদিসম্মান মানুষের প্রতিকৃতি তৈরির মাধ্যমে জবরদখল হয়ে গেছে। ইসলামি শিল্পকলার যে স্থবিরতা নিয়ে সমালোচনা করা হয় তা এক অর্থে ইসলামি শিল্পকলায় প্রতিকৃতির অনুপস্থিতির সাথে সম্পর্কিত। কারণ ইসলামি শিল্পকলা মনে করে যে, নিজের প্রতিকৃতি তৈরি করার মাধ্যমে মানুষ তার সত্তাকে পরিবর্তন করে ফেলে। কারণ প্রতিকৃতির মাঝে সে তার নিজের সত্তাকে প্রজেকশন করে। ফলে সেটা তাকে প্রভাবিত করে এবং তার মাঝে নতুন অনুভূতি জাগিয়ে তোলে যা আবার তাকে পুনরায় নতুন প্রতিকৃতি তৈরি করতে তাড়া করে। এভাবে তার মাঝে নতুন নতুন অনুভূতি জাগে আর সেও নিজের নতুন নতুন প্রতিকৃতি তৈরি করতে থাকে। এ প্রক্রিয়া থামে না; চলতে থাকে। যেমনটা আমরা রেনেসাঁসের পর থেকে ইউরোপিয় শিল্পকলায় দেখতে পাই, যখন থেকে ইউরোপিয় শিল্পকলা প্রতিকৃতির বিশুদ্ধ প্রতীকী গুরুত্ব ভুলে গিয়েছিল। অবশ্য এক্ষেত্রে স্যাক্রেড আর্ট তার পরম্পরাগত রীতি-নীতির কারণে পরিবর্তনের স্রোতে হারিয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা পায়। যা হোক, নরত্বারোপিত প্রতিকৃতির ব্যবহার খুবই পলকা জিনিস। কিতাবি বিধি-নিষেধ থাকলেও মানুষ নিজের মানসিক সীমাবদ্ধতাকে তার বানানো প্রতিকৃতিতে প্রজেকশন করতে চায় এবং একটা সময় যাওয়ার পর দেখা যায় সে নিজেই নিজের প্রতিকৃতিটির বিরোধিতা করে এবং প্রতিকৃতিটি যা রিপ্রেজেন্ট করে তারও বিরোধিতা করে। ইউরোপে একটা সময় ব্লাসফেমি মহামারির মতো ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে গিয়েছিল যার কারণে ইতিহাসের ওই সময়টা আলাদাভাবে পরিচিত হয়ে আছে। আমরা সে সময়টা বুঝতে পারব না যদি নরত্বারোপিত ধর্মীয় প্রতিকৃতির অস্তিত্ত্ব এবং এর সত্যিকার অবক্ষয়কে বিবেচনায় না আনি। ইসলাম এক্ষেত্রে পুরো সমস্যাটাকে গোড়ায় কেটে দিয়েছে। এই ক্ষেত্রসহ অন্যান্য অন্যান্য ব্যাপারেও ইসলাম নিজেকে সর্বশেষ ধর্ম হিসেবে হাজির করে—যে ধর্ম মানুষের বাস্তব দুর্বলতাকে আমলে নেয় এবং মানুষকে তার আদিধর্মে (primordial religion) প্রত্যাবর্তনের জন্য দিশা দেয়। ইসলামি শিল্পকলার মধ্যে ব্যক্তিগত প্রবৃত্তিগুলো হাজির থাকে না, সেজন্য ইসলামি শিল্পকলাকে ‘স্থবির’ বলে সমালোচনা করা হয়। কারণ, ইসলামি শিল্পকলা মানসিক সমস্যাকে একদম পাত্তা দেয় না এবং কেবল সেই উপাদানগুলোকেই ধারন করে যেগুলো সব সময় মূল্যবান ও প্রাসঙ্গিক।
এই কারণে দেখা যায়, ইসলামি শিল্পকলায় জ্যামিতিক অলঙ্করণরীতির অসাধারণ বিকাশ ঘটেছে। অনেকেই ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন যে, প্রতিকৃতির উপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার কারণে যে একটা শুন্যতা তৈরি হয়েছিল তা পূরন করার জন্য এই শিল্পরীতিটির বিকাশ ঘটে। কিন্তু এই ব্যাখ্যা প্রামাণ্য না। কারণ আরব্য-নকশা (Arabesque) কোনভাবেই প্রতিকৃতির বিকল্প না, বরং তার বিপরীত এবং এটি ফিগারেটিভ আর্টকে পুরোপুরি নাকচ করে। একটি পৃষ্ঠকে যখন রঙের নৈপুণ্য অথবা আলো-ছায়ার স্ফুরণে রূপান্তর করা হয় তখন অলঙ্করণরীতিটি মনকে কোন নির্দিষ্ট রূপে স্থির হতে দেয় না যেন কারো ‘আমি’ বলার সুযোগ তৈরি না হয়, যেখানে প্রতিকৃতি নিজেকে ‘আমি’ বলে জানান দেয়।
আরব্য-নকশার দুটি বৈশিষ্ট্যসূচক ধারা আছে। একটি হল জ্যামিতিক বিন্যাস যেখানে অসংখ্য জ্যামিতিক তারকার রশ্মি পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে জটিল ও অন্তহীন নকশা তৈরি করে। এটি সেই মননশীল অবস্থার এক শক্তিশালী প্রতীক যা ‘একত্বের মাঝে বহুত্ব এবং বহুত্ত্বের মাঝে একত্ব’কে উপলব্ধি করতে পারে। (الوحدة في الكثرة والكثرة في الوحدة) আর দ্বিতীয় আরব্য-নকশাটি সবচেয়ে পরিচিত। এটি সাধারণত বিভিন্ন উদ্ভিজ্জ মোটিফ দিয়ে তৈরী করা হয় এবং সেগুলোকে এমন বিশিষ্টতায় শৈলীবদ্ধ করা হয় যেখানে প্রকৃতির সাথে তাদের কোন সাদৃশ্য থাকে না; তারা কেবল ছন্দের নিয়ম মেনে প্রসারিত হতে থাকে। এটি যেন ছন্দের এক দৃশ্যমান রূপ, যেখানে প্রতিটি রেখা পরিপূরক ঢেউয়ের মতো ওঠানামা করে এবং প্রতিটি পৃষ্ঠের একটি বিপরীত প্রতিরূপ থাকে। আরব্য-নকশা একসাথে সুসংগত এবং ছন্দময়, গাণিতিক ও মনোরম। আর এই সমন্বয়ই ইসলামি চেতনার একটি মৌলিক দিককে প্রকাশ করে, যেখানে ভালোবাসা ও বুদ্ধিবৃত্তিক সংযমের মধ্যে এক সূক্ষ্ম ভারসাম্য বিরাজমান।
এ ধরনের শিল্পকলায় শিল্পীর ব্যক্তিসত্তা স্বভাবতই আড়াল হয়ে যায়, তবে এতে তার সৃষ্টি সুখ কোনোভাবেই কমে না—বরং তা কম আবেগপ্রবণ এবং অধিক মননশীল হয়ে ওঠে। তাছাড়া সৃষ্টি সুখকে দমিয়ে দেওয়া তো আধুনিক শিল্পচর্চার অবদান। কিন্তু ঐতিহ্যগত শিল্পচর্চায় শিল্পকর্মটি যদি নিছক হস্তশিল্পও হয়, তবুও তার সৌন্দর্য প্রমাণ করে যে এর মধ্যে গভীর আনন্দ নিহিত আছে।
জ্যামিতিক অলঙ্কাররীতি বেদুঈন গালিচা থেকে আরম্ভ করে পরিমার্জিত শহুরে সাজ-সজ্জায় শোভা পেলেও তাদের মৌলিক উপাদানগুলো মূলত একই থাকে। জ্যামিতিক অলঙ্কাররীতির এই সার্বজনীন বৈশিষ্ট্যগুলো ইসলামের সর্বজনীন প্রকৃতির সাথে পুরোপুরি মিলে যায়। এভাবে তা নগরের জ্ঞানী-গুণীদের সাথে মরুভূমির যাযাবরদের এবং ইব্রাহীমের সময়ের সাথে আমাদের এ যুগের মিলন ঘটায়।
এ পর্যন্ত আলোচনার মাধ্যমে প্রবন্ধের শুরুতে উত্থাপিত ইসলামি শিল্পকলা নিয়ে সমালোচনাগুলোর জওয়াব দেওয়া হয়েছে। এখন বাকি থাকে ইসলামি চিন্তাভাবনার জায়গা থেকে ‘শিল্প’ ধারণাটির অর্থ ব্যাখ্যা করা। শিল্পকলা কখনো তার মূল ভিত্তি শিল্প-কৌশল (Craft) এবং পরম্পরাগত জ্ঞান থেকে বিচ্ছিন্ন না। আরো সুনির্দিষ্টভাবে বললে শিল্পকলা মূলত এ দুইটারই সমন্বয়। ফলে জ্ঞানকে কেবল যৌক্তিক নির্দেশনা নির্ভর হলেই চলে না বরং প্রজ্ঞারও পরিচয় দিতে হয় যেন শিল্পকর্ম তার সর্বজনীন মূলনীতির সাথে সংযুক্ত হয়।
নবী করিম (সাঃ) বলেছেন: ‘আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন যে, প্রতিটি বস্তু ‘পরিপূর্ণতার সাথে’ সম্পূর্ণ করা উচিত—আমরা এখানে ‘সৌন্দর্যের সাথে’ও অর্থ করতে পারি ( إن الله كتب الإحسان على كل شيء)। কোন কিছুর পরিপূর্ণতা বা সৌন্দর্য নিহত থাকে তার আল্লাহর প্রশংসা করার মাঝে। অন্যভাবে বলা যায়, কোনো কিছু ততটাই সুন্দর বা পরিপূর্ণ, যতটা তা ঐশী গুণের প্রতিফলন ঘটায়। ফলে কোন কিছুর মধ্যে আমরা এই পরিপূর্ণতা উপলব্ধি করতে পারি না, যদি না আমরা বুঝতে পারি যে তা কীভাবে খোদার আয়নায় পরিণত হতে পারে।
উদাহরণস্বরূপ স্থাপত্যশিল্পের মূল ভিত্তি হচ্ছে রাজমিস্ত্রীর শিল্প-কৌশল; এবং এর সাথে সম্পৃক্ত জ্ঞান হচ্ছে জ্যামিতি। প্রথাগত স্থাপত্যশিল্পে জ্যামিতি কেবল পরিমাণগত দিকেই (quantitative aspect) সীমাবদ্ধ নয়, যেমনটা আধুনিক প্রকৌশলে দেখা যায়; বরং তার গুণগত দিকও (quantitative aspect) আছে। জ্যামিতির এ গুণগত দিকটি সমানুপাত সূত্রের (law of proportion) মাধ্যমে স্থাপত্যশিল্পে প্রতিফলিত হয়, যার ফলে একটি স্থাপনা অতুলনীয় ঐক্যে রূপ লাভ করে। প্রথাগতভাবে দেখা যায় যে, সমানুপাত সূত্র প্রয়োগ করে বৃত্তকে সুবিন্যস্ত জ্যামিতিক নকশা দ্বারা ভাগ করা হয়। ফলে একটি স্থাপনার সমস্ত পরিমাপ শেষ পর্যন্ত বৃত্ত থেকেই তৈরি হয়। আর বৃত্ত নিজেই সত্তার একত্বের (Unity of Being) সুস্পষ্ট প্রতীক, যা নিজের মধ্যে অস্তিত্বের সমস্ত সম্ভাবনাকে ধারণ করে। বহুভূজবিশিষ্ট ছোট গম্বুজ এবং কোষাকৃতির (alveolar) স্কুইঞ্চ দ্বারা গঠিত অনেক খিলান রয়েছে যেগুলো আমাদেরকে এই প্রতীকী নিদর্শনের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
শিল্পকলার অন্তঃস্থ স্তরবিন্যাস মূলত শিল্প-কৌশল, পরম্পরাগত জ্ঞান, এবং মননশীল প্রজ্ঞার উপর নির্ভরশীল। এটা বিবেচনা করলে সহজে বুঝা যায় যে, প্রথাগত শিল্পকলা দুই দিক থেকেই ধ্বংস হতে পারে—উপর থেকে কিংবা নিচ থেকে। খ্রিষ্টীয় শিল্পকলা নিজের আধ্যাত্মিক মূলনীতি হারানোর ফলে বিকৃত হয়েছে। আর ইসলামি শিল্পকলাও ধীরে ধীরে বিলুপ্তির দিকে এগোচ্ছে প্রথাগত শিল্প-কৌশলের অবক্ষয়ের কারণে।
ইসলামি জগতে স্থাপত্যকলার কেন্দ্রীয় গুরুত্বের প্রেক্ষিতে আমরা প্রধানত স্থাপত্য নিয়েই আলোচনা করেছি। ইবনে খালদুন অবশ্য স্থাপত্যের সাথে বহু ক্ষুদ্র শিল্পকেও সম্পৃক্ত করেছেন। যেমন, ছুতারশিল্প, কাঠমিস্ত্রির কাজ, কাঠ বা আস্তরে খোদাইশিল্প, চীনেমাটির পাত্রে মোজাইক করণ, শোভাবর্ধক চিত্রকর্ম, এবং গালিচা বুননশিল্প। যেগুলো বেশ ভালোভাবে ইসলামি বিশ্বের পরিচয় বহন করে। ক্যালিগ্রাফিও অলংকরণমূলক শিলালিপির মাধ্যম হিসাবে স্থাপত্যশিল্পের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। তবে যাইহোক, মূলত আরবী ক্যালিগ্রাফি কোন ক্ষুদ্র শিল্প নয়। বরং কুরআন লিপিবদ্ধ করার জন্য ব্যবহৃত হওয়ায় এটি ইসলামি শিল্পকলার মধ্যে সর্বোচ্চ মর্যাদা অধিকার করে আছে।
সমগ্র ইসলামি শিল্পকলার বিস্তৃত পরিসর বিশ্লেষণ করা এখানে সম্ভব নয়। তাই দৃশ্যকলার (Visual Art) দুই প্রান্তিক মেরু—স্থাপত্যশিল্প ও ক্যালিগ্রাফি—নিয়েই আমরা আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকি। এর মধ্যে স্থাপত্যশিল্প বস্তুগত অবস্থা দ্বারা সর্বাধিক নিয়ন্ত্রিত, অন্যদিকে ক্যালিগ্রাফি এ দিক থেকে সবচেয়ে স্বাধীন শিল্প। তবুও ক্যালিগ্রাফিকে হরফের স্বতন্ত্র গঠন, অনুপাত, ছন্দের ধারাবাহিকতা এবং শৈলী নিবার্চন করার ব্যাপারে কঠোর নিয়ম মেনে চলতে হয়। অন্যদিকে, হরফগুলোর সম্ভাব্য বিন্যাস প্রায় অসীম এবং শৈলীও বহুবিধ। যেমন ঋজুরেখ ‘কুফী’ থেকে শুরু করে অত্যন্ত প্রবহমান ‘নাসখি’ সহ নানান লিপি রয়েছে। এই চরম নিয়মনিষ্ঠা এবং পরম স্বাধীনতার সমন্বয়ই আরবি ক্যালিগ্রাফিকে এক রাজসিক বৈশিষ্ট্য দান করেছে। দৃশ্যকলার অন্য কোনো শাখায় ইসলামের চেতনা এতটা অকপটে প্রকাশ পায় নাই।
মসজিদ ও অনান্য স্থাপনার দেয়ালে কুরআনের আয়াত খোদাই করার ব্যাপক প্রচলন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, পুরো ইসলামি জীবন কাঠামো কুরআনের উদ্ধৃতির সাথে নিবিড়ভাবে জড়িত। কুরআন তেলওয়াতের পাশাপাশি কুরআন থেকে প্রাপ্ত দোয়া, মোনাজাত এবং ওজিফার মাধ্যমে এই জীবন আধ্যাত্মিকভাবে পরিপুষ্ট হয়। আমরা কুরআন থেকে উৎসারিত এ প্রভাবকে ‘আধ্যাত্মিক স্পন্দন’ বলতে পারি। যেহেতু এর প্রভাব একাধারে আধ্যাত্মিক এবং শ্রুতিগত। তাহলে বলা যায়, ইসলামি শিল্পের প্রতিটি শাখাই এই স্পন্দনের ছাপ বহন করে। সেই অর্থে ইসলামি দৃশ্যকলা কুরআনের বাণীর এক দৃশ্যমান প্রতিফলন—এ ছাড়া ভিন্নরকম হওয়ার সুযোগ নাই। তবে এখানে একটি আপাত-বিরোধ লক্ষ্য করা যায়, যদি আমরা শিল্পকলার কোনো আদর্শরূপ কুরআনের মধ্যে খুঁজতে চাই, তবে তা সরাসরি খুঁজে পাওয়া যায় না—না এর বিষয়বস্তুতে, না এর গঠনরীতিতে। একদিকে, কিছু পারসিয়ান মিনিয়েচার ছাড়া ইসলামি শিল্পকলা সাধারণত কুরআনের কাহিনি বা উপমাগুলোকে চিত্ররূপে উপস্থাপন করে না, যেমন খ্রিস্টীয় শিল্পকলায় বাইবেলের বিভিন্ন উপাখ্যানের দৃশ্যায়ন দেখা যায়। তেমনি কুরআনে এমন কোনো বিশদ সৃষ্টিতত্ত্ব(cosmology) নেই, যা স্থাপত্যিক বিন্যাসে রূপান্তর করা যায়—যেমন বৈদিক বিশ্বতত্ত্ব হিন্দু স্থাপত্যশিল্পে প্রতিফলিত হয়েছে।
অন্যদিকে, কুরআনের মধ্যে এমন কোনো রচনাগত নীতি বা বিন্যাস (ভারসাম্য, অনুপাত, ছন্দ, আলো-ছায়ার বৈসাদৃশ্য, সামঞ্জস্য, ফোকাস এবং গতি) খুঁজে পাওয়া যায় না, যা সরাসরি কোনো শিল্পে প্রয়োগ করা যেতে পারে। কুরআনের আয়াতগুলো অনেকাংশে বিচ্ছিন্ন বলে মনে হয়; এতে কোন যৌক্তিক বিন্যাস বা অন্তঃস্থ কাঠামো নেই। এমনকি এর ছন্দ, যত শক্তিশালীই হোক, কোনো স্থির নিয়ম অনুসরণ করে না। অথচ ইসলামি শিল্পকলা গঠিত হয়েছে শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা, স্তরবিন্যাস এবং স্ফটিকের মতো সুসংহত রূপের ভিত্তিতে।
প্রকৃতপক্ষে, কুর’আনের বাণী ও ইসলামি দৃশ্যকলার মধ্যে যে গভীর সম্পর্ক, তা বাহ্যিক প্রকাশের স্তরে অনুসন্ধান করলে ধরা পড়ে না। কুরআন কোন শিল্পকর্ম নয় বরং সম্পূর্ণ ভিন্নকিছু, যদিও এর বহু অংশে অসামান্য সৌন্দর্য বিদ্যমান। ফলে ইসলামি শিল্পকলা কুরআনের সরল অর্থ বা বাহ্যিক বিন্যাস থেকে উদ্ভূত হয়নি; বরং তা উদ্ভূত হয়েছে এর ‘হাকীকত’—অর্থাৎ তার অরূপ, গভীর ও মৌলিক সত্তা থেকে।
ইসলামের সূচনালগ্নে শিল্পকলার কোনো বিশেষ প্রয়োজন ছিল না; কোনো ধর্মই যখন প্রথম আবির্ভূত হয়, তখন সে শিল্পের ওপর নির্ভরশীল হয় না। দৃশ্য এবং শ্রুতিনির্ভর সংরক্ষণশীল কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা পরে দেখা দেয়, যেমন অবতীর্ণ গ্রন্থের বিস্তৃত ব্যাখ্যার প্রয়োজনও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উদ্ভূত হয়। তবে একটি ধর্মের সকল প্রকৃত প্রকাশ তার প্রাথমিক আবির্ভাবের মধ্যেই সুপ্ত সম্ভাবনা হিসেবে নিহিত থাকে।
ইসলামি শিল্পকলার মূল উৎস হল তাওহীদ—অর্থাৎ ঐশী একত্বের প্রতি স্বীকৃতি ও ধ্যান। তাওহীদের সারবস্তু ভাষার অতীত; কুর’আনে এটি হঠাৎ, বিচ্ছিন্ন ঝলকের মতো আত্মপ্রকাশ করে। এই ঝলকগুলো যখন দৃশ্যমান কল্পনার স্তরে প্রতিফলিত হয়, তখন তা স্ফটিকের মতো সুসংহত রূপে জমাট বাঁধে। এ রূপগুলোই ইসলামি শিল্পকলার সারবস্তু তৈরি করে।
টীকা
বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যে অষ্টম-নবম শতকে সংঘটিত একটি ধর্মীয়-রাজনৈতিক আন্দোলন, যেখানে ধর্মীয় চিত্র বা মূর্তির পূজা নিষিদ্ধ বা ধ্বংস করার পক্ষে মত দেওয়া হয়।
ইসলামি আইকনোক্ল্যাজম (iconoclasm) বলতে যে সব ছবি, মূর্তি বা শিল্পকর্মকে মূর্তিপূজামূলক বা ইসলামসম্মত নয় বলে মনে করা হয়, সেগুলো ভেঙে ফেলা বা সরিয়ে দেওয়া।
ইসলামি অ্যানিকনিজম (aniconism) বলতে ইসলামি শিল্প ও ধর্মীয় পরিসরে সচেতনভাবে জীবন্ত সত্তার চিত্রায়ণ পরিহার করাকে বোঝায়। এই নীতির ফলে ক্যালিগ্রাফি, জ্যামিতিক নকশা এবং আরব্য-নকশার মতো অলংকরণ রীতির বিকাশ ঘটে।
যিশু খ্রিস্টের লাস্ট সাপার স্মরণে নৈশভোজোৎসবের দিন গীর্জার টেবিলের উপর যে পবিত্র রুটি এবং মদ উৎসর্গ করা হয়।
নেভ (nave) হলো গির্জার প্রধান প্রার্থনাকক্ষ, যেখানে সবাই সমবেত হয়ে উপাসনা করেন। এটি সাধারণত প্রবেশদ্বার থেকে আরম্ভ করে বেদী পর্যন্ত বিস্তৃত থাকে এবং গির্জার সামগ্রিক স্থাপত্য বিন্যাসে একটি মৌলিক ও কাঠামোগত উপাদান হিসেবে বিবেচিত।
তরজমা করেছেন তাহসিন বিন বাশার।