মেন্যু
Menu

ইসলামি ওসাতিয়্যাহ : মৌলিকত্ব ও সমকালীনতা | ড. ইসাম আল বাশির

১২ মে, ২০২৬
ওসাতিয়্যাহর উপাদান
  1. দাওয়াতের ব্যাপকতা : ইসলামি দাওয়াতের বার্তাটি ব্যাপক। এতে কোনো ধরনের কাটছাঁট বা খণ্ডিত দৃষ্টিভঙ্গির অবকাশ নেই। এর প্রতিটি অংশ পরস্পরের পরিপূরক।

  2. জ্ঞানের উৎসসমূহ : জ্ঞান অর্জনের উৎস দুটি। একটি হলো ‘কিতাব মাসতুর’ বা লিপিবদ্ধ কিতাব অর্থাৎ মহাগ্রন্থ আল কুরআন পড়া। অন্যটি হলো ‘কাওন মানযুর’ বা এই বিশাল মহাবিশ্ব নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করা।

  3. মৌলিক নির্দেশনা : শরিয়তের লক্ষ্যগুলো (মাকাসিদ) পূরণ করাই আমাদের মূল লক্ষ্য। একইসাথে সৃষ্টির কল্যাণ ও জনস্বার্থ (মাসলাহাত) রক্ষা করাও আমাদের প্রধান দায়িত্ব।

  4. আকল ও ওহি : আমরা বিশুদ্ধ ওহি বা আসমানি বাণীর ওপর পূর্ণ ঈমান রাখি। পাশাপাশি পরিচ্ছন্ন ও সুস্থ আকলকে কাজে লাগানোর ওপরও গুরুত্ব দেই।

  5. মৌলিকত্ব ও সমকালীনতা : আমরা আমাদের মূল উৎসের (কুরআন ও সুন্নাহ) সাথে দৃঢ়ভাবে যুক্ত থাকব। আবার বর্তমান যুগের সাথেও সংযোগ রাখব।

  6. সাওয়াবিত (অপরিবর্তনীয়) ও মুতাগাইয়িরাত (পরিবর্তনশীল) : শরিয়তের সাওয়াবিত অর্থাৎ মৌলিক ও স্থায়ী বিধানগুলোর ব্যাপারে আমরা অবিচল থাকব। তবে বাস্তবতার নিরিখে যেসব বিষয় মুতাগাইয়িরাত বা পরিবর্তনশীল, সেগুলোর ব্যাপারে নমনীয় হব।

  7. তুরাস (ঐতিহ্য) ও ইতিহাস : তুরাস ও ইতিহাস নিয়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি হবে ভারসাম্যপূর্ণ। আমরা আমাদের তুরাস ও ইতিহাসকে অন্ধ ভক্তি বা পবিত্রজ্ঞান (তাকদিস) করব না, আবার তাকে তুচ্ছজ্ঞানও (তাবখিস) করব না। স্থবিরতা কিংবা অস্বীকার-কোনোটিই কাম্য নয়।

  8. তাজদিদ ও ইজতিহাদ : নতুন যুগের সমস্যা সমাধানে তাজদিদ ও ইজতিহাদ করা শরিয়তের ফরজ বিধান। সময়ের প্রয়োজন ও বাস্তবতার প্রয়োজন মেটাতে এটি অপরিহার্য।

  9. অনুসরণ ও উদ্ভাবন : ইবাদত ও আকিদার ক্ষেত্রে আমরা কেবল শরিয়তের অনুসরণ (ইত্তিবা) করব। তবে দুনিয়াবি বা পার্থিব কর্মকাণ্ডে আমরা নিত্যনতুন সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবন (ই’বদা) দেখাব।

  10. কুরআন ও সুলতান (শাসনব্যবস্থা) : দ্বীন এবং শাসনব্যবস্থা বা ক্ষমতার মাঝে থাকবে ঐক্য ও সহযোগিতা। এদের মাঝে কোনো ধরনের সংঘাত বা হানাহানি থাকবে না।

  11. সভ্যতার পুনর্জাগরণ : পৃথিবীতে আল্লাহর খলিফা বা প্রতিনিধি হিসেবে আমাদের দায়িত্ব পালন করতে হবে। একটি মজবুত ও সভ্য সমাজ গড়তে আমাদের সামগ্রিক ভূমিকা রাখতে হবে।

  12. অর্থনীতি ও সমাজ : আমাদের অর্থনীতি হবে প্রবৃদ্ধিমুখী ও জনকল্যাণকর। এখানে সম্পদের অপচয় হবে না, আবার তা কেবল এক শ্রেণির মানুষের হাতে কুক্ষিগতও থাকবে না।

  13. ইসলাহ ও দাওয়াত : আমরা সব সময় ইসলাহ বা সংস্কারের কাজে নিয়োজিত থাকব। আমাদের দাওয়াতের পন্থা হবে সঠিক ও দূরদর্শী।

  14. ভিতর ও বাহির : আমরা ভিতরের পবিত্রতা ও চারিত্রিক গুণাবলির ব্যাপারে যত্নবান হব। একইসাথে বাহ্যিক সৌন্দর্য ও পরিপাটি থাকার বিষয়েও গুরুত্ব দেব।

  15. ধারাবাহিকতা (তাদাররুজ) ও পর্যায়ক্রম (মারহালিয়্যাত) : আমাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হবে সুনির্দিষ্ট ও স্থির। তবে সেই লক্ষ্যে পৌঁছানোর উপায় বা পন্থাগুলোর ব্যাপারে আমরা নমনীয় হব।

  16. সুনান বা দুনিয়ায় কার্যকর প্রাকৃতিক ও ঐশী নিয়ম : আমরা আল্লাহর রহমত ও অনুগ্রহ প্রত্যাশা করি। তবে সেই রহমত পাওয়ার জন্য সুন্নাতুল্লাহ বা দুনিয়ায় কার্যকর আল্লাহ তায়ালার প্রাকৃতিক ও ঐশী নিয়ম মেনে পরিশ্রম চেষ্টা করতে হবে।

  17. ঐক্য ও ভিন্নমত : ইসলামের মূলনীতি বা শিকড়ের বিষয়ে আমরা সবাই এক ও অভিন্ন। তবে শাখাগত বা গৌণ বিষয়ে আমাদের মাঝে বৈচিত্র্য ও ভিন্নমত থাকতে পারে।

  18. নারীর অংশীদারিত্ব : সমাজ গঠনে নারীর অংশগ্রহণ একটি মৌলিক ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি। এই দৃষ্টিভঙ্গির শেকড় আমাদের সভ্যতা ও ইতিহাসের গভীরে প্রোথিত।

  19. শিল্প ও সাহিত্য : আমাদের শিল্প-সাহিত্যের বিষয়বস্তু হবে মজবুত ও অর্থবহ। আর তা উপস্থাপনের শৈলী বা কাঠামো হবে অত্যন্ত নান্দনিক ও আকর্ষণীয়।

  20. সভ্যতার মিথস্ক্রিয়া : আমরা নিজেদের আত্মপরিচয় ও স্বকীয়তা নিয়ে গর্ববোধ করি, তবে আমরা সংকীর্ণমনা নই। অন্যদের সাথে আমাদের মেলামেশা ও লেনদেন হবে উদার, কিন্তু সেখানে আমরা নিজেদের অস্তিত্ব বিলীন হতে দেব না।


ইসলামি ওসাতিয়্যাহ : দ্বীনের সারবত্তা ও দাওয়াতের পাটাতন

আমরা আমাদের বাস্তব জীবনে যে বুদ্ধিবৃত্তিক প্রকল্প বা চিন্তাধারাকে ফুটিয়ে তোলার স্বপ্ন দেখি, তার মূল পরিচয় একটি ‘কেন্দ্রীয় চিন্তা’র মাঝে নিহিত। আর তা হলো-‘ওসাতিয়্যাহ’ বা মধ্যমপন্থা। এই বিষয়টি পরিষ্কার করার পর এবার আমরা এর বিস্তারিত দিক ও বৈশিষ্ট্যগুলো নিয়ে আলোচনা করতে পারি।

ওসাতিয়্যাহ চিন্তার সারকথা হলো-ইসলামকে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে, যা স্থান, কাল ও মানুষের সাথে সংগতিপূর্ণ হবে। ইসলাম বাস্তবতা বিচ্ছিন্ন কোনো কিছু নয়, বরং বাস্তবতার সাথে গভীরভাবে যুক্ত। ওসাতিয়্যাহর এই ইসলামকে ব্যাখ্যা করতে হবে বর্তমান যুগের ভাষায়। এতে বিশুদ্ধ ওহি (নকল) এবং স্বচ্ছ আকলের মাঝে থাকবে চমৎকার সমন্বয়। এই ইসলাম হবে তাজদিদ ও ইজতিহাদের ব্যাপারে উন্মুক্ত। তবে এই তাজদিদ ও ইজতিহাদ হবে আলিম সমাজের কাছে স্বীকৃত গবেষণা ও দলিল অনুসন্ধান পদ্ধতির আলোকে।

ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস ও মূলনীতির (কুল্লিয়্যাত ও উসুলের) ব্যাপারে এই ওসাতিয়্যাহ হবে অবিচল, কিন্তু ছোটখাটো শাখা-প্রশাখার (জুযয়িয়্যাত ও ফুরুয়াতের) বিষয়ে হবে নমনীয়। লক্ষ্যের প্রশ্নে হবে আপসহীন, কিন্তু লক্ষ্য অর্জনের পন্থায় হবে আধুনিক ও প্রগতিশীল। যা কিছু পুরনো কিন্তু কল্যাণকর, তাকে ওসাতিয়্যাহ স্বাগত জানায়। আবার যা কিছু নতুন এবং উপকারী, তা থেকেও সুফল গ্রহণ করে। ওসাতিয়্যাহর এই ইসলাম অন্যান্য সভ্যতার প্রতি বিমুখ নয়, তবে অন্যের মাঝে নিজের অস্তিত্ব বিকিয়ে দেয় না। এটি নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রক্ষা করে চলে, তবে সংকীর্ণতায় ভোগে না। প্রজ্ঞা ও হিকমত যেখানেই পাওয়া যাক, এটি তা গ্রহণ করে। মানুষে মানুষে এবং সভ্যতায় সভ্যতায় যেসব বিষয়ে মিল রয়েছে, এটি তা আরও মজবুত করতে কাজ করে। সংক্ষেপে, এটি যেমন নিজের শেকড় বা উৎসের সাথে যুক্ত, তেমনি বর্তমান যুগ থেকেও বিচ্ছিন্ন নয়।

ইসলামি ওসাতিয়্যাহর মূল কথাটিকে আমরা এভাবে সংক্ষেপে বলতে পারি-এটি হলো ইসলামের দাওয়াতকে মানুষের কাছে সহজভাবে হাজির করা। এর উদ্দেশ্য হলো সব স্তরের মানুষকে দ্বীনের সাথে যুক্ত করা, যেন তারা সচেতনভাবে এবং সক্রিয় প্রচেষ্টার মাধ্যমে এই আদর্শকে গ্রহণ করে নেয়। তারা যেন জ্ঞান ও কর্মে এবং চিন্তা ও প্রয়োগে এই ওসাতিয়্যাহকে নিজেদের জীবনে ধারণ করে।

আমাদের লক্ষ্য হলো বর্তমান মানবসভ্যতাকে এক নতুন স্তরে নিয়ে যাওয়া। এখনকার সভ্যতা কেবল নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত এবং নিজের ভেতরেই সীমাবদ্ধ হয়ে আছে। এই স্তরের নাম ‘উজুদ’। আমরা একে পৌঁছে দিতে চাই ‘হুদুর’-এর স্তরে। আমরা একে এমন এক পর্যায়ে পৌঁছে দিতে চাই, যেখানে এটি মানুষের সুখ-শান্তি নিশ্চিত করতে এবং দুনিয়া বিনির্মাণের (ইমারতের) কাজে সক্রিয় ভূমিকা রাখবে। এর চূড়ান্ত গন্তব্য হলো-এক ‘শুহুদ হাদারি’ বা ‘সভ্যতাগত সাক্ষ্য’ নিশ্চিত করা। যেমনটি আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেছেন-

وَ کَذٰلِکَ جَعَلۡنٰکُمۡ اُمَّۃً وَّسَطًا لِّتَکُوۡنُوۡا شُهَدَآءَ عَلَی النَّاسِ وَ یَکُوۡنَ الرَّسُوۡلُ عَلَیۡکُمۡ شَهِیۡدًا ؕ... ﴿۱۴۳﴾
“এভাবেই আমি তোমাদের এক মধ্যমপন্থী উম্মাহ বানিয়েছি; যাতে তোমরা মানুষের ওপর সাক্ষী হতে পারো এবং রাসূল তোমাদের ওপর সাক্ষী হতে পারেন।” সূরা বাকারা : ১৪৩


‘ওসাতিয়্যাহ’ প্রকল্পের রূপরেখা

দাওয়াতের ব্যাপকতা : সামগ্রিকতা; খণ্ডিত বোঝাপড়া নয়

মুহাম্মাদি দাওয়াতের ব্যপ্তি সময়ের হিসেবে অনাগত কাল পর্যন্ত বিস্তৃত। দেশ ও সীমানার হিসেবে এটি বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে প্রসারিত। আর গভীরতার দিক থেকে এটি ইহকাল ও পরকালের যাবতীয় বিষয়কে ধারণ করে আছে। মানুষের পার্থিব ও পারলৌকিক কল্যাণের জন্য যা যা প্রয়োজন, এই জীবনব্যবস্থা তার সবটুকুই স্পষ্ট করে দিয়েছে। আকিদা ও শরিয়ত, জ্ঞান ও কর্ম, ইবাদত ও মুয়ামালাত, সংস্কৃতি ও নৈতিকতা, সত্য ও শক্তি, দাওয়াত ও রাষ্ট্র এবং সভ্যতা ও উম্মাহ-সবই এর আওতাভুক্ত। সংক্ষেপে বলতে গেলে, এই দাওয়াত দ্বীন ও দুনিয়ার এক অপূর্ব সমন্বয়।

জ্ঞানের উৎসসমূহ : কিতাব মাসতুর ও কাওন মানযুর

জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি হতে হবে পূর্ণাঙ্গ। জ্ঞানের কেবল একটি উৎসের ওপর নির্ভর করে অন্যটি ত্যাগ করা যাবে না। তাই আল্লাহর নাজিল করা কিতাব অর্থাৎ আল কুরআনের গভীর জ্ঞানের পাশাপাশি তাঁর সৃষ্টি করা জগত অর্থাৎ এই বিশাল মহাবিশ্বকেও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। কারণ শরিয়তের জ্ঞান দিয়ে মানুষের দ্বীন রক্ষা পায়, আর জাগতিক জ্ঞান দিয়ে দুনিয়ার ব্যবস্থাপনা ঠিক থাকে। এই দুইয়ের মেলবন্ধন অপরিহার্য, কারণ উভয় জ্ঞানের উৎসই এক ও অভিন্ন। এই ভারসাম্যের মাধ্যমেই আল্লাহর নাজিল করা সেই প্রথম আদেশ অর্থাৎ দুই দুইবার ‘ইকরা’ বা ‘পড়ো’-এর হক আদায় হয়। যেখানে আল্লাহ তায়ালা তাঁর নবিজিকে বলছেন-

اِقۡرَاۡ بِاسۡمِ رَبِّکَ الَّذِیۡ خَلَقَ ۚ﴿۱﴾ خَلَقَ الۡاِنۡسَانَ مِنۡ عَلَقٍ ۚ﴿۲﴾ اِقۡرَاۡ وَ رَبُّکَ الۡاَکۡرَمُ ۙ﴿۳﴾ الَّذِیۡ عَلَّمَ بِالۡقَلَمِ ۙ﴿۴﴾ عَلَّمَ الۡاِنۡسَانَ مَا لَمۡ یَعۡلَمۡ ؕ﴿۵﴾ 
“তুমি পড় তোমার রবের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে রক্তপিন্ড হতে। তুমি পড় আর তোমার রব মহামহিমান্বিত। যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে যা সে জানত না।” সূরা আলাক : ১-৫

মৌলিক নির্দেশনা : শরিয়তের মাকাসিদ রক্ষা ও মাসলাহাত নিশ্চিতকরণ

আমাদের পথচলার মৌলিক উৎস হলো-পবিত্র কুরআন ও বিশুদ্ধ সুন্নাহ। তবে এই দুই উৎসকে বুঝতে হবে সঠিক পদ্ধতিতে। শরিয়তের অন্তর্নিহিত লক্ষ্য বা ‘মাকাসিদ’ সামনে রেখে সুস্থ আকল ও সঠিক জ্ঞানের আলোকে এর ব্যাখ্যা করতে হবে। কুরআনের এক আয়াতের সাথে অন্য আয়াতের বা সুন্নাহর কোনো সংঘর্ষ বাধানো যাবে না। আবার আংশিক (জুযয়ি) বিধান নিয়ে মৌলিক নীতিমালাকে (কুল্লিয়্যাত) এড়িয়ে যাওয়াও চলবে না। আমাদের উচিত, ইসলামি আন্দোলনের জনশক্তিদের এমন এক আদর্শ ‘খালাফ’ হিসেবে গড়ে তোলা, যারা দ্বীনের জ্ঞানকে বিকৃতি থেকে রক্ষা করবে। রাসূলুল্লাহ (সা.) যেমনটি বলেছিলেন-

يَحْمِلُ هَذَا الْعِلْمَ مِنْ كُلِّ خَلَفٍ عُدُولُهُ يَنْفُونَ عَنْهُ تَحْرِيفَ الْغَالِينَ وَانْتِحَالَ الْمُبْطِلِينَ وَتَأْوِيلَ الْجَاهِلين. رَوَاهُ الْبَيْهَقِيّ
“প্রতি যুগে একদল ন্যায়নিষ্ঠ লোক এই জ্ঞানের মশাল বহন করবেন, যারা সীমালঙ্ঘনকারীদের বিকৃতি, বাতিলপন্থীদের মিথ্যাচার এবং মূর্খদের ভুল ব্যাখ্যা থেকে দ্বীনকে রক্ষা করবেন।” (বাইহাকি : ২১৪৩৯)

আকল ও নকল : বিশুদ্ধ ওহি ও স্বচ্ছ আকলের সমন্বয়

আমাদের বিশুদ্ধ নকল বা ওহির অনুসরণ করতে হবে স্বচ্ছ আকলের আলোকে। কারণ আকল এবং নকলের মধ্যে আদতে কোনো বিরোধ নেই। কেউ যদি কথা বা কাজের মাধ্যমে এদের মধ্যে বিরোধ তৈরি করতে চায়, তবে সে মারাত্মক ভুলের মধ্যে পড়বে। প্রাজ্ঞ আলিমদের মতে, এ ধরনের চিন্তা মানুষকে বিভ্রান্তির দিকে ঠেলে দেয়। এর ফলে হয় আকলের দোহাই দিয়ে ওহিকে অকেজো করে ফেলা হয়, অথবা আকলের আলো ছাড়াই ওহির ভুল ব্যাখ্যা করা হয়। এর পরিণতিতে মানুষ আল্লাহর পথ থেকে বিমুখ হয়ে যায়, ঠিক যেমনটি আগের কিছু ধর্মে ঘটেছিল-যেখানে ধর্মীয় যাজকদের গোঁড়ামির কারণে মানুষ দলে দলে ধর্মত্যাগ করেছিল।

মৌলিকত্ব ও সমকালীনতা : মৌলিকত্বের সাথে সম্পৃক্ততা এবং যুগের সাথে সংযোগ

আমাদের আসল উৎস বা মৌলিকত্ব হলো এই পবিত্র দ্বীন। মানুষের সাথে তার রবের সম্পর্ক, একজন মানুষের সাথে আরেকজন মানুষের মুয়ামালাত এবং চারপাশের পরিবেশের সাথে আমাদের আচরণ-সবকিছুই এই দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত। আর দ্বীনের ব্যাপারে উসুল হলো-‘তাওকিফ’ অর্থাৎ শরিয়তের প্রামাণ্য উৎসের ওপর নির্ভর করা। আর এই নির্ভরতা হবে সেই বোঝাপড়ার আলোকে, যার আলোচনা আমরা ইতঃপূর্বে করে এসেছি।

অন্যদিকে ‘সমকাল’ বা বর্তমান হলো সেই সময়, যে সময়ে দ্বীন বা শরিয়ত বাস্তবায়ন করা হয় এবং যেই সময়ে যারা দ্বীন বাস্তবায়ন করেন, তারা বাস করেন। শরিয়তের বিধান প্রয়োগের সময় অবশ্যই বর্তমান সময়ের বাস্তবতা মাথায় রাখা জরুরি। দ্বীনদার মানুষদের সমকালীন জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকা উচিত নয়, আবার যুগের নেতিবাচক স্রোতে গা ভাসিয়ে দেওয়াও ঠিক নয়। পূর্ববর্তী নবিগণের কিতাবে বর্ণিত আছে-

على العاقل أن يكون بصيرا بزمانه، مقبلا على شانع، حافظا للسانه، ومن حسب كلامه من عمله; قل كلامه... إلا فيما يعنيه!
“একজন বুদ্ধিমান মানুষের উচিত নিজের সময় সম্পর্কে সচেতন থাকা, নিজের কাজে মন দেওয়া এবং নিজের জিহ্বা নিয়ন্ত্রণ করা। যে ব্যক্তি নিজের কথাকে নিজের কাজের অংশ মনে করে, সে প্রয়োজন ছাড়া কথা বলে না।”


সাওয়াবিত (অপরিবর্তনীয়) ও মুতাগাইয়িরাত (পরিবর্তনশীল) : শরিয়তের মূলনীতি মেনে চলা এবং বাস্তবতার পরিবর্তনকে আমলে নেওয়া

শরিয়তের সাওয়াবিত বা অপরিবর্তনীয় বিষয়গুলো হলো-মৌলিক আকিদা, মাকাসিদ কুল্লিয়্যাহ, সুনির্দিষ্ট অকাট্য বিধান, নির্ধারিত ইবাদতসমূহ এবং আখলাকি মূল্যবোধ। এগুলোর মূলনির্যাস সব সময় বহাল থাকবে, তবে আলিমদের গবেষণা বা ইজতিহাদের মাধ্যমে এর প্রয়োগিক ব্যাখ্যায় প্রশস্ততা আসতে পারে।

অন্যদিকে মুতাগাইয়িরাত বা পরিবর্তনশীল বিষয়গুলো হলো-সেইসব বিধান যা ইজতিহাদ, মাসলাহাত (জনকল্যাণ), বিশেষ কোনো কারণ বা উরফের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে। সময়, স্থান ও অবস্থার পরিবর্তনের সাথে সাথে এই বিষয়গুলো পরিবর্তিত হয়। জাগতিক নিয়ম অনুযায়ী চারপাশের সব কিছু যখন বদলে যায়, তখন প্রাচীন কোনো প্রথার ওপর অন্ধভাবে পড়ে থাকা বা স্থবির হয়ে থাকা কখনোই সঠিক কোনো কর্মপন্থা হতে পারে না।

তুরাস (ঐতিহ্য) ও ইতিহাস : ভক্তি আর অবজ্ঞার মাঝে ভারসাম্য

আমরা আমাদের ‘তুরাস’ বা ঐতিহ্যকে সম্মান করি। একে আমরা পূর্বসূরিদের এক বিশাল মানবিক অর্জন হিসেবে দেখি। আমাদের পূর্বপুরুষরা তাঁদের যুগে ব্যক্তি মানুষ ও উম্মাহর জন্য যা কিছু কল্যাণকর মনে করেছেন, তার সেরাটাই উপহার দিয়ে গেছেন। তবে তুরাসের সাথে আমাদের আচরণ হবে ভারসাম্যপূর্ণ। আমরা একে এমনভাবে আঁকড়ে ধরব না যে, বিচার-বিশ্লেষণ ছাড়া কেবল মৃত মানুষের চোখ দিয়ে তা পড়তে হয়। আবার একে এমনভাবে অস্বীকারও করব না যে, এর ভেতরে থাকা চমৎকার সব মুক্তো আর হীরা আমাদের নজর থেকে হারিয়ে যায়।

তুরাস থেকে আমাদের ফায়দা নিতে হবে অতিভক্তি (তাকদিস) কিংবা তুচ্ছজ্ঞান (তাবখিস) না করে। এর ওপর পুরোপুরি হাত-পা ছেড়ে দিয়েও বসে থাকা যাবে না, আবার এর সাথে সম্পর্কও ছিন্ন করা যাবে না। বরং একে দেখতে হবে গভীর পর্যবেক্ষণ ও সচেতন দৃষ্টি দিয়ে। তাঁদের প্রচেষ্টাকে মূল্যায়ন করতে হবে, ভুলগুলো শুধরে নিতে হবে এবং অসম্পূর্ণ কাজগুলো পূর্ণ করতে হবে। এই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই আমরা বর্তমান সময়ের উপযোগী এক সংস্কৃতি গড়ে তুলব। যা আজকের মানুষের প্রয়োজন মেটাবে এবং আধুনিক যুগের পরিবর্তনের সাথে তাল মিলিয়ে চলবে।

ইতিহাসের ঘটনাপ্রবাহ ও ব্যক্তিত্বের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। আমরা এমন কোনো পুরনো যুদ্ধে লিপ্ত হব না, যার সময় ফুরিয়ে গেছে এবং যার নায়করা আল্লাহর কাছে তাঁদের কাজের হিসাব দিতে চলে গেছেন। আমরা কোনো বিশেষ ব্যক্তি বা মতাদর্শের অন্ধ অনুসারী হব না। বরং আমাদের সমস্ত আনুগত্য হবে হক ও হাকিকতের প্রতি।

তাজদিদ ও ইজতিহাদ : শরিয়তের ফরজ বিধান বাস্তবায়ন এবং বাস্তবতার দাবি পূরণ

বর্তমান সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো ‘তাজদিদ’ এবং ‘ইজতিহাদ’। এগুলো একইসাথে দ্বীনের হুকুম এবং সময়ের দাবি। যোগ্য মানুষের হাত দিয়ে সঠিক ক্ষেত্রে এই তাজদিদ ও ইজতিহাদের প্রয়োগ ঘটলে এই প্রকল্পের যাবতীয় বৈশিষ্ট্য অর্থবহ হয়ে উঠবে। তবে এখন ব্যক্তিপর্যায়ের ইজতিহাদের চেয়ে ‘সম্মিলিত ইজতিহাদ’ বা ‘ইজতিহাদ জামায়ি’-এর পরিধি বাড়ানো বেশি জরুরি। এই ইজতিহাদ কেবল ব্যক্তির ছোটখাটো সমস্যা নয়, বরং গোটা উম্মাহর সাধারণ স্বার্থ নিয়ে কাজ করবে। কারণ জামায়াত বা ঐক্যের ওপরই আল্লাহর বরকত ও সাহায্য থাকে। উম্মাহর সামষ্টিক স্বার্থের বিষয়ে একক বা কতিপয় ব্যক্তির সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। দ্বীনি বোঝাপড়া এবং সভ্যতা বিনির্মাণে এটিই সবচেয়ে সঠিক পথ।

এই লক্ষ্যেই আমাদের যাবতীয় জ্ঞানতাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক শক্তি নিয়োগ করতে হবে। আমাদের এমন এক ভবিষ্যৎ আলিম সমাজ তৈরি করতে হবে, যারা ইজতিহাদের এই গুরুদায়িত্ব কাঁধে তুলে নেবে। তারা বাড়াবাড়ি বর্জন করে সচেতনভাবে ইজতিহাদ করবে এবং দ্বীনের সীমানা না ছাড়িয়ে সুন্দরভাবে তাজদিদের কাজ আঞ্জাম দিবে।

অনুসরণ ও উদ্ভাবন : দ্বীনি ব্যাপারে অনুসরণ এবং দুনিয়াবি ব্যাপারে উদ্ভাবন 

দ্বীনি বিষয়ের মূলনীতি হলো-‘ইত্তিবা’ বা অনুসরণ। অর্থাৎ নবিজি (সা.) যা নিয়ে এসেছেন, হুবহু তা মেনে চলা। যা তিনি আদেশ করেছেন তা পালন করা এবং যা থেকে নিষেধ করেছেন তা বর্জন করা। যেমনটি কুরআনে বলা হয়েছে-

وَ مَاۤ اٰتٰىکُمُ الرَّسُوۡلُ فَخُذُوۡهُ وَ مَا نَهٰىکُمۡ عَنۡهُ فَانۡتَهُوۡا ۚ...  ۘ﴿۷﴾
“আর রাসূল তোমাদের যা দেন তা গ্রহণ করো, আর যা থেকে নিষেধ করেন তা থেকে বিরত থাকো।” সূরা হাশর : ৭

অন্যদিকে দুনিয়াবি বিষয়ে উসুল হলো-‘ইবদা’ বা উদ্ভাবন। দুনিয়াবি কাজে পুরনো প্রথা বা বর্তমানের অন্ধ অনুকরণ করার প্রয়োজন নেই। বরং উজ্জ্বল চিন্তা ও প্রখর মেধা খাটিয়ে পার্থিব বিষয়ে উন্নতি করতে হবে। একবার খেজুর চাষের একটি জাগতিক বিষয়ে নবিজির (সা.) পরামর্শ আক্ষরিকভাবে পালন করায় ফলন কমে গিয়েছিল। তখন তিনি বলেছিলেন-

إِذَا أَمَرْتُكُمْ بِشَىْءٍ مِنْ دِينِكُمْ فَخُذُوا بِهِ وَإِذَا أَمَرْتُكُمْ بِشَىْءٍ مِنْ رَأْىٍ فَإِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ.
“যখন আমি তোমাদের দ্বীনের কোনো বিষয়ে আদেশ করি, তখন তা মেনে চলো। আর যখন আমি নিজের মতামতের ভিত্তিতে কোনো দুনিয়াবি বিষয়ে কিছু বলি, তবে মনে রাখবে-আমি একজন মানুষ মাত্র।”

অন্য রিওয়ায়েতে এসেছে, তিনি বলেছিলেন-

أنتم أعلم بأمور دنياكم.
“তোমরা তোমাদের দুনিয়াবি বিষয়ে বেশি ভালো জানো।” (সহিহ মুসলিম : ২১৩৬) 

কুরআন ও সুলতান : ঐক্য ও সহযোগিতা; সংঘাত বা বিরোধ নয়

কুরআনের দিকনির্দেশনা আর ন্যায়পরায়ণ সুলতানের সাহসিকতায় একসময় মুসলমানরা রোম ও পারস্য জয় করেছিল। তাঁদের অগ্রগামী সেনাদল ইউরোপে প্রবেশ করেছিল। তাঁরা রোম ও ভিয়েনার দরজায় কড়া নেড়েছিলেন। তাঁরাই সারা বিশ্বে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সভ্যতার আলো ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। ইসলামি আন্দোলনের মূল কাজ হওয়া উচিত ‘কুরআনওয়ালা’ ও ‘ক্ষমতাওয়ালা’দের মাঝে সুসম্পর্ক গড়ে তোলা। দেশের মঙ্গল ও মানুষের কল্যাণের জন্যই এই ঐক্য প্রয়োজন।

আল্লাহ তায়ালা অনেক সময় যা কুরআন দিয়ে সংশোধন করেন না, তা সুলতানের শক্তি দিয়ে সংশোধন করেন। তাই কুরআন ও সুন্নাহর সঠিক জ্ঞান দিয়ে শাসনব্যবস্থাকে সঠিক পথে রাখা অত্যন্ত জরুরি। শাসকের সাথে আলিমদের সম্পর্ক যেন ঝগড়া-বিবাদ কিংবা অন্ধ তোষামোদ-কোনোটিই না হয়। বরং আদালত, হিকমত এবং নসিহতের মাধ্যমে একে অপরকে গ্রহণ করবে। নেক কাজ ও আল্লাহভীতির পথে তারা একে অপরকে সাহায্য করবে।

সভ্যতার পুনর্জাগরণ : খিলাফতের দায়িত্ব ও সামগ্রিক পুনর্গঠন

ওসাতিয়্যাহর মিশন অত্যন্ত ব্যাপক। এর লক্ষ্য হলো এক পূর্ণাঙ্গ সভ্যতা গড়ে তোলা। এমন এক সভ্যতা, যেখানে মানুষের মর্যাদা রক্ষা পাবে এবং সঠিক পন্থায় ‘উমরান’-এর দায়িত্ব পালন হবে। এই সভ্যতা একদিকে দ্বীনকে রক্ষা করবে, অন্যদিকে দুনিয়ারও যত্ন নেবে। এই সভ্যতা মানুষের ভিতর ও বাহির-উভয়কেই সুন্দর করবে। 

এই বিশাল লক্ষ্য অর্জনে তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক উভয় ক্ষেত্রেই কঠোর পরিশ্রম প্রয়োজন। এ জন্য সমস্ত শক্তি ও মেধা কাজে লাগাতে হবে। মানুষের হিম্মত ও মনোবল চাঙ্গা করতে হবে, যেন আল্লাহর খলিফা হিসেবে দুনিয়া বিনির্মাণের (উমরানের) দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করা যায়।

অর্থনীতি ও সমাজ : সঠিক উন্নয়ন; বৈষম্য নয়

একটি সঠিক ও ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনীতির ভিত্তি স্থাপন করা জরুরি। যেখানে সবার জন্য সমান সুযোগ থাকবে, সম্পদের প্রবৃদ্ধি ঘটবে এবং উৎপাদন বাড়বে। আমাদের এমন এক সামগ্রিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে সমাজ দুই ভাগে ভাগ হয়ে যাবে না। এমন যেন না হয় যে-একদল মানুষ ন্যূনতম প্রয়োজনটুকুও মেটাতে পারছে না, আর অন্যদল বিলাসবহুল প্রাসাদে আমোদ-প্রমোদে গা ভাসিয়ে দিচ্ছে।

আমাদের প্রাথমিক লক্ষ্য হলো-সাধারণ মানুষকে ‘ন্যূনতম জীবনধারণের’ (কাফাফ) পর্যায় থেকে টেনে তোলা। এই স্তরে মানুষ কেবল বেঁচে থাকার প্রয়োজনীয় চাহিদাগুলো মেটাতেই হিমশিম খায়। আমাদের চেষ্টা করতে হবে যেন প্রত্যেকের জন্য ‘পর্যাপ্ত সচ্ছলতা’ (কিফায়াহ) নিশ্চিত হয়। এটি এমন এক আর্থিক অবস্থা, যা একজন মানুষের জন্য সম্মানজনক জীবন, সামাজিক নিরাপত্তা ও মানবিক মর্যাদার গ্যারান্টি দেয়।

​আর আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো-মানুষকে ‘সচ্ছলতার’ (কিফায়াহ) উচ্চ শিখরে পৌঁছে দেওয়া। এই ‘কিফায়াহ’ কেবল বস্তুগত উন্নয়ন নয়, বরং রুহানি ও সভ্যতাগত উৎকর্ষের মানদণ্ডও বটে।

ইসলাহ ও দাওয়াত : নিরন্তর ইসলাহ ও সঠিক দাওয়াত

দেশ এবং দ্বীনের সাওয়াবিত তথা মৌলিক বিষয়গুলো রক্ষা করতে হবে। তবে যেসব বিষয় মুতাগাইয়িরাত বা পরিবর্তনশীল, সেখানে স্থবির হয়ে থাকা যাবে না। চলার পথে মাঝেমধ্যে যে বিচ্যুতি বা ত্রুটি দেখা দেয়, তা সংশোধনের চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। এই সংস্কার হতে হবে শান্তিপূর্ণ কথা ও কাজের মাধ্যমে। কোনো অবস্থাতেই কোনো ধরনের সহিংসতার পথে পা বাড়ানো যাবে না।

সব সময় মানুষকে সত্য ও ন্যায়ের পথে ডাকতে হবে। তবে এই দাওয়াত দিতে হবে বিনয় ও নম্রতার সাথে। কারো ওপর জোর করে কিছু চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। এসব কাজের একমাত্র উদ্দেশ্য হবে আল্লাহর সন্তুষ্টি। সমাজে ফ্যাসাদ বা বিশৃঙ্খলা রোধে সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধের দায়িত্ব পালন করতে হবে। দেশ ও জাতির কল্যাণে আমাদের নীতি হতে হবে-পরামর্শ ও সৎ উপদেশ দেওয়া, একে অপরের সাথে লড়াই করা নয়।

ভিতর ও বাহির : অন্তরের পবিত্রতা ও বাহ্যিক সৌন্দর্য

এটি মূলত সামগ্রিক পুনর্গঠন প্রকল্পেরই একটি অংশ। তবে ‘মানুষ গড়ার’ কারিগর হিসেবে এই বিষয়টি আলাদাভাবে আলোচনা করা জরুরি। কারণ মানুষই হলো যেকোনো পুনর্গঠন প্রকল্প ও সভ্যতা বিনির্মাণের মূল বুনিয়াদ। মানুষ যেহেতু মাটি আর রুহ বা জাহির ও বাতিনের সংমিশ্রণে তৈরি, তাই তার উন্নয়নের কাজ উভয় দিক থেকেই হতে হবে। শুধু বাহ্যিক চাকচিক্যের পেছনে ছুটলে চলবে না। এতে মানুষের রুহ শূন্য হয়ে যায়, তার আগ্রহগুলো হয় সস্তা আর অনুভূতিগুলো হয়ে পড়ে স্থবির ও রুক্ষ। আবার শুধু রুহের খোরাক নিয়ে পড়ে থাকলেও চলবে না। এতে মানুষ সমাজবিমুখ হয়ে পড়ে এবং অন্যের ওপর বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। তাই আসল কাজ হলো ভারসাম্য বজায় রাখা। অন্তরের চাহিদা আর দেহের প্রয়োজন-উভয়টিই পরিমিতভাবে পূরণ করতে হবে।

ধারাবাহিকতা (তাদাররুজ) ও পর্যায়ক্রম (মারহালিয়্যাত) : লক্ষ্যে অবিচল, পন্থায় নমনীয়

মধ্যমপন্থা বা ওসাতি চিন্তাধারা তার বাস্তবায়নের পথে সবার আগে ইসলামের সাওয়াবিত বা অপরিবর্তনীয় বিষয়াবলি এবং উসুল বা  মৌলিক বিষয়াবলির ওপর গুরুত্ব দেয়। তবে সব ধরনের কাজেই এটি একটি নমনীয় ও পর্যায়ক্রমিক ধারা অনুসরণ করে। এটিই সৃষ্টিজগত এবং শরিয়তের বিষয়ে আল্লাহর চিরন্তন নিয়ম। ওসাতিয়্যাহর এই ধারাটি বাস্তবসম্মত ও বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণার ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এখানে একদিকে থাকবে শরিয়তের গভীর জ্ঞান, অন্যদিকে থাকবে বর্তমান বাস্তবতার সঠিক বোঝাপড়া। আমাদের লক্ষ্যগুলো থাকবে স্থির ও অবিচল, কিন্তু সেই লক্ষ্যে পৌঁছানোর উপায় বা মাধ্যমগুলো হবে পরিবর্তনশীল। কারণ লক্ষ্যগুলো আসে অপরিবর্তনীয় উৎস থেকে, আর মাধ্যমগুলো বদলায় সময় ও পরিবেশের সাথে সাথে। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো-ঈমান প্রতিষ্ঠা করা, মানুষের মর্যাদা নিশ্চিত করা এবং উমরানের দায়িত্ব পালন করা। যা কিছু এই লক্ষ্য অর্জনে সাহায্য করবে, তা-ই গ্রহণ করতে হবে। আর যা আমাদের লক্ষ্য থেকে দূরে সরিয়ে দেবে, তার কোনো পবিত্রতা নেই, (তা গ্রহণ করা যাবে না)। বরং তাকে ছেড়ে দিয়ে আরও উত্তম ও কার্যকর পথ তালাশ করতে হবে।

সুনান বা দুনিয়ায় কার্যকর প্রাকৃতিক ও ঐশী নিয়ম : ফিকহুস সুনান মেনেই আল্লাহর রহমত তালাশ

আল্লাহ তায়ালা এই মহাবিশ্বে কিছু সুনির্দিষ্ট নিয়ম ও কারণ (সুন্নাতুল্লাহ) নির্ধারণ করে দিয়েছেন। লক্ষ্য অর্জন ও সাফল্যের জন্য তিনি মানুষকে এসব নিয়ম বোঝার ও তা কাজে লাগানোর নির্দেশ দিয়েছেন। ইতিহাসের শিক্ষা এবং যৌক্তিক প্রমাণের মাধ্যমে আল্লাহ আমাদের দেখিয়েছেন যে, দুনিয়া ও আখিরাতের সফলতা নির্ভর করে এসব জাগতিক নিয়ম ও মাধ্যমকে সঠিকভাবে ব্যবহার করার ওপর। এটি কিন্তু তাকদিরের ওপর আমরা যে ঈমান রাখি-তার বিরোধী নয়। বরং শরিয়ত আমাদের শিখিয়েছে এক তাকদির দিয়ে অন্য তাকদিরকে মোকাবিলা করতে। যেমন ইমাম আব্দুল কাদির জিলানি (রহ.) বলেছিলেন-

كثير من الناس إذا دخلوا القضاء والقدر أمسكوا.. وأنا انفتحت لي فيه روزنة; فنازعت أقدار الحق بالحق للحق. والولي من يكون منازعا للقدر.. لا من يكون موافقا له!
“তাকদিরের প্রসঙ্গ আসলে অধিকাংশ মানুষ চুপ হয়ে যায়। কিন্তু আমার কাছে এই বিষয়ে জ্ঞানের এক বাতায়ন খুলে দেওয়া হয়েছে। আমি আল্লাহর দেওয়া সত্য শক্তি দিয়ে আল্লাহরই নির্ধারিত (কঠিন) তাকদিরের সাথে লড়াই করি। প্রকৃত ওলি তিনিই, যিনি প্রতিকূল তাকদিরের সামনে হাত গুটিয়ে বসে না থেকে তা পরিবর্তনের চেষ্টা করেন।”

​ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) এই কথার চমৎকার ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছেন-

“শাইখ আব্দুল কাদের জিলানি এখানে মুহাম্মাদি জবানেই কথা বলেছেন। অর্থাৎ তিনি বলতে চেয়েছেন-একজন মুসলিমের দায়িত্ব হলো আল্লাহর আদেশ পালন করা এবং যা তিনি নিষেধ করেছেন তা প্রতিহত করা, এমনকি সেই নিষিদ্ধ বিষয়টি যদি তাকদির হিসেবেই আসুক না কেন। এভাবেই মানুষ আল্লাহর এক তাকদিরকে অন্য তাকদির দিয়ে প্রতিরোধ করবে। সাহাবিগণ একবার নবিজিকে (সা.) জিজ্ঞেস করেছিলেন-

يَا رَسُولَ اللَّهِ أَرَأَيْتَ رُقًى نَسْتَرْقِيهَا وَدَوَاءً نَتَدَاوَى بِهِ وَتُقَاةً نَتَّقِيهَا هَلْ تَرُدُّ مِنْ قَدَرِ اللَّهِ شَيْئًا فَقَالَ ‏ : هِيَ مِنْ قَدَرِ اللَّهِ. 
‘হে আল্লাহর রাসূল! আমরা যে ওষুধ ব্যবহার করি বা রোগমুক্তির জন্য ঝাড়ফুঁক করি, তা কি আল্লাহর তাকদিরের কিছু পরিবর্তন করতে পারে?’ নবিজি (সা.) জবাবে বলেছিলেন, ‘এসব চিকিৎসাও আল্লাহর তাকদিরেরই অংশ।’ (তিরমিজি : ২০৬৫)।

​ঐক্য ও ভিন্নমত : মূলনীতিতে অভিন্নতা, শাখা-প্রশাখায় বৈচিত্র্য

​ইসলামি ওসাতিয়্যাহর মূল ভিত্তি হলো ‘ফিকহুল ই’তিলাফ’ বাস্তবায়ন করা এবং ঐক্যের পরিবেশ তৈরি করা। এটি এমন এক ফিকহ, যা মানুষের মাঝের সাধারণ মিলগুলো খুঁজে বের করে। এটি অভিন্ন লক্ষ্যগুলোকে মজবুত করে এবং ঐকমত্যের জায়গাকে বড় করে তোলে। এর মাধ্যমে সামাজিক সংহতি, নাগরিক সম্প্রীতি এবং জাতীয় শান্তি নিশ্চিত হয়।

​একইসাথে এটি হককে গ্রহণ করার মানসিকতা এবং মতভেদের আদব শেখায়। ইজতিহাদি বিষয়ে কেউ ভুল করলে তাকে ছাড় দেওয়ার মানসিকতা থাকতে হবে। প্রতিটি স্বীকৃত মাযহাব বা মতাদর্শের অনুসারীদের নিজ নিজ মত পালন ও প্রচারের অধিকার স্বীকার করতে হবে। তবে তা হতে হবে ইলমসম্মত ও মার্জিত পন্থায়। ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) যেমনটি বলেছিলেন-

الحق يقبل من كل من تكلم به.
“সত্য যার মুখ থেকেই আসুক না কেন, তা গ্রহণ করতে হবে।”

ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.)-এর মতে-

البصير الصادق يضرب في كل غنيمة بسهم، ويعاشر كل طائفة على أحسن ما معها.
“একজন সত্যনিষ্ঠ ও দূরদর্শী মানুষ সব দল বা গোষ্ঠীর ভেতর থেকে ভালোটুকু গ্রহণ করেন এবং সবার সাথে চমৎকার আচরণ করেন।”

আমাদের ভ্রাতৃত্বের সব কটি স্তর রক্ষা করতে হবে-ধর্মীয় ভ্রাতৃত্ব, জাতীয় অংশীদারিত্ব এবং মানবিক বন্ধন। পরস্পরের সম্মান রক্ষা করতে হবে। ভিন্নমতাবলম্বীদের গালি দেওয়া, কুৎসা রটানো বা সমাজে গুজব ছড়িয়ে অস্থিরতা তৈরি করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

নারীর অংশীদারিত্ব : শরয়ি মূলনীতি ও সুগভীর সভ্যতা

ওসাতিয়্যাহ চিন্তাধারা বিশ্বাস করে যে, উম্মাহর অগ্রগতির জন্য নারী-পুরুষ সবার সুপ্ত প্রতিভাকে কাজে লাগানো অপরিহার্য। দ্বীনি ও সামাজিক নিয়মকানুন বা সুন্নাহগুলো সঠিকভাবে না বোঝার কারণে আমাদের সমাজে প্রায়ই নারীদের শক্তি ও সামর্থ্যকে অবদমিত করে রাখা হয়। আমরা নারীর ভূমিকা ও অধিকারের ব্যাপারে একটি ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিতে বিশ্বাসী। আমরা যেমন অন্ধ সেকেলে ধ্যান-ধারণায় বিশ্বাস করি না, তেমনি বিজাতীয় অপসংস্কৃতির কাছেও মাথা নত করি না।

নারী অধিকারের নামে আমরা দুই চরমপন্থার কোনোটিকেই সমর্থন করি না। একদল নারী-পুরুষের মাঝে পূর্ণ সমতা ও অভিন্নতার দাবি তুলে তাদের মধ্যকার প্রাকৃতিক পার্থক্যগুলোও মুছে ফেলতে চায়; এটি প্রকারান্তরে নারীর ওপর জুলুম। আবার অন্যদল নারীকে অহেতুক কঠোর শিকলে বেঁধে রাখতে চায়; যার ফলে সমাজের অর্ধেক অংশ অকেজো হয়ে পড়ে। অথচ আল্লাহ তায়ালা বলেছেন- 

وَ لَهُنَّ مِثۡلُ الَّذِیۡ عَلَیۡهِنَّ بِالۡمَعۡرُوۡفِ ۪... ﴿۲۲۸﴾
“নারীদের তেমনি ন্যায়সঙ্গত অধিকার আছে, যেমন আছে তাদের ওপর পুরুষদের।” সূরা বাকারা: ২২৮

আর নবিজি (সা.) বলেছেন-

إِنَّمَا النِّسَاءُ شَقَائِقُ الرِّجَالِ. 
“নারীরা হলো পুরুষেরই সহোদর বা অর্ধাঙ্গী।” (আহমাদ : ২৬১৯৫)।

শিল্প ও সাহিত্য : অর্থবহ বিষয়বস্তু ও নান্দনিক শৈলী

ওসাতিয়্যাহর এই মিশনের প্রসারের প্রয়োজনে ওসাতিয়্যাহ চিন্তাধারাকে আপন সময়ের সব অর্জনের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হবে। এই মহান আদর্শের প্রচার ও প্রয়োগের জন্য বৈধ সব পন্থা ও মাধ্যম ব্যবহার করা অপরিহার্য। মানুষের সচেতনতা তৈরি এবং তাদের রুচি ও আগ্রহের দিক পরিবর্তনে শিল্পকলার যে বিশাল ভূমিকা রয়েছে, তা নিয়ে বিতর্কের কোনো অবকাশ নেই। তাছাড়া প্রতিটি সুস্থ মানুষের জন্যই-সে ছোট হোক বা বড়-কিছুটা বিনোদন ও প্রশান্তির প্রয়োজন থাকে। এটি মানুষের কর্মস্পৃহা বাড়িয়ে দেয় এবং নতুন কিছু করার শক্তি জোগায়।

তাই মানুষের হৃদয়ে আমাদের বার্তা পৌঁছে দেওয়ার জন্য শিল্প-সাহিত্যের এই গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যমটিকে অবহেলা করার বিলাসিতা আমাদের সাজে না। বরং আমাদের অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে, পেশাদারিত্ব ও নিপুণতার সাথে শিল্পকলাকে আপন করে নিতে হবে। আমরা যদি এই ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকি, তবে মানুষের মন ও মনন জয় করার দৌড়েও আমরা পেছনে পড়ে যাব।

সভ্যতার মিথস্ক্রিয়া : আত্মপরিচয় রক্ষা করে উদারতা এবং বিলীন না হয়েও লেনদেন

বর্তমান সময়ে ওসাতিয়্যাহর অনুসারীদের সবচেয়ে বড় একটি কাজ হলো-গঠনমূলক মানবিক সংলাপে ভূমিকা রাখা। বিশ্বের বিবেকবান মানুষদের এমন এক জায়গায় একমত হতে হবে যেখানে সাম্য (মুসাওয়াত) ও ন্যায়বিচার (আদালত) থাকবে। প্রত্যেকের অধিকার ও দায়িত্বের বিষয়ে ইনসাফ প্রতিষ্ঠিত হবে। একে অপরের ভিন্নমতকে সম্মান দিতে হবে এবং দায়িত্বশীলতার সাথে স্বাধীনতার চর্চা করতে হবে। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে ধর্মীয় বিশ্বাস, পবিত্র স্থান ও প্রতীকগুলোর মর্যাদা রক্ষা করতে হবে। পারস্পরিক প্রতিশ্রুতি পালন এবং ধর্মীয় ও মানবিক মিলগুলো আরও মজবুত করতে হবে। এর মাধ্যমেই একটি ভারসাম্যপূর্ণ অংশীদারিত্ব গড়ে উঠবে যা বিশ্বশান্তি নিশ্চিত করবে। তখন সবাই মিলে আধুনিক সভ্যতার সুফল ভোগ করে সুখে-শান্তিতে থাকতে পারবে।

এই সংলাপ বা আলোচনার পরিসরকে তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়-

প্রথমত : ধর্মীয় মূলনীতি, যা মানুষের সহজাত স্বভাব ও মহান স্রষ্টার দাসত্বের কথা বলে। 
দ্বিতীয়ত : মানবিক মূল্যবোধ, পৃথিবীর সব মানুষ যার কথা বলে। 
তৃতীয়ত : পারস্পরিক স্বার্থ, যা মানুষের সাথে মানুষের লেনদেন ও সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণ করে। 

এই তিনটি ক্ষেত্রেই বিশ্বের অধিকাংশ মানুষ একমত হতে পারে। এভাবেই আমরা আমাদের নিজস্ব পরিচয় বজায় রেখে অন্যের সাথে মিশব; কারো মাঝে বিলীন হয়ে যাব না।

তরজমা করেছেন মু. সাজ্জাদ হোসাইন খাঁন।