হিন্দুত্ববাদের বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি
ভূমিকা
ইসলামী আন্দোলন যে পরিবর্তনের ডাক দেয়, তার দাবি হলো—আন্দোলনটি একদিকে যেমন পূর্ণ দৃঢ়তা ও অবিচলতার সাথে ইসলামের মৌলিক দাওয়াত প্রচার করে যাবে, তেমনি তার নিজ সময়ের ও সমকালীন গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রবণতাগুলো সম্পর্কেও গভীর জ্ঞান রাখবে। আন্দোলনের উচিত তার লক্ষ্যভুক্ত সমাজের সাথে এক ধরণের হিতৈষী যোগাযোগ এবং সমাজে প্রচলিত চিন্তাধারার সাথে অর্থবহ সংলাপ বা আলোচনার ধারা বজায় রাখা।
এই সংলাপ বা আলোচনার জন্য এটা জরুরি যে, আন্দোলনের কাছে এমন একটি ন্যারেটিভ থাকবে যা তার নিজস্ব আদর্শিক ভিত্তির ওপর মজবুতভাবে দাঁড়িয়ে থাকবে। একইসাথে তা যেন নিজ সময়ের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, আলোচিত বিষয়াবলি এবং চিন্তাধারার ব্যাপারে একটি স্পষ্ট ও যুক্তিপূর্ণ অবস্থানের অধিকারী হয়।
বর্তমানে আমাদের দেশে একটি প্রভাবশালী চিন্তাধারা হলো 'হিন্দুত্ববাদ' (Hindutva)। এই প্রবণতা দেশের শিক্ষিত জনগণের মধ্যেও দ্রুত জনপ্রিয় হচ্ছে। এমতাবস্থায়, হিন্দুত্ববাদের রাজনৈতিক অগ্রযাত্রা রুখে দেওয়ার চেষ্টাই যথেষ্ট নয়, বরং চিন্তা ও দর্শনের স্তরেও একে মোকাবিলা করা অনেক বেশি জরুরি। খাঁটি ইসলামী চিন্তার ভিত্তিতে এই ব্যবস্থার পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ করা বর্তমান সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ দাওয়াতী ও তাত্ত্বিক প্রয়োজন।
আমরা আগামীতে এই চিন্তাধারাকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রাখার চেষ্টা করব। এই আন্দোলনের (হিন্দুত্ববাদ) তাত্ত্বিক ও নেতাদের রাজনৈতিক অবস্থান এবং ব্যবহারিক পদক্ষেপের ওপর পর্যালোচনার কোনো অভাব নেই। মুসলিম সার্কেল এবং সংবাদমাধ্যমেও এটি এখন আলোচনার প্রধান বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা এই ধারাবাহিক নিবন্ধগুলোতে কেবল সেই বিষয়গুলোতেই সীমাবদ্ধ থাকব না, বরং বোঝার চেষ্টা করব যে এই আন্দোলনের তাত্ত্বিক ভিত্তিগুলো কী? তাদের বিশ্বদর্শন (Worldview) কী? তারা কী ধরণের সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের কথা বলে?
আমাদের চেষ্টা থাকবে এই বিষয়গুলো যাতে সেই আন্দোলনের মূল তাত্ত্বিকদের উদ্ধৃতি দিয়ে বোঝা যায়। পাশাপাশি তাদের চিন্তাধারায় যে বিবর্তন বা পরিবর্তন এসেছে এবং বর্তমান সময়ে তারা যা ভাবছে, সেটিও আমরা গুরুত্বের সাথে স্টাডি করব।
আমাদের দেশে হিন্দুত্ববাদের প্রতিপক্ষ হিসেবে আরও কিছু চিন্তাধারা যেমন—ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ (Secularism), সমাজতন্ত্র (Socialism) ও বিভিন্ন জাতিগত পরিচয় সামনে আসে। আমরা সেগুলোকেও আলোচনার আওতায় আনব। কারণ, এই প্রতিটি চিন্তাধারাই তাদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি থেকে হিন্দুত্ববাদকে বিশ্লেষণ করেছে। আর এই দৃষ্টিভঙ্গিগুলো আমাদের (অর্থাৎ মুসলমানদের এবং আন্দোলনের সাথে যুক্ত ব্যক্তিদের) চিন্তার ওপরও প্রভাব ফেলে। আমরা এই ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিগুলোকেও গভীরভাবে বোঝার চেষ্টা করব। আমরা তাদের গুণ ও ত্রুটিগুলো তুলে ধরব এবং তাদের তাত্ত্বিক, ব্যবহারিক ও সামাজিক ভুলগুলোর বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করব—যা মূলত তাদের তাত্ত্বিক পতনের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং হিন্দুত্ববাদের মতো একটি চিন্তাধারার দ্রুত প্রসারে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। মুসলমানরা এই আন্দোলনকে নিজেদের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর মনে করে আসছে এবং বিভিন্নভাবে এর বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়াও দেখিয়ে যাচ্ছে। মুসলমানদের এই প্রতিক্রিয়াগুলোর পেছনেও চিন্তা ও দর্শনের ভিন্ন ভিন্ন ধারা রয়েছে। এর মধ্যে কিছু ধারা একান্তই মুসলমানদের নিজস্ব চিন্তা থেকে উদ্ভূত, আবার কিছু ধারা সমসাময়িক সেক্যুলার বা অন্যান্য আন্দোলন থেকে ধার করা অথবা সেগুলোর প্রভাবে তৈরি। এই বিভিন্ন ধরণের প্রতিক্রিয়া—বিশেষ করে তাত্ত্বিক বা আদর্শিক প্রতিক্রিয়ার ধরনগুলো বিশ্লেষণ করারও চেষ্টা করা হবে।
এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা যা আমরা শুরু করতে যাচ্ছি। এখানে উপস্থাপিত বিষয়গুলোর ওপর একাধিক মত থাকা এবং গঠনমূলক বিতর্কের কেবল সুযোগই নেই, বরং এই ধারাবাহিকতার মূল উদ্দেশ্যই হলো যাতে এই বিষয়গুলো নিয়ে আরও গভীর ও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা সামনে এগিয়ে যায়। শুধু ব্যবহারিক রাজনীতির সাময়িক জটিলতায় না আটকে থেকে, এই আন্দোলনকে এর চিন্তাধারার গভীরে গিয়ে বোঝা প্রয়োজন। আমি আশা করি যে, বিদগ্ধ সমাজ বা জ্ঞানীরা এই আলোচনাকে এগিয়ে নিতে আমাদের সহায়তা করবেন।
প্রধান তাত্ত্বিকগণ
১) বিনায়ক দামোদর সাভারকর
হিন্দুত্ববাদী আন্দোলনের তাত্ত্বিকদের মধ্যে সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নাম হলো বিনায়ক দামোদর সাভারকর (মৃত্যু: ১৯৬৬)। চিত্তপাবন মারাঠি ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণকারী সাভারকরকে বর্তমান সময়ের সকল হিন্দু পুনর্জাগরণবাদী আন্দোলনের পথিকৃৎ হিসেবে গণ্য করা হয়। মারাঠি এবং ইংরেজি ভাষায় তাঁর মোট ৩৮টি গ্রন্থ রয়েছে।
তার মধ্যে 'Six Glorious Epochs of Indian History' একটি গুরুত্বপূর্ণ বই, যা থেকে ইতিহাসের প্রতি সাভারকরের দৃষ্টিভঙ্গি বোঝা যায়। ইতিহাস ছাড়াও তাঁর কিছু জীবনী এবং জেল জীবনের অভিজ্ঞতার ওপর লেখা বই রয়েছে। তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বই হলো 'Hindutva', যা ১৯২৩ সালে সাভারকর নিজের নাম ব্যবহার না করে 'এ মারাঠা' (A Maratha) ছদ্মনামে প্রকাশ করেছিলেন। এটি ছিল মাত্র ৬৮ পৃষ্ঠার একটি ছোট পুস্তিকা। বর্তমানে এটি সাধারণত 'Hindutva: Who is a Hindu?' নামে সমধিক পরিচিত। এর নতুন সংস্করণে ভূমিকা ইত্যাদি যুক্ত হয়ে এটি আরও বিস্তারিত (১৫৯ পৃষ্ঠা) হয়েছে, যেখানে হিন্দুত্ববাদের তত্ত্ব ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
সাভারকর একজন উগ্র জাতীয়তাবাদী ছিলেন এবং নিজেকে নাস্তিক বলতেন। তাঁর চিন্তাধারা ইউরোপের ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদী এবং নাৎসি ভাবধারা দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত ছিল। আরএসএস (RSS)-এর দ্বিতীয় সরসংঘচালক মাধব সদাশিব গোলওয়ালকর (মৃত্যু: ১৯৭৩) এই চিন্তাধারাকে প্রাচীন হিন্দু দর্শন এবং আধ্যাত্মিক ও ধর্মীয় ধারণার আবরণে উপস্থাপন করে সাধারণ হিন্দুদের কাছে জনপ্রিয় করে তোলেন। গোলওয়ালকরকে সংঘের মহলে 'গুরুজী' বলা হয়। বর্তমানে এই মহলে তিনিই সবচেয়ে জনপ্রিয় চিন্তাবিদ এবং মূলত তাঁর মাধ্যমেই এই শাসনব্যবস্থা বা চিন্তাধারা আলোচিত হয়।
তাঁর মৌলিক গ্রন্থ মাত্র দুটি:
১. Bunch of Thoughts
২. We or Our Nationhood Defined
এগুলো ছাড়াও তাঁর যাবতীয় বক্তৃতা ও লেখনিকে ১২টি খণ্ডে সংকলিত করা হয়েছে। এই হিন্দি বইটি বর্তমানে সহজেই পাওয়া যায়। ইংরেজিতে 'Guruji Vision and Mission' নামক বইয়ে এক খণ্ডেই তাঁর বিভিন্ন চিন্তাধারাকে বিভিন্ন শিরোনামে সংকলিত করা হয়েছে।
২) মাধব সদাশিবরাও গোলওয়ালকর
সংঘের দর্শন ও চিন্তাধারার সবচেয়ে বিস্তারিত ও স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায় গোলওয়ালকরের লেখায় এবং তাঁর উদ্ধৃতিই সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। সাভারকরের মতো তাঁরও কিছু চিন্তাধারা অত্যন্ত উগ্র ছিল। এটা সম্ভব যে, বর্তমান সময়ে সংঘের সবাই তাঁর সমস্ত চিন্তার সাথে একমত নন। এমনকি আরএসএস সংঘের বর্তমান প্রধান (সরসংঘচালক) মোহন ভগবতও তাঁর কিছু বক্তব্যকে বর্তমান পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে অপ্রাসঙ্গিক বলে অভিহিত করেছেন। তবে অনেক বিশ্লেষকের মতে, এই আন্দোলনের মূল চিন্তাধারার সবচেয়ে সৎ ও স্পষ্ট ব্যাখ্যা গোলওয়ালকরই দিয়েছেন, যেখানে অন্য চিন্তাবিদগণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নিজেদের শব্দ চয়ন কিছুটা নমনীয় করেছেন।
৩) দীনদয়াল উপাধ্যায়
দীনদয়াল উপাধ্যায় (মৃত্যু: ১৯৬৮)-এর গুরুত্ব এই যে, তাঁকে জনসংঘ এবং পরবর্তীতে এর পরিবর্তিত রূপ অর্থাৎ বিজেপির (BJP) আসল মতাদর্শিক স্থপতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ১৯৬৫ সালে মুম্বাইয়ে দেওয়া তাঁর চারটি ভাষণে তিনি তাঁর দলের দর্শন স্পষ্ট করেন এবং এই পূর্ণাঙ্গ চিন্তাধারাকে ‘একাত্ম মানবতাবাদ’ (Integral Humanism) নাম দেন।
এটি বর্তমানে বিজেপির আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক দর্শন।
বিজেপির দলীয় সংবিধানেও (ধারা ৩) এটি স্পষ্টভাবে লিখিত রয়েছে।
দলের সদস্য হওয়ার জন্য প্রত্যেক কর্মীকে এই 'একাত্ম মানবতাবাদ' এবং 'ধর্মনিরপেক্ষতা'র অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর করতে হয়।
৪) অন্যান্য প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব
সাভারকর, গোলওয়ালকর এবং দীনদয়াল উপাধ্যায়ের পর এই আন্দোলনের চিন্তাধারা বোঝার জন্য আরও কিছু সূত্র পাওয়া যায়। সংঘের শীর্ষ নেতাদের চিন্তাধারা সংকলন করে অনেক বই প্রকাশিত হয়েছে। সংঘের মুখপত্র 'অর্গানাইজার'-এ বিভিন্ন নেতারা ধারাবাহিকভাবে লিখে গেছেন, যাদের মধ্যে অন্যতম হলেন:
বলরাজ মাধোক (মৃত্যু: ২০১৬)
কে. এস. সুদর্শন (মৃত্যু: ২০১২)
এইচ. ভি. শেষাদ্রি (মৃত্যু: ২০০৫)
এছাড়া অটল বিহারী বাজপেয়ী (মৃত্যু:২০১৮), ভাইয়াজি যোশী, মনমোহন বৈদ্য, শেষাদ্রি চারি -এর বক্তব্য ও প্রবন্ধসমূহ বিভিন্ন সময়ে এই আন্দোলনের তাত্ত্বিক ভিত্তি তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। সম্প্রতি (সেপ্টেম্বর ২০১৮) বর্তমান সরসংঘচালক মোহন ভগবত দিল্লির বিজ্ঞান ভবনে সংঘের আদর্শ ও বর্তমান নীতি নিয়ে তিন দিনের এক বক্তৃতা মেলার আয়োজন করেছিলেন। এই ভাষণগুলো পরবর্তীতে ‘Future India: An RSS Perspective’ শিরোনামে বিভিন্ন ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে, যা বর্তমান নেতাদের চিন্তাধারা বুঝতে সহায়ক।
নিম্নে আমরা এই সমস্ত উৎসগুলিকে সামনে রেখে এই আন্দোলনের চিন্তাধারা বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করব।
যদিও এই চিন্তাবিদগণ বারবার দাবি করেন যে, তাঁদের চিন্তাধারায় বিভিন্ন বিশ্বাস ও ধর্মের বৈচিত্র্যের সুযোগ রয়েছে এবং এটি তাঁদের একটি গর্বের বিষয়। তবে বাস্তবে তাঁদের কর্মপদ্ধতি বিশ্লেষণ করলে এবং ঘোষিত আদর্শগুলো খুঁটিয়ে দেখলে কিছু সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য নজরে আসে। সংঘের তাত্ত্বিকদের লেখা থেকে এটা স্পষ্ট যে, তাঁরা কিছু নির্দিষ্ট বিষয়ে কোনো আপস করতে রাজি নন। তাঁদের এমন কিছু আদর্শ রয়েছে যার মাধ্যমে তাঁরা দেশের নির্দিষ্ট কিছু সম্প্রদায়কে কার্যত আলাদা বা বর্জন (exclude) করে রাখেন।
অস্তিত্বের একত্ব (ওয়াহদাতুল ওজুদ)
যেকোনো বিচারধারার মূল ভিত্তিই হলো তার বিশ্বদর্শন বা 'ওয়ার্ল্ডভিউ'। হিন্দু দর্শনের বিশ্বদর্শন বুঝতে গেলে একটি মৌলিক চিন্তা সবার মধ্যে কমন দেখা যায়, আর তা হলো—অস্তিত্বের একত্ব বা Unity of Existence। এটি একটি প্রাচীন হিন্দু দর্শন, যা বৈদিক সাহিত্যে 'অদ্বৈত বেদান্ত' নামে পরিচিত। এই দর্শনের মূল ভিত্তি পাওয়া যায় বেদান্ত,ব্রহ্মসূত্র, ও ভগবদ্গীতার মতো প্রাচীন পবিত্র গ্রন্থগুলোতে।
১) অদ্বৈত বেদান্তের সারকথা
অষ্টম শতাব্দীতে প্রখ্যাত হিন্দু দার্শনিক আদি শঙ্কর এই প্রাচীন দর্শনকে পুনরুজ্জীবিত করেন যার ফলে মধ্যযুগ ও আধুনিক যুগের হিন্দু আধ্যাত্মিক চিন্তাধারায় এটি প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। এই দর্শনের মূল নির্যাস হলো—মহাবিশ্বের আসল বাস্তবতা বা পরম সত্য কেবল একটিই সত্তা, যাকে বলা হয় 'ব্রহ্ম'। মানুষের আত্মা আসলে সেই পরম ব্রহ্মেরই অংশ। সৃষ্টিজগতের প্রতিটি অণু-পরমাণু এবং প্রতিটি প্রাণ আসলে একই অবিভাজ্য অস্তিত্বের অংশ। বাকি যা কিছু দেখা যায় তা কেবল ‘মায়া’, অর্থাৎ একটি বিভ্রম বা প্রতিফলন মাত্র।
২) মায়া ও সুফিবাদ
আমাদের চোখে যা কিছু আলাদা বা ভিন্ন ভিন্ন মনে হয়, এই দর্শনে তাকে বলা হয় 'মায়া'। অর্থাৎ, সত্য আসলে একটাই, কিন্তু তা আমাদের কাছে ভিন্ন ভিন্ন রূপে ধরা দেয়। এই চিন্তাধারার প্রভাবেই কিছু মুসলিম সুফিদের মধ্যে 'ওয়াহদাতুল ওজুদ'-এর মতো চরমপন্থী বা অতিরঞ্জিত ধারণাগুলোi বিস্তার লাভ করে। যদিও সুফিদের ধারণা এবং অদ্বৈতবাদের মধ্যে কিছু মৌলিক পার্থক্য রয়েছে যা নিয়ে সামনে আলোচনা করা হবে।
সংঘের চিন্তাবিদরা তত্ত্বকে তার চিন্তা পদ্ধতির ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেন এবং চেয়েছিলেন যে সমস্ত মানুষ এটি স্বীকার করে নিক।
বর্তমানে দারা শিকোহ এবং কিছু মুসলিম সুফিদের চিন্তাধারাকে জনপ্রিয় করার পেছনে যে প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে, তার পেছনেও এই একই উদ্দেশ্য কাজ করছে। দৃশ্যত এটি একটি আধ্যাত্মিক দৃষ্টিভঙ্গি মনে হলেও, এর যেভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে এবং হচ্ছে, তা থেকে গভীর সামাজিক, ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক, আইনি এমনকি রাজনৈতিক ফলাফলও বেরিয়ে আসে। একজন মুসলিম সাংবাদিক জিলানী গোলওয়ালকর-এর বিস্তারিত সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন—যা আজ ব্যাপকভাবে প্রচারিত—সেখানে তিনি বলেছিলেন:
"আপনি একে অদ্বৈত বা যা খুশি বলতে পারেন, কিন্তু এই দর্শন না হিন্দুদের, না মুসলমানদের (অর্থাৎ এটি সবার)। এর নির্যাস হলো—অস্তিত্ব কেবল একটি। সেটিই একমাত্র সত্য। সেটিই প্রকৃত আনন্দ। সেটিই স্রষ্টা, পালনকর্তা এবং ধ্বংস করার ক্ষমতা রাখে। আমাদের মাঝে ঈশ্বরের যত বিচিত্র ধারণা বিদ্যমান, তা মূলত সেই পরম সত্যেরই সীমিত প্রকাশ। এই পরম সত্যের ভিত্তি আমাদের সবাইকে একসূত্রে বেঁধে দেয়। এই সত্য নিজেকে কোনো বিশেষ ধর্মের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখে না। ধর্ম কেবল উপাসনার একটি পদ্ধতি মাত্র।"
গোলওয়ালকরের এই দার্শনিক ভিত্তি ‘ইন্টিগ্রাল হিউম্যানিজম’ (Integral Humanism) বা ‘একাত্ম মানবতাবাদ’ একটি রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামো হিসেবে সামনে আসে। তিনি ব্যক্তিবাদের পশ্চিমা ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করেন। তার মতে, সমাজ ব্যক্তিদের মধ্যে কোনো সামাজিক চুক্তির ফলাফল নয় (যেমনটা পশ্চিমা সমাজবিজ্ঞানীরা দাবি করেন), বরং সমাজ নিজেই একটি জীবন্ত সত্তা। এর একটি নিজস্ব আত্মা আছে। এর চারটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো—দেহ, মন, বুদ্ধি এবং আত্মা। এই চারটির সাথে চার ধরনের প্রচেষ্টা (পুরুষার্থ) জড়িত, যা তিনি বর্ণনা করেছেন: অর্থ (অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা), কাম (ইচ্ছার তৃপ্তি), ধর্ম (নৈতিকতা) এবং মোক্ষ (মুক্তি)। এই সবগুলি একে অপরের সাথে যুক্ত। আধুনিক পশ্চিমা ধারণাগুলো যেহেতু কেবল দেহ ও মনকে প্রাধান্য দিয়েছে, তাই তারা ব্যর্থ হয়েছে। ব্যক্তির মতো সমাজেরও একটি আত্মা থাকে যাকে তিনি ‘চিতি’ নাম দিয়েছেন। মানুষের আত্মা যখন তার পূর্ণতা অর্জন করে, তখন তা পরমাত্মায় বিলীন হয়ে যায়, যা মানুষের চূড়ান্ত লক্ষ্য। এটি অর্জনের জন্য বিভিন্ন ধর্মীয় পথ বর্ণনা করা হয়েছে। যার যে পথ পছন্দ, সে সেই অনুযায়ী তার লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে বা নিজের পথ নিজেই তৈরি করে নিতে পারে। হিন্দুস্তানি সভ্যতা এই চারটি বিষয়ের সমন্বয়কে তুলে ধরে।
ব্যক্তি, সমাজ, প্রকৃতি এবং মহাবিশ্ব—এগুলো চেতনার চারটি স্তর। কিন্তু এদের মধ্যে কোনো পারস্পরিক বিরোধ নেই, বরং এদের মধ্যে এক গভীর সুসংগতি বিদ্যমান। এদের মধ্যকার ভারসাম্যই হলো 'ধর্ম'। তিনি (গোলওয়ালকর) এই নীতিগুলোর ভিত্তিতে একটি রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থার খসড়া পেশ করেছিলেন, যা তার মতে হিন্দুস্তানি সভ্যতার আত্মার সাথে পুরোপুরি সংগতিপূর্ণ। এই খসড়াকেই বিজেপি তাদের রাজনৈতিক আদর্শ হিসেবে গণ্য করে।
সংঘের (RSS) বর্তমান সরসংঘচালক মোহন ভগবত হিন্দুস্তানি ধর্মীয় চিন্তাধারা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে বলেছেন যে, এখানে অনেক মতভেদ থাকলেও কয়েকটি বিষয়ে পূর্ণ ঐক্য রয়েছে। এই ঐক্যই মূলত 'হিন্দুত্ববাদ'কে প্রকাশ করে। তিনি এই ঐক্যকে পাঁচটি মূলনীতির মাধ্যমে বর্ণনা করেছেন, যার মধ্যে চতুর্থ নীতিটি হলো:
"তুমি পূর্ণ অস্তিত্বের একটি অংশ। তোমার গঠন এই পূর্ণ অস্তিত্ব থেকেই হয়েছে। দেহ আমি পিতা-মাতার কাছ থেকে পেয়েছি, সংস্কৃতি পেয়েছি পরিবারের মাধ্যমে, শিক্ষা সমাজ ও শিক্ষকদের মাধ্যমে পেয়েছি। যে পোশাক আমি পরি, তা কেউ কাটছে, কেউ বুনছে। কৃষক সেই জমি চাষ করছে যা আমাদের তুলার জোগান দিচ্ছে। আপনি এই মহাবিশ্বের সাথে যুক্ত। আপনাকে এর জন্য সহযোগিতা করতে হবে এবং এর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকতে হবে। সেই 'এক' (অস্তিত্ব) কী? যখন এর বিশ্লেষণ শুরু হয়, তখন কেউ তাকে উপাস্য মনে করে, কেউ শক্তি মনে করে, আবার কেউ তাকে পূর্ণ সত্তা মনে করে। পারস্পরিক মতভেদও হয়, একে অপরের সমালোচনা ও বিরোধিতাও হয়—কিন্তু কেউ কাউকে শেষ করে দেয় না। (এটাই হিন্দুত্ববাদ)।"
আধুনিক পশ্চিমা দর্শনেও একটি প্রবণতা রয়েছে যাকে অর্গানিসিজম (Organicism) বা জৈববাদ বলা হয়। এর মতে, মহাবিশ্ব এবং মানব সমাজ একটি জীবন্ত সত্তা। সমস্ত আলাদা আলাদা বস্তু বা ব্যক্তি কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়, বরং তারা একই জীবন্ত অস্তিত্বের অংশ। ব্রিটিশ দার্শনিক থমাস হবস বলেছিলেন যে, রাষ্ট্র হলো একটি সেক্যুলার ঈশ্বর এবং নাগরিকদের সে নিজের ভেতরে ধারণ করে একটি জীবন্ত অস্তিত্বে রূপ দেন। বেদান্তের প্রাচীন দর্শনের পাশাপাশি এই আধুনিক পশ্চিমা দর্শনগুলোও সংঘের চিন্তাবিদদের প্রভাবিত করেছে।
এই জৈববাদী দর্শনের ফলে ব্যক্তির গুরুত্ব কমে যায় এবং বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীর গুরুত্বও হ্রাস পায়। আসল গুরুত্ব পায় সেই বিশাল 'জৈব অস্তিত্ব', যাকে এই লোকেরা 'রাষ্ট্র' বলে অভিহিত করে। ব্যক্তি এবং সামাজিক গোষ্ঠীগুলো সেই বিশাল অস্তিত্বের কেবল ক্ষুদ্র অঙ্গ বা যন্ত্রাংশে পরিণত হয়। তাদের ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত স্বার্থের আর কোনো আলাদা গুরুত্ব থাকে না। সংঘের চিন্তাধারা ও অবস্থানের ওপর এই বিশেষ চিন্তা পদ্ধতির গভীর প্রভাব স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা যায়। এটি পরিষ্কার যে, জৈববাদের এই দর্শনকে সমস্ত হিন্দুস্তানিদের অভিন্ন দর্শন হিসেবে পেশ করা যায় না। ইসলামসহ অনেক ধর্মের আকিদা ও শিক্ষার সাথে এটি সরাসরি সাংঘর্ষিক।ii কিন্তু সংঘের চিন্তাবিদরা একে একটি ঐক্যবদ্ধকারী এবং অভিন্ন দর্শন হিসেবে উপস্থাপন করে থাকেন।
হিন্দু জাতি বা ভারত মাতা
এই সমস্ত চিন্তাবিদদের মধ্যে একটি সাধারণ ধারা হলো চরমপন্থী জাতীয়তাবাদ। জাতীয়তাবাদ মূলত একটি আধুনিক ইউরোপীয় চিন্তা যা জাতি (nation), বংশধারা (ethnicity), জাতীয় সার্বভৌমত্ব (national sovereignty) এবং স্বায়ত্তশাসিত রাষ্ট্র (state)-এর মতো ধারণার সমন্বয়ে গঠিত। হিন্দু চিন্তাবিদগণ বেদের প্রাচীন দর্শনকে এই আধুনিক পশ্চিমা দর্শনের সাথে মিলিয়ে একটি জগাখিচুড়ি তৈরি করেছেন। অনেক জায়গায় এই ধারণাটি বেশ অস্পষ্ট এবং ধোঁয়াশাপূর্ণ হয়ে পড়েছে।
এই প্রবণতার সূচনা হয় সাভারকর থেকে। সাভারকরের জাতীয়তাবাদের ধারণা আধুনিক ইউরোপীয় ধারণার বেশ কাছাকাছি ছিল। তিনি হিন্দুস্তানের আদি বাসিন্দাদের একটি ‘জাতি’ মনে করতেন। হিন্দু তাঁর কাছে সেই জাতির নাম, যার সদস্যরা ভৌগোলিক ঐক্যের পাশাপাশি বংশগত অংশীদারিত্ব এবং সাংস্কৃতিক ঐক্যের বন্ধনে একে অপরের সাথে জড়িত। যারা ইসলাম বা খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেছে, তাদের তিনি এক আলাদা জাতি হিসেবে গণ্য করতেন। [19]
পরবর্তীতে যখন অস্তিত্বের ঐক্যের এই তত্ত্ব রাজনৈতিক ভাষা ধারণ করল, তখন তা ‘হিন্দুত্বের ঐক্যে’ রূপান্তরিত হলো। গোলওয়ালকর পরিষ্কার করেছেন যে, প্রাচীন দর্শন অনুযায়ী মানুষ বলতে হিন্দু জনগণকেই বোঝানো হয়েছে। হিন্দুস্তানে বসবাসকারী সমস্ত মানুষ একটি পবিত্র সত্তার অংশ। সমগ্র মহাবিশ্ব ঈশ্বরের ওপর পরিব্যাপ্ত। সূর্য ও চাঁদ তাঁর চোখ। নক্ষত্ররাজি তাঁর নাভি থেকে নির্গত হয়েছে। ব্রাহ্মণ তাঁর মাথা, রাজা তাঁর হাত, বৈশ্য তাঁর উরু এবং শূদ্র তাঁর পা। সমস্ত হিন্দু জনগণই তাঁর অংশ, তাই তারা ঐশ্বরিক গুণসম্পন্ন। তাঁদের সেবা করাই ঈশ্বরের সেবা। তাঁদের মধ্যে বিভেদ করা নেই। [20]
তাঁদের মতে হিন্দুস্তানি জনগণের এই দেবত্বের বহিঃপ্রকাশ ঘটে ‘ভারত মাতা’র মাধ্যমে, যা কেবল একটি মূর্তিমাত্র নয় বরং এক জীবন্ত দেবতা (living god)। এটি ঈশ্বরের একটি চিহ্নও বটে এবং ভারতীয় জনগণ মূলত এক এবং অভিন্ন অস্তিত্বের অংশ। তাই তারা পবিত্র। (সুবহানাল্লাহি আম্মা ইয়াসিফুন)
গোলওয়ালকরের মতে:
লোকেরা মন্দিরে যায় এবং সেখানকার মূর্তিতে মনোনিবেশ করার চেষ্টা করে—(একথা ভেবে যে) এগুলো ঈশ্বরের নিদর্শন। এক নিরাকার (shape-less) এবং গুণহীন (attribute-less) ঈশ্বরের ধারণা আমাদের কোথাও নিয়ে যায় না। কিন্তু আমরা যেভাবে সক্রিয় এবং প্রাণবন্ত জীবন চাই, তাতে কেবল এটি দিয়ে সবাই সন্তুষ্ট হতে পারে না। আমাদের একজন ‘জীবন্ত ঈশ্বর’ (living god) প্রয়োজন। [21]
পরবর্তী পংক্তিগুলোতে তিনি এই হিন্দু জাতিকে সেই জীবন্ত ঈশ্বর হিসেবে স্বীকার করেছেন। [22]
আরও লিখেছেন:
হিন্দুস্তানের এই পবিত্র ভূখণ্ড হিমালয়ের পর্বতমালা থেকে ভারত মহাসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত। ভারত মাতা হাজার হাজার বছর ধরে নিজের দুই হাত দুই সমুদ্রে ডুবিয়ে রেখেছেন। তাই (পশ্চিম ও পূর্বে) এর সীমানা ইরান থেকে সিঙ্গাপুর পর্যন্ত বিস্তৃত এবং দক্ষিণে শ্রীলঙ্কা আসলে তাঁর চরণে নিবেদিত একটি পদ্মফুল। [23]
এটিই সেই ধারণা যার বহিঃপ্রকাশ বঙ্কিমচন্দ্র চ্যাটার্জির সঙ্গীত ‘বন্দে মাতারাম’-এ হয়েছে এবং এরই মাধ্যমে ভারত মাতার দেবীত্ব, তাঁর পূজা এবং তাঁর জয়ধ্বনির ঐতিহ্য তৈরি করা হয়েছে। আর এই মতাদর্শের প্রশিক্ষণ ও সে অনুযায়ী মানসিকতা তৈরির চেষ্টা আরএসএস (RSS)-এর শাখাগুলোতে করা হয়, যেখানে শাখার সূচনা সাধারণত একটি বিশেষ প্রার্থনা দিয়ে হয় যার প্রারম্ভিক শব্দগুলো হলো— হে মাতৃভূমি, আমি চিরকাল তোমার সামনে মাথা নত করছি।
এই আলোচনা থেকে বোঝা যায় যে, হিন্দুত্বের চিন্তা ব্যবস্থায় দেশ বা জাতির প্রতি কেবল ভালোবাসা যথেষ্ট নয়, বরং একে ঈশ্বর মনে করে এবং ঈশ্বরের রূপ হিসেবে এর পূজা করাও জরুরি।
হিন্দু বা ভারতীয় জাতি কারা?
এখন প্রশ্ন জাগে যে, সেই ‘পবিত্র জনগণ’ কারা যাদের নিয়ে হিন্দুস্তানি জাতি গঠিত হয় অথবা যাদের হিন্দু বলা হচ্ছে? এটি নির্ধারণ করা এজন্য জরুরি যে, এই আন্দোলনের চিন্তাধারার পুরো ভিত্তি এরই ওপর দাঁড়িয়ে আছে। সংঘের বর্তমান চিন্তাবিদগণ এই ব্যাখ্যা দেন যে, তাদের পুরো জাতির নাম হিন্দু এবং তারা সবাইকে হিন্দু মনে করেন। কিন্তু কেউ যদি হিন্দু শব্দটিকে কোনো ধর্মের নাম মনে করে এবং নিজেকে হিন্দু বলে পরিচয় দিতে না চায় বরং ‘ভারতীয়’ হিসেবে পরিচয় দিতে চায়, তবে তাতে কোনো আপত্তি নেই। যাই হোক, সে এই জাতিরই অংশ। [24]
কিন্তু এই জাতির সংজ্ঞা কী? ভারতের প্রতিটি নাগরিক কি এই জাতির অংশ? এই প্রশ্নেই মূলত আসল বিভ্রান্তি রয়েছে। এই বিষয়ে তো একমত যে, যারা বিভিন্ন হিন্দুস্তানি ধর্ম অনুসরণ করে তারা সবাই এর অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু যারা খ্রিস্টধর্ম বা ইসলাম অনুসরণ করে, তারাও কি হিন্দুস্তানি জাতির অংশ? এই প্রশ্নটি এই চিন্তাবিদদের প্রথম দিন থেকেই দুশ্চিন্তায় ফেলে রেখেছে।
সাভারকর 'হিন্দু'-র জাতীয়তাবাদী সংজ্ঞা খুব স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করেছিলেন। তাঁর মতে, হিন্দু বলতে কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের অনুসারীদের বোঝায় না, বরং তাদের সকলকেই বোঝায় যাদের তিনটি বৈশিষ্ট্য রয়েছে: ভারতে জন্ম (জাতি), ভারতীয় বংশে জন্ম (বর্ণ), এবং ভারতীয় সংস্কৃতি গ্রহণ (সংস্কৃতি)। [25] ভৌগোলিকভাবে এবং জাতিগতভাবে, মুসলমান এবং খ্রিস্টানরাও এই সংজ্ঞার সাথে খাপ খায়। কিন্তু সংস্কৃতি বলতে কী বোঝায়? যদি সংস্কৃতি বলতে ভাষা, জীবনধারা, খাদ্য, কবিতা, স্থাপত্য ইত্যাদি বোঝায়, তবে এর বেশিরভাগ উপাদানও সাধারণ, কিন্তু সাভারকরের মতে, সংস্কৃতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ হল আচার-অনুষ্ঠান, প্রথা এবং উৎসব। অতএব, সাংস্কৃতিক সাধারণতা বলতে দীপাবলি, দশেরা এবং কুম্ভ ও অন্যান্য মেলার মতো উৎসবের সাধারণতা বোঝায়। [26] এই সংজ্ঞা অনুসারে, মুসলমানরা জাতির এই সংজ্ঞা থেকে বাদ।
সাভারকরের মতে, এই জাতির অংশ হওয়ার আরও একটি শর্ত আছে। আর তা হলো তারা এই দেশের ভূমিকে পিতৃভূমি (fatherland) এবং পুণ্যভূমি (holyland) হিসেবে স্বীকার করবে। [27] পবিত্র নদীসমূহ এখানে প্রবাহিত হবে, পবিত্র স্থানসমূহ এখানেই অবস্থিত হবে। যেসব বীর ও ঐতিহাসিক চরিত্রের ওপর তারা গর্ব করে, তাদের সম্পর্কও এই ভূমির সাথেই হতে হবে। স্পষ্টতই এই শর্তে মুসলমান ও খ্রিস্টানরা পুরোপুরি উত্তীর্ণ হতে পারে না।
গোলওয়ালকর সাভারকরের চিন্তাধারাকে হিন্দু জাতির সবচেয়ে বৈজ্ঞানিক সংজ্ঞা হিসেবে অভিহিত করেছেন এবং মুসলমান ও খ্রিস্টানদের সমস্যার সমাধান হিসেবে বলেছেন যে, তারা হিন্দু জাতির মধ্যে বিলীন (assimilate) হয়ে যাবে। অর্থাৎ তারা তাদের ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও ধর্মীয় রীতি অবশ্যই পালন করতে পারবে, কিন্তু আলাদা সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং বিদেশের পবিত্র স্থানসমূহের প্রতি ভক্তির আবেগ পরিহার করে নিজেদের উপর্যুক্ত সংজ্ঞার ছাঁচে গড়ে নিতে হবে, যাতে তারা হিন্দুস্তানি জাতির অংশ হতে পারে। [28]
পবিত্র ভূমিকে (পুণ্যভূমি) জাতীয় পরিচয়ের সাথে যুক্ত করার এই দর্শন এই আন্দোলনের চিন্তাধারার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অটল বিহারী বাজপেয়ীকে এই আন্দোলনের একজন উদার ও মধ্যপন্থী ব্যক্তিত্ব হিসেবে গণ্য করা হয়। তিনিও লিখেছেন:
"এই দেশের মুসলমানদের সাথে তিন ধরণের আচরণ করা সম্ভব। এক হলো তিরস্কার অর্থাৎ তারা যদি নিজেদের পরিবর্তন না করে তবে তাদের একাকী ছেড়ে দাও, বর্জন করো এবং নিজের বিরোধী মনে করো। দ্বিতীয়টি হলো পুরস্কার অর্থাৎ তোষামোদের নীতি, তথা তাদের ঠিক রাখার জন্য ঘুষ দাও—যা বর্তমান কংগ্রেস করছে। তৃতীয় পদ্ধতি হলো পরিষ্কার অর্থাৎ তাদের পরিবর্তন করা, তাদের আদব-কায়দা (সংস্কার) শেখানো এবং জাতীয় মূলধারায় শামিল করা। আমরাও এটাই করতে চাই। তাদের ধর্ম পরিবর্তন করা হবে না। তারা তাদের ধর্ম পালন করতে পারে। মক্কা তাদের কাছে পবিত্র স্থান হতে পারে, কিন্তু ভারত সেই স্থানের চেয়েও বেশি পবিত্র হওয়া উচিত। আপনারা মসজিদে যান, নামাজ পড়ুন, রোজা রাখুন—তাতে আমাদের কোনো আপত্তি থাকবে না। কিন্তু মক্কা এবং হিন্দুস্তানের মধ্যে একজনকে বেছে নেওয়ার প্রশ্ন যখন আসবে, তখন আপনাদের সবসময় হিন্দুস্তানকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। সমস্ত মুসলমানদের মধ্যে এই আবেগ থাকা উচিত যে আমরা হিন্দুস্তানের জন্য বাঁচব এবং এর জন্যই মরব।" [29] (উগ্র জাতীয়তাবাদের কী চরম উত্থান!)
আরএসএস-এর বর্তমান চিন্তাবিদগণ এই চিন্তাধারা থেকে ভিন্নমত পোষণ করেন অথবা এর নতুন ব্যাখ্যা প্রদান করেন। 'বাঞ্চ অফ থটস' (Bunch of Thoughts)-কে তাঁদের কেউ কেউ গোলওয়ালকরের রচনা বলে স্বীকারই করেন না। আবার কেউ বলেন এই বইটি সেই সময়ে লেখা হয়েছিল যখন তিনি আরএসএস-এর কোনো পদে ছিলেন না এবং এটি সংঘের চিন্তাধারার প্রতিনিধিত্ব করে না। মোহন ভগবত বলেন:
"বিশেষ প্রেক্ষাপটে বা কোনো ঘটনার প্রেক্ষিতে কিছু কথা বলা হয়। এমন কথা সব সময়ের জন্য সঠিক হতে পারে না। আমরা চিরন্তন গুরুত্বসম্পন্ন চিন্তাধারাগুলোকে 'Shri Guruji: His Vision and Mission' শিরোনামে আলাদাভাবে প্রকাশ করেছি। এতে সেই সব কথা আছে যা সর্বকালের জন্য বিবেচ্য। আর যেসব কথা বিশেষ পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে বলা হয়েছিল, সেগুলো বাদ দেওয়া হয়েছে।"
আরএসএস-এর অনুসারীরা এও দাবি করেন যে, গোলওয়ালকরের চিন্তাধারা তেমন ছিল না যা উপরোক্ত উদ্ধৃতিগুলো থেকে বোঝা যায়। এর প্রমাণ হিসেবে জিলানিকে দেওয়া তাঁর সাক্ষাৎকারটি উপস্থাপন করা হয়।
ডাক্তার জিলানি জিজ্ঞেস করেছিলেন: ‘ইন্ডিয়ানাইজেশন’ (Indianisation/হিন্দুস্তানিকরণ) সম্পর্কে অনেক কিছু বলা হয়েছে এবং এখনও অনেক বিভ্রান্তি রয়ে গেছে। আপনি কি বলতে পারেন কীভাবে এই বিভ্রান্তি দূর করা সম্ভব? গোলওয়ালকর উত্তর দিয়েছিলেন:
"জি হ্যাঁ, হিন্দুস্তানিকরণ আমাদের শ্লোগান হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে বিভ্রান্তির কী আছে? এর মানে মোটেও এই নয় যে সব মানুষকে হিন্দু ধর্মে নিয়ে আসা হবে। এটি বোঝা প্রয়োজন যে আমরা সবাই এই মাটির সন্তান এবং এই মাটির প্রতি আমাদের আনুগত্য থাকা উচিত। আমাদের সমাজ এক এবং আমাদের পূর্বপুরুষরাও এক ছিলেন। আমাদের আকাঙ্ক্ষাও এক। এই চেতনা জাগ্রত করাই হলো হিন্দুস্তানিকরণ। এর মানে কোনো ধর্ম ত্যাগ করা নয়। আমরা এ কথা কখনও বলিনি এবং বলবও না। বরং আমরা বিশ্বাস করি যে, সমস্ত মানব সমাজের জন্য একটি মাত্র ধর্মীয় ব্যবস্থা উপযুক্ত নয়।" [30]
এও বলা হয়েছে যে, গোলওয়ালকরের হিন্দু জাতির ধারণা ছিল একটি সাংস্কৃতিক ধারণা। এর সাথে রাষ্ট্রের (state) কোনো সম্পর্ক নেই। শাসক যা-ই হোক এবং রাষ্ট্র যেমনই হোক, আমরা সবাই একই সংস্কৃতির বাহক এবং একটি জাতি। [31]
আরএসএস-এর বর্তমান প্রধান মোহন ভগবত আরও ব্যাখ্যা করে বলেছেন:
"ধর্ম ও সংস্কৃতির ঊর্ধ্বে উঠে সেই সমস্ত মানুষ যারা জাতীয় চেতনা ধারণ করে এবং ভারতের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে সম্মান করে, তারা সবাই হিন্দু। আরএসএস এই দেশের সমস্ত ১৩০ কোটি বাসিন্দাকে হিন্দু মনে করে এবং আমরা এভাবেই একটি ঐক্যবদ্ধ সমাজ গঠন করতে চাই।" [32]
এটি বর্তমান প্রধানের একটি কূটনৈতিক বিবৃতি। উপরের বিস্তারিত আলোচনা থেকে স্পষ্ট যে, এই চিন্তাধারায় হিন্দু রাষ্ট্র বা ভারতীয় জাতির অংশ কেবল তাদেরই মনে করা হয় যারা ভারত মাতার পূজা করে, দেশকে পবিত্র মনে করে, 'অস্তিত্বের ঐক্যে' বিশ্বাসী এবং সমস্ত ধর্মকে সত্য মনে করে। যারা এগুলো মানে না, তারা তাদের সংস্কার বা সংশোধন চায়। যখন সংশোধন হবে, তখন তারা এই জাতির অংশ হতে পারবে।
সেমিটিক চিন্তাধারার (Semitic Thought) বিরোধিতা
এই দৃষ্টিভঙ্গিটি সেই সমালোচনাগুলো থেকে আরও স্পষ্ট হয় যা সংঘের আদর্শিক প্রবক্তারা এমন এক চিন্তাধারার ওপর করেন যাকে তারা ‘সেমিটিক চিন্তাধারা’ (Semitic Thought) বলে অভিহিত করেন। গোলওয়ালকর এ বিষয়ে নিজের অপছন্দ প্রকাশ করে লিখেছিলেন:
"সেইসব ধর্ম যারা একটি কিতাব, একজন পয়গম্বর এবং একজন ঈশ্বরে বিশ্বাস রাখে, আর মনে করে যে এগুলোকে না মেনে মানুষের আত্মার মুক্তি সম্ভব নয় (সেটাই আসল সমস্যা)। এই দৃষ্টিভঙ্গির অযৌক্তিকতা বোঝার জন্য অসাধারণ বুদ্ধিবৃত্তির প্রয়োজন নেই।" [33]
ভারতের ক্ষেত্রে যেখানে প্রশ্ন আসে, এখানে ঈশ্বরকে যে কোনো নামেই ডাকা হোক না কেন তাতে কোনো আপত্তি থাকা উচিত নয়। এই মাটির মেজাজেই এই কথাটি মিশে আছে যে, এখানে সকল ধর্মের সমান শ্রদ্ধা এবং তাদের প্রতি ভালোবাসা পাওয়া যায়। অন্যদের বিশ্বাস বা ধর্মের ব্যাপারে অসহিষ্ণুতা পোষণকারী কোনো ব্যক্তি এই মাটির সন্তান হতে পারে না। [34]
আরেকজন হিন্দু চিন্তাবিদ লিখেছেন:
"গতানুগতিকভাবে সেমিটিক চিন্তাধারা মানুষকে দুই ভাগে ভাগ করে দেখে। একদল তারা যারা কোনো নির্দিষ্ট বিশ্বাসকে গ্রহণ করে এবং অন্য দল তারা, যারা তা গ্রহণ করে না। যারা তা গ্রহণ করে না তাদের সম্পর্কে মনে করা হয় যে তারা শয়তানের বন্ধু ও কাফের এবং তাদের জীবিত থাকারও অধিকার নেই। এই বর্জনমূলক (exclusivist) চিন্তাধারা সেইসব (পশ্চিমা) মতবাদগুলোর ওপরও প্রভাব ফেলেছে যা এই (সেমিটিক) অঞ্চলে বিকশিত হয়েছে। আর এই (মতবাদগুলোর অনুসারী) মানুষগুলো এমন সকল মানুষকে নিজেদের বিরোধী মনে করতে শুরু করে যারা তাদের চিন্তার সাথে একমত নয়। অর্থাৎ আপনি যদি কমিউনিস্ট না হন তবে আপনার বামপন্থী হওয়া একটি লজ্জাজনক বিষয়।" [35]
সংঘের জীবনদর্শন বোঝার ক্ষেত্রে এই দৃষ্টিভঙ্গির বড় কেন্দ্রীয় গুরুত্ব রয়েছে। তাঁদের মতে সবচেয়ে বড় মন্দ কাজ হলো এই যে—মানুষ অন্যের ধর্মকে ভুল মনে করবে এবং ধর্মকে কোনো একটি প্রামাণ্য কিতাব বা ব্যক্তিত্বের সাথে সম্পৃক্ত করবে। তারা একে হিন্দুস্তানি চিন্তাধারার পরিপন্থী মনে করে এবং সেমিটিক, পশ্চিমা বা এমন এক চিন্তাধারা মনে করে যা এই দেশের জন্য একেবারেই অপরিচিত। তারা এই চিন্তাধারাকেই বহু সমস্যার মূল মনে করে।
ইসলাম এবং খ্রিস্টধর্মের প্রতি তাদের বিরোধিতার কারণও এটিই যে, তারা মনে করে এই ধর্মগুলো নিজের ছাড়া অন্য কাউকে সঠিক মনে করে না; বরং (অন্যদের) কাফের ও পথভ্রষ্ট মনে করে। তাই তারা অন্যদের কখনোই সম্মান ও শ্রদ্ধা দিতে পারে না।
হিন্দুত্ব এবং হিন্দু রাষ্ট্রের ধারণাসমূহ
এই মৌলিক আলোচনাগুলো থেকে হিন্দুত্ব এবং হিন্দু রাষ্ট্রের ধারণা বোঝা এখন সহজ হয়ে গিয়েছে। সংঘের চিন্তাবিদদের যুক্তি হলো—হিন্দু কোনো ধর্মের নাম নয়। এখানে সনাতন ধর্ম, বৌদ্ধ ধর্ম, জৈন ধর্ম এবং শিখ ধর্ম ইত্যাদি সমস্ত ধর্মই পাওয়া যায়। তাহলে হিন্দু কী? তাঁরা বলেন যে, হিন্দু একটি জীবনপদ্ধতি এবং একটি সাংস্কৃতিক ব্যবস্থার নাম। এজন্য তাঁরা মানুষকে হিন্দু ধর্ম বা ‘হিন্দুত্ববাদ’ (Hinduism) বলার ক্ষেত্রেও তীব্র আপত্তি জানান। তাঁদের বক্তব্য হলো—‘ইজম’ (Ism) বা ‘বাদ’-এর মানেই হলো আপনি কোনো নির্দিষ্ট চিন্তাধারা বা মতবাদের ঝাণ্ডাবাহী এবং বাকি মতবাদগুলোকে ভুল মনে করেন; অথচ এই ধরনের চিন্তা হিন্দুত্বের মেজাজের পরিপন্থী। এজন্য তাঁরা ‘হিন্দুত্ব’ (Hindutva) পরিভাষাটি ব্যবহার করেন, যার অর্থ ‘হিন্দু হওয়া’ বা ‘Hinduness’।
হিন্দুত্ব পরিভাষাটি সর্বপ্রথম বাঙালি সাহিত্যিক ও লেখক চন্দ্রনাথ বসু (মৃত্যু: ১৯১০) ঊনবিংশ শতাব্দীতে ব্যবহার করেছিলেন। কিন্তু একে জনপ্রিয় করার কৃতিত্ব সাভারকরের, যিনি একে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করেন এবং এর ভিত্তিতে হিন্দু জাতিকে একটি বিশেষ পরিচয় দেওয়ার চেষ্টা করেন। হিন্দুত্বের মূলনীতিগুলোর ব্যাখ্যা উপরে এসেছে। এর মৌলিক ভিত্তি হলো সত্যের আপেক্ষিকতার ধারণা— ekam sat, viprah bahudha vadanti (অর্থাৎ সত্য এক, একে বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠী বিভিন্নভাবে বর্ণনা করে)। গোলওয়ালকর একে ‘হিমালয়সম গুরুত্ব’ দিয়েছেন এবং সংঘের মৌলিক চিন্তাধারা হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন। [37]
যখন হিন্দু কোনো ধর্ম বা মতবাদের নাম নয়, তবে হিন্দু রাষ্ট্র কী এবং কোন মূলনীতির ভিত্তিতে তা গঠিত হবে? এই প্রশ্নটি সবসময় এই চিন্তাবিদদের সামনে এসেছে। এর জবাবে তাঁরা বলেন যে, হিন্দু রাষ্ট্রের মানে কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের মানুষকে প্রাধান্য দেওয়া বা কোনো ধর্মের শিক্ষা প্রয়োগ করা নয়, বরং হিন্দুত্ব তথা নিজেদের জীবনপদ্ধতির বিকাশ ঘটানো। যেমন মনমোহন বৈদ্য লেখেন:
"রাষ্ট্র একটি বৈদিক পরিভাষা এবং পশ্চিমা জাতীয়তাবাদের ধারণা থেকে এটি সম্পূর্ণ আলাদা। পশ্চিমা জাতীয়তাবাদের ধারণা রাষ্ট্রের ক্ষমতার ওপর কেন্দ্রীভূত, পক্ষান্তরে রাষ্ট্রের ধারণা নির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের সাথে সম্পৃক্ত। এতে কারও ওপর কোনো কিছু চাপিয়ে দেওয়া বা জুলুম করার কোনো অবকাশ নেই। এজন্য ধর্মরাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রের শব্দগুলো ভারতের প্রেক্ষাপটে অপ্রাসঙ্গিক। এখানে ‘রাষ্ট্রীয়তা’ শব্দ ব্যবহার করা হয়—ভারতের রাষ্ট্রীয়তা।" [38]
যদি হিন্দুত্ব ধর্ম না হয় তবে একে ধর্ম কেন বলা হয়? এর জবাবে তাঁরা বলেন যে, হিন্দু দর্শনে ‘ধর্ম’-এর মানে তা নয় যা ‘রিলিজিয়ন’ (Religion) বা মজহাবের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। ধর্মের ব্যাখ্যাও প্রায় সমস্ত হিন্দুত্ববাদী চিন্তাবিদ একইরকম করেছেন। উদাহরণস্বরূপ, ধর্মের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তাঁরা লিখেন:
"আপনত্বের পরিধি বাড়িয়ে সবাইকে নিজের মনে করা এবং তাদের কল্যাণের জন্য কাজ করাই ধর্ম। ধর্মের মানে ধর্মীয় চিহ্ন পরিধান করা বা মন্দির কিংবা কোনো উপাসনালয়ে যাওয়া নয়, কিংবা কোনো বিশেষ সত্যের উপলব্ধি বা বিশেষ ধর্মীয় আচার পালন করাও ধর্ম নয়। এগুলো হলো উপাসনা (বা ইবাদত) যা ধর্মের পথে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে। ধর্মের মানে হলো আপনি সমাজের দিকে ফিরে তাকান এবং একে (উপকারের মাধ্যমে) প্রতিদান দিন, সমাজের প্রতি নিজের দায়িত্ব পালন করুন এবং সামাজিক সম্পদকে সমৃদ্ধ করুন।" [39]
ভারত হিন্দু রাষ্ট্র—এ কথা বলার মানে এই নয় যে আমরা এতে মুসলমানদের চাই না। যেদিন এ কথা বলা হবে যে এই রাষ্ট্রে মুসলমানদের জন্য কোনো জায়গা নেই, সেদিন হিন্দুত্ব আর অবশিষ্ট থাকবে না। হিন্দুত্বের আদর্শ অনুযায়ী তো গোটা বিশ্বই একটি পরিবার। [40]
সংঘের চিন্তাবিদদের বক্তব্য হলো—হিন্দুস্তান কখনোই ধর্মীয় রাষ্ট্র ছিল না এবং সেমিটিক ধারণার মতো ‘ধর্মীয় রাষ্ট্র’ (Theocratic State) হওয়ার সুযোগও এর নেই। এখানে সবসময় বিভিন্ন ধরণের ধর্মীয় ঐতিহ্য একসাথে চলে আসছে। এই সবগুলোকে একই সময়ে সঠিক বলে মনে করা হয়। সংঘের একজন চিন্তাবিদ থেকে উদ্ধৃত নিচের অনুচ্ছেদটি এই বিষয়ে বর্তমান অবস্থানের প্রতিনিধিত্ব করে:
"আরএসএস কখনোই বলেনি যে আমরা একটি নতুন হিন্দু রাষ্ট্র তৈরি করব অথবা সংবিধান পরিবর্তন করে এই দেশকে হিন্দু রাষ্ট্রে পরিণত করব। তা সত্ত্বেও হিন্দু এবং রাষ্ট্র নিয়ে সংঘের সাথে যুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে ভয়, ক্ষোভ এবং হতাশার ঢেউ লক্ষ্য করা যায়। উভয় পক্ষেই এই বিষয়ে তথ্য ও স্বচ্ছতার অভাব অনুভূত হয়। একদিকে এই বিষয়টি দুশ্চিন্তা, অস্থিরতা এবং অজানা জিনিসের প্রতি ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, অন্যদিকে এটি গর্ব এবং নিরাপত্তার এক কৃত্রিম অনুভূতি তৈরি করে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার মাধ্যম হয়। অথচ সংঘ আসলে বিশ্বাস করে যে, কোনো হিন্দু রাষ্ট্র গঠন করার প্রয়োজন নেই। ভারত আগে থেকেই হিন্দু রাষ্ট্র। হিন্দু এবং রাষ্ট্র শব্দগুলোর অর্থ বুঝলেই জানা যাবে যে, হিন্দু কোনো ধর্মের নাম নয় বরং এই অঞ্চলে বসবাসরত মানুষের দেশীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সমষ্টির নাম।" [41]
জাত-পাতের (বর্ণপ্রথা) সমস্যা
খ্রিস্টান ও মুসলমানদের সমস্যা ছাড়াও এই চিন্তাধারায় যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি অস্থিরতা তৈরি করেছে, তা হলো জাত-পাতের সমস্যা। সাভারকর আধুনিক যুগে জাত-পাতের ভিত্তিতে বিভাজনকে ভুল বললেও ‘চতুর্বর্ণ’ (চার বর্ণ) ব্যবস্থার প্রাচীন কাঠামোকে সমর্থন করেছেন। [42]
গুরু গোলওয়ালকরের চিন্তাধারায় এই বর্ণপ্রথার কেবল সমর্থনই নয়, বরং প্রশংসাও পাওয়া যায়। উদাহরণস্বরূপ, তিনি ইউরোপের ইতিহাস বিশ্লেষণ করে বলেন যে—সেখানের রক্তক্ষয়ী বিপ্লব, যুদ্ধ-বিগ্রহ, জুলুম-শোষণ এবং দাসত্বের মূল কারণ হলো রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তির এক জায়গায় কেন্দ্রীভূত হওয়া। তাই হিন্দু সমাজে (বর্ণাশ্রমের মাধ্যমে) রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তিকে আলাদা করে রাখা হয়েছে। যারা সম্পদ উপার্জন করে (বৈশ্য), তারা শাসক হতে পারবে না। যারা শাসন করে (ক্ষত্রিয়), তাদের হাতে সম্পদ থাকবে না এবং এই উভয় শক্তি অর্থাৎ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শক্তি একটি তৃতীয় ‘নির্লোভ শক্তি’ (ব্রাহ্মণ)-এর তত্ত্বাবধানে থাকবে, যাদের হাতে কোনো ক্ষমতা বা কর্তৃত্ব থাকবে না। তারা শক্তি ও লোভের সমস্ত মোহ থেকে ঊর্ধ্বে থেকে কেবল নিজেদের আধ্যাত্মিক ও নৈতিক শ্রেষ্ঠত্বের ভিত্তিতে এই বিষয়টি নিশ্চিত করবে যে, শাসক বা সম্পদশালী ব্যক্তিরা যেন কোনো অন্যায় না করে। [43] এই ধরণের অনেক কথা আমরা গোলওয়ালকরের লেখায় বিভিন্ন জায়গায় পাই।
এমনকি উপাধ্যায়ের ‘ইন্টিগ্রাল হিউম্যানিজম’ (Integral Humanism)-এ বর্ণপ্রথার সমর্থন ও পক্ষাবলম্বন লক্ষ্য করা যায়। তিনিও বলেন যে, এটি মূলত শ্রম বিভাজনের একটি মূলনীতি, যাতে সমাজের বিভিন্ন শাখা একে অপরের সাথে সহযোগিতা করে জাতিকে উপকৃত করতে পারে। তিনি লিখেছেন:সমাজে বিভিন্ন স্তর বা শ্রেণি পাওয়া যায়। এখানে (আমাদের দেশেও) বিভিন্ন জাতি বা গোষ্ঠী ছিল কিন্তু আমরা কখনো এক জাতি এবং অন্য জাতির মধ্যে সংঘাতের কল্পনা করিনি। চার বর্ণ আমাদের ধারণা অনুযায়ী এক ‘বিরাট পুরুষ’-এর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। এর মানে হলো—ব্রাহ্মণ সেই মহান সত্তার মাথা, ক্ষত্রিয় তাঁর হাত, বৈশ্য তাঁর পেট বা উরু এবং শূদ্র তাঁর পা। মানুষের মাথা, হাত, পেট এবং পায়ের মধ্যে কি কখনো কোনো সংঘাত হতে পারে? বর্ণপ্রথার সূচনা হয়েছিল এই চিন্তা থেকেই। যদি এই চিন্তা বা দর্শনকে বাঁচিয়ে না রাখা হতো, তবে বর্ণগুলো একে অপরের সহায়ক হওয়ার বদলে পারস্পরিক সংঘাত তৈরি করত। বর্তমানে যা ঘটছে তা মূলত এই প্রকৃত দর্শন থেকে বিচ্যুতি বা বিচ্যুতিরই ফলাফল। [44]
রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চিন্তা
এখানে আমরা সংক্ষেপে সেই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চিন্তাধারা পর্যালোচনা করব যা উপরোক্ত আদর্শিক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত এবং যা উপাধ্যায় তাঁর বক্তৃতায় বিস্তারিতভাবে স্পষ্ট করেছেন। বিজেপি (BJP) একেই নিজেদের দর্শন হিসেবে গণ্য করে। এটি সবচেয়ে কৌতূহলী অংশ, কারণ বর্তমান নীতিমালায় এই চিন্তাধারার কোনো প্রতিফলন দেখা যায় না।
উপাধ্যায় বলেন যে—যেহেতু সমস্ত ভারতীয় এবং ভারতীয়ত্ব একটি দেহেরই বিভিন্ন অঙ্গ, তাই এখানে কোনো সংখ্যালঘু বা সংখ্যাগরিষ্ঠ নেই। শরীরে যেমন একটি নাক এবং দুটি কান থাকে, তবে কি নাককে সংখ্যালঘু বলা হয়? বরং একে শরীরের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে গণ্য করা হয়। একইভাবে সংখ্যালঘুদের আলাদা করে দেখা উচিত নয়, বরং শরীরের অংশ হিসেবে দেখা উচিত। সেক্যুলার দলগুলো নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে সংখ্যালঘু ও সংখ্যাগরিষ্ঠের বিভাজন এবং বিভিন্ন শ্রেণির মধ্যে বিচ্ছিন্নতাবোধ তৈরি করেছে। এটি নির্মূল করতে হবে। [45]
অর্থনৈতিক উন্নয়নের নেহরু মডেল আসলে পশ্চিমা মডেল, যা বস্তুবাদের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। বস্তুগত সম্পদ বৃদ্ধি এবং শিল্পায়নের দৌড় ভারতে ‘ভোগবাদ’ (Consumerism)-এর জন্ম দিয়েছে। এর ফলে কেবল শ্রেণিগত বিভাজন এবং আঞ্চলিক বৈষম্যই তৈরি হয়নি, বরং দারিদ্র্যও বেড়েছে। সম্পদের রাষ্ট্রীয় মালিকানা দুর্নীতির সুযোগ দেয় এবং লাগামহীন পুঁজিবাদ লোভ ও সম্পদ কুক্ষিগত করার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ব্যক্তিগত মালিকানার সাথে সমাজের প্রতি পূর্ণ দায়িত্ববোধের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক চেতনা জাগ্রত করা উচিত। অন্ট্রোপ্রেনরশিপ বা উদ্যোক্তা মনোভাব নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিদের অধিকার এবং পিছিয়ে পড়া ও বঞ্চিত শ্রেণির জন্য কল্যাণমূলক পদক্ষেপ নিশ্চিত করতে হবে।
উপাধ্যায়ের চতুর্থ বক্তৃতাটি অর্থনৈতিক নীতির সাথে সম্পর্কিত ছিল। এই বক্তৃতার সমাপ্তি টানতে গিয়ে তিনি যে বিষয়গুলো সারসংক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেছেন, সেগুলো এখানে উল্লেখ করা উপযুক্ত হবে।
পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্র—উভয় ব্যবস্থাই ‘অখণ্ড মানুষ’ (integral man), তার প্রকৃত ব্যক্তিত্ব এবং তার আকাঙ্ক্ষার ওপর গুরুত্ব দিতে ব্যর্থ হয়েছে। একটি ব্যবস্থা মানুষকে এমন এক স্বার্থপর পশুর মতো মনে করে যে কেবল অর্থের জন্য ক্ষুধার্ত, যার সামনে একমাত্র আইন হলো অন্ধ প্রতিযোগিতা। অন্যদিকে, সমাজতন্ত্র মানুষকে একটি বিশাল পরিকল্পনার প্রাণহীন যন্ত্রাংশ হিসেবে গণ্য করে, যা কেবল কঠোর আইনের মাধ্যমেই নিয়ন্ত্রিত হতে পারে এবং জবরদস্তি ছাড়া তা থেকে কোনো ফল পাওয়া যায় না। উভয় ব্যবস্থাই মানুষকে মানবিকতা থেকে বিচ্যুত (dehumanise) করেছে। মানুষ—যে আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে শ্রেষ্ঠতম—এই জড়বাদী ব্যবস্থাগুলোতে তার প্রকৃত সত্তা হারিয়ে ফেলছে। আমাদের সেই মানবিক সত্তাকে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। তাকে তার প্রকৃত স্থান ফিরিয়ে দিতে হবে, তাকে তার মহত্বের অনুভূতি দিতে হবে। তার সম্ভাবনাগুলোকে জাগিয়ে তুলতে হবে এবং তাকে উৎসাহিত করতে হবে যাতে সে তার ব্যক্তিত্বের ডিভাইন (divine) উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে। এটি কেবল একটি বিকেন্দ্রীভূত অর্থনীতির মাধ্যমেই সম্ভব। আমরা পুঁজিবাদও চাই না, আবার সমাজতন্ত্রও চাই না। আমরা মানুষের সুখ চাই। এই উভয় ব্যবস্থাই মানুষের সাথে লড়াই করে। উভয়ই না মানুষকে বোঝে, না তার কথা ভাবে। তাই আমাদের এমন একটি অর্থনীতি প্রয়োজন যাতে:
১. প্রতিটি ব্যক্তি অন্তত ন্যূনতম মানসম্মত সম্মান ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় কাজ এবং সম্পদের নিশ্চয়তা পায়।
২. প্রতিটি ব্যক্তি সেই ন্যূনতম মান থেকে ক্রমাগত উন্নতির দিকে এগিয়ে যেতে পারে এবং ব্যক্তি ও জাতি হিসেবে নিজের মেধার ভিত্তিতে বিশ্ব ও সমাজের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়।
৩. প্রতিটি সুস্থ মানুষ অর্থবহ কর্মসংস্থানের সুযোগ পায়, যার মাধ্যমে উপরের দুটি উদ্দেশ্য সফল হয় এবং প্রাকৃতিক সম্পদের অপব্যবহার রোধ করা যায়।
৪. ভারতের সম্পদ ব্যবহার করে এবং উৎপাদনের সাতটি উপাদানের কথা মাথায় রেখে, ভারতের প্রয়োজন অনুযায়ী দেশীয় প্রযুক্তির বিকাশ ঘটানো যায়।
৫. এমন একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা যা মানুষের জন্য সহায়ক হয় এবং এখানকার সাংস্কৃতিক ও নৈতিক মূল্যবোধ রক্ষা করে।
৬. এই নীতিগুলো সামনে রেখে অর্থনীতির বিভিন্ন খাত সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া যে, কতটুকু ব্যক্তিগত নিয়ন্ত্রণে থাকবে আর কতটুকু রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে থাকবে।
উপসংহার
এই অংশে আমরা সংঘের (RSS) চিন্তাধারার কিছু মৌলিক উপাদান বোঝার চেষ্টা করেছি। তাদের নীতিমালার ওপর এই চিন্তাধারার প্রভাব স্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হয়। এই চিন্তাধারা থেকে অনেক প্রশ্ন উত্থাপিত হয়। যেমন—একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, একটি গ্রন্থ এবং একজন ধর্মীয় নেতাকে মেনে নেওয়া কি সামি (সেমেটিক) চিন্তাধারা নয়, যা কি না হিন্দুস্তানি সভ্যতার সাথে সাংঘর্ষিক? এবং এর ফলে কোনো গোষ্ঠী কি হিন্দুত্বের গণ্ডি থেকে বিচ্যুত হয়ে যাবে? তাহলে এমন অনেক "হিন্দুস্তানি ধর্ম" এই ক্যাটাগরিতে পড়ে, তাদের ব্যাপারে কী ধারণা? শিখ ধর্ম কি হিন্দুত্বের গণ্ডি থেকে বাইরে চলে যাবে? এই চিন্তাবিদদের কাছে এই প্রশ্নের কোনো উত্তর পাওয়া যায় না। অথবা যদি হিন্দুত্বের সম্পর্ক রাজনীতি বা ধর্মের সাথে না হয়ে বরং "নিছক সভ্যতা"র সাথে হয় এবং যদি সমুদ্র ও হিমালয়ের মধ্যবর্তী অঞ্চলের জনগণ এই সভ্যতার দৃষ্টিতে পবিত্র হয়, তবে এই আন্দোলনের উচিত ছিল প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্কের পতাকাবাহী হওয়া। কারণ এই সংজ্ঞা অনুযায়ী সেখানকার জনগণও আমাদের জাতির অংশ। তাদের থেকে বিচ্ছিন্নতা নিছক রাষ্ট্রের বিচ্ছিন্নতা নাকি ধর্মের? যা কি না সংঘের ষড়যন্ত্র তত্ত্ব অনুযায়ী হিন্দুত্বের আগ্রহের বিষয় নয়। কিন্তু ঐতিহাসিক তথ্য-প্রমাণ এর বিপরীত সাক্ষ্য দেয়।
আসল প্রশ্ন হলো, এই আন্দোলনের বাস্তব পদক্ষেপগুলো কি তাদের এই চিন্তাধারাকে সমর্থন করে? যদি এই আন্দোলন কোনো বিশেষ ধর্মের সমর্থনে না হয়, তবে কেন তাদের নেতা ও লেখকদের মুখে বারবার "হিন্দুত্ব বিপন্ন" হওয়ার কথা শোনা যায়? কেন মসজিদ-মন্দির নিয়ে বিবাদ তৈরি করা হয়? রাম মন্দির আন্দোলনের সময় বলা হয়েছিল যে এটি কোনো ধর্মীয় আন্দোলন নয়, বরং বহির্গত আক্রমণকারীদের মোকাবিলায় এই দেশের জনগণের আকাঙ্ক্ষা ও জাতীয় আবেগের বহিঃপ্রকাশ। যদি তাই হয়, তবে এই আন্দোলনের মানুষের আগ্রহ কি কেবল একটি সমস্যার মধ্যেই সীমাবদ্ধ? এমনটি কি নয় যে দেশের ডজন ডজন শহর ও গ্রামে কেবল মন্দির-মসজিদই নয় বরং মন্ডল এবং ধর্মীয় শোভাযাত্রাকে কেন্দ্র করেও বিবাদ সৃষ্টি করা হচ্ছে এবং এই আন্দোলনের লোকেরাই সেই বিবাদে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে?
দীনদয়াল উপাধ্যায় যে অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রস্তাব করেছিলেন এবং জে.পি. যেটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে সংবিধানে লিখে নিজের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন, যার সাথে সংঘের আদর্শিক ভিত্তির গভীর সম্পর্ক রয়েছে—সেটিকে কেন উপেক্ষা করা হয়েছে? আজ কেন এই আন্দোলনের সাথে যুক্ত সংগঠনগুলোর নীতিতে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যায় না? এই দেশে বর্তমানে পুঁজিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ এবং উদারপন্থী গরিব-বিরোধী অর্থনৈতিক নীতির সবচেয়ে বড় সমর্থক তো এরাই। ‘ইন্টিগ্রাল হিউম্যানিজম’ বা অখণ্ড মানবতাবাদের কোনো গুরুত্ব তাদের অর্থনৈতিক নীতিতে দেখা যায় না, আর না দেখা যায় রাজনৈতিক ও সামাজিক নীতিতে। চিন্তার ভেতরের বিদ্যমান বৈপরীত্য এবং চিন্তা ও কাজের মধ্যকার এই দ্বন্দ্ব এই আন্দোলন এবং এর চিন্তাধারা সম্পর্কে নানা সংশয় সৃষ্টি করে। সংঘের অনেক সমালোচকের মতে, এই পুরো চিন্তাধারা এবং এর পেছনের মূল চালিকাশক্তি হলো আসলে ব্রাহ্মণ্যবাদী আধিপত্যের প্রাচীন ব্যবস্থাকে নতুন রূপে জীবিত করার একটি চেষ্টা। কিতাব এবং নবীর স্পষ্ট শিক্ষার ওপর ভিত্তি করে তৈরি আকিদা (বিশ্বাস), জীবন বিধান এবং সুনির্দিষ্ট নীতি ও মূল্যবোধই এই পথে আসল বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তাই তারা মুসলমান ও খ্রিস্টানদের এখানকার বিশেষ সাংস্কৃতিক ব্যবস্থায় বিলীন করে দিতে চায়। এই দৃষ্টিভঙ্গি গভীর, গম্ভীর এবং বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণের দাবি রাখে, যা ভবিষ্যতে করার চেষ্টা করা হবে।
ওয়ামা তাওফিকি ইল্লা বিল্লাহ (আল্লাহর সাহায্য ছাড়া আমার কোনো সামর্থ্য নেই)।
টীকা
i. প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যেতে পারে এতোদ বিষয় আলোচনা করে পূর্বেই ভারতীয় উপমহাদেশের প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলভী এটিকে একটি পরিকাঠামোতে আবদ্ধ করেছেন যেটাকে তিনি নাম দিয়েছেন “ওয়াহদাতুশ শুহুদ” তথা সর্বসাক্ষ্যবাদ বা সকল সৃষ্টির মাঝেই স্রষ্টার এককত্বের স্বাক্ষর বহমান। যা নির্দেশ করে এমন এক একক সত্তার উপস্থিতি, সূক্ষ্ণ দৃশ্যমানতা যা সব সত্যের মধ্যেই বিরাজমান। তাই পরিশেষে বলা যায় এমন চিন্তাকে চরমপন্থী বলা চিন্তার সূক্ষ্মতার পরিপন্থী - সম্পাদক
ii. এখানে বেশ সূক্ষ্ণভাবে লক্ষ্যণীয় যে আমাদের ইসলামের তুরাছের ধারাতেই এটাকে এড্রেস করা হয়েছে, বিশেষত নববী সিলসিলাতে, বলা হয়েছে যে সমস্ত সৃষ্টি জীব (প্রাণ ও প্রকৃতি) হচ্ছে খোদা তা'য়ালার পরিবারের অংশ এবং তারা সকলেই পরিবারের একেকজন সদস্য ও সত্তা। অর্থাৎ খোদার সকল সৃষ্টিই খোদার পরিবারের অন্তর্গত। সব মিলে একটি পরিবারের ন্যায় যেখানে একটা জৈব অস্তিত্বের দিকে আমাদের ইশারা আছে (যেহেতু তিনি সৃষ্টির শুরুতেই রুহ বা জীবনী শক্তি ফুঁকে দিয়েছিলেন মানুষে সুতরাং সেই সত্তার একটা আংশিক গুণগত উপস্থিতি তো মানুষ সহ সকল সৃষ্টির মাঝেই বিদ্যমান, আর অন্যান্য সৃষ্টির বেলাতেও সেটা এভাবে প্রযোজ্য যে তারা সবাই ‘কুন’ কথার বলয়ে, তার প্রভাব ও শক্তিতেই তৈরি হয়েছে)। আর সমস্ত সৃষ্টি যেহেতু খোদা তা’য়ালার পরিবারের অংশ তাই সকলে যেন একে অপরের প্রতি সহমর্মী হয় এবং এর মাধ্যমে আসলে একটা অস্তিত্ব গড়ে ওঠে (integrity)। সুতরাং অর্গানিসিজমকে (এটিকে আবার কোনোভাবেই মুজাস্সিমা বা দেহবাদের সাথে মিলিয়ে ফেলা যাবেনা) ইসলামের আকিদার সাথে সাংঘর্ষিক বলাটা পুনরায় বিবেচনার দাবি রাখে কেননা যে সমস্যার প্রতি ইঙ্গিত করে এখানে আলোচনা করা হয়েছে সেটাকে আমরা এভাবেও বিশ্লেষণ করতে পারি যে সমস্ত সৃষ্টি জীবই এক ধরনের সহযোগিতার মুখাপেক্ষী একে অপরের থেকে, যেমনটি হয়ে থাকে একটি পারিবারের সদস্যদের বেলাতে। এবং তারা এক ধরনের সহনাভূতির দাবি রাখে পরস্পরে। যেটিকে আমরা ইবাদতের বৃহত্তর পরিসরে মুয়ামালাত রুপে পালন করে থাকি (হিন্দুদের ভাষায় যেটি পূজা,আরাধনা বা উপাসনা) যখন আমরা দয়া পেতে অন্যের প্রতি দয়াপরবশ হয়ে থাকি। আর সেটিকে তো আমরা আমাদের ইসলামের ঐতিহ্যগত ধারার ভিতরেই ব্যবহার হতে দেখি। যদিও প্রায়োগিক ক্ষেত্রে হিন্দুত্ববাদে সেটিকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা হয় কিন্তু ত্বত্তীয় জায়গায় স্বচ্ছতা এবং এই পরিষ্কার বুঝটা হওয়া জরুরি। - সম্পাদক
দোহাই
[1] V.D. Savarkar (1971) Six Glorious Epochs of Indian History (Tr. Ed. S.T.Godbole), Associate Publishers, New Delhi.
[2] A Maratha (1923) Hindutva, VV Kelkar (Publisher) Pune.
[3] V.D.Savarkar (1969) Hindutva: Who is a Hindu?, Veer Savarkar Prakashan, Bombay.
[4] M.S. Golwalkar (2000) Bunch of Thoughts, Sahitya Sindhu Prakashana, Bangalore.
Hindi version is विचार नवनीत
[5] M.S. Golwalkar (1939) We or Our Nationhood Defined, Bharat Publications, Nagpur.
[6] Bhartiya Vichar Sadhana Ed. (1978) Shri Guruji: Samagra Darshan, Khand 1-12, Bharatiya Vichar Sadhana, Nagpur
اس کی ساری ۱۲ جلدیں آن لائن بھی دستیاب ہیں
https://epustakalay.com/book/146612-shri-guriji-samrg-khand-4-by-hedgewaar/ retrieved on 12-06-2021
[7] Vaidehi Nathan (2008) Sri Guruji: Mission and Vision, Kurukshetra Prakashana, Kochi.
[8] Constitution of Bhartiya Janta Party, https://www.bjp.org/en/constitution , retrieved on 12-6-2021
[9] Refer BJP Membership Form at BJP website: https://www.bjp.org/var/assets/reg-form/Membership%20Application%20Form.pdf retrieved on 13-06-2021
[10] Mohan Bhagwat (2018) Future India: An RSS Perspective, Vichar Vinimay Prakashan, New Delhi.
اس کتاب کا اردو ترجمہ بھی شائع کیا گیا ہے:
ڈاکٹر شیخ عقیل احمد (مترجم)، مستقبل کا بھارت، قومی کونسل برائے فروغ اردو زبان، نئی دہلی۔
[11] Rakesh Sinha, (2020), Sri Guruji and Indian Muslims, page 11 PDF available at http://www.archivesofrss.org/Encyc/2014/1/21/23_07_02_19_muslim.pdf retrieved on 12-06-2021
[12] Deen Dayal Upadhyay, Ed. VR Pandit, (2002), Integral Humanism, Deendayal Research Institute, Delhi.
[13] Ibid page 17
[14] Ibid page 19
[15] Ibid page 25-26
[16] موہن بھاگوت (۲۰۱۸)، ڈاکٹر شیخ عقیل احمد (مترجم)، مستقبل کا بھارت، قومی کونسل برائے فروغ اردو زبان، نئی دہلی۔
[17] For details refer:Internet Encycopedia of Philosophy Plato: Organicism at https://iep.utm.edu/platoorg/ retrieved on 13-06-2021
[18] See Thomas Hobbes in Stanford Encyclopedia of Philosophy at https://plato.stanford.edu/archives/win2020/entries/hobbes/
[19] V.D.Savarkar, (1963), Hindu Rashtra Darshan Vol 2 , Maharashtra Prantic Hindu Sabha, Pune, p. 52.
[20] M.S. Golwalkar, (1966), Bunch of Thoughts, Vikram Prakashan, Bangalore, pp. 46-47.
[21] Ibid, p. 24.
[22] Ibid, pp. 24-25.
[23] Ibid, p. 81.
[24] موجودہ سر سنگھ چالک نے حالیہ خطابات میں اس موضوع پر تفصیل سے اپنے خیالات بیان کیے ہیں۔ دیکھیے: ڈاکٹر شیخ عقیل احمد (مترجم)، مستقبل کا بھارت، قومی کونسل برائے فروغ اردو زبان، نئی دہلی۔ص ۳۸ تا ۴۰
[25] V.D.Savarkar, (1969), Hindutva: Who is a Hindu?, Veer Savarkar Prakashan, Bombay, p. 117.
[26] Ibid, p. 115.
[27] Ibid, pp. 129 and 152.
[28] M.S. Golwalkar, (2000), Bunch of Thoughts, Sahitya Sindhu Prakashana, Bangalore, p. 256.
[29] Atal Bihari Vajpayee, (2020), The Sangh is My Soul, in Organiser issue dated 16 August 2020.
[30] Manmohan Vaidya, (2019), Come with Open Mind in Organiser issue dated 16 September 2019.
[31] Ibid
[32] ‘RSS regards 130 crore population of India as Hindu society’: Mohan Bhagwat in Hindustan Times, Delhi, December 25,2019.
[33] M.S. Golwalkar, (2000), Bunch of Thoughts, Sahitya Sindhu Prakashana, Bangalore, p. 95.
[34] Ibid, p. 134.
[35] Manmohan Vaidya, (2018), Rashtra and Nation: Eternal Hindu Rashtra in Organiser issue dated 14 April 2018
[36] C.C. Basu(1888) Old India‘s Hope: Proposal for Establishment of Hindu National Congress, CC Basu, Calcutta.
[37] M.S. Golwalkar, (2000), Bunch of Thoughts, Sahitya Sindhu Prakashana, Bangalore, p. 48.
[38] Manmohan Vaidya, (2018), Rashtra and Nation: Eternal Hindu Rashtra in Organiser, issue dated 14 April 2018.
[39] Manmohan Vaidya (2020) Decline in Proportion to Denationalisation in Organiser, issue dated 22 June 2020.
[40] Mohan Bhagwat, (2018), Future India: An RSS Perspective, Vichar Vinimay Prakashan, New Delhi.
[41] Seshadri Chari, Decoding Hindu Rashtra in India Today, Nov 8, 2019.
[42] مثلاً دیکھیں:
V.D.Savarkar, (1969), Hindutva: Who is a Hindu?, Veer Savarkar Prakashan, Bombay, pp. 101-104.
[43] M.S. Golwalkar, (2000), Bunch of Thoughts, Sahitya Sindhu Prakashana, Bangalore, pp. 75-76.
[44] Deen Dayal Upadhyay, Ed. VR Pandit, (2002), Integral Humanism, Deendayal Research Institute, Delhi, p. 29.
[45] B.N. Jog, (2014), Pt. Deendayal Upadhyay: Ideology and Perception, Part 6, Suruchi Prakashan, Delhi, p. 74.
[46] Deen Dayal Upadhyay, Ed. VR Pandit, (2002), Integral Humanism, Deendayal Research Institute, Delhi, pp. 53-54
তরজমা করেছেন সাইফা খান।