ইউরোপীয় দর্শনের নৈতিক দেউলিয়াত্ব | হামিদ দাবাশি
[২০২৩ সালের ৭ই অক্টোবরের সূত্র ধরে শুরু হওয়া ফিলিস্তিন - ইজরাইলের অসম লড়াই ও ইজরায়েলি গণহত্যাযজ্ঞে ইউরোপীয় দার্শনিক হাবারমাস নগ্নভাবে ইজরাইলের পক্ষ নেন। এরই প্রতিক্রিয়ায় হামিদ দাবাশি এই নিবন্ধটি লিখেছিলেন। ৭ই অক্টোবরের প্রায় মাস তিনেক পরে Middle East Eye পত্রিকায় Thanks to Gaza, European philosophy has been exposed as ethically bankrupt শিরোনামে এটি প্রকাশিত হয়েছিল — অনুবাদক]
একটি দৃশ্য কল্পনা করুন— ইরান, সিরিয়া, লেবানন, কিংবা তুরস্ক—রাশিয়া ও চীন-এর পূর্ণ সমর্থন, অস্ত্র ও কূটনৈতিক সুরক্ষায় বলীয়ান হয়ে—টানা তিন মাস দিনরাত তেল আবিব-এ বোমা বর্ষণ চালাচ্ছে; হাজার হাজার ইজরায়েলিকে হত্যা করছে, অসংখ্য মানুষকে পঙ্গু করে দিচ্ছে, লক্ষ লক্ষ মানুষকে গৃহহীন করে তুলছে, এবং শহরটিকে আজকের গাজা-র মতো বসবাসের অযোগ্য ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে তুলছে।
মাত্র কয়েক সেকেন্ডের জন্য হলেও কল্পনা করুন: ইরান ও তার মিত্ররা ইচ্ছাকৃতভাবে তেল আবিবের জনবহুল এলাকাগুলো—হাসপাতাল, সিনাগগ, স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়, গ্রন্থাগার—অথবা যেকোনো জনবসতিপূর্ণ স্থান—লক্ষ্য করে আঘাত হানছে, যাতে বেসামরিক হতাহতের সংখ্যা সর্বোচ্চ হয়। তারা দুনিয়াকে বলত, তারা কেবল ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং তার যুদ্ধ মন্ত্রিসভাকে খুঁজছে।
এখন নিজেকে জিজ্ঞেস করুন—এই কাল্পনিক পরিস্থিতিতে আক্রমণ শুরু হওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং জার্মানি কী করত?
এখন বাস্তবে ফিরে আসুন, এবং বিবেচনা করুন—৭ অক্টোবরের পর থেকে (এবং তার বহু দশক আগ থেকেই) ফিলিস্তিনি জনগণের ওপর ইজরায়েল যা করেছে, তেল আবিবের পশ্চিমা মিত্ররা তা কেবলই প্রত্যক্ষ করেনি, বরং তারা তাকে সামরিক সরঞ্জাম, বোমা, গোলাবারুদ ও কূটনৈতিক আড়ালও দিয়েছে; আর আমেরিকান গণমাধ্যমের অনেক প্রতিষ্ঠান ফিলিস্তিনিদের হত্যাযজ্ঞ ও গণহত্যার পক্ষে মতাদর্শিক যুক্তি হাজির করেছে।
উপরোক্ত কাল্পনিক দৃশ্যপট বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা একদিনের জন্যও সহ্য করত না। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডার সামরিক দাদাগিরি যখন পুরোপুরি ইজরায়েলের পক্ষে দাঁড়ায়, তখন আমরা—বিশ্বের অসহায় মানুষরা—ফিলিস্তিনিদের মতোই নগণ্য হয়ে পড়ি। এটি শুধু একটি রাজনৈতিক বাস্তবতা নয়; এটি সেই সত্তার নৈতিক কল্পনা ও দার্শনিক জগতের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত, যে নিজেকে ‘পশ্চিম’ (the West) বলে পরিচয় দেয়।
যারা ইউরোপীয় নৈতিক কল্পনার পরিসরের বাইরে—তারা তাদের দার্শনিক জগতে আদৌ অস্তিত্বই রাখে না। আরব, ইরানি ও মুসলিম; কিংবা এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার মানুষ—ইউরোপীয় দার্শনিকদের কাছে আমাদের কোনো স্বতন্ত্র সত্তাগত বাস্তবতা নেই; বরং আমরা কেবল একটি অধিবিদ্যাগত হুমকি (metaphysical menace), যাকে দমন ও স্তব্ধ করে দিতে হবে।
ইমানুয়েল কান্ট এবং ফ্রেডরিখ হেগেল থেকে শুরু করে ইমানুয়েল লেভিনা ও স্লাভয় জিজেক পর্যন্ত—আমরা যেন এক ধরনের অদ্ভুত সত্তা, বস্তু, জ্ঞাতব্য অবজেক্ট—যাদের ‘রহস্য উন্মোচন’ করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল ওরিয়েন্টালিস্টদের। সেই হিসেবে, আমাদের মধ্যে হাজার হাজার মানুষকে ইজরায়েল, অথবা যুক্তরাষ্ট্র ও তার ইউরোপীয় মিত্ররা হত্যা করলেও, ইউরোপীয় দার্শনিকদের মনে সামান্যতম বিরামও তৈরি হয় না।
ইউরোপীয় গোষ্ঠিবাদী দর্শক-শ্রোতারা
এ বিষয়ে যদি আপনার সন্দেহ থাকে, তাহলে শীর্ষস্থানীয় ইউরোপীয় দার্শনিক ইউর্গেন হাবারমাস এবং তার কয়েকজন সহকর্মীর দিকে তাকালেই যথেষ্ট—যারা এক বিস্ময়করভাবে নগ্ন ও নির্মম ভঙ্গিতে ফিলিস্তিনিদের ওপর ইজরায়েলের হত্যাযজ্ঞের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। প্রশ্নটি এখন আর এই না যে ৯৪ বছর বয়সী হাবারমাসকে একজন মানুষ হিসেবে আমরা কীভাবে মূল্যায়ন করব। বরং প্রশ্ন হলো—একজন সমাজবিজ্ঞানী, দার্শনিক ও ক্রিটিকাল চিন্তক হিসেবে তাকে আমরা কীভাবে দেখব? তিনি যা ভাবেন, তা যদি আদৌ কখনো গুরুত্ব বহন করে থাকে, এখনও কি দুনিয়ার কাছে কোনো গুরুত্ব বহন করে?
দুনিয়া ইতিমধ্যেই আরেকজন জার্মান দার্শনিক মার্টিন হাইডেগার-এর ব্যাপারে অনুরূপ প্রশ্ন তুলেছে—নাজিবাদের সঙ্গে তার বিপজ্জনক সম্পৃক্ততার প্রেক্ষিতে। আমার মতে, এখন আমাদের একই ধরনের প্রশ্ন তুলতে হবে হাবারমাসের সহিংস জায়নবাদের প্রেক্ষিতে, এবং তা তার সমগ্র দার্শনিক প্রকল্পকে আমরা কীভাবে মূল্যায়ন করব, সে বিষয়ে কী গভীর প্রভাব ফেলে—সেটি নিয়ে।
যদি হাবারমাসের নৈতিক কল্পনায় ফিলিস্তিনিদের মতো মানুষের জন্য বিন্দুমাত্র জায়গাও না থাকে, তাহলে তার সমগ্র দার্শনিক প্রকল্পকে তার নিকটবর্তী ইউরোপীয় ‘স্বগোত্রীয়’ দর্শক-শ্রোতাদের বাইরে মানবজাতির বৃহত্তর অংশের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে বিবেচনা করার কোনো কারণ কি আমাদের আছে?
হাবারমাসকে লেখা এক খোলা চিঠিতে বিশিষ্ট ইরানি সমাজবিজ্ঞানী আসেফ বায়াত বলেছেন, গাজার পরিস্থিতির ক্ষেত্রে তিনি অর্থাৎ হাবারমাস ‘নিজের ধারণাগুলোর সঙ্গেই বিরোধে লিপ্ত’ হচ্ছেন। যথাযথ সম্মান রেখেই বলছি, আমি এই মতের সঙ্গে একমত নই। আমার মতে, ফিলিস্তিনি জীবনের প্রতি হাবারমাসের উদাসীনতা তার জায়নবাদী অবস্থানের সঙ্গেই সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ। এটি সেই বিশ্ববীক্ষার সঙ্গে পুরোপুরি খাপ খায়, যেখানে অ-ইউরোপীয়রা পূর্ণাঙ্গ মানুষ নয়—অথবা ‘মানব-পশু’ (human animals), যেমনটি ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্ট প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছেন।
ফিলিস্তিনিদের প্রতি এই চরম উপেক্ষা জার্মান ও ইউরোপীয় দার্শনিক কল্পনার গভীরে প্রোথিত। প্রচলিত ধারণা হলো— হলোকাস্টের অপরাধবোধ থেকেই জার্মানরা ইজরায়েলের প্রতি দৃঢ় প্রতিশ্রুতি গড়ে তুলেছে।
কিন্তু বিশ্বের বাকি অংশের কাছে—যেমনটি এখন দক্ষিণ আফ্রিকা যে গুরুত্বপূর্ণ নথি আন্তর্জাতিক বিচার আদালত-এ পেশ করেছে, তা থেকে স্পষ্ট — নাজি যুগে জার্মানি যা করেছিল এবং এখন জায়নবাদী যুগে যা করছে, তার মধ্যে এক গভীর ধারাবাহিকতা বিদ্যমান।
আমার মতে, ইউর্গেন হাবারমাস-এর অবস্থান জার্মান রাষ্ট্রনীতির সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ, যেখানে ফিলিস্তিনিদের ওপর জায়নবাদী হত্যাযজ্ঞে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অংশ নেওয়া হচ্ছে। এটি তথাকথিত ‘জার্মান বামপন্থা’র সঙ্গেও সঙ্গতিপূর্ণ—যেখানে আরব ও মুসলমানদের প্রতি একইভাবে বর্ণবাদী, ইসলামবিদ্বেষী ও বিদেশবিদ্বেষী ঘৃণা দেখা যায়, এবং ইজরায়েলি দখলদার-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের গণহত্যামূলক কর্মকাণ্ডকে তারা নিঃশর্ত সমর্থন দেয়।
আমরা যদি মনে করে থাকি যে আজকের জার্মানির মধ্যে হলোকাস্ট-জনিত অপরাধবোধ কাজ করছে, তবে আমাদের সেই ভুল ধারণার জন্য ক্ষমা প্রাপ্য। কারণ বাস্তবে যা দেখা যাচ্ছে, তা যেন অপরাধবোধ নয়, বরং এক ধরনের গণহত্যার নস্টালজিয়া—যেখানে গত এক শতাব্দী ধরে (শুধু গত ১০০ দিন নয়) ইজরায়েলের ফিলিস্তিনি নিধনের মধ্যে তারা পরোক্ষভাবে এক ধরনের আত্মতৃপ্তি খুঁজে নিয়েছে।
নৈতিক অবক্ষয়
ইউরোপীয় দার্শনিকদের বিশ্ব-বীক্ষার বিরুদ্ধে যে ইউরোকেন্দ্রিকতার অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে তোলা হচ্ছে, তা কেবল তাদের জ্ঞানতাত্ত্বিক সীমাবদ্ধতার বিষয় নয়; বরং এটি এক ধারাবাহিক নৈতিক অবক্ষয়ের লক্ষণ। অতীতে বহুবার আমি দেখিয়েছি—ইউরোপীয় দার্শনিক চিন্তার কেন্দ্রে এবং এমনকি ইউরোপের আজকের সবচেয়ে প্রশংসিত প্রতিনিধিদের মধ্যেও এক গভীর, নিরাময়-অযোগ্য বর্ণবাদ সক্রিয়।
এই নৈতিক অবক্ষয় কেবল কোনো রাজনৈতিক ভুল (faux pas) বা মতাদর্শগত অন্ধত্ব নয়। এটি তাদের দার্শনিক কল্পনার গভীরে লিখিত— যা আজও এক নিরাময়-অযোগ্য ‘গোষ্ঠিবাদী’ বা ট্রাইবাল চরিত্র বহন করে।
এখানে আমাদের মার্টিনিকের খ্যাতিমান কবি আইমে সেজেয়ার-এর সেই বিখ্যাত উক্তিটি স্মরণ করতে হবে:
‘হ্যাঁ, হিটলার এবং হিটলারবাদ যে ধাপে ধাপে এগিয়েছিল, তা ক্লিনিক্যালভাবে বিশদে অধ্যয়ন করা উচিত; এবং বিশ শতকের সেই অত্যন্ত সম্মানিত, অত্যন্ত মানবতাবাদী, অত্যন্ত খ্রিস্টান বুর্জোয়াদের সামনে উন্মোচন করা উচিত যে— তারা নিজেরা তা না জানলেও, তাদের ভেতরেই এক হিটলার বাস করে; হিটলার তাদের মধ্যে অধিষ্ঠিত, হিটলারই তাদের দানব; এবং তারা যদি তার বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে, তবে তারা আসলে অসামঞ্জস্যপূর্ণ আচরণ করছে। কারণ, মূলত তারা হিটলারকে ক্ষমা করতে পারে না অপরাধের জন্য নয়, মানুষের বিরুদ্ধে অপরাধের জন্য নয়, মানুষের অপমানের জন্যও নয়; বরং শ্বেতাঙ্গ মানুষের বিরুদ্ধে অপরাধের জন্য, শ্বেতাঙ্গ মানুষের অপমানের জন্য—এবং এই কারণে যে, সে ইউরোপে সেই ঔপনিবেশিক পদ্ধতিগুলো প্রয়োগ করেছিল, যা এর আগে কেবল আরব, ভারতীয় ও আফ্রিকান জনগোষ্ঠীর ওপরই প্রয়োগ করা হতো।’
আজকের ফিলিস্তিন আসলে সেজেয়ার যে ঔপনিবেশিক বর্বরতার কথা বলেছেন, তারই একটি সম্প্রসারণ। হাবারমাস হয়তো বুঝতে পারছেন না যে ফিলিস্তিনিদের হত্যাযজ্ঞকে সমর্থন করা তার অবস্থান সম্পূর্ণভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ—তার পূর্বপুরুষরা নামিবিয়ায় হেরেরো ও নামাকুয়া গণহত্যার সময় যা করেছিল, তার সঙ্গেই। (বালুঝড় থেকে রেহাই পেতে মরুর বালুতে মাথা গুঁজে রাখা) প্রবাদপ্রতিম সে উটপাখির মতো, জার্মান দার্শনিকরা নিজেদের ইউরোপীয় ভ্রান্তির ভেতরে মাথা গুঁজে রেখেছেন, যেন পৃথিবী তাদের প্রকৃত চেহারা দেখতে পাচ্ছে না।
মোটকথা, আমার দৃষ্টিতে, হাবারমাস এমন কিছু বলেননি বা করেননি যা বিস্ময়কর বা স্ববিরোধী; বরং এর সম্পূর্ণ বিপরীত—তিনি তার দার্শনিক ঐতিহ্যের সেই নিরাময়হীন গোষ্ঠিবাদিতার সঙ্গেই সঙ্গতিপূর্ণ থেকেছেন, যা নিজেকে ঝুঁটভাবে সর্বজনীন বলে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল।
এখন বিশ্ব সেই মিথ্যা সর্বজনীনতার ভ্রান্তি থেকে মুক্ত হয়েছে। হাবারমাস ও তার মতো চিন্তাবিদদের তুলনায় ভি. ওয়াই. মুদিম্বে (ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো), ওয়াল্টার মিগনোলো বা এনরিক দ্যুসেল (আর্জেন্টিনা), কিংবা কোজিন কারাতানি (জাপান)—এই ধরনের দার্শনিকদেরই সর্বজনীনতার দাবি অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য।
আমার মতে, ফিলিস্তিন প্রসঙ্গে হাবারমাসের বক্তব্যের নৈতিক দেউলিয়াত্ব ইউরোপীয় দর্শন ও বিশ্বের বাকি অংশের মধ্যে ঔপনিবেশিক সম্পর্কের এক মোড় পরিবর্তনের সূচনা করেছে। বিশ্ব এখন ইউরোপীয় জাতিগত-দর্শনের সেই মিথ্যা ঘুম থেকে জেগে উঠেছে। আর আজ এই মুক্তির ঋণ আমরা বহন করি ফিলিস্তিনিদের মতো জনগণের প্রতি—যাদের দীর্ঘস্থায়ী, ঐতিহাসিক সাহস ও আত্মত্যাগ শেষ পর্যন্ত ‘পশ্চিমা সভ্যতা’র ভিত্তিতে থাকা নগ্ন বর্বরতাকে উন্মোচন করেছে।
অনুবাদক করেছেন সিদ্দিকে আকবর।