মুসলিম মানসের সেক্যুলারিকরণ | আলি এস. হারফৌচ
আমেরিকার মুসলমান জনগোষ্ঠীর জন্য একটি সূক্ষ্ম কিন্তু অস্তিত্বগত বিপদ সম্পর্কে তুলে ধরা-ই এই প্রতিবেদনটির উদ্দেশ্য। সেটি হলো, ‘মুসলিম মানসের উপর আক্রমণ, আরেকটু ভেঙে বললে, মুসলিম মানসের সেক্যুলারিকরণ বা মুসলমানদের চিন্তা-চেতনাকে সেক্যুলার বয়ানের আদলে গড়ে তোলা। মুসলমান জনগোষ্ঠীর উপর শারীরিক ও মৌখিক আক্রমণ করার বিষয়টি সাধারণত ডানপন্থীরা করে থাকলেও মুসলমানদের চিন্তা-চেতনাকে সেক্যুলার বয়ানের আদলে গড়ে তোলার ইচ্ছা দৃশ্যত রাজনৈতিক পরিসরের সকল ধারার মধ্যেই কাজ করে। সে সূত্রে, মুসলমানদের চিন্তা-চেতনাকে পরিবর্তন করার অংশ হিসাবে রক্ষণশীল ও উদারপন্থী— উভয়পক্ষ-ই ‘ভালো মুসলমান’ (Good Muslim) এর সংজ্ঞা ঠিক করে দিতে চায় এবং সে নিরিখে একজন ‘ভালো মুসলমান’ তৈরি করতে চায়। তাদের কাছে, ভালো মুসলমান মানে হচ্ছে একজন ‘সেক্যুলার মুসলমান’ যে ‘সেক্যুলার ইসলাম’ এর প্রতি মনেপ্রাণে নিবেদিত থাকে। যে সেক্যুলার ইসলামের মানে হচ্ছে— উত্তরোত্তর লাগামহীন রাষ্ট্র ও তার মতাদর্শের কাছে নিজেকে সঁপে দেওয়া।
একজন সেক্যুলার মুসলমান ইসলামকে কিছু নৈতিকতা ও মূল্যবোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখে এবং ইসলামের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিসর সম্পূর্ণভাবে বাদ দিয়ে দেয়। ফলে, ইসলামের মধ্যে যে আজাদীর চিন্তা-চর্চা (Liberation Praxis) ও বিশ্ববীক্ষা (World view) হাজির আছে তা সেক্যুলার ইসলাম থেকে নাই হয়ে যায়। ফলে, সেকুলার ইসলাম রাষ্ট্রের মতাদর্শিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে কোনো চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করে না। এখানে, একজন মুসলমান নিজের কর্তাসত্ত্বা হারিয়ে স্রেফ একটা অবজেক্টে পরিণত হয়, যেন রাষ্ট্র তাকে নিছক হাতিয়ার হিসাবে গড়ে তুলে ব্যবহার করতে পারে। যেটা এই প্রতিবেদনটিতে স্পষ্টভাবে দেখানো হয়েছে—‘ধর্মকে রাষ্ট্রের আদলে গড়ে তোলা’র (Religion Building) ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের যুক্ততা কেবল নাইন-এলিভেনের পরবর্তী সময়ে শুরু হয়নি কিংবা নির্দিষ্ট কোনো প্রশাসনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং, ধর্মকে রাষ্ট্রের আদলে গড়ে তোলা বিষয়টিই ‘সেক্যুলার’ মতাদর্শ এবং রাষ্ট্রের স্বঘোষিত সার্বভৌমত্বের বুনিয়াদি কাজ। তাই, আমেরিকার মতো ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র কোনোভাবেই 'নিরপেক্ষ' নয়; বরং এটি ইসলামকে একটি রাষ্ট্র-অনুমোদিত 'আমেরিকান ইসলাম'-এ রূপান্তরিত করার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।
৯/১১-এর পর সেক্যুলারিকরণ এজেন্ডা আরও জোরালো হয়ে উঠে যা সহিংস উগ্রবাদ মোকাবেলা’র (CVE) মতন উদ্যোগগুলোর মাধ্যমে বৈধতা পেয়েছিল। এই উদ্যোগগুলোর মূল লক্ষ্য হচ্ছে চরমপন্থা প্রতিরোধ করা এবং মুসলমান জনগোষ্ঠীর সদস্য ও বর্গগুলোকে এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা। ফলে, সেক্যুলার বয়ান অযৌক্তিকভাবে চরমপন্থা এবং সহিংসতার প্রবণতার সাথে রাজনৈতিক অসন্তোষ, ইসলামের মতাদর্শগত সাযুজ্য এবং বিশ্বের মুসলিম উম্মাহর সম্পর্ককে জড়িত করে। তার-ই অংশ হিসাবে, সরকারি পলিসি এবং সেক্যুলার লিবারেল বয়ান ইসলামের আদর্শিক ধারণাগুলো, যেমন খিলাফতকে, ইসলামের একটি উগ্র সহিংস রাজনৈতিক মতাদর্শের অংশ হিসেবে চিহ্নিত করে।
ফলে, এই উদ্ভুত বিপদটি কেবল রাজনৈতিক ও সামাজিক-ই নয়; একইসাথে বুদ্ধিবৃত্তিকও বটে। কাজেই, বুদ্ধিবৃত্তিক হুমকির জবাব বুদ্ধিবৃত্তিকভাবেই হওয়া জরুরি। তাছাড়া, আমরা যে সমস্যাটির সম্মুখীন হচ্ছি সেটি আরও বিপজ্জনক। সমস্যা কেবল মুসলমানদের চিন্তা-চেতনার উপর আক্রমণ নয়। আসল সমস্যা হচ্ছে, মুসলমানদের মাঝে এই বিপদের বাস্তবতা সম্পর্কেও সচেতনতার অভাব। এ সচেতনতা যদি তৈরি না হয়, তাহলে মুসলমানদের চিন্তা-চেতনার উপর যে আক্রমণ হয়ে থাকে তার প্রত্যুত্তরে মুসলিম উম্মাহ সামগ্রিকভাবে এবং ইসলামিক উপায়ে মোকাবেলা করতে বা এই আলোচনায় যুক্ত হতে অপারগই থেকে যাবে। তাই, এই প্রতিবেদনে ভবিষ্যতের পথ নির্দেশনা হিসাবে আমেরিকার মুসলিম জনগোষ্ঠীর জন্য তিনটি নীতিমালা প্রস্তাব করা হয়েছে:
মসজিদের স্থানকে পুনরুদ্ধার করে মুসলমান জনগোষ্ঠীকে শক্তিশালী করা। সেজন্য মসজিদের স্থানকে প্রকাশ্য সার্বজনীন সংলাপের পরিসর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে যেখানে আমেরিকাসহ বিশ্বের অন্যান্য জায়গার মুসলমান জনপরিসরের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হবে।
একটি জ্ঞানসম্পন্ন এবং রাজনৈতিকভাবে সচেতন মুসলমান জনগোষ্ঠী গড়ে তোলা। সেজন্য সচেতনতা প্রয়োজন যাতে জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক চিন্তা, কর্মতৎপরতা ও ভিশনকে ইসলামী ভিত্তির উপর সুপ্রতিষ্ঠিত করা যায় এবং একইসাথে বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি ও মাত্রাকে আমলে নেওয়া যায়।
সেক্যুলারিকরণের প্রজেক্টগুলোর স্বরূপ উন্মোচন করা, সমালোচনা করা এবং এসব থেকে দূরে থাকা। যেহেতু, এসব প্রজেক্ট মুসলমানদেরকে অ-স্পষ্ট নিরাপত্তা ইস্যু ও সন্ত্রাসবিরোধী বয়ানের ঘোরটোপে সীমাবদ্ধ করতে চায়।
প্রস্তাবিত এই নীতিমালার মাধ্যমে আমরা মুসলমান কমিউনিটির উদ্দেশ্যে কিছু বিকল্প কর্মকৌশল তুলে ধরতে চাই, সেই সাথে সেকুলারিকরণের প্রতিক্রিয়াশীল ও স্ব-বিরোধী কৌশলগুলি পার হয়ে নতুন কর্মপন্থা বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে যেতে চাই—যেন এর মাধ্যমে মুসলমানদের চিন্তা-চেতনার উপর আক্রমণ প্রতিরোধ করা যায়। আমাদের লক্ষ্য— মুসলমান কমিউনিটির মধ্যে একটি সংলাপ তৈরি করা, কমিউনিটির নেতাদের উদ্দেশ্যে গুরুত্বপূর্ণ নীতিমালা সুপারিশ করা। পাশাপাশি, সচেতনতা তৈরি এবং একটি যুগপৎ ও ইসলামসম্মত কর্মপন্থা তুলে ধরার কাজে যুবকদেরকে সম্পৃক্ত ও অন্তর্ভুক্ত করা।
চিন্তা-চেতনায় আক্রমণের উৎস
রাষ্ট্র কর্তৃক ‘ধর্ম-বিনির্মাণ’ বা রাষ্ট্রের চাহিদানুসারে ধর্মীয় বয়ান বিনির্মাণের বিষয়ে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রভাবশালী বয়ানের দাবি হলো, এই প্রচেষ্টা সেক্যুলারিজমের গুরুত্বপূর্ণ দিক ‘নিরপেক্ষতা’র সাথে সাযুজ্যপূর্ণ নয়। ধর্মীয় পরিসরে এ ধরনের হস্তক্ষেপের মাধ্যমে সেক্যুলার রাষ্ট্রের নীতিমালার বিচ্যুতি ঘটে। অন্য কথায় এ বিচ্যুতিটি সেকুলারিজমের নিজস্ব সমস্যা নয়, বরং এটি বাস্তবে সেক্যুলারিজমের একটি অপপ্রয়োগ। তাই, তাদের মতে এর সমাধান হচ্ছে অল্প সেক্যুলারিজমের পরিবর্তে আরও অধিক সেক্যুলারিজমের চর্চা। কিন্তু, এই বয়ানের মুশকিল হলো, ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র, নিরপেক্ষ এবং অ-ভাবাদর্শিক—এই মিথের উপর বয়ানটি প্রতিষ্ঠিত।
তবে, সেক্যুলারিজম বাস্তবে নিরপেক্ষ কোনো বিষয় নয়। তত্ত্ব ও প্রয়োগ উভয়ক্ষেত্রে-ই, সেক্যুলারিজম আরো অনেক মতাদর্শের মতো-ই জনমানুষের চিন্তাভাবনায় আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত একটি আদর্শ। এ ক্ষেত্রে একমাত্র পার্থক্য হলো, সেক্যুলার রাষ্ট্রের ক্ষমতার খায়েশ মেটানোর বিষয়টি সহনশীলতার মুখোশের আড়ালে লুকানো থাকে—যেটাকে আমেরিকান ভাষায় একটা সুবিশাল ‘মেল্টিং পট’১ বলা যেতে পারে। একটি মতাদর্শ হিসেবে সেক্যুলার রাষ্ট্র সমাজের জন্য তার নিজস্ব বিশ্ববীক্ষা, মূল্যবোধ এবং ভিশন নিয়ে সদা কায়েম থাকে।
সেইজন্য, রাষ্ট্রকে বরাবরই সেক্যুলারকরণ প্রক্রিয়া, নাগরিকদেরকে নিজ মতবাদে দীক্ষিত করা এবং ধর্মকে সেক্যুলার চিন্তাকাঠামোর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার করার কাজে সম্পৃক্ত হতে হয়। মোটাদাগে, রাষ্ট্র তিনটি কাজের মাধ্যমে ধর্মকে রাষ্ট্রের উপযোগী করে তোলে—
রাষ্ট্র তার স্ব-নির্ধারিত ক্ষমতাবলে ঠিক করে দেয়— ধর্ম কিভাবে সংজ্ঞায়িত হবে।
বিশ্বাস ও কাজ-কর্মের মাঝে কোনগুলো ধর্মীয়, আর কোনগুলো সেক্যুলার— রাষ্ট্র তা ফারাক করে দেয়।
কোন ধর্মীয় বিশ্বাস ও কাজ-কর্মগুলো রাষ্ট্রের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে এবং বাধা না দিয়ে মেনে নিবে— রাষ্ট্র তা ঠিক করে দেয়।
রাষ্ট্র বিভিন্ন ধর্মকে সামলাতে গিয়ে কিভাবে হস্তক্ষেপ করে তা স্পষ্টভাবে ফুটে উঠে মার্কিন কংগ্রেসে আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা আইনটি (IFRA) পাশ করার মাধ্যমে।
কিভাবে সার্বভৌম ক্ষমতার চর্চা ধর্মীয় স্বাধীনতার সেকুলার মূলনীতিকে গ্রাস করার তালে থাকে— এই আইনে তার ভাল নজির আছে । IRFA ১৯৯৮ সালে প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনের শাসনামলে আইনে পরিণত হয়েছিল এবং এটি মার্কিন ফেডারেল সরকারকে নজিরবিহীন ক্ষমতা দেয় যেন ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষা এবং বহাল রাখার নামে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ধর্মীয় জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।২
আমাদের সামনে সেক্যুলার রাষ্ট্র এমন এক সার্বভৌম শক্তিরূপে হাজির আছে, যা শুধু জনগণের ইমান-আকিদা (Doctrinal Commitment) নির্ধারণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং সেই সাথে ঘোষণা করে— জনগণ ও তাদের ধর্মকে সেক্যুলার রাষ্ট্র তার নিজের আদলে সংস্কার করার অধিকার রাখে।
সেজন্য, ইসলামকে রূপান্তর করার ইচ্ছা বিশেষ কোন সময় বা প্রশাসনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং, আমরিকার রাজনীতিতে ইসলামের নেতিবাচক উপস্থাপন প্রাতিষ্ঠানিক ও ভাবাদর্শগতভাবে প্রোথিত আছে। আইএসআইএসের খিলাফত ঘোষণা, আমরিকার বিরুদ্ধে আল কায়েদার জিহাদের ডাক, কিংবা তথাকথিত ইসলামি চরমপন্থার উত্থান হওয়ার অনেক আগে থেকে-ই মুসলিম মানসের উপর আক্রমণ শুরু হয়েছে। ইসলাম ও মুসলমান প্রশ্ন ১৮০০ সালের শুরু থেকেই আমরিকান ডিসকোর্সের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসাবে হাজির ছিল। প্রথম দিকের প্রটেস্ট্যান্ট মিশনারিরা ইসলামকে যে একটি “খ্রিস্টবিরোধী অন্ধকারাচ্ছন্ন ও রাজনৈতিক অত্যাচার-নিপীড়ন”ময় ধর্ম হিসাবে হাজির করেছিলেন তার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল আমরিকার জাতিগত পরিচয় নির্মাণে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য মিশনারিরা ছিলেন প্লিনি ফিস্ক, জোনাস কিং, এবং লেভি পার্সন্স, যারা তাদের স্বজাতীয় খ্রিস্টানদের কাছে ওসমানীয় খেলাফতকে “পাপের মহাসাম্রাজ্য” হিসাবে উপস্থাপন করতেন এবং ওসমানী খেলাফতের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে বলতেন।
তাছাড়া, আমরিকার সামষ্টিক পরিচয় নির্মাণে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ গঠনমূলক প্রভাব রেখেছিল। এর মধ্যে আছে ১৭৮৫ সাল থেকে ১৮১৫ সাল পর্যন্ত চলা যুক্তরাষ্ট্র ও আলজেরিয়ার মধ্যকার বিরোধ, ১৮০১ থেকে ১৮০৫ সাল পর্যন্ত চলা ট্রিপোলিটান যুদ্ধ এবং গ্রিকদের স্বাধীনতা যুদ্ধ।
উপরন্তু, ১৭৯০ সালের প্রাকৃতিককরণ আইন এবং ১৮৯১ সালের অভিবাসন আইন আমেরিকার অভিবাসন প্রক্রিয়ায় বর্ণবাদী বৈষম্য তৈরি করেছিল। যেখানে যথাক্রমে নাগরিকত্বের জন্য শেতাঙ্গ হওয়াকে পূর্বশর্ত হিসাবে বাধ্যতামূলক করা হয় এবং বহুবিবাহে বিশ্বাসী মানুষদেরকে অভিবাসন অযোগ্য হিসাবে গণ্য করা হয়। তালেবান, আলকায়েদা, বোকো হারাম কিংবা আইসিস (ISIS) -এর উত্থান হওয়ার বহু আগেই প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট বলেছিলেন, “যেখানে মোহাম্মদের ধর্ম প্রধান, সেখানে নৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও বস্তুগত কল্যাণ আশা করা অসম্ভব।”২ আমরিকার ইতিহাস জুড়ে মুসলমানদের নামে যেসব জনপ্রিয় কুৎসা রটানো হয়েছে এই উক্তিটি সেসবের একটি নমুনা।
আমাদেরকে সবার আগে বুঝতে হবে যে, মুসলমানদের চিন্তা-চেতনার উপর আক্রমণের উৎসটা সেক্যুলার ভাবাদর্শের মূলে প্রোথিত আছে— যেটি একটি মতাদর্শ হিসাবে কাজ করে এবং যেভাবে সেক্যুলার রাষ্ট্র একটা নতুন সার্বভৌম ক্ষমতা হিসাবে কাজ করে। সেক্যুলার চিন্তাকাঠামো আমাদের সামনে একটা বাস্তবতা তুলে ধরে। সেটা হচ্ছে—মুসলমানদের চিন্তা-চেতনার উপর আক্রমণ স্রেফ সরকারি কোনো এজেন্ডা নয় যে, এটি বিশেষ কোন প্রশাসনের কার্যক্রমের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, আছে, কিংবা থাকবে বরং এটি গভীরভাবে প্রোথিত একটা মতাদর্শগত এবং প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতা।
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নীতিতে ও বৈশ্বিক সংগ্রামের বাস্তবতা ঝুঁকির বিষয়
মুসলমানদের চিন্তা-চেতনার উপর আক্রমণ দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টার অংশ হিসাবে কাজ করছে। যে প্রচেষ্টার উদ্দেশ্য হচ্ছে, ইসলামকে ভিতর থেকে পরিবর্তন করে সংস্কার করা। মুসলমানদের ব্যাপারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ এবং বৈদেশিক নীতি কী হবে— সেক্ষেত্রে এ প্রচেষ্টাটির গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রয়েছে। আমেরিকার অভ্যন্তরীণ এবং বৈদেশিক নীতিতে কেবল জাতি গঠনের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত নয়, বরং সেখানে ধর্মকে রাষ্ট্রের আদলে গড়ে তোলার (রিলিজিয়ন বিল্ডিং) বিষয়টিও রয়েছে। ফলে, যুক্তরাষ্ট্র এবং মুসলমান জনগোষ্ঠী উভয়ের জন্যই অনেক কিছু ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
আমরিকার ব্যাতিক্রমধর্মিতাকে (আমরিকান এক্সেপশনালিজম) সম্প্রসারিত করার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট কর্মসূচিভিত্তিক প্রচার-প্রচারণা চালানো হচ্ছে যার মূলে আছে ধর্মকে রাষ্ট্রের আদলে গড়ে তোলা। যেটা আমরিকান ইসলামের সাধনা। আমরিকান ব্যাতিক্রমধর্মিতা একটা ভাবাদর্শ হিসাবে কাজ করছে যেটি ধর্মীয় বিষয়গুলোকে সহিষ্ণুতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতার মোড়কে ঢেকে ফেলে, যাতে করে তা তার রাজনৈতিক ধারার সাথে খাপ খায়।
‘আমেরিকান মুসলমান’ ধারণাটি আমেরিকার ব্যতিক্রমধর্মিতার একটি মূর্ত প্রতীক ও চিহ্নে পরিণত হয়েছে। তাই, আমেরিকায় মুসলমানদের লক্ষ্য করে গৃহীত নীতিগুলো আসলে একটি বয়ান এবং প্রকল্পের অংশ, যা যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বব্যাপী সক্রিয়ভাবে প্রচার করছে। ফলত, আমেরিকায় মুসলমানদের মন ও হৃদয় দখলের লড়াইটি কেবল একটি অভ্যন্তরীণ ইস্যু নয়, বরং একটি বৈশ্বিক মতাদর্শিক যুদ্ধের ময়দানে ইসলামকে ভিন্ন একটি রূপ দেওয়ার লড়াই। যার ফলে, ইসলাম নিজে-ই এক ধরণের ঝুঁকির মুখে রয়েছে।
এই প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার পেছনে একটি দৃঢ় মতাদর্শিক বিশ্বাস কাজ করছে। সেটি হচ্ছে—রাজনৈতিক ও নৈতিক কর্তৃত্ব রাষ্ট্রের কাছে থাকতে হবে। সেইসাথে, পশ্চিমা বিশ্ব ইসলামকে যেভাবে হাজির করেছে তার ঐতিহাসিক চিত্র এবং এনলাইটেনমেন্টের আগে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে তার যে মোকাবেলা-সংঘাত হয়েছে সে অভিজ্ঞতাও এই দৃঢ়বিশ্বাসটি তৈরি হওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মতো একটি সেক্যুলার রাষ্ট্র সার্বভৌম, খোদাসুলভ পর্যায়ে চলে গেছে। কারন, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক পরিসীমা ঠিক করে দেওয়ার একমাত্র এখতিয়ার রাষ্ট্রের-ই আছে। সেই ক্ষমতাবলে রাষ্ট্র ঠিক করে দেয়— কোন কোন বিশ্বাস ও কাজ-কর্ম সহনীয় হবে আর কোনগুলো সহ্যসীমার বাইরে পড়বে। ফলত, হিজাব, লিঙ্গ(জেন্ডার) সম্পর্ক, শরিয়া ও খেলাফতের মতো বিষয়গুলো রাষ্ট্রের ইসলাম সংক্রান্ত যে সেক্যুলার বয়ানের এখতিয়ার ও পরিসীমার মধ্যে পড়ে যায় (অর্থ্যাৎ এ সমস্ত বিষয়ের স্বাধীনতার ব্যাপারে রাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করতে পারে।) আরেকটু খোলাসা করে বললে, আমাদের বোঝা উচিত যে সেক্যুলারিজম বলতে ধর্মের প্রতি সহনশীলতা বা ধর্মকে বর্জনের বিষয় বোঝায় না। বরং, সেকুলারিজম হচ্ছে ধর্মকে ভিতর থেকে সংস্কার করে পুনর্গঠন করা যেন তা পশ্চিমের লিবারেল রাজনৈতিক ধারার অনুগামী হয়।
এভাবে, ‘সংশোধিত’ ইসলাম বা একটা ‘নতুন ইসলাম’ সেক্যুলার রাষ্ট্রের প্রকল্পে পরিণত হয়। যার লক্ষ্য হচ্ছে ইসলামের এমন একটি সেক্যুলার, রাজনৈতিকভাবে অক্ষম এবং স্থানিক (আমরিকান আদলে) সংস্করণ তৈরি করা; যে ইসলাম নিজেই সেক্যুলার লিবারেল চিন্তাকাঠামোর ছাঁচে নিজেকে গড়ে তুলবে।
সূত্র ও ব্যাখ্যা
মেল্টিং পট (Melting Pot) একটি সমাজবিজ্ঞানিক ধারণা, যা সাধারণত একটি সমাজে বিভিন্ন জাতি, সংস্কৃতি, ধর্ম, এবং জাতিগত গোষ্ঠীর মিশ্রণ বা একীভূত হওয়ার প্রক্রিয়া বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। এই ধারণায়, বিভিন্ন সম্প্রদায় একে অপরের সাথে মিশে গিয়ে একটি নতুন, একক সংস্কৃতি তৈরি করে। এটি মূলত একটি রূপক, যেখানে "মেল্টিং পট" একটি পাত্রের মতো কাজ করে, যেখানে বিভিন্ন উপাদান (যেমন: জাতি, ভাষা, সংস্কৃতি) গলে গিয়ে একত্রিত হয় এবং একটি নতুন রূপে পরিণত হয়। উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসীদের বিভিন্ন সংস্কৃতি মেল্টিং পটের মাধ্যমে একত্রিত হয়ে একটি সাধারণ মার্কিন সংস্কৃতির উদ্ভব ঘটায়। এই ধারণার মূল ভাবনা হলো বিভিন্ন গোষ্ঠী নিজেদের বিশেষত্ব বজায় রেখেও একে অপরের মধ্যে মিশে গিয়ে সমষ্টিগত সংস্কৃতির সৃষ্টি করে।
“সেকুলারিজম, হারমিউনিটিক্স এন্ড এম্পায়ার: দ্যা পলিটিক্স অব ইসলামিক রিফর্মেশন।” পাবলিক কালচার ১৮, নং-২ (২০০৬): ৩২৩-৩৪৭
হার্ড, এলিজাবেথ শাকমেন। দ্যা পলিটিক্স অফ সেকুলারিজম ইন ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনস। প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটি প্রেস, (২০০৯)
মূল নিবন্ধ: The Secularization of the Muslim Mind
তরজমা করেছেন তাহসিন বিন বাশার।