পশ্চিমা ইসলামবিদ্বেষ বৈশ্বিক দক্ষিণে কীভাবে কাজ করে? | ইরফান আহমাদ
ইসলামবিদ্বেষ (Islamophobia) পশ্চিমা বিশ্ব এবং বৈশ্বিক দক্ষিণে (Global South) আলাদাভাবে নয়, বরং একসঙ্গে মিলেমিশে কাজ করে। সম্প্রতি বাংলাদেশের এক ছাত্রকে শিক্ষকের নির্মমভাবে প্রহার করার একটি ভাইরাল ভিডিওকে ঘিরে বৈশ্বিক মিডিয়ার প্রচারণা এটিকে আরেকবার প্রমাণ করেছে। কোন ছাত্রকে নির্মমভাবে প্রহার করা নিঃসন্দেহে একটি অমানবিক এবং অপরাধমূলক ঘটনা। তবে ঘটনাটি মিডিয়াতে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যার উদ্দেশ্য নিছকই মুসলমানদের ধর্মীয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে আক্রমণ করা।
ইসলামকে এখানে ব্যাখ্যামূলক উপাদান (explanatory vector) হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। বৈশ্বিক দক্ষিণ এবং পশ্চিম উভয় বিশ্বের ক্ষমতাধর অভিজাত গোষ্ঠীগুলো মুসলমানদের বর্বর হিসেবে চিত্রায়িত করার জন্য এ ধরনের ভাষ্য তৈরি করেছে। এই ভাষ্য জিইয়ে রাখতে গণমাধ্যমগুলো হিন্দু, খ্রিস্টান বা অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের শারীরিক শাস্তির ঘটনাগুলোকে উপেক্ষা করে যায়। পাশাপাশি তারা এসব ঘটনার পিছনে পুরনো শিক্ষাপদ্ধতির (outdated pedagogy) মতো অ-ধর্মীয় কারণগুলোকেও লুকিয়ে রাখে।
“ডয়েচে ভেলের (DW) প্রতিবেদনটিতে বাংলাদেশকে “মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ” হিসেবে বর্ণনা করা হলেও ভারতকে “হিন্দু-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ” হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি।”
“দক্ষিণ এশিয়ার মাদরাসা শিক্ষার্থীরা ব্যাপক শারীরিক শাস্তির শিকার” শিরোনামের DW প্রতিবেদনটিতে প্রচলিত সাধারণীকরণ (generalization) করা হয়েছে। প্রতিবেদনটিতে মূল দাবির সমর্থনে কোন তথ্য-উপাত্ত প্রদান করা ছাড়াই কেবল একটি জরিপের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যে জরিপে “মাদরাসা বনাম পাবলিক স্কুলের শাস্তির অনুপাত” সংক্রান্ত কোন তথ্য নেই।
তাহলে শুধু মাদরাসায় শাস্তির ঘটনাকে কেন এতটা চাঞ্চল্যকরভাবে উপস্থাপন করা হয়? প্রতিবেদনের ভেতরে নজর দিলেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে—এই সাধারণীকরণের উদ্দেশ্যে হচ্ছে ইসলাম ও মাদরাসার প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করা। এটি সেই প্রক্রিয়ারই অংশ যা আফগানিস্তানে তালেবানের উত্থানের সময় শুরু হয়েছিল এবং ৯/১১-পরবর্তী সময়ে আরও গতি পেয়েছে। প্রতিবেদনটিতে মারধোর করাকে বারবার ইসলাম এবং মাদরাসার সাথে সম্পৃক্ত একটি প্রথা হিসেবে দেখানো হয়েছে। একইসাথে এতে ধারাবাহিকভাবে ‘মুসলমান’ উপাদানটিকে অতিরঞ্জিত করে তুলে ধরা হয়ে হয়েছে। যেমন, এতে বারবার উল্লেখ করা হয়েছে যে “মুসলিম অভিভাবকরা” তাদের সন্তানদের মাদরাসায় পাঠান।
শাস্তির ধর্মীয় দিকটিকে বেশি করে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা থেকে প্রতিবেদনটিতে বারবার মাদরাসার শিক্ষকদের “ধর্মগুরু” বা “মৌলভি” (clerics) হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ এটি সম্পূর্ণ ভুল চিত্রায়ণ। মাদরাসার শিক্ষকরা শুধু ধর্মীয় বিষয়ই না, ইংরেজিসহ বিভিন্ন ভাষা এবং গণিতের মতো “আধুনিক” বিষয়ও পড়িয়ে থাকেন। তারা নিছকই “ধর্মগুরু/মৌলভি” নন। মুসলমানদের বেলায় এরকম অন্ধ কুসংস্কারপূর্ণ চিত্রায়ণ দেখা গেলেও বিপরীত চিত্র দেখা যায় হিন্দু ধর্মীয় ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে। গণমাধ্যমে হিন্দু ধর্মীয় ব্যক্তিদের “আধ্যাত্মিক গুরু” বা “দ্রষ্টা” (seers) হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। একইভাবে, ডয়েচে ভেলের (DW) প্রতিবেদনটিতে বাংলাদেশকে “মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ” হিসেবে বর্ণনা করা হলেও ভারতকে “হিন্দু-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ” হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি।
বৃহত্তর প্রবণতা
মুসলমানদেরকে শুধুমাত্র ধর্মীয় পরিচয়ে সীমাবদ্ধ করে উপস্থাপন করা একটি বৃহত্তর প্রবণতার অংশ। গত বছর দ্য গার্ডিয়ান জামিয়া মিল্লিয়া ইসলামিয়াকে “দিল্লির মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ” বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে বর্ণনা করেছিল। কিন্তু বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়কে “হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ” বলে বর্ণনা করেনি।
একটি হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ সম্পর্কে এমন একটি উপস্থাপনাকে হয়তো কিছুটা ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখা যেতে পারে। কিন্তু এই ধরনের উদাহরণ ক্রমশ বেড়েই চলছে। বিশেষ করে মুসলমানদের সঙ্গে নেতিবাচক বিষয় যুক্ত থাকলে, “মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ” শব্দটি যোগ করা গণমাধ্যম ও একাডেমিয়ার মধ্যে সাধারণ চর্চা হয়ে দাঁড়িয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, আল জাজিরা-এর একটি প্রতিবেদনে ইসলাম অবমাননার দায়ে কারাবন্দী এক মালয়েশিয়ানকে নিয়ে লেখা হয়েছিল, মালয়েশিয়া একটি “মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ”। দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট-এর প্রতিবেদনে কেনিয়ার লামু দ্বীপকে “মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ” হিসেবে বর্ণনা করা হলেও, কেনিয়াকে “খ্রিস্টান সংখ্যাগরিষ্ঠ” বলা হয়নি।
মুসলমানদের বেলায় ধর্মকে সামনে নিয়ে আসার এই চর্চা কিন্তু হিন্দুদের বেলায়, বিশেষত একান্তই হিন্দু-ধর্মীয় বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে পুরোপুরিই বিপরীত। তখন ধর্মীয় পরিচয়কে গোপন রাখা হয়। হিন্দু ধর্মে পবিত্র হিসেবে বিবেচিত গরুকে রক্ষার নামে ভারতে মুসলমান-বিরোধী সহিংসতা কিংবা গরুর মাংস নিষিদ্ধ করার চেষ্টা নিয়ে প্রতিবেদনগুলোতেই এ বিষয়টি প্রমাণিত হয়। গরু জবাইয়ের অভিযোগে ধর্মীয় আবেগের বশে মুসলমানদেরকে পিটিয়ে মারার ঘটনাগুলো পশ্চিমা গণমাধ্যমে প্রায়শই উপেক্ষা করা হয় কিংবা ভুলভাবে “ধর্মনিরপেক্ষ” ঘটনা হিসেবে তুলে ধরা হয়।
অন্যদিকে, মাদ্রাসাকে কলঙ্কিত করার বাসনা তাদের মধ্যে এতটাই প্রবল যে, DW প্রতিবেদনটিতে মাদ্রাসাভিত্তিক শারীরিক শাস্তির আর কোনও সাম্প্রতিক উদাহরণ না পেয়ে, একটি বেমানান প্রতিবেদন সঙ্গে জুড়ে দেয়—যেখানে হিন্দু আশ্রম সংস্কারের আহবান করা হয়েছে এবং সেগুলোর “আধ্যাত্মিক” দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। কিন্তু সেখানে ইসলাম এবং মাদ্রাসার আধ্যাত্মিক দিককে একেবারেই উপেক্ষা করা হয়েছে। এই পক্ষপাত ভি এস নাইপলের বক্তব্যের কথা মনে করিয়ে দেয়, যেখানে তিনি ইসলামকে “আধ্যাত্মিক শূন্যতা থেকে বেড়ে ওঠা একটি ধর্ম” হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।
স্বীকারোক্তির খেলা
বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনের জন্য সত্যটা যাচাইয়ের অস্ত্র হিসেবে ইসলামবিদ্বেষ প্রায়ই মুসলমানদের উদ্ধৃতি ব্যবহার করে। কিন্তু মিডিয়া বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উদ্ধৃতিগুলো সাধারণত এমনভাবে বাছাই করা হয় যা রিপোর্টারদের পূর্বনির্ধারিত অনুমানগুলোর সঙ্গে মিলে যায়। এছাড়াও আয়ান হিরসি আলী, ইরশাদ মানজি, সালমান রুশদি, তসলিমা নাসরিনদের মতো দেশীয় টিকটিকিদের ইসলাম সম্পর্কে সমালোচনামূলক লেখাগুলো প্রায়ই স্বীকারোক্তিমূলক মতামত হিসেবে ইসলামবিদ্বেষকে বৈধতা দেওয়ার কাজে ব্যবহৃত হয়।
ইসলামবিদ্বেষের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা এই বৈশ্বিক একমুখী ধারণার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের একটি উপায় হলো, শিক্ষার্থীদের মারধরের মতো ঘটনাগুলোর পেছনে স্থানীয় সংস্কৃতি এবং সামাজিক-অর্থনৈতিক বৈষম্যের মতো বিভিন্ন বিষয়কে তুলে ধরা।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মারধরের মূল কারণ ধর্ম নয়। বরং এই প্রথাটি এমন একটি ধারণা থেকে উদ্ভূত, যেখানে শেখা মানেই মুখস্থ করা; আর কেউ মুখস্থ করতে ব্যর্থ হলে শাস্তি অবধারিত। এই প্রথাটি ভারতের হিন্দু, খ্রিস্টান, আধুনিক এবং “ধর্মনিরপেক্ষ” সরকারী স্কুলগুলোতেও দেখা যায়, যেখানে অধিকাংশ শিক্ষক ও ছাত্র-ছাত্রী হিন্দু। আরেকটি বড় কারণ হলো বয়স্কতান্ত্রিকতা (gerontocracy), যা শিক্ষকদের নিজেদের ব্যর্থতা, যেমন একঘেয়ে পড়ানোর পদ্ধতি নিয়ে আত্মসমালোচনাকে নিরুৎসাহিত করে।
শিশু শিক্ষার্থীদের হেনস্তার আরেকটি কারণ হলো, গরীব, আধা-শিক্ষিত বা মূর্খ অভিভাবক যারা বিনামূল্যে শিক্ষার জন্য তাদের সন্তানদের মাদ্রাসায় পাঠান, তারা মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষকে জবাবদিহির আওতায় আনতে পারেন না। ভারতের উত্তর প্রদেশের মাদ্রাসা নিয়ে গবেষণায় আমি দেখেছি, যেসব মাদ্রাসায় ছাত্ররা টিউশন ও আবাসন ফি দেয়, সেখানে মারধরের ঘটনা তুলনামূলকভাবে কম।
শিশুদের ওপর এই নৃশংস আচরণ বন্ধ করতে শুধু আইন প্রণয়নই যথেষ্ট নয়, যেমন যৌতুকের বিরুদ্ধে আইনও সম্পূর্ণ ফলপ্রসূ হয়নি। এক্ষেত্রে আভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক দুই ধরণের পরিবর্তনই প্রয়োজন। শিশু অধিকার সম্পর্কে অভিভাবকদের সচেতনতা এবং তাদের আর্থসামাজিক ক্ষমতায়নও অত্যন্ত জরুরি। এটি ছাড়া অভিভাবকরা মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষকে জবাবদিহি করতে সক্ষম হবেন না।
মূল লেখা : https://www.middleeasteye.net/opinion/how-western-islamophobia-works-global-south
অনুবাদক : হাসান আব্দুল্লাহ