মেন্যু
Menu

ইসলামি পরিসরে চিন্তাযুদ্ধ | ইউসুফ আল কারযাভী

২২ অক্টোবর, ২০২৪

ইসলাহ বা সংস্কারের আলোচনায় সবার আগে চিন্তার পরিশুদ্ধি, বোঝাপড়ার যথার্থতা এবং চিন্তাপ্রক্রিয়া ও কর্মপদ্ধতির সাথে সম্পৃক্ত বিষয়গুলোর প্রতি সবিশেষ গুরুত্বের সাথে নজর দেওয়া উচিত। কেননা, চিন্তা ও কর্মপদ্ধতিই সকল প্রকার আকাঙ্ক্ষিত সংস্কারের মূলভিত্তি। এ কথা কোনোভাবেই বোধগম্য নয় যে, চিন্তা বক্র হওয়ার পরেও কর্ম সঠিক পন্থায় চলতে পারে। যেমন এক কবি বলেছেন—

متى يستقيم الظل والعود أعوج

“বাঁকা কাঠের ছায়া সোজা হবে কখন?”

কোনো ব্যাপারে কারো চিন্তা যদি ভুল বা মন্দ হয়, তাহলে সেই ব্যাপারে তার কর্মও ভুল বা মন্দ পথেই পা বাড়াবে। কেননা, কর্ম বা আচরণ, তা ভালো হোক বা মন্দ হোক, চিন্তারই ফলাফল।

এ কারণেই চিন্তাযুদ্ধ অর্থাৎ বিকৃত চিন্তাধারা ও গলত বোঝাপড়া ঠিক করাকে অন্য সবকিছুর চেয়ে বেশি গুরুত্ব ও অগ্রাধিকার দিতে হবে। কেননা এই চিন্তাযুদ্ধই হচ্ছে মাক্কি সূরা ফুরকানে বর্ণিত হওয়া ‘আল কুরআনের মাধ্যমে জিহাদ’। এই চিন্তাযুদ্ধই হচ্ছে সেই ‘জবান ও বয়ানের মাধ্যমে জিহাদ’, যার কথা এসেছে হাদিস শরিফে৷ নবিজি সা. আদেশ করেছেন—

جاهدوا المشركين بأموالكم وأنفسكم وألسنتكم.

“তোমরা মুশরিকদের সাথে তোমাদের মাল-সম্পদ, জান-জীবন ও জবানের মাধ্যমে জিহাদ কর।”

চিন্তাযুদ্ধের দুইটি মৌলিক ক্ষেত্র রয়েছে। যথা—
  • ইসলামি বা মুসলিম পরিসরের বাইরে ওই সকল নাস্তিক, মিশনারি ও ওরিয়েন্টালিস্টদের সাথে চিন্তাযুদ্ধ, যারা ইসলামের বিরুদ্ধে আক্রমণ করে, যারা আকিদা ও শরিয়ত এবং ঐতিহ্য ও সভ্যতা হিসেবে ইসলামের বিরোধিতা করে। তারা ইসলামের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা প্রতিটি পুনর্জাগরণ আন্দোলনেরই বিরোধিতা করে।

  • ইসলামি বা মুসলিম পরিসরের অভ্যন্তরে ইসলামি কাজবাজ করে এমন দলগুলোর দৃষ্টিভঙ্গি ঠিক করতে, তাদের পথচলা সঠিক পথে পরিচালিত করতে এবং তাদের কার্যক্রম পরিশোধিত করতে পরিচালিত ‘চিন্তাযুদ্ধ’, যাতে তারা বিশুদ্ধ উদ্দেশ্যের দিকে এগিয়ে যেতে পারে বিশুদ্ধ পথ ধরেই।

এখানে আমরা আমাদের এই আলোচনায় ইসলামি পরিসরের অভ্যন্তরের চিন্তাযুদ্ধ নিয়েই সীমিত থাকব। কেননা, অভ্যন্তরের ইসলাহই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক কাজ। সবার আগে প্রাধান্য দিতে হবে এটাকেই।

মুসলিম পরিসরে আমরা অনেকগুলো ধারা, ঘরানা বা চিন্তাকাঠামো হাজির দেখতে পাই। যেমন—

ক. কুসংস্কারপন্থী ধারা

কুসংস্কারপন্থী ধারা বা ঘরানা যেই মূলনীতি বা মৌলিক স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত, সেগুলো হচ্ছে—

  • আকিদা-বিশ্বাসে কুসংস্কার,

  • ইবাদত-বন্দেগিতে বিদয়াত,

  • চিন্তাভাবনায় স্থবিরতা,

  • ফিকাহয় তাকলিদ,

  • আচার-আচরণে নেতিবাচকতা এবং

  • রাজনীতিতে তাল মিলিয়ে চলা বা তেলবাজি করা।

খ. অক্ষরবাদী ধারা

অক্ষরবাদী ধারা বা প্রবণতা দ্বীনের ব্যাপারে বা দ্বীন পালনে এবং বিরোধীদের আক্রমণ থেকে দ্বীনকে রক্ষা করার ব্যাপারে অনেক কঠোর হলেও এর অধিকাংশ অনুসারীর মাঝে এমন কিছু বৈশিষ্ট্য পাওয়া যায়, যা এই ধারাকে অন্য ধারাগুলো থেকে আলাদা করে তুলে। সেগুলো হচ্ছে—

  • আকিদা-বিশ্বাসে বিতর্কপ্রবণতা,

  • ইবাদত-বন্দেগিতে আনুষ্ঠানিকতা,

  • ফিকাহয় জাহিরিয়্যাত,

  • গৌণ ও ছোটোখাটো বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া,

  • রুহানিয়াতের সঙ্কট,

  • দাওয়াতের ময়দানে কাঠিন্য এবং

  • মতবিরোধের ব্যাপারে সংকীর্ণমনতা।

গ. প্রত্যাখ্যানবাদী ও চরমপন্থী ধারা

এই ধারা গোটা সমাজকে তার সকল প্রতিষ্ঠান ও অনুষঙ্গসহ নাকোচ করে। যদিও প্রত্যাখ্যানবাদী ও চরমপন্থী ধারার অনুসারীদের অনেকের মাঝেই সাহসিকতা ও ইখলাস থাকে, কিন্তু তাদের এমন কিছু বৈশিষ্ট্য আছে, যা এই ধারাকে অন্য ধারাগুলো থেকে আলাদা করে তুলে। সেই বৈশিষ্ট্যগুলো হচ্ছে—

  • দ্বীন পালন করার ব্যাপারে কঠোরতা ও কড়াকড়ি করা।

  • নিজেদের ব্যাপারে এমন অতিরিক্ত সৎ ধারণা রাখা, যা তাদেরকে ‘সমাজের বাকি সবার চেয়ে তারাই শ্রেষ্ঠ’ এই মনোভাবের দিকে ধাবিত করে।

  • অন্য সবার ব্যাপারে খারাপ ধারণা পোষণ করা।

  • দ্বীন বোঝার ক্ষেত্রে সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি লালন করা। বাস্তবতা এবং জাগতিক ও সামাজিক ইলাহি সুন্নাত বোঝার ক্ষেত্রেও সংকীর্ণতা লালন করা।

  • সময় আসার আগেই তাড়াহুড়ো করা।

  • লাগামহীনভাবে তাকফির করা এবং

  • উদ্দেশ্য সাধনে শক্তির ব্যবহার করা।

ঘ. মধ্যমপন্থী ধারা (ওসাতিয়্যাহপন্থী)

ওসাতিয়্যাহপন্থী বা মধ্যমপন্থী ধারা। দ্বীন, জীবন ও দ্বীন প্রতিষ্ঠার কর্মপন্থার ব্যাপারে ভারসাম্যপূর্ণ ও মধ্যমপন্থী বোঝাপড়ার ওপর এই ধারা প্রতিষ্ঠিত। এই ধারারও এমন কিছু বৈশিষ্ট্য আছে, যা এটাকে অন্য সবার থেকে স্বতন্ত্র করে তুলে। মধ্যমপন্থী ধারা যেই যেই মূলনীতির ব্যাপারে অত্যধিক গুরুত্ব প্রদান করে থাকে, সেগুলো হচ্ছে—

  • দ্বীনকে সামগ্রিকতা, ভারসাম্য ও গভীরতাসহ অনুধাবন করা।

  • জীবনের বাস্তবতাকে বড়ো বা ছোটো না করে সঠিকভাবে বোঝা। মুসলমান ও তাদের শত্রুদের বাস্তবতাকেও অনুরূপভাবে অনুধাবন করা।

  • আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের সুন্নাত (সুন্নাতুল্লাহ) ও তাঁর অপরিবর্তনীয় নীতিগুলো অনুধাবন করা , বিশেষত মানব সমাজ ও সমষ্টির ব্যাপারে আল্লাহর সুন্নাতকে বোঝা।

  • মাকাসিদুশ শরিয়াহর বোঝাপড়া এবং কেবলই শরিয়তের বাহ্যিকতা নিয়ে পড়ে না থাকা।

  • ‘ফিকহুল আউলায়িয়্যাত’ বা অগ্রাধিকারের ফিকাহ মেনে চলা। আর এটা ‘ফিকহুল মুওয়াযানাত’ বা তুলনার ফিকাহর সাথে জড়িত।

  • ইখতিলাফের ফিকাহ মেনে চলা এবং অন্যান্য ইসলামি ঘরানা বা ধারার সাথে ইখতিলাফের আদব রক্ষা করা (অর্থাৎ একমত হওয়া বিষয়গুলোতে একে অপরকে সহযোগিতা করা আর বিরোধপূর্ণ বিষয়গুলোতে একে অপরকে ছাড় দেওয়া)।

  • সালাফিয়্যাত ও তাজদিদের মাঝে সমন্বয় সাধন করা (অন্য কথায় বলতে গেলে, মৌলিকতা ও সমসাময়িকতার মাঝে সমন্বয় করা)।

  • শরিয়তের সাওয়াবিত (অপরিবর্তনীয় বিষয়) এবং যুগের পরিবর্তনশীল বিষয়কে বিবেচনায় নেওয়া।

  • চিন্তাগত, মানসিক ও আখলাকি পরিবর্তনকেই সকল সভ্যতাগত পরিবর্তনের মূল ভিত্তি হিসেবে বিশ্বাস করা ।

  • উম্মাহর পুনরুত্থান এবং সমকালীন বস্তুবাদী দর্শনের কবল থেকে মানবতার মুক্তির জন্য ইসলামকে একটি পূর্ণাঙ্গ সভ্যতা প্রকল্প হিসেবে হাজির করা।

  • ফতোয়ায় ‘তাইসির’ বা সহজতা এবং দাওয়াতে সুসংবাদের পন্থা অবলম্বন করা।

  • ইসলামের সামাজিক ও রাজনৈতিক মূল্যবোধগুলোকে তুলে ধরা, যেমন : স্বাধীনতা, সম্মান, শুরা বা পরামর্শ, সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবাধিকার।

  • ভিন্নমতাবলম্বী অর্থাৎ অমুসলমান বিরোধী কিংবা বুদ্ধিবৃত্তিক ও আধ্যাত্নিকভাবে পরাজিত মুসলমানদের সাথে সুন্দর পন্থায় সংলাপে অংশগ্রহণ করা।

  • মুসলমানদের নিরাপত্তা ও দারুল ইসলামকে রক্ষা করতে জিহাদকে কর্মপন্থা হিসেবে গ্রহণ করা।

এই মধ্যমপন্থী (ওসাতিয়্যাহপন্থী) ধারাতেই আমরা বিশ্বাস করি। এর দিকেই মানুষকে আমরা আহ্বান জানাই। আমরা মনে করি, এই ধারাই ইসলামের প্রকৃত রূপকে সঠিকভাবে তুলে ধরে। এই ধারাই তুলে ধরে ইসলামের সেই হাকিকি রূপ, আল্লাহ রাব্বুল আলামিন যা তাঁর কিতাব আল কুরআনুল কারিমে নাজিল করেছেন, রাসূলুল্লাহ সা. তাঁর সুন্নত ও সিরাতে যার নির্দেশনা দিয়েছেন, সুপথপ্রাপ্ত খলিফারা যেভাবে এই ইসলামকে বাস্তবায়ন করে গেছেন এবং উম্মাহর খাইরুল কুরুনের তাবেয়িরা যেভাবে এটাকে বুঝেছেন।

(ইউসুফ আল কারযাভীর ‘ফিকহুল আউলায়িয়্যাত.. দিরাসাতুন জাদিদা ফি দওয়িল কুরআনি ওয়াস সুন্নাহ’ থেকে নেওয়া হয়েছে।)

তরজমা করেছেন মু. সাজ্জাদ হোসাইন খাঁন।