বাঙালি মুসলিম সংস্কৃতির উজ্জীবনে আব্বাসউদ্দীন | ফাহমিদ-উর-রহমান
উত্তর ভারতের মুসলমান সমাজের মধ্যে বহুদিন ধরে এক ধরনের দরবারী গানের প্রচলন ছিল। সেখানে জন্ম হয়েছে বহুগুণী ওস্তাদের। মুসলিম বাদশাহ ও নওয়াবরা বিভিন্ন সময় এই সব গানের পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন। ফলে সেখানে সঙ্গীতচর্চার একটা বিশেষ মুসলমানী ঢং ও ঘরানা গড়ে উঠতে পেরেছে। অযোধ্যার শেষ নওয়াব ওয়াজেদ আলী শাহ’র সঙ্গীত প্রীতির কথাতো অনেকেই জানেন।
বাঙালি মুসলিম সমাজে এমনি কোন গানের ধারা গড়ে ওঠেনি। কিন্তু উত্তর ভারতের মতো পরিশীলিত কোন গানের ধারা গড়ে না উঠলেও এখানে ছিল লোকসঙ্গীতের এক সমৃদ্ধ ধারা। এই সব গ্রামীণ গান তৈরি হয়েছিল নানা মানুষের অবচেতন সঙ্গীত প্রেরণায়। এক অসাধারণ লৌকিক আবেগের ভিতর দিয়ে এ সব গানে মানব মনের বিচিত্র আশা আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটে।
আব্বাসউদ্দীনের মাধ্যমে প্রথম এই লোক সঙ্গীত বিশেষভাবে মূর্ত হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের মানুষ বিশেষ করে নাগরিক সমাজ সচেতন হয়ে ওঠে এ গানের নিভৃত সৌন্দর্য সম্বন্ধে। আব্বাসউদ্দীন যে কালে জন্মগ্রহণ করেছিলেন সে সময় সংস্কৃতির ক্ষেত্রে বাঙালি হিন্দুর পাশে বাঙালি মুসলিম সমাজ পিছিয়ে পড়েছিল। অথচ বাংলা ভাষাভাষী জনসমষ্টির মধ্যে বাঙালি মুসলিম সমাজই ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ। দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে মিত্রভাব যথেষ্ট রকম ছিল না। উল্টো সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষও ছিল প্রকট। ঐতিহাসিক কারণে বাঙালি মুসলিম সমাজের মধ্যে সাংস্কৃতিক হীনমন্যতা এতদূর পৌঁছেছিল যে দু’একজন মুসলমান শিল্পী ছিলেন তারাও স্বনামে গান রেকর্ড করতে কুণ্ঠিত হতেন। এরকম একজন শিল্পী ছিলেন কে মল্লিক। শিল্পী হিসেবে তার খ্যাতিও ছিল। তিনি প্রধানত কীর্তন ধারার গান গাইতেন। কিন্তু কেউ জানত না তিনি মুসলমান। তার পুরো নামছিল আবুল কাশেম মল্লিক।
একই রকম ঘটনা ঘটেছিল ওস্তাদ আলাউদ্দীনের ক্ষেত্রে। ওস্তাদ হিসেবে তিনি বিশেষভাবে খ্যাতি পান উত্তর ভারতে গিয়ে। কলকাতায় তার জীবন কেটেছে একজন অখ্যাত থিয়েটার শিল্পী হিসেবে। কিন্তু এ সময় তাকেও নিতে হয়েছিল ছদ্ম হিন্দু নাম। এমনি ছিল সেদিনকার বাংলার বিশেষত কলকাতার সামাজিক অবস্থা। এরকম একটা পরিবেশে মুসলমান হয়ে নিজ নামে নিজ পরিচয়ে গান গেয়ে খ্যাতিমান হওয়া ছিল প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। আব্বাসউদ্দীন সেই অসাধ্য সাধন করেছিলেন। আগেই বলেছি বাঙালি মুসলিম সমাজে লোকসঙ্গীতের এক সমৃদ্ধধারা বহমান ছিল। আর ছিল পুথি সাহিত্য। এই সঙ্গীত ও সাহিত্য ঔপনিবেশিক বাংলার অজস্র কৃষক, শ্রমিক, নদীর মাঝি, গাড়িয়াল আর খেটে খাওয়া মানুষের একমাত্র বিনোদনের বিষয় ছিল। উপনিবেশিক কলকাতায় ব্রিটিশের প্রশ্রয়ে সেদিন যে রেনেসাঁর আলো ফুটে উঠেছিল তার শরীক কিন্তু এই শ্রেণী হতে পারেনি। এই শ্রেণীর গান ছিল উত্তর বঙ্গে ভাওয়াইয়া ও পূর্ববঙ্গে ভাটিয়ালি। আর ছিল রাখালী, মারফতি, মুর্শিদী। আব্বাসউদ্দীন গণমানুষের এই গানকে পুনরুজ্জীবন দান করেন। তার এ সাফল্যের পিছনে ছিল তার অসাধারণ স্বর নৈপুণ্য ও লোকগানের অবিকৃত শিল্পরূপ রক্ষা।
অন্যদিকে কাজী নজরুল ইসলাম পুঁথি সাহিত্যের বাংলাকে আধুনিক সাহিত্যে রূপান্তরিত করেন। এইভাবে আব্বাসউদ্দীন ও কাজী নজরুল ইসলাম বাঙালি মুসলমানের আত্মাকে নাড়া দিয়ে জাগিয়ে তোলেন। কাজী নজরুল ইসলাম বাঙালি মুসলমানের সাংস্কৃতিক ভাষাকে বাংলা সাহিত্যে প্রতিষ্ঠা করেন আর আব্বাসউদ্দীন বাঙালি মুসলমানের প্রাণের ভাষায় সুরারোপ করেন। এইভাবে শব্দ দিতেন নজরুল ইসলাম, কণ্ঠ দিতেন আব্বাসউদ্দীন। বাঙালি মুসলিম সমাজের দিকবদলের ক্রান্তিকালে এ দু’জনের বন্ধন ছিল মূল্যবান। বাঙালি মুসলিম জাগরণে তাদের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে এদের সাহস ও অঙ্গীকার আজ আমাদের জাতীয় সম্পদ। কাজী নরুজল ইসলাম যে কারণে এখন আমাদের জাতীয় কবি, আব্বাসউদ্দীন ঠিক সে কারণে আমাদের জাতীয় শিল্পী। আব্বাসউদ্দীন আর একটি দিক দিয়ে বাংলার মুসলিম জনসমাজের কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন। আব্বাসউদ্দীন তার স্মৃতিকথায় জানিয়েছেন তিনি চেয়েছিলেন গানের মাধ্যমে পিছিয়ে পড়া মুসলমান সমাজে নব জাগরণ সৃষ্টি করতে। তার লেখা স্মৃতিকথা তার সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিলও বটে। যাইহোক আব্বাসউদ্দীনই কাজী নজরুল ইসলামকে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন ইসলামি গান রচনা করতে। এই গানের প্রভাব হয়েছিল সুদূরপ্রসারী। বাংলার মুসলিম সমাজ জীবনের ইতিহাস বিশ্লেষণে এর কথা বাদ দেয়া যায় না। বাংলার মুসলিম সমাজের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক চেতনা সৃষ্টির মূলে রয়েছে নজরুলের ঐ গানগুলো। আব্বাসউদ্দীনের কণ্ঠে ঐ গানগুলো বাংলার সুদূরতম অঞ্চলেও প্রাণের সাড়া জাগায়।
আব্বাসউদ্দীন হাজার হাজার জনসভায় এইসব গান গেয়েছেন। তার শ্রোতা ছিল সাধারণ মানুষ। বড় লোকের বৈঠকখানায় কিংবা পরিশীলিত এলিট শ্রেণীর সামনে গান গাওয়ার চেয়ে মুক্তমঞ্চে দাঁড়িয়ে জনতার সামনে গান গেয়ে সেদিন তিনি বাঙালি মুসলমানের দেশাত্মবোধ, জাতি প্রেম, নিজেদের অধিকার প্রভৃতি সম্বন্ধে সচেতন করে তোলেন। দেশের কাছে, মানুষের কাছে শিল্পী যে একান্তভাবে দায়বদ্ধ তার প্রকাশ ও পরিচয় আব্বাসউদ্দীনের জীবনে বার বার মিলেছে। ত্রিশ আর চল্লিশের দশকে আব্বাসউদ্দীন এদেশের আকাশে, বাতাসে আর অস্তিত্বের মধ্যে যেন মিশে ছিলেন। হাতল ঘুরানো, চোঙ অলা গ্রামফোনে গাড়িয়ালের নিঃসঙ্গ যাত্রার কথকতা যেমন শুনেছে গ্রামীণ মানুষ, তেমনি ইসলামের গৌরব ঘোষণায়, আল্লাহর গুণ মহীমা গাঁথায়, হযরতের প্রতি বিগলিত চিত্ততার ভিতর দিয়ে ফুটে উঠেছে বাঙালি মুসলমানের মানসিক কাঠামো ও আধ্যাত্মিক মানস।
শেষ পর্যন্ত আব্বাসউদ্দীন এদেশের মানুষের অন্তরে লোকগীতি ও ইসলামি গানের নায়ক হিসেবে চিরস্থায়ী আসন পেয়েছেন। সেদিক দিয়ে তিনি শুধু শিল্পী ছিলেন না, ছিলেন একজন গণশিল্পীও। আব্বাসউদ্দীনকে তাই বলা চলে বাঙালি মুসলিম সমাজের প্রথম পল রবসন। যে ঐতিহাসিক কারণে সংস্কৃতির ক্ষেত্রে বাঙালি মুসলমানরা পিছিয়ে পড়েছিল বঙ্গভঙ্গ ও প্রথম মহাযুদ্ধের পর থেকে তার বাঁক পরিবর্তন শুরু হয়। বাঙালি মুসলমানের জীবনে চাঞ্চল্য জাগে। তারা আত্ম আবিষ্কারের সাধনায় মগ্ন হয়। আব্বাসউদ্দীন বাঙালি মুসলিম সমাজের এই আত্ম আবিষ্কারের শিল্পী। কাজী নজরুল ইসলাম তার বিখ্যাত “বড়’র পিরীতি বালির বাঁধ” প্রবন্ধের এক জায়গায় লিখেছিলেন বিশ্বকাব্য লক্ষ্মীর একটা মুসলমানী ঢং আছে। বাঙালি মুসলমানের আত্ম আবিষ্কারের লগ্নে কাজী নজরুল ও আব্বাসউদ্দীন বাংলার শিল্প সাহিত্যে সেই মুসলমানী ঢংটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আজকের দিনে যে আধুনিক বাঙালি মুসলিম সংস্কৃতির উজ্জীবন ঘটেছে তার অন্যতম স্থপতি ছিলেন কাজী নজরুলের সাথে আমাদের শিল্পী আব্বাসউদ্দীনও।
হদিস : প্রেক্ষণ, (জুলাই- সেপ্টেম্বর, ২০১২)