মেন্যু
Menu

মোহমুক্তি, বাজার ও হ্যালোইন | সিদ্দিকে আকবর

৩ নভেম্বর, ২০২৬

অক্টোবরের শেষ দিনগুলোতে নিউজফিডের স্ক্রিনজুড়ে দেখি হ্যালোইন উন্মাদনা। কঙ্কাল, ডাইনি আর ভুতুড়ে আলোছায়ার এক অদ্ভুত কাণ্ডকারখানা। অভিজাত এলাকাগুলোতে তখন নানা আয়োজন। দেখা যায়, গুলশান-বনানীর ক্যাফেগুলোতে মৃদু আলোর থিম-ডিনার, অভিজাত হোটেলের ছাদে আলো ঝলমলে ভৌতিক রাত, কিংবা তরুণদের জাঁকজমকপূর্ণ ভূতুড়ে পোশাকের প্রতিযোগিতা। শহরের নানা প্রান্তে টিকিট কেটে কিংবা আগাম আসন বুক করে ভূতের রাতে মেতে ওঠার এই দৃশ্য এখন বেশ স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। সংবাদমাধ্যমেও একে নাগরিক জীবনের নতুন রেওয়াজ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। আমাদের জানানো হচ্ছে, ঢাকায় হ্যালোইনের পরিধি প্রতি বছরই একটু একটু করে বাড়ছে, আর শহরের তরুণদের আগ্রহও তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে ঊর্ধ্বমুখী। কেন জানি মনে হলো, এমন দৃশ্য আগের বছরগুলোর তুলনায় এবছর একটু বেশিই চোখে পড়েছে।

যাই হোক, নিউজফিড স্ক্রল করতে করতে এসব দেখে আমি যেখানে আটকে গেছি, সেটা খোদ ওইসব আয়োজনে নয়, বরং একটা জিনিসের অনুপস্থিতিতে। রাতটা তো মৃতদের। ভূত, কঙ্কাল, কবর থেকে উঠে আসা মুখ—সবকিছুর কেন্দ্রেই তারা। (হ্যাঁ, পপ কালচারের অনেক চরিত্রও থাকে, সেটা অস্বীকার করছি না।) অথচ গোটা আয়োজনের তালিকায় তাদের জন্য কোনো জায়গা নেই। আছে খাবার-দাবার, গান, নাচ, ফিল্ম স্ক্রিনিং, প্রতিযোগিতা, উৎসবমুখর পরিবেশ। যে উৎসবের কেন্দ্রে মৃত্যু, সে ঢাকায় এসে মৃত্যুকে বাদ দিয়েই এত স্বচ্ছন্দ হয়ে গেল কীভাবে? আর তার চেয়েও জরুরি প্রশ্ন, এই শহরের একটা বিশেষ শ্রেণির তরুণেরা এই রাতে এমন কী পাচ্ছে, যা তাদের হাতের কাছে আগে ছিল না?

এই প্রশ্নের দুটো সহজ উত্তর আছে, দুটোই আমার কাছে অসম্পূর্ণ লাগে। একটা ব্যাখ্যা হচ্ছে বাজার। ব্যবসায়ীরা একটা বিদেশি উৎসবকে পণ্য বানিয়েছে, মানুষ কিনছে। আরেকটা ব্যাখ্যা সাংস্কৃতিক আগ্রাসন। ওরা পাঠাচ্ছে, আমরা নিচ্ছি। দুটোতেই আংশিক সত্য আছে, তবে পুরোপুরি নয়। আর সেটা কোথায়, তা আমরা দেখব। সমস্যা হলো: দুটোতেই মানুষকে ধরা হচ্ছে নিষ্ক্রিয়। বাজার বেচে, মানুষ কেনে। ওরা সংস্কৃতি চাপায়, আমরা গিলি। অথচ কোনো বাজার এমন কিছু বেচতে পারে না, যার জন্য ক্রেতার ভেতরে আগে থেকে কোনো চাহিদা বা শূন্যতা তৈরি হয়ে নেই। ভরাট করার জন্য আগে তো পাত্র খালি হতে হবে। অবশ্য এই শূন্যতা সব সময় বাজারের আগেই তৈরি হয়, এমন নয়। বাজারও মানুষের চাহিদাকে নতুন করে গড়ে তুলতে পারে। আসল ব্যাপার হলো, বাজার ও মানুষের চাহিদার সম্পর্কটা একমুখী নয়।

আমার কথা হচ্ছে, ঢাকার হ্যালোইন আসল বাজার পায় কেবল বাজারে নয়, তার চেয়েও গভীরে থাকা একটা শূন্যতায়। শহরের তরুণদের জন্য মৃত্যুর সঙ্গে একটা হালকা, সহজ ও খোলামেলা সম্পর্ক তৈরি করার মতো কোনো সাংস্কৃতিক মাধ্যম বা ভাষা ক্রমশ দুর্লভ হয়ে উঠেছে। প্রচলিত ধর্মীয় আচারগুলো আছে, কিন্তু সেগুলোর সঙ্গে অনেকের যাপিত জীবনের মানসিক দূরত্বও তৈরি হয়েছে। ফলে শূন্যতাটা রয়েই যায়। বাজার এই শূন্যতা একা তৈরি করেনি, সে কেবল ওই শূন্যতায় পৌঁছানোর একটা পথ তৈরি করেছে; একই সঙ্গে সেই চাহিদাকে নতুন রূপও দিচ্ছে। তবে এটুকু আমার অনুমান, কোনো অকাট্য প্রমাণ নয়। কারণ ওই রাতে যাঁরা সেজেগুজে বের হয়েছেন, তাঁদের মুখ থেকে সরাসরি কথাগুলো শোনার সুযোগ আমার হয়নি। এ নিয়ে লেখার শেষে আবার কথা বলব।

ফাঁক বা শূন্যতার কথায় যাওয়ার আগে একটা পুরোনো তর্ক আলতো করে স্পর্শ করে সরিয়ে রাখতে হবে। হ্যালোইন নিয়ে আলোচনা সাধারণত যে জায়গায় আটকে থাকে: উৎসবটা কার? সমর্থকেরা বলেন, ভূতের উৎসব আমাদের এখানেও ছিল। বিরোধীরা বলেন, এটা বাইরের জিনিস। দুজনেই আসলে জিজ্ঞেস করেন, এটার শেকড় কোথায়, আর দুজনেই ধরে নেন যে শেকড়ের উত্তরে ঝামেলা মিটে যাবে। কিন্তু বিতর্কের এই ভিত্তিটাই তো টলমলে।

প্রচলিত গল্পটা এমন। আয়ারল্যান্ডের প্রাচীন কেল্টরা গ্রীষ্মের শেষ ও শীতের শুরুর সন্ধিক্ষণে সামহাইন নামে এক উৎসব করত। এই সময়টাতে জীবিত আর মৃতের মাঝের পর্দা পাতলা হয়ে আসত বলে বিশ্বাস করা হতো। চার্চ পরে সেই উৎসবকে নিজের ক্যালেন্ডারের সঙ্গে মিলিয়ে পয়লা নভেম্বরে সর্বসাধুর দিন বা অল সেইন্টস ডে প্রতিষ্ঠা করে, আর হ্যালোইন সেই পুরোনো রাতেরই ধারাবাহিকতা। গল্পটা বেশ মসৃণ এবং সামঞ্জস্যপূর্ণ লাগে। তবে ঐতিহাসিকদের একটা বড় অংশ ঠিক এখানেই আপত্তি তোলেন। ব্রিটিশ ঐতিহাসিক রোনাল্ড হাটন আর লোকসংস্কৃতি-গবেষক স্টিভ রুড মনে করেন না যে খ্রিষ্টীয় উৎসবটি সরাসরি কোনো পৌত্তলিক উৎসবকে ঢেকে দেওয়ার উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কারণ, এর পক্ষে নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই। রুড তো সামহাইনের সঙ্গে আধুনিক হ্যালোইনের সরাসরি যোগসূত্রের প্রচলিত ব্যাখ্যাটিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেন। নিকোলাস রজার্স তাঁর বই হ্যালোইন: ফ্রম পেগান রিচুয়াল টু পার্টি নাইট (অক্সফোর্ড, ২০০২)-এ মনে করিয়ে দেন, সামহাইন যে বিশেষভাবে মৃতদের বা পূর্বপুরুষ-পূজার উৎসব ছিল, এমন শক্ত প্রমাণ নেই। আরেক ঐতিহাসিক বেথ অ্যালিসন বারের পর্যবেক্ষণও এখানে প্রাসঙ্গিক। তিনি আইরিশ ও জার্মান খ্রিষ্টীয় ঐতিহ্যে সাধুদের স্মরণের দিনপঞ্জির ভিন্নতার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। তাঁর আলোচনায় দেখা যায়, আইরিশ অঞ্চলে সাধুদের স্মরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন ছিল এপ্রিলে, অথচ জার্মান অঞ্চলে নভেম্বরের এই উৎসবের প্রচলন ছিল, যদিও সেখানকার প্রাচীন সামহাইন-ঐতিহ্যের সঙ্গে এর কোনো প্রতিষ্ঠিত সম্পর্ক ছিল না।

সামহাইন নিয়ে বেশ কিছু পুরোনো চিত্রকর্ম ও দৃশ্যকল্প প্রচলিত আছে। তবে চিত্রকর্মগুলো নিজেরা কোনো ঐতিহাসিক প্রমাণ নয়। সেগুলো মূলত পরবর্তী সময়ের কল্পনা ও রোমান্টিক ভাবনারই রূপায়ণ। রজার্সের মতে, ফ্রেজারের মতো লেখকেরা পরবর্তী মধ্যযুগীয় রীতিনীতিকে আরও প্রাচীন অতীতের ওপর চাপিয়ে দিয়েছিলেন। হাটনও তাঁর গবেষণায় স্বীকার করেন, কেল্টদের সামহাইন উৎসবে ঠিক কী কী ঘটত, সে সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান বেশ সীমিত। ফলে সামহাইনকে আধুনিক হ্যালোইনের নিশ্চিত ও সরাসরি উৎস হিসেবে হাজির করা কঠিন। অন্যদিকে, যে ঐতিহাসিক সূত্রগুলো তুলনামূলকভাবে নির্ভরযোগ্য, সেগুলো খ্রিষ্টীয় সাধু-স্মরণ, অল সেইন্টস ডে এবং তার আগের সন্ধ্যার আচারগত সম্পর্কের দিকে ইঙ্গিত করে। নামটিও সেই সম্পর্কের কথা মনে করিয়ে দেয়: 'অল হ্যালোজ ইভ'।

এরিক হবসবমের পরিভাষায়, এখানে আবিষ্কৃত ঐতিহ্যের (ইনভেন্টেড ট্র্যাডিশন) ধারণাটি প্রাসঙ্গিক। অর্থাৎ এমন এক রীতি, যাকে অনাদি ও প্রাচীন বলে উপস্থাপন করা হয়, অথচ যার বর্তমান রূপ তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক সময়ে নির্দিষ্ট সামাজিক ও ঐতিহাসিক পরিস্থিতিতে নির্মিত হয়েছে। এর মানে এই নয় যে আচারটি মিথ্যা, কিংবা তার কোনো সাংস্কৃতিক মূল্য নেই। বরং প্রাচীনত্বের দাবি এখানে ইতিহাসের কাজ যতটা করে, বৈধতা তৈরির কাজ করে তার চেয়ে ঢের বেশি। ঢাকায়, আমি যদ্দুর আঁচ করতে পারি, এই বৈধতার খোঁজ ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। দেশের একটা প্রভাবশালী ইংরেজি পত্রিকার লেখায় দেখলাম বেশ কায়দা করে সান্ত্বনা দেওয়া হয়েছে—হ্যালোইন এ শহরে নতুন হলেও আত্মাদের সঙ্গে মেলামেশার ধারণা নাকি আমাদের কাছে নতুন নয়, আর ভূত চতুর্দশীর মতো বাঙালি ঐতিহ্যের সঙ্গে এর নাকি অপ্রত্যাশিত সমন্বয় ঘটেছে! কথাটা শুনতে বেশ চটকদার হলেও এর পেছনের ফাঁকিবাজিটা মজার।

বাংলাদেশের যে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ইসলাম ধর্মের অনুসারী, যাঁদের সমাজ বা জীবনযাপনের সঙ্গে 'ভূত চতুর্দশী' বা চোদ্দ পুরুষের উদ্দেশে প্রদীপ জ্বালানোর কোনো পঞ্জিকা, ইতিহাস কিংবা প্রত্যক্ষ সাংস্কৃতিক সম্পর্ক নেই, শহুরে পত্রিকার পাতায় তাঁদের বাস্তবতাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে এই আচারকে পুরো জাতির অভিন্ন ঐতিহ্য হিসেবে হাজির করা একধরনের অন্ধ ও সুবিধাবাদী সাংস্কৃতিক প্রতিনিধিত্বের রাজনীতি। এখানে সমস্যাটা ভূত চতুর্দশী বাঙালি ঐতিহ্যের অংশ কি না, শুধু তা নয়। সমস্যাটা হলো, বাঙালি ঐতিহ্য বলতে ঠিক কাদের অভিজ্ঞতা ও স্মৃতিকে বোঝানো হচ্ছে। একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় সম্প্রদায়ের আচারকে কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই সমগ্র জনগোষ্ঠীর অভিন্ন ঐতিহ্য হিসেবে হাজির করলে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সাংস্কৃতিক বাস্তবতা আড়াল হয়ে যায়। তাছাড়া, ভূত চতুর্দশীর লক্ষ্যও সুনির্দিষ্ট: নিজের রক্তের সম্পর্ক বা পূর্বপুরুষদের মৃতদের স্মরণ। আর হ্যালোইনের ভূত মানে তো কারও নির্দিষ্ট পূর্বপুরুষ নয়, স্রেফ বাজারচলতি এক মুখোশ। ফলে কেল্টদের নাম বিক্রি করে ওদিক থেকে একটা মেকি বংশপরিচয় আনা আর এদেশের মানুষের ধর্মীয় বাস্তবতাকে বেমালুম চেপে ধরে একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় পঞ্জিকার আচারকে ব্যাখ্যাহীনভাবে 'বাঙালি ঐতিহ্য' বলে চালিয়ে দেওয়া—দুটোই আসলে একই ধরনের প্রবণতা। মানে এক আমদানি করা পণ্যকে জোড়াতালি দিয়ে ঘরোয়া বানানোর চেষ্টা। বংশের আর জোড়াতালির লড়াইয়ে না গিয়ে বরং সরাসরি জিজ্ঞাসা করা ভালো, এই উৎসবটা আসলে কার স্বার্থ উদ্ধার করছে, আর সমাজে বা রাষ্ট্রে সে ঠিক কী কাজ করছে।

আমার ধারণা, ঢাকার এই রাত মূলত তিনটা কাজ একসঙ্গে করছে, আর তিনটাই একে অন্যের সঙ্গে গভীর সুতোয় বাঁধা।

প্রথম কাজটা সবচেয়ে গোড়ার: সে মৃত্যুকে ছোঁয়ার সুযোগ দেয়, অথচ কোনো দায়দায়িত্ব কাঁধে চাপায় না। এখানকার সমাজে স্মরণের আচারগুলোর কথা ভাবা যাক: কবরের পাশে দাঁড়ানো, জানাজা, দোয়া কিংবা কাছের মানুষদের নিয়ে শোকের সেই ভারিক্কি পরিবেশ। এসব আচার আমাদের কাছে অনেক কিছু দাবি করে। বিশ্বাস চায়, শোক চায়, নিজের একদিন চলে যাওয়ার অনিবার্য সত্যটা মনে করিয়ে দেয়, আর রবের সামনে চূড়ান্ত জবাবদিহির একটা কাঁপন ধরিয়ে দেয়। হ্যালোইন এর কোনোটাই চায় না। ভূতের পোশাক পরে মৃত্যুর রাতে ঢোকা যায় এবং একবারের জন্যও সত্যিকারের কোনো মৃত্যুর মুখোমুখি না হয়েই আবার ফুরফুরে মেজাজে বেরিয়ে আসা যায়।

ম্যাক্স ওয়েবার আধুনিক জগতের যে বৈশিষ্ট্যকে বলেছিলেন 'মোহমুক্তি' (ডিসএনচ্যান্টমেন্ট), অর্থাৎ জগৎ থেকে রহস্য ও অতিপ্রাকৃতের আবরণ ক্রমশ খসে পড়ার যে আধুনিক প্রক্রিয়া, হ্যালোইন যেন তারই এক সস্তা ও বিকৃত ছায়া। যে সমাজ মৃত্যুকে স্রেফ একটা চিকিৎসাবিদ্যার নির্ধারিত সময়সীমা বা হাসপাতালের ফাইলবন্দি ঘটনা বানিয়ে দূরে ঠেলে দিয়েছে, সে মৃত্যুকে সামলায় নীরবতা দিয়ে, কিংবা শোক কাটিয়ে ওঠার জন্য নির্দিষ্ট সামাজিক রীতি ও সময়সীমা তৈরি করে। আমার ধারণা, সেই চাপা দেওয়া ও অস্বীকার করা মৃত্যুই তখন ফিরে আসে খেলার সুরতে। ভয় আর ভয় থাকে না, হয়ে যায় একটা পরিকল্পিত ও নিয়ন্ত্রিত থ্রিলার, যার শুরু সন্ধ্যা সাতটা নাগাদ, আর শেষ রাত এগারোটায়। বিশ্বাসের সঙ্গে সম্পর্কহীন এই আয়োজনে মৃত্যু তখন হয়ে ওঠে এক নিরাপদ জেশ্চার। অনেকের কাছে সম্ভবত এটাই মৃত্যুর কাছে যাওয়ার এমন এক ধরন, যা তাঁরা কোনো অস্বস্তি ছাড়াই গ্রহণ করতে পারেন। তবে ঢালাওভাবে এই দাবি করতে চাই না যে, হ্যালোইনে অংশ নেওয়া প্রত্যেক মানুষই মৃত্যুর ধর্মীয় বা অস্তিত্বগত অর্থ এড়িয়ে চলতে চান। বরং উৎসবটির বাণিজ্যিক ও নাগরিক রূপটি এমন এক পরিসর তৈরি করে, যেখানে মৃত্যুর প্রতীক ব্যবহার করা যায়, অথচ মৃত্যুর বাস্তবতা নিয়ে কোনো গভীর প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। আর ঠিক এই কারণেই বোঝা যায়, এখানে চাহিদাটা মৃত্যুর প্রতি কোনো শ্রদ্ধাবোধের চেয়ে মৃত্যুর এক দায়মুক্ত সংস্করণের প্রতি বেশি।

দ্বিতীয় কাজটা সম্মিলিত ও প্রকাশ্য আনন্দের একটা পরিসর তৈরি করা, যার মধ্যে কিছুটা কৃত্রিমতাও আছে। ঢাকার তরুণ মধ্যবিত্তের হাতে দল বেঁধে করার মতো উৎসব এমনিতেই কম, আর যা আছে তার বেশির ভাগই কোনো না কোনো সামাজিক বা ধর্মীয় পরিচয়ের সুনির্দিষ্ট গাম্ভীর্য বহন করে। হ্যালোইন সেখানে একেবারে হালকা এক মুক্তির পথ। পত্রিকার পাতায় লেখা হয়, ঢাকায় হ্যালোইন নাকি সৃজনশীল প্রকাশের এক দারুণ ক্ষেত্র হয়ে উঠছে, যেখানে শিল্পী আর পোশাকপ্রেমীদের একটা ছোট কিন্তু উদ্দীপ্ত কমিউনিটি তৈরি হচ্ছে। 'কমিউনিটি' শব্দটাই এখানে সবচেয়ে লক্ষণীয়। এ রাত অনেকের কাছে শুধু ভোগবিলাসে সীমাবদ্ধ নয়; নিজের মতো করে সেজে তা সবার সামনে মেলে ধরার এক সুযোগ। পরিচিত সামাজিক পরিচয়ের বাইরে গিয়ে সাময়িকভাবে অন্য কিছু হয়ে ওঠার সুযোগও হয়তো এতে আছে। কেউ ডাইনি, কেউ ভ্যাম্পায়ার, কেউ কঙ্কাল—এই সাজের ভেতর দিয়ে মানুষ নিজের দৈনন্দিন পরিচয় থেকে খানিকটা দূরে সরে দাঁড়াতে পারে। এই অভিজ্ঞতাকে নিছক ভোগবাদ বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে এটাও দেখতে হবে, সেই সাময়িক মুক্তির পরিসরটি কোন ধরনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ভেতর তৈরি হচ্ছে।

তৃতীয় কাজটা শ্রেণির, অর্থাৎ নিজেকে অভিজাত সমাজে দৃশ্যমান করা। জনপ্রতি তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকার প্রবেশমূল্য আর পাঁচতারকা হোটেলের ছাদের বুফে যাঁদের নাগালে, সমাজে তাঁদের সংখ্যা সীমিত। পিয়ের বুর্দিয়ো রুচিকে বলেছিলেন 'বিশিষ্টতা' (ডিস্টিংকশন), অর্থাৎ রুচির মাপকাঠিতে নিজের সামাজিক অবস্থানকে আলাদা করে চেনানো। কে কোন সাজে, কোন পাঁচতারকা হোটেলের ছাদে, কার সঙ্গে পোজ দিয়ে ছবি তুলছে—ছবির এই যুগে সেটাও পরিষ্কার বলে দেয় সে কোন শ্রেণির বা কোন সামাজিক বলয়ের মানুষ। দাম আর ঠিকানার এই আয়োজন থেকেই শ্রেণির ছাপ জলের মতো পরিষ্কার। অংশগ্রহণকারীদের প্রত্যেকের ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য যাই থাকুক না কেন, এই জমকালো প্রদর্শনী দিনশেষে ঠিকই বলে দেয়, এরা কোন অভিজাত জগতের বাসিন্দা। অর্থাৎ উৎসবটি একই সঙ্গে আনন্দের উপলক্ষ এবং সামাজিক অবস্থান জানান দেওয়ার একটি মাধ্যম হয়ে ওঠে। এখানে অংশগ্রহণের সামর্থ্যটাও অংশগ্রহণের মতোই গুরুত্বপূর্ণ। কে উৎসবে গেল, তার চেয়েও কখনো কখনো বড় হয়ে ওঠে কে কোথায় গেল, কত খরচ করল এবং সেই অভিজ্ঞতাকে কতটা দৃশ্যমান করে তুলতে পারল।

এই তিন কাজের মিলিত ফল দাঁড়িয়েছে এমন এক পণ্যের বাজারে, যা মৃত্যুর প্রতীক অথচ মৃত্যুহীন, সম্মিলিত অথচ প্রায় শর্তহীন, আনন্দের অথচ একই সঙ্গে একধরনের বিশিষ্ট ও একচেটিয়া সামাজিক মর্যাদার বাহক। এই জিনিস ঢাকায় নতুন করে আবিষ্কার করতে হয়নি। সে এসেছে প্রায় তৈরি প্যাকেজ হিসেবে। আর কীভাবে এসেছে, সেখানেই লুকিয়ে আছে বাজারের আসল কারসাজি।

কোনো সংস্কৃতিকে ছড়িয়ে দেওয়াই বাজারের একমাত্র কাজ নয়, বরং সেই সংস্কৃতিকে কীভাবে ভোগের উপযোগী করে তুলতে হয়, সে ব্যাপারেও তার দক্ষতার কমতি নেই। মার্কিন খুচরা বিক্রেতাদের সংগঠন এনআরএফের হিসাব বলছে, সেখানে হ্যালোইনকে ঘিরে প্রতিবছর কয়েক শ কোটি ডলার ব্যয় হয়, যার বিরাট একটা অংশ জুড়ে থাকে নানা ধরনের কস্টিউম, সাজসজ্জা ও প্রসাধনী। এই ধরনের একটি বৈশ্বিক বাণিজ্যিক ব্যবস্থার সারা দুনিয়ায় পৌঁছানোর ক্ষমতা আছে, আর তার ফর্মুলাও একেবারে ধরাবাঁধা: সাজগোজ, সাজসজ্জা, খাওয়াদাওয়া আর পার্টি। এই ছাঁচের ভেতরটা খতিয়ে দেখলে একটা জিনিস খুব স্পষ্ট হয়। বাজার মৃত্যুর গম্ভীর বাস্তবতার জন্য তৈরি নয়, সে তৈরি কেবল বিক্রিযোগ্য পণ্যের জন্য। আর যা বিক্রিযোগ্য, তার জন্য তো কাউকে কোনো দিন জবাবদিহি করতে হয় না। আমার কাছে এই মিলটা মোটেও কাকতালীয় মনে হয় না। দায়হীন মৃত্যুর চাহিদা আর দায়হীন পণ্যের যুক্তি একই রেখায় হাঁটে, আর ঠিক সেখানেই বাজার ও মানুষের এই শূন্যতা একে অপরকে চিনে নেয়। অবশ্য বাজার শুধু মানুষের আগে থেকে থাকা চাহিদার ওপর ভর করে চলে না। সে চাহিদাকে নতুন করে সাজায়, তার ভাষা তৈরি করে, এমনকি মানুষ কী চাইবে, সেটাও অনেকাংশে নির্ধারণ করে দেয়। হ্যালোইনের ক্ষেত্রেও এই দুই প্রক্রিয়া পাশাপাশি কাজ করছে। মানুষের মধ্যে মৃত্যুকে ঘিরে একধরনের কৌতূহল, ভয় ও বিনোদনের আকাঙ্ক্ষা আগে থেকেই থাকতে পারে। বাজার সেই আকাঙ্ক্ষাকে নির্দিষ্ট পোশাক, সাজসজ্জা, খাবার ও অনুষ্ঠানের মাধ্যমে কিনে নেওয়ার মতো অভিজ্ঞতায় পরিণত করছে।

ঢাকায় এই বাহনের পথটাও বেশ ইঙ্গিতপূর্ণ। এক দশক আগেও এই শহরে হ্যালোইনকে পুরোপুরি বিদেশি ও বেমানান ঠেকত। এখন সে এসেছে হোটেল, রিসোর্ট আর অভিজাত ক্যাফেগুলোর হাত ধরে, যেসব জায়গায় বিদেশি বিলাসিতা আগে থেকেই স্বাভাবিক করে রাখা হয়েছে। উৎসবের অংশ হিসেবে বিচিত্র প্রতিযোগিতা হয়, সেখানে দেওয়া হয় লোভনীয় উপহার। ভয় আর অন্ধকারের একটি উৎসবে পুরস্কার যখন এমন ভোগবাদী উপঢৌকন, তখন মৃত্যুকে স্রেফ সাজসজ্জার ব্যাকগ্রাউন্ডে নামিয়ে আনা হচ্ছে বললেও হয়তো কম বলা হয়। এখানে আন্তোনিও গ্রামসির 'ভাবাধিপত্য' (হেজেমনি) ধারণাটা খুব মিলে যায়: কেউ কাউকে বন্দুকের মুখে বাধ্য করছে না। বরং ব্যাপারটা মজার, চটকদার, সোশ্যাল মিডিয়ার ফিডে সুন্দর দেখানোর মতো। কেউ যদি এর বিরুদ্ধে সামান্য আপত্তি তোলে, উল্টো তাকেই রসকষহীন এক মান্ধাতা আমলের কিংবা বুমার বলে দাগিয়ে দেওয়া হয়। আধিপত্য ঠিক এভাবেই কাজ করে। কোনো কিছুকে সামাজিক চেতনার ভেতর এতটাই স্বাভাবিক ও নিরীহ করে তোলে যে, এর বিরুদ্ধে একটা প্রশ্ন তোলাটাই বোকামি বলে মনে হয়। হোমি ভাবা যার নাম দিয়েছিলেন 'অনুকরণ' (মিমিক্রি)। অর্থাৎ প্রভাবশালী সংস্কৃতির এমন এক অনুকরণ, যা অবিকল তার মতো হতে চায়, কিন্তু কখনোই পুরোপুরি তা হয়ে উঠতে পারে না। তবে এই অনুকরণ নিছক নকল নয়; এর ভেতরে স্থানীয় রুচি, সামাজিক আকাঙ্ক্ষা ও শ্রেণিগত অবস্থানেরও প্রকাশ ঘটে। ঢাকার হ্যালোইনও নিউইয়র্কের হ্যালোইন নয়। ওই 'almost-but-not-fully' অবস্থার ভেতরেই দেশি অভিজাতদের কিছু নিজস্ব রূপ-রং, আকাঙ্ক্ষা আর ভনিতা ঢুকে পড়ে। ফলে বিদেশি উৎসবটি এখানে এসে কেবল অনুকৃত হয় না, স্থানীয় সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে মিশে নতুন একটি রূপও পায়।

তবে এর পেছনের প্রাতিষ্ঠানিক চালিকাশক্তি কারা, তা বুঝতে হলে দরজার চাবি কার হাতে আছে, সেদিকে তাকাতে হবে। সৌদি আরবের দিকে তাকালে বিষয়টি আমরা বুঝতে পারব কিছুটা। ২০১৮ সালে সেখানে হ্যালোইন আয়োজনকে ঘিরে কর্তৃপক্ষের অভিযান ও গ্রেপ্তারের খবর পাওয়া গিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে দেশটির 'ভিশন ২০৩০' প্রকল্পের অধীনে বিনোদন ও জনসমাগমের নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। ফলে একসময় যে ধরনের আয়োজন কর্তৃপক্ষের বাধার মুখে পড়েছিল, পরবর্তী সময়ে সেগুলোরই কিছু রূপ রিয়াদের রাস্তায় প্রকাশ্যে দেখা যেতে থাকে। দানব আর ডাইনির সাজে মানুষ রাস্তায় নামল। স্থানীয় সমালোচকেরা তখন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, এটা তো আমাদের প্রথা নয়। আর তরুণদের অনেকে উৎসাহ নিয়ে বলল, সৌদি বদলাচ্ছে! কথা হলো, ক্ষমতার চাবি যার হাতে, সে-ই আসলে ঠিক করে দেয় কখন কোন বিনোদন প্রকাশ্যে নামবে। যেই দরজাটা একটু ফাঁক করা হলো, অমনি মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়ল। এ থেকে অন্তত এটুকু ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, রাষ্ট্রের অনুমোদন বা নিষেধাজ্ঞার বাইরেও মানুষের মধ্যে নতুন ধরনের বিনোদনের প্রতি একটি আকাঙ্ক্ষা আগে থেকেই মজুদ ও প্রস্তুত ছিল। হ্যাঁ, একটা দিনের উৎসব বা একটা খবরের প্রতিবেদন দিয়ে আস্ত একটা দেশের মনস্তত্ত্ব পড়া যায় না। সৌদি আরবের রাষ্ট্র, সমাজ ও ধর্মীয় বাস্তবতার সঙ্গে ঢাকার বাস্তবতারও বিস্তর পার্থক্য আছে। তবু ঘটনাটি আমাদের একটি বিষয় ভাবতে সাহায্য করে: বাজার বা রাষ্ট্র হয়তো কোনো বিনোদনের পথ নিয়ন্ত্রণ করে, কখনো খুলে দেয়, কিন্তু মানুষের সেই বিনোদনের প্রতি আগ্রহের উৎস সব সময় তাদের হাতে তৈরি হয় না। সেই আকাঙ্ক্ষা সমাজের ভেতরে আগে থেকেই তৈরি হয়ে থাকতে পারে, কিংবা নতুন সামাজিক পরিস্থিতিতে ধীরে ধীরে গড়ে উঠতে পারে।

আর ঠিক এখানেই মূল সংকটটা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। গ্যাপটা আসলে কোথায়? আমাদের সমাজে তো মৃতদের স্মরণের আচারের কোনো কমতি নেই। হ্যাঁ, আসলেই কমতি নেই। কিন্তু সংকটটা আচারের পরিমাণের নয়, সংকট হলো আমাদের ঐতিহ্যগত ও ধর্মীয় স্মরণের ভাষার সঙ্গে এই শহরের তরুণ জীবনের যাপিত মানসিকতার তৈরি হওয়া দূরত্বে। ইসলামী জীবনদর্শন ও ঐতিহ্য অনুযায়ী মৃত্যুকে স্মরণ করার যে ভাষা, তা কোনো খেলনা নয়; তা কবর, আখিরাত এবং মানুষের চূড়ান্ত দায়বদ্ধতার ভারে গম্ভীর ও পবিত্র। আমাদের জানাজা, কবর জিয়ারত, দোয়া বা ইস্তিগফারের প্রতিটি স্তরে থাকে মৃত্যুর সেই কঠিন সত্য ও রবের সামনে জবাবদিহির ভয়। অন্যদিকে শহুরে তরুণ প্রজন্মের একটি অংশের কাছে সেই ভার বহন করা ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে। তারা হয়তো এমন এক হালকা, ঐচ্ছিক ও দায়মুক্ত বিনোদনের পরিসর খুঁজছে, যা মৃত্যুর কথা বলবে অথচ পরকালের কোনো হিসাব বা গাম্ভীর্যের মুখোমুখি দাঁড় করাবে না। এখানে সংকটটা শাশ্বত ধর্মীয় বোধ থেকে বিচ্ছিন্ন একটি আত্মকেন্দ্রিক প্রজন্মের তৈরি করা শূন্যতা—এমন সরল সিদ্ধান্তে পৌঁছানো অবশ্য ঠিক হবে না। বরং বলা যায়, আধুনিক নগরজীবনে ধর্মীয় স্মরণের ভাষা ও তরুণদের যাপিত অভিজ্ঞতার মধ্যে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে, হ্যালোইনের মতো উৎসব সেই দূরত্বের ভেতর দিয়ে প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছে। মৃত্যুর স্মরণকে সেখানে নামিয়ে আনা হচ্ছে স্রেফ থ্রিলারে। তবে অংশগ্রহণকারীদের প্রত্যেকের অভিজ্ঞতা বা উদ্দেশ্য যে একই, তা নয়। কারও কাছে এটি নিছক পোশাক ও সাজসজ্জার খেলা, কারও কাছে বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে আনন্দ করার উপলক্ষ, আবার কারও কাছে পরিচিত সামাজিক পরিচয়ের বাইরে সাময়িকভাবে নিজেকে প্রকাশ করার সুযোগ। কিন্তু ব্যক্তিগত উদ্দেশ্যের এই ভিন্নতা উৎসবটির সামগ্রিক সামাজিক ও বাণিজ্যিক চরিত্রকে আড়াল করে না।

বিদেশ থেকে সেই চটকদার ও দায়হীন বিনোদন প্রায় তৈরি প্যাকেজ হিসেবে এসে হাজির হয়েছে, আর বাজার কেবল তার বাহক হিসেবে কাজ করেনি; স্থানীয় চাহিদার সঙ্গে মিলিয়ে তার নতুন রূপও তৈরি করেছে। বলাই বাহুল্য, যে মানুষ নিজের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কগুলো থেকে ক্রমশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, বাজার তার জন্য খুব সহজেই নতুন আকাঙ্ক্ষা ও নতুন পরিচয়ের জায়গা তৈরি করতে পারে। আর আজকের শহুরে ভোগবাদী যাপন যেমন মানুষের মধ্যে আত্মকেন্দ্রিকতার প্রবণতা বাড়ায়, তেমনি সেই আত্মকেন্দ্রিক মানুষই আবার এই যাপনের সবচেয়ে অনুগত ক্রেতা হয়ে ওঠে। এখানে বাজার ও ব্যক্তির সম্পর্কটা পরস্পরকে শক্তিশালী করে। মানুষ নিজের পছন্দমতো আনন্দ ও পরিচয়ের খোঁজ করে, আর বাজার সেই পছন্দকে নির্দিষ্ট পণ্যের আকারে হাজির করে। তবে এর অর্থ এই নয় যে আমাদের নিজস্ব ধর্মীয় ও ঐতিহ্যিক আচারের ভেতর কোনো কাঠামোগত ঘাটতি আছে। কিংবা আধুনিক মানুষের প্রতিটি নতুন সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতাকে ধর্মীয় ঐতিহ্য থেকে বিচ্যুতি হিসেবে দেখতে হবে। এর সহজ অর্থ হলো, আধুনিক ভোগবাদী হাওয়ায় গা ভাসানো একশ্রেণির তরুণের না-বলা ও অমীমাংসিত চাহিদার সঙ্গে আমাদের প্রচলিত ধর্মীয় স্মরণের ভাষার একটি দূরত্ব আছে, এবং থাকাটাই স্বাভাবিক। আমাদের ধর্মীয় আচার মৃত্যুকে হালকা বিনোদনে পরিণত করার অনুমতি দেয় না; বরং তাকে জীবনের চূড়ান্ত বাস্তবতা ও জবাবদিহির সঙ্গে যুক্ত করে। ফলে যারা মৃত্যুকে ঘিরে এমন এক অভিজ্ঞতা খুঁজছে, যেখানে রোমাঞ্চ থাকবে কিন্তু সেই জবাবদিহি থাকবে না, তাদের জন্য হ্যালোইনের মতো উৎসব একটি সহজ বিকল্প হয়ে উঠছে। সমস্যাটা তাই শুধু বিদেশি উৎসবের আগমন নয়। সমস্যাটা হলো, আমাদের সমাজের ভেতরে তৈরি হওয়া এই সাংস্কৃতিক ও মনস্তাত্ত্বিক দূরত্বকে বাজার কীভাবে নিজের পণ্যের পক্ষে কাজে লাগাচ্ছে।

শেষ পর্যন্ত এই পুরো আলোচনাটা গিয়ে ঠেকে সেই মৌলিক প্রশ্নে। ধরা যাক, কালকে শহুরে বাণিজ্যের এই রঙিন তালিকায় আমাদের নিজেদের জানাজা, কবর জিয়ারত বা মৃতদের স্মরণের চিরন্তন রীতিগুলোকেও কেউ টেনে আনতে চাইল। অথচ আমাদের সেই গম্ভীর আচারে কোনো প্রবেশমূল্য থাকে না, বিজয়ীদের জন্য কোনো পুরস্কার থাকে না, ক্যামেরার লেন্সের সামনে পোজ দেওয়ার জন্য কোনো কৃত্রিম সাজ বা হাসিমুখও থাকে না। সেখানে থাকে কেবল নীরব কান্নায় ভিজে ওঠা বুক, চোখের পানি আর নিজের একদিন চলে যাওয়ার সেই কঠিন হিসাব মেলানোর ভয়। কিন্তু সেই গোরস্থানের গম্ভীর নীরবতার সামনে এই শহরের কসপ্লেপ্রেমী ভিড় গিয়ে দাঁড়াবে কি? সম্ভবত না। কারণ ওখানে মৃতেরা সত্যিই আছেন, আর আখিরাত ও হিসাবের সেই অপরিবর্তনীয় বাস্তবের সামনে দাঁড়িয়ে ডাইনি বা ভ্যাম্পায়ার সেজে কৌতুক করার অবকাশ থাকে না। এখানে অবশ্য কথাটা হ্যালোইনে অংশ নেওয়া মানুষদের ব্যক্তিগত সাহস বা বিশ্বাস নিয়ে নয়; বরং দুটি ভিন্ন অভিজ্ঞতার পার্থক্য নিয়ে। একটিতে মৃত্যু একটি সাজানো দৃশ্য, অন্যটিতে তা জীবনের অনিবার্য বাস্তবতা। একটিতে ভয়ের শুরু ও শেষ নির্দিষ্ট, অন্যটিতে মৃত্যুর কথা মনে পড়লে নিজের অস্তিত্ব ও দায়বদ্ধতা নিয়েই প্রশ্ন জাগে।

তাই 'উৎসবটি আমাদের কি না'—এই গতানুগতিক প্রশ্ন এখানে সম্পূর্ণ ভুল। আসল প্রশ্ন হওয়া উচিত, আমরা মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তার নৈতিক ভারটুকু বইতে কতটা প্রস্তুত, নাকি কেবল নিছক রোমাঞ্চটুকু নিয়ে পালিয়ে যেতে চাই? উত্তরটা অবশ্য সবার জন্য এক নয়। তবু উৎসবটির যে বাণিজ্যিক ও নাগরিক রূপ আমাদের সামনে হাজির হয়েছে, সেখানে মৃত্যুর বাস্তবতার চেয়ে তার দৃশ্যমান প্রতীকগুলোরই কদর বেশি। এই আয়োজনে ভূত আছে, কঙ্কাল আছে, কবর থেকে উঠে আসা মুখ আছে; আছে পোশাক, আলো, খাবার, পুরস্কার আর ছবি তোলার অসংখ্য উপলক্ষ। অথচ ভূতের এই জমকালো আয়োজনে সবচেয়ে উপেক্ষিত ও অনুপস্থিত যে চরিত্রটি থাকে, সে আর কেউ নয়—খোদ সেই মৃত মানুষগুলোই।