ওভামির আনজুমের সাথে বাতচিত : ইসলাম, রাষ্ট্র, রাজনীতি ও জুলাই গণঅভ্যুত্থান
সওয়াল-জবাব
১। ইসলাম কীভাবে ব্যক্তি ও সমষ্টির স্বার্থের মধ্যকার চিরস্থায়ী টানাপোড়েনের সমাধান করে?
জবাব
ব্যক্তি স্বার্থ বনাম সামষ্টিক স্বার্থের সমস্যার সমাধান কীভাবে করা হবে তা হচ্ছে যে-কোন আইনি এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থার মৌলিক প্রশ্ন। ইসলামী শরীয়তের পুরোটাই হচ্ছে এই প্রশ্নের একটি সমাধান। এই প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত উত্তর হচ্ছে—ইসলাম ব্যক্তি ও সমষ্টির মাঝে নিখুঁত ভারসাম্য সৃষ্টি করে। অন্যান্য জীবনব্যবস্থা এই প্রশ্নের যে সমাধান দেয়, তা থেকে ইসলামের এই ভারসাম্য সুস্পষ্ট। আধুনিক পাশ্চাত্যে লিবারেলিজমের আদর্শের আধিপত্য। এ আদর্শে ব্যক্তি স্বার্থ, স্বাধীনতা এবং অধিকারকে প্রাধান্য দেয়া হয়। এই আদর্শের সুবিধা হচ্ছে এই যে, তা অন্তত কিছু ব্যক্তির ক্ষমতায়ন করে এবং তাদের সৃষ্টিশীলতা ও উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে উন্মুক্ত করে; সেইসাথে তাদের ঊর্ধ্বমুখী সামাজিক গতিশীলতা ও পরিবর্তনের পথ সহজ করে দেয়। তবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সকল দুর্নীতির কথা না ধরেই বলা যায়, বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জন্য এই আদর্শ দুর্দশার কারণ এবং মানবপ্রকৃতি বিরোধী। ব্যক্তি উপাসনা কিছু ক্ষমতাশালী ও চতুর মানুষ অনুসৃত নব্য পৌত্তলিকতা হয়ে উঠে। লিবারেলিজমের ঠিক অপর প্রান্তে রয়েছে হিন্দু ধর্ম, যার ভিত্তি হচ্ছে মানুষের মধ্যকার অসমতাকে মৌলিক ধরে নেয়া, মানুষকে বিভিন্ন বর্ণে বিভক্ত করা এবং সামাজিক শৃঙ্খলার জন্য ব্যক্তিকে কুরবান করে দেয়া। হিন্দু ধর্মের মানুষের উপর নিপীড়ন এবং মানবিক মর্যাদার লঙ্ঘন বিষয়ে আলোচনার পুনরাবৃত্তি এখানে নিষ্প্রয়োজন। ইসলাম এই উভয় রকমের প্রান্তিকতার বিরোধী। ইসলাম অনুযায়ী, মানুষ আল্লাহর সামনে ব্যক্তি হিসেবে একাই দাঁড়াবে এবং শরীয়তেও ব্যক্তির অধিকার ও কর্তব্য রয়েছে। এরপরও ইসলাম ধর্মীয় প্রথা দ্বারা সুসংহত পারিবারিক ও সম্প্রদায়গত জীবন যে মানবীয় সমৃদ্ধির জন্য অপরিহার্য তা স্বীকার করে নেয়। ইসলাম বলে যে, পরম সত্যকে অস্বীকারকারী অমুসলিমরাও পরিবার ও সম্প্রদায়ের এই সুবিধা ভোগ করা উচিত। এজন্য ইসলাম অমুসলিমদের উপর শরীয়তের সম্প্রদায়গত ও ধর্মীয় দিক চাপিয়ে দেয় না। ব্যক্তি ও সমষ্টির মধ্যে ইসলাম এই যে ভারসাম্য রক্ষা করে তার আরো ভুড়ি ভুড়ি উদাহরণ দেয়া যেতে পারে।
উপর্যুক্ত সব বিষয়ের পরও এটা মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে, ইসলাম সত্য। ইসলাম যদি কোন সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানের ওয়াদা নাও করে, তবুও তা নিজের অধিকারেই অপরিসীম মূল্যবান। কোন সমস্যা সমাধানের উপযোগিতা ইসলামের মধ্যে আছে এর ভিত্তিতে আমাদের উচিত না ইসলামকে সমর্থন করা বা তাকে মূল্য দেয়া। বরঞ্চ ইসলাম হচ্ছে সত্য। যখন কেউ কোরআনের উচ্চতর উপলব্ধি অর্জন করে, তার জন্য এমনভাবে সমস্যাগুলোর রূপান্তর ঘটে যে, তার প্রতিটি ব্যক্তিগত ও সামাজিক কাজ সর্বপ্রথম ও সর্বাগ্রে আল্লাহর জন্য, আল্লাহর দ্বারা এবং আল্লাহর সাথে মুয়ামালাত বা লেনদেন হয়ে দাঁড়ায়।
২। ড. ওয়ায়েল হাল্লাকের বই ‘The Impossible State’ আধুনিক ইসলামী রাষ্ট্রের ধারণার ব্যাপারে অনেক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। ড. ওয়ায়েল হাল্লাক যেমনটা কিনা তাঁর এই গ্রন্থে বলেছেন, আপনিও কি তাঁর মত আধুনিক রাষ্ট্রের কাঠামোর ভেতরে ইসলামী শাসনব্যবস্থাকে অসম্ভব মনে করেন?
জবাব
হাল্লাকের বইটি শরীয়াকে এর ক্লাসিক্যাল গঠনরূপে একটি অনৈতিহাসিক আদর্শ আকারে এবং আধুনিক জাতিরাষ্ট্রকে একটি নমুনাগত কাঠামো হিসেবে দেখেন। জাতিরাষ্ট্রীয় কাঠামোর বৈশিষ্ট্য হিসেবে তিনি সার্বভৌমত্ব, আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ, আইন সঙ্কলন, সহিংসতার একচেটিয়া অধিকার, নৈতিকতানিরপেক্ষতা ও আত্মসংরক্ষণ এবং অনুগত নাগরিক তৈরীর জন্য সাংস্কৃতিক ও শৃঙ্খলা ক্ষমতা ব্যবহার করা– এসবকে চিহ্নিত করেন। হাল্লাকের যুক্তির শক্তিশালী দিক হলো, আমরা পাশ্চাত্য থেকে কি আমদানি করেছি সেটার ব্যাপারে পুনঃচিন্তা করার জন্য আমাদের আন্দোলিত করা। কিন্তু তাঁর যুক্তির দুর্বল দিক হলো এটি ইতিহাস ও কর্তাসত্ত্বাকে যথাযথ মূল্যায়ন করতে সক্ষম হয় নি। এর অর্থ হাল্লাকের যুক্তি তিনটি ব্যাপার যথাযথভাবে মোকাবেলা করতে সক্ষম হয় নি—
• প্রথমত, এই ব্যাপারটি মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হওয়া যে, রাষ্ট্র সব জায়গায় একইরকম না। এর মডেলও ক্রমাগত পরিবর্তনশীল এবং এর ঔপনিবেশিক শিকড় ও বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানসমূহ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হওয়ার পরও এর বিরুদ্ধে স্থানীয়ভাবে প্রতিরোধ ও কর্তাসত্ত্বার চর্চা করা যায়।
• দ্বিতীয়ত, এটা মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হওয়া যে, ইসলাম কেবল ফিকাহর গ্রন্থের ক্লাসিক্যাল শরীয়তের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরঞ্চ তা মানবহৃদয়ে স্থান করে নেয়া এর চেয়েও অনেক বড় ও শক্তিশালী সত্য। ইসলাম আধুনিকতার চেয়েও অনেক বেশি দৃঢ়চিত্ত। এরই একটি অনুসিদ্ধান্ত হলো—ইসলামে রাজনীতি ও সামষ্টিক কাজের জরুরত; সেটা সশস্ত্র জিহাদের আদলে হোক কিংবা হোক সামাজিক সংগ্রামের আদলে।
• তৃতীয়ত এবং সর্বশেষ দিকটি হলো—জীবিত মুসলিম আলেম ও চিন্তাবিদগণ কর্তৃক প্রস্তাবিত রাষ্ট্র ও আধুনিকতার কিছু দিককে চ্যালেঞ্জ করে এবং অন্যান্য কিছু দিককে গ্রহণ ও এর সাথে খাপ খাইয়ে নেয়—এমন প্রকল্পসমূহের সাথে হাল্লাকের ফলপ্রসূ প্রলম্বিত বোঝাপড়ার অনুপস্থিতি।
ইসলাম কেবলমাত্র জীবন্তই নয়, এটি বর্তমান পৃথিবীতে সবচেয়ে প্রাণবন্ত ধর্মীয় ও সামাজিক শক্তি, যদিও ইসলামকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে দমন করা হচ্ছে। তাই আমরা ইসলামের ব্যাপারে এমনভাবে কথা বলতে পারি না, যেন আমরা কোন ল্যাব বা যাদুঘরের নমুনা নিয়ে কথা বলছি। পন্ডিতরা যেমন ইসলাম নিয়ে গবেষণা করছেন, ইসলামও যেন তাদের পর্যবেক্ষণ করছে এবং সাড়া দিচ্ছে। হাল্লাক এই পারস্পরিক আলাপচারিতাকে সামনে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে খুব সম্ভব আমাদের সাথে শরীক হবেন।
সবশেষে বলা দরকার যে, মুসলিমদের জন্য কোন বিদ্যমান ব্যবস্থাকে বোঝাপড়া ও পুনঃনির্মাণের কাজ সর্বপ্রথম ও সর্বাগ্রে আল্লাহর সাথে লেনদেনের ব্যাপার। আমাদের এটা ভুলা উচিত না যে, “যে আল্লাহকে ভয় করে চলে, আল্লাহ তার জন্য উপায় বের করে দেন এবং তাঁকে এমন জায়গা থেকে রিযিক দেন, যার চিন্তাও সে করে না।” (আল-কোরআন ৬৫ : ২-৩)
গাজার মুসলিমদের তাদের নির্মূল করতে চাওয়া বৈশ্বিক গণহত্যাকারী শক্তির বিরুদ্ধে যে সংগ্রাম ও দৃঢ়তা তা এই সত্যের সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
৩। সম্প্রতি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সাথে সম্পৃক্ত একজন পরিচিত ব্যক্তিত্বের একটি কথা বেশ তর্ক-বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তার মতে, বাংলাদেশী ইসলাম পাকিস্তানী ইসলাম বা আরব ইসলাম থেকে আলাদা। একক কোন ইসলাম বলে কিছু নেই, বরঞ্চ একাধিক ইসলাম রয়েছে। বাংলাদেশী ইসলাম হিন্দু ধর্ম, বৌদ্ধ ধর্ম, বাংলাদেশের জলবায়ু ও পরিবেশ এসবের সাথে মিথষ্ক্রিয়ার মাধ্যমে স্বতন্ত্রভাবে রূপ লাভ করেছে। ইসলামে বিভিন্ন চিন্তাধারার বহুত্বের বহিঃপ্রকাশের মাধ্যমে আমরা আপাতঃদৃষ্টিতে ইসলামের বহুত্ব দেখতে পাই, সেটাকে আমরা কীভাবে ব্যাখ্যা করবো?
জবাব
ইসলাম কি একক নাকি অনেক— এই বিশ্বাস নির্ভর করে আমরা কি আল্লাহ প্রেরিত মহানবী মুহাম্মাদ (সা) এর রিসালাতের উপর বিশ্বাস রাখি নাকি আমরা এর ব্যাপারে সন্দিহান এবং কেবল ইসলামের সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক প্রকাশের দিকে তাকাতে চাই। সেক্যুলার জ্ঞানের শাখাগুলো খোদায়ী সত্যকে সহজে আমলে নিতে পারে না, কারণ সেগুলো দর্শনগতভাবে ইতিহাসবাদের সাথে সংযুক্ত হয়ে পড়েছে। ইতিহাসবাদ নিজেই একটি অধিবিদ্যাগত বিশ্বাস যেমন কিনা কোন সত্য দাবিকে প্রত্যাখ্যান করা নিজেই একটি সত্য দাবী এবং এক প্রকারের ধর্ম।
তবে আমার মতে, একজন সেক্যুলার সমাজবিজ্ঞানীও তাঁর গবেষণার উপাদান-উপকরণ ব্যবহার করে এই অলস ধারণাকে উৎরে যেতে পারে যে, ইসলাম একাধিক। সম্প্রতি প্রকাশিত শিহাব আহমেদের বই ‘What is Islam?’ আমার দৃষ্টিতে একটি বিভ্রান্ত ও ত্রুটিপূর্ণ বই। কিন্তু এটিও একাধিক ইসলামের ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করে। তালাল আসাদ একজন নৃতত্ত্ববিদ হিসেবে একাধিক ইসলামের ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন, কারণ এটি পৃথিবীব্যাপী মুসলিমদের বিশ্বাসের সাথে সাংঘর্ষিক।
ইসলামের আঞ্চলিক সংস্কৃতি ও প্রকাশ থাকতে পারে, কিন্তু মুসলমানদের জন্য ইসলাম কখনোই খাবারে কতটুকু লবণ দেয়া উচিত সেটা কিংবা কোন মাযহাব তারা অনুসরণ করে সেটার নাম ছিল না। ইসলাম হচ্ছে সেই একতার নাম যা “আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ (সা) তাঁর সর্বশেষ নবী, যিনি সর্বকালের জন্য সমস্ত মানবজাতির জন্য প্রেরিত হয়েছেন”—এই স্বীকৃতি দেয়ার মাধ্যমে তৈরী হয়। এই বিশ্বাস কিয়ামত পর্যন্ত মানুষকে আল্লাহর দিকে আহ্বান এবং এক উম্মাহ হিসেবে একতাবদ্ধ হওয়ার একটি প্রকল্পের জন্ম দেয়।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, আমাদের অলস সমাজবিজ্ঞান ও ইতিহাসবাদকে প্রত্যাখ্যান করা উচিত। কেউ যদি সকল সত্যের প্রত্যাখ্যানকে সাগ্রহে বরণ করে নিতে এবং সবকিছুকে ইতিহাসের দুর্ঘটনা হিসেবে দেখতে চায়, তার উচিত এই প্রতিজ্ঞাকে সরাসরি ঘোষণা দেয়া এবং তাকে যুক্তিতর্ক দ্বারা সমর্থন করা। কিন্তু ইসলামের উপর তা প্রয়োগ করা হবে কেতাদুরস্ত বাকওয়াজ, যেটার না তো কোন দার্শনিক আত্মসচেতনতা আছে আর না এটি কোন ভালো সমাজবিজ্ঞান এবং ঐতিহাসিক অনুসন্ধান হবে।
পরিশেষে বলতে চাই, আল্লাহর সাথে মুমিনের সম্পর্কের বাস্তবতার মধ্য দিয়ে অতীতের সকল মুসলিম পন্ডিত ও আলেমদের মত আমরাও এর সত্যতা জ্ঞাপন করি যে, যারা আল্লাহর কাছে নিজেদের সমর্পণ করে, তারা এক উম্মাহ। এই উম্মাহ কেবলমাত্র স্থানিক দিক দিয়ে নয়, কালিক দিক দিয়েও, আদম (আ) ও নূহ (আ) থেকে মুহাম্মাদ (সা)- এর যুগ পর্যন্ত। আল্লাহ তায়ালা বলছেন—
“তোমার এই উম্মাহ একই উম্মাহ এবং আমি তোমাদের রব। অতএব আমারই ইবাদত করো।” (আল-কোরআন ২১ : ৯২)।
এই একতা, বন্ধন ও সংহতির ধারণা ইসলামের অপরিহার্য একটি অংশ।
৪। আপনি আপনার বই ‘Politics, Law and Community in Islamic Thought’-এ প্রাক আধুনিক ইসলামে শরীয়ত ও সিয়াসাতের দুটি দৃষ্টিভঙ্গী দেখিয়েছেন—শাসক-কেন্দ্রিক এবং গণ-কেন্দ্রিক। আপনি কি মনে করেন, মাওলানা মওদূদীর থিও-ডেমোক্রেসি এবং গণখিলাফতের ধারণাকে গণ-কেন্দ্রিক শরীয়ত ও সিয়াসাতের দৃষ্টিভঙ্গির অন্তর্ভুক্ত ধরা যায়?
জবাব
হ্যাঁ , আমি মনে করি, মাওলানা মওদূদী গণ-কেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির পক্ষে গুরুতর অবদান রেখেছেন। তবে এ ব্যাপারে তিনি যে তত্ত্বীয় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছিলেন, তা হচ্ছে এই মুসলিম গণ-এর সীমানা নির্ধারণ করা, যা এর সংজ্ঞাকরণের জন্য জরুরি ছিল। এই মুসলিম গণ কি পাকিস্তান বা বাংলাদেশের মতো আধুনিক জাতিরাষ্ট্র দ্বারা নির্ধারিত হবে? যদি তেমনটা না হয় এবং এই জাতিরাষ্ট্র যদি কেবলই ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো দ্বারা আরোপকৃত হয়ে থাকে (যা তিনি তাঁর জীবদ্দশায়ই দেখে গিয়েছেন), তাহলে কি আমাদের এই বাস্তবতা স্বীকার করে নেয়া উচিত এবং ভাবা উচিত যে, স্থান-কালের ঊর্ধ্বে থাকা মুহাম্মাদ (সা)-এর একক উম্মাহর বদলে পৃথিবীতে এখন ৫৫টি স্বাধীন-সার্বভৌম মুসলিম উম্মাহ রয়েছে? এই প্রশ্নটি বর্তমানকার মুসলিম মানসে তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক টানাপোড়েনের সৃষ্টি করে।
৫। সেক্যুলার মানবতাবাদকে সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার, বহুত্ববাদ, লৈঙ্গিক সাম্য ইত্যাদি চমকপ্রদ পরিভাষা দ্বারা ন্যায্যতা প্রদান করা হয়। সেক্যুলার মানবতাবাদের সমর্থকরা প্রায়ই ইসলাম বিশেষ করে রাজনৈতিক ইসলামকে এসব মূল্যবোধের বিরোধী হিসেবে তুলে ধরে। এ ব্যাপারে আপনার মন্তব্য কী?
জবাব
সেক্যুলার মানবতাবাদ এবং উপনিবেশবাদ, অবিচ্ছিন্ন গণহত্যা, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অসাম্য-শোষণ ও পরিবেশ বিপর্যয়ের মধ্যে যে অবিচ্ছেদ্য সংযোগ মুসলিমদের উচিত তা মানুষের সামনে তুলে ধরা। এই সংযোগের ফলে স্পষ্টভাবে বৈশ্বিক পর্যায়ে এই আদর্শকে প্রতিস্থাপনের জরুরত প্রতীয়মান হয়। তবে এর মানে এই না যে, আমরা গত দুইশো বছরের মানবজাতির সামগ্রিক অভিজ্ঞতা থেকে কিছুই শিখবো না। এর মানে এই যে, আমরা যারা ইসলামকে যাপন করার ব্যাপারে অঙ্গীকারাবদ্ধ, তাদের উচিত আধুনিক অবস্থাকে ইসলামীকরণ করা, যেটার জন্য উম্মাহর মধ্যে সংহতি ও কল্পনাশক্তির প্রয়োজন।
খোদার ধারণা ছাড়া কোন মানবিক মর্যাদা থাকতে পারে না। বরঞ্চ খোদা ছাড়া মানুষের ধারণাই থাকতে পারে না। একত্ববাদ এবং খোদা দ্বারা অনুপ্রাণিত ব্যক্তি (নবী-রাসূল) এর ধারণার প্রসারের আগে মানুষ একক মানবীয় ভ্রাতৃত্বের ধারণায় বিশ্বাসই করত না। বর্তমান সময়কার প্রযুক্তিগত ট্রান্সহিউম্যানিজমের যুগে সেক্যুলার সমাজগুলোতে মানবতার ধারণা আবার হারিয়ে যেতে পারে।
(কথোপকথনটি ওভামির আঞ্জুমকে অতিথি করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দাওয়াহ এসোসিয়েশন কর্তৃক আয়োজিত ওয়েবিনার থেকে সংগৃহীত।)