মেন্যু
Menu

হাল্লাকের 'ইম্পসিবল স্টেট' : জাতি-রাষ্ট্র, আইন ও শরীয়া প্রশ্ন

১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

মুকাদ্দিমা

ওয়ায়েল বি. হাল্লাকের The Impossible State: Islam, Politics, and Modernity’s Moral Predicament সমকালীন ইসলামী রাজনৈতিক চিন্তার অন্যতম আলোচিত গ্রন্থ। বইটির কেন্দ্রীয় দাবি হলো, 'আধুনিক রাষ্ট্র' বলতে আমরা যা বুঝি, তার স্বীকৃত ও আদর্শ সংজ্ঞা অনুযায়ী একটি 'ইসলামী রাষ্ট্র' ধারণাগতভাবে অসম্ভব এবং স্ববিরোধী। হাল্লাকের মতে, এর কারণ ইসলামী সভ্যতার দীর্ঘ ইতিহাসে বিকশিত শরিয়াহভিত্তিক নৈতিক শাসনব্যবস্থা এবং আধুনিক ইউরোপীয় জাতি-রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো ও দর্শনের মধ্যে এমন এক গভীর দ্বন্দ্ব রয়েছে, যা কোনো আপসের মাধ্যমে দূর করা সম্ভব নয়। ফলে ইসলামকে আধুনিক রাষ্ট্র কাঠামোর মধ্যে বন্দী করার যেকোনো প্রচেষ্টাই শেষ পর্যন্ত ইসলামি নৈতিকতার পরাজয় ডেকে আনে।

ওয়ায়েল হাল্লাক স্পষ্ট করেছেন যে, ‘দ্য ইম্পসিবল স্টেট’ বইটি আসলে তার আগের বইগুলোরই একটি যৌক্তিক ধারাবাহিকতা। বিশেষ করে, ‘শরিয়াহ: হিস্ট্রি, থিওরি, প্র্যাকটিস’ এবং ‘অ্যান ইন্ট্রোডাকশন টু ইসলামিক ল’ বইয়ে ইসলামী আইন ও শাসনপদ্ধতির বাস্তব চিত্র যেভাবে তুলে ধরা হয়েছিল, এটি তারই পরবর্তী বিস্তৃত পরিসর।

তিনি এই বইয়ে যেভাবে যুক্তি দিয়েছেন, তা যেমন মানুষকে গভীরভাবে ভাবায়, তেমনি বিতর্কেরও জট খুলে দেয়। ওয়ায়েল হাল্লাক শুরুতেই ধরে নিয়েছেন, সৌদি আরব, পাকিস্তান কিংবা ইরানের মতো দেশের সরকারগুলো মুখে দাবি করলেও বর্তমান দুনিয়ার কোনো রাষ্ট্রই আসলে 'ইসলামী রাষ্ট্র' নয়। তিনি বলেন, আধুনিক ইসলামপন্থীরা একটা মৌলিক জায়গায় মস্ত বড় ভুল করছেন। তারা 'মনে করেন যে আধুনিক রাষ্ট্র হলো দেশ চালানোর একটা নিরপেক্ষ মাধ্যম বা হাতিয়ার, যাকে দেশের নেতারা যেভাবে চাইবেন সেভাবেই নিজেদের ইচ্ছেমতো ব্যবহার করতে পারবেন' (১৫৫পৃ.)। হাল্লাকের মতে, শরিয়াহ যে নৈতিক শাসনব্যবস্থা দাবি করে, তা বাস্তবায়ন করার কাজটা বর্তমান ইসলামপন্থীদের ধারণার চেয়েও অনেক বেশি কঠিন ও গভীর। তাদেরকে শাসনব্যবস্থার একদম নতুন কোনো পথ বা রূপ তৈরি করতে হবে; কারণ জাতি রাষ্ট্রের কাঠামো দিয়ে নৈতিক শাসনের এই জটিল সমস্যার সমাধান করা যাবে না। কেন তা করা যাবে না, সেটা তুলে ধরতে এই বইয়ের সাতটি অধ্যায়ের ওপর নজর বুলিয়ে নেওয়া দরকার।

বইয়ের প্রথম অধ্যায়, 'Premises'-এ হাল্লাক তাঁর লেখার কিছু দরকারি পারিভাষিক শব্দের পরিচয় প্রকাশ করেছেন। হাল্লাক তাঁর আগের গবেষণার বরাতে স্পষ্ট করেছেন যে, প্রাতিষ্ঠানিক বা কাঠামোগতভাবে শরিয়াহ আজ বিলীন। তবে যা এখনও বেঁচে আছে, তা হলো শরিয়াহর শাশ্বত নৈতিক আদর্শ, যা আধুনিক মুসলিমদের আত্মিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তির মূল জোগানদার। সমসাময়িক ইসলামপন্থীরা সামাজিক শোষণ, রাজনৈতিক নিপীড়ন এবং পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে যে আওয়াজ তোলেন, তার আসল রসদ আসে শরিয়াহর এই নৈতিক সুর থেকেই। অথচ আধুনিক রাষ্ট্রের সর্বগ্রাসী ক্ষমতার কাছে ইসলামী শাসনের সেই পুরনো ঐতিহ্যবাহী রূপগুলো আজ পুরোপুরি হারিয়ে গেছে, যা একসময় এই অন্যায়গুলোর প্রতিকার করত।

দ্বিতীয় অধ্যায়, 'The Modern State'-এ তিনি আধুনিক রাষ্ট্রের সংজ্ঞা দিয়েছেন, যদিও নিজেই স্বীকার করেছেন যে, 'বিখ্যাত পণ্ডিতরা রাষ্ট্র নিয়ে যত লিখেছেন, এটা নিয়ে ধারণাও ঠিক ততটাই বেশি' (২০পৃ.)। তবে তিনি এসব মতভেদকে স্রেফ আলাদা দৃষ্টিভঙ্গি বলে পাত্তাই দেননি। তিনি ধরে ধরে একটি ঐতিহাসিক সৃষ্টি হিসেবে আধুনিক রাষ্ট্রের মূল খুঁটিগুলোর ব্যবচ্ছেদ করেছেন। যার ভেতর আছে সার্বভৌমত্বের অহংকার, আইন বানানোর একক একচেটিয়া অধিকার, বিশাল আমলাতন্ত্র এবং সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে নিজস্ব ছাঁচে নাগরিক গড়ে তোলার এক সাংস্কৃতিক মায়াজাল।

তৃতীয় অধ্যায়, 'Separation of Powers'-এ উঠে এসেছে আধুনিক প্রশাসনিক রাষ্ট্রের সেই রূপ, যা মুখে 'ক্ষমতার ভারসাম্য বা পৃথকীকরণের' বুলি আওড়ালেও বাস্তবে নিজেই তা গ্রাস করে নেয়। এটি আসলে আমলা ও প্রশাসকদের এমন এক অভেদ্য দেয়াল তৈরি করে, যা ইসলামী শাসনের সংজ্ঞায় পড়ে না। কারণ, ইসলামী শাসনের অন্যতম প্রধান শর্তই হলো আইন তৈরির ঐশ্বরিক ক্ষমতা (শরিয়াহ) থেকে দেশের নির্বাহী ক্ষমতাকে সম্পূর্ণ আলাদা রাখা, যা আধুনিক রাষ্ট্রের যান্ত্রিক চরিত্রের সাথে একেবারেই বিপরীতমুখী। বইয়ের পরবর্তী অধ্যায়গুলোতে ওয়ায়েল হাল্লাক তাঁর এই মূল সুরটিকেই ফুটিয়ে তুলেছেন যে, আধুনিক রাষ্ট্রের ফ্রেমে 'নৈতিকতার দেয়াল তোলা অসম্ভব' (৯৩পৃ.)।

চতুর্থ অধ্যায়, 'The Legal, the Political, and the Moral'-এ দেখানো হয়েছে কীভাবে আধুনিক ইউরোপে আইন ও রাষ্ট্র থেকে নৈতিকতা বা উচিত-অনুচিতের বোধকে সম্পূর্ণ আলাদা করে ফেলা হয়েছে। অথচ ইসলামী দর্শনে আইন আর নৈতিকতা একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ, এদের আলাদা করার কোনো সুযোগ নেই। এই অধ্যায়ের শেষেই হাল্লাক লিখেছেন, 'মুসলমানদের জন্য আজকের আধুনিক রাষ্ট্রের আইন মেনে চলার কোনো দরকারই নেই, কারণ তারা দীর্ঘ বারোশো বছরেরও বেশি সময় ধরে এমন একটা আইনি পরিবেশ পেয়েছে যা পুরোপুরি একটি বড় নৈতিক আদর্শের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছিল' (৮৯পৃ.)।

পোস্টমডার্ন তত্ত্বের আলোতে পঞ্চম অধ্যায়ে লেখক একটি চমৎকার তুলনা করেছেন, আধুনিক রাষ্ট্র যেখানে নিজের ছাঁচে মানুষ গড়ার জন্য সমাজের প্রতিটি স্তরে হানা দেয়, সেখানে প্রাচীন ইসলামী সমাজে জোর দেওয়া হতো ব্যক্তির 'আত্মিক পরিশুদ্ধি ও মনন গঠনের' ওপর। হাল্লাকের ভাষায়, পুলিশি নজরদারি, বিশাল সব কারাগার, রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত শিক্ষা আর জনস্বাস্থ্যের মতো হাতিয়ারগুলো ব্যবহার করে আধুনিক রাষ্ট্র নাগরিকের ওপর এমন এক শৃঙ্খলা চাপিয়ে দেয় যা মানুষকে এক 'যান্ত্রিক ব্যবস্থার অন্ধ পুতুলে' পরিণত করে (১০০পৃ.)। তখন কোনো আত্মিক বা নৈতিক বন্ধন নয়, বরং রাষ্ট্রের উস্কে দেওয়া 'জাতীয়তাবাদ'-ই মানুষকে কৃত্রিমভাবে বেঁধে রাখে (১০৬পৃ.)। কিন্তু ইসলামী শাসনের রূপটি ছিল আলাদা; তা গড়ে উঠেছিল সমাজের মজ্জায় মজ্জায় মিশে থাকা নৈতিকতার ওপর ভর করে। ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভ কেবল কিছু আচার-অনুষ্ঠান ছিল না, বরং তা একজন মুমিনের যাপনচিত্রকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করত যা তাকে বৃহত্তর ধর্মীয় সমাজের (উম্মাহর) সাথে এক সুতোয় বেঁধে দিত (১২১-১২৩পৃ.)।

আধুনিক রাষ্ট্রের এই স্বার্থপর ও যান্ত্রিক যুক্তি যে একটি নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন সমাজের কল্যাণকামী প্রতিষ্ঠানের সাথে খাপ খায় না তা প্রমাণ করার পর, ষষ্ঠ অধ্যায়ে হাল্লাক একটি কাল্পনিক দৃশ্যপট (thought experiment) তৈরি করেছেন। তিনি বলেন, হাজারো প্রতিকূলতা পেরিয়ে আজকের এই আধুনিক দুনিয়ায় যদি কোনো ইসলামী শাসনব্যবস্থার জন্ম হয়ও, তবুও বিশ্বায়নের করাল গ্রাস আর আন্তর্জাতিক অর্থব্যবস্থার যাতাকলে পড়ে সেই প্রচেষ্টা অচিরেই ধূলিসাৎ হতে বাধ্য।

সর্বশেষ সপ্তম অধ্যায়, 'The Central Domain of the Moral'-এ হাল্লাক দেখিয়েছেন, নৈতিকতার এই চরম আকালের যুগে শরিয়াহর বুনিয়াদি আদর্শগুলো হতে পারে এক বড় সঞ্জীবনী শক্তি। একে একদিকে যেমন বর্তমানের ত্রুটিগুলো ধরার কষ্টিপাথর হিসেবে ব্যবহার করা যাবে, অন্যদিকে এর আলোকেই জন্ম দেওয়া যাবে এমন এক 'নতুন শাসন কাঠামোর', যা হবে মূলত একটি নৈতিক সমাজের প্রতিচ্ছবি (১৬৮পৃ.)।

তবে হাল্লাকের এই প্রেসক্রিপশন শুধু মুসলমানদের জন্য কোনো দেয়াল-ঘেরা সমাধান নয়। তিনি নিজের এই ভাবনার সাথে ম্যাকইনটায়ার ও চার্লস টেইলরের মতো বিখ্যাত পশ্চিমা সমাজ-তাত্ত্বিকদের দর্শনের এক গভীর মেলবন্ধন খুঁজে পেয়েছেন। তাঁর মতে, দুনিয়ার নানা ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিতে যখনই সামাজিক সুবিচারের দাবি ওঠে, তখনই তার আড়ালে আধুনিকতার বিরুদ্ধে এক সুপ্ত নৈতিক ক্ষোভ প্রকাশ পায়। তিনি আধুনিক মুসলিমদের আহ্বান জানান সংকীর্ণতার বৃত্ত ভেঙে অন্য সব সংস্কৃতির সাথে এক বিশ্ব-সংলাপে মেতে উঠতে। সেই সংলাপের ভাষা হবে এমন এক সহজ ও সর্বজনীন নৈতিকতার ভাষা, যা কোনো 'জাতিগত অহংকার' বা সীমানায় আটকে থাকবে না, বরং 'সভ্যতার বৈচিত্র্য ছাপিয়ে নৈতিকতাকেই করে তুলবে গোটা মানব সংস্কৃতির মূল চালিকাশক্তি' (১৬৯পৃ.)।

'ইম্পসিবল স্টেট' গ্রন্থের সামষ্টিক পর্যালোচনা

হাল্লাকের অন্যতম বড় অবদান হলো, তিনি আধুনিক রাষ্ট্রের ইতিহাস, ইউরোপীয় রাজনৈতিক দর্শন, ইসলামী আইন, নৈতিক দর্শন এবং সভ্যতার ইতিহাসকে একই বিশ্লেষণাত্মক কাঠামোয় এনে তুলনামূলক পর্যালোচনা করেছেন। তিনি রাষ্ট্রের চারটি স্থায়ী বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করেন — সার্বভৌমত্ব, আইন ও বলপ্রয়োগ, যুক্তিভিত্তিক আমলাতন্ত্র এবং সাংস্কৃতিক আধিপত্য — এবং এগুলো নির্মাণে ওয়েবার, কেলসেন, শ্মিট, মার্ক্স, গ্রামসি ও ফুকোর তত্ত্বকে একসঙ্গে বুনে দেন। কিন্তু এই চারটি বৈশিষ্ট্যের তালিকা যতটা পরিচ্ছন্ন শোনায়, বাস্তবে ততটা নিরপেক্ষ নয়; এগুলো মূলত রাষ্ট্র সম্পর্কে ইউরোপীয় আত্মসমালোচনার সবচেয়ে কঠোর ধারা থেকে বাছাই করা, যা হাল্লাকের সিদ্ধান্তকেই আগেভাগে নির্ধারণ করে রাখে।

তাঁর মতে আধুনিক রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব এতটাই সর্বগ্রাসী যে ব্যক্তিস্বাধীনতার কোনো সুযোগ রাখে না, এমনকি জীবন-মৃত্যুও রাষ্ট্রের মর্জির অধীন (২৮পৃ)। রাষ্ট্র কার্যত খোদার জায়গা দখল করে নেয়, আর আইন হয়ে ওঠে তার ক্ষমতার প্রতীক — কেলসেনের ভাষায় রাষ্ট্র ও আইন একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ (২০পৃ)। আমলাতন্ত্র এই কাঠামোকে কার্যকর করে অনুগত সমাজ তৈরির মাধ্যমে, ফলে জন্ম নেয় এক homo modernus, যার আনুগত্যের সর্বোচ্চ কেন্দ্র রাষ্ট্র নিজেই।

এর বিপরীতে হাল্লাক ঐতিহাসিক ইসলামী শাসনব্যবস্থাকে একটি নৈতিক সমাজ হিসেবে দাঁড় করান, যার কেন্দ্রে রাষ্ট্র নয়, শরিয়াহ। সার্বভৌমত্ব এখানে আল্লাহর, শাসকের কাজ প্রশাসন-কর-নিরাপত্তা, আইন প্রণয়ন নয়; দাওলা শব্দকে আধুনিক অর্থে রাষ্ট্র বলা তাই একধরনের কালভ্রম (১০৯পৃ)। আইন, নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিকতা এখানে অবিচ্ছেদ্য, লক্ষ্য হলো homo moralis গড়ে তোলা, এমনকি জিহাদও রাষ্ট্রীয় আইন নয় বরং নৈতিক দায়িত্ব (৯৫পৃ)।

সমস্যা হলো, এই দুই চিত্রের তুলনাটা সমান শর্তে হয় না। আধুনিক রাষ্ট্রকে বিচার করা হয় তার সবচেয়ে অন্ধকার ঐতিহাসিক বাস্তবতা দিয়ে, আর ইসলামী শাসনকে তার সবচেয়ে আদর্শিক রূপ দিয়ে। ফুকোকে গাজালীয় দৃষ্টিকোণ থেকে পুনর্ব্যাখ্যা করা কিংবা ইসলামী আচারের নৈতিক তাৎপর্য বিশ্লেষণ নিঃসন্দেহে বইটির স্থায়ী অবদান, কিন্তু এই অসম তুলনা পদ্ধতিই বইয়ের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা, যা পরের বাহাস ও তানকীদ অংশে আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

বাহাস ও তানকীদ

ওয়ায়েল হাল্লাকের The Impossible State গ্রন্থটি প্রকাশের পর এটি ইসলামী রাজনৈতিক চিন্তা, আইন, দর্শন ও আধুনিক রাষ্ট্রতত্ত্বের জগতে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। বইটির কেন্দ্রীয় দাবি হলো, আধুনিক রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো ও নৈতিক ভিত্তির সঙ্গে ঐতিহাসিক ইসলামী শাসনব্যবস্থার এমন একটি মৌলিক অসামঞ্জস্য রয়েছে যে, প্রকৃত অর্থে 'আধুনিক ইসলামি রাষ্ট্র' একটি স্ববিরোধী ধারণার প্রতিফলন। এই শক্তিশালী তত্ত্ব যেমন বিপুল প্রশংসা অর্জন করেছে, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ কিছু সমালোচনারও মুখোমুখি হয়েছে। বিভিন্ন তাত্ত্বিক ও গবেষকদের মতানুযায়ী 'ইম্পসিবল স্টেট' গ্রন্থে হাল্লাকের পদ্ধতিগত (methodological) অনুমান, ইতিহাস পাঠ এবং ‘প্যারাডাইমসহ’ বেশকিছু ধারণার ব্যবহার অনেকটাই প্রশ্নবানে জর্জরিত। সেইসব বৌদ্ধিক সমালোচনা ও সাহিত্যিক পর্যালোচনা এই লেখার মধ্যকার যুক্তি ও বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তিকে আরো ঋদ্ধ ও মজবুত করতে ভূমিকা রেখেছে।

প্রথম সমালোচনাটি হাল্লাকের গবেষণার তুলনামূলক পদ্ধতি নিয়ে। হাল্লাক একটি প্রাক-আধুনিক ইসলামী শাসনব্যবস্থাকে সরাসরি আধুনিক ইউরোপীয় রাষ্ট্রের সঙ্গে তুলনা করেছেন, অথচ এই দুই ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভিন্ন ঐতিহাসিক ও সামাজিক বাস্তবতার ফসল। আধুনিক রাষ্ট্রের আবির্ভাবের আগে ইউরোপেও এমন বহু প্রাক-আধুনিক রাজনৈতিক কাঠামো ছিল, যেগুলোর সঙ্গে ঐতিহাসিক ইসলামী শাসনব্যবস্থার তুলনা অনেক বেশি অর্থবহ হতে পারত। ফলে, মধ্যযুগীয় ইসলামী অভিজ্ঞতার সঙ্গে আধুনিক সার্বভৌম রাষ্ট্রের সরাসরি তুলনা অনেকটা 'আপেলের সঙ্গে কমলার তুলনা' করার মতই। উপনিবেশ, ইসলাম ও আধুনিকতা নিয়ে গবেষণার জন্য বিখ্যাত তুরস্কের ইবন হালদুন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশিষ্ট অধ্যাপক ইরফান আহমদ 'দি ইম্পসিবল স্টেট' গ্রন্থের উপর 'On the State of the (Im)possible: Notes on Wael Hallaq’s Thesis' নামে একটি সমালোচনামূলক প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। তিনি লিখেছেন, 'জ্ঞানতাত্ত্বিক দিক থেকে তাঁর (হাল্লাকের) এই পদ্ধতিটা হলো এমন এক চিন্তার প্রতিনিধিত্ব রূপ, যা বাস্তব জীবনে মানুষের প্রাত্যহিক অভিজ্ঞতার জগতের সাথে কোনোরূপ যোগাযোগ না রেখেই শুধু বইয়ের পাতার তত্ত্ব দিয়ে একটি সমাজ বা সংস্কৃতিকে বিচার করতে চায়। দর্শনশাস্ত্রে মানুষের এই বাস্তব অভিজ্ঞতার জগতকে 'লাইফওয়ার্ল্ড' (Lifeworld) বলা হয়।...একটা আদর্শ যদি বাস্তবতার বাইরে একটু বিমূর্ত বা স্বপ্নের মতো না হয়, তবে সেটা আর আদর্শই থাকে না। তাই তত্ত্বের আদর্শ এবং বাস্তব জীবন দুটোই দরকার।..... হাল্লাকের লেখায় এই 'লাইফওয়ার্ল্ড' বা বাস্তব সমাজের চিত্র বলা যায় দুটোই অনুপস্থিত। সমাজ হলো এমন একটা জায়গা যেখানে নানা চিন্তা তৈরি হয়, তর্ক-বিতর্ক হয় এবং ভুল সংশোধন করা হয়। হাল্লাকের বইতে আজকের দিনের ঘটনা, জীবিত মানুষ কিংবা কিছুদিন আগে মারা যাওয়া মানুষদের দেখা পাওয়াই ভার।'

দ্বিতীয়ত, আধুনিক রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে হাল্লাক ইউরোপীয় আত্মসমালোচনার সবচেয়ে কঠোর ধারাগুলো যেমন ফুকো, বোর্দিয়ু, অ্যাডর্নো, জন গ্রে, ম্যাকইনটায়ার কিংবা মেরি অ্যান গ্লেনডনের মতো চিন্তাবিদদের সমালোচনাকে অনুসরণ করে রাষ্ট্রের প্রকৃত রূপ হিসেবে গ্রহণ করেছেন। কিন্তু ইসলামী শাসনব্যবস্থার ক্ষেত্রে একই মাত্রার আত্মসমালোচনামূলক বা ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ তিনি উপস্থাপন করেননি। বরং সেখানে তিনি শরিয়াহভিত্তিক একটি আদর্শিক (paradigmatic) কাঠামোকেই ইসলামের প্রতিনিধি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। ফলে তুলনাটি একদিকে আধুনিক রাষ্ট্রের সবচেয়ে অন্ধকার চিত্র এবং অন্যদিকে ইসলামের সবচেয়ে আদর্শিক চিত্রের মধ্যে সংঘটিত হয়েছে।

হাল্লাকের উদ্দেশ্য অবশ্য ইসলামি শাসনের আদর্শিক কাঠামোকে বাস্তব ইতিহাসের বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা নয়; বরং কীভাবে এসব আদর্শিক ধারণা ও চর্চা একটি নির্দিষ্ট সামাজিক-রাজনৈতিক ব্যবস্থা নির্মাণে ভূমিকা রেখেছিল, তা ব্যাখ্যা করা। সমস্যা দেখা দেয় যখন তিনি ক্ষমতার পৃথকীকরণ, সার্বভৌমত্ব, কর্তৃত্ব ও আত্মসত্তার মতো ধারণা নিয়ে ইসলামি শাসনব্যবস্থার সঙ্গে আধুনিক ইউরো-আমেরিকান রাষ্ট্রের তুলনা করেন। কখনো তাঁর সমালোচনার লক্ষ্য আধুনিক রাষ্ট্রের আইনি তত্ত্ব, কখনো তার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, আবার কখনো তার বাস্তব রাজনৈতিক ব্যর্থতা। ফলে তুলনাটি সবসময় একই স্তরে সংঘটিত হয় না। একইভাবে, ইসলামি প্রতিষ্ঠানগুলোর তাত্ত্বিক যুক্তি এবং প্রাক-আধুনিক মুসলিম সমাজে সেগুলোর বাস্তব প্রয়োগের মধ্যকার পার্থক্যও সবসময় পরিষ্কার থাকে না।

মিশরের মুসলিম ব্রাদারহুড যখন বলেছিল 'আধুনিক জাতিরাষ্ট্র আর ইসলামী শরিয়াহর মধ্যে কোনো অমিল নেই', হাল্লাক তখন সরাসরি বলে দিয়েছেন, 'অবশ্যই অমিল আছে' (ভূমিকা)। ইসলাম যে জাতীয়তাবাদ বা পুঁজিবাদকে সমর্থন করে, এটা প্রমাণ করার জন্য বিশ্বব্যাপী যারাই তাড়াহুড়ো করে বই লিখেছেন, তাদের বিপক্ষে হাল্লাক যেধরনের সমালোচনা হাজির করেছেন, যদিও সংক্ষেপে, তাতে দ্বিমতের সুযোগ নাই। কিন্তু শরিয়াহ আর আধুনিক রাষ্ট্রের বিতর্কের বাইরেও ভাবার এবং গবেষণা করার অনেক কিছু আছে। হাল্লাকের দৃষ্টি ততটুকু প্রসারিত নয়। তিনি আধুনিক রাষ্ট্র ও শরিয়াহর সংঘাতকে অনেকাংশে দ্বৈত (binary) রূপে উপস্থাপন করেছেন। অথচ ইতিহাসের বাস্তবতা এতটা সাদা-কালো নয়। আধুনিক রাষ্ট্রের সঙ্গে শুধু শরিয়াহ নয়, উদারনৈতিক দর্শন, খ্রিষ্টীয় রাজনৈতিক ঐতিহ্য, সাংবিধানিক তত্ত্ব এবং অন্যান্য নৈতিক দর্শনেরও নানা টানাপোড়েন রয়েছে। রাষ্ট্রের ইতিহাস মূলত দ্বন্দ্ব, অভিযোজন, সমন্বয় এবং সংকরায়ণের (hybridity) ইতিহাস। এই বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে সবকিছুকে 'অসম্ভব' বা 'সম্পূর্ণ অসামঞ্জস্যপূর্ণ' হিসেবে উপস্থাপন করলে বিশ্লেষণের পরিসর সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

হাইতির বিপ্লব নিয়ে লিখতে গিয়ে ট্রুইলট বলেছিলেন, 'তাত্ত্বিক কথা বা বয়ান সবসময় বাস্তব অনুশীলনের চেয়ে পিছিয়ে থাকে।' হাল্লাকের এই তত্ত্বের ক্ষেত্রেও কি একই কথা খাটে? একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। হাল্লাকের মূল কথা হলো, ইসলামে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব আর আধুনিক রাষ্ট্রের জনগণের সার্বভৌমত্ব একে অপরের বিরোধী। কিন্তু এই কথাটি এখন খোদ অনেক ইসলামপন্থীদের কাছেই আর আগের মতো অকাট্য নয়। ইরফান আহমেদ তার প্রবন্ধে দেখিয়েছেন, ভারতে জামায়াতে ইসলামীর একজন বড় নেতা এবং উর্দু পত্রিকা 'রাহগুজার'-এর সম্পাদক আবদুল হাফিজ খান মনে করতেন যে, মুসলমানরা একই সাথে মানুষের ক্ষমতা এবং আল্লাহর ক্ষমতায় বিশ্বাস রাখতে পারে। তিনি বলেছিলেন, 'আল্লাহর সার্বভৌমত্বের ধর্মীয় ধারণার সাথে গণতন্ত্রের রাজনৈতিক সার্বভৌমত্বের কোনো বিরোধ নেই।' খানের কাছে এর মানে এই ছিল না যে তিনি আধুনিক রাষ্ট্রকে অন্ধভাবে নকল করছেন, বা মহানবীর দেখানো পথ ছেড়ে দিচ্ছেন। বরং তিনি তাঁর সামাজিক কাজের মাধ্যমে নিজের নৈতিক আদর্শ ও বাস্তব জীবনের মেলবন্ধন ঘটিয়ে একটি নতুন ব্যাখ্যায় পৌঁছেছিলেন। হাল্লাক যেভাবে মনে করেন যে প্রাক-আধুনিক মুসলিম সমাজে জন রলসের 'সুশৃঙ্খল সমাজ'(৭৩পৃ) ছিল, ঠিক তেমনি গণতন্ত্র ও ধর্ম নিয়ে খানের এই ভাবনাটি রবার্ট বেলার একটি কথার মতোই ছিল। বেলা বলেছিলেন: 'আমেরিকান রাজনৈতিক তত্ত্বে ক্ষমতা বা সার্বভৌমত্ব অবশ্যই জনগণের হাতে, কিন্তু পরোক্ষভাবে এবং অনেক সময় সরাসরিই, এই চূড়ান্ত ক্ষমতা ঈশ্বরের বলেই মানা হয়'। 

তৃতীয় সমালোচনা হাল্লাকের বহুল ব্যবহৃত 'Paradigmatic Islamic Governance' ধারণাকে কেন্দ্র করে। সমালোচকদের মতে, হাল্লাক ইচ্ছাকৃতভাবে 'প্যারাডাইম' শব্দটির ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করেন, কিন্তু একইভাবে কখনো 'Paradigmatic Modern State' ধারণাটি নির্মাণ করেন না। এর ফলে ইসলামী শাসনব্যবস্থাকে একটি নৈতিক ও আদর্শিক ছকের আলোকে বিচার করা হলেও আধুনিক রাষ্ট্রকে মূলত তার ঐতিহাসিক বাস্তবতার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হয়। এই অসম পদ্ধতি তুলনাটিকে ভারসাম্যহীন করে তোলে। Georgetown University Law Center-এর অধ্যাপক বিশিষ্ট ফিলিস্তিনি-আমেরিকান আইনবিদ ও একাডেমিক লামা আবু-ওদেহ হাল্লাকের 'দি ইম্পসিবল স্টেট' বইয়ের সমালোচনায় লিখেছেন, 

'এই শব্দটির (প্যারাডাইমেটিক) প্রতি হাল্লাকের যেন এক অন্ধ অনুরাগ রয়েছে, কেননা সমগ্র রচনায় অন্য যেকোনো শব্দের চেয়ে তিনি এই শব্দেরই পুনরাবৃত্তি করেছেন সবচেয়ে বেশি...। বিস্ময়করভাবে, তিনি এই শব্দবন্ধটি কেবল ‘ইসলামী’ ব্যবস্থার সমান্তরালেই আবর্তন করিয়েছেন, ‘আদর্শ আধুনিক রাষ্ট্র’ এমন উচ্চারণ তাঁর মুখে মেলা ভার। কারণ, হাল্লাক ইসলামী রাষ্ট্রের চিরন্তন ‘আদর্শ’ ও তার ‘ঐতিহাসিক নির্মম বাস্তবতা’র মধ্যকার সীমান্তরেখাকে এক কুয়াশায় ঢেকে দিতে চান। এই ‘প্যারাডাইমেটিক ইসলামিক গভর্ন্যান্স’ শব্দটির চতুর প্রয়োগ সেই কুয়াশাকেই গাঢ় করে তোলে, যা পাঠককে এক গোলকধাঁধায় ফেলে দেয় যে, হাল্লাক কি এখানে ফকীহদের চিন্তা ও মতাদর্শিক চর্চার জায়গা থেকে কোনো আদর্শিক শাসনের কল্পনা করছেন, নাকি ইতিহাসের পাতায় ঘটে যাওয়া কোনো বাস্তব বিবরণ দিচ্ছেন! হাল্লাকের পদ্ধতিগত বিশ্বাসের মূলে রয়েছে আদর্শিক বা ছকটিই বাস্তবের আদি উৎস; যেন সমগ্র ইসলামী ইতিহাস হলো সেই মহাসনদকে ছুঁতে চাওয়ার এক অন্তহীন আরাধনা, যেখানে মুসলিমরা কখনো সফলতার চূড়া ছুঁয়েছে, কখনো বা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে।' 

এই অবস্থানের বিপরীতে লামা আবু ওদেহ ইসলামী আইনের ইতিহাসবিদ বাবের জোহানসেনের গবেষণাকে গুরুত্বপূর্ণ ও পাল্টা উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছেন। ভূমিস্বত্ব, খাজনা এবং কৃষকের অধিকার নিয়ে তাঁর গবেষণা দেখায় যে, ইসলামী ইতিহাসের বিভিন্ন যুগে আইনি বিধান ও রাজনৈতিক বাস্তবতা ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। কোথাও কৃষকের অধিকার শক্তিশালী হয়েছে, আবার কোথাও তা দুর্বল হয়েছে। এসব পরিবর্তন কেবল একই নৈতিক আদর্শের বিভিন্ন প্রয়োগ নয়; বরং ইতিহাস, অর্থনীতি, ক্ষমতার সম্পর্ক এবং সামাজিক প্রয়োজনের পরিবর্তনেরও প্রতিফলন। অর্থাৎ, ইসলামী আইনের ইতিহাসকে একটি স্থির নৈতিক কাঠামোর প্রকাশ হিসেবে দেখার বদলে, জোহানসেন ইতিহাস ও আদর্শের পারস্পরিক নির্মাণপ্রক্রিয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। 

কাতারের Hamad Bin Khalifa University-এর College of Islamic Studies-এর Assistant Professor উসামা আল আজামী হাল্লাকের আলোচ্য গ্রন্থের সমালোচনায় লিখেছেন, 'এই গ্রন্থটি আধুনিকতার একটি তীব্র ও ক্ষুরধার সমালোচনা হলেও, ওয়ায়েল হালাক ক্ষেত্রবিশেষে ইসলামের ইতিহাস এবং প্রাক-আধুনিক ইসলামী শাসনব্যবস্থার কিছুটা আদর্শায়িত চিত্র (idealized picture) উপস্থাপন করেছেন বলে প্রতীয়মান হয়। যদি এই বিবরণগুলো আরো পর্যাপ্ত ও সুনির্দিষ্ট তথ্যসূত্রের (citations) মাধ্যমে সমর্থিত হতো, তবে তা অধিকতর গ্রহণযোগ্য ও নির্ভরযোগ্য মনে হতো (যেমন, ৬৯-৭০, ১৬১, ১৭৫ পৃ, টীকা: ৪৩)। যদিও তিনি সংক্ষেপে স্বীকার করেছেন যে, এই ইতিহাস সম্পূর্ণ নিখুঁত ছিল না (১১, ৭০পৃ), তথাপি তাঁর এই আদর্শায়িত উপস্থাপন কোনো সংশয়বাদী পাঠকের কাছে বিষয়টিকে তুলনামূলকভাবে কম বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে পারে। তদুপরি, কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রাক-আধুনিক ইসলামী ব্যবস্থার প্রতি তাঁর এই তাত্ত্বিক বা আদর্শিক পক্ষপাত, বর্তমান যুগে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রগুলোতে মুসলিমদের উদ্ভাবনী ইজতিহাদের (ijtihad) সম্ভাবনাকে সীমিত, এমনকি অবৈধ বা নীতিবহির্ভূত বলে প্রতিপন্ন করতে পারে।' 

হাল্লাকের পুরো বইয়ের যুক্তি মোটাদাগে দুটি দাবির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। প্রথমত, বর্তমান যুগে একটি প্রকৃত ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা নৈতিকভাবে অনুচিত, কারণ তা শরিয়াহভিত্তিক ঐতিহাসিক ব্যবস্থার তুলনায় নিম্নমানের হবে। দ্বিতীয়ত, ধারণাগতভাবে ইসলামি শাসন এবং আধুনিক রাষ্ট্র পরস্পরের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। কিন্তু বইয়ের শেষ অধ্যায়ে হাল্লাক নিজেই এই কঠোর বিভাজনকে শিথিল করেছেন। সেখানে তিনি মুসলমানদের আধুনিকতার নৈতিক পুনর্গঠনের প্রকল্পে অংশগ্রহণের আহ্বান জানান এবং ম্যাকইনটায়ার, চার্লস টেইলর ও চার্লস লারমোরের মতো পশ্চিমা নৈতিক দার্শনিকদের সঙ্গে এক ধরনের যৌথ নৈতিক সংগ্রামের সম্ভাবনার কথা বলেন। হাল্লাক মনে করেন, মুসলমানরাও 'আধুনিকতার ভুলগুলো ধরিয়ে দিয়ে একে নৈতিকভাবে বদলে দেওয়ার লড়াইয়ে অংশ নিতে পারে। আর এই লড়াই শুধু একটি ইসলামী শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্যই জরুরি নয়, বরং মানুষের দুনিয়াবী ও আত্মিক জীবনের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্যও সবচেয়ে বেশি দরকার' (১৭০পৃ.)। এই চিন্তাবিদদের এবং সাধারণ মুসলমানদের লক্ষ্য এখানে এক হয়ে গেছে: '... কারণ, এই জয় ছাড়া যেমন কোনো ইসলামী শাসনব্যবস্থা আসবে না, তেমনই আধুনিকতার ভেতরে নৈতিক জ্ঞান বা বিবেক না জাগলে কোনোদিন এই জয় আসাও সম্ভব নয়' (১৬৯-১৭০পৃ.)। হাল্লাক পূর্ব ও পশ্চিম দুই জায়গাতেই 'আধুনিক রাষ্ট্র এবং তার লিবারেল বা উদারপন্থী মূল্যবোধগুলোর সাথে আলোচনা ও বোঝাপড়ার' ডাক দিয়েছেন (১৬৮পৃ.)। তাহলে শেষ পর্যন্ত যে বিষয়টি দাঁড়াল তা হলো, ইসলামী শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। এমনকি হাল্লাকের মতে এটি এখন সময়ের মস্ত বড় দাবি। ফলে বইয়ের শুরুতে যে 'অসম্ভব' ধারণাটি ছিল একেবারে চূড়ান্ত, শেষ অধ্যায়ে এসে তা 'নৈতিক শাসনব্যবস্থা' (governance)-এর সম্ভাবনায় রূপ নিতে শুরু করে। এক্ষেত্রে প্রশ্ন তোলাটাই স্বাভাবিক, যদি নৈতিক শাসনব্যবস্থা সম্ভব হয়, তবে 'অসম্ভব' কথাটি আসলে কোন অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে?

চতুর্থ , The Impossible State গ্রন্থে হাল্লাক শরিয়াহকে প্রায় সম্পূর্ণভাবে আইনকেন্দ্রিক করে তুলেছেন বলে ইরফান আহমেদ মনে করেন। এই অতিরিক্ত আইন-নির্ভরতার কারণে উলামা বা আলেম সমাজকে স্রেফ 'আইনজীবী' বা 'আইন বিশেষজ্ঞ' বানিয়ে দেওয়া হয়েছে, যা ইসলামের আসল রূপ এবং এর আইনকাঠামো দুটোকেই আড়াল করে দেয়। ইরফান আহমেদ তার লেখায় কবি ও দার্শনিক আল্লামা ইকবালের বক্তব্যকে উদ্ধৃতি করেছেন। ইকবালের মতে, 'যেসব হাদিস শুধু আইনের কথা বলে, সেগুলোকে নৈতিক বা আধ্যাত্মিক হাদিস থেকে আলাদা করে দেখা দরকার।' ইকবালের মতানুযায়ী শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভি (যাকে তিনি ইসলামের সৃজনশীল চিন্তার পথপ্রদর্শক বলেছিলেন) বিষয়টি খুব ভালো বুঝতেন। ইকবাল শাহ ওয়ালিউল্লাহর চিন্তাকে এভাবে ব্যাখ্যা করেছেন, আল্লাহ যখন কোনো নবীর মাধ্যমে আইন পাঠান, তখন সেই সমাজের মানুষের স্বভাব ও অভ্যাসের কথা মাথায় রেখেই পাঠান। কিন্তু নবীর আসল বাণী সবার জন্য, কোনো নির্দিষ্ট সমাজের জন্য আটকে থাকা নয়। নির্দিষ্ট সমাজের এই নিয়মগুলো ছিল আসল সার্বজনীন রূপটি তৈরি করার একটি প্রাথমিক ভিত্তি মাত্র। অপরাধের শাস্তির মতো নির্দিষ্ট আইনগুলো তখনকার সমাজের জন্য নির্দিষ্ট ছিল। তাই ভবিষ্যতের সমাজেও এগুলো হুবহু একই থাকবে, এমন কোনো কথা নেই; বরং এগুলোকে সময়ের সাথে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। এই দিক থেকে দেখলে, দুনিয়াকে 'দারুল হরব' (যুদ্ধের দেশ) এবং 'দারুল ইসলাম' (ইসলামের দেশ) হিসেবে ভাগ করার যে কথা হাল্লাক বলেছেন(৫৯পৃ.), তা নিয়েও আলোচনা করার সুযোগ আছে। কারণ এই ভাগটি ইসলামের শুরুর দিকে ছিল না, এটি আব্বাসীয় আমলে তৈরি করা একটি 'নতুন নিয়ম' মাত্র। তাছাড়া, মহানবী (সা.) এবং তাঁর ঠিক পরের যুগের মুসলমানদের কোনো গোছানো আইনি বই বা নিয়মকানুন ছিল না। গবেষক হজসনের ভাষায় বলতে গেলে, তাদের যা ছিল তা হলো এক গভীর আধ্যাত্মিক চেতনা এবং নৈতিক বিবেক, যেখানে জীবন ও মৃত্যুকে আলাদা করে দেখা হতো না। পরবর্তীতে ইতিহাস ও রাজনীতির নানা কারণে 'আইন' বিষয়টাই প্রধান হয়ে ওঠে। এটি ছিল সময়ের প্রয়োজনে ঘটে যাওয়া একটা সাধারণ ঘটনা, যেটাকে পরবর্তীতে মানুষ ইসলামের মৌলিক বা অপরিবর্তনশীল নিয়ম হিসেবে ভুল বুঝেছে। এটা সত্যি যে, আইন বিশেষজ্ঞরা ইসলামের রূপরেখা তুলে ধরেছেন, কিন্তু এই চেতনা পুরো উম্মাহ বা মুসলিম সমাজের সবার মধ্যেই কম-বেশি ছড়ানো ছিল। সেখানে সাধারণ মানুষও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। আলেমরা সমাজেরই অংশ ছিলেন, সমাজ থেকে আলাদা কেউ ছিলেন না। 

অথচ, হাল্লাক তাঁর আগের লেখাগুলোতে শরিয়াহকে একটি বিস্তৃত নৈতিক ও সভ্যতাগত অনুশীলন (discursive practice) হিসেবে ব্যাখ্যা করেছিলেন। কিন্তু আলোচ্য বইতে তিনি আইনগত মাত্রাকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিয়েছেন। ফলে একদিকে তিনি শরিয়াহকে 'ঈশ্বরের আইন' বলেন, আবার অন্যদিকে একে 'জনগণের আইন' বলেও উল্লেখ করেন(৫০,৫২,৫৯পৃ.)। এই দ্বৈত অবস্থান তাঁর তাত্ত্বিক কাঠামোর ভেতরেই একটি স্পষ্ট টানাপোড়েন সৃষ্টি করে। এর প্রধান কারন, হাল্লাকের প্রাচ্যতাত্ত্বিক বা ওরিয়েন্টালিস্ট বয়ান দ্বারা প্রভাবিত হওয়া। হাল্লাকের লেখায় অজান্তেই ওরিয়েন্টালিস্টদের কিছু চিন্তাভাবনা বা প্রভাব রয়ে গেছে। হাল্লাক তার 'ইম্পসিবল স্টেট' গ্রন্থে ইসলাম আর শরিয়াহকে শুধু আইনের চশমা দিয়েই বেশি দেখেছেন, তবে এর পেছনে কি জোসেফ শ্যাক্টের মতো প্রাচ্যবিদদের কোনো প্রভাব আছে কিনা সেটাও আলবৎ খতিয়ে দেখা দরকার। মজার বিষয় হলো, হাল্লাক নিজেই আগে এই শ্যাক্টের তত্ত্বের খুব কড়া সমালোচনা করেছিলেন। শ্যাক্ট মনে করতেন, ইসলামী আইনই হলো ইসলামের আসল রূপ এবং এর মূল কেন্দ্রবিন্দু। শ্যাক্টের এই কথার সাথে কি হাল্লাকের 'দ্য ইম্পসিবল স্টেট' বইয়ের কথার মিল নেই? যেখানে হাল্লাকও ইসলামকে শুধু শরিয়াহর সাথে মিলিয়েছেন এবং একে 'মুসলমানদের খোদায়ী আইন' বলেছেন। এই ব্যাপারে হাল্লাক নিজেই অন্য এক জায়গায় লিখেছিলেন, 'ওরিয়েন্টালিস্টরা যেভাবে ইসলামী আইনকে আমাদের সামনে তুলে ধরেছে, আমাদের নিজেদের চিন্তাভাবনাও তার ভেতরেই আটকে গেছে'। 

তিনি অনেকটাই সঠিক কথা বলেছেন, যে পশ্চিমা ওরিয়েন্টালিস্টদের এই চিন্তাভাবনা 'নিজেদের আইন ও ইতিহাস নিয়ে মুসলমানদের নিজেদের ভাবনাকেও' বদলে দিয়েছে। ইরফান আহমেদ লিখেছেন, 'এই ধরণের ঔপনিবেশিক প্রভাব আল্লামা ইকবালের লেখার মধ্যেও দেখা যায়। ইকবাল শুধু আইনের কথা না বলে 'মোহামেডান ল' শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন। এমনকি দক্ষিণ এশিয়ার অনেক মুসলিম এখনও নিজেদের 'মোহামেডান' বা মোহামেডানপন্থী বলেন, যা মূলত ব্রিটিশ আমলের দেওয়া একটা নাম। এছাড়া, পশ্চিমারা সবসময় একটা অপবাদ দিত যে ইসলামে গত ৫০০ বছর ধরে নাকি নতুন করে চিন্তা করার বা 'ইজতিহাদ' করার ক্ষমতা বন্ধ হয়ে গেছে। ইকবালও পশ্চিমের এই অভিযোগটা একরকম সত্যি বলে মেনে নিয়েছিলেন। অথচ, হাল্লাক নিজেই তাঁর একটি বিখ্যাত লেখায় প্রমাণ করে দিয়েছিলেন যে পশ্চিমের এই দাবিটি সম্পূর্ণ 'ভিত্তিহীন ও ভুল'।'

পঞ্চমত, বড় বড় পণ্ডিত ও সমালোচকদের মতানুসারে, শরিয়াহ আইন ও তার সাথে সংশ্লিষ্ট প্রায়োগিক কাজগুলো যখন আজকের আধুনিক রাষ্ট্রের মধ্যে চালানো হয়, তখন সেগুলো এক অন্যরকম রূপ নেয়; হাল্লাক নিজেও তাঁর আগের বইগুলোতে এই কথা খুব কড়াভাবে প্রমাণ করেছেন। কিন্তু 'ইম্পসিবল স্টেট' গ্রন্থে তিনি আরো এক ধাপ এগিয়ে বয়ান নির্মাণ করেছেন। তিনি আধুনিক কালে সাংবিধানিক আইনের প্রধান উৎস হিসেবে শরিয়াহকে 'প্রাতিষ্ঠানিক দিক থেকে মৃত' (২পৃ.) বললেও, আধুনিক রাষ্ট্রই যে শরিয়াহর আসল খুনি, সেটাকে আরো বিস্তৃত পরিসরে ব্যাখ্যা না করে বরং তিনি ঘোষণা করেছেন যে, আধুনিক রাষ্ট্র আর ইসলামী শরিয়াহর আসল চরিত্রের পার্থক্যের কারণে এদের মধ্যে কোনোদিন কোনো মিল হতে পারে না। হাল্লাকের এই ভাষার মধ্যে সাইয়্যেদ কুতুবের সেই বিখ্যাত দাবির একটা অদ্ভুত মিল পাওয়া যায়, যেখানে কুতুব বলেছিলেন, 'আজকের সব সমাজই আসলে 'জাহেলিয়াত' বা অন্ধকারের মধ্যে আছে.... কারণ এই সমাজগুলোতে আল্লাহর আইনের বদলে মানুষের ওপর মানুষের হুকুম চালানো হয়।' (যদিও আমরা পরে দেখব, সাইয়্যেদ কুতুব আর হাল্লাকের মধ্যে দুটো বড় অমিলও আছে)।

এটা সত্যি যে, কেউ যদি ফ্যাসিবাদের উগ্র রূপ দেখে রাষ্ট্রের সংজ্ঞা ঠিক করে, তবে রাষ্ট্রের ওপর তার ঘেন্না আসবেই। আবার কেউ যদি ইসলামের সমাজব্যবস্থাকে সাইয়্যিদ কুতুবের মতো জাহিলিয়ার চোখে দেখে(যেমনটা তার মা‘আলিম ফিত-তারীক বা ফি জিলালিল কুরআন তাফসীর গ্রন্থে স্পষ্ট হয়)। তবে আধুনিক রাষ্ট্রের সাথে ইসলামের অমিলটা খুব সহজেই চোখে পড়বে। কিন্তু শাসনব্যবস্থার ভেতরের নানা টানাপোড়েন, কাটাকুটি, মেলবন্ধন কিংবা খাপ খাইয়ে নেওয়ার (Hybridity) মতো বাস্তব বিষয়গুলো নিয়ে কথা না বলে, সবকিছুকে একদম 'অসম্ভব' বলে দিলে লাভটা কী হয়? আর ঠিক এই জায়গাতেই হাল্লাকের সাথে সাইয়্যিদ কুতুবের বড় তফাত। কুতুব মনে করতেন, মুসলমানদের এগিয়ে যাওয়ার পথ খুঁজতে হবে ইসলামের একদম শুরুতে। অর্থাৎ সপ্তম শতাব্দীর মক্কা ও মদিনার যুগে ফিরে যেতে হবে। যদিও কুতুব ওই যুগের পরের কয়েকশো বছরের ইতিহাসকে অনেকটাই আলোচনার বাহিরে রেখেছেন। কিন্তু হাল্লাকের কাছে ইসলামের আসল রূপ বা স্বর্ণযুগ ছিল শরিয়াহর বিকশিত রূপটি, যা ইসলামের প্রথম যুগেরও কয়েক শতাব্দী পর শুরু হয়েছিল এবং আধুনিক কাল আসার আগ পর্যন্ত টিকে ছিল।

আপাতদৃষ্টিতে, কুতুবের চেয়ে হাল্লাককে ইসলামের এই ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের প্রতি অনেক বেশি শ্রদ্ধাশীল মনে হতে পারে। কিন্তু অন্য দিক থেকে চিন্তা করলে, হাল্লাকের চিন্তা কুতুবের চেয়েও বেশি কট্টর বা চরমপন্থী মনে হওয়াটাও অস্বাভাবিক মনে হবে না। কুতুবের সমর্থকরা সবসময় বলেন যে, কুতুব শুধু তখনকার সমাজগুলোকে অ-ইসলামী বা জাহিলিয়াতে আচ্ছন্ন হিসেবে বলতেন, কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট মুসলমানের ঈমান বা পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তুলতে চাননি। কিন্তু হাল্লাকের মতে, শরিয়াহ ধ্বংস হয়ে যাওয়ার ফলাফল মারাত্মক, এবং সেক্ষেত্রে তিনি সাধারণ মানুষের মুসলমানিত্ব নিয়েও টানাটানি লাগিয়েছেন। তিনি সরাসরি বলেছেন, 'এই নৈতিক নিয়মগুলো ছাড়া কোনো মুসলিম পরিচয়ই টিকে থাকা সম্ভব নয়' (৭০পৃ.)। তার এই বক্তব্য প্রাচ্য-পাশ্চাত্যসহ বিশ্বব্যাপী সেকুলার জাতিরাষ্ট্রের কোলে বেড়ে ওঠা সংখ্যাগরিষ্ঠ কিংবা সংখ্যালঘু মুসলমানদের এক মস্ত বড় বিপদে ফেলে দেয়। এবং এইধরনের বক্তব্যে স্বাভাবিকভাবেই বিভিন্ন ধর্মীয় চরমপন্থী গ্রুপগুলোর মধ্যে তাকফিরি প্রবণতার হার নতুন রূপে ফিরে আসার প্রবল সম্ভাবনা দেখা স্পষ্ট হয়।

ষষ্ঠত, হাল্লাক যদিও মুসলমানদের একেবারে খালি হাতে ছেড়ে দেননি। আধুনিক জাতিরাষ্ট্রের বুকে ক্লাসিকাল শরীয়ার রূপ ও কাঠামো প্রতিষ্ঠা সম্ভব না হলেও, গ্রন্থের একদম শেষ পাতায় তিনি শরিয়াহর বেশ কিছু ভালো দিক ফিরিয়ে আনার জন্য একাধিক রাস্তার হদিস দিয়েছেন। তাঁর লেখায় এই হঠাৎ আশার আলো দেখে মনে হয়, হাল্লাক উপনিবেশ উত্তর জাতিরাষ্ট্রে গড়ে ওঠা ইসলামী আন্দোলনগুলোকে বড্ড বেশি অবহেলা করেছেন। কারণ, উপনিবেশিক আধুনিকতা মুসলিম সমাজে যে আত্মপরিচয়হীনতার বোধ তৈরি করেছিল, সেই পটভূমিতে রাজনৈতিক ইসলামের বিকাশ। এটি মুসলিম সমাজকে তার হারানো পরিচয় ফিরে ফেতে সাহায্য করেছিল। যেই ব্যাপারটি হাল্লাকের লেখায় যথাযথভাবে উঠে আসে নাই। উপনিবেশ পরবর্তী মুসলিম দুনিয়ার উপর ঝেঁকে বসা রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্বের বোঝা থেকে মুক্তির লক্ষ্যে, হাত মুষ্টিবদ্ধ করে মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের বসে থাকার উপায় ছিল না। তারা তাদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টায় রাজনৈতিক ইসলামের পাটাতন দাড় করানোর চেষ্টা চালান। ঔপনিবেশিক আইনি ও প্রশাসনিক কাঠামো পরিবর্তনের জন্যও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ প্রয়োজন ছিল। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বাইরে থেকে কেবল সমালোচনা করে বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলা ছিল কঠিন ও অসম্ভব। তারা শুধুমাত্র পশ্চিমা আধুনিকতার মোকাবিলায় তত্ত্বের পসরা সাজিয়ে থমকে যান নাই, পাশাপাশি বাস্তবিক ময়দানে সেটার ইমপ্লিমেন্টেশন করতে রাজনৈতিক দলও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বিশেষ করে, পশ্চিমা আধুনিকতার মোকাবিলায় ইসলামকে মাস্টার সিগনিফায়ারের জায়গায় তুলে ধরা ছিল তাদেরই বিশেষ কৃতিত্ব। যেটি হাল্লাকের আলাপে অনেকটাই অনালোচিত থেকে গেছে।

তিনি বইতে মুসলিম ব্রাদারহুডের মত দলের এক্টিভিস্ট ও মাঠপর্যায়ের কর্মীদের বক্তব্যের তাত্ত্বিক ব্যবচ্ছেদ করলেও গ্রন্থটি তাদের আশু প্রয়োজন মেটাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন বলা চলে। আলোচ্য গ্রন্থে একদিকে যেমন তিনি তাদের প্রকাশ্য ও প্রচ্ছন্ন কঠোর সমালোচনার শরে বিদ্ধ করেছেন, অন্যদিকে তাঁর নিজ নির্দেশিত কর্মপন্থাকেও ধোঁয়াশামুক্ত করতে পারেননি। এমন এক দোলাচলে মনে সংশয় জাগে, এই আদর্শিক ইসলামী গবেষণায় তিনি আসলে সঠিক তত্ত্বকাঠামো নির্মাণের পূর্ব পর্যন্ত সমস্ত ইসলামী রাজনৈতিক তৎপরতাকে আড়ালে বা স্থগিত রাখার আহ্বান জানাচ্ছেন কি না। যদি তাঁর অন্তরে অধিকতর বাস্তব কোনো কর্মপন্থা সুপ্ত থেকেও থাকে, তবে তা এই লেখায় সেটিও তীব্রভাবে অনুপস্থিত।

হাল্লাকের লেখায় সমকালীন মুসলিম মনীষী বিশেষত আরবীয় জ্ঞানতাপসদের চিন্তা-দর্শনের সাথে তাত্ত্বিক সংযোগ একেবারেই অনুপস্থিত। আধুনিকতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সাম্প্রতিক মুসলিম মানসের বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ের যে ব্যাপ্তি ও গভীরতা, তার কোনো আভাস এই গ্রন্থে মেলে না; এমনকি হাল্লাক নিজেও সেই জ্ঞানচর্চার সাথে কতটা পরিচিত, তাও পুরোদস্তুর কুয়াশাবৃত। এর একমাত্র ব্যতিক্রমী স্ফুলিঙ্গ দেখা যায় একটি নিঃসঙ্গ পাদটীকায় (১৭৫পৃ, টীকা: ৪৯), যেখানে মরক্কোর দার্শনিক ও স্কলার তাহা আবদুর রহমানের কয়েকটি গ্রন্থের উল্লেখ রয়েছে। তবে সেখানেও এই দার্শনিকের রচনার কোনো সুনির্দিষ্ট পৃষ্ঠা নির্দেশ করা হয়নি এবং গ্রন্থের নির্ঘণ্টে (index) তাঁর পর্যন্ত ঠাঁই পায়নি। তাছাড়া, বিগত কয়েক দশকে ইসলামী রাজনৈতিক দর্শনের জগতে যেসব দেদীপ্যমান ইসলামপন্থী উলামার উথান ঘটেছে এবং তাদের লেখনীও বিশ্বব্যাপী বিস্তৃতি লাভ করেছে। এই গ্রন্থে তাঁদের মহাসমাবেশ ঘটেনি; যদিও হাল্লাকের সমালোচনার তূণ থেকে ছিটকে আসা তীরের মূল আঘাত সইতে হয়েছে এই ইসলামপন্থীদেরকেই।

মজার বিষয় হলো, সময়ের স্রোতে মওদূদী, বান্নাহ কিংবা কুতুবের মত স্কলার ও বুদ্ধিজীবীদের সমালোচনা ও পর্যালোচনার কথা নাহয় বাদই দিলাম। সেখানে, বর্তমান বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী ইসলামপন্থী বিদগ্ধজন ইউসুফ আল-কারাদাভির কোনো চিহ্ন পর্যন্ত নেই; নেই সালাফি ঘরানার মুক্তচিন্তক হাকিম আল-মুতায়রি; এমনকি ‘দ্য ইম্পসিবল স্টেট’ গ্রন্থের চারণভূমিতে বিস্তারিত বিচরণ করা মিশরের প্রজ্ঞাবান বুদ্ধিজীবী আব্দুল ওয়াহাব আল-মাসিরি, তৌফিক আল-শাবি কিংবা মুহাম্মদ ইমারার মতো জ্ঞান-সাধকদেরও কোনো উপস্থিতি নেই। হাল্লাকের ক্ষুরধার লেখনী আসলে ইসলামি আন্দোলনের মূল তাত্ত্বিকদের আঘাত করার চেয়ে, জনপ্রিয় ইসলামপন্থী অ্যাক্টিভিস্ট বা মাঠের রাজনৈতিক কুশীলবদের ওপরই বেশি বর্ষিত হয়েছে। অথচ হাল্লাকের চিন্তার গভীরতা সাধারণ কর্মীদের চেয়ে এই বিদগ্ধ পণ্ডিতদের সাথেই অধিকতর তুলনীয় হতে পারতো এবং তত্ত্বের লড়াইয়ে এরাই হতে পারতেন তাঁর যোগ্যতম সারথি বা প্রতিপক্ষ।

বিশেষত, রাজনৈতিক ইসলামের প্রবক্তারা কী বলেছেন, সময়োপযোগী কী করেছিলেন বা কিভাবে সমাধান হাজির করার চেষ্টা করেছেন, সেদিকে হাল্লাক ক্রিটিকালি খুব একটা নজর দেননি। তিনি কীভাবে ধরে নিলেন যে, ইসলামী আন্দোলনের কর্মী বা চিন্তাবিদরা যখন 'ইসলামিক রাষ্ট্র' শব্দটা ব্যবহার করতেন, তখন তারা আক্ষরিক অর্থে আজকের এই আধুনিক রাষ্ট্রের ক্ষমতাকেই বোঝাতেন এবং অন্য কিছু নয়? অথচ, ইসলামপন্থীদের রচনায় এই শব্দটা খুব কম সময়ই একাকী ব্যবহার হয়েছে। এর সাথে সবসময় 'ইসলামী ব্যবস্থা' বা 'ইসলামী শৃঙ্খলা'র মতো কথাগুলোও থাকত। যেমন মুসলিম ব্রাদারহুড বলতো 'নিজামে ইসলামী' আর মাওলানা মওদুদীর প্রতিষ্ঠিত জামায়াতে ইসলামী বলতো 'ইসলামী নিজাম', 'নিজাম-ই-মুস্তফা' (মহানবীর দেখানো পথ) বা 'ইসলামী জীবনব্যবস্থা'। হাল্লাক নিজেই তো বলেছেন যে মহানবী (সা.) মক্কা বা মদিনায় আজকের দিনের মতো কোনো রাষ্ট্র তৈরি করেননি। তাহলে পাকিস্তানের জামায়াতে ইসলামীর প্রধান স্লোগান 'নিজাম-ই-মুস্তফা'র আহ্বানকে কেন শুধু একটি 'ইসলামিক রাষ্ট্র' বানানোর চেষ্টা হিসেবে দেখা হবে? ইংরেজি ভাষার বইপত্রেও 'ইসলামিক রাষ্ট্র' কথার পাশাপাশি 'ইসলামী সামাজিক-রাজনৈতিক ব্যবস্থা', ইসলামের 'সামাজিক প্রভাব', 'ইসলামী সমাজ', 'জীবন বিধান' বা 'ইসলামের পুনর্জাগরণ'-এর মতো শব্দগুলো সমানভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। 

সমকালীন প্রেক্ষাপট বিবেচনায় বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা ইসলামী আন্দোলনগুলোর জন্য 'ইসলামিক রাষ্ট্র' একটা বড় স্লোগান ছিল ঠিকই, কিন্তু এত সব আলাদা আলাদা শব্দ ও ধারণাকে জোর করে একসাথে মিলিয়ে সবকিছুর অর্থ স্রেফ একটা 'আধুনিক রাষ্ট্র' বানিয়ে দেওয়াটা মস্তবড় ভুল ব্যাখ্যা ছাড়া আর কিছুই নয়। উসামা আল আজামী কুয়েন্টিন স্কিনারের বিখ্যাত লেখা 'A Genealogy of the Modern State'-এর উদ্ধৃতি দিয়ে দেখিয়েছেন যে, এই বিতর্কিত 'রাষ্ট্র' শব্দটি মূলত গত কয়েক শতাব্দী ধরে আমাদের চেনা সাধারণ অর্থে ব্যবহার হয়ে আসছে। কিন্তু তারপরেও আধুনিক ইতিহাসবিদরা নিয়মিতভাবে প্রাচীনকালের নগর-রাষ্ট্র বা মধ্যযুগের রাষ্ট্র নিয়ে কথা বলেন এবং স্কিনার বা হাল্লাকের মতো পণ্ডিতরা নতুন কোনো পরিভাষা না দেওয়া পর্যন্ত ইতিহাসবিদদের দোষ দেওয়া যায় না। কোনো নতুন আইন তৈরি করে যেমন অতীতের কাজের বিচার করা অন্যায়, ঠিক তেমনি পরের যুগের পণ্ডিতদের আবিষ্কার দিয়ে আগের যুগের লেখকদের খাটো করাও অন্যায্য। এই নিয়মটি হাসান আল-বান্নার মতো আলেম কিংবা বর্তমানের সালাফি আল-নূর পার্টির মতো সাধারণ রাজনৈতিক কর্মীদের জন্য আরও বেশি প্রযোজ্য, কারণ পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই জটিল তত্ত্বগুলো জানার সুযোগ তাঁদের কখনোই ছিল না। 

তাছাড়া, এই আলাপও জারি আছে যে, আরব বিশ্বে ইসলামিক রাষ্ট্রের দাবিটা ছিল আসলে 'নিজেদের সাংস্কৃতিক পরিচয় ধরে রাখার' একটা চেষ্টা, যাতে পশ্চিমের ক্ষমতা এবং তাদের রাষ্ট্রব্যবস্থা থেকে নিজেদের আলাদা রাখা যায়। যদি তা-ই হয়, তবে প্রকাশের মাধ্যমটাকে কি আমরা এত বড় করে দেখব যে আসল কথাটাই ঢাকা পড়ে যাবে? অথচ, ইসলামিক রাষ্ট্রের দাবিটা ছিল রাজনৈতিক প্রতিবাদের অনেকগুলো রূপের মধ্যে একটা রূপ মাত্র, এটাকে শুধু 'রাষ্ট্র' শব্দ দিয়ে মাপা যাবে না। এটা ঠিক যে, কিছু আন্দোলন শুধু রাষ্ট্রকে ইসলামী কায়দায় বদলানোর চেষ্টা করেছে এবং এই চেষ্টা থেকে তারা যেমন আশা করেছিল তেমন ফল পায়নি। আবার ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার নামে পশ্চিমের রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তির মোকাবিলায় কিছু কিছু আন্দোলন অতিমাত্রায় উদার নীতিমালা গ্রহণ করেছে। তাই বলে রাজনৈতিক ইসলামের পুরো তাত্ত্বিক দিকটিকেই বদলিয়ে ফেলা যায় না। পাশাপাশি, তাদের অবদানকেও অস্বীকার করা অনুচিত। অন্যদিকে, রাজনৈতিক ইসলাম নানাভাবে আধুনিক তুরস্ক, ইরান, মালেশিয়া কিংবা ইন্দোনেশিয়াসহ বিশ্বব্যাপী রাষ্ট্রগুলোর কাঠামোগত ইসলামায়নে স্বল্প কিংবা ব্যাপক পরিসরে ভূমিকা রেখে চলেছে।

ইসলামপন্থা বা 'ইসলামিজম' অনেক বড় ও বৈচিত্র্যময় একটি বিষয়। এর মূল উদ্দেশ্য হলো, মুসলিম মানস ও সমাজকাঠামো যেন আল্লাহর দেওয়া নৈতিক নিয়ম মেনে বাঁচতে পারে, তার জন্য বিভিন্ন উপায় খুঁজে বের করা। আধুনিক দুনিয়ায় ইসলামী আদর্শ মেনে চলার জন্য মুসলমানরা এমন আরও অনেক পথ বের করেছে। এর কোনো কোনোটা হয়তো সরকারের নিয়মনীতি দিয়ে সাহায্য পায়, আবার কোনোটা বাধার মুখে পড়ে। কিন্তু মানুষের এই চেষ্টাগুলো অবাস্তব নয়,অনেকক্ষেত্রে স্থান-কাল-প্রেক্ষাপট বিবেচনায় সময়োপযোগী। এগুলো সত্যিকারে মানুষ যেমন মেনে চলে এবং সমাজ ও রাষ্ট্রে এর বাস্তব প্রভাবও পরিলক্ষিত হয়। ফলে, হাল্লাকের পর্যালোচনায় ইসলামি রাষ্ট্র বলতে শুধুমাত্র রাজনৈতিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার যে প্রবণতা ব্যাখ্যা করা হয়েছে সেটা আরো পর্যালোচনার অবকাশ থেকে যায়।

সপ্তম, অটোমান রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক ইতিহাসের গবেষক সাঈদ সালিহ কায়ামাকচি হাল্লাকের 'দি ইম্পসিবল স্টেট' গ্রন্থের উপর George Mason University-এর অনলাইন প্রকাশনা প্লাটফর্ম The Maydan এ একটি ক্রিটিকাল রিভিউ প্রকাশ করেছেন। কায়ামাকচি তার লেখায় হাল্লাকের ইউরোপীয় ইতিহাস পাঠ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন। তিনি মনে করেন, হাল্লাক তার বইয়ে ইউরোপীয় রাজতন্ত্রকে প্রায় সীমাহীন ক্ষমতার অধিকারী হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। কিন্তু সমসাময়িক ইতিহাসচর্চার পাটাতনে ঐতিহাসিকগণ সেই মন্তব্যের বিপরীতে অবস্থান নিয়েছেন। তারা বলার চেষ্টা করছেন, ইউরোপের রাজাদের ক্ষমতা কখনোই এতটা নিরঙ্কুশ ছিল না। তারা চার্চ, অভিজাত শ্রেণি, স্থানীয় প্রথা, পার্লামেন্ট এবং প্রচলিত আইনের নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে শাসন করতেন। বিশেষত ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও দেওয়ানি আইনের ক্ষেত্রে রাজাদের ক্ষমতা ছিল সীমিত। ফলে আধুনিক রাষ্ট্রের উদ্ভবকে একরৈখিক ক্ষমতা-কেন্দ্রীকরণের গল্প হিসেবে বর্ণনা করা ইতিহাসের জটিলতাকে সরলীকৃত করে ফেলা হয় বলে কায়মাকচির ধারণা।

কায়ামাকচি আরো দেখান যে, হাল্লাক ‘দাওলা’ (রাষ্ট্র) শব্দটির ঐতিহাসিক বিকাশকেও যথাযথভাবে তার বইয়ে মূল্যায়ন করেননি(৬২পৃ.)। অটোমান চিন্তায় ‘দাওলা’ ধীরে ধীরে এমন একটি রাষ্ট্র-ধারণায় রূপ নেয়, যা সুলতানের ব্যক্তিগত ক্ষমতা থেকে পৃথক এবং শরিয়াহর অধীন একটি সাংবিধানিক কাঠামো হিসেবে বিবেচিত হতো। এমনকি 'ইসলামিক রাষ্ট্র' (Devlet-i Islamiyye) পরিভাষাও আধুনিক যুগের আগেই অটোমান নথিপত্রে ব্যবহৃত হয়েছিল, যা হাল্লাকের দাবির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

এছাড়া ইউরোপীয় সামরিক আধুনিকতার চ্যালেঞ্জের মুখে অটোমানদের প্রতিক্রিয়াও হাল্লাক যথেষ্ট গুরুত্ব দেননি। ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর বাধ্যতামূলক সৈন্যভর্তি, কেন্দ্রীভূত আমলাতন্ত্র ও আইন প্রণয়নের ক্ষমতা অটোমানদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করলেও, তারা দীর্ঘ সময় ধরে শরিয়াহভিত্তিক সাংবিধানিক কাঠামো বজায় রেখে প্রয়োজনীয় সংস্কারের পথ খুঁজতে চেষ্টা করেছে। অর্থাৎ আধুনিকতার সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ছিল দ্বন্দ্ব, সমন্বয় ও অভিযোজনের; সরল প্রত্যাখ্যান বা সম্পূর্ণ গ্রহণের নয়। কায়ামকচি আরও যুক্তি দেন যে, অটোমান রাজনৈতিক চিন্তায় রাষ্ট্রকে কখনোই সর্বোচ্চ উদ্দেশ্য হিসেবে দেখা হয়নি। রাষ্ট্র ছিল ধর্ম, সমাজ ও জনকল্যাণ রক্ষার একটি মাধ্যম। তাই রাষ্ট্রের স্বার্থকে ধর্ম ও মানুষের কল্যাণ (মাসলাহা)-এর অধীনেই বোঝা হতো। এই ধারণা আধুনিক সার্বভৌম রাষ্ট্রের ধারণা থেকে মৌলিকভাবে ভিন্ন।

অটোমান ইতিহাসের পার্সপেক্টিভ বিবেচনায়, হাল্লাকের উল্লেখ্য দাওলাহ' ও ইতিহাসের বয়ানগত সমালোচনা করলেও কায়মাকচি স্বীকার করেন যে, হাল্লাকের আধুনিক রাষ্ট্রের নৈতিক সংকট বিষয়ক বিশ্লেষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে তাঁর মতে, অটোমান অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে ইসলামি শাসনব্যবস্থা ছিল পরিবর্তনশীল, বিতর্কপূর্ণ ও অভিযোজনক্ষম। তাই আধুনিক রাষ্ট্র ও ইসলামি শাসনের সম্পর্ককে একেবারে 'অসম্ভব' বলে ঘোষণা করার পরিবর্তে, এটিকে একটি জটিল, ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিকভাবে কঠিন অভিযোজনের প্রক্রিয়া হিসেবে দেখাটা ছিল অধিক যুক্তিসঙ্গত। 

অষ্টম সমালোচনা হচ্ছে, হাল্লাকের বইতে জাতীয়তাবাদের ওপর খুব কম মনোযোগ দেওয়া হয়েছে বলে মনে করেন প্রফেসর ইরফান আহমেদ। এবং জাতীয়তাবাদের সমান্তরালে বা এর বিপরীতে যে অন্য চিন্তাভাবনাগুলোও ইতিহাসে বিরাজমান ছিল, তার প্রায় কোনো উল্লেখই নেই। তিনি মনে করেন, যদি আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা এই 'জাতি' বা নেশনের ধারণা থেকেই তার সব শক্তি আর বৈধতা পেয়ে থাকে, তবে রাষ্ট্রব্যবস্থার সমালোচনার সাথে সাথে বাস্তব জীবনের জাতীয়তাবাদের সমালোচনাকেও যুক্ত করা দরকার। এই দুটোকে একসাথে মেলাতে পারলে ভবিষ্যতের জন্য অন্য কোনো পথ বা সমাজ কল্পনা করা সহজ হবে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পুরো পৃথিবীর রাজনীতিতে 'জাতিরাষ্ট্র' (Nation-state) ধারণাটিই একমাত্র উপায় হিসেবে জিতে যায়। এর ফলে, প্রাচ্যের বা অ-পাশ্চাত্যের নতুন তৈরি হওয়া দেশগুলো তাদের জাতীয়তাবাদের সরকারি ইতিহাসের বাইরে অন্য সব চিন্তাকে ভুল বলে খারিজ করে দেয় এবং ইতিহাস থেকে মুছে ফেলে। এটা ঠিক যে, উনিশ ও বিশ শতকের পুরো অ-পাশ্চাত্য বা প্রাচ্যের দেশগুলোর অনেক বড় বড় নেতারা এই আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থাকেই নিজেদের আদর্শ বানিয়ে ফেলেছিল। কিন্তু সবাই যে স্রেফ চোখ বন্ধ করে এটা মেনে নিয়েছিল, তা নয়। মানুষ অনেক উপায়েই এই রাষ্ট্রকাঠামোর বিরোধিতা করেছে, একে রুখে দাঁড়িয়েছে, অবিশ্বাস করেছে এবং এর নিয়মকানুন এড়িয়ে চলেছে। তাই আধুনিক রাষ্ট্র ও তার চরম ক্ষমতার প্রতিষ্ঠার গল্পের ভেতরেই লুকিয়ে আছে সাধারণ মানুষের অন্য একটি গল্প। সমাজের দুর্বল ও ক্ষমতাহীন মানুষেরা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার জোরজুলুমকে ফাঁকি দেওয়ার জন্য এই উপায়গুলো বেছে নেয়, যাতে তারা রাষ্ট্রের কোনো রকম ঝামেলা বা অত্যাচার ছাড়াই নিজেদের সংস্কৃতি ও অতীতকে নিয়ে বেঁচে থাকতে পারে। যেমনটি ক্রেবিল অ্যামিশ (Amish) সম্প্রদায়ের মানুষের ক্ষেত্রে দেখিয়েছেন। ঠিক একইভাবে, জর্ডানের বেনি সাখর উপজাতির খুরেশা সম্প্রদায়ের মানুষ ও অন্যরা এই রাষ্ট্র তৈরির চেষ্টা, দেশের সীমানা টানা এবং জাতিরাষ্ট্রের এই নতুন নিয়মের বিরুদ্ধে কীভাবে লড়াই করেছিল, তা ভাবা দরকার। এটা ঠিক যে, সাধারণ মানুষের এই ফাঁকি দেওয়ার কৌশলগুলো কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্রের পথচলাকে থামিয়ে দিতে পারেনি, বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে রাষ্ট্রকে আরও সতর্ক ও শক্তিশালী করেছে। তা সত্ত্বেও, তত্ত্ব বা দর্শন তৈরি করার জন্য মানুষের এই লড়াইয়ের উপাদানগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

তৎকালীন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা এবং ১৯২০-এর দশকের ভারতের স্বাধীনতা ও খেলাফত আন্দোলনের বড় নেতা মোহাম্মদ আলী জোহরের কথাই ধরা যায়। তিনি ভারতকে একটি সাধারণ জাতিরাষ্ট্র হিসেবে ভাবেননি; তিনি ভেবেছিলেন এটি হবে 'ধর্মসমূহের একটি ফেডারেশন' বা মিলনমেলা। এই স্বপ্ন পূরণ করতে তিনি 'কমরেড' নামে একটি পত্রিকা বের করেন, যার নীতি ছিল 'সবার প্রতি বন্ধুত্ব, কারও একচোখা সমর্থক নয়'। জাতীয়তাবাদ মানুষের কাছ থেকে যে একচেটিয়া আনুগত্য দাবি করে, তা অস্বীকার করে তিনি বলেছিলেন: 'আমি সমান আকারের দুটি বৃত্তের ভেতর আছি, কিন্তু বৃত্ত দুটির কেন্দ্র এক নয়। একটি বৃত্ত হলো ভারত এবং অন্যটি মুসলিম বিশ্ব... ভারতীয় মুসলিম হিসেবে আমরা এই দুটি বৃত্তেরই অংশ, যার প্রতিটিতে ৩০ কোটির বেশি মানুষ আছে। আমরা কোনো বৃত্তই ছেড়ে যেতে পারি না'। হসরত মোহানী নামের আরেকজন বড় নেতা ও সাংবাদিক মুক্ত ভারতের ভবিষ্যৎকে 'প্রজাতন্ত্রসমূহের ফেডারেশনের সাংবিধানিক ভারতীয় ইউনিয়ন' হিসেবে দেখেছিলেন। তিনি ভারতের পূর্ব, দক্ষিণ, মধ্য, দক্ষিণ-পশ্চিম এবং পশ্চিমে আলাদা আলাদা ফেডারেশন কল্পনা করেছিলেন এবং প্রতিটি ফেডারেশন তৈরি হতো এলাকা বা ভাষার ভিত্তিতে। তখনকার মূলধারার উগ্র জাতীয়তাবাদীদের কাছে হসরতের এই ভাবনার কোনো দাম ছিল না। কিন্তু আমাদের এটা বোঝা দরকার যে, সে সময় শুধু জাতীয়তাবাদ বা জাতিরাষ্ট্রের চিন্তাই একমাত্র পথ ছিল না। আরব বিশ্বেও এমন বিকল্প চিন্তা ছিল। সিরিয়ার মতো দেশগুলো কিন্তু সেখানকার মানুষের ইচ্ছায় তৈরি হয়নি, বরং 'বেশিরভাগ মানুষের তীব্র বিরোধিতার মুখে' জোর করে তৈরি করা হয়েছিল। 

ইউরোপীয়দের উস্কে দেওয়া শিয়া-সুন্নি কোন্দল থাকা সত্ত্বেও, বিংশ শতাব্দীর শুরুতে 'আল-ইরফান' পত্রিকার শিয়া বুদ্ধিজীবীরা নিজেদের ইউরোপের মতো কোনো 'জাতি' মনে করতেন না। তাই ইংরেজরা তাঁদের 'প্যান-ইসলামিস্ট' হিসেবে বর্গায়ন করে । একইভাবে শাকিব আরসালান বা সাতি আল-হুসরির চিন্তাভাবনাকেও জাতিরাষ্ট্রের বিরোধী বা সন্দেহবাদী হিসেবে নতুন করে পড়া যায়। কিছুদিন আগে ফ্রেডরিক কুপার পশ্চিম আফ্রিকায় জাতীয়তাবাদের বিকল্প চিন্তাগুলো নিয়ে খুব সুন্দর লিখেছেন। পশ্চিম আফ্রিকার অনেক বড় নেতাই জাতিরাষ্ট্রের চশমা দিয়ে দুনিয়াকে দেখতেন না, বরং তাঁরা একে সন্দেহের চোখে দেখতেন। ১৯৫৩ সালে সেখানকার নেতারা 'সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের লোভ' থেকে দূরে থাকতে বলেছিলেন এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক গণতন্ত্রের ওপর জোর দিয়েছিলেন। সেনেগালের নেতা মামদু দিয়া বলেছিলেন, 'জাতিরাষ্ট্রের এই পুরোনো সাম্রাজ্যবাদী চিন্তা বাদ দিয়ে আমাদের আধুনিক বহুজাতিক রাষ্ট্রের দিকে এগোতে হবে।' সেনেগালের বিখ্যাত খ্রিস্টান নেতা ও পরবর্তী প্রেসিডেন্ট লিওপোল্ড সেংঘোর তো 'জাতীয়তাবাদকে বাচ্চাদের একটি রোগ' বলেছিলেন, যা দ্রুত সারানো দরকার। এই সব বিচিত্র চিন্তাভাবনা যদি ইউরোপের ওয়েস্টফালিয়ান রাষ্ট্রের অন্ধ অনুকরণ না হয়ে থাকে, তবে আজকের এই সংকীর্ণ পৃথিবীর বাইরে অন্য এক সুন্দর পৃথিবীর স্বপ্ন দেখতে আমাদের এই পুরোনো ঐতিহাসিক চিন্তাগুলোকে আবার খুঁজে বের করতে হবে।কারণ ফরাসি চিন্তাবিদ জ্যাক রাঁসিয়েরের ভাষায় বলতে গেলে, শুধু শাসনের কথা না লিখে, মানুষের এই 'মুক্তি' বা স্বাধীন হওয়ার গল্প ও কবিতা লেখার জন্যই এই বিষয়গুলো জানা দরকার।

নবম সমালোচনা হচ্ছে, ইসলাম যে অর্থনৈতিক রূপকল্প উপস্থাপন করে, তার ভিত্তি মূলত নৈতিকতা। কুরআন ও হাদিসে লেনদেন, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সততা ও বিশ্বস্ততার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সমাজের নিপীড়িত, দরিদ্র ও বঞ্চিত মানুষের প্রতি দায়িত্ব পালনের জন্য বারবার আহ্বান জানানো হয়েছে। কুরআনে বলা হয়েছে, 'পুণ্যবান তারা, যাদের ধন-সম্পদে সাহায্যপ্রার্থী ও বঞ্চিতদের সুনির্দিষ্ট অধিকার রয়েছে।' অন্যদিকে, একটি হাদিসে ঘোষণা করা হয়েছে, 'সৎ ও বিশ্বস্ত ব্যবসায়ী [পরকালে] নবীদের সঙ্গী হবেন' (পৃষ্ঠা ১৫০)। যাকাতের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো সম্পদকে পবিত্র করা এবং সমাজে সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা। বিপরীতে, যারা কেবল সম্পদ সঞ্চয় করে এবং অর্থ উপার্জনকেই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য বানিয়ে নেয়, তাদের জন্য কুরআনে কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারিত হয়েছে। এর বিপরীতে দান, সদকা এবং জনকল্যাণমূলক ব্যয়কে অত্যন্ত মর্যাদার সঙ্গে মূল্যায়ন করা হয়েছে।

ঐতিহাসিকভাবে মুসলিম সমাজে দাতব্য ওয়াকফ প্রতিষ্ঠানের ব্যাপক বিস্তার ছিল। হাল্লাকের ভাষ্য অনুযায়ী, মুসলিম বিশ্বের মোট স্থাবর সম্পত্তির প্রায় ৪০–৫০ শতাংশই ওয়াকফের অধীনে ছিল (৫৭পৃ.)। তাঁর মতে, এই ধরনের জনকল্যাণমুখী মানসিকতা বা subjectivity ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভ ও ধর্মীয় অনুশীলনের মাধ্যমে গড়ে ওঠে। আবু হামিদ আল-গাজালীর চিন্তার আলোকে হাল্লাক ইসলামের ধর্মীয় অনুশাসন ও আধ্যাত্মিক সফরের সমন্বয়মূলক দীর্ঘ বিশ্লেষণ হাজির করেন। এছাড়াও, হাল্লাক ফুকোর ধারণাকে ‘গাজালীয়’(১২৯পৃ) বলে উল্লেখ করে দেখানোর চেষ্টা করেছেন যে, ধর্মীয় আচার, বিশ্বাস ও নৈতিক কর্ম একে অপরের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত। এই দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে তিনি ইবাদত (ধর্মীয় আচার) ও মুয়ামালাতকে (পারস্পরিক লেনদেন) পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন করার উদারপন্থী (liberal) প্রচেষ্টার সীমাবদ্ধতা তুলে ধরেন। তাঁর মতে, আধুনিক রাষ্ট্র যে ধরনের নাগরিক-মানসিকতা গড়ে তোলে, তা গাজালীয় নৈতিক প্রকল্পের সঙ্গে মৌলিকভাবে ভিন্ন। গাজালির প্রকল্প কেবল নৈতিকতা, আইন, ধর্মতত্ত্ব, তাসাওউফ ও দর্শনের এক বুদ্ধিবৃত্তিক সংশ্লেষণই নয়, বরং এটি মুসলিম ব্যক্তিসত্তার এক গভীর নৃতাত্ত্বিক অনুসন্ধানও বটে। এটি সেই বুদ্ধিবৃত্তিক, সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক শক্তিগুলোকে তুলে ধরে, যা এই মুসলিম ব্যক্তিসত্তাকে একটি আদর্শ মডেলে (paradigm) পরিণত করেছিল।

অন্যদিকে, ইসলাম ব্যবসা-বাণিজ্য ও বৈধ উপায়ে সম্পদ অর্জনকে নিরুৎসাহিত করে না; বরং তা উৎসাহিত করে।(১৪৯পৃ.) তবে হাল্লাকের মতানুযায়ী, 'ইসলামের নৈতিক অর্থনৈতিক আদর্শের সঙ্গে আধুনিক পুঁজিবাদ, বিশেষ করে শুধু লাভ খোঁজা মুনাফাকেন্দ্রিক বৃহৎ করপোরেট ব্যবস্থার সাথে সমন্বয় করা মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত কঠিন' (পৃষ্ঠা ১৫৪পৃ.)। কিন্তু এখানেই তাঁর বিশ্লেষণের একটি সীমাবদ্ধতা লক্ষ করা যায়। তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন যে, ইতিহাসে এমন সমন্বয়ের কোনো উল্লেখযোগ্য প্রচেষ্টার বিশদ মূল্যায়ন তিনি করেননি(কারণ এই ধরণের চেষ্টা তো গত দুইশো বছরের ইতিহাসের মধ্যেই হতে পারত, যাকে তিনি আগেই বই থেকে বাদ দিয়েছেন)। ফলে ইসলাম ও পুঁজিবাদের সহাবস্থানকে একেবারে ‘অসম্ভব’ বলা কঠিন হয়ে পড়ে। ইসলামী আইনে অংশীদারিত্বভিত্তিক ব্যবসা (partnership) একটি সুপ্রতিষ্ঠিত ও স্বীকৃত ব্যবস্থা, যা আধুনিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। অনেক ক্ষেত্রেই এটি বৃহৎ করপোরেট কাঠামোর তুলনায় অধিক জবাবদিহিতা ও ন্যায়সংগত অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার সম্ভাবনা সৃষ্টি করে। যা আজ শুধু মুসলিম চিন্তাবিদরাই নয়, বহু সমকালীন অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞও স্বীকার করেন। তদুপরি, বহুজাতিক করপোরেশনের অনিয়ন্ত্রিত প্রভাব মোকাবিলা এবং তাদের জালিয়াতি বা অপব্যবহার রোধে আইন প্রণয়ন ও কার্যকর বিচারব্যবস্থা নিশ্চিত করার সক্ষমতা আধুনিক রাষ্ট্রের যথেষ্ট রয়েছে। হাল্লাক উক্ত বিষয়ে আরো পর্যালোচনাধর্মী আলাপ হাজির করতে পারতেন। কিন্তু সেটা পুরোদস্তুর গরহাজির।

দশম সমালোচনা হচ্ছে, হাল্লাক তার বইটার নাম দিয়েছেন দ্য ইম্পসিবল স্টেট। এখানে তিনি 'ইম্পসিবল স্টেট' বলতে আধুনিক 'ইসলামিক স্টেট'-কে মীন করেছেন। অথচ বইটিতে তিনি সরাসরি যে স্টেটের সবচাইতে ব্যাপক, গভীর এবং তীব্র ক্রিটিক করেছেন তা হল 'ওয়েস্টার্ন মডার্ন নেশন-স্টেট', 'ইসলামিক স্টেট' কিন্তু নয়। কদাচিত তিনি 'ইসলামিক স্টেট' ও 'ইসলামিজমে'র সরাসরি সমালোচনা করেছেন। তার কিতাব ও থিসিসের তর্কটা অনেকটা এরকম যে, যেহেতু 'মডার্ন স্টেট' ও নীতি-নৈতিকতা নির্ভর শাসনের মধ্যে একটা সম্পূর্ণ বৈপরীত্য রয়েছে, তাই 'মডার্ন স্টেটে'র একটি ভার্শন হিসাবে 'ইসলামিক স্টেট' একেবারে অসম্ভব ও অসঙ্গতিপূর্ণ। অর্থাৎ তিনি 'ইসলামিক স্টেটে'র বিশ্লেষণ করছেন না, করছেন 'মডার্ন স্টেটে'র; কিন্তু পরোক্ষভাবে 'মডার্ন স্টেটে'র যাবতীয় ত্রুটিগুলি 'ইসলামিক স্টেটে'র উপরে বর্তায় বলে তিনি ইঙ্গিত করেছেন।

এই ত্রুটিগুলি বাস্তব আধুনিক 'ইসলামিক স্টেটে'র উপরে কতটা প্রযোজ্য তা তিনি নমুনা বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রতিপাদন কিংবা পরিষ্কার করছেন না। তিনি পাকিস্তান, সৌদি আরব ও ইরানের নাম নিয়েছেন বটে; কিন্তু এই নমুনাগুলির বিস্তারিত বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা করেন নি। একইভাবে মিশরের 'ইখওয়ানুল মুসলিমিনে'র নামও তিনি উল্লেখ করেছেন ঠিকই; কিন্তু এটি কিংবা দক্ষিণ এশিয়ার 'জামায়াতে ইসলামী'র কোনো বিস্তারিত আলাপ তার কিতাবে নাই। তিনি আধুনিক রাষ্ট্রের সমস্যা ও সংকট নিয়ে প্রত্যক্ষ ও বিস্তারিত আলাপ করে 'ইসলামি রাষ্ট্র'-কে পরোক্ষভাবে সমস্যায়িত করার কৌশল অবলম্বন করেছেন। কিন্তু তিনি যদি বাস্তব আধুনিক 'ইসলামি রাষ্ট্রে'র নমুনাগুলির সরাসরি বিশ্লেষণ ও সমস্যায়ন করতেন, তাহলে তা আরও বেশি শক্তিশালী হতে পারত বলে মনে করি।

শেষকথা :

হাল্লাক তাঁর আলোচনার সমাপ্তি টেনেছেন এক ধরনের ত্রিবিধ ভাবনার দোলাচলে। একদিকে তিনি পাশ্চাত্যকে আহ্বান জানান মুসলিম অপরত্বের (Miuslim other) এই মৌলিক স্বাতন্ত্র্যকে স্বীকার করতে এবং মুসলিম সমাজের ওপর চাপিয়ে দেওয়া তথাকথিত ‘সার্বজনীনতার’ মুখোশ পরিত্যাগ করতে। আবার, মুসলিমদেরকে উৎসাহিত করেন পশ্চিমের সাথে একধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক মোকাবিলায় অংশগ্রহন করতে। হাল্লাকের প্রত্যাশা, পশ্চিমা মনন যদি ইসলামের এই নৈতিক ও দার্শনিক ঐতিহ্যের প্রতি উন্মুক্ত হতে পারে, তবে হয়তো সেই সাক্ষাৎ তাদের নিজস্ব বৌদ্ধিক সংকট অতিক্রমেরও একটি পথ দেখাতে সক্ষম হবে। অন্যদিকে আবার বইয়ের আলাপে তিনি আধুনিক রাষ্ট্রের ইসলাম প্রতিষ্ঠার বয়ানকে অসম্ভব বলে বিশ্লেষণ করেন। যা হাল্লাকের চিন্তার ভিত্তিমূলকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

কেননা, হাল্লাকের এই সুপারিশমূলক বয়ানের প্রেক্ষাপট বিবেচনারও বহুকাল পূর্ব থেকে মুফতি আব্দুহু, রশিদ রিদা, আবুল হাসান আলী নদভী, মওদূদী, সাইয়েদ কুতুব কিংবা তারিক রমাদানের মত বুদ্ধিজীবীরা ইসলামের সাথে পশ্চিমের বুদ্ধিবৃত্তিক মোকাবিলার কথা বলে আসছিলেন। যদিও তাদের ভাষা ও ব্যবহারের এপ্রোচে ভিন্নতা ছিল, কিন্তু উদ্দেশ্যগত দিক থেকে সেটা অনেকটাই অভিন্ন। এইসব বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ পশ্চিমা আধুনিকতার বিরুদ্ধে মুসলমানদের কন্ঠস্বর হওয়ার চেষ্টা করেছেন। 'ইসলামাইজেশন অব নলেজ' সেই মোকাবিলারই একটি পথ। শুধু তাই নয়, আধুনিক যুগের বাস্তবতায় উসূলবিদ ও মুসলিম চিন্তাবিদরা শরিয়ার বাস্তবিক ও সময়োপযোগী প্রয়োগ সাধনে মাকাসিদে শরীয়ার মত দূর্দান্ত কন্সেপ্ট ডেভেলপ করেছেন। যার সফল প্রভাব আজকের ইন্দোনেশিয়া, মালেশিয়া, ইরান কিংবা তুরস্কের মত রাষ্ট্রগুলোর আদর্শ ও সমাজ কাঠামোর অন্তরালে ব্যাপকভাবে পরিলক্ষিত হয়। হয়তো বিভিন্ন দিক থেকে বিচার করলে রাষ্ট্রগুলো পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি ও আধুনিক বৈশ্বিক রাজনীতির মারপ্যাঁচে আটকানো মনে হবে। কিন্তু, তাদের প্রচেষ্টা ও সমাজগঠনের অপার স্বপ্ন অনেকটাই ইসলামিজমের অনাগত ভবিষ্যত সফলতার হাতছানি দিয়ে যায়।

এক্ষেত্রে, হাল্লাকের বই মুসলিম মননে একধরনের সাইকোলজিকাল অসন্তোষ তৈরির প্রচেষ্টায় রত। যা দেখতে সুন্দর ও সুমিষ্ট মনে হলেও আদতে একটা মাকাল ফল। এর মাধ্যমে মুসলিম মননে আধুনিক রাষ্ট্রের মাঝে নিজের ও সমাজের প্রতি ব্যক্তির যে দায়বোধ ও কর্তব্যের সীমারেখা, সেটাকে আরো সংকুচিত করে। ব্যক্তির মনোজগত এক অন্ধকার আত্মপরিচয়ের সংকটে নিপতিত হয়,তার ভাবনায় ধরা দেয় এক অসম্ভব রাষ্ট্র, যেখানে সে এক মরিচীকা। হাতছানি দেয় অন্ধকারের বুকে, তারপর ঘটে এক স্বপ্নভঙ্গের যাতনা। হাল্লাক থেমে যান সেই তীরেই।

প্রকাশিত হওয়ার পর থেকেই আধুনিককালের ইসলামপন্থী এক্সট্রিমিস্ট গ্রুপগুলোর প্রধান হাতিয়ার হয়ে ওঠে ওয়ায়েল হাল্লাকের ইম্পসিবল স্টেট গ্রন্থ। হাল্লাকের মত তারাও মনে করেন আধুনিক রাষ্ট্রে ইসলাম প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা একটা অসম্ভব ব্যপার। কিন্তু হাল্লাক যখন বইয়ে জাতিরাষ্ট্রের সমাধান বা ইসলাম প্রতিষ্ঠার কোন যুগোপযোগী পদ্ধতি হাজির করতে অসমর্থ হন, সেখানেই গ্রুপগুলো তাদের কথিত শরীয়া প্রতিষ্ঠার জেহাদী ডকট্রিন হাজির করে ব্যক্তির মনোজগতে প্রভাব রাখার চেষ্টা করে। উক্ত প্রকল্পের বিরোধী যেকেউই কাফির হিসেবে আখ্যায়িত হন এবং তাকে হত্যা করাকে কর্তব্যের মধ্যে নিয়ে নেয়। হোক সে ব্যক্তি সমাজ ও রাষ্ট্রে মুসলিম পরিচয়ের পতাকাবাহী। কিংবা গণতান্ত্রিক পন্থায় রাষ্ট্রে ইসলামের মৌলিক অনুশাসন প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে অগ্রসর।

সব মিলিয়ে, The Impossible State এমন একটি গ্রন্থ, যেখানে ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদের আলো খুবই ক্ষীণ। ইসলামের সঙ্গে বিজ্ঞান, যুক্তিবাদ, আধুনিক পাশ্চাত্য সভ্যতা, গণতন্ত্র, নারীবাদ, পুঁজিবাদ, উদারনৈতিক সহনশীলতা কিংবা আধুনিক সংস্কৃতির বিভিন্ন উপাদানের অসামঞ্জস্য নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিস্তর আলোচনা রয়েছে। হাল্লাক সেই তালিকায় আরও একটি মৌলিক অসামঞ্জস্য যোগ করেন 'শরিয়াহ ও আধুনিক রাষ্ট্রের মৌলিক অমিল'। তাঁর যুক্তি অনুযায়ী, এই দুই ব্যবস্থা কেবল ভিন্ন নয়; বরং তাদের ভিত্তিগত নীতিমালা পরস্পর অসামঞ্জস্যপূর্ণ। এ কারণেই তিনি বলেন, বর্তমান যুগে মুসলমানদের একদিকে আধুনিক রাষ্ট্রের অনিবার্য বাস্তবতা এবং অন্যদিকে শরিয়াহভিত্তিক শাসনব্যবস্থার অনুপস্থিতির কঠিন বাস্তবতার মধ্যে এক ধরনের আপস বা সমন্বয় করে চলতে হবে।

বইটিতে আরব বসন্তের সংক্ষিপ্ত উল্লেখ থাকলেও সেটিই ভবিষ্যৎ সম্পর্কে একমাত্র ক্ষীণ আশার ইঙ্গিত। কিন্তু আজ সেই আরব বসন্তও দেশীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তির প্রতিযোগিতা এবং ভূরাজনৈতিক স্বার্থের সংঘাতে কার্যত বিপর্যস্ত। যে রাষ্ট্রগুলো নিজেদের গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের প্রবক্তা হিসেবে উপস্থাপন করে, তাদের অনেকের ভূমিকাও এই আন্দোলনের ব্যর্থতায় প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে একটি মৌলিক প্রশ্ন অনিবার্য হয়ে ওঠে, তাহলে মুসলিম বিশ্বের ভবিষ্যৎ কোন পথে? যদি আধুনিক রাষ্ট্র ও শরিয়াহর মধ্যে হাল্লাক যে মৌলিক অসামঞ্জস্য চিহ্নিত করেছেন তা সত্যিই এত গভীর ও আপসহীন হয়, তবে সেই অচলাবস্থা অতিক্রমের বাস্তব পথ কী? হাল্লাক অত্যন্ত শক্তিশালী ও সূক্ষ্ম বিশ্লেষণের মাধ্যমে সমস্যাটিকে উন্মোচন করার চেষ্টা করেছেন বটে, কিন্তু তার কার্যকর সমাধান বা ভবিষ্যৎ নির্মাণের সুস্পষ্ট রূপরেখা দিতে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। ফলে The Impossible State মূলত আধুনিক রাষ্ট্রের একটি গভীর দার্শনিক সমালোচনা হিসেবে যতটা শক্তিশালী, একটি বিকল্প রাজনৈতিক কর্মপরিকল্পনা হিসেবে ততটা আশাব্যঞ্জক নয়। এ কারণেই বইটি পাঠকের মনে যেমন গভীর চিন্তার জন্ম দেয়, তেমনি রেখে যায় এক ধরনের অপূর্ণতা ও অনিশ্চয়তার অনুভূতি।