মেন্যু
Menu

জিয়াউর রহমান কী ইসলামপন্থী বা মুসলিম জাতীয়তাবাদী ছিলেন?

২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

'জিয়া মুক্তিযুদ্ধবিরোধী রাজাকার, আলবদরদের প্রতিষ্ঠিত করেছিল', নিষিদ্ধ সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা ২০১৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ যুবলীগের ৪২ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আয়োজিত পুর্নমিলনী সভায় এমন মন্তব্য করেন।১ ২০২১ সালের ০৬ নভেম্বর জামালপুরের সরিষাবাড়ি উপজেলার এক আয়োজনে তৎকালীন তথ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. মো. মুরাদ হাসান বলেন, জিয়াউর রহমান রাজাকার ও আলবদরদের মন্ত্রী বানিয়েছেন।২ বিগত সরকারের আমলে আওয়ামি লীগ নেতাদের অসংখ্য বক্তব্য-বিবৃতিতে জিয়াউর রহমানকে 'রাজাকারদের সহযোগী', 'রাজাকার', 'পাকিস্তানি' হিসেবে সম্বোধন করা হয়েছে।

জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমীর গোলাম আযম বলেন, জেনারেল জিয়াউর রহমান ১৯৭৫-এর নভেম্বরে ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকেই সমন্বয়ের রাজনীতি শুরু করেন। স্বাধীনতার পক্ষে-বিপক্ষে জনগণকে বিভক্ত করার পরিবর্তে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করে দেশকে গড়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ করেন।[...] রাজাকার নেতা হিসেবে নিন্দিত শাহ আজিজুর রহমানকে প্রধানমন্ত্রী ও জাতীয় সংসদে বিএনপি দলীয় পার্লামেন্টারি পার্টির নেতা নিযুক্ত করে প্রেসিডেন্ট জিয়া বিরাট দুঃসাহসের পরিচয় দেন। এ ব্যাপারে তিনি কারো আপত্তির পরওয়া করেননি।৩

২০২৬ সালের ১৭ মে স্টার নিউজের কড়া আলাপে উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ ড. শিব্বির আহমেদ বলেছেন, 'মেজর জিয়াকে সিপাহি-জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে মুক্ত করা হলো। ওখানে জাসদ ছিল, সেনাবাহিনী ছিল, জনতা ছিল। ওখানে স্লোগান দিয়েছে নারায়ে তাকবির আল্লাহু আকবার। জাসদ তো নারায়ে তাকবির আল্লাহু আকবার স্লোগান দেয় না। সে স্লোগান কারা দিয়েছিল জিয়াকে যখন মুক্ত করা হয়েছিল। সে জনতা কারা ছিল? সে জনতা ছিল জামাতের লোকজন, সেই জনতা ছিল মুসলিম লীগ, সেই জনতা ছিল ইসলামপন্থী জনতা। সো জিয়াউর রহমানকে পাওয়ারে নিয়ে এসেছে ইসলামপন্থী জনতা। জিয়াউর নিজেও ইসলামপন্থী মানুষ ছিলেন। উনি ক্ষমতায় এসে 'আল্লাহর প্রতি পূর্ণাঙ্ক আস্থা ও বিশ্বাস' সংযুক্ত করেছেন সংবিধানে এবং আরও নানা সংস্কার করেছেন।'৪

টকশোর দর্শক-শ্রোতাগণের নিকট ড. শিব্বির আহমেদ জামায়াতপন্থী হিসেবে পরিচিত। ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের ইসলামপন্থী এবং ডানপন্থী ঘরানার রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবীগণ জিয়াউর রহমানকে মুসলিম জাতীয়তাবাদী বা ইসলামপন্থী হিসেবে উপস্থাপন করতে আরম্ভ করে। এক্ষেত্রে বিগত আওয়ামী বয়ানগুলোই তারা মূলত সামনে নিয়ে এসেছে। যেমন: জিয়াউর রহমান সংবিধানের মূলনীতি থেকে 'ধর্মনিরপেক্ষতা' কে অপসারণ করেন এবং এটিকে 'আল্লাহর প্রতি পূর্ণাঙ্ক আস্থা ও বিশ্বাস' দ্বারা প্রতিস্থাপন করেন। সংবিধানের শুরুতে 'বিসমিল্লাহ' যুক্ত করেন। তার হাত ধরেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী ফিরে আসে।

আমরা অনুসন্ধান করব: (১) ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের সিপাহি জনতার বিপ্লবের প্রেক্ষাপট, (২) জিয়াউর রহমানের 'ধর্মনিরপেক্ষা'র স্বরূপ, (৩) জিয়াউর রহমান ইসলামপন্থী বা মুসলিম জাতীয়তাবাদী ছিলেন কী না?

অনুসন্ধান পদ্ধতি:

অনুসন্ধান পদ্ধতি হিসেবে মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞানে বহুল ব্যবহৃত বিশ্লেষণী পদ্ধতির (Qualitative Method) ব্যবহার করা হয়েছে। প্রাথমিক উৎস (Primary Source) হিসেবে জিয়াউর রহমানের রচনা, সমকালীন পত্রিকার প্রতিবেদন/সংবাদ (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত) ব্যবহার করা হয়েছে। দ্বৈতীয়িক উৎস (Secondary Source) হিসেবে বিভিন্ন অনলাইন পোর্টালের সংবাদ/মতামত, প্রাসঙ্গিক গ্রন্থাবলি এবং সাময়িকী ব্যবহার করা হয়েছে।

ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বরের সিপাহি-জনতার বিপ্লব

১৯৭৫ সালে বাংলাদেশে তিনটি সেনা অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। প্রথম অভ্যুত্থানটি ঘটে ১৫ আগস্ট, দ্বিতীয়টি ৩ নভেম্বর এবং তৃতীয়টি ঘটে ৭ নভেম্বর।

৩ নভেম্বর সংঘটিত অভ্যুত্থানটিকে ভারতপন্থী অভ্যুত্থান হিসেবে দেখা হয়। কারণ, ভারতীয় গণমাধ্যমে উক্ত অভ্যুত্থানটিকে ইতিবাচক ভাবে প্রচার করা হয়। যেমন: আকাশবাণী এই অভ্যুত্থানকে 'প্রো-মুজিব' ক্যু বলে সম্বোধন করে।৫ ৪ নভেম্বর রুশ-ভারতপন্থী রাজনৈতিক দলসমূহ 'মুজিব দিবস' হিসেবে পালন করে। তারা মুজিবের স্মরণে একটি মিছিল বের করে। মিছিলটি ধানমন্ডি ৩২ এ গিয়ে সমাপ্ত হয়। এই মিছিলের নেতৃত্ব ছিলেন খালেদ মোশাররফের মাতা এবং ছোট ভাই রাশেদ মোশাররফ এমপি। ফলে জনগণের নিকট ৩ নভেম্বর 'রুশ-ভারতপন্থী ক্যু' হিসেবে পরিচিতি লাভ করে৷৬

৭ নভেম্বর খালেদ মোশাররফ হত্যাকান্ডের শিকার হন। তিনি আওয়ামী পরিবারের সন্তান ছিলেন। তবে তাকে 'রুশ-ভারতপন্থী' হিসেবে বিবেচিত করেননি তৎকালীন ঘটনার সহিত সম্পৃক্ত ব্যক্তিবর্গ। বি. কে. জাহাঙ্গীরের 'Problematic of Nationalism' এ বলা হয়েছে, মোশাররফ ভারতবিরোধী ছিলেন এবং তিনি শেখ মুজিব সম্বন্ধে বিরূপ মন্তব্যও করেছেন। কর্নেল (অব.) ফারুক রহমান ১৯৮৯ সালের ১৫ এপ্রিলে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ১৫ আগস্টের অভ্যুত্থানের সকালে অভ্যুত্থানের নেতাদের অভিনন্দন জানান এবং সহযোগিতা করেন।৭

বামপন্থী রাজনীতিবিদ রইস উদ্দিন আরিফ ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থান সম্পর্কে বলেন, পঁচাত্তরের ৩ নভেম্বরে দেশপ্রেমিক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সামরিক ক্যু-দেতার মাধ্যমে মার্কিন-ভারতের পুতুল মোশতাক সরকার উৎখাত হওয়ার পর র-এর চক্রান্তে তাৎক্ষণিকভাবে খালেদ মোশাররফ ভারতের দালাল এই প্রচারণা চালানো হলে ক্যু-দেতার নেতা খালেদ মোশাররফ বিভ্রান্ত সিপাহীদের দ্বারা নির্মমভাবে নিহত হন। তারই জের ধরে ৭ নভেম্বরে সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থান ঘটে রুশ-ভারত বিরোধী শ্লোগানকে কেন্দ্র করে।৮

নৃ-বিজ্ঞানী এবনে গোলাম সামাদ ৭ নম্ভেম্বরের অভ্যুত্থান সম্বন্ধে বলেছেন, সেই সময় জিয়া যদি এদেশের অতি উগ্র বামশক্তির [জাসদ] গতিরোধ না করতে পারতেন, তবে এদেশেও উদ্ভব হতে পারত পল পট (Pol Pot)-এর মত কোন নেতার। জিয়া যা করেছিলেন, তার ফলে এদেশে রক্ষা পেতে পেরেছিল বহু মানুষের জীবন। তার নীতির ফলে সমাজ বিপ্লবের নামে শুরু হতে পারে না বাংলাদেশে ব্যাপক গণহত্যা। যেমন শুরু হতে পেরেছিল কাম্বোডিয়াই, ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৯-এর মধ্যে পল পটের নেতৃত্বে। জিয়া চরমপন্থী ছিলেন না, ছিলেন গণতন্ত্রী।৯

উল্লেখ্য, ৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের মাধ্যমে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) অঙ্গ সংগঠন বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা 'বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র' বাস্তবায়ন করার পরিকল্পনা করেছিল। তবে জিয়াউর রহমানের কারণে তা হয়নি।১০

৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতার বিপ্লব পরবর্তী সময়ে 'নারায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবর' স্লোগানের উল্লেখ অনেকে করেছেন। তবে তৎকালীন পত্র-পত্রিকায় এই স্লোগানের উল্লেখ করা হয়নি। দৈনিক বাংলার প্রতিবেদনে উল্লেখিত স্লোগানসমূহ হলো: বাংলাদেশ জিন্দাবাদ, সিপাহি জনতা ভাই ভাই, জেনারেল জিয়া জিন্দাবাদ, জওয়ান জওয়ান ভাই ভাই, খন্দকার মোশতাক জিন্দাবাদ, আমাদের আজাদী - রাখবোই রাখবো, স্বাধীনতা স্বাধীনতা - রাখবোই রাখবো, হাতের সঙ্গে হাত মিলাও - এক কাতারে শামিল হও, হাতের সঙ্গে হাত মিলাও - সিপাহী জনতা এক হও।১১

দৈনিক সংবাদেও অনুরূপ স্লোগানের উল্লেখ রয়েছে। 'নারায়ে তাকবির আল্লাহু আকবর' স্লোগানের উল্লেখ নেই।১২

জিয়াউর রহমানের ধর্মনিরপেক্ষতা

জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালের সংবিধানের সংশোধিতে মূলনীতি হতে 'ধর্মনিরপেক্ষতা' কে অপসারণ করেন। তিনি সংবিধানের শুরুতে 'বিসমিল্লাহ' যুক্ত করা এবং ধর্মনিরপেক্ষতাকে 'আল্লাহর উপর পূর্ণাঙ্গ আস্থা ও বিশ্বাস' দ্বারা প্রতিস্থাপন করেন। এজন্য অনেকে জিয়াউর রহমানকে ইসলামপন্থী বা মুসলিম জাতীয়তাবাদী শাসক বলে থাকেন।

জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমীর গোলাম আযম ধর্মনিরপেক্ষতা সম্পর্কে বলেছেন:

ধর্মীয় প্রবণতাকে মানুষের ব্যক্তি জীবনে সীমাবদ্ধ রেখে সমাজ জীবনের সকল দিক ও বিভাগকে আল্লাহ ও রাসূলের প্রভাব থেকে মুক্ত রাখার নামই ধর্মনিরপেক্ষতা। সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ধর্মকে পরিত্যাগ করাই এর লক্ষ্য। সে হিসাবে এ মতবাদকে ধর্মহীনতা বলাই সমীচীন। কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনে ধর্মের বিধান মেনে চলার বিরুদ্ধে এর কোন বিশেষ আপত্তি নেই বলে এ মহান 'উদারতার' স্বীকৃতি স্বরূপ এর নাম ধর্মনিরপেক্ষতা রাখা হয়েছে।১৩

জিয়াউর রহমান জামায়াত ও মুসলিম লীগের সমালোচনায় বলেছেন, মুসলিম লীগ, আইডি এল, জামায়াত। এরা ধর্মভিত্তিক রাজনীতি করছে এবং ধর্মভিত্তিক একটি দেশের রূপরেখা টানছে। অথচ আল্লাহ তা'আলা কোরআন শরীফে বলেছেন, 'লা ইলাস তরুণা বে আইয়াজাল, লা তামাজান কালিলান।' অর্থাৎ যত বড় মূল্যেই হোক না কেন আল্লাহর নামকে বিক্রি করো না। কিন্তু আল্লাহর নামকে বিক্রি করে পার্টি করা হচ্ছে। রাজনীতি করা হচ্ছে।১৪

জিয়াউর রহমান ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র পাকিস্তান সম্বন্ধে বলেছেন, কিন্তু আল্লাহর নামকে বিক্রি করে পার্টি [জামায়াত ও মুসলিম লীগ] করা হচ্ছে। রাজনীতি করা হচ্ছে। পাকিস্তানও এভাবে চেয়েছিল। কিন্তু কামিয়াব হয়নি।১৫

তিনি রাষ্ট্র বা রাজনীতি হতে ধর্মের পৃথকীকরণের নীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন। এই দৃষ্টিভঙ্গির কারণে জিয়াউর রহমান একজন ধর্মনিরপেক্ষ শাসক।

জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালে কমনওয়েলথের সিলভার জুবিলি উৎসবে ইংল্যান্ডে গমন করেছিলেন। তিনি সেখানকার মানুষের কথায় কথায় বাইবেলের ভার্স ব্যবহার করতে দেখেন। তার মনে প্রশ্ন জাগে তাহলে ইংল্যান্ড সেক্যুলার হলো কীভাবে?১৬

ইংল্যান্ডের মানুষ তাদের কথা-বার্তায় বাইবেল ব্যবহার করলেও রাজনীতি বা রাষ্ট্রপরিচালনার ক্ষেত্রে বাইবেলের নির্দেশনার অনুসরণ করেন না। তারা তাদের ধর্মকে ব্যক্তি পর্যায় বা কথাবার্তাতেই সীমাবদ্ধ রেখেছে। এজন্য জিয়াউর রহমানের ন্যায় তারাও সেক্যুলার।

জিয়াউর রহমান শুধু চিন্তায় ধর্মনিরপেক্ষ ছিলেন না। তার কর্মেও এর প্রমাণ খুঁজে পাওয়া যায়।

১৯৭৬ সালের ২৬ শে মার্চ মার্শাল ল ভঙ্গ করে ঢাকায় একটি বিশাল সিরাত মাহফিলের আয়োজন করা হয়। প্রধানবক্তা ছিলেন এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) মো. গোলাম তাওয়াব। সে মাহফিলে স্পষ্ট দাবি জানানো হয়, বাংলাদেশকে একটি ইসলামী প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করতে হবে।

সেনাবাহিনীতে তখন লেফটেন্যান্ট কর্নেল সাইয়েদ ফারুক উর রহমান, লেফটেন্যান্ট কর্নেল খন্দকার আবদুর রশিদ এবং তাওয়াবরা ইসলামী বিপ্লবের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ২৬ শে মার্চের সিরাত মাহফিলের এক সপ্তাহের মধ্যে বগুড়া সেনানিবাসে ইসলামপন্থীরা বিদ্রোহ করল।

এই বিদ্রোহের নেতৃত্বে ছিল কর্নেল ফারুকের বেঙ্গল লেন্সার। এই বিগ্রেড ট্যাঙ্ক বহর নিয়ে পুরো সেনানিবাসের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়।

বিদ্রোহীদের দমনে একটি বড় বিগ্রেড বগুড়ায় পাঠালে রাজধানী ঢাকা নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। সেজন্য জিয়া একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিলেন - বিগ্রেডিয়ার (অব.) হান্নান শাহের নেতৃত্বে গ্যারিসন বিগ্রেডকে বগুড়ায় পাঠিয়ে দিলেন বিদ্রোহীদের দমন করতে।

এর ফলে নর্থ বেঙ্গলের ঐতিহাসিক দুইটি বিগ্রেডের - বেঙ্গল ল্যান্সার ও গ্যারিসন - মধ্যে সংঘাত সৃষ্টি হয়। হান্নান শাহ দৃঢ় নেতৃত্বের মাধ্যমে ল্যান্সারদের পরাজিত করেন। পরবর্তীতে ল্যান্সার বিগ্রেডকে বিলুপ্ত করে দেওয়া হয়।১৭

জিয়াউর রহমান এভাবে ইসলামপন্থীদের অভ্যুত্থানকে ব্যর্থ করে দেন। এই ঘটনা প্রমাণ করে জিয়াউর রহমান একজন ধর্মনিরপেক্ষ শাসক, ইসলামপন্থী শাসক নন।

ইসলামপন্থা (Islamism)

আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানীগণ 'ইসলামপন্থা'কে একটি আধুনিক রাজনৈতিক আন্দোলন হিসেবে বর্ণনা করেছেন৷ আধুনিক পন্ডিতগণের মতে যে সকল মুসলিমগণ রাজনৈতিক আকাঙ্খা পোষণ করেন তারাই ইসলামপন্থী। সালমান সাঈদ তার Recalling the Caliphate: Decolonization and world order গ্রন্থে বলেছেন, ইসলামপন্থা হলো ইসলামকে কেন্দ্র করে একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা কায়েম করা। এই রাজনৈতিক ব্যবস্থার কেন্দ্রে থাকবে ইসলাম এবং এই ব্যবস্থায় ইসলামের মূলনীতি সমূহের কোনোরূপ বিকৃতি সাধন করা হবে না৷১৮

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সাহিত্যসমূহে এই ইসলামী রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে 'ইকামাতে দ্বীন' হিসেবে সম্বোধন করা হয়েছে। জামায়াতের সাবেক আমীর মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী 'ইকামাতে দ্বীন' সম্পর্কে বলেন:

ইকামাতে দ্বীন অর্থ দ্বীন কায়েমের প্রচেষ্টা। আর দ্বীন কায়েম বলতে বুঝায় কোন একটা জনপদে দ্বীন ইসলাম বিজয়ী আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়া। দ্বীন ইসলামের পরিপূর্ণ বিধি-বিধান অনুসরণ ও বাস্তবায়নের পথে কোন প্রকারের বাধা ও অন্তরায় না থাকা। কোন দেশে যদি ইসলামী অনুশাসন বা কোরআন সুন্নাহর বিপরীত আইন চালু থাকে তাহলে জীবন যাপনের আন্তরিক নিষ্ঠা থাকা সত্ত্বেও ঐ আইনের কারণে তা মানা সম্ভব হয় না।১৯

মুসলিম জাতীয়তাবাদ (Muslim Nationalism)

মুসলিম জাতীয়তাবাদ ও ইসলামপন্থার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। ঐতিহাসিক ভাবে দেখতে গেলে মুসলিম জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে বা পাকিস্তান আন্দোলনের সাথে জড়িত ব্যক্তিদের ইসলামপন্থী বলা যায় না। তারা সকলে ছিলেন আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত। এবং তারা ব্রিটিশদের নিকট হতে প্রাপ্ত আধুনিক মূল্যবোধসমূহকে ধারণ করতেন৷ লেখক ও চিন্তক ফাহমিদ উর রহমানের মতে, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং শ্রী অরবিন্দ ঘোষের মতো ব্যক্তিদের হিন্দুরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া হিসেবে মুসলিম জাতীয়তাবাদের জন্ম হয়।২০

নৃবিজ্ঞানী এবনে গোলাম সামাদের মতে, জাতি হলো রাজনীতি সচেতন মানবগোষ্ঠী যারা চায় রাষ্ট্র কায়েম করতে। তার মতে, মুসলিম জাতীয়তাবাদের উৎপত্তি মূলত হিন্দুত্ব বা হিন্দু জাতীয়তাবাদের প্রতিক্রিয়া হিসেবে। তিনি বলেন, উনবিংশ শতাব্দীতে বিখ্যাত ভাষাতাত্ত্বিক ম্যাক্স মুলারকে (১৮২৩-১৯০০) অর্থ প্রদান করে নির্দেশ প্রদান করা হয় বৈদিক ভাষা হতে হিন্দুদের ধর্মগ্রন্থ ঋকবেদের ইংরেজি অনুবাদ করার জন্য। এখান থেকেই আসে আর্য জাতির ধারণা। এর উপর ভিত্তি করেই গড়ে ওঠে হিন্দুত্ব বা হিন্দু জাতীয়তাবাদ। হিন্দুরা নিজেদের প্রভুজাতি বা শ্রেষ্ঠ জাতি হিসেবে মনে করতে শুরু করে। এই হিন্দুদের হাতেই গড়ে ওঠে 'হিন্দু মহাসভা' নামক রাজনৈতিক সংগঠন। এই সংগঠনের বিখ্যাত সভাপতি বিনায়ক দামোদর সাভারকার (১৮৮৩-১৯৬৬) বলেছিলেন, এই উপমহাদেশের মুসলিমরা বহিরাগত। তাদের উপমহাদেশ হতে বিতাড়িত করতে হবে। এ ধরনের উগ্র ও সাম্প্রদায়িক ধারণা মুসলিমদের মনে একধনের হিন্দু আধিপত্যের ভীতির জন্ম দেয়। এর প্রতিক্রয়া হিসেবে জন্ম নেয় মুসলিম জাতীয়তাবাদ। এই মুসলিম জাতীয়তাবাদীদের হাত ধরে ১৯৪৭ সালে জন্ম নেয় পাকিস্তান।২১

বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ: জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক চিন্তা

জিয়াউর রহমান 'বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ'-এর রাজনীতি করেছেন। তিনি 'আমার রাজনীতির রূপরেখা' গ্রন্থে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের স্পষ্ট সংজ্ঞা প্রদান করেছেন। এবং বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের সংজ্ঞা প্রদানের সাথে তিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদ, মুসলিম জাতীয়তাবাদ ও ইসলামপন্থার সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন:

১৯৪৭ সালে ধর্মকে ভিত্তি করে মূলত পাকিস্তান হলো। কিন্তু তাদের সেই নয়া কিসিমের উপনিবেশবাদ চলতে থাকলো এবং ধর্মকে কেন্দ্র করে পাকিস্তান টিকে থাকতে পারল না। তাই আমরা আবার পুরানো দিনে ফিরে যেতে পারি না। তাই এই যে জামায়াত, মুসলিম লীগ, আইডিএল এরা যে ধর্মকে কেন্দ্র করে রাজনীতি করবার চেষ্টা করছে সেটা বাস্তবায়িত হতে পারে না।২২

বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ প্রসঙ্গে জিয়াউর রহমান বলেছেন:

বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের মধ্যে রয়েছে রেস, ভাষা, ধর্ম, অঞ্চল, অর্থনীতি, সাংস্কৃতিক যুদ্ধ। সেই জন্য আমরা বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদকে বলি সার্বিক জাতীয়তাবাদ। এই সবগুলিকে নিয়ে হলো সার্বিক জাতীয়তাবাদ। এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের সৃষ্টি, যদি কোন একটা ফ্যাক্টরে আমাদের স্বল্পতা থেকে থাকে কি দুর্বলতা থাকে যেহেতু আরো ৬/৭টি ফ্যাক্টর রয়েছে সেগুলির শক্তি সেই দুর্বলতাকে ঢেকে ফেলবে। তাই বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ হলো সার্বিক জাতীয়তাবাদ।২৩

জিয়াউর রহমানকে মুসলিম জাতীয়তাবাদী বা ইসলামপন্থী হিসেবে দেখার যে প্রবণতা দেখা যায়, তার কারণ, ধর্ম বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের একটি ফ্যাক্টর। তবে একমাত্র ফ্যাক্টর নয়। তিনি ধর্ম ছাড়াও রেস, ভাষা, অঞ্চল, অর্থনীতি এবং সাংস্কৃতিক যুদ্ধকে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের ফ্যাক্টর হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

এছাড়াও জিয়াউর রহমানকে মুসলিম লীগ এবং জামায়াতকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে পুর্নবাসনের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়। অনেকের নিকট একই সাথে মুসলিম লীগ ও জামায়াতের সমালোচনা এবং তাদের রাজনীতির সুযোগ দেওয়ার বিষয়টিকে স্ববিরোধী মনে হতে পারে। তবে জিয়াউর রহমান বাঙালি জাতীয়তাবাদের সমালোচনাও করেছেন। তিনি বলেছেন:

এখন দুইটি জিনিস চিন্তা করো ১৯৪৭ সালে এই উপমহাদেশ বিভক্ত হয়ে গেল, তখন যদিও পশ্চিম বাংলার লোকেরা বাংলা বলত আমরা বাংলা বলতাম এখনও বলছি। কিন্তু আমরা এক হয়ে থাকতে পারি নাই। তাই সেই ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ সেটা ইতিমধ্যেই চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেছে। এবং ইতিহাসে ফিরে যাওয়া যায় না। তাই আজকে বাকশালী, কমিউনিস্ট পার্টি যে বাঙালী জাতীয়তাবাদের কথা বলছে সেটা হতে পারে না। আমরা পুরানো দিনে ফিরে যেতে পারি না। আবার লক্ষ্য কর তারা বলেছিল যে 'সেটা বেঙ্গল হবে' বাংলাদেশ, আসাম, উড়িষ্যা, বিহার আর বাংলাদেশকে নিয়ে। কিন্তু তাতো হলো না। আসামে কেমন মার পড়তেছে। সেই বাঙালী জাতীয়তাবাদের ভিত্তি ধ্বংস। সেখানে আমরা ফিরে যেতে পারি না।২৪

আবার একই সাথে তিনি আওয়ামী লীগ ও জাসদের মতো রাজনৈতিক দলগুলোকে রাজনীতি করার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। আমাদের মনে রাখতে হবে, জিয়া বহুদলীয় গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী ছিলেন।

জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে আরেকটি গুরুতর অভিযোগ হল তিনি রাজাকারদের তার দলে নিয়েছিলেন। ঐতিহাসিকভাবে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে মুসলিম লীগ ও জামায়াত পাকিস্তানের পক্ষাবলম্বন করেছিল। সেজন্য বাঙালি জাতীয়তাবাদীদের (আ'লীগ ও বামপন্থীদের একাংশ) অভিধানে রাজাকার বলতে জামায়াত, মুসলিম লীগের মতো রাজনৈতিক গোষ্ঠী সমূহকে বোঝায়।

জিয়াউর রহমান মুসলিম লীগের নেতাদের পাশাপাশি আ'লীগ-বাকশালের নেতা এবং বামপন্থীদেরও তার মন্ত্রী সভায় ও দলে নিয়েছিলেন। ১৯৭৮ সালের ২৯ জুন গঠিত মন্ত্রী পরিষদের কয়েকজন সদস্যদের ২৫ রাজনৈতিক পরিচয় দেখলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে:

(১) মওদুদ আহমেদ: মওদুদ আহমেদ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ভাসানী) রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন।২৬ ১৯৭৮ সালে গঠিত মন্ত্রীসভায় তিনি ডাক, তার ও টেলিফোন দফতরের দায়িত্বে ছিলেন।

(২) কে. এম. ওবায়দুর রহমান: মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে তিনি আ'লীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃত্বের একজন ছিলেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন।২৭ ১৯৭৮ সালের মন্ত্রীসভায় তিনি মৎস্য ও পশুপালন দফতরের দায়িত্বে ছিলেন।

(৩) কাজী জাফর আহমেদ: কাজী জাফর আহমেদ বামপন্থী ছাত্র সংগঠন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন (১৯৬২-৬৩)।২৮ মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে তিনি মাওলানা ভাসানীর ন্যাপে যোগদান করেন। ১৯৭৪ সালের তিনি চীনপন্থী কমিউনিস্ট পার্টি ইউনাইটেড পিপলস্ পার্টিতে যোগদান করেন। তিনি ১৯৭৮ সালের মন্ত্রী সভায় শিক্ষা দফতরের দায়িত্বে ছিলেন।

(৪) মশিউর রহমান যাদু মিয়া: ১৯৭৮ সালের মন্ত্রীসভায় তিনি সিনিয়র মন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন। সিনিয়র মন্ত্রী হিসেবে তিনি রেলওয়ে, সড়ক, রাজপথ ও সড়ক পরিবহন দফতরের দায়িত্বে ছিলেন। '৬০-এর দশকে তিনি ন্যাপের সাধারণ সম্পাদক নিযুক্ত হন। মাওলানা ভাসানীর মৃত্যুর পর তিনি ন্যাপের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন।২৯

জামায়াতের মুখপাত্র 'দৈনিক সংগ্রাম' এর সাবেক সম্পাদক প্যানভিশন টিভিতে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ১৯৭৯ সালে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনে জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে ভোট কারচুপির অভিযোগ তুলে বলেন, জিয়াউর রহমান নির্বাচনে পরাজিত হলেও বামপন্থী রাজনীতিবিদ মোহাম্মদ তোয়াহাকে সংসদে নিয়ে যান।৩০

বিস্তারিত অনুসন্ধানে এর সত্যতা পাওয়া যায়। মোহাম্মদ তোয়াহার দলের নাম ছিল বাংলাদেশের সাম্যবাদী দল (মা: লে:)। তিনি ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নোয়াখালী-১৩ আসন হতে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৭৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি দৈনিক ইত্তেফাকের প্রতিবেদনে স্পষ্ট বলা হয়েছে, তোয়াহা নির্বাচিত হননি।৩১

২১ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়েছে, বাসস জানায়, নোয়াখালী-১৩ নির্বাচনী এলাকার ৫৪ টি ভোট কেন্দ্রের একটিতে সংঘটিত এক ঘটনার প্রেক্ষিতে উক্ত নির্বাচনী এলাকার ফলাফল ঘোষণা স্থগিত রাখা হইয়াছে। উক্ত ভোটকেন্দ্রে পুনহায় ভোট গ্রহণ করা হইবে।৩২

মোহাম্মদ তোয়াহা ২৫ ফেব্রুয়ারি আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করেন, চর আলেকজান্ডারের একটি কেন্দ্রে ব্যালট বক্স ছিনতাই এর অজুহাতে নির্বাচনের ফল ঘোষণা স্থগিত রাখা হয়েছে। নোয়াখালী-১৩ আসনের বিএনপি প্রার্থী এ কে এম আজাদ উদ্দিন তোয়াহার লোকজনের বিরুদ্ধে উক্ত কেন্দ্রের পোলিং অফিসার শ্রী বল্লভ চন্দ্র দাশকে রাত আনুমানিক দেড়টার সময় হাইজ্যাক করে নিয়ে নিকটবর্তী একটি বাড়িতে আটকে রেখে অস্ত্রের মুখে তাকে দিয়ে এক হাজার ব্যালট পেপার দস্তখত করিয়ে বাস মার্কায় সীল দিয়ে নেওয়ার অভিযোগ করেন। ফলে ১৮ ফেব্রুয়ারি ঘোষিত ফল অনুযায়ী উক্ত কেন্দ্রে তোয়াহা ৫৫৫ টি ভোট পেলেও পরদিন বিকাল সাড়ে চারটায় দেখা যায় তোয়াহা ১৫৫৫ টি ভোট পেয়েছে। পোলিং অফিসার শ্রী বল্লভ চন্দ্র দাশ এই ঘটনার সত্যতা সম্পর্কে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে এফিডেভিট করে জানিয়ে দিয়েছেন।৩৩

অবশেষে নির্বাচন কমিশন ৭ মার্চ মোহাম্মদ তোয়াহাকে বিজয়ী ঘোষণা করেন।৩৪

এছাড়াও জিয়াউর রহমানকে রাজনৈতিক কারণে রাজাকার বলা হলেও তিনি '৭১ এ পাকিস্তানের পক্ষাবলম্বনকারী রাজনৈতিক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। তার বিরুদ্ধে গোলাম আযম অভিযোগ করেন:

১৯৮১ সালের স্বাধীনতা দিবসের দু'দিন পূর্বে শিল্পকলা ভবনের অডিটরিয়ামে কর্নেল নুরুজ্জামানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান হঠাৎ করে (মুক্তিযোদ্ধাদের খুশি করার জন্যই হোক বা যে উদ্দেশ্যেই হোক) বলে ফেললেন, 'রাজাকারদেরকে সহ্য করা হবে না; তাদেরকে প্রতিরোধ করতে হবে।'[...] হঠাৎ প্রেসিডেন্টের মুখে 'রাজাকার' গালি উচ্চারিত হওয়ায় অনেকেই স্তম্ভিত হয়ে পড়েন। তাঁর মুখে ঐ অসতর্ক উচ্চারণ সারা দেশে জামায়াত-শিবিরবিরোধীদের খেপিয়ে তোলে। সর্বত্র জামায়াতের সমাবেশ ও মিছিলে হামলা হতে থাকে।৩৫

তৎকালীন পত্র-পত্রিকায় এমন কোনো সংবাদ খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে যুবদল কর্তৃক আয়োজিত একটি আলোকচিত্র প্রদর্শনীর উদ্ধোধনী অনুষ্ঠানে তিনি নাম উল্লেখ না করে জামায়াতের সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন:

কতিপয় ব্যক্তি বিদেশী প্ররোচনায় আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব খর্ব করার অপচেষ্টায় লিপ্ত রহিয়াছে। তাহারা কে, আমি জানি। তাহারা স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে নাই। বরং বিরোধিতা করিয়াছিল। [...] স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধিতা করিয়া যেমন ঐ সময় তাহারা সফল হইতে পারে নাই, আজও তাহারা সফল হইতে পারিবে না। জনগণ তাহাদের ধ্বংস করিয়া দিবে। স্বাধীনতা বিরোধীদের এই ষড়যন্ত্র আমাদের আরও ঐক্যবদ্ধ করিবে, শক্তিশালী করিবে। প্রয়োজন হইলে স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বকে রক্ষার জন্য জনগণ আবার অস্ত্র হাতে তুলিয়া নিবে। আর এইবার জনগণকে নেতৃত্ব দিবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল।৩৬

১৯৭৮ সালের ১৫ জুন মুক্তিযোদ্ধা সংসদ আয়োজিত একটি প্রোগ্রামে তার উপস্থিতিতে তার উদ্দেশ্য পঠিত সম্বধর্নাপত্রে বলা হয়, বাকশালীরা টাকার বিনিময়ে একাত্তরের রাজাকার ও দালালদের ক্ষমা করিয়াছে, কিন্তু মুক্তিযোদ্ধারা ক্ষমা করিতে পারে না।৩৭

উপসংহার

জিয়াউর রহমান প্রকৃতপক্ষে একজন মধ্যমপন্থী এবং ধর্মনিরপেক্ষ শাসক ছিলেন। তিনি জাসদের বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠিত হতে দেননি। একই সাথে ইসলামী বিপ্লবকেও সফল হতে দেননি। তিনি তার দল ও মন্ত্রীসভাতে সকল ধারার মানুষকে যুক্ত করেছিলেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধে বিরোধীতাকারীদের বিরুদ্ধেও সোচ্চার ছিলেন। তিনি চিন্তায় ও কর্মে একজন প্রকৃত মধ্যমপন্থী রাজনীতিবিদ এবং শাসক। সেজন্য জিয়াউর রহমানকে রাজনৈতিক কারণে আ'লীগের ভাষায় 'রাজাকার' এবং জামায়াতের ভাষায় 'ইসলামপন্থী' বা 'মুসলিম জাতীয়তাবাদী' বলা অযৌক্তিক।

তথ্যসূত্র ও টীকা:

১. 'মোশতাক ছিল মোনাফেক, জিয়া ছিল তার দোসর', দৈনিক প্রথম আলো, ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮, লিংক: https://tinyurl.com/6nkpbyaw, প্রবেশ: ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

২. জিয়াউর রহমান রাজাকার ও আলবদরদের মন্ত্রী বানিয়েছেন : তথ্য প্রতিমন্ত্রী, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা, ৬ নভেম্বর, ২০২১, লিংক: https://www.bssnews.net/bangla/national/17650, প্রবেশ: ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

৩. গোলাম আযম, জীবনে যা দেখলাম (পঞ্চম খন্ড), ঢাকা: কামিয়াব প্রকাশন লিমিটেড, ২০১৪, পৃ. ২০০

৪. শিব্বির আহমেদ, মেজর জিয়াউর রহমান একজন ইসলামপন্থী মানুষ ছিলেন [ভিডিও], ইউটিউব, ১৭ মে, ২০২৬, লিংক: https://youtube.com/shorts/UOEaQQA0lv0?si=9-d-DaGWI-_aiQYC, প্রবেশ: ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

৫. ড. আবদুল লতিফ মাসুম, জিয়াউর রহমান: আচ্ছাদিত ইতিহাস, ঢাকা: আফসার ব্রাদার্স, ২০২৫, পৃ. ২৮

৬. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৮

৭. প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৪

৮. রইস উদ্দিন আরিফ, আন্ডারগ্রাউন্ড জীবন সমগ্র: বাংলাদেশ ও উপমহাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের বিতর্কিত অধ্যায়, ঢাকা: পাঠক সমাবেশ, ২০১৩, পৃ. ২৯

৯. এবনে গোলাম সামাদ, বায়ান্ন থেকে একাত্তর, রাজশাহী: পরিলেখ প্রকাশনী, ২০১৭, পৃ. ১২২-২৩

১০. ড. আবদুল লতিফ মাসুম, প্রাগুক্ত, পৃ. ২৯

১১. আনন্দ উদ্বেল মানুষের ঢল নেমেছিল, দৈনিক বাংলা, ৮ নভেম্বর, ১৯৭৫

১২. রাজধানীর পথে পথে লাখো জনতার আনন্দ মিছিল, দৈনিক সংবাদ, ৮ নভেম্বর, ১৯৭৫

১৩. গোলাম আযম, ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদ, ঢাকা: আধুনিক প্রকাশনী, ২০১১, পৃ. ৫

১৪. জিয়াউর রহমান, আমার রাজনীতির রূপরেখা, এ. কে. এ. ফিরোজ নুন সম্পাদিত, ঢাকা: জ্ঞান বিতরণী, ২০২২, পৃ. ৩৫

১৫. প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৫

১৬. প্রাগুক্ত, পৃ. ৬১

১৭. Rumi Ahmed, Wahiduzzaman's post, Shaheed Zia, and the rising controversy of "Tauhidi Janata", 12 February, 2025, Link: https://en.banglaoutlook.org/editors-pick/235442, Last View: 23 September, 2026

১৮. Dr. Asim Qureshi, 'The Case Against Islamism', Ummatics Institute, 2022, Link: https://ummatics.org/research-papers/the-case-against-islamism

১৯. মতিউর রহমান নিজামী, ইসলামী আন্দোলন ও সংগঠন, ঢাকা: প্রকাশনা বিভাগ, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, ২০২৫, পৃ. ১৮

২০. ফাহমিদ-উর-রহমান, অন্য আলোয় দেখা, ঢাকা: বাংলা সাহিত্য পরিষদ, ২০২০, পৃ. ৭

২১. এবনে গোলাম সামাদ, প্রাগুক্ত, পৃ. ১২৭

২২. জিয়াউর রহমান, প্রাগুক্ত, পৃ. ৭৮

২৩. প্রাগুক্ত, পৃ. ৭৯

২৪. প্রাগুক্ত, পৃ. ৭৮

২৫. দফতর বণ্টন, দৈনিক ইত্তেফাক, ৩০ জুন, ১৯৭৮

২৬. রাষ্ট্র পুর্নগঠনে অন্তর্ভুক্তিমূলক মন্ত্রী সভা গঠন করেছিলেন জিয়াউর রহমান, দৈনিক বণিক বার্তা, ১৯ জানুয়ারি, ২০২৬, লিংক: https://tinyurl.com/4kxxxyn4, প্রবেশ: ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

২৭. প্রাগুক্ত

২৮. Kazi Zafar no more, Daily Star, 27 August, 2015, Link: https://tinyurl.com/5bek3h95, Last View: 24 September, 2026

২৯. মশিউর রহমান যাদু মিয়ার আজ জন্মশতবার্ষিকী, কালবেলা, ৯ জুলাই, ২০২৪, লিংক: https://www.kalbela.com/ajkerpatrika/khobor/102584, প্রবেশ: ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

৩০. আবুল আসাদ, রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যেভাবে ভোট কারচুপি করেছিলেন [ভিডিও], ৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫, লিংক: https://youtu.be/FN-eHyp0pLQ?si=KSjI6OiApmcZKMA7, প্রবেশ: ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

৩১. জাতীয়তাবাদী দলের নিরঙ্কুশ বিজয়, দৈনিক ইত্তেফাক, ২০ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৯

৩২. সর্বশেষ দলগত পরিস্থিতি, দৈনিক ইত্তেফাক, ২১ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৯

৩৩. নির্বাচনের কারচুপি আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে: তোয়াহা, দৈনিক বাংলা, ২৬ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৯

৩৪. অবশিষ্ট দুইটি নির্বাচনী এলাকার ফলাফল, দৈনিক ইত্তেফাক, ৮ মার্চ, ১৯৭৯

৩৫. গোলাম আযম, জীবনে যা দেখলাম (পঞ্চম খন্ড), ঢাকা: কামিয়াব প্রকাশন, ২০১৪, পৃ. ২০০

৩৬. স্বাধীনতার নস্যাতের ষড়যন্ত্রকারীদের আমি চিনি: জিয়া, দৈনিক ইত্তেফাক, ২৬ মার্চ, ১৯৮১

৩৭. অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে গণজাগরণ সৃষ্টি করুন: জিয়া, দৈনিক ইত্তেফাক, ১৬ জুন, ১৯৭৮