মেন্যু
Menu

মুখ ও মুখোশ : উদারবাদ ও ফ্যাসিবাদের সাধারণ ব্যাকরণ

৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

মিথ্যা বৈপরীত্যের সমস্যা

ভোট দিয়ে এক সেট শাসক বদলে ফেলে একটা মুক্ত সমাজের আশ্বাস পাওয়ার পর, যখন দেখা যায় সেই একই ছকে আবার পুরোনো দাপট, ভয়ের সংস্কৃতি আর ক্ষমতার দখলদারি ফিরে আসছে—তখন বুকের ভেতর একটা চেনা শঙ্কা মোচড় দিয়ে ওঠে। আমরা ভাবি, ব্যালট বাক্স আর সুশীল গণতন্ত্রের প্রতিশ্রুতিই বুঝি আমাদের সব স্বৈরাচার থেকে বাঁচাবে; কিন্তু যখন জনগণের রায়ে আসা ক্ষমতাও খুব সহজে সেই পুরোনো দাপটের পুনরাবৃত্তি ঘটাতে শুরু করে, তখন প্রশ্ন ওঠে: ফ্যাসিবাদের নগ্ন রক্তচক্ষু আর উদার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার এই চকচকে আশ্বাস কি আসলে একই নাটকের দুটো ভিন্ন দৃশ্য মাত্র?

উদারবাদী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সংকটে ফ্যাসিবাদকে যখনই কোনো হঠাৎ ধেয়ে আসা বহিরাগত বিপর্যয় হিসেবে চিত্রায়িত করা হয়, তখনই আধুনিক রাজনীতির সবচেয়ে বড় স্ববিরোধিতাটি আড়াল পেয়ে যায়। প্রচলিত রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের প্রতিনিয়ত একটি কৃত্রিম দ্বিমুখী সংকটের মুখে দাঁড় করায়—হয় উদারবাদের বিদ্যমান প্রাতিষ্ঠানিক প্রথাকে তার সমস্ত ক্ষয় ও বর্জনসহ মেনে নেওয়া, না হয় তার বিপরীত মেরুতে থাকা একনায়কত্বকে প্রতিরোধ করতে গিয়ে সেই একই উদারবাদী রাষ্ট্রযন্ত্রের আশ্রয় নেওয়া। কিন্তু এই বহুল প্রচারিত রূপকথাটি মূল সত্যকে এড়িয়ে যায়: আধুনিক রাষ্ট্রকাঠামোর ভেতরেই বর্জন ও 'ব্যতিক্রমী ক্ষমতার' যে বীজ নিহিত থাকে, ফ্যাসিবাদ তারই একটি অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিণতি।

​এই লেখনীতে আমাদের মূল লক্ষ্য বর্তমান ব্যবস্থার সেই আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক আবরণকে অনাবৃত করা, যা তার কাঠামোগত সহিংসতাকে 'স্বাভাবিকতা' বলে চালিয়ে দেয়। আমরা এখানে চারটি স্বতন্ত্র অথচ পরস্পর-নির্ভর যুক্তির স্তর অতিক্রম করব—যেখানে প্রথম স্তরে ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর নির্দিষ্ট রূপরেখা থেকে শুরু করে, দ্বিতীয় স্তরে সার্বভৌম ক্ষমতা ও নেক্রোপলিটিক্সের তাত্ত্বিক সিলসিলা বিশ্লেষণ করা হবে। পরবর্তী স্তরগুলোতে আমরা উন্মোচন করব কেন ও কীভাবে এই ঐতিহাসিক আত্মীয়তাকে ঢেকে রাখা হয় এবং কীভাবে আজ বর্জনের এই রাজনীতি আমাদের অভ্যন্তরীণ ও আন্তঃদেশীয় রাজনীতিতে কাজ করে যাচ্ছে।

এর সবচেয়ে রক্তমাংসের প্রতিফলন আমরা দেখতে পাই দক্ষিণ এশিয়ার বর্তমান রাজনৈতিক ময়দানে। ইন্ডিয়ার রাষ্ট্রযন্ত্র যেভাবে উদারবাদী সংবিধান, আইনি আধুনিকায়ন ও কর্পোরেট পুঁজির মেলবন্ধনে হিন্দুত্ববাদী শাসন চালনা করছে এবং নিজ জনসংখ্যার একটা অংশকে 'অনাকাঙ্ক্ষিত' ও অনভিপ্রেত বানানোর নেক্রোপলিটিক্যাল বিভাজনরেখা টানছে, তা এই তত্ত্বের এক ভয়াল বাস্তবতা। বাংলাদেশের সীমান্ত, ভৌগোলিক অবস্থান এবং নিজস্ব রাজনৈতিক বয়ানেও এর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব গভীর। ইন্ডিয়ার হিন্দুত্ববাদী মডেল প্রমাণ করে যে উদারবাদী আইনি কাঠামোর ভেতরে থেকেই একটি বর্জনভিত্তিক রাজনীতি কার্যকর করা সম্ভব—যা দক্ষিণ এশিয়ার সার্বিক রাজনৈতিক যুক্তিকে প্রভাবিত করে।

​অতএব, উদারবাদ আর ফ্যাসিবাদের মধ্যবর্তী তথাকথিত দূরত্বকে প্রকৃতির ফারাক না ভেবে মাত্রার ফারাক হিসেবে বোঝা এবং আমাদের আঞ্চলিক 'স্বাভাবিক' রাজনৈতিক ব্যবস্থার ভেতরেই সেই সুপ্ত বর্জন-যুক্তিকে নগ্ন করা—এই হলো এই বিশ্লেষণের মূল লক্ষ্য।

বস্তুগত মৈত্রীর ইতিহাস

​কোনো সামাজিক বা রাজনৈতিক মতাদর্শের তাত্ত্বিক যুক্তিকাঠামো যত গভীর ও শক্তিশালীই হোক না কেন, তার চূড়ান্ত সত্যাসত্য পরীক্ষা করতে হয় ইতিহাস ও বাস্তব ঘটনাপ্রবাহের নিরিখে। উদারবাদ ও ফ্যাসিবাদের ঐতিহাসিক সম্পর্কের পানে যখন আমরা দৃষ্টিপাত করি, তখন যে চিত্রটি উন্মোচিত হয় তা প্রচলিত আধিপত্যশীল বয়ানের একেবারেই বিপরীত—ফ্যাসিবাদ কোনো আকাশ থেকে পড়া বহিরাগত আক্রমণ হিসেবে এসে উদারবাদী গণতন্ত্রকে পরাস্ত করেনি; বরং তা জন্ম নিয়েছিল সেই একই গণতন্ত্রের গর্ভ থেকে, তার নিজস্ব প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে।

​ইতালির ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা এই কাঠামোগত রূপান্তরকে অত্যন্ত স্পষ্ট করে তোলে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী তীব্র আর্থ-সামাজিক সংকট এবং বলশেভিক বিপ্লবের সদ্য-উত্থানের প্রভাবে কাঁপতে থাকা ইতালিতে মুসোলিনি শিল্পপতি ও ব্যাংকিং এলিটদের আস্থা অর্জন করেছিলেন তার চরম শ্রমিকবিরোধী ও পুঁজিবাদ সুরক্ষাকারী রাজনৈতিক অবস্থানের মাধ্যমে। দানিয়েল গেরাঁ তার ক্লাসিক্যাল গবেষণায় বিস্তারিত দেখিয়েছেন যে, ১৯২২ সালের অক্টোবরে ‘কনফেডারেশন অফ ইন্ডাস্ট্রি’-এর শীর্ষ উদ্যোক্তা ও প্রধান ব্যাংক-মালিকেরা মুসোলিনির ঐতিহাসিক ‘রোম অভিযান’-এর জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ জোগান (Guérin, Fascism and Big Business)। অথচ স্মরণ করা প্রয়োজন, এই মুহূর্তে যা ঘটেছিল তা কোনো রফাহীন সহিংস অভ্যুত্থান নয়; বরং ইতালি রাজতন্ত্র মুসোলিনিকে আনুষ্ঠানিকভাবে আহ্বান জানায় এবং সংসদীয় প্রথা মেনে তার হাতে মন্ত্রিসভা গঠনের দায়িত্ব অর্পণ করে। রাষ্ট্র স্বয়ং—কোনো উল্লেখযোগ্য প্রতিরোধ ব্যতিরেকেই—নিজের প্রাতিষ্ঠানিক চাবি তুলে দিয়েছিল এমন এক শক্তির হাতে, যার ঘোষিত লক্ষ্যই ছিল সেই রাষ্ট্র কাঠামোকে বিনাশ করা। এর পরবর্তী ঘটনাবলী আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ: উদারপন্থীরা ১৯২৩ সালের জুলাইয়ে স্বপ্রণোদিত হয়ে মুসোলিনির নতুন ফ্যাসিস্টবান্ধব নির্বাচনী আইন অনুমোদন করে এবং ১৯২৪ সালের এপ্রিলের নির্বাচনে ফ্যাসিস্টদের সাথে এক যৌথ প্যানেল গঠন করে—যার প্রত্যক্ষ ফলশ্রুতিতে পার্লামেন্টে ফ্যাসিস্টদের আসন সংখ্যা ৩৫ থেকে লাফিয়ে ২৮৬-তে পৌঁছায়।

​এই আন্তঃরাষ্ট্রীয় বস্তুগত আঁতাতের সংক্রামক বিস্তার ঘটেছিল ইউরোপের বাইরেও, যার ঐতিহাসিক সূত্রপাত ঘটেছিল দক্ষিণ এশিয়া তথা ঔপনিবেশিক ইন্ডিয়ায়। ইতালীয় ইতিহাসবিদ মার্জিয়া কাসোলারি তার আর্কাইভভিত্তিক গবেষণায় দেখিয়েছেন, হিন্দু মহাসভার নেতা বি এস মুঞ্জে ১৯৩১ সালে ইতালি সফরে গিয়ে মুসোলিনির সাথে সরাসরি সাক্ষাৎ করেন এবং ফ্যাসিস্ট যুব-সংগঠন বালিল্লা ও আভান্ত গার্দিস্তার সাংগঠনিক কাঠামো অনুসরণ করে দেশে ফিরে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) সামরিক-প্রশিক্ষণমূলক রূপান্তর ঘটান (Casolari, In the Shadow of the Swastika)। ইতালীয় ফ্যাসিবাদের এই প্রচারণামূলক ও অর্থনৈতিক আনুকূল্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ও তৎকালীন বাঙালি বুদ্ধিজীবী মহল পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল, এমনকি সাভারকর প্রকাশ্যে নাৎসি জার্মানির নেশন থিওরিকে ইন্ডিয়ার জন্য অনুকরণীয় মডেল হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন। এই ঐতিহাসিক ঘটনা প্রমাণ করে যে, ফ্যাসিবাদের বৈশ্বিক বিস্তার কেবল মতাদর্শিক ছিল না, বরং তা প্রাতিষ্ঠানিক ও অর্থনৈতিক অবকাঠামো বিনিময়ের মধ্য দিয়েই সংগঠিত হয়েছিল।

​জার্মানির নাৎসিবাদের উত্থানের ইতিহাসও প্রায় একই ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক প্যাটার্ন অনুসরণ করে, যদিও তার গতি ও তীব্রতা ছিল ভিন্ন। নাৎসি পার্টির দেশব্যাপী বিস্তার সম্ভব হয়েছিল জার্মানির শীর্ষ ইন্ডাস্ট্রি-ম্যাগনেট ও ব্যাংকারদের প্রত্যক্ষ আর্থিক আনুকূল্যে, যা ১৯৩০ সালের সেপ্টেম্বরের নির্বাচনে নাৎসিদের অভাবনীয় বিজয়ের পথ সুগম করে। হিটলার নিজেই পরবর্তীকালে ১৯৩৫ সালের এক দলীয় ভাষণে অকপটে স্বীকার করেছিলেন যে, প্রায় এক হাজার নাৎসি বক্তাকে নিজস্ব গাড়িসহ দেশজুড়ে সমর্থনের আর্থিক রসদ পেয়েছিলেন বলেই তারা এক বছরে প্রায় এক লক্ষ জনসভা আয়োজন করতে সক্ষম হয়েছিল।

তবে এই প্রক্রিয়ার সবচেয়ে ট্র্যাজিক ও গুরুত্বপূর্ণ দিকটি ধরা পড়ে ১৯৩২ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনে সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে—যেখানে তারা কমিউনিস্টদের সাথে যুক্তফ্রন্ট গড়ে তুলে নাৎসিবাদকে রোখার পথ পরিত্যাগ করে বরং প্রতিক্রিয়াশীল রক্ষণশীল শিবিরের সাথে আপসে লিপ্ত হয়। মাইকেল পারেন্তি রাজনৈতিক কৌশলের এই ঐতিহাসিক প্রবণতাকে চিহ্নিত করে যথার্থই লিখেছেন যে, জার্মানি সহ ইউরোপের বহু দেশেই সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট বা সংস্কারপন্থী বামেরা কমিউনিস্টদের সাথে হাত মেলানোর চেয়ে উগ্র প্রতিক্রিয়াশীল ডানপন্থীদের সাথে হাত মেলাতেই নীতিগত ও মানসিকভাবে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করত (Parenti, Blackshirts and Reds)। কমিউনিস্ট পার্টির তৎকালীন নেতা আর্নস্ট থেলমান তখন স্পষ্টভাবে সতর্ক করে বলেছিলেন যে, রক্ষণশীল পোল হিন্ডেনবুর্গকে ভোট দেওয়ার অর্থ প্রকারান্তরে হিটলার ও আসন্ন যুদ্ধকেই ভোট দেওয়া—এবং সেই আশঙ্কাই সত্য হয়েছিল যখন মাত্র কয়েক সপ্তাহ পরই হিন্ডেনবুর্গ হিটলারকে জার্মানির চ্যান্সেলর পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানান।

​এই বস্তুগত আঁতাতের তৃতীয় এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্তরটি পরিলক্ষিত হয় আন্তর্জাতিক পুঁজির ভূমিকা ও ভূমণ্ডলে। মার্কিন শিল্পপতি হেনরি ফোর্ড ১৯৩৮ সালে নাৎসি জার্মানির সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা 'জার্মান ঈগল'-এ ভূষিত হন। তিনি কেবল নাৎসি পার্টিকে প্রত্যক্ষ অর্থায়নই করেননি, বরং তার নিজস্ব পত্রিকা দ্য ইন্টারন্যাশনাল জিউ-এর মাধ্যমে নাৎসি মতাদর্শের মনস্তাত্ত্বিক বুনিয়াদ গঠনে ভূমিকা রাখেন। ঐতিহাসিক ক্রিস্টোফার সিম্পসনের গবেষণা প্রমাণ করে যে, ইন্টারন্যাশনাল হার্ভেস্টার, ফোর্ড, জেনারেল মোটরস, স্ট্যান্ডার্ড অয়েল অব নিউ জার্সি এবং ডু পন্টের মতো অন্তত ছয়টি শীর্ষ মার্কিন বহুজাতিক কর্পোরেশন নাৎসি জার্মানির অস্ত্র পুনঃসংহতকরণ প্রক্রিয়ার সাথে গভীরভাবে যুক্ত ছিল। পরিণতিতে, হিটলার ক্ষমতায় আসার পর যখন সমগ্র ইউরোপজুড়ে মার্কিন পুঁজি দ্রুত প্রস্থান করছিল, ঠিক সেই সময়েই কেবল জার্মানিতে মার্কিন বিনিয়োগের পরিমাণ শতকরা ৪৮.৫ ভাগ বৃদ্ধি পেয়েছিল (Simpson, The Splendid Blond Beast)। এমনকি এই সমস্ত মার্কিন কর্পোরেশনের স্থানীয় জার্মান শাখাগুলো নাৎসি কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের বন্দিদের দিয়ে বাধ্যতামূলক দাস-শ্রম (forced labor) করাতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেনি।

​আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও ভূ-রাজনীতির ময়দানেও একই ঐতিহাসিক প্যাটার্নের পুনরাবৃত্তি ঘটেছিল। স্পেনের গৃহযুদ্ধে পশ্চিমা উদারবাদী শক্তিগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে স্পেনের গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত রিপাবলিকান সরকারকে কোনো সামরিক সহায়তা না দিয়ে নির্লিপ্ত থাকে, অথচ একই সময়ে অক্ষশক্তি অক্ষত অবস্থায় ফ্র্যাঙ্কোকে নজিরবিহীন সামরিক রসদ সরবরাহ করে যাচ্ছিল। ১৯৩৮ সালের কুখ্যাত ‘মিউনিখ চুক্তিতে’ যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও ইতালি যৌথভাবে স্বাক্ষর করে হিটলারের হাতে চেকোস্লোভাকিয়ার সুদেতেনল্যান্ড তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করে। এরিক হবসবম তার বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন যে, হিটলারকে ঠেকাতে সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে কোনো যৌথ নিরাপত্তা অক্ষ গঠনে পশ্চিমা উদারবাদী সরকারগুলোর ভেতরে তীব্র ও অনড় এক অনিহা কাজ করছিল (Hobsbawm, Age of Extremes)। পশ্চিমা উদারবাদী শক্তিগুলোর এই দীর্ঘ কূটনৈতিক ঔদাসীন্য ও কৌশলগত পরিহারই শেষ পর্যন্ত স্তালিনকে ১৯৩৯ সালের ‘নাৎসি-সোভিয়েত অনাক্রমণ চুক্তি’র (Molotov–Ribbentrop Pact) দিকে ধাবিত করে—যে ঐতিহাসিক বাধ্যবাধকতার সিদ্ধান্তটিকে পরবর্তীতে পশ্চিমা মূলধারার গণমাধ্যমে একপেশেভাবে ‘কমিউনিজম ও নাৎসিবাদের চিরন্তন মিত্রতার’ প্রমাণ হিসেবে প্রচার করা হয়। অথচ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, এই চুক্তির পটভূমিতে ছিল পশ্চিমা উদারবাদী গণতন্ত্রগুলোরই বছরের পর বছর ধরে চালানো কূটনৈতিক বর্জন ও তোষণ নীতি।

​পুঁজি কি সত্যিই ফ্যাসিবাদকে ‘কিনেছিল’?

​তবে এই পর্যায়ে এসে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক আর্গুমেন্টের মুখোমুখি হওয়া প্রয়োজন, যা এড়িয়ে গেলে সমগ্র বিশ্লেষণটি আংশিক বা মেকানিকাল মনে হতে পারে। ফ্যাসিবাদ-অধ্যয়নের অন্যতম প্রামাণ্য ঐতিহাসিক রবার্ট প্যাক্সটন তার The Anatomy of Fascism গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে, পুঁজি ও ফ্যাসিবাদের এই ঐতিহাসিক সম্পর্কটি কোনো সরল, একমুখী বা বাজারজাত লেনদেন ছিল না—যেটি ঐতিহ্যবাহী মেকানিকাল মার্কসবাদী বয়ানে প্রায়শই দাবি করা হয়। প্যাক্সটনের মতে, অধিকাংশ বৃহৎ ব্যবসায়ী বা শিল্পপতিদের প্রথম বা আদর্শ পছন্দ কখনোই ‘ফ্যাসিবাদ’ ছিল না। কিন্তু ১৯২২ সালের ইতালি বা ১৯৩৩ সালের জার্মানির সুনির্দিষ্ট সংকট-মুহূর্তে, ক্রমবর্ধমান লাল-বিপ্লব (সমাজতন্ত্র) কিংবা সম্পূর্ণ অকার্যকর বাজার-ব্যবস্থার মুখে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার খাতিরে তারা ফ্যাসিবাদকেই ‘কম ক্ষতিকর’ (lesser evil) বিকল্প হিসেবে বেছে নেয় এবং পরবর্তী সময়ে ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রের আরোপিত শর্তাবলীর সাথেই নিজেদের খাপ খাইয়ে নেয়। ইতিহাসবিদ পিটার হেইজের বহুল-উদ্ধৃত বাক্যটিতে এই সম্পর্কের রূপরেখা চমৎকারভাবে ধরা পড়ে: নাৎসি রাষ্ট্র ও পুঁজিবাদী ব্যবসায়ী মহলের স্বার্থ ছিল মূলত ‘অভিসারী, কিন্তু অভিন্ন নয়’ (converging but not identical)। একইভাবে, ইতিহাসবিদ হেনরি টার্নার দেখিয়েছেন যে, জার্মান শিল্পপতি মহল নাৎসি পার্টিকে একচেটিয়াভাবে অর্থায়ন করেনি; বরং তারা তৎকালীন একাধিক ডানপন্থী রাজনৈতিক দলের মধ্যে ঝুঁকি এড়াতে অর্থ ভাগ করে দিয়েছিল। অর্থাৎ, হিটলারকে ক্ষমতার শীর্ষে বসানোর চাবিটি সরাসরি শিল্পপতিদের নির্দেশের চেয়েও বেশি নিশ্চিত হয়েছিল ঐতিহ্যবাহী রক্ষণশীল রাজনৈতিক অভিজাতদের হিসেবি ও রাজনৈতিক জুয়াড়ির সিদ্ধান্তের মাধ্যমে।

​এই ঐতিহাসিক সংবেদনশীলতা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক, কিন্তু এটি এই প্রবন্ধের মূল তত্ত্বকে বিন্দুমাত্র খণ্ডন করে না—বরং তাকে আরও বেশি তীক্ষ্ণ ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দান করে। প্যাক্সটন কিংবা টার্নার মূলত ইতিহাসের ‘কৈফিয়ত ও এজেন্সি’র (agency) প্রশ্নটি উত্থাপন করেছেন—অর্থাৎ কার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত ছিল বা কে কাকে শাসন করছিল। কিন্তু এই প্রবন্ধের মূল অনুসন্ধানের ক্ষেত্রটি ‘এজেন্সি’র প্রশ্নের চেয়েও বেশি এর ‘কাঠামোগত পূর্বশর্ত’ (structural precondition)-এর ওপর নিবদ্ধ। পুঁজি নিজে স্ব-উদ্যোগে ফ্যাসিবাদকে সরাসরি কিনে নিয়েছিল কি না—সেটির চেয়েও বড় বাস্তব সত্য হলো, গভীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট-মুহূর্তে পুঁজির টিকে থাকার সমীকরণে ফ্যাসিবাদ ছিল সমাজতন্ত্র বা মূলগত গণতান্ত্রিক পুনর্বণ্টনের চেয়ে অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য ও সহনীয় বিকল্প। আর ঠিক এই ‘কম খারাপ’ হিসেবে মেনে নেওয়ার ঐতিহাসিক যুক্তিটাই উদারবাদের অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতা ও অভিসারকে নগ্ন করে দেয়। উদারবাদী পুঁজিবাদী ব্যবস্থার নিরাপত্তা যখন গণতান্ত্রিক সামাজিক অন্তর্ভুক্তির চাপে হুমকির সম্মুখীন হয়, তখন তার নিজস্ব মূলধন-সুরক্ষার যুক্তির ভেতর থেকেই ফ্যাসিবাদ একটি ‘যৌক্তিক ও প্রয়োজনীয় সমাধান’ হিসেবে আবির্ভূত হয়। এটিই হলো সেই কাঠামোগত পূর্বশর্ত—আর প্যাক্সটনের ঐতিহাসিক তথ্যসূত্র (যেটি মনে করিয়ে দেয় যে এই রূপান্তরটি কোনো যান্ত্রিক নিয়তিবাদ ছিল না বরং মানুষের নেওয়া সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তের ফসল) সেই কাঠামোগত বিশ্লেষণকে খারিজ করে না, বরং তাকে আরও সমৃদ্ধ ও বস্তুনিষ্ঠ করে তোলে। ঐতিহাসিক এজেন্সি এবং তাত্ত্বিক কাঠামো—দুটি একই সাথে ক্রিয়াশীল থাকতে পারে।

​উপরিউক্ত সমস্ত ঘটনাপ্রবাহ এবং সেগুলোর বিপরীতে ওঠা ঐতিহাসিক আপত্তিগুলোকে সমন্বিত করলে যে সামগ্রিক সত্যটি উঠে আসে তা হলো: ফ্যাসিবাদের উত্থান কোনো একক মুহূর্তের বিশ্বাসঘাতকতা বা আকস্মিক সামাজিক বিপর্যয় নয়; বরং তা একটি বহুস্তরীয়, প্রাতিষ্ঠানিক অনুঘটকীয় প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ায় সংসদীয় রাজনীতির আইনি বৈধতা, পুঁজির হিসাব-নিকাশভিত্তিক আপস, সংস্কারপন্থী বামদের কৌশলগত ভুল এবং বৈশ্বিক কূটনীতির নীরব ভূমিকা—প্রতিটি উপাদানই একে অপরকে ত্বরান্বিত ও শক্তিশালী করেছিল। তবে এই ইতিহাস আমাদের চূড়ান্তভাবে এক গভীরতর তাত্ত্বিক প্রশ্নের মুখোমুখি নিয়ে দাঁড় করায়: উদারবাদ ও ফ্যাসিবাদ যদি সতলেই দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ও বিপরীতমুখী রাজনৈতিক দর্শনের প্রতিনিধিত্ব করে থাকে, তবে তাদের মধ্যকার এই সুগভীর সহযোগিতা ও সীমানা-অতিক্রম কেন ইতিহাসের সংকট-মুহূর্তে এত সহজে, এত বারবার এবং এত সুশৃঙ্খলভাবে ঘটতে পারল?

​এই প্রশ্নের সদুত্তর কেবল বাহ্যিক ঐতিহাসিক ঘটনাবলির সারসংক্ষেপে পাওয়া সম্ভব নয়—এর মূল উত্তর নিহিত রয়েছে উভয় মতাদর্শের গভীরের সেই ‘অভিন্ন কাঠামোগত ব্যাকরণ’-এর মধ্যে, যা আমরা পরবর্তী তাত্ত্বিক পর্বে বিশ্লেষণ করব।

কাঠামোগত আত্মীয়তা

​যদি বস্তুগত ইতিহাসের প্রথম স্তর আমাদের দেখায় যে উদারবাদ ও ফ্যাসিবাদ বাস্তবে সংকট-মুহূর্তে কীভাবে একসাথে কাজ করেছে, তবে সেই বাস্তবতার ভেতরের মৌলিক প্রশ্নটি তোলা যাক—কেন এই অভিসার এত সহজে সম্ভব হলো, এবং কেন কোনো গভীর আদর্শগত বা প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিরোধ এই ঐতিহাসিক মৈত্রীকে আটকে রাখতে পারেনি? এই প্রশ্নের সন্তোষজনক সদুত্তর খুঁজতে হলে আমাদের কেবল ক্ষণস্থায়ী অর্থনৈতিক স্বার্থ বা রাজনীতিকদের বিশ্বাসঘাতকতার গল্পের বাইরে গিয়ে উভয় আদর্শের গভীর রাজনৈতিক ব্যাকরণকে ব্যবচ্ছেদ করতে হবে। আর সেখানে প্রবেশ করলে আমরা দেখতে পাই একটি অভিন্ন তাত্ত্বিক যুক্তিকাঠামো, যা যেকোনো রাজনৈতিক সম্প্রদায়কে সর্বদা কোনো না কোনো মৌলিক ‘বর্জনপ্রক্রিয়া’র (logic of exclusion) ওপর দাঁড় করিয়ে সংজ্ঞায়িত করে।

​কার্ল শ্মিটের রাজনৈতিক তত্ত্ব থেকে এই বিশ্লেষণের যাত্রা শুরু করা যাক। শ্মিটের মূল যুক্তি ছিল, ‘রাজনৈতিকের’ (the political) পরম সারমর্ম কোনো নৈতিক বা অর্থনৈতিক বিভাজনে নিহিত নয়; বরং তা নিহিত রয়েছে মিত্র ও শত্রুর (friend-enemy) চূড়ান্ত দ্বান্দ্বিক বিভাজনের মধ্যে। এবং এই রাজনৈতিক সত্তায় ‘সার্বভৌম’ (sovereign) হলো ঠিক সেই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান, যে আইনি স্বাভাবিকতাকে স্থগিত ঘোষণা করে ‘ব্যতিক্রমী অবস্থা’ (state of exception) জারি করার এখতিয়ার রাখে (Schmitt, Political Theology)। উদারবাদ নিজেকে সর্বদা এমন এক ব্যবস্থা হিসেবে জাহির করে যেখানে আইনের শাসন সর্বজনীন, নিরপেক্ষ এবং যেখানে রাষ্ট্রীয় সার্বভৌম ক্ষমতা কঠোর সাংবিধানিক কাঠামোর অধীন। কিন্তু শ্মিট দেখিয়েছেন, এই দাবিটি কার্যত একটি মনস্তাত্ত্বিক আড়াল বা মিথ্যা প্রশান্তি মাত্র—কারণ সংকটকালে, যুদ্ধাবস্থায়, ঔপনিবেশিক সীমান্তে কিংবা ‘জাতীয় নিরাপত্তা’র দোহাই দিয়ে উদারবাদী রাষ্ট্রও বারবার সেই একই ব্যতিক্রমী ক্ষমতা প্রয়োগ করে। পার্থক্য কেবল এই যে, উদারবাদে এই স্বৈরাচারী ক্ষমতাটি আইনি পরিভাষা ও প্রাতিষ্ঠানিক আনুষ্ঠানিকতার আড়ালে সুপ্ত বা ঢাকা থাকে। ফ্যাসিবাদ মূলত এই ব্যতিক্রমী ক্ষমতাকে কোনো অস্থায়ী ব্যবস্থা না রেখে স্থায়ী নিয়মে পরিণত করে এবং তাকে সূর্যালোকের মতো নগ্ন ও উন্মুক্ত করে দেয়। সংক্ষেপে, ফ্যাসিবাদ উদারবাদের বিপরীত বা পরাবাস্তব কোনো সত্তা নয়; বরং তা উদারবাদেরই গোপন ও সুপ্ত সত্যের এক চরম ভৌতিক আত্মপ্রকাশ।

​শ্মিটের ব্যতিক্রমী অবস্থার ধারণাটির জন্য সমসাময়িক ইন্ডিয়া এক নিখুঁত দৃষ্টান্ত—২০১৯ সালে সংবিধানের ৩৭০ ধারা বাতিলের পর জম্মু ও কাশ্মীরে যে দীর্ঘ যোগাযোগ-অবরোধ ও রাজনৈতিক স্থগিতকরণ জারি হয়, তা সংবিধান স্থগিত না করেই সংবিধানেরই আইনি ভাষার মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয়েছিল।

​তবে শ্মিট কেবল এই রূপগত সাযুজ্যটি উন্মোচন করেছিলেন; কিন্তু কেন ও কীভাবে এই সাযুজ্যটি ঐতিহাসিক সংকট-মুহূর্তে সক্রিয় হয়ে ওঠে, তার অর্থনীতি-রাজনৈতিক ব্যাখ্যা তিনি দেননি। সেই অভাবটি পূরণ করেন রাজনৈতিক চিন্তক ইশাই লান্দা, তার প্রামাণ্য গ্রন্থ The Apprentice's Sorcerer: Liberal Tradition and Fascism-এ। লান্দার মৌলিক পর্যবেক্ষণ হলো, উদারবাদ কোনো একক বা একমুখী অখণ্ড মতাদর্শ নয়—বরং তার ভেতরে সর্বদা দুটি পৃথক ও তীব্র টানাপোড়েনমূলক স্তর ক্রিয়াশীল থাকে। প্রথমটি হলো রাজনৈতিক উদারবাদ, যা প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্র, ভোটাধিকারের সম্প্রসারণ ও নাগরিক সাম্যের কথা বলে। দ্বিতীয়টি হলো অর্থনৈতিক উদারবাদ, যা ব্যক্তিগত সম্পত্তির অনিয়ন্ত্রিত অধিকার, অবাধ বাজারব্যবস্থা এবং পুঁজিবাদী সঞ্চয়নের সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দেয়। ঊনবিংশ শতাব্দীতে এই দুটি স্তর আপাত শান্তিতে একসাথে পাশাপাশি হেঁটেছিল, কারণ তৎকালীন বুর্জোয়াদের নিজেদের রাজনৈতিক অধিকারের লড়াইটাই ছিল তাদের সম্পত্তির অধিকার রক্ষার সর্বশ্রেষ্ঠ ঢাল। কিন্তু বিংশ শতাব্দীতে যখন গণ-আন্দোলনের মুখে শ্রমিকশ্রেণি সার্বজনীন ভোটাধিকার ছিনিয়ে নেয় এবং সেই গণতান্ত্রিক ক্ষমতা ব্যবহার করে সম্পদের পুনর্বণ্টনের দাবি তুলতে শুরু করে, তখন উদারবাদের এই দুই অভ্যন্তরীণ স্তরের মধ্যকার সুপ্ত সংঘাতটি প্রকাশ্যে চলে আসে—গণতন্ত্র তখন পুঁজি ও সম্পত্তির সুরক্ষার জন্য সরাসরি হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।

​লান্দা এখানে গ্যোতের বিখ্যাত কবিতা ‘জাদুকরের শিক্ষানবিশ’ (sorcerer's apprentice)-এর রূপকটি চমৎকারভাবে ব্যবহার করেন। উদারবাদ এখানে সেই আনাড়ি শিক্ষানবিশের মতো, যে নিজের রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতার স্বার্থে ‘গণতন্ত্র’ রূপ পানি-বহনকারী জাদুদণ্ডকে জাগিয়ে তুলেছিল; কিন্তু একটু পরেই আতঙ্কিত হয়ে দেখে যে সেই জাগ্রত শক্তি তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে এবং তার নিজস্ব সম্পত্তির প্রাচীরকে ভাসিয়ে দেওয়ার উপক্রম করছে। ঠিক এই নিয়ন্ত্রণহীন পরিস্থিতিতে সে বাধ্য হয়ে আসল জাদুকর—ফ্যাসিবাদকে—ডেকে আনে, যে এসে সহিংসতার চাবুক দিয়ে সেই ডেমোক্রেটিক শক্তিকে পুনরায় নিশ্চল ও নিষ্ক্রিয় কাঠে পরিণত করে। ফ্যাসিবাদ গণতন্ত্রকে তার মূল বিপজ্জনক পুনর্বণ্টনমূলক সম্ভাবনা থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে দেয়। লান্দার ভাষায়, ফ্যাসিবাদ তাই উদারবাদের শত্রু হিসেবে হাজির হয়নি; বরং তা এসেছিল উদারবাদের অভ্যন্তরীণ সংকটকে সমাধান করার এক প্রখর, রূঢ় অথচ বহুপ্রত্যাশিত ‘ত্রাণকর্তা’ হিসেবে (Landa, The Apprentice's Sorcerer)।

​মিশেল ফুকো এই সার্বভৌম বর্জনের যুক্তিকে আরও গভীর তাত্ত্বিক মাত্রায় নিয়ে যান তার ‘জৈবরাজনীতি’ (biopolitics)-এর ধারণার মধ্য দিয়ে। ফুকো দেখান যে, ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে এসে আধুনিক রাষ্ট্রের ক্ষমতার চরিত্রগত পরিবর্তন ঘটে। রাষ্ট্র আর কেবল সার্বভৌম হিসেবে ‘হত্যা করার বা বাঁচতে দেওয়ার’ সনাতন অধিকার দাবি করে না; বরং তা পুরো জনসংখ্যাকে ‘বাঁচিয়ে রাখার’ ও শারীরবৃত্তীয়ভাবে পরিচালনা করার সার্বিক দায়িত্ব গ্রহণ করে। কিন্তু জৈবিক জীবনকে বাঁচানোর এই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা অনিবার্যভাবেই জনসংখ্যার ভেতরে এক অদৃশ্য কিন্তু কঠিন বিভাজনরেখা টেনে দেয়—কারা সেই কাঙ্ক্ষিত সম্প্রদায়ের অংশ যাদের সুরক্ষা দেওয়া হবে, আর কারা সেই ‘অপর’ বা ক্ষতিকর উপাদান যাদের মৃত্যু বা বর্জন সার্বিক জনসংখ্যাকে সুস্থ ও বিশুদ্ধ রাখার পূর্বশর্ত? ফুকো একেই আখ্যা দেন ‘রাষ্ট্রীয় বর্ণবাদ’ (state racism) হিসেবে—যা কেবল গায়ের রঙের বর্ণবাদ নয়, বরং যেকোনো আইনি বা সামাজিক বিভাজনরেখা যা মানবগোষ্ঠীকে ‘আমরা’ বনাম ‘ওরা’র (Us vs them) নীতিতে ভাগ করে দেয় (Foucault, Society Must Be Defended)। ইন্ডিয়ার নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) ও জাতীয় নাগরিক তালিকা (এনআরসি) একত্রে ঠিক সেই জৈবরাজনৈতিক বিভাজনরেখাটি টানে যার কথা ফুকো বলেছিলেন—কে 'বৈধ নাগরিক' আর কে 'অনুপ্রবেশকারী', তা নির্ধারণের আমলাতান্ত্রিক-আইনি প্রক্রিয়া, যেখানে ধর্মীয় পরিচয়ই সেই বাছাইয়ের গোপন মানদণ্ড হয়ে ওঠে।

আগামবেন Homo Sacer-এর রূপকের মাধ্যমে এই বিশ্লেষণকে আরও চূড়ান্ত রূপ দেন। আগামবেনের মতে, কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প বা বন্দিশিবির আধুনিক রাজনীতির কোনো হঠাৎ গজিয়ে ওঠা ব্যতিক্রম বা বিচ্যুতি নয়; বরং তা আধুনিক জাতিরাষ্ট্রের অন্যতম লুকায়িত নিখুঁত নজির—এমন এক ভৌগোলিক ও আইনি স্থান যেখানে রাষ্ট্র নিজের আইনকে স্থগিত রেখে আইনগতভাবেই চূড়ান্ত ক্ষমতা প্রয়োগ করে (Agamben, Homo Sacer)। এই দৃষ্টিকোণ থেকে, নাৎসি বন্দিশিবির উদারবাদী জাতিরাষ্ট্রের আধুনিক যুক্তির বিপরীত কিছু ছিল না, বরং তা ছিল তারই সবচেয়ে স্বচ্ছ ও নগ্ন প্রকাশ।

​তবে ফুকো ও আগামবেনের এই তাত্ত্বিক কাঠামোর ভেতরে একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক সীমাবদ্ধতা কাজ করে, যা চিহ্নিত করেছেন রাজনৈতিক দার্শনিক আশিল এমবেম্বে তার ‘নেক্রোপলিটিক্স’ (necropolitics) তত্ত্বে। এমবেম্বের যুক্তি হলো, ফুকোর জৈবরাজনীতি তত্ত্বটি মূলত ইউরোপকেন্দ্রিক। কারণ ঔপনিবেশিক ভূখণ্ডে সার্বভৌম ক্ষমতার প্রাথমিক প্রকাশই ছিল সরাসরি ‘মৃত্যু বণ্টন’ বা হত্যা করার নিরঙ্কুশ অধিকার। এমবেম্বে দেখান যে, ঔপনিবেশিক শাসনকাঠামো ছিল একইসাথে অনুশাসনমূলক, জৈবরাজনৈতিক এবং ‘নেক্রোপলিটিক্যাল’ (লাশের রাজনীতি) ক্ষমতার এক সম্মিলিত হিংস্র রূপ (Mbembe, Necropolitics)। এমবেম্বের মূল পর্যবেক্ষণ হলো: উদারবাদী গণতন্ত্রগুলোরও অভ্যন্তরীণ সংহতির জন্য ‘শত্রু’ নির্মাণের প্রয়োজন পড়ে, যেমনটি তাদের প্রয়োজন হয়েছিল দাসপ্রথা ও ঔপনিবেশিক দখলের যুগে।

​এখানে প্যাক্সটনের সেই সতর্কতাটিও স্মরণ করা জরুরি। অচিন বনায়েক ও ক্রিস্টফ জাফরেলোর মতো পণ্ডিতরা হিন্দুত্ব-ফ্যাসিবাদ তুলনাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন এই যুক্তিতে যে, ইন্ডিয়ায় এখনো বহুদলীয় নির্বাচন, আংশিক স্বাধীন বিচার বিভাগ ও সক্রিয় নাগরিক সমাজ বহাল আছে—কোনো একদলীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এই আপত্তিটি এজেন্সির প্রশ্ন তোলে, কাঠামোগত পূর্বশর্তের প্রশ্নকে খণ্ডন করে না। লুনা সাবাস্তিয়ানের সাম্প্রতিক গবেষণা (Fascism in India: Race, Caste, and Hindutva, হার্ভার্ড, ২০২৫) ঠিক এই ফাঁকটি পূরণ করে জাতপ্রথাকে ইউরোপীয় জাতিতত্ত্বের ইন্ডিয়ান কাঠামোগত সমতুল্য হিসেবে বিশ্লেষণ করে—যেটা দেখায়, হিন্দুত্ববাদ মুসলিমদের সরাসরি রাতারাতি নির্মূল নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক নিপীড়ন ও সহিংস আত্তীকরণের মাধ্যমে মুছে ফেলার প্রকল্প গ্রহণ করে, যা ইউরোপীয় মডেল থেকে ভিন্ন কিন্তু কাঠামোগতভাবে সমতুল্য।

​উদারবাদের এই অভ্যন্তরীণ স্ববিরোধিতা ও দ্বিচারিতা সবচেয়ে জোরালোভাবে উন্মোচিত হয়েছিল ফ্রানজ ফানোঁ এবং আইমে সেজেরের ঔপনিবেশিক সমালোচনায়। ফানোঁর বিশ্লেষণে ঔপনিবেশিক বিশ্ব ছিল একটি ‘ম্যানিকিয়ান’ (Manichean) বা চূড়ান্ত দ্বি-বিভাজিত জগত—যেখানে শাসক ও শাসিতের মধ্যে টানা বিভাজনরেখাটি কার্যত মানুষ ও অ-মানুষের পার্থক্য হিসেবে কাজ করত (Fanon, The Wretched of the Earth)। আইমে সেজের এই ঐতিহাসিক সত্যকেই ব্যক্ত করেছিলেন: ইউরোপীয় বুর্জোয়ার নিকট হিটলারের আসল ‘অপরাধ’ এটি ছিল না যে তিনি অপরাধ করেছিলেন; বরং তার প্রকৃত অপরাধ ছিল এই যে, তিনি এতদিন ধরে অ-শ্বেতাঙ্গ ঔপনিবেশিক জনগণের ওপর যে বর্বর পদ্ধতিগুলো নির্বিচারে প্রয়োগ করা হয়েছিল, সেগুলোকে এবার খোদ ইউরোপীয়দের ওপর প্রয়োগ করা শুরু করেছিলেন (Césaire, Discourse on Colonialism)। ফানোঁ বা সেজেরের এই অবস্থান কোনো রোমান্টিক নীতিবাক্য বা প্রথাগত সমাধানের রূপরেখা তৈরি করে না; বরং এটি আমাদের জন্য একটি তাত্ত্বিক 'সীমানা-ধারণা' (limit-concept) হিসেবে কাজ করে—যা প্রমাণ করে যে উদারবাদ ও ফ্যাসিবাদের কৃত্রিম দ্বিধাকে চূর্ণ না করে সার্বভৌম বর্জনের মূল স্বরটিকে ধরা অসম্ভব।

​তাত্ত্বিক সংশয়: সমাজতন্ত্র বনাম ফ্যাসিবাদের বর্জনযুক্তি

​তবে আলোচনার এই জায়গায় এসে একটি প্রাসঙ্গিক তাত্ত্বিক প্রশ্ন উঠতেই পারে: যদি বর্জন বা সীমানা নির্ধারণের যুক্তিই রাজনৈতিক সম্প্রদায়ের সর্বজনীন বৈশিষ্ট্য হয়ে থাকে, তবে কি ফ্যাসিবাদ ও সমাজতন্ত্রের বর্জনযুক্তির মধ্যেও একই ধরনের কাঠামোগত সাযুজ্য খুঁজে পাওয়া যাবে?

​উত্তর হলো—না, এই দুটি বর্জন যুক্তিকে এক কাতারে ফেলা যায় না, কারণ তাদের রাজনৈতিক প্রকৃতি ও কাঠামোগত লক্ষ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। ফ্যাসিবাদ এবং উদারবাদের বর্জনযুক্তি তাদের নিজস্ব সার্বভৌমত্বের সংজ্ঞার ভেতরেই স্থায়ী ও অপরিহার্য হিসেবে প্রোথিত। এটি এমন এক কাঠামোগত গুণ যা নিজেকে কখনোই বিলুপ্ত করার লক্ষ্য রাখে না; এখানে জাতি, রক্ত, নাগরিকত্ব বা ‘সভ্যতার’ প্রাচীর চিরকাল কাউকে না কাউকে বাইরে রাখবে। অন্যদিকে, সমাজতান্ত্রিক প্রকল্পের ‘শ্রেণিশত্রু’ বা শ্রেণিবর্জনের ধারণাটি দুটি মৌলিক কারণে ভিন্ন:

​এটি কোনো স্থায়ী, জৈবিক বা অপরিহার্য অস্তিত্বগত পরিচয় নির্দেশ করে না, বরং এটি একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ককে (উৎপাদন সম্পর্কের অবস্থান) নির্দেশ করে, যা পরিবর্তনযোগ্য।

​এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এটি ঘোষিতভাবেই অস্থায়ী ও ঐতিহাসিক। মার্কসীয় রাজনৈতিক তত্ত্বে রাষ্ট্র ও শ্রেণিবিভাজন নিজেই শেষ পর্যন্ত বিলুপ্তির (withering away of the state) লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে। এখানে সার্বভৌম বর্জনযুক্তির কোনো স্ব-স্থায়ীকরণ প্রকল্প নেই, বরং বর্জনের বস্তুগত ভিত্তিটাকেই নির্মূল করার কথা বলা হয়। এই মৌলিক পার্থক্যটাই পরবর্তীতে ‘টোটালিটারিয়ানিজম তত্ত্ব’ (Totalitarianism Theory)-এর সরলীকৃত সমীকরণের মূল খণ্ডন হিসেবে কাজ করে।

​সংক্ষেপে, এই সমস্ত তাত্ত্বিক ফ্রেমওয়ার্কগুলোকে একত্রে স্থাপন করলে যে গভীর সত্যটি উন্মোচিত হয় তা হলো: উদারবাদ ও ফ্যাসিবাদের পার্থক্যটি কোনো গুণগত বা মৌলিক বৈপরীত্যের নয়, বরং তা প্রধানত মাত্রা, প্রকাশ্যতা ও রূপায়নের পার্থক্য। উভয়েই কেন্দ্রস্থ সার্বভৌম ক্ষমতাকে ঘিরে গঠিত, উভয়েরই ভেতরে একটি অন্তর্নিহিত অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক টানাপোড়েন বিদ্যমান যা সংকটে সামাজিক বিস্ফোরণ ঘটায়, উভয়েই মানব জীবনের মূল্যের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক বিভাজনরেখা টানে, এবং উভয়েই একটি বর্জিত বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর ভিত্তি করে নিজেদের সুশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিচয় রক্ষা করে।

​উদারবাদ এই বর্জনকে সূক্ষ্ম সম্মতি, আইনের সুশীল ভাষা এবং ভৌগোলিক দূরত্বের আড়ালে সুশৃঙ্খলভাবে ম্যানেজ করে; আর ফ্যাসিবাদ সেই একই বর্জনকে অভ্যন্তরীণ ভূখণ্ডে উন্মুক্ত সহিংসতা ও ভৌগোলিক নৈকট্যের মধ্যে রূপদান করে। এই গভীর কাঠামোগত আত্মীয়তাই মূলত ব্যাখ্যা করে—কেন প্রথম স্তরে বর্ণিত বস্তুগত মৈত্রী ইতিহাসে এত দ্রুত ও অনায়াসে বাস্তবায়িত হতে পেরেছিল।

কেন এই আত্মীয়তা আড়াল করা হয়

এই পর্যায়ে এসে একটি মৌলিক তাত্ত্বিক প্রশ্ন অনিবার্য হয়ে ওঠে: যদি এই প্রমানসমূহ এতই সুস্পষ্ট ও নথিবদ্ধ হয়, তবে মূলধারার রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বয়ানে কেন এই দুই মতাদর্শকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যেন তারা দুটি সম্পূর্ণ বিপরীত, মেরু-দূরবর্তী ও পরম শত্রু রাজনৈতিক জগত?

​এই ঐতিহাসিক ও তাত্ত্বিক আত্মীয়তাকে আড়াল করার প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়াটি কোনো অনভিপ্রেত ভুল বোঝাবুঝি বা সরল ঐতিহাসিক অজ্ঞতা নয়—এটি স্বয়ং একটি সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক তৎপরতা, যার পেছনে রয়েছে একটি নির্দিষ্ট আধিপত্যশীল শ্রেণির স্বার্থ এবং দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক কার্যকারিতা।

​১. ‘টোটালিটারিয়ানিজম তত্ত্ব ও স্নায়ুযুদ্ধের বয়ান-প্রকৌশল

​এই আত্মীয়তা ঢেকে ফেলার প্রধানতম প্রাতিষ্ঠানিক ও তাত্ত্বিক হাতিয়ারটি হলো ‘সর্বাত্মকতাবাদ’ বা Totalitarianism তত্ত্ব। এই তাত্ত্বিক ফ্রেমওয়ার্কের মূল কৌশল হলো—ফ্যাসিবাদ ও কমিউনিজমকে কৃত্রিমভাবে একই রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত করা এবং উভয়কেই ‘চরমপন্থা’, ‘স্বৈরাচার’ বা ‘একনায়কতন্ত্র’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা। আর এই দুই বিপরীতমুখী কাঠামোর বিপরীতে উদারবাদকে উপস্থাপন করা হয় একমাত্র সুষম, যুক্তিসঙ্গত, মধ্যপন্থী ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা হিসেবে।

​রাজনৈতিক দার্শনিক দোমেনিকো লোসুর্দো তার প্রামাণ্য বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন যে, এই টোটালিটারিয়ানিজম তত্ত্বের ঐতিহাসিক ও তাত্ত্বিক ভিত্তি অত্যন্ত ভঙ্গুর এবং তা মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত (Losurdo, War and Revolution)। এই তত্ত্বটি ফ্যাসিবাদ ও কমিউনিজমের ভেতরের মূলগত শ্রেণি-চরিত্রের পার্থক্যকে (যেখানে একটি পুঁজি ও ব্যক্তিগত সম্পত্তির চূড়ান্ত রক্ষায় নিয়োজিত, আর অন্যটি পুঁজিভিত্তিক ব্যবস্থার উচ্ছেহয়েছেদে নিবেদিত) সম্পূর্ণ মুছে ফেলে; আর তার জায়গায় একটি বিমূর্ত ও অস্পষ্ট ‘কর্তৃত্ববাদ’ (authoritarianism)-এর মাপকাঠি দিয়ে এই দুটিকে জোরপূর্বক একই বন্ধনীতে আটকে দেয়। আমাদের পূর্ববর্তী স্তরে বিশ্লেষিত তাত্ত্বিক পার্থক্যটি—যেখানে দেখানো শ্রেণিশত্রুর ধারণা ঐতিহাসিকভাবে নির্দিষ্ট ও স্ব-বিলুপ্তির লক্ষ্যে নিয়োজিত, পক্ষান্তরে সার্বভৌম বর্জনযুক্তি একটি স্থায়ী ও অপরিহার্য কাঠামোগত শর্ত—লোসুর্দোর এই কঠোর সমালোচনার তাত্ত্বিক ভিত্তিকেই পুনর্নিশ্চিত করে। এই তাত্ত্বিক চালবাজির রাজনৈতিক পরিণতি ছিল সুদূরপ্রসারী: যদি ফ্যাসিবাদ ও কমিউনিজমকে একই ধরনের অশুভ শক্তি হিসেবে দাঁড় করানো যায়, তবে উভয়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের একমাত্র ‘বৈধ ও সভ্য’ পথ হয়ে দাঁড়ায় উদারবাদ। ফলশ্রুতিতে, যেকোনো বিকল্প সমাজতান্ত্রিক চিন্তা বা বৈপ্লবিক সম্ভাবনাকে রাজনৈতিক কল্পনার রাজত্ব থেকেই চূড়ান্তভাবে নির্বাসিত করা সহজ হয়।

​দক্ষিণ এশীয় ও ইন্ডিয়ান প্রেক্ষাপটে টোটালিটারিয়ানিজম তত্ত্বের কার্যকর সমতুল্যটি হলো নেহেরুভীয় ধর্মনিরপেক্ষতা ও উদারবাদী সংবিধানের প্রতিষ্ঠিত বয়ান, যেখানে আজকের হিন্দুত্ববাদকে ইন্ডিয়ান গণতন্ত্রের এক 'সাময়িক বিচ্যুতি' বা 'অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা' হিসেবে দেখানো হয়—যেন স্বাধীনতা-উত্তর ইন্ডিয়ান রাষ্ট্র নিজে কখনো সেই একই সার্বভৌম বর্জন-যুক্তি অনুশীলন করেনি। অথচ দীর্ঘ কাশ্মীর সামরিকায়ন, শিখ-বিরোধী সংঘাত কিংবা উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার যুক্তি প্রমাণ করে, উদারবাদী আইনি কাঠামোর ভেতরেই সেই সুপ্ত 'ব্যতিক্রমী ক্ষমতা' চর্চা করা হয়েছে, যাকে হিন্দুত্ববাদ আজ কেবল নগ্ন ও স্থায়ী রূপ দিয়েছে। কল্পনা উইলসন ও অন্যান্যদের বিশ্লেষণ (Oxford Intersections: Racism by Context) দেখায়, হিন্দুত্ববাদ নিজেও কোনো 'খাঁটি প্রাক-ঔপনিবেশিক প্রত্যাবর্তন' নয়—বরং তা ঔপনিবেশিক শাসকদের রচিত ইতিহাস ও উদারবাদী আধুনিকতার এক মিশ্র উত্তরাধিকার, যা এখন রাষ্ট্রীয় আইনি ভাষার আড়ালে নিজের সর্বাত্মক বর্জননীতি পরিচালনা করছে।

​এই বয়ান-নির্মাণের আসল ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-উত্তর ‘স্নায়ুযুদ্ধ’ (Cold War)-এর ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ ছাড়া বোঝা অসম্ভব। বিশ্বযুদ্ধের ঠিক পরপরই, যখন এই বাস্তব সত্যটিকে ঢাকার কোনো উপায় ছিল না যে—নাৎসি ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী, মুখোমুখি ও নির্ণায়ক লড়াইটি লড়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের ‘রেড আর্মি’, তখন পশ্চিমা রাজনৈতিক আধিপত্যকামী শক্তির জন্য অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছিল একটি নতুন ঐতিহাসিক মিথ তৈরি করা। টোটালিটারিয়ানিজম তত্ত্ব ঠিক এই রাজনৈতিক প্রয়োজনেই উদ্ভাবিত হয়েছিল। এটি কমিউনিজমকে ফ্যাসিবাদের সমতুল্য এক পরম ‘অপর’ বা দানব হিসেবে হাজির করে, যার ফলে নাৎসিবাদকে ধূলিসাৎ করায় সোভিয়েত ইউনিয়নের অভূতপূর্ব ঐতিহাসিক অবদান বৈশ্বিক রাজনৈতিক স্মৃতি থেকে সুচতুরভাবে মুছে ফেলা হয়। এর স্থলাভিষিক্ত করা হয় এক নতুন 'উৎস-পুরাণ' (origin myth)—যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সমন্বয়ে গঠিত ‘উদারবাদী গণতান্ত্রিক বিশ্ব’ই নাকি ছিল ফ্যাসিবাদের মূল বিনাশকারী, আর উদারবাদ হলো সেই একমাত্র নৈতিক ও আলোকিত শক্তি যা মানবজাতিকে সব ধরনের চরমপন্থার হাত থেকে রক্ষা করার একক দাবিদার।

​২. ঐতিহাসিক স্থবিরতা বনাম চলমান প্রক্রিয়া: তোস্কানো ও বর্ণপুঁজিবাদ

​তবে এই আড়াল করার প্রক্রিয়াটি কেবল স্নায়ুযুদ্ধের ইতিহাসেই সীমাবদ্ধ নয়—এটি একটি চলমান তাত্ত্বিক প্রকল্প, যা সমকালীন রাজনীতিতেও ভিন্ন ভিন্ন মোড়কে ক্রমাগত পুনরুত্পাদিত হয়ে চলেছে। রাজনৈতিক তাত্ত্বিক আলবার্তো তোস্কানো তার গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা গ্রন্থ Late Fascism: Race, Capitalism and the Politics of Crisis-এ দেখিয়েছেন যে, মূলধারার রাজনীতিতে ফ্যাসিবাদকে বোঝার প্রচলিত পদ্ধতিটির ভেতরেই একটি গভীর ফাঁকি লুকিয়ে রয়েছে। ফ্যাসিবাদকে যখন কেবল আন্তঃযুদ্ধকালীন (১৯১৯–১৯৩৯) ইউরোপের একটি নির্দিষ্ট, সমাপ্ত ও অতীত ঐতিহাসিক ‘আদর্শ-রূপ’ (ideal type) হিসেবে সীলমোহর মেরে দেওয়া হয়, তখন এই সংজ্ঞাটি রাজনৈতিক ব্যবস্থার জন্য এক ধরণের স্বস্তিদায়ক আত্মতুষ্টি ও মিথ্যা আশ্বাস তৈরি করে। ধরে নেওয়া হয়, ফ্যাসিবাদ ১৯৪৫ সালে অক্ষশক্তির পতনের সাথে সাথেই চিরতরে পরাজিত হয়েছে; ফলে বর্তমানে যেকোনো নতুন কর্তৃত্ববাদী বা উগ্র ডানপন্থী উত্থানকে যদি সেই পুরনো ১৯৩০-এর দশকের মুসোলিনি বা হিটলারের বাহ্যিক অবয়বের সাথে হুবহু না মেলে, তবে তাকে আর ‘প্রকৃত’ ফ্যাসিবাদ বলা যাবে না!

​তোস্কানো এই চেকলিস্ট-ভিত্তিক তুলনাকে প্রত্যাখ্যান করে প্রস্তাব করেন যে, ফ্যাসিবাদকে কোনো স্থবির অতীত ঘটনা নয়, বরং একটি চলমান ও নমনীয় ‘প্রক্রিয়া’ (process) হিসেবে দেখতে হবে—যা পুঁজিবাদী আধিপত্য টিকিয়ে রাখার কৌশলের সাথে অত্যন্ত গভীরভাবে সংযুক্ত। এবং যার শিকড় ছড়িয়ে রয়েছে ক্লাসিক্যাল ইউরোপীয় ফ্যাসিবাদের জন্মেরও অনেক পূর্বে—দাসপ্রথা, ঔপনিবেশিক দখলদারিত্ব এবং বসতি স্থাপনকারী ঔপনিবেশিকতার (settler colonialism) দীর্ঘ ইতিহাসের মধ্যে। এই স্থানে তোস্কানো সেড্রিক রবিনসনের ‘বর্ণ-পুঁজিবাদ’ (racial capitalism) ধারণার সাথে সুর মেলান। তাদের মূল যুক্তি হলো: উদারবাদ ও ফ্যাসিবাদের মধ্যে যে কাল্পনিক বৈপরীত্য দাঁড় করানো হয়, তা কেবল তখনই টিকে থাকে যখন ফ্যাসিবাদকে বর্ণবাদ ও ঔপনিবেশিক শোষণের দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ইতিহাস থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে একটি স্রেফ ‘বিশুদ্ধ ইউরোপীয়-অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দুর্ঘটনা’ হিসেবে চিত্রায়িত করা হয়।

​ঠিক এই আড়াল ভাঙার মুহূর্তেই ফ্রাঞ্জ ফানোঁ ও এমে সেজেরের ঔপনিবেশিক সমালোচনা আমাদের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ 'সীমানা-ধারণা' (limit-concept) হিসেবে আবির্ভূত হয়। ফানোঁ যখন দেখান যে ইউরোপে নাৎসিবাদ আসলে সেই একই সামরিক ও আইনি বর্জন-প্রযুক্তি—যা ইউরোপীয়রা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কলোনিতে চর্চা করে এসেছিল—তখন তা প্রমাণ করে যে ঔপনিবেশিক সহিংসতা কেবল ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে এতদিন ইউরোপের নাগরিকদের চোখের আড়ালে রাখা সম্ভব হয়েছিল। ফলে, ফানোঁর চিন্তা আমাদের প্রথাগত উদারবাদ বনাম ফ্যাসিবাদের কৃত্রিম দ্বিমেরুকে চূর্ণ করার এক ধারালো তাত্ত্বিক হাতিয়ার সরবরাহ করে।

​৩. আড়ালকরণের রাজনৈতিক কার্যকারিতা ও চূড়ান্ত রূপরেখা

​এই সুপরিকল্পিত বয়ান-নির্মাণের গভীরে থাকা রাজনৈতিক কার্যকারিতাকে বুঝতে হলে আমাদের চূড়ান্তভাবে প্রশ্নটি করতে হবে—এই ঐতিহাসিক ও তাত্ত্বিক আত্মীয়তাকে আড়াল রাখাটি প্রকৃতপক্ষে ঠিক কার এবং কোন ব্যবস্থার সুরক্ষা নিশ্চিত করে?

​এর সুস্পষ্ট উত্তর হলো: এই আড়ালকরণ স্বয়ং পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামোকে সুরক্ষা দেয়। এটি নিজের সংকট-মুহূর্তে ব্যবস্থার বারবার ফ্যাসিবাদের দিকে ঝুঁকে পড়ার যে অবধারিত প্রবণতা, তাকে সাধারণ মানুষের চোখের সামনে থেকে সুচতুরভাবে লুকিয়ে রাখে। যদি উদারবাদ ও ফ্যাসিবাদকে রাজনৈতিকভাবে দুটি সতলেই ‘পরম বিপরীত’ হিসেবে প্রচার করা যায়, তবে ফ্যাসিবাদ সবসময় একটি বহিরাগত, আচমকা ও ব্যাখ্যাতীত ‘অস্বাভাবিকতা’ বা ব্যাধি হিসেবেই পরিচিতি পাবে—যা নাকি কিছু ‘খারাপ বা উন্মাদ ব্যক্তির’ কারসাজি! এবং ধরে নেওয়া হবে যে, সেই কতিপয় খারাপ ব্যক্তিকে নির্বাচনে হারিয়ে বা পরাজিত করতে পারলেই মূল ব্যবস্থাটি কার্যত নির্দোষ, নিরাপদ ও অক্ষত থেকে যায়।

​কিন্তু যদি এটি সততার সাথে স্বীকার করে নেওয়া হয় যে, ফ্যাসিবাদ কোনো আকাশ থেকে পড়া মহামারী নয়, বরং তা পুঁজিবাদী ব্যবস্থার নিজস্ব অভ্যন্তরীণ সংকট-সমাধানের এবং স্বকীয় পুনরুত্পাদনেরই একটি সুনির্দিষ্ট ও সম্ভাব্য রূপ—যেমনটি আমরা বস্তুগত ইতিহাস, সার্বভৌম বর্জনের তত্ত্ব এবং তোস্কানোর ‘চলমান প্রক্রিয়ার’ মাধ্যমে দেখিয়েছি—তবে রাজনীতির মূল প্রশ্নটাই আমূল বদলে যায়। তখন ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সত্যিকারের প্রতিরোধ স্রেফ ‘নির্বাচনে কোনো নির্দিষ্ট ফ্যাসিস্ট প্রার্থীকে পরাজিত করার’ মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং মূল লড়াইটা গিয়ে দাঁড়ায় সেই পুরো অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাটাকেই উন্মোচিত করার মধ্যে, যা বারবার স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফ্যাসিবাদের জন্ম দেওয়ার শর্ত তৈরি করে।

​অতএব, এই আত্মীয়তাকে আড়াল করার ঐতিহাসিক প্রক্রিয়াটি কোনো নিরপেক্ষ ঐতিহাসিক ভুল নয়; বরং তা একটি সুসংগঠিত, সচেতন ও প্রাতিষ্ঠানিক মতাদর্শিক নির্মাণ, যার সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক উদ্দেশ্য মূলত চারটি:

​সংগ্রামের সীমানা নির্ধারণ: রাজনৈতিক লড়াইয়ের মূল ময়দানকে কেবল বিদ্যমান ব্যবস্থার অভ্যন্তরীণ উপ-দলগুলোর (উদারপন্থী বনাম ডানপন্থী প্রতিক্রিয়াশীল) মধ্যকার রূপমাত্রিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার ভেতরেই সীমাবদ্ধ রাখা।

​শক্তি অপচয়: সাধারণ মানুষের প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিকে উচ্ছেদের বদলে—কীভাবে বিদ্যমান বর্জনমূলক ব্যবস্থাকেই ‘আরও সুশীল ও মানসিকভাবে সহনীয়’ উপায়ে পরিচালনা করা যায়, সেই ব্যর্থ সংস্কারবাদী প্রক্রিয়ায় ব্যস্ত রাখা।

​শ্রেণি ও বর্জনের বিভাজন ঝাপসা করা: প্রকৃত অর্থনৈতিক, ঔপনিবেশিক ও সার্বভৌম বর্জনের মূল বিভাজনরেখাকে অস্পষ্ট ও অদৃশ্য করে দেওয়া।

​বিকল্প বিলোপ: যেকোনো মূলগত সমাজতান্ত্রিক বা প্রথাগত রাষ্ট্রকাঠামো-উত্তর বিকল্পকে সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক সম্ভাবনার তালিকা থেকেই চিরতরে মুছে ফেলা।

​এই চারটি প্রাতিষ্ঠানিক কাজ একত্রে যা অর্জন করে, তা হলো এক নির্দিষ্ট সীমানাবদ্ধ রাজনৈতিক পরিসর—যেখানে সর্বোচ্চ প্রশ্ন তোলা যায় কেবল ‘উদারবাদ বনাম ফ্যাসিবাদ’ নিয়ে; কিন্তু কখনোই প্রশ্ন তোলা যায় না ‘সার্বভৌম বর্জন বনাম সার্বজনীন মানবিক মুক্তি’ কিংবা ‘কাঠামোগত পরিবর্তন বনাম ব্যবস্থার স্থায়িত্ব’ নিয়ে।

​আর ঠিক এই কৃত্রিম ও সংকীর্ণ প্রশ্নের পরিসরের ভেতরেই আমাদের সার্বিক রাজনৈতিক কল্পনাশক্তিকে বন্দি করে রাখা হয়েছে—যতক্ষণ না পর্যন্ত আমরা উদারবাদ ও ফ্যাসিবাদের এই আড়াল করে রাখা গভীর আত্মীয়তাটিকে নিঃসংকোচে স্বীকার করে নিচ্ছি।

সমসাময়িক প্রতিধ্বনি

এতদূর যা দেখানো হলো তা মূলত আন্তঃযুদ্ধকালীন ইউরোপ ও তার ঐতিহাসিক অনুকরণকে ঘিরে – কিন্তু যদি এই প্রবন্ধের কেন্দ্রীয় দাবিটা সত্যি হয়, অর্থাৎ উদারবাদের ভেতরেই সার্বভৌম বর্জন-যুক্তি সুপ্ত থাকে আর সংকটে তা সক্রিয় হয়ে ওঠে, তবে এই যুক্তিকে ১৯৪৫ সালেই থামিয়ে রাখার কোনো কারণ নেই। প্রশ্ন করা দরকার – এই একই ব্যাকরণ কি আজকের বিশ্বব্যবস্থায়, বিশেষ করে আমাদের নিজস্ব দক্ষিণ এশীয় ভূরাজনীতিতে, ভিন্ন শব্দভাণ্ডারে কাজ করছে?

​কুইন স্লোবোডিয়ানের গবেষণা এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দেয়। স্লোবোডিয়ান দেখান, নব্য-উদারবাদী চিন্তাধারার জন্ম হয়েছিল একটা নির্দিষ্ট আতঙ্ক থেকে – অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সাম্রাজ্যের পতনের পর গণতান্ত্রিক আত্মনিয়ন্ত্রণের ঢেউ, যা হায়েক ও ফন মিজেসের মতো চিন্তকদের কাছে সম্পত্তির অধিকারের জন্য একটা অস্তিত্বগত হুমকি মনে হয়েছিল। তাদের প্রকল্প ছিল বাজারকে ‘মুক্ত’ করা নয়, বরং বাজারকে গণতান্ত্রিক ভোটের নাগালের বাইরে আইনি-প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় বন্দি করে ফেলা। স্লোবোডিয়ানের ভাষায়, লক্ষ্যটা ছিল পুঁজিবাদকে গণতন্ত্রের হুমকি থেকে টিকা দেওয়া (to inoculate capitalism against the threat of democracy)। এটা শ্মিটীয় যুক্তির একটা সমসাময়িক সংস্করণ – এখানেও ব্যতিক্রমী ক্ষমতা (গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্তকে অকার্যকর করার ক্ষমতা) সুপ্ত থাকে, কিন্তু তা লুকিয়ে থাকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য-চুক্তি, বিচারিক বিধিনিষেধ ও 'স্বাধীন' অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের ভাষায়।

​স্লোবোডিয়ানের এই বন্দীকরণ-এর সবচেয়ে বৈরী ও সহিংস রূপান্তর দেখা যায় আজকের ইন্ডিয়ায়—যাকে বিশ্লেষকরা 'হিন্দুত্ব নব্য-উদারবাদ' হিসেবে চিহ্নিত করছেন। এখানে বাজারকে গণতান্ত্রিক নাগালের বাইরে রাখার পাশাপাশি তাকে সরাসরি সংখ্যাগুরুবাদী (majoritarian) সাংস্কৃতিক রাজনীতির সাথে ফিউজ করে দেওয়া হয়েছে। অর্থনৈতিক অনটন ও গভীর সামাজিক সংকটের জনরোষকে প্রশাসনিক ব্যবস্থার বাইরে চালিত করতে মুসলিম, দলিত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে 'অনাকাঙ্ক্ষিত' চিহ্নিত করা হচ্ছে। নাগরিকত্ব সংশোধন আইন (CAA) কিংবা জাতীয় নাগরিক পঞ্জির (NRC) মতো রাষ্ট্রীয় বন্দোবস্তগুলো কোনো আইনি বিচ্ছিন্নতা নয়—এগুলো উদারবাদী আইনি কাঠামোর ভেতরে থেকেই পরিচালিত এক্সক্লুশনারি নেক্রোপলিটিক্স।

​ওয়েন্ডি ব্রাউন যেমন দেখান, নব্য-উদারবাদী যুক্তিবিন্যাস গণতান্ত্রিক নাগরিককেই পুনর্গঠন করে একজন 'মানবপুঁজি' (human capital) হিসেবে, যার রাজনৈতিক অস্তিত্বের একমাত্র প্রকাশ হলো প্রতিযোগিতামূলক মূল্য বৃদ্ধি করা—যৌথ রাজনৈতিক দাবি তোলা নয়। এটি একটি নীরব কিন্তু গভীর রাজনৈতিক শুন্যতা (depoliticization) তৈরি করে। আর এমবেম্বের নেক্রোপলিটিক্সকে যখন এর সাথে যুক্ত করা হয়, তখন এই চিত্রটি সম্পূর্ণ হয়। ইন্ডিয়ার এই বর্জনভিত্তিক হিন্দুত্ববাদী মডেল সীমান্ত পেরিয়ে পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলোর ওপরও তার ছায়া ফেলে। বিশেষ করে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান ও সীমান্ত বাস্তবতায় এর প্রভাব প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ—উভয়ভাবেই গভীর। একদিকে সীমান্তে প্রতিদিনের রক্তপাত ও পুশ-ব্যাকের মতো ঘটনাকে ‘নিরাপত্তাজনিত দুর্ঘটনা’ হিসেবে স্বাভাবিক করা, অন্যদিকে বাংলাদেশের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বয়ানে ‘শত্রু চিহ্নিতকরণ’ ও বর্জনভিত্তিক নিরাপত্তার ভাষা যোগানো—এসবই সেই একই আঞ্চলিক নেক্রোপলিটিক্সের প্রসার। আজকের শাসকশ্রেণি এই সহিংসতাকে প্রশাসনিক বা আইনি দূরত্বের আড়ালে সম্পন্ন করে, যা ফানোঁ-সেজেরের সেই 'ভৌগোলিক-দূরত্বের' যুক্তির সমসাময়িক রূপ। বাংলাদেশে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে উৎখাত হওয়া শেখ হাসিনার আওয়ামী শাসন ছিল এই নেক্রোপলিটিকাল বর্জন যুক্তির সিলসিলা।

বাজারের প্রাতিষ্ঠানিক বন্দীকরণ, বিরাজনীতিকরণ, আর আঞ্চলিক নেক্রোপলিটিক্স – একসাথে দেখায় যে এই বিশ্লেষণ কোনো ইতিহাসের বন্ধ অধ্যায় নয়। একবিংশ শতকে উদারবাদ প্রথমে চেষ্টা করেছে প্রাতিষ্ঠানিক বন্দীকরণ দিয়ে তার অভ্যন্তরীণ সংকট সামলাতে। কিন্তু যখন সেই বন্দোবস্ত রাজনৈতিক প্রতিরোধের মুখোমুখি হচ্ছে, তখন কাঠামোগত সংকট ঢাকতে তা উদামভাবে মেজরিটারিয়ানিজম ও নেক্রোপলিটিক্সের শরণাপন্ন হচ্ছে। উদারবাদী রাষ্ট্রযন্ত্র যখন নিজের ভেতরেই এই বর্জন-যুক্তিকে জিইয়ে রাখে, তখন নতুন সংকট মোকাবেলায় সে কি আবারও সেই পুরনো ফ্যাসিবাদী জাদুকরকেই ডেকে আনছে না?

প্রকৃত বিভাজন রেখা কোথায়

এতক্ষণ আমরা দেখলাম, ইতিহাসের যেকোনো সংকটকালে যখন সার্বভৌম ক্ষমতার হিংস্র রূপটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তখন উদারবাদ আমাদের সামনে একটি কৃত্রিম রাজনৈতিক বন্দোবস্ত হাজির করে—হয় তার প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষয় ও বর্জনকে 'স্বাভাবিক' ধরে নিয়ে মেনে নেওয়া, না হয় তার গর্ভজাত একনায়কত্বকে প্রতিরোধ করার নামে সেই একই প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর শরণাপন্ন হওয়া। এটি একটি মিথ্যা বৈপরীত্য। উদারবাদ আর ফ্যাসিবাদের মধ্যবর্তী দূরত্বকে প্রকৃতির ফারাক না ভেবে যদি মাত্রার ফারাক হিসেবে বোঝা যায়, তবে তা কোনো নিষ্ক্রিয়তা তৈরি করে না; বরং তা উদারবাদী প্রতিষ্ঠানের ভেতরের সুপ্ত রূপান্তর প্রক্রিয়াকে চিহ্নিত করার চোখ তৈরি করে।

​এই কাঠামোগত দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক পরিসরকে—বিশেষ করে ইন্ডিয়ার হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিকে—নতুন করে বুঝতে বাধ্য করে। হিন্দুত্ববাদকে যদি কেবল কতিপয় চরমপন্থীর ধর্মীয় উগ্রতা বা অতীতের কোনো সামন্তীয় বিচ্ছিন্নতা হিসেবে দেখা হয়, তবে তার প্রকৃত শক্তি ও বিপদ অধরাই থেকে যায়। বাস্তবে, ইন্ডিয়ান রাষ্ট্রযন্ত্রের সংবিধিবদ্ধ উদারবাদী আইনি কাঠামো, অর্থনৈতিক আধুনিকায়ন এবং কর্পোরেট পুঁজির সমন্বয়েই হিন্দুত্ববাদী ক্ষমতার বিকাশ ঘটেছে। নাগরিকত্ব সংশোধন আইন (CAA) বা জাতীয় নাগরিক পঞ্জির (NRC) মতো প্রশাসনিক ব্যবস্থার মাধ্যমে যেভাবে জনসংখ্যার একটি অংশকে 'অনাকাঙ্ক্ষিত' বানিয়ে নেক্রোপলিটিক্যাল বিভাজনরেখা টানা হচ্ছে, তা কোনো বাইরের আক্রমণ নয়—তা উদারবাদী রাষ্ট্রেরই আইনি ক্ষমতার এক ভয়াবহ প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়োগ।

​বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক অবস্থানের কারণে এই রাজনীতির ঢেউ কেবল সীমানার ওপারে থেমে থাকে না। প্রত্যক্ষ সীমান্ত-সহিংসতা ও প্রতিক্রিয়া থেকে শুরু করে পরোক্ষভাবে বাংলাদেশের নিজস্ব রাজনৈতিক ও সামাজিক বয়ানে 'নিরাপত্তা', 'শত্রু চিহ্নিতকরণ' এবং 'সংখ্যাগুরু বনাম সংখ্যালঘু' বিভাজনের যুক্তি নির্মাণ—সবক্ষেত্রেই এর গভীর প্রভাব পড়ে। ইন্ডিয়ার হিন্দুত্ববাদী মডেল যখন দেখিয়ে দেয় যে উদারবাদী আইনি রূপকাঠামোর ভেতরে থেকেই একটি বিপজ্জনক প্রজা-বর্জনীয় পলিটিক্স পরিচালনা করা সম্ভব, তখন তা সীমান্ত পেরিয়ে পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রগুলোর শাসকশ্রেণিকেও একই ধরনের রাজনৈতিক ব্যাকরণ অনুশীলনে উৎসাহিত করে।

​অতএব, দেখা যাচ্ছে, আধুনিক প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা তার নিজস্ব সংকট সামলাতে গিয়ে বারবার 'ব্যতিক্রমী ক্ষমতা' জাগিয়ে তোলে। আইনি ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ভেতরের দেয়ালগুলো প্রতিপক্ষকে ঠেকানোর জন্য নয়, বরং সংকটকালে রাষ্ট্রযন্ত্রের নিজেরই চরমপন্থায় রূপান্তরিত হওয়ার পথ উন্মুক্ত রাখার জন্য নির্মিত।

আমরা এখানে কোনো ইউটোপিয়ান বিকল্প বা প্রথাগত সমাধান ফেরি করব না। আমাদের কাজ বর্তমান ব্যবস্থার সেই প্রাতিষ্ঠানিক আবরণকে ছিন্ন করা, যা তার কাঠামোগত সহিংসতাকে ঢেকে রাখে। ফ্যাসিবাদকে কোনো বহিরাগত দুর্ঘটনা হিসেবে না দেখে তাকে যদি উদারবাদেরই এক অর্থনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় পরিণতি হিসেবে দেখা হয়, তবে রাজনৈতিক লড়াইটি আর সীমানার বাইরের কোনো কাল্পনিক শত্রুর বিরুদ্ধে থাকে না—তা সোজা এসে পড়ে আমাদের আঞ্চলিক ও জাতীয় 'স্বাভাবিক' রাজনৈতিক ব্যবস্থার কেন্দ্রে।

​প্রকৃত রাজনৈতিক বিভাজনরেখা তাই কোনো রূপকথার প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থায় আস্থা রাখার বিষয় নয়। আসল লড়াইটা সেই কাঠামোগত শর্তের বিরুদ্ধে, যা নাগরিক বর্জন ও শাসনকে প্রশাসনিক স্বাভাবিকতা বানিয়ে রাখে। এটি কোনো স্থায়ী স্বস্তি দেয় না, দেয় কেবল এক চিরন্তন, আপসহীন ও বস্তুবাদী সতর্কতার রাজনৈতিক দায়িত্ব।

বিবলিওগ্রাফি

  1. Agamben, Giorgio. Homo Sacer: Sovereign Power and Bare Life. Stanford University Press, 1998.

  2. Brown, Wendy. Undoing the Demos: Neoliberalism's Stealth Revolution. Zone Books, 2015.

  3. Casolari, Marzia. In the Shadow of the Swastika: The Relationships Between Indian Radical Nationalism, Italian Fascism and Nazism. Routledge, 2020.

  4. Césaire, Aimé. Discourse on Colonialism. Monthly Review Press, 1972 (মূল প্রকাশ ১৯৫০)।

  5. Fanon, Frantz. The Wretched of the Earth. Grove Press, 1963 (মূল প্রকাশ ১৯৬১)।

  6. Foucault, Michel. Society Must Be Defended: Lectures at the Collège de France, 1975–76. Picador, 2003।

  7. Guérin, Daniel. Fascism and Big Business. Pathfinder Press, 1973 (মূল প্রকাশ ১৯৩৬/১৯৪৫)।

  8. Hobsbawm, Eric. Age of Extremes: The Short Twentieth Century, 1914–1991. Michael Joseph, 1994।

  9. Landa, Ishay. The Apprentice's Sorcerer: Liberal Tradition and Fascism. Brill, 2010 / Haymarket Books, 2012।

  10. Losurdo, Domenico. War and Revolution: Rethinking the Twentieth Century. Verso, 2015।

  11. Mbembe, Achille. 'Necropolitics.' Public Culture, vol. 15, no. 1, 2003। এবং Necropolitics. Duke University Press, 2019।

  12. Parenti, Michael. Blackshirts and Reds: Rational Fascism and the Overthrow of Communism. City Lights Books, 1997।

  13. Paxton, Robert O. The Anatomy of Fascism. Alfred A. Knopf, 2004।

  14. Sabastian, Luna. Fascism in India: Race, Caste, and Hindutva. Harvard University Press, 2025।

  15. Schmitt, Carl. Political Theology: Four Chapters on the Concept of Sovereignty. MIT Press, 1985 (মূল প্রকাশ ১৯২২)।

  16. Simpson, Christopher. The Splendid Blond Beast: Money, Law, and Genocide in the Twentieth Century. Common Courage Press, 1995।

  17. Slobodian, Quinn. Globalists: The End of Empire and the Birth of Neoliberalism. Harvard University Press, 2018।

  18. Toscano, Alberto. Late Fascism: Race, Capitalism and the Politics of Crisis. Verso Books, 2023।

  19. Turner, Henry Ashby. German Big Business and the Rise of Hitler. Oxford University Press, 1985।

  20. Wilson, Kalpana, Giti Chandra, and Lata Narayanaswamy. 'Hindutva: Hindu Supremacist Fascism, Neoliberal Development, and the Co-optation of Decolonial Discourse.' Oxford Intersections: Racism by Context, 2025।