নাফ থেকে কালাদান - রক্তে ভেজা আরাকান
১.
আরাকানে ৮ম শতাব্দীতে প্রথম ইসলামের আগমন ঘটে আরব বণিক ও নাবিকদের মাধ্যমে। সে সময় আরব ও পারস্য উপসাগরীয় মুসলিম বণিকরা বঙ্গোপসাগর হয়ে চট্টগ্রাম–আরাকান–ইয়াঙ্গুন উপকূলে ব্যবসা করত। স্থানীয়দের সঙ্গে বাণিজ্য ও সামাজিক সম্পর্ক স্থাপন করে, ফলে ইসলামী সংস্কৃতি ধীরে ধীরে এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠীর নামকরণ এভাবে করা হয় মতান্তরে, রোহাং" মানে আরাকান, আর “রোহিঙ্গা” অর্থ “রোহাং-এর মানুষ” সে জনপদের মুসলমানদের বলা হতো রোহিঙ্গা মুসলমান। আরাকানের মুসলমানদের সাথে বাংলার খুবই সৌহার্দ্যপূর্ণ ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠে। ‘১৩শ শতাব্দী থেকে বাংলা সালতানাত (বিশেষত চট্টগ্রাম ও গৌড়) থেকে বহু মুসলিম ব্যবসায়ী, সৈনিক, ও দরবেশ সেখানে বসবাস শুরু করেন। তারা স্থানীয় ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে এক নতুন আরাকানি মুসলিম সম্প্রদায় গড়ে তোলেন, যারা পরবর্তীতে রোহিঙ্গা নামে পরিচিত হয়।’ বাংলা সালতানাত -আরাকান সম্পর্ক ও মুসলিম প্রভাব (১৪৩০–১৭৮৪) অব্দি নিরবিচ্ছিন্ন ছিলো।১৪৩০ সালে বাঙালি সুলতান নাসিরউদ্দিন শাহ বা সুলতান জালালউদ্দিন মুহাম্মদ শাহ আরাকানের রাজার নারামেইখলা সিংহাসনে পুনঃপ্রতিষ্ঠায় সাহায্য করেন। তার মধ্য দিয়ে বাংলা আরাকানী সংস্কৃতি, সাহিত্য ও ইসলামীক জ্ঞানচর্চার মধ্যযুগের একটি কেন্দ্র হয়ে উঠে। এখানে ছিলেন বিখ্যাত কবি আলাওল, দাউদ কার্নাফুলী, এবং মাগনাজি প্রমুখ ছিলেন বাংলাভাষী মুসলমান। আরাকানের রাজধানী ম্রাউক-উ (Mrauk-U) শহরে মুসলিম মন্ত্রীরা, সৈন্য ও কবিরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বাংল সালতানাতের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ হিসেবে আরাকানের মুদ্রাতে আরবি ক্যালিগ্রাফিতে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ ও চার খলিফার নাম লিখে বাজারে ছাড়ে। রোহিঙ্গারা মূলত আরব, পারসিক, বাংলা ও স্থানীয় আরাকানি জনগোষ্ঠীর সংমিশ্রণে গঠিত একটি মুসলিম জাতিগোষ্ঠী, যাদের উৎপত্তি অন্তত ১,২০০ বছরের পুরনো। ইসলামী বসতি ও বাংলা আরাকান সাংস্কৃতি গড়ে উঠে। এর ফলস্বরূপ আরাকানে প্রায় ৩৫০ বছর ধরে মুসলিম প্রভাব ও প্রশাসনিক যোগাযোগ বজায় থাকে। পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজুদ্দৌলা বৃটিশদের কাছে পরাজয়ের মধ্য দিয়ে মুসলমানদের শেষ ভরসাটুকু নিভে যায় আরাকানে। ধীরে ধীরে মোঘল সাম্রাজ্য দখল করে নেয় ইংরেজ' রা। আর রোহিঙ্গা মুসলমানদের স্বাধীনতা লুট হয়ে যায় ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানদের চোখের সামনে।
২.
রোহিঙ্গা মুসলমানদের উপর জাতিগত নিধন ১৯৭৮ সালে কিংবা ২০১৭ সালে শুরু হয়নি। এর ভিত্তি ১৭শতকে গাঁথা। ১৭৮৪ সালে বার্মিজ আগ্রাসন ও গণহত্যা, মুসলমান ও আরাকানি জনগোষ্ঠীর ওপর ভয়ানক প্রভাব ফেলেছিলো। ১৭৮৪ সালে বার্মার কোণবাউং রাজবংশের রাজা বোদাওপায়া আরাকান দখল করে নিয়ে মুসলিমদের ধরে ধরে বাস্তুচ্যুত ও গণহত্যা চালায়। বৌদ্ধ মগরা নারীদের ধর্ষণ ও হত্যা করে তীব্র ঘৃণা ও ধর্ম বিদ্বেষ নিয়ে। নাফ ও কালাদান নদী মুসলমানদের রক্তে রক্তের নদীতে রূপ নেয়। নারী পুরুষদের বন্দী করে দাস হিসেবে নিয়ে বিক্রি করে দিতো দাস বাজারে। আরাকানের দখলের পর বহু মুসলমান বাংলায় পালিয়ে আসে। যারা থেকে গিয়েছিল, তাদের ওপর কঠোর নিপীড়ন, জোরপূর্বডক ধর্মান্তর, ও দাসত্ব চাপানো হয়। অধিকারহীন, অবরুদ্ধ ও দাসত্বের হিসেবে নিক্ষিপ্ত করা হয়।
ইতিহাসবিদ Pamela Gutman ও Jacques Leider-এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে:—
“The Arakanese Muslims who remained were deprived of land and citizenship, being treated as prisoners in their own country”
এই সময় বহু মুসলমান ও আরাকানি নাগরিককে ইরাবতী নদীর পার হয়ে বার্মার অভ্যন্তরীণ আমরাপুরা, আভা ও মান্দালয় অঞ্চলে দাস হিসেবে পাঠানো হতো। বোদাওপায়ার সেনাবাহিনী আরাকান জয়ের পর ম্রাউক-উ এর (ম্রাউক-উ (Mrauk U) বা ম্রোহং হলো আরাকানের (বর্তমান মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যের একটি ঐতিহাসিক প্রাচীন শহর।) অভিজাত শ্রেণীসহ প্রায় ২০,০০০ থেকে ৩৫,০০০ মানুষকে বন্দি ও দাস হিসেবে বার্মার মূল ভূখণ্ডে (বিশেষ করে তৎকালীন রাজধানী আমারাপুরায়) নিয়ে যায়। তাদেরকে দিয়ে বিভিন্ন প্যাগোডা নির্মাণ, কৃষিকাজ এবং রাজকীয় বাধ্যতামূলক শ্রম করানো হতো এবং নৃশংস নির্যাতন করা হতো। রাজা বোদাওপায়া বিশ্বের সবচেয়ে বড়ো প্যাগোডা (Mingun Pagoda) তৈরির এক উচ্চাভিলাষী প্রজেক্ট হাতে নেয় তখন। আরাকান থেকে ধরে নেওয়া হাজার হাজার মুসলিম ও বৌদ্ধ দাসকে দিনরাত অমানবিক খাটুনি খাটিয়ে এই প্যাগোডা এবং বিশাল 'মিনগুন ঘণ্টা' তৈরির কাজে বাধ্য করা হতো। অতিরিক্ত খাটুনি এবং অনাহারে সেখানে হাজার হাজার বন্দি মৃত্যুবরণ করেছিলো। ইতিহাসের এক নির্মম বাস্তবতা হলো বাংলা সালতানাতের ১৫৭৬ সালের দিকে অস্তমিত হয়। যখন মোগল সম্রাট আকবরের সেনাপতি মুনিম খান তোকরাইয়ের যুদ্ধে (বা রাকই যুদ্ধ) শেষ স্বাধীন সুলতান দাউদ খান কররানি-কে পরাজিত করেন। এবং বন্দী করে হত্যা করা হয়। মোঘল সাম্রাজ্য বাংলা পুনরায় দখল করে নেয়। আরাকানের মুসলমান' রা কার্যত হয়ে পড়ে অভিভাবকহীন এতিম। মগেরমুলুক শুরু হয় আরাকানে, জমিজমা সম্পদ লুন্ঠন করে নিয়ে যাচ্ছে, গণহত্যা, গণধর্ষণ করছে মুসলিম মা বনদের। কেউ প্রতিরোধ করার কোথাও ছিলো না, দিল্লির মোঘল সম্রাটরা কাউকে পাঠায়নি মুসলমানদের রক্ষা করতে। এরমধ্য দিয়ে আরাকানের মুসলমানদের উপর নেমে আসে জাতিগত ধর্মীয় আগ্রাসন। মুসলমানরা বাংলার উপকূলীয় অঞ্চলে অনেকে শরনার্থী হিসেবে পালিয়ে আসে। ইতিহাসবিদ মোশে ইয়েগার লিখেছেন:
“বোদাওপায়ার আরাকান বিজয়ের পরপরই এক ভয়াবহ গণহত্যা সংঘটিত হয়; হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়, এবং প্রায় ২০,০০০ মানুষকে দাস হিসেবে বার্মায় নিয়ে যাওয়া হয়।”
(মোশে ইয়েগার, দ্য মুসলিমস অব বার্মা, ১৯৭২, পৃষ্ঠা ২১)
১৮২৪–১৮২৬ খ্রিষ্টাব্দ: প্রথম অ্যাংলো–বার্মিজ যুদ্ধের এই সময়ে আরাকান অঞ্চলে বার্মিজ সেনারা ব্রিটিশদের সহায়তাকারী ট্যাগ দিয়ে মুসলমান ও রাখাইন জনগোষ্ঠীর উপর প্রতিশোধমূলক হত্যাযজ্ঞ চালায়। হাজার হাজার মুসলমান নিহত হয়, শত শত গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়া হয়।
(মোশে ইয়েগার, দ্য মুসলিমস অব বার্মা, ১৯৭২, পৃষ্ঠা ২১-২৩)
আরাকানের মুসলমানদের উপর পর্যায়ক্রমে একের পর এক গণহত্যা চালিয়ে যায় বার্মিজ সেনা' রা ও বৃটিশ উপনিবেশিক সেনাবাহিনী।
জ্যাক লেইডারের মতে ১৮৩২–১৮৩৮ সালে “Pacification Campaigns” শান্তি প্রতিষ্ঠার নামে আরাকান মুসলিম দমন অভিযান চালায় বৃটিশ উপনিবেশিক সেনাবাহিনী। ব্রিটিশরা আরাকান জয় করার পর স্থানীয় মুসলমানদের “বিদ্রোহী” বলে অভিযুক্ত করে। অথচ ১৮২৪ সালে মুসলমানদের বৃটিশদের সহযোগী বলে বার্মিজ সেনাবাহিনী গণহত্যা চালায়। ১৮৩২ সালে মিনব্যা ও রামরু এলাকায় প্রথম অভিযান চালায় বৃটিশ উপনিবেশিক সেনাবাহিনী। ১৮৩৮ সালে আবারো “anti-insurgency” অভিযানে শত শত মুসলমান নিহত ও গ্রাম জ্বালানো হয়। ১৮৩২ ও ১৮৩৮ সালের তথাকথিত শান্তি প্রতিষ্ঠা অভিযান (Pacification Campaigns) পরিচালনা করেছিল বৃটিশ উপনিবেশিক বেঙ্গল আর্মির অফিসাররা। বিদ্রোহের সন্দেহে মুসলিম বসতিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়। পুরো গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়া হয় এবং শত শত মানুষ প্রাণ হারায়।”
তথ্য সূত্র: Jacques Leider, Conflict and Mass Violence in Arakan (Oxford, 2018)
১৮২৬ সালে প্রথম অ্যাংলো–বার্মিজ যুদ্ধ শেষে ইয়ান্ডাবু চুক্তি (Treaty of Yandabo)-র মাধ্যমে আরাকান অঞ্চল ব্রিটিশদের হাতে চলে আসে। বার্মিজ সেনাবাহিনীর পরাজয়ের ক্ষোভে আরাকান রোহিঙ্গাদের উপর চালিয়ে যায় ইতিহাসের বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞ। আরান চলে আসে প্রভিন্স অব বাংলার অধীনে। বিশেষ করে ১৮৩২, ১৮৪২ ও ১৮৫২ সালের অভিযানে শত শত মুসলমান নিহত হয়।
১৮৭০–১৮৯০: দাঙ্গা, দমন ও ধর্মীয় দমননীতির মধ্য দিয়ে উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে আরাকানের মুসলিম জনসংখ্যা কিছুটা পুনর্গঠিত হলে, স্থানীয় বৌদ্ধ ও মুসলমানদের মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়ে।
ব্রিটিশ প্রশাসন মুসলমানদের বিরুদ্ধে পক্ষপাত দেখায়, তাদের প্রশাসনিক পদে নিয়োগে বাধা দেয় এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রবেশ সীমিত করে। ১৮৮০–৮৯ সালের মধ্যে আরাকানের দক্ষিণাঞ্চলে বেশ কয়েকটি anti-Muslim pogrom সংঘটিত হয়, যেখানে মুসলমানদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হয় এবং কয়েকশ মানুষ নিহত হয়। এই তথ্য পাওয়া যায় Colonial Gazette of British Burma (1890) এবং Moshe Yegar-এর বর্ণনা থেকে।
১৮৮৬–১৮৮৯: শেষ দিকের গণহত্যা।
১৮৮৫ সালে তৃতীয় অ্যাংলো–বার্মিজ যুদ্ধের পর আরাকানের মুসলমানরা ব্রিটিশ বিরোধী প্রতিরোধে যুক্ত হলে, ১৮৮৬–১৮৮৯ সালে “counter-insurgency” অভিযানে প্রায় ৩,০০০ মুসলমান নিহত হয় বলে উপনিবেশিক প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে। তথ্য সূত্র: (Burma Administration Report, 1890)
প্রায় ৩০০ বছর দুই টানা জাতিগত নিধন ও ধর্মীয় বৈষম্য, গণহত্যার স্বীকার হয়ে আসছে রোহিঙ্গা মুসলমান' রা। ১৯৩৭ সালে বৃটিশ ভারতের অংশ থেকে আরাকানকে বাদ দিয়ে বৃটিশ বার্মার সাথে যুক্ত করে ইংরেজরা। এটা ছিলো তাদের সুদুর প্রসারী পরিকল্পনা, যেনো আরাকানের মুসলমানরা কোনদিন স্বাধীনতার স্বাদ না পায়। এবং দক্ষিণ এশিয়া অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে ডুবে থাকে। ১৯৪৭ সালে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তান স্বাধীনতা লাভ করে ১৪ই আগস্ট। দুঃখজনক সত্য হলো আরাকানের রোহিঙ্গা মুসলমান' রা পাকিস্তানের সাথে যোগ দেওয়ার জন্য মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ' কে চিঠি দেয় কিন্তু পাকিস্তান আন্দোলনের নেতারা পাত্তা দেয়নি তখন। রোহিঙ্গা মুসলিম ভাইদের সেদিন সবাই মিলে একটি মৃত্যুকূপে নিক্ষেপ করে চলে যায়। ১৯৪৬ সালে গঠন হয় নর্থ আরাকান মুসলিম লীগ।
যারা প্রকাশ্যে আরাকানের উত্তরাঞ্চল (মংডু, বুথিডং) অঞ্চলকে পূর্ববাংলার নবগঠিত পাকিস্তানের সাথে সংযুক্ত করার দাবি জানায়।
ব্রিটিশ প্রশাসনিক নথি অনুযায়ী (Burma Office Records, 1946–47)
১৯৪৭ সালে মাওলভী কাসিম, সুলতান আহমেদ, ও সিদ্দিক আহমদ নামে কয়েকজন আরাকানি মুসলিম নেতা জিন্নাহর কাছে একটি স্মারকলিপি পাঠান, যেখানে বলা হয় উত্তর আরাকান মুসলমান অধ্যুষিত অঞ্চলগুলো পূর্ব পাকিস্তানের সাথে একীভূত করা উচিত। কারণ আমাদের ধর্ম সংস্কৃতি ভাষা বাংলার মানুষের সঙ্গে অভিন্ন। জিন্নাহ নবগঠিত পাকিস্তানের স্থিতিশীলতা নিয়ে ছিলো প্রচন্ড চাপে। হিন্দু মুসলিম দাঙ্গা। সাথে বৃটিশ ও রেঙ্গুনের প্রশাসনের সঙ্গে সংঘাতের জড়িয়ে পড়ার ভয় ছিলো। যা রোহিঙ্গা মুসলমানদের স্বাধীনতা চুপ থেকে নীরবে প্রত্যাখ্যান করে। অথচ আরাকান ছিলো বাংলা সালতানাত ও প্রেসিডেন্সি বাংলার অংশ, রোহিঙ্গা মুসলমান' রা ভেবেছিলো পূর্ব বাংলার স্বাধীনতার অংশ তারাও হবে, কিন্তু কেউ তাদের দিকে ফিরেও তাকালো না। অনাদারে এক নৃশংস জুলুমের ভিতর শতকের পর শতক পিষ্ট হচ্ছে। অথচ সমস্ত পৃথিবীর মুসলমান' রা দেখেও না দেখার ভান করে বসে আছে আরাকানের মুসলমানদের উপর চলা নৃশংস জুলুম, উৎপীড়ন, নির্যাতন।
“The Muslim-majority areas of North Arakan should be merged with East Pakistan, as the people share religion, culture, and language with Bengal.”
(Source: Moshe Yegar, The Muslims of Burma, 1972, p. 26)
৪ জানুয়ারি ১৯৪৮ বৃটিশরা বার্মাকে স্বাধীনতা দেয়, এবং নতুন রাষ্ট্রের নাম হয় Union of Burma (বার্মা ইউনিয়ন)। চিরতরে রোহিঙ্গা মুসলমানদের স্বাধীনতা দাফন হয়ে যায় ১৯৪৮ সালে।
১৯৭৮ সালের রোহিঙ্গা সঙ্কট ও শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কূটনীতিক তৎপরতা।
১৯৭৮ সালে বার্মার (তৎকালীন মিয়ানমার) সামরিক সরকার “Operation Nagamin (Dragon King)” নামে এক অভিযান চালায়। এই অভিযানে আরাকানের মুসলমানদের বিরুদ্ধে ব্যাপক জাতিগত নিধন ও জোরপূর্বক বহিষ্কার অভিযান হয়। প্রায় ২ লক্ষ ৫০ হাজার রোহিঙ্গা মুসলমান পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়।
তথ্য সূত্র: United Nations High Commissioner for Refugees (UNHCR) Report, 1978; Moshe Yegar, 1982
জিয়াউর রহমান তখন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি। তিনি ঘটনাটি গণহত্যা নয়, বরং জাতিগত নিধন (ethnic expulsion) হিসেবে আন্তর্জাতিক মহলে তুলে ধরেন।
তার কূটনৈতিক পদক্ষেপগুলো ছিলো আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে দুর্দান্ত সমাধান। জাতিসংঘ ও ইসলামী সম্মেলন সংস্থা (OIC)–এ মিয়ানমারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান। কক্সবাজার ও টেকনাফে শরণার্থী শিবির স্থাপন করেন, যেখানে বাংলাদেশ সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সহায়তায় খাদ্য, চিকিৎসা ও আশ্রয় দেওয়া হয়। কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে মিয়ানমারের সাথে repatriation agreement স্বাক্ষর করেন (জুলাই ১৯৭৮) যার ফলে প্রায় ২ লক্ষেরও বেশি রোহিঙ্গা বার্মায় ফিরে যায়।
উদ্ধৃতি:
“President Ziaur Rahman acted swiftly to protect the refugees and brought Myanmar to the negotiation table through diplomatic pressure.”
(UNHCR Archives, 1979)
২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রাখাইন রাজ্যের উত্তরাঞ্চলে
একটি ভয়াবহ অভিযান শুরু করে, যার নাম দেওয়া হয় Clearance Operation (পরিষ্কার অভিযান) জাতিগত মুসলিম নিধনের মিশনে নামে। রোহিঙ্গা গণহত্যার সারা পৃথিবীতে সাড়া ফেলে। বাংলাদেশে প্রায় ১০ লক্ষ হিন্দু মুসলিম রোহিঙ্গা শরনার্থী হিসেবে আশ্রয় নেয়। ARSA (Arakan Rohingya Salvation Army) নামে এক রোহিঙ্গা সংগঠন নাকি সীমান্ত পুলিশ পোস্টে হামলা চালিয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এই অজুহাতে শুরু হয় পুরো রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর পরিকল্পিত জাতিগত নিধন। জাতিসংঘ এই ঘটনাকে “textbook example of ethnic cleansing” বলে ঘোষণা করে। UN Fact-Finding Mission (2018) বলেছে:
“The operations were executed with genocidal intent — to destroy the Rohingya as a group.”
১৯৮২ সালের “Burma Citizenship Law” পাসের মাধ্যমে। এই আইনে মিয়ানমারের নাগরিকত্বের অধিকার দেওয়া হয় শুধুমাত্র ১৩৫টি স্বীকৃত “জাতিগত গোষ্ঠী”-কে, কিন্তু “Rohingya” নামটি ইচ্ছাকৃতভাবে বাদ দেওয়া হয়। ফেলে ১৯৮২ সাল থেকেই রোহিঙ্গারা আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রহীন (stateless) হয়ে পড়ে। তাদের জাতীয় পরিচয়, ভোটাধিকার, শিক্ষা, জমির মালিকানা, এমনকি চলাচলের স্বাধীনতাও বাতিল করা হয়। রোহিঙ্গা মুসলমানদের ইতিহাস কেবল ২০শ শতকের নির্যাতন দিয়ে শুরু হয়নি। এটি অন্তত দুই শতাব্দীর ধারাবাহিক জাতিগত দমন, ধর্মীয় বৈষম্য ও রাষ্ট্রীয় সহিংসতার ফল। ১৭৮৪ সালের বোদাওপায়ার গণহত্যা থেকে শুরু করে ১৯শ শতকের ব্রিটিশ দমননীতি এই সময়ই রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব , জমি ও অস্তিত্ব ধ্বংস হতে শুরু করে যা এখনো চলমান। আজকে যে রোহিঙ্গা মুসলমানদের উপর গণহত্যা চালিয়ে যাচ্ছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও আরাকান বৌদ্ধ মিলিশিয়া, মগ' রা, তার বীজ বুনা হয়েছে ১৭শতকে।
রোহিঙ্গা মুসলমানদের স্বাধীনতার জন্য বাংলাদেশের করণীয় কী? বাংলাদেশসহ বিশ্বের সকল মুক্তিকামী মানুষদের ঐক্যবদ্ধ করে রোহিঙ্গা মুসলমানদের স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পরিসরে নানাবিধ কূটনীতিক ও শিল্পসাহিত্যের মধ্যে তৎপরতা চালানো। ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা ও মানবাধিকার নিয়ে যেভাবে পৃথিবীর সকল মুক্তিকামী মানুষ ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াই করে যাচ্ছে। আমরা যদি সুক্ষ্মভাবে দেখতে যাই মিয়ানমার কিংবা আরাকান আর্মি রোহিঙ্গা মুসলমানদের স্বাধীনতা ও নাগরিকত্ব কখনো দিবে না বরং জাতিগত বিদ্বেষ নিয়ে দিনের পর দিন গণহত্যা চালিয়ে যাবে। বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ রাখতে হলে আরাকানের রোহিঙ্গা মুসলমানদের স্বাধীনতার বিকল্প পথ বাংলাদেশের কাছে নেই। বাংলাদেশের আপামর জনগণের উচিত রোহিঙ্গাদের স্বাধীন সংগ্রামের জন্য সামাজিক সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তুলা।
‘নাফ থেকে কালাদান
মুক্ত হবে আরাকান’