মেন্যু
Menu

নীরবতার সামাজিকীকরণ: কীভাবে আমরা প্রজায় পরিণত হই

৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজের একটি সাধারণ ক্লাসরুমের দৃশ্য দিয়েই শুরু করা যাক। নির্ধারিত সময়ে শিক্ষক ক্লাসে এলেন না, কিংবা এলেও দশ মিনিট গল্প করে কোনোভাবে দায়সারা ক্লাস শেষ করে চলে গেলেন। একজন সচেতন শিক্ষার্থীর স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া কী হওয়া উচিত? তার মনে হওয়া উচিত আজ আমার শিক্ষার অধিকার ক্ষুণ্ণ হলো। যে জ্ঞান ও প্রাতিষ্ঠানিক সেবা পাওয়ার জন্য আমি এখানে এসেছি, তা থেকে আমি বঞ্চিত হলাম। কিন্তু বাস্তবে আমাদের ক্লাসরুমে কী ঘটে?

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, শিক্ষার্থীরা এতে বিরক্ত বা ক্ষুণ্ণ হলেও এটা তাদের কাছে স্বাভাবিক মনে হয়। শিক্ষকের ক্লাসে না আসা, বা তার দায়সারা ভাবে ক্লাস নেয়াটাকে শিক্ষার্থীরা অতি স্বাভাবিক বা একটা নিয়মিত ঘটনা হিসেবে দেখে।

প্রশ্ন হলো, একটি সুস্পষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়ম বা অধিকারবঞ্চনাকে আমরা কেন 'একদম স্বাভাবিক ঘটনা' হিসেবে ধরে নিচ্ছি? শিক্ষক ঠিকমতো না পড়ালে বা ক্লাস ফাঁকি দিলে আমাদের কেন মনে হয় না যে এটি একটি বঞ্চনা? কেন আমাদের ভেতরে কোনো নাগরিক ক্ষোভ বা অসন্তোষ তৈরি হয় না? কেন আমরা এর বিরুদ্ধে কথা বলা তো দূরের কথা, অন্যায্যতার বিরুদ্ধে কথা বলার কোনো প্রয়োজনই অনুভব করি না? আমাদের ক্লাসরুমগুলোর অধিকাংশ শিক্ষার্থী টু শব্দটুকু করে না। কেউ হাত তুলে শিক্ষকের গাফিলতি নিয়ে প্রশ্ন তোলে না। আমাদের এই নীরবতার কারণ কী?

কারণ, আমাদের প্রতিবাদ করার মতো নাগরিক 'মেরুদণ্ড' তৈরিই হয়নি। আর সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, আমরা এই নীরবতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার কোনো প্রয়োজনও অনুভব করি না। কারণ, কর্তৃপক্ষের এই অসংগতি বা অনিয়ম আমাদের কাছে শতভাগ 'স্বাভাবিক' বলে মনে হয়। আমরা ধরে নিই, এ দেশে এমনই হয়, এটাই নিয়ম। অথচ এই ক্লাসরুম কিংবা শিক্ষকের দায়িত্বহীনতার উদাহরণটি আসলে হিমশৈলের চূড়া মাত্র। আসল সংকটটি ক্লাসরুমে সীমাবদ্ধ নয়; আসল সংকটটি আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে আছে। ছোট ছোট প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়মকে 'স্বাভাবিক' বলে মেনে নেওয়ার এই মনস্তাত্ত্বিক অভ্যাসই কালক্রমে একটি জনগোষ্ঠীকে বৃহৎ রাষ্ট্রীয় অন্যায়, গুম, খুন এবং দীর্ঘমেয়াদী ফ্যাসিবাদের সামনে অন্ধ ও প্রতিবাদহীন করে তোলে।

মনস্তত্ত্ব ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের এক নিদারুণ সত্য হলো, কোনো স্বৈরাচার বা ফ্যাসিবাদী শাসক একদিনে মহীরুহ হয়ে ওঠে না। সমাজ যখন ছোট ছোট অনিয়মকে মেনে নিতে শুরু করে, শাসক তখন তার অন্যায়ের মাত্রা এক ধাপ বাড়িয়ে দেয়। যখন দেখে সমাজ সেই বড় অন্যায়কেও হজম করে নিয়েছে, তখন সে রাষ্ট্রকে এক চূড়ান্ত জিম্মিদশায় নিয়ে যায়।

ফরাসি সমাজতত্ত্ববিদ পিয়েরে বুর্দিয়ু (Pierre Bourdieu)-র একটি বিখ্যাত তত্ত্ব আছে, 'হ্যাবিটাস' (Habitus)। হ্যাবিটাস বলতে বোঝায় শৈশব থেকে পরিবার ও সমাজ থেকে অর্জিত কিছু অলিখিত আচরণগত অভ্যাস, যা আমাদের অবচেতন মনে এমন এক স্থায়ী চিন্তা-কাঠামো তৈরি করে দেয়, যার চশমা দিয়েই আমরা সারা জীবন বাইরের বাস্তবতাকে বিচার করি।

পরিবারে একটি শিশু যখন প্রথম থেকেই দেখতে পায় যে কর্তৃপক্ষকে প্রশ্ন করা 'বেয়াদবি', বয়সে বা পদে বড় কেউ ভুল করলেও তা চুপচাপ মেনে নেওয়াই নিয়ম; তখন সেই শিশুটি বড় হয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা কর্মক্ষেত্রে গিয়েও একই মনস্তত্ত্ব বহন করে। শিক্ষক যখন ক্লাসে ফাঁকি দেন বা দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হন, তখন শিক্ষার্থীর অবচেতন মন এভাবে চিন্তা করতে শুরু করে: 'তিনি তো শিক্ষকের পদে আছেন, অর্থাৎ তিনি ক্ষমতার জায়গায় আছেন। আর ক্ষমতার জায়গায় থাকা কারো বিরোধিতা করা নিশ্চয়ই বেয়াদবি বা বিপদ ডেকে আনার শামিল।'

বুর্দিয়ু এই মনস্তত্ত্বের দ্বিতীয় পর্যায়কে বলেছেন 'ডোক্সা' (Doxa)। ডোক্সা হলো এমন এক চরম মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা, যেখানে সমাজে চলতে থাকা অসংগতি বা অন্যায্য বিষয়গুলো মানুষের কাছে এতটাই চিরন্তন ও স্বাভাবিক মনে হতে শুরু করে যে, মানুষ সেগুলোকে আর 'অনিয়ম' বলে চিহ্নিত করতেই পারে না। শিক্ষকের ক্লাস না নেওয়া, সরকারি অফিসে বকশিশ ছাড়া কাজ না হওয়া, কিংবা যেকোনো ক্ষমতার কাছে সাধারণ মানুষের অপদস্থ হওয়া, এই সব কিছুকে আমরা আমাদের মানসিকতায় 'ডোক্সা' বা 'স্বাভাবিক নিয়ম' হিসেবে গেঁথে নিয়েছি। ফলে আমাদের মন থেকে প্রতিবাদ করার বোধটাই হারিয়ে গেছে; আমরা অন্যায্য পরিস্থিতিকে পরিবর্তন করার বদলে তার সাথেই খাপ খাইয়ে নেওয়াকে বিজ্ঞের মতো আচরণ বলে ধরে নিই।

সমাজ যখন ছোট ছোট দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারকে 'সিস্টেমের অংশ' বলে মেনে নেয়, তখন সেটির ওপর ভর করেই গড়ে ওঠে বৃহৎ রাষ্ট্রীয় অসংগতি। গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা বিপুল অঙ্কের অর্থ পাচারের মতো ভয়ংকর অপরাধগুলোও তখন একসময় মানুষের কাছে আর আলাদা করে ধাক্কা দেয় না।

এই যে যেকোনো অন্যায়ের সামনে আমাদের কথা বলার 'মেরুদণ্ড' হারিয়ে যায়, এই মানসিক পঙ্গুত্ব আমরা কোথা থেকে অর্জন করি? এর উত্তর রয়েছে আমাদের পারিবারিক সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ার গভীরে। রাজনৈতিক সামাজিকীকরণ নিয়ে বিভিন্ন গবেষণা নির্দেশ করে যে, একটি শিশু শৈশবে তার পরিবারের ভেতরের ক্ষমতা ও আনুগত্যের চর্চা দেখেই মূলত পরবর্তী রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনের পাঠ গ্রহণ করে।

আমাদের সমাজ ও পারিবারিক কাঠামোয় 'প্রশ্নহীন আনুগত্য' প্রকাশ করাকেই প্রায়শ ভদ্রতার একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়; 'চুপ থাকা' বা নীরব থাকাকে ধরে নেওয়া হয় শিষ্টাচারের সর্বোচ্চ স্তর হিসেবে। মনস্তাত্ত্বিক থিওডর অ্যাডর্নো (Theodor W. Adorno) তাঁর 'অথরিটারিয়ান পারসোনালিটি থিওরি'-তে দেখিয়েছেন যে, যেসব পরিবারে কড়া শৃঙ্খলা এবং কর্তৃপক্ষের সব সিদ্ধান্তকে বিনাবাক্যে মেনে নেওয়াকে পরম সত্য মনে করা হয়, সেখানে মূলত 'কর্তৃত্বনির্ভর ব্যক্তিত্ব' গড়ে ওঠে। এই সন্তানরা বড় হয়ে ক্ষমতার সামনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে মাথা নত করতে শেখে।

এর সাথে যুক্ত হয় বুর্দিয়ুর 'প্রতীকী সহিংসতা' (Symbolic Violence)-র ধারণা। এই লেখায় আমরা এই সামগ্রিক প্রবণতাকে – ঔপনিবেশিক শাসন ও পরবর্তী স্বৈরাচারী ইতিহাসের অভিজ্ঞতা থেকে জন্ম নেওয়া পারিবারিক ক্ষমতা-ভীতির সংস্কৃতিকে – আপাতত 'উত্তর-ঔপনিবেশিক পারিবারিক কর্তৃত্ববাদ' নামে চিহ্নিত করছি; এটা কোনো প্রতিষ্ঠিত একাডেমিক পরিভাষা নয়, বরং উপরোক্ত তত্ত্বগুলোর আলোকে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট বোঝার একটা প্রস্তাবিত কাঠামো মাত্র। ঔপনিবেশিক শাসন ও পরবর্তী স্বৈরাচারী ইতিহাসের নির্মম অভিজ্ঞতার কারণে আমাদের অভিভাবক প্রজন্ম রাষ্ট্র বা ক্ষমতাকে ভয় পান। সন্তানদের প্রতি গভীর ভালোবাসা ও নিরাপত্তার তাগিদ থেকেই তাঁরা ছোটবেলা থেকে শেখান: 'ঝামেলা এড়িয়ে চলো', 'রাজনীতি নোংরা জিনিস', 'ক্ষমতাবানদের ঘাঁটাতে যেও না'।

আমাদের সমাজে ব্যাপকভাবেই সন্তানদের যেকোনো ধরনের ঝুঁকি বা সংঘাত এড়িয়ে চলতে শেখানো হয়। ভালোবাসার মোড়কে মোড়ানো এই নিরাপত্তামূলক শিক্ষাটি বাস্তবে সন্তানের ভেতরের 'পলিটিক্যাল ও সিভিক এফিক্যাসি' (Political Efficacy) বা সামাজিক পরিবর্তন আনার আত্মবিশ্বাসকে সম্পূর্ণরূপে গুঁড়িয়ে দেয়। ফলাফল? আমরা এমন এক বিশাল জনগোষ্ঠী তৈরি করি, যাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা হয়তো বাড়ে, কিন্তু অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মতো বা স্বাধীন নাগরিক হিসেবে কথা বলার মতো 'বৌদ্ধিক মেরুদণ্ড' তৈরি হয় না।

পারিবারিক ও প্রাতিষ্ঠানিক স্তরে শেখা এই 'গা সয়ে যাওয়া' মনস্তত্ত্বের সবচেয়ে বড় শিকার বাংলাদেশ দেখেছে বিগত শেখ হাসিনার টানা ১৫ বছরের শাসনকালে। শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী রেজিম কোনো জাদুমন্ত্রে রাতারাতি গড়ে ওঠেনি। এটি ধাপে ধাপে তৈরি হয়েছে আমাদের সম্মিলিত নীরবতার ওপর ভর করে। প্রথম যখন নিরপেক্ষ নির্বাচনকে ধ্বংস করে সাজানো নির্বাচন চালু করা হলো, সমাজ সেটাকে ক্ষোভের সাথে দেখলেও শেষ পর্যন্ত মেনে নিয়েছিল। ফলস্বরূপ, পরবর্তীতে ২০১৮ সালে 'দিনের ভোট রাতে' হওয়া কিংবা ২০২৪ সালে 'আমি আর ডামির' হাস্যকর তামাশাও আমাদের গা সয়ে গেল।

রাষ্ট্র যখন ইলিয়াস আলী আর চৌধুরী আলমের মতো রাজনৈতিক নেতাদের গুম করা শুরু করল, মানুষ প্রথমে আঁতকে উঠলেও ধীরে ধীরে সেটাকেও 'রাজনৈতিক বাস্তবতা' বলে ধরে নিল। 'আয়নাঘর' নামের মানবাধিকারবিরোধী ভয়ংকর বন্দিশালা বছরের পর বছর ধরে চালু রইল, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাবাহিনী প্রকাশ্যে নাগরিক তুলে নিয়ে গেল, বিচারবহির্ভূত হত্যা বা 'বন্দুকযুদ্ধ'কে স্বাভাবিক বলে ধরে নেওয়া হলো। আমরা প্রতিবাদ করিনি; বরং পরিবার থেকে শেখা সেই পুরোনো আপসকামী মন্ত্র জপেছি, 'আই হেইট পলিটিক্স।'

হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যাংক থেকে লুট হয়ে গেল, মেগা প্রজেক্টের নামে মেগা-দুর্নীতি স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হলো। আমরা কেবল চায়ের দোকানে বসে একটু আক্ষেপ করলাম, কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্রের কাছে কোনো জবাবদিহিতা চাইলাম না। কেন একটি বিপুল জনসংখ্যার দেশ দীর্ঘ দেড় দশক ধরে এত বড় বড় রাষ্ট্রীয় অপরাধকে মুখ বুজে সহ্য করে গেল?

কারণ, আমাদের 'রেসপন্স থ্রেশহোল্ড' বা অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংবেদনশীলতার মাত্রা বহু আগেই ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল। যে শিক্ষার্থী ক্লাসরুমে শিক্ষকের গাফিলতির বিরুদ্ধে কথা বলতে ভয় পায়, কিংবা যে নাগরিক স্থানীয় অফিসের পিয়নের ঘুষ চাওয়াকে 'নিয়তি' মনে করে, তার পক্ষে রাষ্ট্রযন্ত্রের মাধ্যমে সংঘটিত 'গুম' বা 'খুন'-এর বিরুদ্ধে গিয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে দাঁড়ানো সম্ভব ছিল না। আমরা আত্ম-সংযম বা স্ব-সেন্সরশিপের (Self-censorship) এমন এক সংস্কৃতিতে প্রবেশ করেছিলাম, যেখানে আমরা অন্যায্যতাকেই জীবনের 'বাস্তবতা' বলে স্বান্তনা পেতাম।

২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে একটি আপাত স্বৈরাচারী কাঠামোর পতন ঘটেছে ঠিকই, কিন্তু আমাদের প্রশ্ন তুলতে হবে, যে মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে সেই ফ্যাসিবাদের জন্ম হয়েছিল, সেই 'গা সয়ে যাওয়া' মানসিকতা কি আমাদের ভেতর থেকে মুছে গেছে?

বর্তমান প্রেক্ষাপটে বা পরিবর্তিত পরিস্থিতিতেও যখন আমরা দেখি প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে বিশৃঙ্খলা, মব জাস্টিসের নামে আইনি প্রক্রিয়ার লঙ্ঘন, কিংবা প্রশাসনিক স্তরে নতুন চেহারায় নতুন ধরনের অনিয়ম ও চাঁদাবাজির শুরু, তখনও যদি আমাদের প্রতিক্রিয়া আগের মতোই নিস্পৃহ থাকে, তবে বুঝতে হবে পরিবর্তনটা কেবল উপর দিয়েই হয়েছে; আমাদের অবচেতন মনের 'ডোক্সা' বা গোলামীর অভ্যাস বদলায়নি।

আমরা যদি মনে করি, কেবল রাষ্ট্রপ্রধান কিংবা সরকারের মুখ বদলে দিলেই একটি সমাজ গণতান্ত্রিক বা দুর্নীতিমুক্ত হয়ে যাবে, তবে আমরা বোকার স্বর্গে বাস করছি। যে সমাজে নাগরিকরা যেকোনো ছোট-বড় অনিয়মকে 'এ দেশে এমনই হয়' বলে মেনে নিতে অভ্যস্ত, সেখানে আজ হোক কিংবা দশ বছর পর, অন্য যেকোনো শক্তিশালী গোষ্ঠী বা শাসক ঠিক একই উপায়ে নতুন রূপের ফ্যাসিবাদের জন্ম দিতে পারে।

অন্যায়ের সাথে আপস করা এবং ছোট ছোট অসংগতিকে গা সয়ে নেওয়ার এই মানসিকতার কারণে রাষ্ট্র ও সমাজ হিসেবে আমরা কী হারাচ্ছি?

১. নাগরিকত্ব প্রজা মানসিকতায় রূপান্তর: রাষ্ট্রবিজ্ঞান অনুযায়ী, প্রজা কেবল নির্দেশ পালন করে, আর নাগরিক জবাবদিহিতা চায়। আমরা ক্রমান্বয়ে একটি সচেতন নাগরিক সমাজ থেকে অনুগত প্রজা বা মনস্তাত্বিক গোলামে পরিণত হচ্ছি।
২. মেধা ও প্রতিভার পাচার (Brain Drain): যেসব তরুণ তাদের ক্লাসরুমে বা রাষ্ট্রে কাজের মূল্যায়ন দেখে না এবং দেখে যে সর্বত্র অসংগতিই নিয়ম আর এই অসঙ্গতির ফলে যারা অযোগ্য তারা সুবিধা পাচ্ছে, আর যোগ্যরা অবমূল্যায়িত হচ্ছে, তখন তারা রাষ্ট্র মেরামতের আশা ছেড়ে দিয়ে সুযোগ পেলেই দেশত্যাগে সচেষ্ট হয়।
৩. প্রতিষ্ঠানের প্রাতিষ্ঠানিক মৃত্যু: বিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়, আদালত, পুলিশ কিংবা নির্বাচন কমিশন, যেকোনো প্রতিষ্ঠান তখনই কার্যকর থাকে, যখন তার সেবাগ্রহীতারা অসংগতির সামনে সোচ্চার হয়। সমাজ যখন নিশ্চুপ থাকে, তখন প্রতিষ্ঠানগুলো নাগরিকদের সেবা দেওয়ার বদলে শাসক বা কায়েমি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর হাতিয়ারে পরিণত হয়।

একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত বা ভেঙে পড়া রাষ্ট্রকে যদি সত্যিই টেনে তুলতে হয়, তবে কেবল সংবিধান বা আইনের কাগজ পরিবর্তন করলে চলবে না; পরিবর্তন আনতে হবে আমাদের মানসিকতার গোড়াতে।

১. পারিবারিক শিক্ষার দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন
পরিবারে সন্তানদের আনুগত্য নয়, বরং যুক্তিভিত্তিক চিন্তার স্বাধীনতা দিতে হবে। শিশু যদি পারিবারিক সিদ্ধান্ত নিয়ে যৌক্তিক দ্বিমত পোষণ করে, তাকে বেয়াদবি হিসেবে না দেখে গঠনমূলক সমালোচনার সূচনা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। সুরক্ষার দোহাই দিয়ে সন্তানকে স্বার্থপর ও ভীতু নাগরিক বানানোর এই আত্মঘাতী অভিভাবকত্ব বন্ধ করতে হবে।

২. অন্যায্যতাকে 'অন্যায্য' বলার সামাজিক মানসিকতা তৈরি
ক্লাসরুমে শিক্ষকের অবহেলা হোক, সরকারি অফিসের ঘুষ হোক কিংবা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের স্বৈরাচারী আচরণ, যেকোনো অসংগতিকে 'সিস্টেমের অংশ' বা 'স্বাভাবিক' বলা বন্ধ করতে হবে। যা অন্যায়, তা অন্যায়ই। এই মানসিক অবস্থান তৈরি করা নাগরিক হিসেবে আমাদের প্রথম দায়িত্ব।

৩. 'সিভিক এফিক্যাসি' বা নাগরিক ক্ষমতার পুনর্জাগরণ
নাগরিকদের বিশ্বাস করতে হবে যে, তাঁদের একা একজন হলেও কথা বলাটা গুরুত্বপূর্ণ। ছোট ছোট প্রতিবাদই কালক্রমে গণজোয়ার তৈরি করে। ছোট অসংগতির সামনে কথা বলার এই সাহসটুকুই পরবর্তীতে বড় রাজনৈতিক অন্যায় প্রতিরোধ করার জাতীয় প্রতিরোধক (Resistance) হিসেবে কাজ করে।

একটি সমাজে স্বৈরাচার কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক পচন আকাশ থেকে হঠাৎ নাজিল হয় না। তার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয় প্রতিদিনের ছোট ছোট আপসগুলোর মাধ্যমে।

আমরা যখন কোনো শিক্ষকের ক্লাস ফাঁকি দেওয়া কিংবা দায়িত্বহীনতার সামনে নিশ্চুপ থাকি, যখন আমরা স্থানীয় এক নেতার ছোটখাটো ক্ষমতার দাপটকে মুখ বুজে সহ্য করি, যখন আমরা ভাবি 'কথা বলে ঝামেলা বাড়ানোর দরকার কী', তখনই মূলত আমরা একজন হবু স্বৈরাচারকে বার্তা দিই যে, 'আমরা প্রস্তুত, আপনি আরও বড় অন্যায় নিয়ে আসুন, আমরা সেটাও গিলে নেব।'

হাসিনা রেজিমের অপশাসন, গুম, খুন কিংবা বিপুল অর্থ পাচার আমাদের গা সয়ে গিয়েছিল কারণ আমরা আমাদের প্রতিবাদের মেরুদণ্ডটিকে শৈশব থেকেই একটু একটু করে বিকিয়ে দিতে শিখেছিলাম।

যদি আমরা সত্যিই এক নতুন, বিচারসম্মত ও সুস্থ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চাই, তবে আমাদের অন্যায়ের প্রতি এই 'গা সয়ে যাওয়া'র ব্যাধি দূর করতে হবে। আমাদের বুঝতে হবে, যেকোনো অসংগতিকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়া কোনো বুদ্ধিমত্তা নয়, এটি আদতে নিজের এবং পরবর্তী প্রজন্মের নাগরিক অধিকারকে নিজ হাতে বলি দেওয়ার এক নীরব কৌশল।

বিবলিওগ্রাফি

Adorno, T. W., Frenkel-Brunswik, E., Levinson, D. J., & Sanford, R. N. (1950). The Authoritarian Personality. New York: Harper & Row.

Almond, G. A., & Verba, S. (1963). The Civic Culture: Political Attitudes and Democracy in Five Nations. Princeton: Princeton University Press.

Bourdieu, P. (1977). Outline of a Theory of Practice. Cambridge: Cambridge University Press.

Bourdieu, P. (1990). The Logic of Practice. Stanford: Stanford University Press.

Hyman, H. H. (1959). Political Socialization: A Study in the Psychology of Political Behavior. Glencoe, IL: Free Press.