মেন্যু
Menu

বাব আল-মান্দাব: নতুন ভূরাজনৈতিক সংকটে মধ্যপ্রাচ্য

১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

গত কয়েক দিনে মধ্যপ্রাচ্যে এমন কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে, যা এই অঞ্চলের চলমান সংকটকে নতুন করে বিশ্লেষণ করতে বাধ্য করছে। এতদিন ইরানকে ঘিরে যে সংকট তৈরি হয়েছে, সেটিকে মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সামরিক সংঘাত, নিষেধাজ্ঞা এবং কূটনৈতিক অচলাবস্থার আলোকে দেখা হচ্ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ দেখাচ্ছে, বিষয়টি এখন আর শুধু ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সংঘাতের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামো, ইরাকের ভূখণ্ড, ইয়েমেনের হুতি নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল, লোহিত সাগর এবং বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ বাব আল-মান্দাব পর্যন্ত। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা। গত ১০-১১ সেপ্টেম্বর সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ ইস্ট-ওয়েস্ট অয়েল পাইপলাইন ড্রোন হামলার পর সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।¹ প্রায় ১,২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাইপলাইনটি সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলের তেলক্ষেত্রকে পশ্চিম উপকূলের ইয়ানবু বন্দরের সঙ্গে যুক্ত করে এবং হরমুজ প্রণালী এড়িয়ে লোহিত সাগরের মাধ্যমে তেল রপ্তানির একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে। সৌদি আরবের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, হামলাটি ইরাকের ভূখণ্ড থেকে পরিচালিত হয়েছিল। ইরাকও হামলার উৎস তাদের ভূখণ্ড বলে নিশ্চিত করেছে এবং তদন্তের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে।²

এই ঘটনাটির গুরুত্ব বুঝতে হলে সৌদি আরবের জ্বালানি রপ্তানি কাঠামোটা একটু বুঝতে হবে। সৌদি আরব বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল উৎপাদক ও রপ্তানিকারক দেশ। দেশটির অধিকাংশ বড় তেলক্ষেত্র পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত। ঐতিহ্যগতভাবে সমুদ্রপথে এসব তেল বিশ্ববাজারে পাঠানোর অন্যতম প্রধান পথ হলো পারস্য উপসাগর এবং হরমুজ প্রণালী। কিন্তু বর্তমান সংঘাতে হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে কমে গেছে। ৯ সেপ্টেম্বরের তথ্য অনুযায়ী, একদিনে মাত্র ছয়টি কমোডিটি জাহাজ হরমুজ অতিক্রম করেছে, যেখানে আগের দশ দিনের গড় ছিল প্রায় ১২টি। একই সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১০০ ডলারের ওপরে উঠে গেছে।³ ফলে সৌদি আরবের জন্য লোহিত সাগর হয়ে বিকল্প রপ্তানি ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন সেই বিকল্প ব্যবস্থারই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু এই মুহূর্তে যখন হরমুজ কার্যত অচলাবস্থার মধ্যে রয়েছে, ঠিক তখনই সৌদি আরবের ওই বিকল্প অবকাঠামোতে হামলা এবং তার সাময়িক বন্ধ হয়ে যাওয়া মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে।

এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে, যা পুরো বিষয়টিকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। ইয়েমেনের হুতিরা সাম্প্রতিক সময়ে দেশটির পশ্চিমাঞ্চলে দ্রুত অগ্রসর হয়ে লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রবেশপথের দিকে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করেছে। তারা গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মোখা দখল করেছে এবং তার পরের দিনই বাব আল-মান্দাবের প্রবেশমুখে অবস্থিত কৌশলগত মায়ুন বা পেরিম দ্বীপের নিয়ন্ত্রণও নিয়েছে বলে একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম নিশ্চিত করেছে।⁴ বাব আল-মান্দাব হলো এমন একটি সংকীর্ণ সামুদ্রিক পথ, যা লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগর ও ভারত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করে। এর উত্তরেও রয়েছে সুয়েজ খাল। ফলে এই একটি পথের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে সমুদ্রবাণিজ্য ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, হুতিদের এই অগ্রগতি তাদের বাব আল-মান্দাবের ওপর প্রভাব আরও বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করেছে এবং সৌদি আরবের তেল রপ্তানির ওপরও নতুন চাপ তৈরি করছে।

অর্থাৎ বিষয়টি এখন এমন একটি পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে সৌদি আরবের জন্য একের পর এক বিকল্প পথ সংকুচিত হয়ে আসছে। হরমুজ প্রণালীতে অস্থিরতা তৈরি হলে সৌদি আরব তার পূর্বাঞ্চলের তেলকে ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের মাধ্যমে পশ্চিম উপকূলে নিয়ে গিয়ে লোহিত সাগর দিয়ে রপ্তানি করতে পারে। কিন্তু একই সময়ে যদি লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রবেশপথ বাব আল-মান্দাবও ঝুঁকির মধ্যে পড়ে, তাহলে সেই বিকল্প পথের কার্যকারিতাও প্রশ্নের মুখে পড়ে। এ কারণেই হুতিদের সাম্প্রতিক সামরিক অগ্রগতি শুধু ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধের আরেকটি অধ্যায় নয়; এটি মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি ভূরাজনৈতিক ঘটনা। বিশ্লেষকদের অনেকেই বলছেন, হুতিদের অগ্রগতি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নতুন কৌশলগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে, বিশেষ করে এমন সময়ে যখন হরমুজ প্রণালীও ব্যাপকভাবে বিঘ্নিত।

এখন প্রশ্ন হলো, হুতিরা কেন সৌদি আরবকে এত গুরুত্ব দিয়ে লক্ষ্য করছে এবং এর সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক কোথায়? হুতিরা ইয়েমেনের একটি রাজনৈতিক ও সামরিক আন্দোলন, যার শিকড় দেশটির জাইদি শিয়া সম্প্রদায়ের মধ্যে। ২০১৪ সালে তারা রাজধানী সানা দখল করার পর ইয়েমেনের রাজনৈতিক সংকটের কেন্দ্রীয় শক্তিতে পরিণত হয়। পরবর্তী সময়ে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সমর্থন দিয়ে হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পরিচালনা করে। দীর্ঘস্থায়ী এই সংঘাত ইয়েমেনকে বিশ্বের অন্যতম বড় মানবিক সংকটে পরিণত করেছে। ফলে হুতিদের সঙ্গে সৌদি আরবের বিরোধ কোনো সাম্প্রতিক ঘটনা নয়। বরং এটি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক, সামরিক ও আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার ফল। একই সঙ্গে হুতিদের সঙ্গে ইরানের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক ও সামরিক সম্পর্কও বহুদিনের। যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো ইরানের বিরুদ্ধে হুতিদের অস্ত্র, প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ ও সামরিক সহায়তা দেওয়ার অভিযোগ করে আসছে। তবে হুতিদের প্রতিটি সিদ্ধান্ত সরাসরি ইরানের নির্দেশে হয়েছে এমন দাবি করার ক্ষেত্রেও সতর্কতা প্রয়োজন, কারণ হুতিদের নিজস্ব রাজনৈতিক ও স্থানীয় স্বার্থ রয়েছে। বরং বলা যায়, ইরান ও হুতিদের স্বার্থের মধ্যে একটি শক্তিশালী কৌশলগত সমন্বয় তৈরি হয়েছে।

এই সম্পর্কের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি বোঝা যায় ভূগোলের দিকে তাকালে। ইরানের হাতে রয়েছে হরমুজ প্রণালীর ভৌগোলিক সুবিধা, আর ইয়েমেনের হুতিদের অবস্থান তাদের বাব আল-মান্দাবের ওপর চাপ তৈরির সক্ষমতা দিয়েছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক chokepoint একই বৃহত্তর সংঘাতের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাচ্ছে। ইরান সরাসরি সব জায়গায় সামরিকভাবে উপস্থিত না থেকেও তার মিত্র ও অংশীদার গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে বিভিন্ন অঞ্চলে চাপ সৃষ্টি করতে পারে। ইরাকের বিভিন্ন ইরানপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠী, লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং ইয়েমেনের হুতিদের ক্ষেত্রে এই আঞ্চলিক নেটওয়ার্কের বিষয়টি বারবার আলোচনায় এসেছে। সাম্প্রতিক সৌদি পাইপলাইন হামলার ক্ষেত্রেও ইরানের সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র অভিযোগ করেছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, হামলার পেছনে ইরান থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে ইরান সরাসরি দায় স্বীকার করেনি এবং ইরাকি সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী হামলাটি ইরাকের ভূখণ্ড থেকে হয়েছে। ফলে এখানে সবচেয়ে দায়িত্বশীল বিশ্লেষণ হবে, হামলার সঙ্গে ইরানপন্থী গোষ্ঠীগুলোর সম্ভাব্য যোগসূত্র এবং ইরানের কৌশলগত স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা, কিন্তু সরাসরি নির্দেশের বিষয়টিকে স্বাধীনভাবে প্রমাণিত তথ্য ছাড়া চূড়ান্ত সত্য হিসেবে না বলা।

এর মধ্যে সৌদি আরবের সাম্প্রতিক নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক অবস্থানও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তার প্রধান স্তম্ভ ছিল যুক্তরাষ্ট্র। বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতি, নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং অস্ত্র সরবরাহের মাধ্যমে নিজের কৌশলগত প্রভাব বজায় রেখেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তিত বাস্তবতা সৌদি আরবসহ আরব দেশগুলোকে নিজেদের নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদারের উদ্যোগ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তিন দেশ যৌথ প্রতিরক্ষা সহযোগিতার আওতায় একটি সচিবালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়ে সম্মত হয়েছে। এই উদ্যোগকে সরাসরি ইরানবিরোধী সামরিক জোট হিসেবে চূড়ান্তভাবে চিহ্নিত করার আগে সতর্ক থাকা প্রয়োজন, কিন্তু ইরানের দৃষ্টিকোণ থেকে সৌদি আরবের নতুন আঞ্চলিক নিরাপত্তা সহযোগিতা নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পরিবর্তন।

কারণ ইরানের জন্য সমস্যা শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি নয়। যদি যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র সৌদি আরব নিজেদের সামরিক সক্ষমতা বাড়ায় এবং তুরস্ক ও পাকিস্তানের মতো গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা গভীর করে, তাহলে ভবিষ্যতে ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব সীমিত করার জন্য একটি নতুন নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি হতে পারে। এই বাস্তবতায় ইরানের সম্ভাব্য কৌশল হতে পারে সরাসরি সৌদি আরবের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে না গিয়ে বিভিন্ন আঞ্চলিক অংশীদারের মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি করা। হুতিদের মাধ্যমে ইয়েমেন ও বাব আল-মান্দাব অঞ্চলে চাপ, ইরাকের ইরানপন্থী গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে ইরাক থেকে চাপ এবং হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে সামুদ্রিক চাপ একই বৃহত্তর কৌশলের বিভিন্ন উপাদান হতে পারে। এখানে 'প্রক্সি যুদ্ধ' শব্দটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই ধরনের সংঘাতে রাষ্ট্রগুলো সবসময় সরাসরি যুদ্ধে না গিয়ে স্থানীয় সশস্ত্র গোষ্ঠী ও মিত্রদের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে চাপে রাখে।

এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে, এই কৌশল কতটা সফল হচ্ছে। একদিকে ইরান অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত কঠিন অবস্থার মধ্যে রয়েছে। দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা, সামরিক ব্যয় এবং চলমান সংঘাত তার অর্থনীতির ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করেছে। অন্যদিকে ইরানের কৌশল হচ্ছে, সেই চাপের একটি অংশ প্রতিপক্ষের ওপর ফিরিয়ে দেওয়া। যদি ইরানের ওপর চাপ বাড়ে, কিন্তু তার প্রতিক্রিয়ায় সৌদি আরবের তেল সরবরাহ ব্যাহত হয়, হরমুজে জাহাজ চলাচল কমে যায় এবং বাব আল-মান্দাবও অনিরাপদ হয়ে পড়ে, তাহলে সংঘাতের অর্থনৈতিক মূল্য শুধু ইরানকে বহন করতে হচ্ছে না। সেই মূল্য সৌদি আরব, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ এবং এশিয়ার জ্বালানি আমদানিকারক দেশগুলোকেও দিতে হচ্ছে। এ কারণেই তেলের দাম ১০০ ডলারের ওপরে উঠে যাওয়া কেবল একটি বাজারগত ঘটনা নয়; এটি মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার সরাসরি অর্থনৈতিক প্রতিফলন। আন্তর্জাতিক বাজার-পর্যবেক্ষকরা জানাচ্ছেন, সাম্প্রতিক সংঘাতে বৈশ্বিক বাজার থেকে বিপুল পরিমাণ তেল সরবরাহ কমে গেছে এবং বাজারে মজুতও দ্রুত কমছে।

এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলার পর রিয়াদ ওয়াশিংটনের কাছ থেকে সহায়তা চেয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি বড় আকারের নতুন সামরিক অভিযান শুরু করার পরিবর্তে গোয়েন্দা তথ্য ও অন্যান্য সহায়তার ওপর জোর দিচ্ছে। ট্রাম্পও সরাসরি সামরিক অভিযানে যাওয়ার ব্যাপারে সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। এর পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বাস্তব কৌশলগত হিসাব থাকতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযান শুরু করলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও অর্থনৈতিক ব্যয় বাড়বে, মার্কিন সেনাদের ঝুঁকি বাড়বে এবং তারপরও ইরানের প্রক্সি নেটওয়ার্ককে পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় করা সম্ভব হবে কি না, তা অনিশ্চিত। ফলে ওয়াশিংটনের সামনে এখন কঠিন সমীকরণ হলো, একদিকে সৌদি আরবকে নিরাপত্তা নিশ্চয়তা দেওয়া, অন্যদিকে সরাসরি এমন একটি যুদ্ধে জড়িয়ে না পড়া যার শেষ কোথায় তা স্পষ্ট নয়।

এই সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বৈশ্বিক বাণিজ্য। বাব আল-মান্দাব ও সুয়েজ খাল আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ করিডোর। হুতিদের হামলার কারণে এর আগেও বহু জাহাজকে লোহিত সাগর এড়িয়ে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে দীর্ঘতর পথে যেতে হয়েছে। এতে পরিবহন সময় ও ব্যয় বেড়েছে। এখন যদি হরমুজের পাশাপাশি বাব আল-মান্দাবও দীর্ঘস্থায়ীভাবে অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে, তাহলে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর চাপ আরও বাড়বে। জ্বালানি পরিবহনের পাশাপাশি খাদ্য, কাঁচামাল, শিল্পপণ্য এবং অন্যান্য ভোগ্যপণ্যের পরিবহন ব্যয়ও বাড়তে পারে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাব শেষ পর্যন্ত ইউরোপের মূল্যস্ফীতি থেকে শুরু করে এশিয়ার আমদানি ব্যয় পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে।

এই জায়গায় বাংলাদেশের জন্যও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ সরাসরি এই সংঘাতের কোনো পক্ষ নয়, কিন্তু অর্থনৈতিকভাবে মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানি ব্যয় বাড়তে পারে। পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বাড়লে তার প্রভাব মূল্যস্ফীতিতেও পড়তে পারে। একই সঙ্গে সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলো বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা তৈরি হলে বাংলাদেশের প্রবাসী কর্মসংস্থান ও রেমিট্যান্স প্রবাহের ওপরও পরোক্ষ প্রভাব পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। তাই মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংকটকে বাংলাদেশের জন্য দূরের কোনো ভূরাজনৈতিক ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর অর্থনৈতিক অভিঘাত জ্বালানি, বাণিজ্য, পরিবহন এবং প্রবাসী আয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও পৌঁছাতে পারে।

সবশেষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো কি প্রমাণ করছে যে ইরান মধ্যপ্রাচ্যে কৌশলগতভাবে শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছে? উত্তরটি সরল নয়। ইরান নিজেও বড় ধরনের অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপের মধ্যে রয়েছে। তার অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, অর্থনীতি সংকুচিত হয়েছে এবং ভবিষ্যৎ সংঘাতের ঝুঁকি রয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও স্পষ্ট যে ইরানকে শুধু অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বা সরাসরি সামরিক হামলার মাধ্যমে দ্রুত নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া সহজ নয়। ইরানের শক্তি তার নিজস্ব সামরিক সক্ষমতার পাশাপাশি তার আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক, ভূগোল এবং গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক chokepoint-এর ওপর প্রভাব তৈরির সক্ষমতার মধ্যেও নিহিত। হরমুজ প্রণালীর এক পাশে ইরান এবং বাব আল-মান্দাবের দিকে হুতিদের ক্রমবর্ধমান অবস্থান, এই দুই বাস্তবতা একই সঙ্গে বিদ্যমান থাকলে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কৌশলগত হিসাব আরও জটিল হয়ে ওঠে।

এই পুরো সংকট আসলে একটা পুরনো সত্যকেই নতুন করে সামনে আনছে – আধুনিক শক্তি যত প্রযুক্তি আর অস্ত্রনির্ভর মনে হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত তা দাঁড়িয়ে থাকে হাতে গোনা কয়েকটা সরু জলপথ আর পাইপলাইনের ভঙ্গুরতার ওপর, এবং যে পক্ষ আগে এই ভঙ্গুরতাকে চিনতে পারে ও কাজে লাগাতে পারে, দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষমতার সমীকরণে অনেকটাই সে-ই এগিয়ে থাকে।

সুতরাং গত কয়েক দিনের ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্ন কয়েকটি হামলা হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত গুরুত্ব বোঝা যাবে না। সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনে হামলা, ইরাকের ভূখণ্ডের ব্যবহার, ইয়েমেনে হুতিদের দ্রুত অগ্রগতি, বাব আল-মান্দাবের ওপর বাড়তে থাকা চাপ এবং হরমুজ প্রণালীতে অচলাবস্থা – সবগুলো ঘটনাকে একসঙ্গে বিশ্লেষণ করলে মধ্যপ্রাচ্যে একটি বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের চিত্র পাওয়া যায়। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র তার পুরোনো নিরাপত্তা কাঠামো ধরে রাখতে চাইছে, সৌদি আরব নিজেদের কৌশলগত সক্ষমতা বাড়াতে চাইছে, আর ইরান সরাসরি সংঘাতে না গিয়ে আঞ্চলিক মিত্র ও প্রক্সি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পাল্টা চাপ তৈরির চেষ্টা করছে। ফলে আগামী দিনগুলোতে মূল প্রশ্ন শুধু কে সামরিকভাবে জয়ী হবে, তা নয়; বরং কে কতদিন অর্থনৈতিক ও কৌশলগত চাপ ধরে রাখতে পারবে। কারণ হরমুজ ও বাব আল-মান্দাব কেবল দুটি জলপথ নয়, এগুলো বৈশ্বিক জ্বালানি ও বাণিজ্য ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ ধমনী। এই দুই পথ একই সময়ে অস্থিতিশীল হয়ে পড়লে মধ্যপ্রাচ্যের সংকট আর মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; এর প্রভাব পড়বে পুরো বিশ্ব অর্থনীতি এবং বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির ওপরও।

তথ্যসূত্র:

১. Al Jazeera, 'Saudi Arabia says East-West pipeline hit by drones launched from Iraq', ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

২. Al Jazeera, 'Saudi Arabia shuts critical oil pipeline after drone attack: What it means', ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

৩. TIME, 'Yemen's Houthis Reach Strategic Island in Key Shipping Route', ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

৪. CNBC, 'Houthis reportedly advance to key Red Sea island, further threatening crucial oil choke point', ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬