মালেক বিন নাবি ও উন্নয়ন-বিভ্রম | আনাস ইসলাম
আধুনিকতার মোড়কে গ্লোবাল সাউথের কাঠামোগত পরাধীনতা
বৈশ্বিক দক্ষিণের (global south) বহু রাষ্ট্রে উন্নয়নকে দীর্ঘদিন ধরে মাপা হয়েছে দৃশ্যমান ভোগের মানদণ্ডে—উচ্চতর জীবনযাত্রা, আধুনিক পণ্য ও পশ্চিমা লাইফস্টাইলের অনুকরণ হিসেবে। কিন্তু এই প্রবণতা আদতে একটি ‘Needs-first Imitation’ বা ‘চাহিদার অগ্রাধিকার’ অনুকরণবাদী উন্নয়ন তৈরি করেছে, যেখানে উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে ওঠার আগেই ভোগের কাঠামো আমদানি করা হয়। মালেক বিন নাবি এই সমস্যাটিকে চিহ্নিত করেছিলেন 'تقليد الاستهلاك' (Consumption-led Imitation) হিসেবে—যেখানে সমাজ নিজের প্রয়োজন নির্ধারণ করে না, বরং অন্য সভ্যতার ভোগপ্যাটার্নকে ‘উন্নয়ন’ বলে ধরে নেয়। এর ফলাফল হয়েছে আলোচ্য রাষ্ট্রগুলোতে উৎপাদনকেন্দ্রিক আধুনিকতা না দাঁড়িয়ে ভোগকেন্দ্রিক আধুনিকতা দাঁড়িয়েছে; সক্ষমতা অর্জিত না হয়ে হয়েছে কেবল প্রদর্শন।[১] [২]
মালেক বিন নাবির সভ্যতাতত্ত্ব ও প্রিম্যাচিউর আধুনিকতার সংকট
মালেক বিন নাবির সভ্যতা-চিন্তায় উন্নয়ন কোনো যান্ত্রিক বা পরিসংখ্যানগত প্রক্রিয়া না; এটি এক গভীরভাবে জৈবিক প্রক্রিয়া—যা ধীরে ধীরে সমাজের ভেতর থেকে বিকশিত হয়। টেকসই উৎপাদন কাঠামো গড়ে ওঠে আগে মানুষের মানসিক প্রস্তুতি এরপর নৈতিক শৃঙ্খলা ও ধারণাগত পরিপক্বতার মাধ্যমে; উপকরণ তখনই কার্যকর হয়,[৩] [৪] যখন তা একটি প্রস্তুত মানব ও বৌদ্ধিক কাঠামোর ভেতরে প্রবেশ করে।
কিন্তু গ্লোবাল সাউথের বহু রাষ্ট্র এই স্বাভাবিক ও ঐতিহাসিক ধারাটিকে উল্টোভাবে অনুসরণ করেছে। এখানে প্রথমেই হাজির হয়েছে উপকরণের প্রদর্শন অর্থাৎ প্রযুক্তি, অবকাঠামো, ভোগ্যপণ্যের দৃশ্যমান বিস্তার। এরপর—কখনো কখনো—ধারণার আমদানি ঘটেছে নীতি বা উন্নয়ন-বক্তৃতার স্তরে। আর মানুষ—যার ওপর গোটা সভ্যতাগত প্রকল্প দাঁড়ানোর কথা সে-ই রয়ে গেছে সবচেয়ে অবহেলিত, সবচেয়ে অনুপস্থিত উপাদান হয়ে।
ঐতিহাসিকভাবে পশ্চিমা সমাজে জীবনযাত্রার মান (standard of living) বেড়েছে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির সরাসরি ফল হিসেবে। শিল্পায়ন, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, শ্রমের দক্ষতা ও সাংগঠনিক শৃঙ্খলার ওপর দাঁড়িয়েই ভোগের সম্প্রসারণ ঘটেছে। অর্থাৎ, ভোগ ছিল উৎপাদনের ফল—লক্ষ্য না। কিন্তু গ্লোবাল সাউথে ঘটেছে এর ঠিক উল্টোটি। এখানে শিল্পভিত্তি শক্ত না হয়েই, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা গড়ে না উঠেই এবং স্থানীয় উৎপাদন ব্যবস্থা পরিপক্ব না হয়েই— রাষ্ট্র ও সমাজ উন্নত ভোগ প্যাটার্ন আমদানি করেছে। ফলে ভোগ উন্নয়নের সূচক হিসেবে হাজির হয়েছে, কিন্তু উৎপাদনের প্রকাশ হিসেবে না।
মালেক বিন নাবির ভাষায়, এটি এক ধরনের 'premature modernity'—এক আগাম আধুনিকতা। এমন এক অবস্থা, যেখানে সমাজ আধুনিকের মতো দেখতে চায়, কিন্তু আধুনিক হওয়ার যে দীর্ঘ, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও আত্মসংযমী পথ—সে পথে হাঁটতে অনিচ্ছুক।[৫][৬] আধুনিকতা এখানে অর্জন না, অনুকরণ; সাধনা না, সাজসজ্জা।
এই বাস্তবতাকে আরও গভীরভাবে ব্যাখ্যা করে কনজ্যুমার কালচার তত্ত্ব। এই তত্ত্ব দেখায়—আধুনিক সমাজে ভোগ কেবল প্রয়োজন পূরণের মাধ্যম না; এটি পরিচয়, সামাজিক মর্যাদা এবং আকাঙ্ক্ষা নির্মাণের প্রধান ভাষা।[৭] গ্লোবাল সাউথে এই প্রক্রিয়া আরও তীব্র আকার ধারণ করে, কারণ এখানে উৎপাদনের মাধ্যমে আত্মমর্যাদা অর্জনের সুযোগ সীমিত, অথচ ভোগ প্রদর্শনের মাধ্যমে সামাজিক স্বীকৃতি তুলনামূলকভাবে সহজলভ্য। ফলে মানুষকে মূল্যায়ন করা হয় সে কী তৈরি করতে পারে—তার ভিত্তিতে না; বরং সে কী ব্যবহার করে, কী পরে, কী চালায়—এই দৃশ্যমান সংকেতগুলোর ভিত্তিতে। এইখানেই জন্ম নেয় consumer-subject—যে ব্যক্তি নাগরিক হিসেবে নয়, উৎপাদক হিসেবে নয়, বরং একজন ‘সফল ভোক্তা’ হিসেবেই সামাজিকভাবে দৃশ্যমান। তার সামাজিক অস্তিত্ব নির্ধারিত হয় তার উৎপাদনক্ষমতার পরিবর্তে তার ভোগক্ষমতা দিয়ে।
এই ভোগকেন্দ্রিক মানসিকতা রাষ্ট্রীয় নীতিতেও গভীর ছাপ ফেলে। যখন সমাজ উন্নয়ন বলতে বোঝে আরও ব্র্যান্ড, আরও শপিং মল, আরও বিলাসী সেবা—তখন রাষ্ট্রের অগ্রাধিকারও স্বাভাবিকভাবেই বদলে যায়। স্থানীয় শিল্পের গভীরতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি—এসব দীর্ঘমেয়াদি, ধীর এবং রাজনৈতিকভাবে কম দৃশ্যমান প্রকল্প হয়ে পড়ে অনগ্রাধিকারযোগ্য। তার বদলে রাষ্ট্র ঝুঁকে পড়ে আমদানিনির্ভর বাজার সম্প্রসারণে, ভোগ সহজ করতে ঋণ ও ভর্তুকি প্রদানে, কিংবা শহরকেন্দ্রিক প্রদর্শনীমূলক অবকাঠামো নির্মাণে। ফলে উন্নয়ন মানে দাঁড়ায় দৃশ্যমান চাকচিক্য— নতুন কারখানার বদলে গুরুত্ব পায় নতুন শোরুম।
এই উল্টো অগ্রাধিকারের সবচেয়ে বিপজ্জনক ফল হলো একটি দ্বৈত অর্থনীতির জন্ম। একদিকে স্মার্টফোন, এসি, ফাস্ট ফ্যাশন, ডিজিটাল পেমেন্ট ও বিলাসী সেবার ঝলমলে উপস্থিতি; অন্যদিকে দুর্বল শিল্পভিত্তি, নিম্ন প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন, কাঁচামাল রপ্তানি ও সমাপ্ত পণ্য আমদানির ওপর নির্ভরতা। সমাজ দেখতে আধুনিক হলেও তার ভেতরটা থেকে যায় কাঠামোগতভাবে নির্ভরশীল (structurally dependent)। উৎপাদন কাঠামো নিজে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না; তাকে সবসময় বৈশ্বিক বাজারের দয়ার ওপর নির্ভরশীল হয়ে থাকতে হয়। মালেক বিন নাবির দৃষ্টিতে, এটা সভ্যতার অত্যন্ত বিপজ্জনক অবস্থা—যেখানে ভোগ আছে, কিন্তু তার পেছনে কোনো সৃজনশীল শ্রমের ইতিহাস নেই।
এই প্রক্রিয়ার শেষ ধাপে সমাজ ধীরে ধীরে তার উৎপাদন প্রবণতা একেবারে হারিয়ে ফেলে। শিশু ‘কী হবে’— তার বদলে ‘কী ব্যবহার করবে’ সেই স্বপ্ন দেখে। শিক্ষার লক্ষ্য দক্ষতা ও সক্ষমতার পরিবর্তে হয়ে ওঠে সামাজিক অবস্থান। শ্রমকে আর সৃজনশীল শক্তি হিসেবে দেখা হয় না; দেখা হয় ভোগের পথে এক অনিবার্য বোঝা হিসেবে। এখানে উন্নয়ন আর আত্মনির্ভরতার যাত্রা থাকে না—থাকে কেবল ভোগ টিকিয়ে রাখার এক অন্তহীন সংগ্রাম।
মালেক বিন নাবির দৃষ্টিতে ছিন্নমূল সভ্যতা
উত্তর-উন্নয়ন অধ্যয়ন (Post-Development Studies) মূলধারার উন্নয়ন চিন্তার একটি মৌলিক অনুমানকে সরাসরি প্রশ্নবিদ্ধ[৯] করে। সেই অনুমানটি হচ্ছে, পশ্চিমা ইতিহাসই সার্বজনীন উন্নয়নের একমাত্র পথ। এই ধারার চিন্তাবিদরা দেখান, বৈশ্বিক দক্ষিণে যে ভোগকেন্দ্রিক আধুনিকতা গড়ে উঠেছে, তা প্রকৃত অর্থে উন্নয়ন না; বরং এটি হলো নির্ভরশীলতার (dependency) পুনরুৎপাদন—মানে একটি নতুন রূপে পুরোনো নির্ভরশীলতার ধারাবাহিকতা। মালেক বিন নাবির ভাষায়, এটি এক ধরনের ছিন্নমূল সভ্যতা (rootless civilisation) — যা বাইরে থেকে আধুনিক দেখায়, কিন্তু ভেতরে শিকড়হীন ও শূন্য।[১০]
যখন একটি সমাজ উন্নয়ন বলতে বোঝে আধুনিক পণ্যের সহজলভ্যতা, তখন তার প্রথম এবং স্থায়ী পরিণতি হয় আমদানী-নির্ভরতা (import-dependence)। দৈনন্দিন ভোগ্যপণ্য থেকে শুরু করে প্রযুক্তি, যন্ত্রপাতি, এমনকি সাংস্কৃতিক পণ্যও—সবকিছু বাইরে থেকে আসতে থাকে। এতে স্থানীয় অর্থনীতি একযোগে তিনটি কাঠামোগত আঘাতের মুখে পড়ে।
১) বৈদেশিক মুদ্রার বহিঃপ্রবাহ (foreign exchange drain): উৎপাদন না করে ভোগ করার অর্থ হলো—নিজের আয়কে ধারাবাহিকভাবে বাইরে পাঠানো।
২) আভ্যন্তরীণ মূল্য শৃঙ্খল (domestic value chain) ভেঙ্গে পড়া: আমদানিকৃত সমাপ্ত পণ্য বাজার দখল করে নেয়ার কারণে স্থানীয় কাঁচামাল, শ্রম ও দক্ষতা অপ্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে,
৩) মূল্য ঝুঁকি (price vulnerability): বৈশ্বিক বাজারে সামান্য ধাক্কাতেই স্থানীয় বাজার অস্থির হয়ে পড়ে। এর ফলে অর্থনীতি নিজে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না; তাকে সবসময় বাইরের সাপ্লাই চেইনের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়।
উত্তর-উন্নয়নবাদী চিন্তাবিদরা বলেন, এই প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বড় ক্ষতিটি হয় দেশীয় উৎপাদন ব্যবস্থার। বৈশ্বিক দক্ষিণের বহু সমাজে একসময় শক্তিশালী হস্তশিল্প, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উৎপাদন ব্যবস্থা এবং স্থানীয় জ্ঞানভিত্তিক প্রযুক্তি ছিল। কিন্তু সস্তা বা ব্র্যান্ডেড আমদানিকৃত পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় এসব টিকে থাকতে পারে না। রাষ্ট্রও সচেতনভাবে এগুলোকে রক্ষা করে না, কারণ এগুলোকে “আধুনিক” মনে করা হয় না, এবং এগুলো রাজনৈতিকভাবে প্রদর্শনযোগ্যও না। ফলে নবায়নমূলক বিনাশ (creative destruction)-এর বদলে উন্নয়নের মানে হয়ে দাঁড়ায় সাংস্কৃতিক বিনাশ (cultural destruction)।
মালেক বিন নাবির মতে, যখন একটি সমাজ নিজের উৎপাদন ঐতিহ্য ধ্বংস করে, তখন সে কেবল কর্মসংস্থান হারায় না; হারায় নিজের সময়বোধ, শ্রমনৈতিকতা এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণের ক্ষমতাও। এই প্রক্রিয়ার সবচেয়ে সূক্ষ্ম কিন্তু সবচেয়ে ভয়াবহ দিকটি হলো আমদানির মাধ্যমে সমাপ্ত পণ্যের (finished goods) প্রযুক্তিগত জ্ঞানের স্থান দখল করা। যন্ত্র আসে, কিন্তু প্রযুক্তি আসে না। পণ্য আসে, কিন্তু কারিগরী কৌশল আসে না। ব্যবহার শেখা হয়, কিন্তু তৈরি শেখা হয় না।
ফলে সমাজ এক ধরনের ব্যবহার-সংস্কৃতি গড়ে তোলে, কোনোভাবেই উৎপাদন-সংস্কৃতি গড়ে তোলে না।[৬][১১] উত্তর-উন্নয়ন অধ্যয়ন এই অবস্থাকে চিহ্নিত করে প্রযুক্তিগত নির্ভরতা হিসেবে—যেখানে প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষমতা আছে, কিন্তু প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা নেই। দীর্ঘমেয়াদে এটি তিনটি কাঠামোগত দুর্বলতা সৃষ্টি করে:
১) স্বল্প উদ্ভাবনী দক্ষতা (low innovation capacity),
২) নগণ্য গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্কৃতি (negligible R&D culture),
৩) দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যমান দক্ষতা ও প্রয়োজনের অমিল (chronic skill mismatch)।
এইখানেই মালেক বিন নাবির ‘ছিন্নমূল সভ্যতা’-র ধারণাটি তার পূর্ণ অর্থে উন্মোচিত হয়। এটি এমন এক সভ্যতা যা — ভোগ করে, কিন্তু সৃষ্টি করে না; ব্যবহার করে, কিন্তু উত্তরাধিকার তৈরি করে না; উপভোগ করে, কিন্তু নিজের গল্প লিখতে পারে না। এখানে ভোগ সভ্যতার প্রকাশের বদলে হয়ে ওঠে সভ্যতার মুখোশ। সমাজ দেখতে আধুনিক হলেও, তার অর্থনৈতিক ভিত থাকে ঔপনিবেশিক কাঠামোরই এক বিস্তৃত সংস্করণ।
এই কাঠামোর স্বাভাবিক পরিণতি হলো অব্যাহত বাণিজ্য ঘাটতি। রপ্তানি সীমিত থাকে, কারণ উৎপাদন দুর্বল; আর আমদানি ব্যাপক হয়, কারণ ভোগের চাহিদা উচ্চ। ফলে রাষ্ট্র আটকে পড়ে এক ধরনের স্থায়ী ভারসাম্যহীনতায়। এই ঘাটতি সামাল দিতে গিয়ে বৈদেশিক ঋণ, বৈদেশিক সহায়তা ও শর্তসাপেক্ষ অর্থনৈতিক কর্মসূচি অনিবার্য হয়ে ওঠে।
ভোগনির্ভর অর্থনীতি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে সীমিত পরিসরে—বিক্রয়, বিপণন ও সেবা খাতে। কিন্তু মূল্য-সৃষ্টিকারী কর্মসংস্থান তৈরি হয় না। বৈদেশিক মুদ্রা বাইরে চলে যায়, আর স্থানীয় শ্রমিক থেকে যায় বেকার বা অর্ধ-বেকার। ফলে উন্নয়নের একটি ফল দাঁড়ায় উৎপাদন ছাড়া আবর্তন - টাকা আবর্তিত হয়, কিন্তু মূল্য সৃষ্টি হয় না।
সবশেষে রাষ্ট্র নিজেই হয়ে পড়ে ঋণ-নির্ভর। এই ঋণ শিল্পায়নের জন্য আসে না, সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্যও না; আসে কেবল ভোগের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্য। মালেক বিন নাবির দৃষ্টিতে, এটি সভ্যতার খুব বিপজ্জনক একটি স্তর—যেখানে রাষ্ট্র ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বন্ধক রেখে বর্তমানের ভোগ টিকিয়ে রাখে।
আয়–ভোগ ফাঁক ও সামাজিক ঋণায়ন
যে সমাজে উৎপাদন কাঠামো দুর্বল, আয় বৃদ্ধির হার ধীর এবং মূল্য সংযোজন সীমিত—কিন্তু একই সঙ্গে জীবনযাত্রার মান দ্রুত বাড়ছে, ভোগের সামাজিক চাপ তীব্র এবং ‘উন্নত’ হওয়ার প্রতিযোগিতা সমানতালে চলছে—সেখানে অনিবার্যভাবে ভোগ ও আয়ের মধ্যে একটি স্থায়ী ব্যবধান (consumption–income gap) সৃষ্টি হয়, অর্থাৎ মানুষ যতটা আয় করে, তার চেয়ে অনেক বেশি ভোগ করতে বাধ্য হয়। এই ফাঁক পূরণ করার ঋণ ছাড়া আর কোনো বাস্তবসম্মত উপায় থাকে না। ধীরে ধীরে এই ঋণ আর ব্যতিক্রম থাকে না; তা হয়ে ওঠে একটি স্বাভাবিক সামাজিক ব্যবস্থা।
ব্যক্তি পর্যায়ে এই ঋণতাড়িত ভোগ সবচেয়ে স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। ক্রেডিট কার্ডে দৈনন্দিন ভোগের জন্য ক্রয়, সমমানের মাসিক কিস্তি (EMI)-এর মাধ্যমে ফোন, গাড়ি, আসবাবপত্র ক্রয় — এমনকি সামাজিক অনুষ্ঠান ও জীবনধারাও চলে ঋণের ওপর। ভোক্তা সংস্কৃতি তত্ত্ব (Consumer Culture Theory) একে ব্যাখ্যা করে ভোগের মাধ্যমে সামাজিক মর্যাদা বজায় রাখা হিসেবে।[৭] এখানে মানুষ প্রয়োজন মেটানোর জন্য ঋণ নেয় না; নেয় সামাজিক দৃশ্যমানতা ধরে রাখার জন্য। ফলে ঋণ হয়ে ওঠে সামাজিক মর্যাদার এক অঘোষিত শর্ত।[১২] এর সঙ্গে ভেঙে পড়ে সঞ্চয় ও বিনিয়োগের সংস্কৃতি, কারণ ব্যক্তি ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার চেয়ে বর্তমান প্রদর্শনকে বেশি মূল্য দিতে শুরু করে। মালেক বিন নাবির ভাষায়, এটি এক ধরনের নৈতিক অবক্ষয়, যেখানে মর্যাদা আর শ্রম বা সৃষ্টিশীলতার ফল থাকে না; তা দাঁড়িয়ে থাকে কেবল ভাসমান এক কিস্তির ওপর।
এই বাস্তবতাকে ব্যক্তিগত দুর্বলতা হিসেবে দেখা একটি গুরুতর ভুল। এটি আদতে একটি সম্মিলিত মনস্তত্ব। গণমাধ্যম, বিজ্ঞাপন এবং ক্রমাগত সামাজিক তুলনা মানুষের ভেতর এমন এক আকাঙ্ক্ষা তৈরি করে: 'আমি যা না, সেটা আমাকে এখনই হতে হবে।' এই অবস্থাকে বলা যায় সাধ্যাতীত উচ্চাকাঙ্খা (aspirational overreach)—যেখানে সমাজ নিজের বাস্তব উৎপাদন সক্ষমতার আগেই উন্নত জীবনের দাবি জানায়। এর ফলে সংযমকে পশ্চাৎপদ মনে করা হয়, ধীর উন্নয়নকে ব্যর্থতা হিসেবে দেখা হয়, আর ঋণকে স্বাভাবিক—এমনকি বুদ্ধিমানের কাজ হিসেবে গ্রহণ করা হয়।
ব্যক্তি পর্যায়ের এই ভোগচাপ রাষ্ট্রীয় স্তরে গিয়ে বহুগুণ বেড়ে যায়। রাষ্ট্র যখন দেখে জনগণ আমদানিনির্ভর আধুনিক ভোগে অভ্যস্ত, বাজারে চাহিদা স্থায়ী কিন্তু স্থানীয় উৎপাদন খাত সেই চাহিদা পূরণে অক্ষম—তখন তার সামনে কার্যত দুটি পথ খোলা থাকে। একদিকে ভোগ কমানো, যা রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ; অন্যদিকে ঋণ নিয়ে ভোগ টিকিয়ে রাখা, যা স্বল্পমেয়াদে তুলনামূলক সহজ। বাস্তবে প্রায় সব ক্ষেত্রেই দ্বিতীয় পথটি বেছে নেওয়া হয়। এর ফল হিসেবে একসঙ্গে হাজির হয় বৈদেশিক ঋণ, বাজেট ঘাটতি এবং IMF ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শর্তসাপেক্ষ কর্মসূচি।
কিন্তু ঋণ কখনো নিরপেক্ষ থাকে না। রাষ্ট্র যখন বৈদেশিক ঋণের ফাঁদে পড়ে, তখন তাকে অনিবার্যভাবে কিছু শর্ত মানতে হয় যেমন—ভর্তুকি কমানো, সামাজিক ব্যয় সংকোচন, মুদ্রা অবমূল্যায়ন এবং বাজার উদারকরণ। এই কৃচ্ছসাধন নীতি (austerity measures) সবচেয়ে বেশি আঘাত করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে, বিশেষ করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষার মতো খাতে। এক অদ্ভুত বৈপরীত্য এখানে তৈরি হয়—ঋণ নেওয়া হয় ভোগ টিকিয়ে রাখার জন্য, কিন্তু তার বোঝা বহন করে মূলত তারাই, যারা সেই ভোগের প্রধান উপকারভোগী না।
উন্নয়ন অর্থনীতির ভাষায় ঋণ একটি উপকরণ—যা উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে ব্যবহৃত হওয়ার কথা। কিন্তু এই ভোগনির্ভর কাঠামোয় ঋণ হয়ে ওঠে অক্সিজেনের মত তথা ভোগ চালু রাখার জন্য অপরিহার্য উপাদান। এখানে ঋণ না নিলে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে; ঋণ শোধ করাও মুখ্য লক্ষ্য থাকে না, বরং ঋণ নবায়ন করাই প্রধান কৌশল হয়ে ওঠে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের আয় আগেভাগেই বরাদ্দ হয়ে যায় বর্তমানের ভোগ বজায় রাখার জন্য। মালেক বিন নাবির মতে, ঋণনির্ভর সামাজিক মর্যাদার তীব্র সমালোচনা এখানেই যে, এটি এমন এক মর্যাদা যা নৈতিক বা উৎপাদনমূলক কোনো ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে নেই; দাঁড়িয়ে আছে কেবল প্রদর্শনমূলক ঋণের ওপর।
এই ঋণনির্ভর ভোগ শেষ পর্যন্ত সৃষ্টি করে এক গভীর প্রজন্মান্তর অবিচারের। বর্তমান প্রজন্ম ভোগ করে, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম শোধ দেয়—তবু উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ে না। ফলে সমাজ আটকে যায় একটি ঋণনির্ভর ভোগের ফাঁদে, যেখানে উন্নয়ন দাঁড়িয়ে থাকে কেবল সময় কেনার উপর—দিক বদলানোর উপর না।
উৎপাদক কল্পনার মৃত্যু
যে সমাজে উৎপাদন জীবনের কেন্দ্রবিন্দু, সেখানে শিশুর স্বপ্ন গড়ে ওঠে সৃষ্টির ভাষায়—কী বানাবে, কী আবিষ্কার করবে, কীভাবে কিছু তৈরি করবে। ভবিষ্যৎ কল্পনা সেখানে পেশা, দক্ষতা ও সৃষ্টিশীল শ্রমের মধ্য দিয়ে রূপ পায়। কিন্তু ভোগনির্ভর সমাজে স্বপ্নের ব্যাকরণ বদলে যায়। শিশুর কল্পনায় ভবিষ্যৎ কাজ বা সৃষ্টির মাধ্যমে সংজ্ঞায়িত হয় না; বরং সে ভাবে—কোন ফোন ব্যবহার করবে, কোন গাড়ি চালাবে, কেমন লাইফস্টাইল প্রদর্শন করবে। স্বপ্ন এখানে সৃষ্টিশীল কল্পনাশক্তি থেকে সরে গিয়ে হয়ে ওঠে ভোগবাদী বাসনা। মালেক বিন নাবির ভাষায়, এমন সমাজ আর ভবিষ্যৎ নির্মাণ করে না; সে কেবল অন্যদের ভবিষ্যৎ-কল্পনার অনুকরণ করে।
এই মানসিক রূপান্তরের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রতিফলন ঘটে শিক্ষাব্যবস্থায়। উৎপাদনমুখী সমাজে শিক্ষা মানে দক্ষতা অর্জন, সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা এবং বাস্তব কাজের উপযোগিতা। শিক্ষা সেখানে মানুষকে তৈরি করে করতে পারার জন্য। কিন্তু ভোগকেন্দ্রিক সমাজে শিক্ষা হয়ে ওঠে সার্টিফিকেট, সামাজিক অবস্থান এবং ভোগক্ষমতায় প্রবেশের অনুমতিপত্র। ডিগ্রি আর সৃষ্টিশীলতার যোগ্যতার প্রমাণ থাকে না; তা রূপ নেয় একটি মর্যাদার চিহ্নে। ফলে হাতে-কলমে দক্ষতা অবমূল্যায়িত হয়, কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষা তুচ্ছ হয়ে পড়ে, আর বাড়তে থাকে শিক্ষিত বেকারত্ব। শিক্ষা এভাবে উৎপাদক তৈরি না করে তৈরি করে উচ্চাকাঙ্খী ভোক্তা—যারা কাজ জানে না, কিন্তু জীবনযাপন কল্পনা করতে জানে।[১৩]
মালেক বিন নাবি বারবার জোর দিয়েছেন—সভ্যতা টিকে থাকে শ্রমনৈতিকতার (work ethic) ওপর। কিন্তু ভোগনির্ভর সংস্কৃতিতে শ্রমের অর্থই পাল্টে যায়। শারীরিক ও কারিগরি শ্রমকে ‘নিচু’ বলে মনে করা হয়, দ্রুত আয় ও সহজ জীবনকে আদর্শ ধরা হয়, আর পরিশ্রমের জায়গা নেয় প্রদর্শন। শ্রম আর গৌরবের বিষয় থাকে না; তা হয়ে ওঠে অপ্রয়োজনীয় কষ্ট। এই মানসিকতা উৎপাদনের ভিত্তিকেই ভেঙে দেয়, কারণ কোনো সমাজই উৎপাদক হতে পারে না যদি তার মানুষ শ্রমকে ঘৃণা করতে শেখে।
এখানে উৎপাদক সত্তা থেকে ভোক্তা সত্তায় একটি মৌলিক পরিচয়গত রূপান্তর ঘটে যেখানে উৎপাদক সত্তা নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করত কারণ সে সৃষ্টি করতে পারত। অন্যদিকে ভোক্তা সত্তা নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে কারণ সে ভোগ করতে পারে।
দ্বিতীয় পরিচয়টি যখন সমাজের প্রধান আত্মপরিচয় হয়ে ওঠে, তখন মানুষ নিজের মূল্য খুঁজতে শুরু করে বাজারে—নিজের কাজে না। এর ফলে তৈরি হয় এক গভীর অস্তিত্বগত শূন্যতা। মালেক বিন নাবির দৃষ্টিতে, এটাই সভ্যতার প্রকৃত পতন—যেখানে মানুষ আর নিজেকে ইতিহাসের নির্মাতা হিসেবে দেখে না; দেখে ইতিহাসের একজন ভোক্তা হিসেবে।[১৪]
যখন উৎপাদক সত্তা বিলুপ্ত হয়, তখন রাষ্ট্রের ভূমিকাও আমূল বদলে যায়। রাষ্ট্র আর উৎপাদন কাঠামো গড়তে চায় না; তার প্রধান লক্ষ্য হয়ে ওঠে ভোগ যেন ব্যাহত না হয়। নীতিনির্ধারণ রূপ নেয় স্বল্পমেয়াদি, সংকট-ব্যবস্থাপনামূলক সিদ্ধান্তে। উন্নয়ন এখানে আর রূপান্তরমূলক প্রকল্প থাকে না; হয়ে ওঠে একটি ভোগরক্ষণ কৌশলে।
এই পর্যায়ে এসে আত্মনির্ভরতার ধারণা অর্থহীন হয়ে পড়ে। উৎপাদন নেই, উৎপাদক নেই—এমনকি উৎপাদনের আকাঙ্ক্ষাও নেই। সমাজের সামনে একমাত্র লক্ষ্য দাঁড়ায়—যেভাবেই হোক ভোগ টিকিয়ে রাখা। আর সেখান থেকেই আগের সব সংকট—আমদানি-নির্ভরতা, ঋণ, বহিঃনির্ভরতা—চক্রাকারে ফিরে আসে।
উৎপাদক সত্তার অবলুপ্তি তাই কেবল একটি সামাজিক পরিবর্তনই না; এটি একটি সভ্যতাগত আত্মসমর্পণও। মালেক বিন নাবির বিশ্লেষণ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—যে সমাজ নিজের মানুষকে উৎপাদক হিসেবে কল্পনা করতে পারে না, সে সমাজ শেষ পর্যন্ত নিজের ভবিষ্যৎ কল্পনা করার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলে।
References