মেন্যু
Menu

শহরের নান্দনিক একরূপতা | সিদ্দিকে আকবর

৭ এপ্রিল, ২০২৬

"স্থান হল স্মৃতির শরীর। যখন স্থান মরে যায়, স্মৃতি তার সাথে নিঃশব্দে কবরস্থ হয়।"- মার্ক অজে, Non-Places, ১৯৯২

ঈদের ছুটিতে ঢাকা ছেড়ে গ্রামে যায় মানুষ। সেখানে গিয়ে অনেকেই হয়তো একটা অদ্ভুত জিনিস লক্ষ্য করে থাকবেন। গ্রামের বাজার বা একটু উন্নত টাউন এলাকায় নতুন গজিয়ে উঠা রেস্তোরাঁ কিংবা হাইওয়ে-ইন গুলো দেখে মনে হয় যেন ঢাকার কোনো এক রেস্তোরাঁর অদ্ভুত প্রতিচ্ছবি! শৈশবের গ্রাম দেখার টানে আমরা গ্রামে যাই। কিন্তু গ্রামের সেই রেস্তোরাঁয় বসে আপনার মনে হবে, আপনি গ্রামেই আসেননি। বসে আছেন ঢাকার বুকে। অন্তত আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এমনই সাক্ষ্য দেয়।

অথবা ধরুন আপনি এক সকালে ঢাকার গুলশানে একটি ক্যাফেতে বসে আছেন। সাদা টাইলস, কাঠের ছোট টেবিল, দেয়ালে উন্মুক্ত বাল্ব - এডিসন বাল্ব, যার কুণ্ডলী-পাকানো ফিলামেন্ট একটা হলুদ আভা দিচ্ছে। মেনুতে কোল্ড ব্রু কফি আর অ্যাভোকাডো টোস্ট। দেয়ালে কোনো একটি সরল বাক্য হাতে লেখা - হয়তো ইংরেজিতে। ইনস্টাগ্রামে ছবি তুললে ক্যাপশন লেখার দরকার পড়বে না, ছবিটি নিজেই বলে দেবে বাকি সব।

এখন ভাবুন, এই একই সকালে কেউ বসে আছেন পর্তুগালের লিসবনে, অথবা তুরস্কের ইস্তাম্বুলের কোনো এক মহল্লায়, অথবা মুম্বইয়ের বান্দ্রায়, অথবা টোকিওর কোনো এক পাড়ায়। সেখানেও কফি শপগুলোতে দেয়াল সজ্জা, আলোক সজ্জা, সাথে মেন্যুর এক আশ্চর্য মিল। এক অদৃশ্য স্থপতি যেন পৃথিবীর প্রতিটি শহরে একই ধাঁচে ঘর বানিয়েছে। এই স্থপতির নাম নেই, ঠিকানা নেই, তবু তার ক্ষমতা আধুনিক কালের যেকোনো সাম্রাজ্যকে হার মানায়। কে সে? অথবা, কী তা?

এই প্রবন্ধ সেই অদৃশ্য স্থপতিকে চিহ্নিত করার একটি প্রয়াস।

একটি নান্দনিক মহামারী

২০১৬ সালে সাংবাদিক কাইল চাইকা একটি বিস্ময়কর পর্যবেক্ষণ পেশ করেন - যা পরবর্তীতে তার বই ‘Filterworld’ (২০২৪)-এ পূর্ণতা পায়।[১] তিনি লক্ষ্য করেন যে Airbnb-র মাধ্যমে ভাড়া দেওয়া বাড়িগুলো পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে একটি বিশেষ নান্দনিকতা অর্জন করেছে - সাদা দেয়াল, কাঠের আসবাব, এডিসন বাল্ব। তিনি এই ঘটনার নাম দেন ‘AirSpace’। কিন্তু চাইকা যখন এই পর্যবেক্ষণ দিচ্ছিলেন, ততদিনে এই ফেনোমেনন Airbnb-এর সীমা অনেক আগেই ছাড়িয়ে গেছে।

আজকের আধুনিক কফি শপ, হোটেল, রেস্তোরাঁ - এদের মালিক, দেশ এমনকি কোম্পানিও ভিন্ন হতে পারে। কিন্তু ভেতরে ঢুকলে মোটা দাগে একই অভিজ্ঞতা। এদের নান্দনিক অন্দরমহলগুলোতে ছোটখাট সজ্জাগত ভিন্নতা ছাড়া কোনো নান্দনিক ভিন্নতা নেই। গুলশান থেকে লিসবন, বার্সেলোনা থেকে বেঙ্গালুরু - সর্বত্র অভিন্ন চিত্র। কোম্পানির লোগো বদলায় কিন্তু নান্দনিকতা বদলায় না।

কিন্তু এই অভিন্নতা কীভাবে সম্ভব হল? এটি কোনো বৈশ্বিক ষড়যন্ত্র নয়, কোনো একক কোম্পানির চাপিয়ে দেওয়া নকশা নয়। বরং এটি হল অ্যালগরিদমের অনিচ্ছাকৃত স্থাপত্য। যখন লক্ষাধিক মানুষ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একই ধরনের ছবিতে লাইক দেন, সেই লাইকের সম্মিলিত ভার একটি নান্দনিক মানদণ্ড তৈরি করে। রেস্তোরাঁ মালিক, সজ্জাকার, শহরের পরিকল্পনাবিদ - সবাই এই মানদণ্ডের দিকে অনিচ্ছাসত্ত্বেও ঝুঁকে পড়েন কারণ এটিই কাজ করে, এটিই লাইক পায়।[২]

উপমা দিতে গেলে, এয়ারস্পেস একটি ডিজিটাল স্টিমরোলার - যা শহরের সমস্ত উঁচু-নিচু, অদ্ভুত, স্থানীয় বৈচিত্র্যকে পিষ্ট করে মসৃণ করে একটি সার্বজনীন সমতলভূমিতে পরিণত করে।

এই প্রক্রিয়াটি কারও ইচ্ছায় ঘটে না বলেই এটি বিশেষভাবে বিপজ্জনক। একটি সাম্রাজ্যবাদী শক্তি যখন কোনো দেশে তার সংস্কৃতি চাপিয়ে দেয়, তখন সেটির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সম্ভব। কিন্তু যে শক্তি আপনার নিজের পছন্দের মাধ্যমে কাজ করে, তার বিরুদ্ধে দাঁড়াবেন কীভাবে? এই প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে আমাদের আরও গভীরে যেতে হবে - স্বয়ং অ্যালগরিদমের চরিত্র বুঝতে হবে।

অ-স্থান ও প্রবাহের পরিসর

ফরাসি নৃবিজ্ঞানী মার্ক অজে ১৯৯২ সালে তাঁর ‘Non-Places’ গ্রন্থে একটি ধারণা প্রবর্তন করেন যেটা আজকের যুগে এসে নতুন মাত্রা পেয়েছে।[৩] অজে বলেন, একটি স্থান (place) তখনই তৈরি হয় যখন তার সাথে মানুষের সম্পর্ক, ইতিহাস এবং পরিচয়ের একটি গভীর সংযোগ থাকে। পাড়ার চায়ের দোকান, শহরের পুরনো মসজিদ, মায়ের রান্নাঘর - এগুলো স্থান কারণ এগুলো স্মৃতি বহন করে। এগুলোর দেয়ালে সময়ের স্তর জমে আছে।

কিন্তু ‘নন-প্লেস’ বা ‘অ-স্থান’ হল সেই স্থাপত্য কাঠামো যা মানুষকে বিচ্ছিন্নতার মধ্যে স্থাপন করে; যেমন বিমানবন্দর, হাইওয়ে, বড় শপিং মল, আন্তর্জাতিক হোটেল চেইন - এসব। এসব জায়গায় আপনি থাকেন কিন্তু বাস করেন না। আপনি গতির মধ্যে আছেন কিন্তু কোথাও পৌঁছাচ্ছেন না। অ-স্থানে কোনো স্মৃতি তৈরি হয় না কারণ স্মৃতি তৈরির জন্য স্থান-কালের সাথে যে ঘর্ষণ বা নিরবচ্ছিন্নতার মধ্যে ছেদ দরকার - সেই অপ্রত্যাশিত সংযোগ, সেই অদ্ভুত মুহূর্ত - তা এখানে পরিকল্পনামাফিক অনুপস্থিত।[৪]

আজকের এয়ারস্পেস ক্যাফে বা কিংবা আধুনিক হোটেল কি অজে-র অ-স্থানের ডিজিটাল সংস্করণ নয়? একটি Airbnb অ্যাপার্টমেন্টে আপনি রাত কাটাচ্ছেন কিন্তু সেই শহরের স্পন্দন অনুভব করছেন না কারণ সেই অ্যাপার্টমেন্টটি স্থানীয় স্মৃতি থেকে বিযুক্ত - এটি একটি স্ক্রিনের মতো, যেখানে পটভূমি বদলায় কিন্তু ইন্টারফেস অভিন্ন থাকে।

এটাকে আরও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেন স্প্যানিশ-আমেরিকান সমাজবিজ্ঞানী ম্যানুয়েল কাস্তেলস তাঁর তত্ত্ব দিয়ে। তাঁর ‘The Rise of the Network Society’ (১৯৯৬) গ্রন্থে কাস্তেলস ‘Space of Flows’ বা ‘প্রবাহের পরিসর’ ধারণাটি প্রস্তাব করেন।[৫] তিনি যুক্তি দেন যে, তথ্য-পুঁজিবাদের যুগে ক্ষমতা আর ভৌগোলিক স্থানে নেই - এটি প্রবাহিত অবস্থায় আছে: অর্থের প্রবাহ, তথ্যের প্রবাহ, প্রযুক্তির প্রবাহ।

কাস্তেলস-এর ভাষায়, স্থানীয় পরিসর হল সেটা যেখানে মানুষ তাদের দৈনন্দিন জীবন যাপন করে, ইতিহাস তৈরি করে। প্রবাহের পরিসর হল সেই আধিপত্যকারী নেটওয়ার্ক যা এই স্থানীয়তার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয় এবং ধীরে ধীরে তাকে নিজের ছন্দে মিলিয়ে নেয়।[৬] উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ঢাকার গুলশান এখন এই প্রবাহের পরিসরের অংশ, এবং সেই অংশগ্রহণের মূল্য হল স্থানীয় স্মৃতির ক্রমিক বিসর্জন।

একটি শহর যখন প্রবাহের পরিসরে প্রবেশ করে, সে আন্তর্জাতিক হয়। কিন্তু এই আন্তর্জাতিকতার মূল্য চুকাতে হয় তার নিজস্ব মুখাবয়ব মুছে ফেলে।

অ্যালগরিদম কি নিরপেক্ষ যন্ত্র নাকি ক্ষমতার ভাষা?

এই পর্যন্ত আমরা দেখেছি কী ঘটছে এবং কীভাবে ঘটছে। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি এখনো বাকি: কার হয়ে ঘটছে? অ্যালগরিদমকে প্রায়ই একটি নিরপেক্ষ, অবজেক্টিভ বা বস্তুনিষ্ঠ উপকরণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয় - এটি নাকি শুধু ডেটা দেখে, মানুষের পছন্দ বোঝে, এবং সেই অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু সত্যি কথা হলো, এই দাবিটি নিজেই একটি রাজনৈতিক অবস্থান।

একটি অ্যালগরিদম কখনো শূন্য থেকে তৈরি হয় না। এর পেছনে রয়েছে কোন ডেটা সংগ্রহ করা হবে, কোন লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী সেটি প্রশিক্ষিত হবে, কোন মূল্যবোধকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে – এসব বিষয়ে নির্দিষ্ট মানুষের নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত। উদাহরণস্বরূপ, Instagram-এর অ্যালগরিদম তৈরি করেছে Silicon Valley-র একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষ - যাদের সংস্কৃতি, রুচি, এবং সৌন্দর্যবোধ এই কোডের মধ্যে থরে থরে সাজানো। তারা engagement-কে সর্বোচ্চ মূল্য হিসেবে কোড করেছেন এবং সেই engagement-এর সংজ্ঞাটাও নিরপেক্ষ নয়।  বরং এটিকে আমরা বলতে পারি একটি নির্দিষ্ট সভ্যতার নান্দনিক রুচির গাণিতিক অনুবাদ।[৭]

এই জায়গায় ফুকোর power/knowledge তত্ত্ব অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।[৮] ফুকো দেখিয়েছিলেন যে জ্ঞান এবং ক্ষমতা আলাদা নয় - যে জ্ঞান উৎপাদন করে সে-ই বাস্তবতা নির্মাণ করে। অ্যালগরিদম হচ্ছে এখানে জ্ঞান-উৎপাদন যন্ত্র: এটি নির্ধারণ করে কোনটি সুন্দর, কোনটি জনপ্রিয়, কোনটি দৃশ্যমান। এই নির্ধারণ করতে পারাটাই ক্ষমতা। সুতরাং অ্যালগরিদম কোনো নিরপেক্ষ আয়না নয় - এটি একটি সক্রিয় নির্মাতা যা বাস্তবতাকে একটি নির্দিষ্ট ছাঁচে গড়ে তোলে। অ্যালগরিদম বলে: এটাই সুন্দর, এটাই মানুষ চায়। কিন্তু আসল প্রশ্ন হল - কোন মানুষের রুচি থেকে এই সংজ্ঞা এসেছে, এবং কোন মানুষকে এই সংজ্ঞা মেনে নিতে বাধ্য করা হচ্ছে?

এখানে আরেকটি প্রশ্নের উদয় হয় আর তা হচ্ছে: এই ব্যবস্থা টিকে থাকে কীভাবে? এখানে আমরা গ্রামশির হেজেমনি বা ভাবাধিপত্যের ধারণাটি ধার করতে পারি।[৯] গ্রামশি দেখিয়েছিলেন যে ক্ষমতা শুধু জোর-জবরদস্তিতে টিকে থাকে না - এটি টিকে থাকে সম্মতির মাধ্যমে। যখন আধিপত্যকারী শ্রেণির মূল্যবোধ সমাজের সাধারণ মূল্যবোধ হিসেবে গৃহীত হয়, তখন সেই আধিপত্যকে আর বলপ্রয়োগ করতে হয় না। মানুষ স্বেচ্ছায় সেটি গ্রহণ করে। ডিজিটাল জগতে এই সম্মতি আরও সূক্ষ্মভাবে কাজ করে। ঢাকার একজন ক্যাফে মালিক মিনিমালিস্ট ডিজাইন বেছে নেন বাধ্য হয়ে নয়, বরং তিনি জানেন এটাই বর্তমান বাজারে চলে। একজন তরুণ কনটেন্ট ক্রিয়েটর নির্দিষ্ট ধরনের ভিডিও বানান কারণ অ্যালগরিদম সেটিকে পুশ করে। কিন্তু ভোক্তা মালিকের এই স্বেচ্ছা সিদ্ধান্তের আড়ালে আছে একটি কাঠামোগত বাধ্যবাধকতা। কেউ এই প্রবাহে অংশ না নিলে তার অদৃশ্য হওয়ার ভয় রয়েছে। এর ফলে অর্থনৈতিকভাবে টিকে থাকার প্রশ্নও এখানে আসে। এটি স্বাধীন পছন্দ নয় - এটি কাঠামোর মধ্যে করা পছন্দ, যে কাঠামো নিজে অদৃশ্য।[১০]

একটি শহর এবং তার মানুষের যে নিজস্ব সভ্যতাগত শক্তি থাকে - তার যে আত্মিক ও সামাজিক বন্ধন, তার যে ইতিহাস ও স্মৃতির সাথে গাঁথা স্থানিক পরিচয় - সেটি যখন বাইরের একটি অদৃশ্য কোডের অধীনে নিজেকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করতে বাধ্য হয়, তখন কেবল নান্দনিকতা বদলায় না; বদলে যায় সেই শহরের ভেতরের প্রাণ ও বাইরের গতি।

লাইক, চেক-ইন এবং এসইও 

প্রক্রিয়াটি কীভাবে কাজ করে সেটি আরেকটু খুলে বলা দরকার। একজন নতুন রেস্তোরাঁ মালিক জানেন যে, তার ব্যবসার সাফল্য নির্ভর করে ফটোজেনিক পরিবেশের ওপর কারণ মানুষ Instagram-এ খাবারের ছবি দেয়। সেই ছবিতে লাইক পড়লে আরও মানুষ আসেন। লাইকের অ্যালগরিদম কোন ধরনের ছবিকে বেশি ছড়িয়ে দেয়? এর উত্তর হচ্ছে, উচ্চ-কন্ট্রাস্ট, পরিচ্ছন্ন, মিনিমালিস্ট পরিবেশ। ফলে মালিক সেই রকম অন্দরসজ্জা বেছে নেন।[১১] সারা পৃথিবীতে লাখো কোটি মালিক এই একই যুক্তিতে একই সিদ্ধান্তে পৌঁছাচ্ছেন।

এই ঘটনাটিকে সমাজবিজ্ঞানীরা অ্যালগরিদমিক কনভার্জেন্স বা অ্যালগরিদমীয় অভিসরণ বলেন। পুঁজিবাদের যুগে বাজার প্রতিযোগিতা বিভিন্নতার দিকে নিয়ে যায় - প্রতিটি উদ্যোক্তা নিজের আলাদা পরিচয় তৈরির চেষ্টা করেন। কিন্তু যখন সবাই একই অ্যালগরিদমকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করেন, প্রতিযোগিতার ফলাফল হয় হোমোজেনিটি বা একরূপতা। বৈচিত্র্যের বদলে অভিসরণ।

শুধু ইন্টেরিয়র ডিজাইন নয়, এই প্রক্রিয়া নগর পরিকল্পনাকেও প্রভাবিত করছে। ডেভেলপাররা জানেন কোন ধরনের প্রকল্প বিক্রি হয়, এবং সেই জ্ঞান আসে ডিজিটাল তথ্য থেকে - কোথায় চেক-ইন বেশি হয়, কোন এলাকার ছবি বেশি শেয়ার হয়। গুগল ম্যাপে কোনো জায়গার রেটিং নগর পরিকল্পনার সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে - এটি কোনো অতিরঞ্জন নয় বরং বর্তমান বাস্তবতা।[১২]

এমনকি কফি শপের ভেতরের কোন কোণে আলো বেশি থাকবে তা নির্ধারণ করে দিচ্ছে সেই অদৃশ্য ভূত - সেই অ্যালগরিদম, কারণ সেই কোণে তোলা ছবিতে বেশি রিয়েক্ট তথা এঙ্গেজমেন্ট পাওয়া যায়। একজন মানব স্থপতির পরিবর্তে একটি গাণিতিক অস্তিত্ব ঠিক করে দিচ্ছে আমাদের বাসযোগ্য পরিসরের আকার-আকৃতি। আমরা ভাবি আমরা সৌন্দর্য বেছে নিচ্ছি; আসলে সৌন্দর্য আমাদের বেছে নিচ্ছে।

মিনিমালিজমের শ্রেণি-রাজনীতি

পিয়ের বুর্দিউ তাঁর ‘Distinction’ (১৯৭৯) গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে, রুচি কখনো নিরপেক্ষ নয়।[১৩] যা আমরা সুন্দর বলি বা মার্জিত বলি, তা আসলে একটি সামাজিক শ্রেণির নান্দনিক কোড - যে কোড অর্জন করতে পারলে শ্রেণিটির সদস্যপদ মেলে, না পারলে বাইরে থাকতে হয়। বুর্দিউ এই অদৃশ্য শ্রেণিবিভাজনকে বলেন সাংস্কৃতিক পুঁজি।

মিনিমালিস্ট বা স্ক্যান্ডিনেভিয়ান নান্দনিকতা আজকের শহরে একটি অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক পুঁজির কোড। সাদা দেয়াল, কাঠের আসবাব, এলোমেলো জঞ্জলমুক্ত পরিসর - এগুলো দেখতে সরল কিন্তু অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত ব্যয়বহুল। একটি মিনিমালিস্ট অ্যাপার্টমেন্ট রাখতে হলে আপনার প্রথমে যথেষ্ট বড় বাসা প্রয়োজন, তারপর প্রিমিয়াম ডিজাইনের আসবাবপত্র, তারপর স্টোরেজের সুবিধা যাতে বাসার জঞ্জালগুলো লুকিয়ে রাখা যায়।[১৪] সরলতা এখানে হয়ে গেছে বিলাসিতা।

ঢাকার প্রেক্ষাপটে এটি আরও স্পষ্ট। পুরান ঢাকার মিষ্টি দোকানের কারুকার্য করা ছাদ, মিরপুরের চায়ের স্টলের রঙিন বেঞ্চ, বাংলাবাজারের বইয়ের দোকানের স্তূপ - এই অসুন্দর, অবিন্যস্ত, ক্লাটার্ড পরিসরগুলো ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম বা পিন্টারেস্টে ভালো ছবি দেয় না। ফলে এগুলো অর্থনৈতিক মানচিত্রে পিছিয়ে পড়ে। নতুন বিনিয়োগ যায় মিনিমালিস্ট ক্যাফের দিকে, যেখানে কফির দাম শ্রমিক শ্রেণির একজনের দৈনিক আয়ের প্রায় সমান বা তার থেকেও বেশি।

এই প্রক্রিয়াটির একটি নাম আছে: ‘Digital Gentrification’ বা ‘ডিজিটাল অভিজাতকরণ’। এই অভিজাতকরণে সাধারণত যেটা হয় - ধনী শ্রেণি কোনো পাড়ায় প্রবেশ করে এবং তাদের উপস্থিতি স্থানীয় জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে স্থানীয়দের বাস্তুচ্যুত করে। ডিজিটাল অভিজাতকরণে কোনো মানুষের শারীরিক উপস্থিতিও লাগে না - অ্যালগরিদম নিজেই সেই কাজ করে।[১৫] যে পাড়ায় বেশি চেক-ইন হয়, সেখানে দাম বাড়ে, সেখানে ব্যবসা আসে, এবং পুরনো বাসিন্দারা ধীরে ধীরে সরে পড়তে বাধ্য হয়। ডিজিটাল যুগে সাংস্কৃতিক পুঁজির সবচেয়ে শক্তিশালী রূপ হল অ্যালগরিদমিক সৌন্দর্যবোধ - যা অর্জন করতে পারলে আপনি ডিজিটাল মানচিত্রে দৃশ্যমান হন, না পারলে অদৃশ্য থাকেন।

অনিশ্চয়তার মৃত্যু

১৯৫৮ সালে ফরাসি চিন্তাবিদ গি দ্যুবোখ (Guy Debord) একটি ধারণা প্রস্তাব করেন: ‘dérive’ বা প্রবাহমান পদচারণা।[১৬] ধারণাটি সরল কিন্তু গভীর - শহরের মধ্যে উদ্দেশ্যহীনভাবে হাঁটুন, মানচিত্র ছাড়া, পরিকল্পনা ছাড়া। গলি থেকে গলিতে যান, অপরিচিত স্থানে প্রবেশ করুন – যা আপনাকে আপনার দৈনন্দিন রুটিন থেকে অবকাশ দেবে এবং আপনি বুঝতে পারবেন কিভাবে পরিবেশ মনস্তত্ত্বের উপর প্রভাব ফেলে। এই হারিয়ে যাওয়ার মধ্যে শহরের আসল চরিত্রও উন্মোচিত হয়।

আজ গুগল ম্যাপ সেই dérive-কে হত্যা করেছে। বরঞ্চ আরও নির্ভুলভাবে বললে: গুগল ম্যাপ আমাদের হারিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনকে হত্যা করেছে। যখনই আপনি কোনো নতুন শহরে পা দেন, আপনার ফোনের নীল তীর আপনাকে বলে দেয় ঠিক কোথায় যেতে হবে, কোন পথে যেতে হবে, এবং কত সময় লাগবে। অথচ যখন আপনি হারিয়ে যান এবং একটি অপ্রত্যাশিত দোকান খুঁজে পান, একটি অজানা গলিতে একটি পুরনো মসজিদ দেখেন, একজন অপরিচিত মানুষের সাথে কথা বলেন - এই মুহূর্তগুলো স্মৃতি তৈরি করে, সম্পর্ক তৈরি করে, এবং একটি শহরের সাথে আপনার ব্যক্তিগত ইতিহাস রচনা করে।[১৭]

কিন্তু গুগল ম্যাপের নীল তীর নিরবচ্ছিন্নতার ছেদ বা বিরামকে দূর করে দিয়েছে। ম্যাপের সহায়ক রেস্তোরাঁ খোঁজার অ্যাপ আপনাকে সেরা রেস্তোরাঁটি বাতলে দেয়। ইনস্টাগ্রাম আপনাকে দেখিয়ে দেয় কোন জায়গাটি দেখতে হবে। ফলে আপনি যখন ঢাকায় নতুন আসেন, আপনি ঠিক সেই ক্যাফেতেই যান যেখানে লাখো মানুষ আগে গেছে। আপনি ঠিক সেই দৃশ্যটিই দেখেন যা অন্য সবাই দেখেছে। আপনি ঠিক সেই ছবিটিই তোলেন যা অন্য সবাই তুলেছে।

এই প্রক্রিয়ায় শহর একটি থিম পার্কে পরিণত হয়। থিম পার্কে কোনো অনিশ্চয়তা নেই - সবকিছু পরিকল্পিত, সুরক্ষিত, অপ্টিমাইজড। কিন্তু থিম পার্ক জীবন্ত নয়। পুরান ঢাকার সংকীর্ণ গলিগুলো, যেখানে মশলার গন্ধ এবং ঐতিহাসিক স্থাপত্যের ছোঁয়া একসাথে মেলে - সেগুলো একটি এয়ারস্পেস ক্যাফের চেয়ে ঢাকার কথা বেশি বলে।

ডিজিটাল মানচিত্র পথ দেখায়, কিন্তু পথের অভিজ্ঞতাকে হত্যা করে। এটি গন্তব্যে পৌঁছায়, কিন্তু যাত্রার রোমাঞ্চকর অনুভূতি কেড়ে নেয়।

ঢাকার অবস্থান কোথায়?

এই সমস্ত আলোচনার পর একটি প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই আসে: ঢাকা বা বাংলাদেশের শহরগুলোর ক্ষেত্রে এর বিশেষ তাৎপর্য কী? 

পশ্চিমা শহরগুলোতে এয়ারস্পেস একটি নস্টালজিয়ার বাজার। কীভাবে? এডিসন বাল্ব, উন্মুক্ত ইট, কাঁচা কংক্রিট - এগুলো পশ্চিমে আসলে শিল্প বিপ্লবের শুরুর দিককার ধ্বংসাবশেষ। ডেট্রয়েটের পরিত্যক্ত কারখানা, লন্ডনের পুরনো গুদামঘর - পশ্চিমা শহরগুলো শিল্পায়নের গতিবৃদ্ধির সাথে সাথে সেই কারখানা ও গুদামঘরগুলো হারিয়েছে, এবং এখন সেই হারানো যুগকে নান্দনিকভাবে পুনরুদ্ধার করছে - বাজারের মাধ্যমে। এটা তাদের নিজেদের অতীতের প্রতি নস্টালজিয়া।

কিন্তু ঢাকায় বা বাংলাদেশের গ্রামে এই একই নান্দনিকতা আমদানি হচ্ছে। আমাদের সেই শিল্প বিপ্লবের ইতিহাস নেই, সেই কারখানার স্মৃতিও নেই। ফলে এখানে এটা নস্টালজিয়া নয় - এটা অন্য কারও নস্টালজিয়ার অন্ধ অনুকরণ। ঢাকায় এই একই নান্দনিকতা আমদানি হয়েছে বা হচ্ছে সরাসরি একটি উপনিবেশ-পরবর্তী সংকট তথা  নিজেদের ঐতিহ্যের প্রতি আস্থাহীনতার উপর ভর করে।

বাংলাদেশে যারা আধুনিক ক্যাফে খোলেন, তারা অনেকক্ষেত্রে মনে করেন স্থানীয় নান্দনিকতা - টেরাকোটার কারুকাজ, মোঘল স্থাপত্যের অনুপ্রেরণা, বাংলার মাটির রং - এগুলো পুরনো বা অনুন্নত। আন্তর্জাতিক মানের হতে হলে মিনিমালিস্ট হতে হবে। এটি ফ্রান্জ ফাঁনোর সেই পর্যবেক্ষণের একটি সূক্ষ্ম প্রতিফলন: উপনিবেশ শুধু ভূমি দখল করে না, মনও দখল করে। নিজের সৌন্দর্যের প্রতি অবিশ্বাস সেই মানসিক উপনিবেশের সবচেয়ে গভীর লক্ষণ।[১৮]

এখানে একটি গভীর প্রশ্ন উঠে আসে যা কেবল নান্দনিকতার প্রশ্ন নয়। একটি শহর এবং তার মানুষ যে পরিসরে বাস করে, সেই পরিসর কি কেবলই দেয়াল আর টাইলসের সমষ্টি? নাকি এটি মানুষের সাথে মানুষের, ইতিহাসের আর তার সম্প্রদায়ের একটি সম্পর্কের জায়গা? যে স্থাপত্য এই সম্পর্ককে লালন করে সে স্থাপত্য জীবন্ত। যে স্থাপত্য কেবল ক্যামেরার জন্য তৈরি, সে স্থাপত্য একটি সুসজ্জিত গোরস্থান।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ঢাকার পুরনো পাড়াগুলো - শাঁখারীবাজার, তাঁতীবাজার, নবাবপুর - এগুলো ইতিমধ্যে ডিজিটাল মানচিত্রে প্রায় অদৃশ্য। এগুলোর Instagram-এ উপস্থিতি নেই, Google রেটিং নেই, ইনফ্লুয়েন্সার কভারেজ নেই। ফলে বিনিয়োগ সেখানে যায় না, পর্যটন সেখানে যায় না, এবং প্রজন্মান্তরে সেই স্থানগুলো শুধু ভৌগোলিক নয়, স্মৃতিগতভাবেও বিলুপ্ত হতে থাকে।

প্রতিরোধের সম্ভাবনা

তাহলে কি কোনো উপায় নেই? এই অদৃশ্য ছকটি কি পরিবর্তনযোগ্য?

উত্তর হল হ্যাঁ আছে, তবে তা সহজ নয়। প্রতিরোধের মূল্যটাও সমান নয়। একটি মিনিমালিস্ট ক্যাফের বিকল্প বেছে নেওয়া ঢাকার একজন উদ্যোক্তার জন্য আর্থিক ঝুঁকি। এই অসম মূল্যকে স্বীকার না করে প্রতিরোধের কথা বলাটা সততার সাথে যাবে না।

তবু কিছু পথ আছে। প্রথমত, সচেতনতা অপরিহার্য। যখন আমরা বুঝতে পারব যে, আমাদের পছন্দ আসলে একটি নির্দিষ্ট ক্ষমতার কাঠামোর মধ্যে আকৃতি পেয়েছে - তখন সেই পছন্দের বিষয়ে আমরা আরও ক্রিটিকাল হতে পারব।

দ্বিতীয়ত, স্থানীয় নান্দনিকতার পুনরুদ্ধার একটি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড। বাংলাদেশের স্থপতি, ডিজাইনার, উদ্যোক্তারা যখন টেরাকোটার ইট, মসলিনের মোটিফ, বাংলার গৃহস্থালি নকশাকে সমসাময়িক ভাষায় উপস্থাপন করেন, তারা শুধু একটি ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন না - তারা একটি ঐতিহাসিক বিবৃতি দিচ্ছেন।

তৃতীয়ত, অনিশ্চয়তাকে পুনরায় আলিঙ্গন করা দরকার। কিছু অভ্যাস যেমন, মাঝে মাঝে ফোন বন্ধ করে হাঁটা, Google Maps ছাড়া একটি নতুন জায়গা খুঁজে দেখা, সেই রেস্তোরাঁয় যাওয়া যার কোনো ফেসবুক বা Instagram হ্যান্ডেল নেই - এই সামান্য বিদ্রোহগুলো ব্যক্তিগত স্তরে শুরু হলেও তাদের সামষ্টিক প্রভাব ধীরে ধীরে গভীর হতে পারে।

অজে বলেছিলেন, স্থান হল স্মৃতির শরীর। যদি স্থানগুলো একই রকম হয়ে যায়, তাহলে স্মৃতিও একই রকম হয়ে যাবে। যে সমাজের স্মৃতি নেই, সে সমাজের ভবিষ্যৎও নেই - শুধু বাকি থাকে বর্তমান মুহূর্তের অন্তহীন ভোগ।

শহর স্রেফ ইট-পাথরের কাঠামো নয়, এটি আমাদের সম্মিলিত কল্পনার বস্তুীভূত রূপ। যে শহরে মানুষ কেবল ভোগ করে কিন্তু অর্থ খোঁজে না, সে শহর সুন্দর হতে পারে কিন্তু জীবন্ত নয়। সেই অদৃশ্য স্থপতিকে চ্যালেঞ্জ করি কীভাবে, যে ছক শুধু আমাদের দেয়ালের রং বদলাচ্ছে না, আমাদের কল্পনার পরিসরও সংকুচিত করছে? এই প্রবন্ধে সেই প্রশ্নের বিশদে যাব না। এখানে শুধু ফেনোমেননটা চিহ্নিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। শেষ করব কয়েকটি প্রশ্ন দিয়ে - এই ছকের কারিগর যারা, তাদের বিশ্ববীক্ষা আর আপনার বিশ্ববীক্ষা কি একই? এই ছক কি আপনার চোখে ধরা দেয়?  ধরা না দিলে এই ছকের জালে আপনি ফেঁসে যান কেন?


টীকা ও তথ্যসূত্র
[1]  Kyle Chayka, Filterworld: How Algorithms Flattened Culture. Doubleday, 2024.
[2]  Ibid. Chayka আলোচনা করেন কীভাবে taste-making অ্যালগরিদম দ্বারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে গঠিত হয়।
[3]  Marc Auge, Non-Places: Introduction to an Anthropology of Supermodernity. Translated by John Howe. Verso Books, 1995.
[4]  Ibid., pp. 77-101. অজের অ-স্থানের বিস্তারিত বর্ণনা এই অধ্যায়গুলোতে।
[5]  Manuel Castells, The Rise of the Network Society. Blackwell Publishers, 1996. Vol. 1 of The Information Age trilogy.
[6]  Ibid., pp. 378-428.
[7]  এই বিশ্লেষণের বিস্তার দেখুন: Safiya Umoja Noble, Algorithms of Oppression. NYU Press, 2018.
[8]  Michel Foucault, Power/Knowledge: Selected Interviews and Other Writings 1972-1977. Pantheon Books, 1980.
[9]  Antonio Gramsci, Selections from the Prison Notebooks. Translated by Quintin Hoare and Geoffrey Nowell Smith. International Publishers, 1971.
[10]  এই কাঠামোগত বাধ্যবাধকতার বিশ্লেষণ দেখুন: Shoshana Zuboff, The Age of Surveillance Capitalism. PublicAffairs, 2019.
[11]  Nathan Jurgenson, The Social Photo: On Photography and Social Media. Verso, 2019.
[12]  Shannon Mattern, A City Is Not a Computer. Places Journal, February 2017.
[13]  Pierre Bourdieu, Distinction: A Social Critique of the Judgement of Taste. Harvard University Press, 1984. মূল ফরাসি: La Distinction, 1979.
[14]  Kyle Chayka, The Longing for Less: Living with Minimalism. Bloomsbury Publishing, 2020.
[15]  David Wachsmuth and Alexander Weisler, Airbnb and the rent gap. Environment and Planning A: Economy and Space, 2018.
[16]  Guy Debord, Theory of the Derive. Internationale Situationniste, No. 2, December 1958.
[17]  Nassim Nicholas Taleb, The Black Swan. Random House, 2007. বিশেষত Chapter 13-14.
[18]  Frantz Fanon, Black Skin, White Masks. Translated by Richard Philcox. Grove Press, 2008. মূল: Peau noire, masques blancs, 1952.