মেন্যু
Menu

ইসলামি ঐতিহ্যে বিতর্কশাস্ত্র

২৫ অক্টোবর, ২০২৬

তর্ক-বিতর্ক মানুষের স্বভাবজাত বিষয়। মানুষ তার দৈনন্দিন জীবনে চারপাশের মানুষের সাথে নানা বিষয় নিয়ে বিতর্ক করে। আল্লাহ তায়ালা মানুষের ব্যাপারে বলেছেন–

وَكَانَ الْإِنسَانُ أَكْثَرَ شَيْءٍ جَدَلًا

“আর আর মানুষ সবচেয়ে বেশি তর্ককারী।”

এছাড়া হাদিসে আছে, হযরত আবু হুরায়ারা রা. থেকে বর্ণিত–

احتَجَّ آدَمُ وموسى، فقال له موسى: أنتَ آدَمُ الذي أخرَجَتكَ خَطيئَتُكَ مِنَ الجَنَّةِ؟! فقال له آدَمُ: أنتَ موسى الذي اصطَفاكَ اللهُ برِسالاتِه وبكَلامِه، ثُمَّ تَلومُني على أمرٍ قُدِّرَ عليَّ قَبلَ أن أُخلَقَ؟! فقال رَسولُ اللهِ صلَّى اللهُ عليه وسلَّم: فحَجَّ آدَمُ موسى

“আদম আ. ও মূসা আ. এর মধ্যে যুক্তি-তর্ক হলো। মূসা আ. তাকে বললেন, আপনিই কি সেই আদম, যার ভুলের কারণে আপনাকে জান্নাত থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল?! আদম আ. তাকে বললেন, আপনিই কি সেই মূসা, যাকে আল্লাহ তার রিসালাত (বার্তা) এবং তার বাণীর মাধ্যমে মনোনীত করেছেন? এরপরও আপনি আমাকে এমন একটি বিষয়ের জন্য দোষারোপ করছেন, যা আমাকে সৃষ্টি করার আগেই আমার তাকদীরে নির্ধারণ করে রাখা হয়েছিল?! অতঃপর রাসূলুল্লাহ সা. বললেন: এভাবে যুক্তি-তর্কে আদম আ. মূসা আ.-এর ওপর প্রাবল্য লাভ করলেন (বা যুক্তিতে জয়ী হলেন)।” (মুসলিম, হাদিস নং ৩৪০৯ ও বুখারি, হাদিস নং ২৫৫২)

এই হাদিসে দেখা যায়, মুসা আ.ও আদম আ.-ও বিতর্ক করেছেন। শয়তানও আল্লাহর সাথে বিতর্ক করেছে এবং চিরঅভিশপ্ত হয়েছে। এছাড়া আল্লাহ তায়ালা কুরআনুল কারিমে বলেছেন–

وَجَادِلْهُم بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ

“এবং তাদের সাথে সুন্দরভাবে বিতর্ক কর”

উমাইয়া ও আব্বাসি আমলে মুসলিমদের মধ্যে নানা ঢংয়ের, নানা পদ্ধতির বিতর্কের উদ্ভব ঘটে। নানাবিধ জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চার মজলিশে আলেম ওলামাগণ এইসকল বিতর্কের জন্ম দেন। সাহিত্য, আকিদা, দর্শন থেকে ফিকহ পর্যন্ত সর্বাঙ্গনে বিতর্করীতির প্রভাব লক্ষণীয় ছিলো।

বিতর্কশাস্ত্র ও যুক্তিবিদ্যা এক বিষয় নয়। যুক্তিবিদ্যাকে আরবিতে বলা হয়, মানতিক। আর বিতর্কশাস্ত্রকে বলা হয়, ‘ইলমুল মুনাজারা (علم المناظرة) বা ইলমু আদাবিল বাহাছ ওয়াল মুনাজারা (علم أدب البحث والمناظرة) বা ইলমুল জাদাল (علم الجدل)’।

অনেকের মতে, ‘ইলমুল মুনাজারা’ এবং ‘ইলমুল জাদাল’ দুটি আলাদা বিষয়। ত্বশ কুবরা যাদাহ, সিদ্দিক হাসান খান ও ইবনু খালদুন বিতর্ক বিষয়ক তিনটি শাস্ত্রের কথা উল্লেখ করেছেন। একটি হলো, ইলমুন নজর বা ইলমুল মুনাজারা; দ্বিতীয়টি হলো, ইলমুল জাদাল; আর তৃতীয়টি হলো, ইলমুল খিলাফ।

আমরা প্রথমে ইলমুল খিলাফ, তারপর ইলমুল জাদাল ও সর্বশেষ ইলমুল মুনাজারা সম্পর্কে জানব।

ইলমুল খিলাফ

ইলমুল খিলাফ আদতে একটি বর্ণনামূলক জ্ঞান (descriptive knowledge), যেখানে বিভিন্ন মাজহাবের ফকিহদের মধ্যকার বিতর্কিত বিষয়গুলো দলীল সহকারে উপস্থাপন করা হয়।

ইবনু খালদুন বলেন–

“নিজেদের মাজহাব বা ইমামের ফিকহকে শুদ্ধ হিসেবে উপস্থাপন করার নিমিত্তে ফোকাহারা তর্কে লিপ্ত হতেন। এই সকল তর্কে ফোকাহারা নিজেদের মাজহাব বা ইমামের দলীল ও ইজতেহাদের ভিত্তি উল্লেখ করতেন। এইসব মতভেদপূর্ণ বিষয় নিয়ে ইলমুল খিলাফিয়াত গঠিত।”

আর ফোকাহারা তর্কে লিপ্ত হওয়ার জন্য যে শাস্ত্র বা পদ্ধতি ও রীতিনীতির দ্বারস্থ হতেন তা হলো, ইলমুল জাদাল; একটুপরেই আমরা ইলমুল জাদাল নিয়ে আলোচনা করব।

মদীনাতুল উলুম গ্রন্থকার বলেছেন, “ইলমুল খিলাফ হলো, ‘মাদ্দাহ’ বা উপকরণ; আর ইলমুল জাদাল হলো, ‘সুরত’ বা আকার-আকৃতি ও ছাঁচ। এর মানে হলো, যেসব ফিকহি বিষয়গুলোতে ইখতিলাফ বা বিতর্ক সেগুলো হলো মাদ্দাহ বা উপকরণ; আর যেসব ‘সুরত’ অর্থাৎ আকার-আকৃতি বা পদ্ধতি অনুসরণ করে বিতর্ক পরিচালিত হয় তা হলো, ইলমুল জাদাল।

হানাফি ও শাফেয়ী ফোকাহাদের মধ্যে বিতর্কের পরিমান সবচেয়ে বেশি। তাই, ইলমুল খিলাফে তাদের রচিত গ্রন্থের সংখ্যাও অনেক। ইলমুল খিলাফ শাস্ত্রের কিতাবাদির মধ্যে রয়েছে–

১. ‘আল হুজ্জাহ আলা আহলিল মদিনাহ’, এটির রচয়িতা ইমাম মুহাম্মাদ ইবনু হাসান আশ শায়বানি।

২. ‘আত তাজরিদ’, এটির রচয়িতা ইমাম আবুল হুসাইন কুদুরি

৩. ‘তা’সিসুন নাজর’, এটির রচয়িতা কাজি আবু যায়েদ দাব্বুসি

৪. ‘ উয়ুনুল আদিল্ল্যাহ ফি মাসায়িলিল খিলাফ বাইনা ফোকাহায়িল আমসার’, এটির রচয়িতা কাজি ইবনুল কাসার বাগদাদি ইত্যাদি।

ইলমুল জাদাল

জাদাল অর্থ বিতর্ক, ঝগড়া ও বিবাদ। ইংরেজিতে একে বলা হয়, Dialectic অথবা Argumentation।

‘মু’জামুল মুস্তালাহাত আশ শারইয়্যাহ’তে ইলমুল জাদাল শাস্ত্রের সংজ্ঞাতে এসেছে–

“শরয়ী দলীলাদির উপর আপত্তি উপস্থাপন ও এসবের জওয়াবদানের পদ্ধতি।”

আর এর উদ্দেশ্যের ব্যাপারে শায়েখ আবু জাহরা বলেন–

“জাদালের উদ্দেশ্য হলো, প্রতিপক্ষের উপর কোনো কিছু চাপিয়ে দেয়া এবং দলীল উপস্থাপন করে তার উপর জয়ী হওয়া।”

উপরের সংজ্ঞা ও উদ্দেশ্য থেকে প্রতীয়মান হয় যে, জাদাল হলো দ্বীনী বিষয়ে বা শরয়ি অঙ্গনে তর্ক-বিতর্কের রীতিনীতি। যেমন, ফিকহ, উসূলুল ফিকহ ও কালামশাস্ত্রে সংগঠিত বিতর্কসমূহে ব্যবহৃত বিতর্ক পদ্ধতি। আর তর্ক-বিতর্কের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে পরাস্ত ও ঘায়েল করাই জাদালের মূখ্য উদ্দেশ্য।

ইবনু খালদুন তার মুকাদ্দিমায় বলেন–

“ইলমুল জাদাল হলো বিতর্ক-পদ্ধতির জ্ঞান, যে বিতর্কগুলো বিভিন্ন মাজহাবের ফকিহ ও অন্যান্যদের মধ্যে সংঘটিত হতো। বিতর্কে লিপ্ত দুই পক্ষই দলীলগ্রহন ও জওয়াবদানের সময় লাগামহীনভাবে যুক্তি প্রদর্শন করতেন। তাই, ইমামগণ বিতর্কে লিপ্ত দুই পক্ষের জন্য কিছু আদব নির্ধারন করেন…” এভাবেই ইলমুল জাদাল শাস্ত্রের বিকাশ ঘটে।

ইমাম আবদুল কাহের বাগদাদি বলেন–

“আমি ‘আদাবুল জাদাল ওয়া কাওয়ানিনুন নজর’ বা বিতর্কের আদব ও চিন্তার পদ্ধতি বিষয়ে আমাদের সাথীদের ও তাদের বিরুদ্ধবাদীদের বইপুস্তক পর্যালোচনা করে দেখলাম, তাদের অনেকের বই বিতর্কের ক্ষেত্রে ‘ফকিহদের রীতিনীতি’র উপর সীমাবদ্ধ, সেগুলোতে মুতাকাল্লিমিনদের রীতিনীতির কোনো স্থান নেই; আবার মুতাকাল্লিমিন অনেকের বই দেখলাম, তাদের পুস্তকে শুধু ইলমুল কালামের সাথে সংশ্লিষ্ট বিতর্কের রীতিনীতি উল্লেখ আছে, ফকীহদের রীতিনীতির কোনো স্থান নেই।” (আ’ইয়ারুন নজর, পৃ. ১১২, তাহকীক আহমদ মুহাম্মদ আররুবি, দারু আসফার, কুয়েত)

ইমাম আবদুল কাহের বাগদাদির এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট হয়, বিতর্কশাস্ত্রের দুইটি ধারা রয়েছে। একটি হলো, ফকিহদের ধারা এবং আরেকটি হলো, মুতাকাল্লিমিনদের ধারা। আর দুই ধারার লোকদেরই বিতর্কের নিজস্ব রীতিনীতি রয়েছে, একে অপরে রীতিনীতির ধার ধারেন না।

মূলত ফিকহি জাদালের উৎপত্তি হলো, ইজতেহাদ থেকে। কেননা, কুরআন ও সুন্নাহের নস বা টেক্সট হলো সীমাবদ্ধ; রাসূল সা. এর ওফাতের পর কুরআন নাজিল ও হাদিস নতুন করে আসার পথ বন্ধ হয়ে গিয়েছে। তাই, নিত্যনতুন উদ্ভূত বিষয়ের ক্ষেত্রে ফকীহগণ ইজতেহাদের মাধ্যমে নিজেদের মতামত ব্যক্ত করতেন। তারপর প্রতিপক্ষের নিকট নিজেদেরকে বা নিজেদের মতকে সত্য হিসেবে উপস্থাপনের জন্য জাদাল বা বাকবিতন্ডার শরণাপন্ন হতেন। এভাবেই ফিকহি জাদালের বিকাশ ঘটে।

আর মুতাকাল্লিমিনদের নিকট জাদালের উৎপত্তি হয়েছে, উমাইয়া ও আব্বাসি আমলে। বিশেষ করে, খলিফা মামুনের আমলে। গ্রীক দর্শন আরবিতে অনুবাদ হওয়ার পর থেকে এই আকিদাগত বিষয়ে জাদালের সূচনা হয়। আকিদাগত জাদালের তেমন কোনো সুনির্দিষ্ট ও স্বতন্ত্র গ্রন্থ পাওয়া যায় না। এর কারণ হলো, কালামের বইপুস্তকগুলো জাদালের আশ্রয় নিয়েই লেখা হয়েছে, বইগুলোর পরতে পরতে জাদালের রীতিনীতির বাস্তবিক প্রয়োগ ঘটানো হয়েছে। তাই, মুতাকাল্লিমিনদের আলাদা করে কালামি জাদালের গ্রন্থ রচনা করতে হয় নি; যেমনটি ফকীহগণ করেছেন।

ত্বশ কুবরা যাদাহ বলেন–

“ফিকহি জাদাল শাস্ত্রে সর্বপ্রথম গ্রন্থ রচনা করেন আবু বকর মুহাম্মদ ইবনু ইসমাঈল আল কিফাল শাশি শাফেয়ী।”

অনেকে বলেন, ইলমুল জাদালে সর্বপ্রথম শাস্ত্রীয় কিতাব রচনা করেন, ইমাম রুকন উদ্দিন আ’মিদি। তার ব্যাপারে ইবনু খাল্লিকান বলেন, “উনার পূর্ণ নাম হলো, আবু হামেদ মুহাম্মদ ইবনু মুহাম্মদ আল আ’মিদি। তার উপাধি ‘রুকন উদ্দিন’। তিনি সমরকন্দের প্রসিদ্ধ হানাফি ফকিহ ছিলেন। বলা হয়, তিনি সর্বপ্রথম জাদালশাস্ত্রে ‘ইরশাদ’ নামক নাতিদীর্ঘ গ্রন্থ রচনা করেন। তিনি ৬১৬ হিজরিতে বুখারাতে ইন্তিকাল করেন।” (ওফায়াতুল আ’ইয়ান, ৪/২৫৭)

এছাড়া জাদালশাস্ত্রের প্রসিদ্ধ গ্রন্থগুলো হলো–

১. ‘আল মিনহাজ ফি তারতিবিল হিজাজ’, এর রচয়িতা আবুল ওয়ালিদ বাজি মালেকি

২. ‘আল মাউ’না ফিল জাদাল’, এর রচয়িতা আবু ইসহাক শিরাজি শাফেয়ি

৩. ‘ আল কাফিয়া ফিল জাদাল’, এর রচয়িতা ইমামুল হারামাইন জুয়াইনি

৪. ‘আল জাঝাল ফি ফান্নিল জাদাল’, এর রচয়িতা তুফি

৫. ‘আল ইদ্বাহ ফি বায়ানিল ইস্তিলাহ’, এর রচয়িতা ইবনুল জাওজি।

ইমাম আবদুল কাহের বাগদাদি বিতর্কশাস্ত্রে ‘সমন্বয়বাদী ধারা’র সূচনা করেছিলেন। তিনি ‘’ইয়ারুন নজর’ নামে গ্রন্থ রচনা করেন। এই গ্রন্থের মুকাদ্দিমায় আবদুল কাহের বাগদাদি তিন ধরনের জাদালের উল্লেখ করেছেন। একটি হলো, ফালসাফি বা দার্শনিক জাদাল; দ্বিতীয়টি হলো, কালামি বা আকিদাগত জাদাল এবং সর্বশেষ হলো, ফিকহি জাদাল। তিনি বলতে চেয়েছেন, এই তিন প্রকার জাদালেই রীতিনীতির কমতি রয়েছে। তাই তিনি এই তিনটি ধারাকে সমন্বয় করে ‘অহদাতুল মানহাজ ফিল বাহাছ আল মা’রিফি’ বা ‘জ্ঞানগত বিষয়ে আলোচনা বা বিতর্কের অভিন্ন পদ্ধতি’ তৈরির ব্যাপারে এই গ্রন্থে আলোচনা করেছেন। তিনি দাবি করেন, জ্ঞানগত বিষয়ের প্রকৃতি বা ধরণ যেমনি হোক, তাতে আলোচনা বা বিতর্কের অভিন্ন পদ্ধতি থাকা দরকার; কেননা সব বিষয়েই বিতর্কের সাধারণ আলোচনা হলো ‘দলীলের উপর নির্ভরতা ও দাবিকৃত বিষয়ের সাথে যৌক্তিকভাবে দলীলের সংযোগ করা’ নিয়ে। আর এর মাধ্যমে সম্ভবত তিনি ইলমু আদাবিল বাহাছ ওয়াল মুনাজারা বুঝাতে চেয়েছেন।

জাদালশাস্ত্রে যেসব বিষয়ে আলোচনা হয়, সেগুলো হলো–

  • জাদাল সংক্রান্ত পরিভাষা ও সেগুলোর সংজ্ঞা,

  • প্রশ্নের প্রকার। দলীল সম্পর্কে অথবা কোনো বিষয়ের উপর কোনো দলীল কিভাবে নির্দেশ করে, সে সম্পর্কে প্রশ্ন করার পদ্ধতি,

  • দলীলের প্রকার এবং কোনো কিছু থেকে দলীল গ্রহণ করার পদ্ধতি,

  • দলীলের উপর আপত্তি ও উত্থাপিত আপত্তির জবাবদানের পদ্ধতি,

  • বিতর্ক করার আদব, ইত্যকার বিষয় নিয়ে ইলমুল জাদালে আলোচনা হয়ে থাকে।


ইলমু আদাবিল বাহাছ ওয়াল মুনাজারা

সাইয়েদ শরিফ জুরজানী ‘মুনাজারা বা বিতর্কে’র সংজ্ঞায় তার তারিফাত কিতাবে বলেন–

“সত্য অনুসন্ধানের উদ্দ্যেশ্যে, কোনো বিষয়ে, দুই পক্ষের নজর বা পর্যবেক্ষন।” (তা’রিফাত, ‘মুনাজারা’র মাদখাল দ্রষ্টব্য)

আমিন শানকীতির ভাষায়–

“দুই পক্ষের বাকবিতন্ডা, যেখানে উভয়েই প্রতিপক্ষের বক্তব্যকে বাতিল এবং নিজের বক্তব্যকে হক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়, এবং উভয়েরই সত্য উন্মোচনের সদিচ্ছা রয়েছে।” (আদাবুল বাহাছ ওয়াল মুনাজারা, আল্লামা মুহাম্মদ আল আমিন আশ শিনকিতি, তাহকিক সউদ ইবনু আবদুল আজিজ আরিফি, দারু ইবনু হাযম, পৃ. ১৩৯)

এই দুই সংজ্ঞাতে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে, মুনাজারায় লিপ্ত দুই পক্ষের মধ্যেই সত্য অনুসন্ধানের বা সত্যকে তালাশ করার একটি আকাঙ্ক্ষা রয়েছে। অন্যদিকে, ইলমুল জাদাল হলো, প্রতিপক্ষকে নিজের বক্তব্য থেকে সরিয়ে অন্য মত বা নিজের মত মানতে বাধ্য করার মাধ্যমে ঘায়েল করা। এটাই হলো, ইলমুল মুনাজারা ও ইলমুল জাদালের মধ্যকার তফাত। এই তফাত একইসাথে উদ্দ্যেশ্যগত ও আখলাকি।

উদ্দ্যেশ্যগত ও আখলাকি তফাত ছাড়াও ইলমুল জাদাল ও ইলমুল মুনাজারার মধ্যে পরিধিগত তফাত রয়েছে, যা ইতোপূর্বেও উল্লেখ করা হয়েছে। ইলমুল জাদালের পরিধি শুধু ধর্মীয় বিষয়াবলির মধ্যে সীমাবদ্ধ। অন্যদিকে, ইলমুল মুনাজারা সার্বজনীন। জ্ঞানবিজ্ঞানের যেকোনো শাখায় সত্য তালাশের একটি হাতিয়ার। এজন্যই ইবনু সদর উদ্দিন ‘ফাওয়ায়েদে খা-ক্বানিয়া’ কিতাবে মুনাজারার এই জ্ঞানকে মানতিকের সাথে তুলনা করে বলেছেন, “এই জ্ঞান মানতিকের মতো সকল জ্ঞানবিজ্ঞানের খেদমত করে।” এছাড়াও মেথডলজিক্যাল একটি পার্থক্য রয়েছে। তা হলো, ইলমুল জাদালে ‘মাশহুরাত’ বা মানুষের নিকট প্রসিদ্ধ ও ‘মুসাল্লামাত’ বা প্রতিপক্ষের মেনে নেয়া কোনো বক্তব্যের আশ্রয় নিয়ে প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করা হয়। কিন্তু ইলমুল মুনাজারায় বিতর্কের জন্য ‘ইয়াকিনিয়াত’ বা অকাট্য প্রমাণ প্রয়োজন পড়ে; কারণ ইলমুল মুনাজারার মাকসাদ হলো, সত্যের নিকট পৌছানো। এটিই মূলত ইলমুল জাদাল ও ইলমুল মুনাজারার মধ্যকার আসল তফাত।

এই শাস্ত্রের সবচেয়ে প্রসিদ্ধ মতন বা ভাষ্যগ্রন্থ রচনা করেন, মুহাম্মাদ ইবনু আশরাফ আল হুসাইনী আস সমরকন্দি। তিনি ‘আদাব আস সমরকান্দিয়া’ নামক সংক্ষিপ্ত পুস্তক রচনা করেন। হাজি খলিফার মতে, তিনি ৬০০ হিজরিতে ইন্তেকাল করেন। কেউ কেউ বলেছেন, তার মৃত্যুসন ৬৯০ হিজরি। আবার কেউ বলেছেন, ৮৮৭ হিজরি। গ্রহণযোগ্য মত হলো, ৭২২ হিজরিতে মারা যান।

এছাড়া ইলমুল মুনাজারার প্রসিদ্ধ গ্রন্থগুলো হলো–

১. ‘আর রিসালাহ ফি আদাবিল বাহাস’, এর রচয়িতা আদুদ্দিন আল ইজি

২. ‘আর রিসালাহ আল ওলাদিয়া’, এর রচয়িতা মুহাম্মাদ আল মারআশি সেলজুকি যাদাহ

৩. ‘আদাবুল ফাদ্বেল’, এর রচয়িতা ত্বশ কুবরা যাদাহ।

আর আধুনিক সময়ের সবচেয়ে প্রসিদ্ধ গ্রন্থ হলো, শায়েখ মুহিউদ্দিন আবদুল হামিদের লিখিত ‘রিসালাতুল আদাব ফি ইলমি আদাবিল বাহাছ ওয়াল মুনাজারা।

এই শাস্ত্রগুলোর সংক্ষিপ্ত পরিচয় প্রদানের পর, আমরা ত্বশ কুবরা যাদাহর ‘মিফতাহুস সাআ’দা’ গ্রন্থে, তার কয়েকটি কথা উদ্ধৃত করে সমাপ্তি টানবো।

তিনি বলছেন, “কিন্তু ইলমুল খিলাফের গ্রন্থগুলো আজ বিলুপ্তপ্রায়। সেগুলোর অবশিষ্টাংশও ধীরে ধীরে হারিয়ে গেছে। আমাদের যুগে এসে এ শাস্ত্রের চিহ্নটুকুও প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। এমনকি বর্তমান যুগের তালিবুল ইলমরাও মুনাযারা, জাদাল ও খিলাফের মধ্যকার পার্থক্য বুঝতে পারে না। এ-সংক্রান্ত গ্রন্থাবলি সম্পর্কে জানা তো দূরের কথা, সেগুলোর আলোচিত কিছু মাসআলা সম্পর্কেও তাদের ধারণা নেই।

এ যুগের অবস্থা আল্লাহই ভালো জানেন! এ যুগের ইলমুল কালাম এমন এক কালামশাস্ত্রে পরিণত হয়েছে, যার কোনো কার্যকর প্রভাব নেই; ইলমুল খিলাফ এমন এক শাস্ত্রে পর্যবসিত হয়েছে, যার কোনো বাস্তব ফলাফল নেই। এখানে মৌলিক বিষয়গুলো পরিত্যক্ত উচ্ছিষ্টের মতো পড়ে আছে, আর সুপরিচিত বিষয়গুলোও যেন অপরিচিত হয়ে উঠেছে।”