মেন্যু
Menu

সম্পদের মূল্য ও মর্যাদা বিষয়ক মাকাসিদ | ইউসুফ আল কারযাভী

৯ এপ্রিল, ২০২৫
ক. ইসলামে সম্পদের মর্যাদা ও গুরুত্ব

ইসলামের দৃষ্টিতে, মানুষের ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক জীবনে সম্পদ খুবই গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। দুনিয়াবি ও আখিরাত উভয় ব্যাপারেই আছে সম্পদের ভূমিকা। এই ব্যাপারটি আমাদের কাছে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে, যদি আমরা সম্পদ বিষয়ে খ্রিষ্টধর্ম ও ইসলামের শিক্ষা পারস্পরিক তুলনা করি। New Testament-এর নির্ভরযোগ্য কিতাবে ঈসা মাসিহর তরফ থেকে বর্ণনা করা হচ্ছে—

Jesus looked at him and said, “How hard it is for the rich to enter the kingdom of God! Indeed, it is easier for a camel to go through the eye of a needle than for someone who is rich to enter the kingdom of God.”

“যিশু তার দিকে তাকালেন এবং বললেন, যাদের ধন-সম্পদ আছে, তাদের পক্ষে পক্ষে ঈশ্বরের রাজ্যে প্রবেশ করা কতইনা দুষ্কর! প্রকৃতপক্ষে, ঈশ্বরের রাজ্যে সম্পদশালীর প্রবেশ করা অপেক্ষা বরং সুঁইয়ের ছিদ্র দিয়ে উটের প্রবেশ করা সহজ।”1

যিশুর কাছে এক ব্যক্তি এসে তার অনুসরণ, অনুকরণ ও আনুগত্য করতে চাইল। তার সাথে পথ চলতে ইচ্ছা পোষণ করল। তখন যিশু তাকে বললেন—

“If you would be perfect, go, sell what you possess and give to the poor, and you will have treasure in heaven; and come, follow me.”

“তুমি যদি কামালিয়াত হাসিল করতে চাও, তাহলে যাও তোমার যা কিছু আছে তা সব বিক্রি করে দাও এবং গরিবদের দান করে দাও; আর তাহলেই তুমি জান্নাতে প্রাচুর্য লাভ করিবে। তারপর আসো, আমার অনুসরণ কর।”2

সম্পদ সম্পর্কে এই হচ্ছে খ্রিষ্টধর্মের দৃষ্টিভঙ্গি। কিন্তু ইসলাম সম্পদকে দেখে ভিন্ন এক দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে। ইসলাম মনে করে, সম্পদ হচ্ছে শরিয়তের দুনিয়াবি ও আখিরাতি, ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক মাকাসিদ হাসিল করার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। সম্পদ ছাড়া কোনো ব্যক্তির পক্ষেই তার জীবন রক্ষা করা সম্ভব নয়। এই সম্পদের মাধ্যমেই সে খায়-দায়, পান করে, পরিধান করে, থাকার ঘর বানায়। সম্পদের মাধ্যমেই সে অস্ত্র নির্মাণ করে, যার সাহায্যে সে নিজেকে, নিজের পরিবার-পরিজন ও সম্মান-মর্যাদাকে রক্ষা করে; এর মাধ্যমেই সে উন্নতি ও তরক্কি করে তার জীবনের।

এই সম্পদের মাধ্যমেই সে জাকাত দেয়, সদকা করে, দাস আজাদ করে এবং ভালো কাজে অংশগ্রহণ করে; যেমনটি আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেছেন—

তবে সে তো বন্ধুর গিরিপথে প্রবেশ করেনি। আর কিসে আপনাকে জানাবে—বন্ধুর গিরিপথ কী? এটা হচ্ছে দাসমুক্তি। অথবা ক্ষুধার দিনে খাদ্যদান— এতিম আত্মীয়কে অথবা দারিদ্র-নিষ্পেষিত নিঃস্বকে। তদুপরি সে তাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায় যারা ঈমান এনেছে এবং পরস্পরকে উপদেশ দিয়েছে ধৈর্য ধারণের, আর পরস্পর উপদেশ দিয়েছে দয়া অনুগ্রহের।” সূরা বালাদ : ১১-১৭

এ কারণেই আল কুরআনুল কারিম সম্পদকে মানবজীবনের ‘قيام’ বা ‘قوام’ অর্থাৎ ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করেছে। আধুনিক যুগের ভাষায়, যাকে বলা হয় ‘জীবনস্নায়ু’। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন—

আর তোমরা বোকাদের তোমাদের ধন-সম্পদ অৰ্পণ কর না, যাকে আল্লাহ তোমাদের জীবনযাত্রার অবলম্বন বা ভিত্তি বানিয়েছেন।” সূরা নিসা : ০৫

এছাড়াও আল কুরআন বহু নবিকে ধনাঢ্যতা ও সম্পদের গুণে গুণান্বিত করেছে, যেমন সেই সকল নবির কথা বলা যেতে পারে, যাদেরকে আল্লাহ তায়ালা শাসনক্ষমতা দান করেছিলেন। এর মাঝে আছেন ইউসুফ আ., যাকে আল্লাহ তায়ালা মিসরে ক্ষমতাসীন করেছিলেন; ফলে তিনি অবস্থান করতে পারতেন, যেখানে ইচ্ছা সেখানে। আরও আছেন দাউদ আ., যাকে আল্লাহ তায়ালা শাসনক্ষমতা ও হিকমত দান করেছিলেন। আছেন সুলাইমান আ., যাকে আল্লাহ তায়ালা এমন ক্ষমতা দান করেছিলেন, যা তারপর দুনিয়ায় আর কাউকে দেওয়া হবে না।

আল কুরআন আমাদের কাছে বর্ণনা করছে, সত্তাগতভাবে সম্পদ আজাব, ঘৃণ্য বা খারাপ কোনো কিছু নয়; যেমনটি মনে করে থাকে কিছু কিছু ধর্ম ও দর্শনের অনুসারী। এই সকল ধর্ম ও দর্শন দুনিয়ার পবিত্র বস্তুরাজি থেকেও বঞ্চিত থাকা এবং দেহকে শাস্তি দেওয়ার মাধ্যমে রুহানি তরক্কি হাসিল করার নীতিতে বিশ্বাসী। যেমন— ভারতের ব্রাহ্মণ্যবাদ, পারস্যের বৌদ্ধ ধর্ম, গ্রীকের জেনোবাদীরা (Stoics) এবং খ্রিষ্টধর্ম, বিশেষত খ্রিষ্টধর্মের বৈরাগ্যবাদী চিন্তা।

কিন্তু বিপরীতে আমরা দেখ, কুরআন বহু আয়াতে সম্পদকে ‘خير’ বা কল্যাণ হিসেবে অভিহিত করেছে। যেমন আল্লাহ তায়ালা মানুষ সম্পর্কে বলেছেন—

আর নিশ্চয় সে ধন-সম্পদের আসক্তিতে প্রবল।” সূরা আদিয়াত : ০৮

আল্লাহ তায়ালা আরও বলছেন—

তারা কী ব্যয় করবে, সে সম্পর্কে আপনার কাছে প্রশ্ন করে। বলুন, যে ধন-সম্পদ তোমরা ব্যয় করবে তা পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন, এতিম, মিসকিন এবং মুসাফিরদের জন্য। উত্তম কাজের যা কিছুই তোমরা কর, আল্লাহ সে সম্পর্কে সম্যক অবগত।” সূরা বাকারা : ২১৫

আল্লাহ আরও বলছেন—

তোমাদের মধ্যে কারো মৃত্যুকাল উপস্থিত হলে, সে যদি ধন-সম্পত্তি রেখে যায়, তবে প্রচলিত ন্যায়নীতি অনুযায়ী তার পিতা-মাতা ও আত্মীয় স্বজনের জন্য অসিয়ত করার বিধান তোমাদেরকে দেওয়া হল। এটা মুত্তাকিদের ওপর কর্তব্য।” সূরা বাকারা : ১৮০

অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, এই আয়াতগুলোতে ‘خير’ বা কল্যাণ বলতে ধন-সম্পদকে বোঝানো হয়েছে।

এছাড়াও অসংখ্য আয়াতে, সম্পদ ও রিজিকের প্রশস্তাকে এই দুনিয়ায় নেককার বান্দাদের জন্য আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের তাৎক্ষণিক পুরস্কার হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।

আল্লাহ তায়ালা নূহ আ. এর জবানিতে বলছেন—

তারপর বলেছি, তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর, নিশ্চয় তিনি মহাক্ষমাশীল, তিনি তোমাদের জন্য প্রচুর বৃষ্টিপাত করবেন। আর তিনি তোমাদেরকে সমৃদ্ধ করবেন ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে এবং তোমাদের জন্য স্থাপন করবেন উদ্যান ও প্রবাহিত করবেন নদী-নালা।” সূরা নূহ : ১০-১২

অন্যত্র আল্লাহ তায়ালা নবিদের সত্যবাদী একনিষ্ঠ অনুসারীদের ব্যাপারে বলেছেন—

তারপর আল্লাহ তাদেরকে দুনিয়ার পুরস্কার এবং আখিরাতের উত্তম পুরস্কার দান করেন। আর আল্লাহ মুহসিনদেরকে ভালবাসেন।” সূরা আল ইমরান : ১৪৮

আল্লাহ তায়ালা আরও বলছেন—

আর যদি জনপদের অধিবাসীরা ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত, তবে অবশ্যই আমরা তাদের জন্য আসমান ও জমিনের বরকতসমূহ উন্মুক্ত করে দিতাম।” সূরা আরাফ : ৯৬

আল্লাহ তায়ালা আরও বলছেন—

আর যে কেউ আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য (উত্তরণের) পথ করে দেবেন এবং তাকে তার ধারণাতীত উৎস হতে দান করবেন রিজিক।” সূরা তালাক : -

আল্লাহ তায়ালা আহলুল কিতাবদের সম্পর্কে বলছেন—

আর তারা যদি তাওরাত, ইঞ্জিল ও তাদের রবের কাছ থেকে তাদের প্রতি যা নাজিল হয়েছে, তা প্রতিষ্ঠিত করত; তাহলে তারা অবশ্যই তাদের ওপর থেকে ও পায়ের নীচ থেকে খাদ্য লাভ করত।” সূরা মায়িদা : ৬৬

আল্লাহ তায়ালা আখেরি নবি মুহাম্মাদ সা.কে অনুগ্রহ করেছেন, যার ব্যাপারে তিনি বলছেন—

আর তিনি তোমাকে নিঃস্ব পেয়েছেন, তারপর ধনী করেছেন।” সূরা দুহা :

হিজরতের পর আল্লাহ তায়ালা সাহাবিদেরও অনুগ্রহ করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন—

আর তোমাদের উত্তম বস্তুগুলো রিজিক হিসেবে দান করেন, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞ হও।” সূরা আনফাল : ২৬

রাসূলুল্লাহ সা. আমর ইবনুল আস রাযি.কে বলেছেন—

نِعْمَ المالُ الصَّالحُ للرَّجُلِ الصالحِ.

উত্তম সম্পদ নেককার লোকের জন্য কতইনা ভালো।”3

মাসনুন দুআগুলোর একটি দুআ এমন—

اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ الْهُدَى وَالتُّقَى وَالْعَفَافَ وَالْغِنَى.

হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে হিদায়াত, আল্লাহভীতি, চারিত্রিক উৎকর্ষতা ও সচ্ছলতার জন্য দুআ করছি।”4

সাদ ইবনু আবি ওয়াক্কাস রাযি. রাসূলুল্লাহ সা. এর বরাতে বর্ণনা করছেন, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন—

إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْعَبْدَ التَّقِيَّ الْغَنِيَّ الْخَفِيَّ‏.‏

নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা মুত্তাকি, আত্মনির্ভরশীল ও নির্জনে ইবাদতকারী বান্দাকে ভালোবাসেন।”5

অসিয়ত সম্পৃক্ত সেই মশহুর হাদিস— যেখানে একজন সাহাবি তার সকল সম্পদ কিংবা তার অর্ধেক অথবা তার এক-তৃতীয়াংশ ওয়ারিশদের না দিয়ে কল্যাণকর কোনো কাজে অসিয়ত করে যেতে চেয়েছিলেন, তখন নবিজি সা. বলেন—

الثُّلُثُ وَالثُّلُثُ كَثِيْرٌ.

এক-তৃতীয়াংশ। আর এক-তৃতীয়াংশই অনেক।”6

রাসুলুল্লাহ সা. তাঁর খাদিম আনাস রাযি. এর জন্য দুআ করেছিলেন, আল্লাহ তায়ালা যেন তার সম্পদ বাড়িয়ে দেন।7

তিনি আরও বলেছেন—

مَا نَفَعَنِي كمَالُ أَبِي بَكْرٍ

আমাকে অন্য কোনো সম্পদ এতটা উপকার করেনি, যতটা উপকার করেছে আবু বকরের সম্পদ।”8

এছাড়াও আলিমদের কাছে এই নীতি সুপরিচিত যে, ধৈর্যশীল দরিদ্রের চেয়ে শুকরগুজার ধনীর মর্যাদা বেশি। যেমন হাদিস শরিফে এসেছে—

ذَهَبَ أَهْلُ الدُّثُورِ بِالأُجُورِ

ধন সম্পদের মালিকেরা তো সব সওয়াব নিয়ে নিচ্ছে।”9

ইসলাম নিচের হাতের চেয়ে ওপরের হাতকে বেশি মর্যাদা দিয়েছে। ওপরের হাত দান করে, আর নিচের হাত গ্রহণ করে। সহিহ হাদিসে এসেছে, নবিজি সা. বলছেন—

وَالْيَدُ الْعُلْيَا خَيْرٌ مِنْ الْيَدِ السُّفْلَى.

আর ওপরের (দাতার) হাত নিচের (গ্রহীতার) হাত থেকে শ্রেষ্ঠ।”10

খ. সম্পদ হিফাজত করার আবশ্যকতা

ইসলামের দৃষ্টিতে সম্পদের এত গুরুত্বের কারণেই, সম্পদ হিফাজত করার ব্যাপারে আল কুরআনুল কারিম নির্দেশনা দিয়েছে, দিয়েছে আদেশ। হাদিস শরিফেও এই ব্যাপারে এসেছে নববি নির্দেশনা। যেমন সম্পদ নষ্ট করা, অপচয় ও অপব্যয় করা থেকে নিষেধ করা হয়েছে। এছাড়াও জাহিলি যুগে শস্য ও চতুষ্পদ জন্তু নিয়ে যেসব রীতিনীতি (আল্লাহ ও মূর্তির জন্য আলাদা আলাদা ভাগ নির্ধারণ করার নিয়ম) প্রচলিত ছিল, ইসলাম তা নাকোচ করেছে।

সম্পদ হিফাজত করার আরেকটি উদাহরণ হচ্ছে, ইসলাম নির্বোধদের হাতে সম্পদ অর্পণ করতে নিষেধ করেছে। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন—

আর তোমরা বোকাদের তোমাদের ধন-সম্পদ অৰ্পণ কর না।” সূরা নিসা : ০৫

আর এই নিষেধাজ্ঞা সমাজের মাসলাহাত বা কল্যাণের জন্যই দেওয়া হয়েছে।

ইসলাম ছোটো শিশু ও পাগল বা বিকৃতমস্তিষ্ক মানুষদের হাতেও সম্পদ অর্পণ করতে নিষেধ করছে। আর এই নিষেধাজ্ঞা মূলত তাদেরই কল্যাণের জন্য দেওয়া হয়েছে।

সম্পদ হিফাজতের গুরুত্বের ব্যাপারে এটাই যথেষ্ট, আল কুরআনুল কারিমের সবচেয়ে বড়ো আয়াতটি নাজিল হয়েছে সম্পদ ব্যবস্থাপনার একটি দিকের (ঋণ চুক্তি লিখে নেওয়ার) ব্যাপারে। এই আয়াতটিকে বলা হয় ‘آية المداينة’ বা পারস্পরিক ঋণচুক্তির আয়াত। আল্লাহ তায়ালা বলছেন—

হে মুমিনগণ, তোমরা যখন একে অন্যের সাথে নির্ধারিত সময়ের জন্য ঋণের আদান-প্রদান কর, তখন তা লিখে রেখো; তোমাদের মধ্যে কোনো লেখক যেন ন্যায়ভাবে তা লিখে দেয়; কোনো লেখক লিখতে অস্বীকার করবে না, যেমন আল্লাহ তাকে শিক্ষা দিয়েছেন। সুতরাং সে যেন লিখে; আর যে ব্যক্তির ওপর হক রয়েছে (ঋণগ্রহীতা), সে যেন লেখার বিষয়বস্তু বলে দেয় এবং সে যেন তার রব আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করে। আর তা থেকে কিছু যেন না কমায় (ব্যতিক্রম না করে)। অতঃপর যার ওপর হক রয়েছে (ঋণগ্রহীতা) যদি নির্বোধ অথবা দুর্বল হয় অথবা লেখার বিষয়বস্তু সে বলে দিতে না পারে, তবে যেন তার অভিভাবক ন্যায্যভাবে লেখার বিষয়বস্তু সে বলে দিতে না পারে তবে যেন তার অভিভাবক নায্যভাবে লেখার বিষয়বস্তু বলে দেয়। আর তোমরা তোমাদের পুরুষদের মধ্য হতে দু’জন সাক্ষী রাখ, অতঃপর যদি দু’জন পুরুষ না পাও, তবে একজন পুরুষ ও দু’জন স্ত্রীলোক যাদেরকে তোমরা সাক্ষী হিসেবে পছন্দ কর, যাতে স্ত্রীলোকদের মধ্যে একজন ভুলে গেলে তাদের একজন অপরজনকে স্মরণ করিয়ে দেয়। আর সাক্ষীগণকে যখন ডাকা হবে, তখন তারা যেন অস্বীকার না করে। আর তা (লেনদেন) ছোট-বড়ো যাই হোক, মেয়াদসহ লিখতে তোমরা কোনোরূপ বিরক্ত হয়ো না। এটাই আল্লাহর নিকট ন্যায্যতর ও সাক্ষ্যদানের জন্য দৃঢ়তর এবং তোমাদের মাঝে সন্দেহের উদ্রেক না হওয়ার জন্য অধিকতর উপযুক্ত। তবে তোমরা পরস্পর যে নগদ ব্যবসা পরিচালনা কর, তা তোমরা না লিখলে কোনো দোষ নেই। আর তোমরা যখন পরস্পর বেচাকেনা কর, তখন সাক্ষী রেখো। আর কোনো লেখক ও সাক্ষীকে ক্ষতিগ্রস্ত করা হবে না। আর যদি তোমরা ক্ষতিগ্রস্ত কর, তবে তা হবে তোমাদের ফাসিকি। আর তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর এবং আল্লাহ তোমাদের শিক্ষা দিবেন। আর আল্লাহ সবকিছু সম্পর্কে সবিশেষ জ্ঞানী।” সূরা বাকারা : ২৮২

গ. সম্পদ নিয়ে ফিতনায় পড়া, অহঙ্কার ও সীমালঙ্ঘন করার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা

সম্পদের এত মর্যাদা ও গুরুত্ব থাকার পরেও ইসলাম এর কারণে ফিতনায় পড়া, অহঙ্কার ও সীমালঙ্ঘন প্রদর্শন করার ব্যাপারে কঠিন সতর্ক করেছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন—

তোমাদের সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তো পরীক্ষা বিশেষ; আর আল্লাহ, তাঁরই কাছে রয়েছে মহাপুরস্কার।” সূরা তাগাবুন : ১৫

আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন—

বস্তুতই মানুষ সীমালঙ্ঘনই করে থাকে, কারণ সে নিজেকে অমুখাপেক্ষী মনে করে।” সূরা আলাক : -

মানুষের নিজেকে নিয়ে মত্ত থাকা এবং অন্যের থেকে, এমনকি তার রব থেকেও অমুখাপেক্ষী থাকার প্রবণতাকে সীমালঙ্ঘননে সাথে যুক্ত করা দেখেছে আল কুরআনুল কারিম।

আল্লাহ তায়ালা আরও বলছেন—

হে মুমিনগণ, তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি যেন তোমাদেরকে আল্লাহর জিকির থেকে উদাসীন না করে। আর যারা এরূপ উদাসীন হবে, তারাই তো ক্ষতিগ্ৰস্ত।” সূরা মুনাফিকুন :

অতএব সমস্যা সন্তানসন্ততি বা সম্পদ থাকাতে নয়; বরং এগুলো যদি আল্লাহর জিকির থেকে গাফিল রাখে, তাহলে সমস্যা তাতে।

যারা মসজিদের অগ্রসেনা, মসজিদ আবাদ করে, তাদের প্রশংসা করে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলছেন—

সকাল ও সন্ধ্যায় তারা তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে। তারা সেসব লোক, যাদের ব্যবসা-বানিজ্য ও ক্রয়-বিক্রয় কোনোটিই আল্লাহর জিকির হতে এবং সালাত কায়িম ও জাকাত প্রদান করা হতে বিরত রাখে না। তারা ভয় করে সেই দিনকে, যেদিন অনেক কলব ও দৃষ্টি উল্টে যাবে।” সূরা নূর : ৩৬,৩৭

অর্থাৎ মসজিদ আবার করা এই লোকগুলো দারবিশ বা নিষ্কর্মা নয়, বরং তারা সক্রিয় ও কর্মঠ লোক; কিন্তু তাদের কাজকর্ম তাদেরকে আল্লাহর জিকির ও আবশ্যিক দায়িত্ব পালন করা থেকে গাফিল করে না।

তাই এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছুই নেই, যখন আমরা দেখি আল কুরআন সীমালঙ্ঘনকারী ধনীদের কঠিনভাবে শাসাচ্ছে। যেমন কারুন। আল্লাহ তায়ালা বলছেন—

নিশ্চয় কারুন ছিল মূসার সম্প্রদায়ভুক্ত, কিন্তু সে তাদের প্রতি ঔদ্ধত্য প্রকাশ করেছিল। আর আমরা তাকে দান করেছিলাম এমন ধনভাণ্ডার, যার চাবিগুলো বহন করা একদল বলবান লোকের পক্ষেও কষ্টসাধ্য ছিল। স্মরণ কর, যখন তার সম্প্রদায় তাকে বলেছিল, অহংকার করো না, নিশ্চয় আল্লাহ অহংকারীদেরকে পছন্দ করেন না...।” সূরা কাসাস : ৭৫

কারুনের বর্ণনা সংবলিত এই আয়াতগুচ্ছ শেষ হয়েছে এভাবে যে, আল্লাহ তায়ালা তাকে এবং তার বাড়িঘরকে ধ্বসিয়ে দিয়েছেন।

সীমালঙ্ঘনকারী ধনীদের শাসানোর বিবরণ আমরা আরও পাই— সূরা কাহাফে বর্ণিত দুই বাগান মালিকের ঘটনায়। একই কারণে, আল্লাহ তায়ালা আরও শাসিয়েছেন আদ ও সামুদকে। আল্লাহ তায়ালা আদ জাতির ব্যাপারে বলেছেন—

তোমরা কি প্রতিটি উচ্চ স্থানে স্তম্ভ নির্মাণ করছ নিরর্থক? আর তোমরা প্রাসাদসমূহ নির্মাণ করছ যেন তোমরা স্থায়ী হবে।” সূরা শুয়ারা : ১২৮-১২৯

ভয় কর তাঁকে, যিনি তোমাদেরকে সাহায্য করেছেন সে সকল সম্পদ দিয়ে, যা তোমরা জান। তোমাদেরকে দিয়েছেন চতুষ্পদ জন্তু ও সন্তান-সন্ততি এবং উদ্যানরাজি ও বহু প্রস্রবণ।” সূরা শুয়ারা : ১৩২-১৩৪

আল্লাহ তায়ালা সামুদ জাতির ব্যাপারে বলেছেন—

তোমাদেরকে কি নিরাপদ অবস্থায় ছেড়ে রাখা হবে, যা এখানে আছে তাতে— উদ্যানে, প্রস্রবণে, শস্যক্ষেত্র এবং খেজুর বাগানে; যার মোছা নরম?” সূরা শুয়ারা : ১৪৬-১৪৮

আল্লাহ তায়ালা আরও বলেছেন—

দুর্ভোগ প্রত্যেকের, যে পিছনে ও সামনে লোকের নিন্দা করে, যে সম্পদ জমায় ও তা বার বার গণনা করে। সে ধারণা করে যে, তার অর্থ তাকে অমর করে রাখবে। কখনও না, সে অবশ্যই নিক্ষিপ্ত হবে হুতামায়। আর আপনাকে কীসে জানাবে হুতামা কী? এটা আল্লাহর প্রজ্বলিত আগুন, যা হৃদয়কে গ্ৰাস করবে; নিশ্চয় এটা তাদেরকে পরিবেষ্টন করে রাখবে— দীর্ঘায়িত স্তম্ভসমূহে।” সূরা হুমাজা : -

আল্লাহ তায়ালা আরও বলেছেন—

ধ্বংস হয়েছে আবু লাহাবের দু’হাত এবং ধ্বংস হয়েছে সে নিজেও। তার ধন-সম্পদ ও উপার্জন তার কোনো কাজে আসেনি। অচিরেই সে দগ্ধ হবে লেলিহান আগুনে, আর তার স্ত্রীও (দগ্ধ হবে)— যে ইন্ধন বহন করে, যার গলায় পাকানো রশি।” সূরা মাসাদ : -

আল্লাহ তায়ালা আরও বলেছেন—

সে ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে সমৃদ্ধশালী।” সূরা কলম : ১৪

ফুটনোট

1 The Gospel of Luke 18 : 24-25।

2 The Gospel of Luke 18 : 24-25।

3 আহমাদ, মুসনাদ : ১৭০৯৬। যারা হাদিসের তাখরিজ করেন, তারা বলছেন, মুসলিমের শর্তানুযায়ী এর সনদ সহিহ। ইবনু হিব্বান, জাকাত : ৩২১০; হাদিসটি বর্ণিত হয়েছে আমর ইবনুল আস রাযি. থেকে।

4 মুসলিম, যিকর ও দুআ (২৭২১), আহমাদ, মুসনাদ : (৩৬৯২), তিরমিজি, দাওয়াত : ৩৪৮৯, ইবনু মাজাহ, দুআ : ৩৮৩২; আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাযি. থেকে হাদিসটি বর্ণিত হয়েছে।

5 মুসলিম; জুহদ ওয়ার রাকায়িক : ২৯৬৫; হাদিসটি বর্ণনা করেছেন সাদ ইবনু আবি ওয়াক্কাস রাযি.

6মুত্তাফাকুন আলাইহি : বুখারি; ঈমান : ৫৬, মুসলিম; অসিয়ত : ১৬২৮। হাদিসটি আরও বর্ণনা করেছেন— আহমাদ, মুসনাদ : ১৪৭৯, আবু দাউদ : ২৮৬৪, তিরমিজি : ২১১৬, নাসায়ি : ৩৬২৬, ইবনু মাজাহ : ২৭০৮; সুনানের চারটি কিতাবেই হাদিসটি অসিয়ত অধ্যায়ে বর্ণিত হয়েছে। হাদিসটি বর্ণনা করেছেন সাদ ইবনু আবি ওয়াক্কাস রাযি.

7 আনাস রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলছেন, আমার মা বলেছেন—

হে আল্লাহর রাসূল, আপনার খাদিম আনাসের জন্য আল্লাহর কাছে দুআ করুন।’

রাসূলুল্লাহ সা. তখন দুআ করলেন

হে আল্লাহ, আপনি তাকে বেশি করে সম্পদ ও সন্তান দান করুন এবং তাকে যা দিবেন, তাতে বরকত দা করুন।’ মুত্তাফাকুন আলাইহি : বুখারি; দাওয়াত : ৬৩৮, মুসলিম; ফাদায়িল : ২৪৮১, হাদিসটি আরও বর্ণনা করেছেন আহমাদ; মুসনাদ : ১৩০১৩। হাদিসটি বর্ণিত হয়েছে আনাস রাযি. থেকে।

8 আহমাদ; বুখারি; মুসনাদ : ৭৪৪৬; যারা হাদিসের তাখরিজ করেন, তারা বলেছেন— শাইখানের শর্তানুযায়ী এর সনদ সহিহ। হাদিসটি আরও বর্ণনা করেছেন— তিরমিজি; মানাকিব : ৩৬৬১, ইমাম তিরমিজি বলছেন, হাদিসটি এই সনদানুযায়ী হাসান গরিব। ইবনু মাজাহ; মুকাদ্দিমা : ৯৪, আলবানি তার সহিহুত তিরমিজিতে হাদিসটকে সহিজ বলেছেন।

9 মুত্তাফাকুন আলাইহি : বুখারি; আজান : ৮৪৩, মুসলিম; মাসাজিদ ওয়া মাওয়াদিয়ুস সালাত : ৫৯৫। হাদিসটি আরও বর্ণনা করেছেন— আহমাদ, মুসনাদ : ৭২৪৩, আবু দাউদ : ১৫০৪, ইবনু মাজাহ : ৯২৭; উভয় কিতাবেই হাদিসটি সালাত অধ্যায়ে বর্ণিত হয়েছে। হাদিসটি বর্ণনা করেছেন আবু হুরাইরা রাযি.

10 মুত্তাফাকুন আলাইহি : বুখারি : ১৪২৯, মুসলিম : ১০৩৩; কিতাবেই হাদিসটি যাকাত অধ্যায়ে বর্ণিত হয়েছে। হাদিসটি আরও বর্ণনা করেছেন— আহমাদ, মুসনাদ : ৭১৫৫, আবু দাউদ : ১৬৪৮, নাসায়ি : ২৫৩৩। আবু দাউদ ও নাসায়ি উভয়ই হাদিসটি যাকাত অধ্যায়ে বর্ণনা করেছেন। হাদিসটি বর্ণিত হয়েছে আবু হুরাইরা রাযি. থেকে।

(তরজমা করেছেন মু. সাজ্জাদ হোসাইন খাঁন।)