অহিংসবাদের মিথ : গান্ধী, ফিলিস্তিন ও ইজরায়েল | ইরফান আহমাদ
গাজায় (২০১৪ সালের) ইসরায়েলের প্রাণঘাতী হামলাকে ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্টের ইজরাইলের “গণহত্যা নীতি” হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে অনেকেই মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর (১৮৬৯–১৯৪৮) আলাপ সামনে এনেছেন। গান্ধীর প্রসঙ্গ সামনে আসার পেছনে দুটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, তিনি ঔপনিবেশিক দখলদারিত্বের বিরোধিতা করেছিলেন। দ্য ইকোনমিক টাইমস-এর একজন বিশ্লেষক গান্ধীর একটি উদ্ধৃতি উল্লেখ করেছেন, যা পরে ফেসবুকেও শেয়ার করা হয়েছিল। বক্তব্যটি ছিল:
“ফিলিস্তিন আরবদের, যেমনভাবে ইংল্যান্ড ইংরেজদের এবং ফ্রান্স ফরাসিদের।”
দ্বিতীয়ত, গান্ধীকে স্মরণ করার মাধ্যমে পরোক্ষভাবে সন্ত্রস্ত (terrorized) ফিলিস্তিনিদের প্রতি এই পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে যে, তারা যেন “সহিংসতা ছেড়ে শান্তি বেছে নেয়,” কারণ গান্ধীও অহিংসার পক্ষে ছিলেন।
অথচ ইতিহাসের আলোকে বিশ্লেষণ করলে গান্ধীর ব্যাপারে এই দুইটি অনুমান বিভ্রান্তিকর, এমনকি ভুল ও অসত্য হিসেবে প্রমাণিত হয়। এটা ঠিক যে, ১৯২১ সালে গান্ধী আরব ভূমিতে ইহুদিদের বসতি স্থাপনের বিরোধিতা করেছিলেন। তবে পরবর্তী সময়ে তিনি সূক্ষ্মভাবে ঔপনিবেশিক দখলদারিত্বকে সমর্থনও করেছিলেন। অন্যদিকে অহিংসা এবং অসহযোগ আন্দোলন (সত্যাগ্রহ) সম্পর্কে গান্ধীর আনুষ্ঠানিক প্রচার আসলে ছিল কৌশলগত, প্রেক্ষাপটভিত্তিক এবং সাময়িক। অহিংসার “দেবদূত” হিসেবে প্রতিষ্ঠিত মিথের বিপরীতে আসল সত্য হলো গান্ধী বাস্তবে হত্যাকে ন্যায্যতা দিয়েছেন, এমনকি তিনি সহিংসতার জন্য গর্ববোধ করেছেন। তিনি অসহযোগ আন্দোলনেরও বিরোধিতা করেছেন, যখন তা তার রাজনৈতিক এবং জাতীয় স্বার্থে উপযুক্ত মনে হয়েছে।
আরবদের “সদিচ্ছা,” “উদারতা” এবং জায়নবাদী উপনিবেশিকতা
ভারতে গান্ধীর রাজনীতি মূলত ফিলিস্তিনে ব্রিটিশ ম্যান্ডেটের সমসাময়িক ঘটনা। ফিলিস্তিন বিষয়ে গান্ধীর প্রথম দিকের বক্তব্যগুলোর একটি হলো ১৬ মার্চ ১৯২১ সালের। লন্ডনের ডেইলি হেরাল্ড পত্রিকায় তিনি বলেছিলেন:
“কোনো নীতিশাস্ত্র বা যুদ্ধনীতি ফিলিস্তিনকে মিত্রশক্তি কর্তৃক ইহুদিদেরকে দান করে দেয়ার পক্ষে সাফাই দিতে পারে না। এটি হবে পুরো ভারতবর্ষের, বিশেষ করে ভারতীয় মুসলমানদের প্রতি এক ধরনের বিশ্বাসঘাতকতা।”
গান্ধী এই বক্তব্য দিয়েছিলেন সে সময়, যখন ভারতে তার সমর্থিত খেলাফত আন্দোলন সক্রিয় ছিল। ১৯১৯ সালে শুরু হওয়া এই আন্দোলন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বিজয়ী মিত্রশক্তি কর্তৃক উসমানী সাম্রাজ্য বিভাজনের পরিকল্পনা এবং আরবদের পবিত্র স্থানগুলোকে ইউরোপের অনুগত স্থানীয় শাসকদের কাছে হস্তান্তরের বিরোধিতা করেছিল। ১৯৩১ সালে দ্য জিউইশ ক্রনিকল-এ দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে গান্ধী বলেন, “জায়নবাদের অর্থ যদি হয় ফিলিস্তিনের পুনর্দখল, তবে তা আমার কাছে কোনো সমর্থনীয় বিষয় নয়। ... প্রকৃত জেরুজালেম হলো আধ্যাত্মিক জেরুজালেম। ফলে একজন ইহুদি পৃথিবীর যেকোনো জায়গায় এই জায়নবাদ প্রতিষ্ঠা করতে পারেন।” গান্ধীর এই বক্তব্য সেসময় তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। দ্য জিউইশ ক্রনিকল এটিকে “প্রলাপ” (nonsense) বলে অভিহিত করে। আমেরিকান জায়নবাদী ড. স্টিফেন ওয়াইজ গান্ধীর ফিলিস্তিন পুনর্দখলের বক্তব্যকে “অদ্ভুত” আখ্যা দেন। ওয়াইজের মতে, এটি বরং ছিল ইহুদিদের “পুনঃপ্রবেশ”।
কিন্তু ১৯৩৭ সাল থেকে গান্ধী জায়নবাদকে প্রকৃত অর্থে ইস্তেমাল করতে শুরু করেন। সেই বছরই ব্রিটিশরা বিভাজন পরিকল্পনার (Partition plan) প্রস্তাব দেয় এবং এই প্রেক্ষিতে ব্রিটিশ ম্যান্ডেট দ্বারা গঠিত ইহুদি এজেন্সি (Jewish Agency) গান্ধীর কাছে একটি “গোপন মধ্যস্থতার প্রস্তাব” নিয়ে আসে। এই ইহুদি এজেন্সি ব্রিটিশদের সহযোগিতায় “ইহুদি অভিবাসীদের একীভূত করতে” এবং “ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য আন্তর্জাতিক সমর্থন সংগ্রহ করতে” গঠিত হয়েছিল। এই উদ্দেশ্যে ইহুদি এজেন্সি গান্ধীর দক্ষিণ আফ্রিকান ঘনিষ্ঠ বন্ধু ক্যালেনবাখকে নিয়োগ দেয়। ক্যালেনবাখ পেশায় ছিলেন একজন স্থপতি এবং একসঙ্গে গান্ধীবাদী ও জায়নবাদী।
১৯৩৭ সালের জুনে ক্যালেনবাখ ভারত সফর করেন এবং তিন সপ্তাহ গান্ধীর সঙ্গে কাটান। তিনি গান্ধীকে জায়নবাদী আন্দোলনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে অবহিত করেন। ক্যালেনবাখ গান্ধীকে জায়নবাদী সাহিত্যও পাঠান। গান্ধী সেই সাহিত্যকে “হৃদয়গ্রাহী” এবং “খুবই আকর্ষণীয়” বলে মন্তব্য করেন। ৪ জুলাই ক্যালেনবাখ ভারত ত্যাগ করে জেরুজালেম চলে যান। গান্ধী তার মধ্যস্থতাকারী বক্তব্যে, যা ৫০ বছর পর প্রকাশিত হয়, ক্যালেনবাখকে জানান:
...ইহুদিদের উচিত সশস্ত্র উপায়ে তাদের আকাঙ্ক্ষা পূরণের পরিকল্পনাকে পরিত্যাগ করা এবং শুধুমাত্র আরবদের সদিচ্ছার উপর নির্ভর করা। ফিলিস্তিনে একটি আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার ইচ্ছা ইহুদিদের একটি স্বাভাবিক বাসনা। এই বিষয়ে কোনো আপত্তি তোলা সম্ভব নয়। তবে তাদের অপেক্ষা করা দরকার, যতদিন না আরব জনগণ এটি মেনে নেয়।
গান্ধী সেসময় পূর্বাভাস দিয়েছিলেন যে, “ইহুদি উপনিবেশ যদি সামরিক শক্তি পরিত্যাগ করে আরব জনগণের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করতে শুরু করে, তবে তাদের উপনিবেশ নিরাপদ থাকবে।” (সিমোন প্যান্টার-ব্রিক, গান্ধী অ্যান্ড দ্য মিডল ইস্ট, ২০০৮, পৃ. ৬৩)।
১৯৩৮ সালে গান্ধী দ্য জিউস প্রকাশ করেন, যেখানে তার ১৯২১ সালের বিবৃতির বিপরীতে জায়নবাদী উপনিবেশ প্রতিষ্ঠার জন্য যথেষ্ট সাফাই ছিল। “ইংল্যান্ড যেমন ইংরেজদের, তেমনি ফিলিস্তিন আরবদের…” বলার পাশাপাশি তিনি এটাও বলেন যে, “আরবদের সদিচ্ছার মাধ্যমেই তারা (জায়নবাদীরা) ফিলিস্তিনে বসবাস করতে পারবে।” সিমোন প্যান্টার-ব্রিকের মতো বিশেষজ্ঞগণ গান্ধীর এই পরিবর্তনকে ক্যালেনবাখের সাথে বন্ধুত্বের ফল হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এটা হয়তো সত্য। তবে ১৯২১ সালেই গান্ধী উল্লিখিত বক্তব্যের পরপরই আরেকটি মন্তব্য করেছিলেন:
“আমার মত হচ্ছে, তারা ফিলিস্তিনকে কোনো ছলচাতুরি বা নৈতিকতা লঙ্ঘনের মাধ্যমে অধিকার করতে পারবে না’।
নীরবতা, গোপনীয়তা, ছলচাতুরী
তবে গান্ধীর পরিবর্তিত অবস্থান, সাংঘর্ষিক বিবৃতি, গোপনীয়তা বজায় রাখা এবং ভুতুড়ে নীরবতার ভেতরেই একটি ছলচাতুরী স্পষ্ট হয়ে উঠে। ১৯৩৯ সালে ক্যালেনবাখ আবার গান্ধীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসেন। কিন্তু এবার কোনো বিবৃতি জারি করা হয়নি। সে ছিল এক পরিপূর্ণ নীরবতা! বোম্বে জায়নবাদী অ্যাসোসিয়েশনের শোহেট সেসময় মন্তব্য করেন: “...তিনি (গান্ধী) এ বিষয়ে কিছুই বলবেন না, এমনকি একটি ব্যক্তিগত সাক্ষাৎকারেও নয়। তবে তিনি (এ ব্যাপারে) আগ্রহী। তিনি তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্নও।” (প্যান্টার-ব্রিক, পৃ. ১৩৪)। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পুরো সময়কালজুড়েই গান্ধী তার নীরবতা বজায় রাখেন।
১৯৪৬ সালে ওয়ার্ল্ড জিউইশ কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট হনিক এবং অ্যাংলো-ইহুদি পার্লামেন্ট সদস্য সিডনি সিলভারম্যান গান্ধীর সঙ্গে একটি বৈঠক করেন। গান্ধী তার সচিব পেয়ারেলালকে নির্দেশ দেন যেন এ বিষয়ে কোন প্রতিবেদন প্রকাশ করা না হয়। সিলভারম্যানের কাছে গান্ধী একটি বিবৃতি দেন। তার আমেরিকান জীবনীকার লুইস ফিশারের কাছে পাঠানো সেই বিবৃতিটি ছিল:
“আমি সিডনি সিলভারম্যানকে বলেছি যে ফিলিস্তিনে ইহুদিদের দাবীটি বেশ যৌক্তিক। ফিলিস্তিনে যদি আরবদের কোন দাবি থাকে, তবে ইহুদিদের দাবি আরও পুরনো” (প্যান্টার-ব্রিক, পৃ. ১৪৭)। (বিবৃতিটির সত্যতা গান্ধী নিজে নিশ্চিত করেছিলেন।)
অথচ এই ছোট্ট শব্দ “পুরনো” ছিল এক চমৎকার ভাষাগত চাতুরী, যা একজন বুদ্ধিমান আইনজীবী হিসেবে গান্ধী ব্যবহার করেছিলেন। যে নৈতিকতা বা সত্য তিনি প্রতিনিধিত্ব করার দাবি করেছিলেন— এটি তা ছিলনা; বরং এটি ছিল এক নগ্ন রাজনীতি।
১৯৪৮ সালে গান্ধী নিহত হওয়ার পর, প্যারেলাল ফিলিস্তিন সম্পর্কিত সব নথি ধ্বংস করে ফেলেন। এর স্বপক্ষে তিনি বলেন: “কিছু উপকরণ রয়েছে, যা আমি গোপন রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।” যখন তাকে জিজ্ঞাসা করা হয় কোনগুলো, প্যারেলাল উত্তর দেন: “প্রথমত, ইসরাইল সম্পর্কে গান্ধীর মতামত। আমি সেগুলো ইতিহাস থেকে গোপন রাখতে সক্ষম হয়েছি। কারণ ঈশ্বরের কৃপায় আমিই একমাত্র ব্যক্তি যে সেগুলো সম্পর্কে জানে।”
নথিগুলো ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় আমরা আর ফিলিস্তিন নিয়ে গান্ধীর মতামত সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারব না। তবে বিদ্যমান প্রমাণ থেকে বোঝা যায় যে, তার অবস্থান ছিল অস্থিতিশীল ও সাংঘর্ষিক—কেউ কেউ এটিকে প্রতারণামূলকও বলতে পারেন। তিনি জায়নবাদী উপনিবেশিকতার বিরোধিতা করেননি; তিনি শুধু তা বাস্তবায়নে ব্রিটিশদের সম্পৃক্ততার বিরোধিতা করেছিলেন। তবে ব্রিটিশদের প্রতি এই আপাত বিরোধিতাও সম্পূর্ণ আন্তরিক ছিল না, কারণ ম্যান্ডেটের অধীনে যা কিছু ঘটছিল তা উপনিবেশিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু ছিলনা। যে জিউইশ এজেন্সিকে তিনি গোপন প্রস্তাব দিয়েছিলেন, স্বয়ং সেটি ছিল উপনিবেশিকতার একটি শাখা। ইহুদি অভিবাসীদের—গান্ধীর ভাষায় “নতুন আগন্তুকদের”—এনে জনসংখ্যা পরিবর্তন করার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য বাস্তবায়ন করাও ছিল ঔপনিবেশিক কার্যক্রম। একইভাবে, ঔপনিবেশিক শাসনের অধীন থাকা আরবদের প্রতি “সদিচ্ছা” ও “উদারতা” প্রদর্শনের আহ্বান করাও ছিল উপনিবেশিকতার আরেক দৃষ্টান্ত। এখানে একটি লক্ষণীয় ব্যাপার হচ্ছে, বেলফোর ঘোষণা এবং জিউইশ এজেন্সিকে দেয়া গান্ধীর গোপন প্রস্তাব—উভয় জায়গাতেই “আবাসভূমি” (home) শব্দটি উপস্থিত ছিল।
গান্ধী বিশেষজ্ঞ সিমোন প্যান্টার-ব্রিক যাকে গান্ধীর “রূপান্তর” (conversion) বলছেন, সেটাকে কীভাবে ব্যাখ্যা করা যায়? প্যান্টার-ব্রিক মনে করেন যে হলোকস্টের পর গান্ধী জায়নবাদের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে উঠেছিলেন। হলোকস্টের পর ইহুদিদের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করা মানবিক—কোনো মানুষই অন্যথা করবে না। কিন্তু ফিলিস্তিনে ইহুদিদের “পুরনো দাবি বা অধিকার” আছে বলা একেবারেই আলাদা বিষয়। আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, ১৯২১ সালে দেয়া গান্ধীর দ্বিতীয় বিবৃতিতেই জায়নবাদকে সমর্থনের বীজ লুকিয়ে ছিল।
সহিংসতার দূত এবং নাগরিক অবাধ্যতার বিরোধী
স্পষ্টতই গান্ধীর আপত্তি ছিল জায়নবাদী লক্ষ্য অর্জনের উপায় নিয়ে, খোদ জায়নবাদ নিয়ে নয়। ১৯৪৭ সালের জুনে ফিলিস্তিন সমস্যা সমাধানের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে, তিনি উত্তর দেন: “ইহুদিদের পক্ষ থেকে সন্ত্রাসবাদ এবং অন্যান্য ধরনের সহিংসতা সম্পূর্ণভাবে পরিহার করা।” তবে গান্ধী নিজে কি সত্যিকার অর্থে এবং আজীবন অহিংসবাদে বিশ্বাসী ছিলেন? ঐতিহাসিক প্রমাণগুলো দেখায়, তিনি তা ছিলেন না।
গান্ধীর অহিংসবাদ বর্ণনা করার আগে স্মরণ করিয়ে দিই যে গান্ধী ব্রিটিশদের সহায়তা করার জন্য তিনটি যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন: দুটি বোয়ার যুদ্ধ, জুলু যুদ্ধ এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। (গান্ধী নিজেই আহমেদাবাদের ঔপনিবেশিক আদালতে একটি বিবৃতিতে এই তিনটি যুদ্ধে তার অংশগ্রহণের কথা স্বীকার করেছিলেন, যেখানে ব্রিটিশরা ইংল্যান্ডের ইয়াং ইন্ডিয়া পত্রিকায় নিবন্ধ প্রকাশের মাধ্যমে “সরকারের বিরুদ্ধে অসন্তোষ সৃষ্টির” জন্য তাকে অভিযুক্ত করেছিল।) ভারতের স্বাধীনতা এবং পাকিস্তান সৃষ্টির পরপরই ২০ ডিসেম্বর ১৯৪৭ সালে এক প্রার্থনা সভায় গান্ধী ঘোষণা করেন:
এটা কি কল্পনা করা যায় যে ভারতের কয়েক কোটি মুসলিম ভারতবর্ষের প্রতি বিশ্বস্ত থাকবে এবং পাকিস্তানের বিরুদ্ধে লড়াই করবে? ...আমরা কাউকে খারাপ মনে করতে পারি না যতক্ষণ না তা প্রমাণিত হয়... যদি পরবর্তীতে তারা (মুসলিমরা) বিশ্বাসঘাতকতা করে, আপনি তাদের গুলি করতে পারেন। আপনি একজন, দুইজন অথবা নির্দিষ্ট সংখ্যক মানুষকে গুলি করে মেরে ফেলতে পারেন। (কিন্তু) সবাই বিশ্বাসঘাতক হবে না... আমাদের সাহসী হতে হবে এবং মুসলিমদের উপর বিশ্বাস রাখতে হবে। যদি পরবর্তীতে তারা বিশ্বাস ভঙ্গ করে, আপনি তাদের শিরোচ্ছেদ করতে পারেন। (পৃ. ১৬০–১৬১)
১৯৪৭ সালের শীতে কাশ্মীরে পাকিস্তানের উপজাতিদের আক্রমণের বিরুদ্ধে ভারতীয় সেনা অভিযান শুরু হয়। এ প্রসঙ্গে গান্ধী বলেন: “উপজাতিদের এই কাশ্মীর আক্রমণকে আমি বর্বরোচিত মনে করি; তাদের মোকাবিলায় আমাদের সেনা পাঠাতে হয়েছে” (পৃ. ৮৫)। গান্ধী কেবল সামরিক সহিংসতাকে অনুমোদন দিয়েই থেমে থাকেননি, বরং তার শিষ্য সরদার প্যাটেলের স্মৃতিচারণ অনুযায়ী তিনি এ নিয়ে গর্বও করেছিলেন:
“যখন আমি ওই বিমানগুলোর শব্দ শুনি, আমি তখন গর্ব অনুভব করি... যখন এই কাশ্মীর অভিযান শুরু হয়, তখন আমি সেগুলো নিয়ে গর্ব অনুভব করতে শুরু করি। আর প্রতিটি বিমান যখন অস্ত্রশস্ত্র, গোলাবারুদ ও সেনাবাহিনীর প্রয়োজনীয় সামগ্রী-সরঞ্জাম নিয়ে যায়, তা আমাকে গর্বিত করে” (পৃষ্ঠা ৮৮)।
এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে ওই যুদ্ধবিমানগুলো ফুলের তোড়া বহন করছিল না।
তবে সতেরো বছর আগে, ১৯৩০ সালেই গান্ধী সহিংসতাকে সমর্থন করেছিলেন। এমনকি যেসব সৈনিক উপনিবেশ-বিরোধী আন্দোলনকারীদেরকে গুলি চালিয়ে হত্যা করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল, তাদের তিনি ভর্ত্সনাও করেছিলেন। সেসময় রয়্যাল গড়ওয়াল রাইফেলসের (The Royal Garhwal Rifles) সৈনিকরা—যাদের বেশিরভাগই ছিল হিন্দু—পেশোয়ারের উপনিবেশ-বিরোধী আন্দোলনকারীদের উপর—যাদের অধিকাংশই ছিল মুসলমান—গুলি করার আদেশ অমান্য করেছিল। এ কারণে গান্ধী ওই সৈনিকদের ভর্ত্সনা করেন। যখন এই সৈনিকদের সহিংস কর্মকাণ্ডে অংশ না নেওয়ার জন্য শাস্তি দেওয়া হয়েছিল, তখন তাকে জিজ্ঞাসা করা হয় যে এটি তার “অহিংস নীতির সঙ্গে এটি কিভাবে যায়?” উত্তরে গান্ধী বলেছিলেন:
একজন সৈনিক যে গুলি করার আদেশ অমান্য করে... সে দণ্ডনীয় অবাধ্যতার (criminal disobedience) দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়। আমি সৈনিকদের আদেশ অমান্য করতে বলতে পারি না, কারণ যখন আমি ক্ষমতায় আসব, তখন আমাকেও... সেই একই সৈনিকদের ব্যবহার করতে হবে।
গান্ধীর জন্য কি সত্যিই নাগরিক অবাধ্যতা একটি চিরন্তন নীতি ছিল? প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী গান্ধী সর্বদাই এতে বিশ্বাস রাখতেন। তিনি নিজেই বলেছিলেন:
“যদি আমার ক্ষমতা থাকতো, তবে আমি নাগরিক অবাধ্যতা (civil disobedience) দমন করার জন্য কখনই এটি (সরকারি বাহিনী) ব্যবহার করতাম না বা ব্যবহারের অনুমতি দিতাম না, তা (নাগরিক অবাধ্যতা) যেভাবেই বা যেখানেই উদ্ভূত হোক না কেন। কারণ আমি নাগরিক অবাধ্যতাকে আমাদের অস্তিত্বের একটি চিরন্তন নীতি মনে করি।”
১৯৩৩ সালে গান্ধী তৎকালীন ভাইসরয়ের প্রতি নাগরিক অবাধ্যতাকে একটি “সাংবিধানিক অধিকার” হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য আহ্বান জানিয়ে একটি চিঠি লিখেন। এ সময় তার সেক্রেটারি প্রশ্ন করেন: “কাল যদি ভারত স্বাধীন হয়, তখন আপনি কি বলবেন যে সত্যাগ্রহ একটি সাংবিধানিক অধিকার? এর মানে কেউ যদি আইন ভাঙে, তবে কিছুই করা যাবে না?” গান্ধী জবাবে বলেন: “আমি এই চিঠি না পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”
ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের বর্বর সহিংসতা এবং বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে সংঘটিত সকল প্রকার সহিংসতার অভিজ্ঞতা থেকে ন্যায়বিচার-প্রত্যাশী প্রতিটি মানুষের সম্মিলিতভাবে শান্তি ও ইনসাফভিত্তিক দুনিয়া গঠনের একটি নতুন দার্শনিক ধারণা বিনির্মাণে উদ্বুদ্ধ হওয়া উচিত। এর মাধ্যমেই কেবলমাত্র গান্ধীর অহিংসতার ছলচাতুরীপূর্ণ কৌশলকে (tactic of mere non-violence) অতিক্রম করা সম্ভব হবে– যা ছিল স্ববিরোধী, অসামঞ্জস্যপূর্ণ, সীমাবদ্ধ এবং একান্তভাবে জাতীয়তাবাদী।
মূল লেখা: (https://kafila.online/2014/08/02/gandhi-palestine-and-israel-irfan-ahmad/)
তরজমা করেছেন হাসান আব্দুল্লাহ।