সম্পদ, উৎপাদন ও ভোগ : ইসরাফ, তাবযির ও ইতিদালের তাত্ত্বিক আলাপ | সাজ্জাদ হোসাইন খাঁন
ইসলামি আদর্শগত অবস্থান ও মূলনীতির ক্ষেত্রে একটি মৌলিক নীতি হলো মধ্যমপন্থা অবলম্বন। ইসলাম সম্পদের ব্যবস্থাপনায় এমন দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করতে বলে, যার মাধ্যমে আল্লাহর সৃষ্ট প্রতিটি সত্তার প্রয়োজন পূরণ হয়। এর মূল লক্ষ্য শুধু মানবজাতির চাহিদা মেটানো নয়, বরং তার সাথে পরিবেশ ও বিশ্বজগতের রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা। ইসলামের সৌন্দর্য এই যে, ইসলাম ব্যক্তিগত জীবন থেকে রাষ্ট্রীয় পর্যায় পর্যন্ত প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে একটি মৌলিক কাঠামো প্রদান করেছে। এজন্যই ইসলামকে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা বলা হয়। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেন: “আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের ধর্ম পরিপূর্ণ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার নেয়ামত সম্পূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে পছন্দ করলাম” (সূরা আল-মায়িদা, ৫:৩)।
ইসলামে কোনো কিছুর অতিরিক্ত বা সর্বাধিকরণ মূল নীতিমালার সাথে সাংঘর্ষিক। যদিও আল্লাহ মানবজাতি ও জিন জাতিকে ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছেন, তবুও রাসূলুল্লাহ (স) হাদীসে অল্প কিন্তু নিয়মিত ইবাদতের উপর জোর দিয়েছেন, যা নাজাতের পথ হিসেবে বিবেচিত। সুতরাং সর্বাধিককরণের ধারণাটি ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গিতে গ্রহণযোগ্য নয়।
ইসলামী অর্থনীতিবিদগণ তাদের বিশ্লেষণে কখনোই “সর্বাধিককরণ” (maximization) এর ধারণা গ্রহণ করেননি, অন্তত মুনাফা বা সম্পদের ক্ষেত্রে নয়। যেখানে এই শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, তা কোনো উপকার বা কল্যাণের নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে—মধ্যমপন্থা বজায় রেখেই—প্রয়োগ করা হয়েছে। বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, কোনো ক্ষেত্রে এই ধরণের ভাষা থাকলেও প্রকৃত ঝোঁকটি ছিল ভারসাম্য ও আচরণগত ন্যায্যতার দিকে, যা মধ্যপন্থার একটি অনুপম দৃষ্টান্ত।
এই নীতির বাস্তব উদাহরণ রাসূল (স)-এর খাদ্য গ্রহণ সম্পর্কিত নির্দেশনাতেও পাওয়া যায়। তিনি বলেন: “তোমাদের কেউ যেন তার পেটের এক-তৃতীয়াংশ খাদ্যের জন্য, এক-তৃতীয়াংশ পানীয়ের জন্য এবং এক-তৃতীয়াংশ শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য ফাঁকা রাখে”। অথচ মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতা হলো পুরো পেট ভর্তি করে ফেলা, যা স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আধুনিক গবেষণাও একমত যে, পেটের একটি অংশ খালি রাখা হজম ও স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী, কারণ বহু রোগের উৎপত্তি পাকস্থলী থেকেই হয়।
তাছাড়া, খাদ্য ভাগাভাগি এবং পরিমিত ভোগের শিক্ষা রাসূল (স)-এর আরেকটি হাদীস থেকেও পাওয়া যায়। জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ আনসারী (রা) বর্ণনা করেন, রাসূল (স) বলেছেন: “একজনের খাবার দুইজনের জন্য যথেষ্ট, দুইজনের খাবার চারজনের জন্য যথেষ্ট” (সহিহ মুসলিম, হাদীস - ৫১৯৭)। এটি একটি জীবন্ত উদাহরণ যে, ইসলাম স্বভাবতই স্বল্পতায় বরকতের নীতি এবং মধ্যমপন্থার চর্চা করে।
অর্থনৈতিক কর্মদক্ষতার ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি
অর্থনৈতিক কার্যক্রম মূলত চাহিদা ও যোগানের উপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়। যদিও এই চাহিদা ও যোগান প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠে, মানব সমাজে তা কৃত্রিমভাবেও সৃষ্টি করা সম্ভব। উৎপাদনের প্রায় সকল কাঁচামালই প্রকৃতি থেকে আসে। অর্থনীতির ভাষায় উৎপাদনের চারটি উপাদান হলো—ভূমি, শ্রম, মূলধন ও সংগঠন। এর মধ্যে ভূমি সরাসরি প্রকৃতি থেকে প্রাপ্ত, শ্রম মানুষের পরিশ্রম থেকে উদ্ভূত, মূলধন হলো উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত উৎপাদিত উপকরণ এবং সংগঠন হলো একটি সুবিন্যস্ত কাঠামো, যার মাধ্যমে মানুষ উৎপাদন ও বণ্টন প্রক্রিয়াকে সুশৃঙ্খল করে।
এই উপাদানগুলোর সংমিশ্রণের মাধ্যমে মানুষ জাতিগত সম্পদের পরিমাণ বৃদ্ধি করে, যা মোট জাতীয় উৎপাদন (Gross National Product - GNP) হিসেবে পরিমাপ করা হয়। দেশের ভৌগোলিক সীমানার ভেতরে এক বছরে উৎপাদিত সকল চূড়ান্ত পণ্য ও সেবার বাজারমূল্যকে বলা হয় মোট দেশজ উৎপাদন (Gross Domestic Product - GDP)। এর মাধ্যমেই একটি দেশের ধনী ও দরিদ্রের সীমারেখা নির্ধারণ করা হয়।
ইসরাফ ও তাবযির : ভোগের সীমারেখা
ইসলাম ভোগের ক্ষেত্রে দুটো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে পৃথকভাবে উল্লেখ করেছে: ইসরাফ এবং তাবযির।
ইসরাফ হলো প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত ভোগ করা, বিশেষ করে বিলাসবহুল পণ্য ও সেবা গ্রহণের মাধ্যমে। এটি এমনকি তখনও অনুচিত, যখন ব্যক্তির আর্থিক সামর্থ্য থাকে। অর্থনৈতির পরিভাষায় ব্যাখ্যা করলে, প্রান্তিক ভোগ প্রবণতা (Marginal Propensity to Consume) বাড়তে থাকলে মানুষের চাহিদাও বাড়ে, এবং ধীরে ধীরে অতিরিক্ত ভোগ তার স্বাভাবিক অভ্যাসে পরিণত হয়। এর ফলে সামষ্টিক চাহিদা বাড়ে এবং উৎপাদন বাড়ানোর জন্য অতিরিক্ত চাপ পড়ে। যদি এই চাপ সামাল দেওয়া সম্ভব না হয়, তাহলে তৈরি হয় পণ্যের ঘাটতি, যা মূল্যস্ফীতির দিকে ঠেলে দেয়। সেই মূল্যবৃদ্ধির ভার বহন করতে না পেরে নিম্ন আয়ের মানুষ বাজার থেকে ছিটকে পড়ে, এবং তাদের মৌলিক চাহিদাগুলো অধরাই থেকে যায়। এই কারণেই ইসলাম ইসরাফকে আল্লাহর অসন্তোষের কারণ হিসেবে বিবেচনা করে । ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে, দান-সদাকার ক্ষেত্রে উদারতা প্রশংসনীয় হলেও তাতে এমন ভারসাম্য থাকতে হবে যেন দানকারী নিজেই পরবর্তীতে অভাবগ্রস্ত না হয়ে পড়ে। রাসূল (স) বলেন: “তোমরা ওয়ারিশদের অভাবমুক্ত রেখে যাওয়া উত্তম—তাদের এমন অবস্থায় রেখে যাওয়ার চেয়ে যেখানে তারা অন্যের নিকট হাত পাতবে” (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)।
তাবযির হলো সম্পদের অপব্যবহার। এটি তখন ঘটে, যখন সম্পদকে অপাত্রে ব্যয় করা হয় বা প্রয়োজনের তুলনায় এমনভাবে ব্যবহৃত হয়, যা তার কার্যকারিতা হ্রাস করে। ইসরাফ যেখানে ভোগের অতিরিক্ততায় প্রকাশ পায়, তাবযির সেখানে সম্পদের ভুল জায়গায় বা উদ্দেশ্যহীন ব্যবহারে প্রতিফলিত হয়। ইসলামী দৃষ্টিতে, ইসরাফ মানুষকে আদর্শ মুসলিমের পর্যায় থেকে নামিয়ে দিতে পারে, কিন্তু তাবযির ব্যক্তিকে শয়তানের সঙ্গী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কোরআনে বলা হয়েছে: “নিশ্চয় যারা অপচয় করে, তারা শয়তানের ভাই, আর শয়তান ছিল তার প্রতিপালকের প্রতি অকৃতজ্ঞ।” (সূরা আল-ইসরা, ১৭:২৭)
আধুনিক প্রেক্ষাপটে প্রাসঙ্গিকতা
বর্তমানে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় দেখা যায়, সম্পদের অতিরিক্ত ব্যবহার (Extensive Use of Resources) থেকে উদ্ভূত ব্যয়কে সম্প্রসারিত ব্যয় (Expansive Cost) বলা হয়, যা একধরনের ইসরাফ। অপরদিকে, উৎপাদিত ও প্রাকৃতিক সম্পদের অদক্ষ, অনুৎপাদনশীল ও উদ্দেশ্যহীন ব্যবহারকে বলা হয় wasteful use of resources, যা তাবযিরের সমার্থক।
এইভাবে, ইসলাম চাহিদা, যোগান, উৎপাদন এবং ভোগ—প্রতিটি ধাপে একটি ভারসাম্যপূর্ণ, ন্যায়সঙ্গত এবং টেকসই অর্থনৈতিক কাঠামোর কথা বলে, যা আধুনিক অর্থনীতির সাস্টেইনেবিলিটি ধারণার সাথে অনেকাংশে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
ইতিদাল বা মধ্যমপন্থা
ইসলাম উৎপাদন ও ভোগ উভয় ক্ষেত্রেই ইতিদাল—অর্থাৎ মধ্যমপন্থা অবলম্বনের উপর গুরুত্বারোপ করে। ইসলামী ফিকহে এই মধ্যপন্থার বহু প্রয়োগ লক্ষ করা যায়। একবার তিনজন ব্যক্তি তিনটি অঙ্গীকার করেন: প্রথমজন আজীবন রোজা রাখার, দ্বিতীয়জন সারারাত নামাজ আদায়ের, এবং তৃতীয়জন নারীদের থেকে দূরে থাকার (অর্থাৎ বিবাহ না করার)। রাসুল (স) তাদের উদ্দেশে বলেন, “আল্লাহর কসম! আমি তোমাদের তুলনায় আল্লাহকে অধিক ভয় করি ও তাঁর প্রতি অধিক অনুগত। কিন্তু আমি রোজা পালন করি আবার রোজা ভাঙিও; নামাজ আদায় করি আবার ঘুমাই; বিবাহও করি।” (সহীহ বুখারী: ৫০৬৩) এটি প্রমাণ করে যে, ইসলাম বৈধ ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবনাচরণকে উৎসাহিত করে। ইসলাম বৈধভাবে সম্পদ অর্জনে উৎসাহ প্রদান করে, যেমন কোরআনে বলা হয়েছে: “সালাত আদায় করার পর তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ো এবং আল্লাহর অনুগ্রহের সন্ধানে ব্যস্ত হও, আর আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ কর, যাতে তোমরা সফল হতে পারো।” (সূরা জুমুআহ: ১০)
অথচ, অলসতা ইসলাম সমর্থন করে না। বরং সকলকে জীবিকা অর্জনের জন্য পরিশ্রম করতে বলা হয়েছে। তবে এটি বলার পরও ইসলাম আয়-বৈষম্যের অস্তিত্বকে স্বীকার করে, যা কখনও স্থান বা সুযোগের পার্থক্য থেকে উদ্ভূত হতে পারে। এ বৈষম্য লাঘবে যাকাত, সদকা প্রভৃতি প্রাতিষ্ঠানিক ও আত্মিক ব্যবস্থার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, হযরত উসমান (রা.) বৈধ পথে অনেক সম্পদ অর্জন করেছেন এবং সে সম্পদ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ব্যয় করেছেন। তবে সম্পদ অর্জনে তিনি এতই মগ্ন হননি যে তা তার ধর্মীয় দায়িত্ব থেকে বিচ্যুতির কারণ হয়। এটি একটি আদর্শ দৃষ্টান্ত, যা আজকের সমাজে প্রায় অনুপস্থিত।
ইসলাম বলে, জীবিকা অর্জনের জন্য সকলকে চেষ্টা করতে হবে, তবে আল্লাহর বিধানকে উপেক্ষা করে নয়। উভয় অবস্থান বজায় রাখার মাধ্যমেই আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন সম্ভব। যেমন কোরআনে বলা হয়েছে: “আল্লাহ জীবনোপকরণে তোমাদের কাউকে কারও ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন।” (সূরা নাহল: ৭১)। ইসলাম বেরাগ্যতার নামে কাজ-কর্ম থেকে দূরে থাকার শিক্ষা দেয় না, আবার এমন কাজেও উৎসাহ দেয় না যা ইবাদাত থেকে বিচ্যুতি ঘটায়। বরং একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান গ্রহণের নির্দেশ দেয়। আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদীসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন: “শক্তিশালী মুমিন দুর্বল মুমিন অপেক্ষা আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয়।” (সহীহ মুসলিম: ৬৫৩২)
অতএব, ইসলামে ‘সম্পদের সর্বাধিকরণ’ নয় বরং ‘সম্পদে বরকত’ ও ‘সামাজিক কল্যাণের সর্বাধিকরণ’ই হলো মূল লক্ষ্য। কারণ অধিক সম্পদ কখনও ক্ষতির কারণ হতে পারে, কিন্তু বরকতময় সম্পদ তা নয়। ফলে কল্যাণ সর্বাধিকরণই হয় উৎপাদন, বন্টন ও ভোগের মূল তাড়না। আর এই কল্যাণ নিশ্চতে মানুষের দায়িত্ব হলো কর্মদক্ষতা নিশ্চত করা ও সামাজিক ন্যায়বিচার (আদালাহ ইজতিমাইয়্যা) প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে যথাযথ প্রক্রিয়ায় বন্টন করা।