লিবারেলিজমের সমাজ দৃষ্টিভঙ্গি | মোহাম্মদ ইমরান
এক.
‘সমাজ’ এর ধারণা অত্যন্ত ব্যাপক এবং বহুমাত্রিক। সমাজবিজ্ঞানের জনক অগাস্ট কোঁৎ সমাজকে একটি শক্তিশালী সিস্টেম বা কাঠামো হিসেবে দেখেছেন যেটি বিভিন্ন উপাদান, যেমন- মূল্যবোধ, আচরণ ও প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে গঠিত, এবং একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনে একত্র কাজ করে। সমাজ সম্পর্কে বলতে গিয়ে এমিলি ডুর্খেইম collective consciousness বা ‘সামগ্রিক সচেতনতা’ ধারণাটি সামনে নিয়ে আসেন। ডুর্খেইমের এ ‘সামগ্রিক সচেতনতা’ ধারণাটি সমাজের মানুষের মধ্যে ঐক্যবদ্ধতা সৃষ্টি এবং পারস্পরিক সমন্বয়ের তাগাদা দেয়।
সমাজ ধারণার আরো ব্যাপকতা বুঝতে হলে আমাদের ধর্মীয় এবং দার্শনিক বিশ্বাসের দিকেও নজর দিতে হবে। ইসলামে সমাজের ধারণাটি একটি আধ্যাত্নিক এবং নৈতিক কাঠামোকে ঘিরেই তৈরি হয়েছে। এই কাঠামোটা গড়ে ওঠবে ইনসাফ, অধিকার এবং শৃঙ্খলা রক্ষার মাধ্যমে। পাশাপাশি ইসলামের সমাজ ধারণা ব্যক্তির উপর ইনসাফ প্রতিষ্ঠার এক ধরণের দায়িত্ব আরোপ করে।
ইসলামের সমাজ ধারণার সাথে কনফুসিয়ানিজমের সামাজিক বোঝাপড়ার একটা সাদৃশ্য লক্ষণীয়। কনফুসিয়ান চিন্তা সমাজের মধ্যে শৃঙ্খলা, মর্যাদা ও শ্রদ্ধাবোধের একটি কাঠামো প্রস্তাব করে, যেখানে সমাজ পরিচালিত হবে নৈতিকতা এবং সমাজের প্রতি ব্যক্তির দায়িত্বশীল ও আনুগত্যশীল আচরণের মাধ্যমে।
সমাজ সম্পর্কে উপরে আলোচিত ক্লাসিক্যাল ধারণা থেকে দুটি জিনিস পরিষ্কার হয়—
• প্রথমত, সমাজকে একটি সিস্টেম বা ব্যবস্থা হিসেবে দেখা হয়েছে, যেখানকার রীতি অনুসারে ব্যক্তি আচরণ করবে কিংবা ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করবে।
• দ্বিতীয়ত, এ ব্যবস্থাকে কার্যকর করার জন্য ব্যক্তির ভূমিকা এবং দায়িত্বের ধারণা সামনে নিয়ে আসা হয়েছে।
এই বিষয়গুলোকে একত্র করে সমাজের একটি সংজ্ঞা দাঁড় করানো যায় এভাবে— সমাজ মূলত কিছু ব্যক্তির সমষ্টি দ্বারা পরিচালিত একটি ব্যবস্থা, যা সবার সংঘবদ্ধ কার্যকলাপের মাধ্যমে সক্রিয় থাকে।
দুই.
সতেরো এবং আঠারো শতকে ইউরোপে এনলাইটেনমেন্ট বা আলোকায়নের বিকাশ ঘটে। এনলাইটেনমেন্ট মূলত ইউরোপীয় সমাজের একটি বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন, যেটি পুরোনো সকল দৃষ্টিভঙ্গি ও চিন্তাধারার বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধন করেছিল। এই বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনের অন্যতম ভিত্তি ছিল হিউম্যান রিজনিং বা মানুষের স্বাধীন চিন্তার সক্ষমতা, রেশনালিটি বা যৌক্তিকতা এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা। আলোকায়নের এসব উপাদানের ভেতর থেকেই লিবেরালিজমের ধারণা বেরিয়ে আসে।
লিবারেল আইডিয়োলজি বা উদারতাবাদের উপাদান মূলত এনলাইটেনমেন্ট থেকে উৎসারিত। লিবারেলিজমের মূল আলাপে যাওয়ার আগে জেরেমি বেনথামের একটি একটি বিখ্যাত উক্তির উপর দৃষ্টিপাত করা যাক—
“Happiness is maximizing pleasure and minimizing pain.”
বেনথামের এই কথাটি বুঝতে হলে আমাদের আগে উপযোগবাদ তথা Utilitarianism ধারণার সাথে পরিচিত হওয়া লাগবে। উপযোগবাদ মূলত একটি নীতিবাদী দর্শন, যার মূল কথা হচ্ছে— কোনো action বা কাজের নৈতিক অবস্থান বা নৈতিকতা নির্ভর করে তার outcome বা ফলাফলের উপর।
আরো স্পষ্ট করে বলতে গেলে, ব্যক্তির কোনো সিদ্ধান্ত যদি সর্বাধিক সুখ নিয়ে আসে, তবে সেটি নৈতিকভাবে সঠিক বলে বিবেচিত হবে। জেরেমি বেনথামের মতে সুখ হচ্ছে— Maximising pleasure and minimising pain. অর্থাৎ সর্বোচ্চ আনন্দ লাভ করা এবং কষ্ট বা দুঃখ প্রশমিত করা।
বেনথাম উপযোগের ধারণা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অনেকটা সুখ অর্জনকেই ব্যক্তির আসল লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করেছেন। তার ধারণা মতে, সুখ ব্যাপারটা আনন্দ লাভ এবং দুঃখ প্রশমনের সাথে জড়িত। বেনথামের এ থিওরিকে ভালোভাবে অনুধাবন করার জন্য আমাদেরকে তৎকালীন আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটের দিকে নজর দিতে হবে। তিনি মূলত আলোকায়ন বা Enlightenment এর সময়কার একজন স্কলার। আলোকায়নের কল্যাণে ইউরোপীয় সমাজ তখন উদার অর্থনৈতিক এবং পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার দিকে ধাবিত হচ্ছিল। তৎকালীন ক্রমবর্ধমান উদারতাবাদ বা লিবেরাল সোসাইটির আইডিয়াগুলোই মূলত বেনথামের এই দৃষ্টিভঙ্গি তৈরিতে মূল নিয়ামকের ভূমিকা পালন করেছিল বলা যায়।
লিবেরাল বা উদারনৈতিক সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিগুলো হলো— সমতা (equality), যৌক্তিকতাবাদ (Rationality), ব্যক্তিস্বাধীনতা (liberty) এবং সম্পদ অর্জন ও ভোগের স্বাধীনতা (private property ).
উদারতাবাদের এসব পিলারের উপরই দাঁড়িয়ে আছে বেনথামের অর্থনৈতিক উপযোগের ধারণা। আরো পরিষ্কার করে বলতে গেলে, উদারনৈতিক সমাজে ব্যক্তির স্বাধীনতা অর্থাৎ ব্যক্তির পছন্দ অপছন্দকে গুরুত্ব দেওয়া হয়, এবং সেই অনু্যায়ী তার কর্মপন্থার উপর সমাজ কোনো প্রকার হস্তক্ষেপ করতে পারে না।
দ্বিতীয়ত, উদারনৈতিক সমাজ ব্যক্তির যৌক্তিকতা নিরুপণ এবং তদনুযায়ী কর্মপন্থা নির্ধারণের সক্ষমতাকে স্বাগত জানায়। অর্থাৎ সোসাইটি এখানে তার কোনো চিন্তার পরিসর ও কর্মক্ষেত্র তৈরি করে দেয় না। বরং ব্যক্তি তার যৌক্তিকতার মাধ্যমে যেটাকে ভালো মনে করে, লিবেরাল সোসাইটি তাকে সেটা বাস্তবায়ন করার এখতিয়ার প্রদান করে।
তৃতীয়ত, লিবারেল সোসাইটি ব্যক্তির সম্পদ অর্জন ও ভোগের ব্যাপারে অবাধ স্বাধীনতা প্রদানের ওপর জোর দেয়। লিবারেলদের মতে, সম্পদ অর্জনের স্বাধীনতা ব্যক্তিকে তার ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের উপলব্ধি এবং সুখ লাভের অনুভূতি প্রদান করে। এ জায়গায় উদারতাবাদ সম্পদ অর্জন এবং ভোগকেই সুখ অর্জনের উপায় হিসেবে বিবেচনা করে।
উদারতাবাদের এসব ভিত্তি বা পিলারের উপরই দাঁড়িয়ে আছে বেনথামের অর্থনৈতিক উপযোগের ধারণা (Economic Utility)।
জেরেমি বেনথামের তত্ত্ব এই জায়গাতেই শেষ নয়। তিনি অর্থনৈতিক উপযোগ ধারণার সাথে ‘Harmony of interest’ তথা স্বার্থের ঐক্য ধারণাটিকেও যুক্ত করেছেন। ‘হারমনি অব ইন্টেরেস্ট’ ধারণাটি ইনডিভিজুয়াল তথা ব্যক্তিস্বার্থের সাথে সংশ্লিষ্ট। লিবেরাল সোসাইটি যখন ব্যক্তি স্বাধীনতার চর্চা ও তার স্বার্থ রক্ষা করতে সাহায্য করবে, পাশাপাশি কোনো রকম আইন বা রীতিনীতির মাধ্যমে হস্তক্ষেপ করবে না, তখন ইনডিভিজুয়ালের ইন্টারেস্ট রক্ষার মাধ্যমে সামাজের সামগ্রিক স্বার্থ সংরক্ষিত হবে।
একইভাবে অর্থনীতির জনক এডাম স্মিথও তার অর্থনৈতিক ব্যাখ্যা হাজির করে গুড সোসাইটির ধারণা এঁকেছেন। সোসাইটিতে ইনডিভিজুয়ালের স্বাতন্ত্রিকতা ও সর্বোচ্চ ব্যক্তি স্বাধীনতা চর্চার মাধ্যমে একটি সম্মিলিত ঐক্য তৈরি হয়, যা সমৃদ্ধশালী ও শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠন করতে পারে। স্মিথের ইনভিজিবল হ্যান্ড থিওরির মধ্যেই গুড সোসাইটির ধারণা আরো স্পষ্ট হয়। এই থিওরি অনুযায়ী, সমাজে বিদ্যমান প্রতিযোগিতামূলক বাজারে ব্যক্তি দু’ভাবে আচরণ করে। সে হয় তার চাহিদা পূরণের জন্য ভোক্তা হিসেবে আচরণ করে অথবা উৎপাদক বা বিক্রেতা হিসেবে সক্রিয় থাকে। এ পরিস্থিতিতে ভোক্তা তার চাহিদা ও প্রয়োজন মেটায় আর বিক্রেতা ভোক্তার প্রয়োজন মেটাতে সাহায্য করার মাধ্যমে নিজের স্বার্থ সংরক্ষণ করে। এভাবে এই প্রতিযোগিতামূলক অর্থনৈতিক সমাজে ইনডিভিজুয়ালস বা ব্যক্তিদের মধ্যে একটা ঐক্য তৈরি হয়। পাশাপাশি এ সিস্টেমে কোনো উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বা সরকারের হস্তক্ষেপ থাকে না, বরং এটি একটি self-regulating বা আত্ননিয়ন্ত্রিত সিস্টেম। এই সামাজিক কাঠামোকে স্মিথ “ইনভিসিবল হ্যান্ড বা অদৃশ্য হাত” হিসেবে অভিহিত করেছেন। এই কাঠামোর মধ্যেই ব্যক্তি তার প্রকৃত সুখ অর্জন করতে পারে। যে সমাজ এ কাঠামোকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে ব্যক্তির সুখ অর্জনে সহায়ক ভূমিকা পালন করে, বেনথামের মতো স্মিথও এ সমাজকেই গুড সোসাইটি হিসেবে অভিহিত করেছেন।
একটা লক্ষণীয় ব্যাপার হলো, বেনথাম এবং স্মিথ উভয়ের কাছেই গুড সোসাইটি বা ভালো সমাজের ক্রাইটেরিয়া হচ্ছে—ব্যক্তিকে স্বাধীনতা দেওয়া, যার মাধ্যমে সে সুখ অর্জন করতে পারে। আর এ সুখ অর্জনের ব্যাপারটি ভোগের সাথে সম্পর্কিত। এদিক দিয়ে বেনথাম আরো এক দাপ এগিয়ে। তিনি এই ভোগবাদিতার স্বাধীনতা এবং সেটা উপভোগের জন্য সহযোগিতা প্রদানের সিস্টেমকেই utlitarianism তত্ত্বের মাধ্যমে মোরালিটি বা নৈতিকতা বলে আখ্যায়িত করছেন।
তিন.
লিবারালিজমের এসব বস্তুবাদী দার্শনিক এবং নৈতিক উপাদানই আধুনিক লিবেরাল সোসাইটির ধারণাকে মজবুত করে। পাশাপাশি এই ধরনের সমাজ কাঠামোকে ‘গুড সোসাইটি’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। বর্তমান দুনিয়ায় লিবারালিজমের এই সমাজ চিন্তার universalization বা বৈশ্বিকীকরণ ঘটেছে। যে কারণে পশ্চিমা দুনিয়া এই সীমারেখার মধ্যেই সমাজকে পর্যবেক্ষণ করতে শিখায়। পশ্চিমা দার্শনিক এবং চিন্তকদের এ স্বীকৃতির বাইরে গিয়ে লিবারেল সোসাইটিকে পাঠ করতে হলে, এবং তার শ্রেষ্ঠত্ব বা সাধারণত্ব বিচার করতে গেলে এর নেতিবাচক দিক কিংবা সীমাবদ্ধতার জায়গাগুলো নিয়ে একটু আলাপ করা জরুরি।
• প্রথমত, উদারনৈতিক সমাজ collectivism বা সামগ্রিকতার চেয়ে ব্যক্তির স্বাতন্ত্র্য, স্বাধীনতা ও যৌক্তিকতাকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে থাকে। সে বলতে চায় individual exists beyond the society. এভাবে ইনডিভিজুয়ালিটিকে প্রাধান্য দেয়ার ফলে ব্যক্তি সমাজে কীরুপ আচরণ করবে, এ বিষয়ে সে সমাজে কোনো মোরাল ফ্রেমওয়ার্ক বা নৈতিক সীমারেখা আরোপ করে না। নৈতিক মানদণ্ডে ভালোমন্দ যাচাই-বাছাইয়ের কোনো কাঠামো বিদ্যমান থাকে না। বরং যে কর্মের মাধ্যমে ব্যক্তি তার স্বাধীনতা ব্যবহার করে আনন্দ লাভ করতে পারে, সেটাকেই নৈতিকভাবে সঠিক বলে ধরে নেওয়া হয়। আধুনিক সমাজে এ ধরনের নৈতিক সীমারেখা অনুপস্থিত থাকার ফলাফল কী হতে পারে, সেটা খোদ পাশ্চাত্যের বিখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী এমিল ডুরখেইমের আলাপ থেকেই অনুধাবন করা যাক। সমাজ বিজ্ঞানের আবর্তন ও বিকাশ লাভে এমিল ডুরখেইমের অবদান সবচেয়ে বেশি। তার গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন তত্ত্বের মধ্যে “অ্যানোমি” তত্ত্বটি ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। সামাজিক মূল্যবোধ ও রীতিনীতি বিবর্জিত সমাজের অবস্থা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি অ্যানোমি ধারণাটি নিয়ে আসেন। ডুরখেইমের মতে—সমাজ ব্যক্তির ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা এবং চাহিদাকে বিভিন্ন মূল্যবোধ ও রীতিনীতি দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। পাশাপাশি তার আচার আচরণকে বিভিন্নভাবে গাইড করে। অ্যানোমি এমন এক পরিস্থিতি যখন ব্যক্তি এবং এই সামাজিক নৈতিক কাঠামোর মধ্যে বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়। অতঃপর এ সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ব্যক্তিকে সমাজের মূল অংশ থেকে উদ্দেশ্যহীন ও নিঃসঙ্গ করে ফেলে, এবং তার মধ্যে একাকিত্ব ও হতাশা সৃষ্টি করে।
আধুনিকায়নের ফলে অর্থনৈতিক পরিবর্তনের মাধ্যমে পুঁজিবাদী এবং ভোগবাদী সংস্কৃতির আবির্ভাব সমাজের এই গাইডিং স্ট্রাকচার তথা পথনির্দেশমূলক কাঠামো ব্যক্তিকে অনিয়ন্ত্রিত স্বাধীনতা প্রদানের মাধ্যমে মূলত তাকে “অ্যানোমি” সিচুয়েশনে ফেলে দেয়। যেখানে তাকে পথনির্দেশ করার মতো কোনো নিয়মনীতি এবং নৈতিকব্যবস্থা বিদ্যমান থাকে না।
লিবেরাল সোসাইটির আরেকটি নেতিবাচক প্রভাব হলো, এর ভোগবাদী এবং বস্তুবাদী প্রকৃতি। এ ধরনের সমাজ ব্যক্তিকেন্দ্রিকতাকেই সবেচেয়ে বেশি প্রাধান্য দিয়ে থাকে। ফলে ব্যক্তির উচ্চাশা ও অনিয়ন্ত্রিত চাহিদাকে সীমিত করতে না পারার ফলে সমাজের ইনডিভিজুয়াল বস্তুবাদী জীবনধারায় অভ্যস্থ হয়ে পড়ে। এই consumer culture বা ভোগবাদী সংস্কৃতি সমাজে দু’ধরনের বিভাজন তৈরি করে। প্রথমত অর্থনৈতিকভাবে স্বচ্ছল একটা ক্লাস তৈরি করে, যাদের consumption rate বা ভোগের পরিমাণ থাকে সবসময় বেশি। আরেকটা অর্থনৈতিকভাবে তুলনামূলক অসচ্ছল ক্লাস, যারা নিজেদেরকে frustrated কমিউনিটির অংশ মনে করে। এ ব্যাপারটি আরো ভালোভাবে বুঝা যাবে, যদি আমরা রবার্ট কে মারটনের “Realtive deprivation” ধারণাটির সাথে পরিচিত হয়। Relative deprivation হচ্ছে এমন এক পরিস্থিতি, যখন কেউ তুলনামূলকভাবে অন্যের স্বচ্ছলতা, বিলাসী লাইফস্টাইল দেখে বঞ্চিত অনুভব করে। এই অনুভূতিটা সাধারণত অন্যের সাথে তুলনা ও মূল্যায়নের ভিত্তিতে তৈরি হয়, বিশেষত যখন কেউ তার নিজের এবং সমপর্যায়ের অন্য কারোর সামাজিক অবস্থান, অর্থ, বৈভব কিংবা মর্যাদার মধ্যে ফাঁক দেখতে পায়।
লিবেরাল সোসাইটির উদারনেতিক সামাজিক চিন্তা, মূল্যবোধ ও পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক কাঠামো ব্যক্তির মধ্যে এই রিলেটিভ ডিপ্রেভিয়েশনের অনুভূতি সঞ্চার করতে মূখ্য ভূমিকা পালন করে থাকে। এই অনুভূতির যেমন ব্যক্তিকেন্দ্রিক নেতিবাচক প্রভাব আছে, তেমনি সামগ্রিক সমাজ ব্যবস্থায়ও নানাবিধ সমস্যা সৃষ্টি করে। সমাজ বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে, এটি ব্যক্তিপর্যায়ে হতাশা, দুর্দশা ও মানসিক অস্থিরতা তৈরি করে। অথচ জেরেমি বেনথামের উদারনৈতিক পুঁজিবাদী সমাজ কাঠামোর লক্ষ্যই ছিল ব্যক্তির সুখ অর্জনকে সর্বোচ্চকরণ। কিন্ত রিলেটিভ ডিপ্রেভিয়েশন বাস্তবে বিদ্যমান অসমতা ও বৈষম্যকেই সামনে নিয়ে আসে।
• দ্বিতীয়ত, এটি সামাজে ক্রাইম বিস্তারের পথ খুলে দেয়। পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক কাঠামোর ভেতর দিয়ে একটি ফ্রাস্ট্রেটেড কমিউনিটি গড়ে উঠে, যাদের প্রাইভেট প্রপার্টি নেই এবং কনজিউমার কালচার তথা ভোগবাদী সংস্কৃতিতে যাদের কোনো অংশগ্রহণ নেই। এই ফ্রাস্ট্রেটেড কমিউনিটি ধীরে ধীরে বিভিন্ন অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা অর্জনের নিমিত্তে অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে পড়ে।
পাশাপাশি, ফ্রাস্ট্রেটেড কমিউনিটির মধ্যে দীর্ঘমেয়াদে সোস্যাল সিস্টেমের বৈপ্লবিক পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা লুকিয়ে থাকে। বিদ্যমান ব্যবস্থার বিলোপ সাধনের লক্ষ্যে তারা অনেকসময় উগ্রপন্থী আন্দোলনের সংকটও তৈরি করতে পারে। যেটা মূলত রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টির মাধ্যমে সংঘাত ও যুদ্ধাবস্থার দিকেও মোড় নিতে পারে। বিগত শতাব্দীতে পুঁজিবাদী বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ঘটে যাওয়া কমিউনিস্ট আন্দোলন তার উৎকৃষ্ট উদাহারণ।
ইউরোপীয় রেনেসাঁ ও এনলাইটেনমেন্টের প্রজেক্ট ‘লিবারেলিজম’ ধর্মীয় আদর্শ এবং কনজারভেটিভ সোসাইটির দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বেরিয়ে এসে রেশনালিটি এবং হিউম্যান রিজনিং-এর উপর ভর করে সমাজ চিন্তা হাজির করেছে। মানুষের কার্যকরণ এবং যৌক্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতাকে প্রাধান্য দিয়ে ইনডিভিজুয়ালিস্টিক বা ব্যক্তিনির্ভর সোসাইটির ধারণা সামনে নিয়ে এসেছে। ফলে ব্যক্তির চিন্তা প্রতিফলিত হয়েছে সমাজ ব্যবস্থায়, সাংস্কৃতিক আচরণে, মূল্যবোধ বিনির্মাণে এবং অর্থনৈতিক আচরণে। এগুলোর সমন্বয়ে আবির্ভাব ঘটেছে লিবারেল সোসাইটি। যেখানে ব্যক্তি এবং তার ভূমিকা হচ্ছে মূখ্য। আর সমাজের পরিচয় মিলে ব্যক্তির আকাঙ্ক্ষা ও তার খাহেশাতকে পূর্ণ সমর্থন ও বিকশিত করার গৌণ ভূমিকায়।