রাষ্ট্রে আইন ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সেকুলারাইজেশন : সংঘর্ষ ও সম্পর্কের স্বরূপ | সোহরাব হোসাইন
কলোনাইজেশন এবং বিশ্ব রাজনীতির পটপরিবর্তনের কারণে গত ১৮ ও ১৯ শতকে মুসলিম দেশগুলোর রাষ্ট্রীয় কাঠামোগুলোকে স্বেচ্ছায় বা জোরপূর্বক সেকুলারাইজেশন করা হয়। নোয়াহ ফেল্ডম্যান ও তালাল আসাদ মিশর ও উসমানি শাসন কাঠামোর বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, কীভাবে ইসলামী রাষ্ট্র ও বিচার ব্যবস্থাকে সেকুলারাইজেশন করা হয়েছিল। মূলত শরীয়া বা শরীয়া আদালত প্রথম দিকে রাষ্ট্রের অধীন ছিল না। প্রথম আবদুল মজিদ ১৮৩৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর প্রথম রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে সেকুলারাইজেশন প্রক্রিয়া শুরু করেন। তার ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে সুলতান আবদুল হামিদ ১৮৭৬ সালে আইন প্রণয়নের দায়িত্ব দিয়ে নিম্ন কক্ষ ও উচ্চ কক্ষ নামে দুইটি আইনসভা সৃষ্টি করেন, যার মাধ্যমে আইন প্রণয়নের ক্ষমতাকে রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগের অধীন করা হয়। আবার একই বছর নেপোলিয়ান কোডের আদলে দেওয়ানী কার্যবিধি (মিসিল) প্রণয়নের মাধ্যমে শরীয়াকে রাষ্ট্রের অধীন করা হয়। ফলে শরীয়ার কার্যকারিতা যতটুকু যে সীমার মধ্যে অনুমোদন করা হয়েছিল, ঠিক ততটুকু সে সীমার মধ্যে কার্যকর থাকে। এ ধরনের পরিবর্তনের আন্দোলনকে ‘তানযিমাত’ বলা হত। আর এভাবেই ‘তানযিমাত’ এর হাত ধরে সেকুলারাইজেশনের যাত্রা শুরু হয়।
(পাশ্চাত্যের অভিজ্ঞতার আলোকে) সেকুলারাইজেশনের মূল হল রাষ্ট্রকে ধর্ম থেকে আলাদা করে দেওয়া এবং শরীয়া বা ধর্মীয় বিধানকে ব্যক্তিগত বিষয়, যেমন: বিয়ে, তালাক এসবের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেওয়া এবং সে ব্যক্তিগত বিষয়ে ব্যক্তিগত স্বাধীনতার স্বীকৃত দেওয়া। কিন্তু আমরা দেখব যে, আসলে রাষ্ট্র শরীয়া বা ধর্মীয় (ইসলাম) বিধানকে শুধু ব্যক্তিগত বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার মাধ্যমে (যেহেতু ইসলাম ব্যক্তিগত বিষয়ে সীমাবদ্ধ নয় বরং রাষ্ট্র নিয়েও তার প্রস্তাবনা আছে) যেমন হস্তক্ষেপ করে, তেমনি সেই স্বীকৃত সীমাবদ্ধ বিষয়েও হস্তক্ষেপ করে । আর এভাবে সে তার নাগরিকের একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়কেও ব্যক্তিগত মনে না করে তার নিজের অধীন করে নেয়। একটা সেকুলার রাষ্ট্র যখন শরীয়া ধর্মকে প্রাইভেট ডোমেইনে প্রয়োগের জন্য সীমা নির্ধারণ করে দেয় আর তার মাধ্যমে নিজের অধীন করে নেয়, তখন সেটা তার ‘অভ্যন্তরীণ অংশ’এ পরিণত হয় । এভাবে রাষ্ট্র যখন শরীয়াকে নিজের অধীন করে একটা সীমার মধ্যে তার প্রয়োগকে নির্দিষ্ট করে দেয় আবার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের (বিচার ব্যবস্থা) মাধ্যমে তা প্রয়োগ করার বন্দোবস্ত করে, তখন সে মূলত সেকুলার রাষ্ট্রের অধীন শরীয়ার অস্তিত্বকে স্বীকার করে নেয়। শরীয়ার এরূপ স্বীকৃতি বা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কর্তৃক প্রয়োগ হওয়াটা ধর্মের সাথে সেকুলার রাষ্ট্রের সম্পর্কহীনতা নয়, সম্পর্কের বোঝাপড়াকে নির্দেশ করে। একইভাবে (পাশ্চাত্যের অভিজ্ঞতার আলোকে) ‘আলাদা করা’ বলতে ধর্ম প্রকৃতিগতভাবেই ব্যক্তিগত বিষয় সেজন্য আলাদা করা প্রয়োজন—এমনটা বোঝায় না বরং ধর্ম এবং রাষ্ট্রের মাঝে একটা সম্পর্ক রয়েছে যা বৈষম্যের কারণ, সেজন্য আলাদা করা প্রয়োজন—বোঝায়। অন্যদিকে সেকুলার রাষ্ট্র শরীয়ার অস্তিত্ব স্বীকার করলেও তার কর্তৃত্ব স্বীকার করে না। আর এরূপ (শরীয়ার কর্তৃত্ব) অস্বীকার করার সীমা রাষ্ট্র কর্তৃক একান্ত ব্যক্তিগত বলে স্বীকৃত বিষয় পর্যন্ত বিস্তৃত। এভাবে রাষ্ট্র নিজেকে ধর্মীয় বিধান পালনের ক্ষেত্রে অনুমোদন করা বা না করার একমাত্র হকদার বলে দাবি করে। অর্থাৎ মানুষ ধর্মীয় বিধান পালন করতে পারে এ জন্য না যে ধর্ম/শরীয়া এরূপ বিধান পালন করতে বলে বরং এ জন্যও যে রাষ্ট্র এরূপ ধর্মীয় বিধান পালন করার অনুমতি দেয় । একইভাবে কোন ব্যক্তির ধর্মীয় স্বাধীনতা আছে এ জন্য না যে সে ধর্মীয়ভাবে স্বাধীন বরং এ জন্য যে ধর্মের নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে সেকুলার রাষ্ট্র এটাকে স্বাধীন বলে স্বীকৃতি দেয়। ফলে যখন কেউ বলে আমি ব্যক্তিগত পর্যায়ে স্বাধীন, তখন সে স্বাধীন এটা বোঝায় না বরং তাকে নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে, সে জন্য সে স্বাধীন সেটা বোঝায়। ধর্মীয় স্বাধীনতা তখন ধর্ম দ্বারা নয়, রাষ্ট্র দ্বারা নির্ধারিত হয়। এভাবে সেকুলার রাষ্ট্র ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে আলাদা করে ব্যক্তিগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ করা দ্বারা এটা বুঝায় না যে, ব্যক্তি পর্যায় ধর্ম পালনে সে পুরোপুরি স্বাধীন বরং এটা বুঝায় যে, স্বাধীনতা দেওয়ার এখতিয়ার ধর্মের নয়; কেবল রাষ্ট্রের। আর এভাবে শরীয়ার সাথে সেকুলারিজমের একটা সাংঘর্ষিক সম্পর্ক তৈরি হয়।
ইউরোপে যে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তন ঘটে, তা আধুনিক সেকুলার রাষ্ট্র কাঠামো গঠন ও তার অধীন সেকুলার আইন প্রণয়নের পথকে উন্মুক্ত করে দেয় । এভাবে আইনকে (যা রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কিত) নৈতিকতা (যা পরিবারের সাথে সম্পর্কিত) থেকে আলাদা করে ফেলা হয়। আহমদ সাফওয়াত (একজন মিশরীয় আইনবিদ, যিনি শরীয়াকে কীভাবে সেকুলার কাঠামোর সাথে অ্যাডজাস্ট করানো যায়, তার উপর কাজ করেছিলেন) দেখানোর চেষ্টা করেছেন, কীভাবে শরীয়ার সীমার মধ্যেও সেকুলার উপাদান থাকতে পারে। এ ক্ষেত্রে তিনি কোরআনে বর্ণিত আয়াতগুলোকে দুইটি ভাগে ভাগ করেছেন—
পজিটিভ (ধনাত্মক) ও
নেগেটিভ (ঋণাত্মক)।
তিনি বলছেন, সম্পত্তির বণ্টনের বাধ্যবাধকতা হলো পজিটিভ আইন। আবার একজন পুরুষ মুসলিম চারটার বেশি বিয়ে করতে না পারাটা নেগেটিভ আইন; কিন্তু সে তিনটা করবে নাকি দুইটা করবে নাকি একটা, সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার ব্যক্তির নিজের। সম্পত্তির বণ্টন ও চারটার বেশি বিয়ে করতে না পারাটা বাধ্যবাধকতা বোঝায় আবার একইসাথে চার বা তার চেয়ে কম যেকোনো সংখ্যক বিয়ে করাটা ব্যক্তির স্বেচ্ছাধীনতাকে বোঝায়। আহমদ সাফওয়াত বলছেন, কোন কিছুর সীমার মধ্যে করা বা না করার বাধ্যবাধকতা সেই সীমার মধ্যে অনুমোদিত কোন কিছু করতে অনুমোদন দেওয়া বা না দেওয়াটা শরীয়া ডিল করে না। ফলে রাষ্ট্র চাইলে এই জায়গায় বিধি নিষেধ আরোপ করতে পারে । যেমন: ২য় বিয়ের জন্য কোর্টের অনুমোদন না নেওয়া বা ২য় বিয়ের আগে প্রথম স্ত্রীর অনুমোদন নেওয়ার বাধ্যবাধকতা।
কথা হলো শরীয়াই যদি কারো সম্মতি ছাড়া কোন কিছু করা বা না করার এখতিয়ার ব্যক্তিকে দিয়ে থাকে, তাহলে সেটাকে অন্য কোন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষ করে দেওয়াটা শরীয়তের ফ্রেমওয়ার্কের ভিতরে সেকুলার উপাদান প্রয়োগ করার ‘স্কোপ’ থাকার মাধ্যমে সেকুলারাইজেশন না বুঝিয়ে বরং ‘হস্তক্ষেপ’র মাধ্যমে সেকুলারাইজেশনকে বুঝায়। আর যদি শরীয়তের ফ্রেমওয়ার্কের ভিতর নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে সেকুলার উপাদান প্রয়োগ করার স্কোপকে শরীয়া অনুমোদন করে, তাহলে সেটা সেকুলার ফর্মে রূপান্তরকরণকে না বুঝিয়ে বরং শরীয়ার অংশকেই বুঝায়। তবে আহমদ সাফওয়াত নৈতিকতাকে সেকুলার রাষ্ট্র বা ধর্ম কর্তৃক অনুমোদন করা বা না করার সম্পর্কের দৃষ্টিতে দেখেন নি। তিনি এটাকে আইন মানার দায়িত্ব ও না মানার খেসারত হিসেবে দুনিয়া ও আখিরাতে শাস্তি পাওয়ার দৃষ্টিতে দেখেছেন। তিনি নৈতিকতা বলতে ব্যক্তিগত পর্যায়ে কর্তৃত্বশীল বিধানকে (আইনের মত কর্তৃত্বশীল প্রয়োগ) বোঝাতে চেয়েছেন। কোন বিধান আইনের মত কর্তৃত্বশীল হওয়ার পরেও সেটা আইন না হয়ে নৈতিকতা হয় এই জন্য যে, সেটা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে প্রয়োগ না হয়ে ব্যক্তিগত পর্যায়ে প্রয়োগ হয়। তবে এরূপ নৈতিকতা নিজে কর্তৃত্বশীল হওয়ার পরেও তার উপর কোন নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষের কর্তৃত্বকে অস্বীকার করে না। আর এর দ্বারা তিনি নৈতিকতা বলতে কর্তৃত্বহীন অবস্থা বোঝানোর প্রচলিত বয়ানকে পাস কাটিয়ে ‘কর্তৃত্বশীল অবস্থা’র দাবি করে নতুন চিন্তা হাজির করার চেষ্টা করেছেন ।
সেকুলার রাষ্ট্র বলতে প্রত্যেক নাগরিকের ব্যক্তিগত পর্যায়ে ধর্মীয় স্বাধীনতার স্বীকৃতি বোঝালেও রাষ্ট্র সেখানেও তার কর্তৃত্বশীল উপস্থিতিকে নিশ্চিত করে। একটা রাষ্ট্র যখন বিয়ে করার জন্য বয়সকে নির্দিষ্ট করে দেয়, তখন সে বিয়ের ক্ষেত্রে ধর্মীয় অনুমোদনকে অস্বীকার করে। বিয়ের ক্ষেত্রে শারীরিক সক্ষমতার ধর্মীয় মানদণ্ডকে (যেমন: ইসলামে বিয়ের জন্য নির্দিষ্ট বয়স নয় বরং নারী পুরুষের শারীরিক সম্পর্ক করার সক্ষমতাকে মানদণ্ড ধরে) অস্বীকার করে। একইসাথে পরিবেশের ভিন্নতার কারণে মানুষের শারীরিক সম্পর্ক করার সক্ষমতা অর্জনে বয়সের তারতম্যের মত প্রাকৃতিক বিষয়কেও অস্বীকার করে (যেমন: অনেক মেয়ের ৯-১০ বছর বয়সে মাসিক হয় আবার অনেকের ১১-১৩ বছর বয়সে মাসিক হয়। এক্ষেত্রে রাসূল (সঃ) কর্তৃক হযরত আয়েশা (রাঃ) কে ৬ বছর বয়সে বিয়ে ও ৯ বছর বয়সে ঘরে তোলাটা একটা ভালো উদারহরণ)। যখন পরিবেশের ভিন্নতার কারণে শারীরিক সক্ষমতা অর্জনে বয়সের ভিন্নতা এবং শরীয়া বা ধর্ম কর্তৃক প্রাপ্ত বয়স্ক (মানসিক নয়, শারীরিক সম্পর্কে সক্ষমতা) হলে বিয়ের অনুমোদনকে বয়স নির্দিষ্টকরণের মাধ্যমে অস্বীকার করে, তখন মূলত রাষ্ট্র ব্যক্তিগত পর্যায়েও শরীয়ার এরূপ কর্তৃত্বকে অস্বীকার করে। এ ছাড়া শিক্ষা (ইসলামের সিলসিলায় শিক্ষা আর বস্তুবাদী পাশ্চাত্য দর্শনের আলোকে শিক্ষার তফাৎ অনেক) এবং বিয়ে দুটাকেই ইসলাম ফরয করেছে। ফলে বিয়ের জন্য পড়াশুনায় বিধিনিষেধ আরোপ বা পড়াশুনার জন্য বিয়ের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপ কোনোটাই ইসলাম সমর্থন করে না। ফলে শিক্ষিত সমাজ তৈরি করার জন্য এরূপ ১৮ বা ২১ বছরের আগে বিয়ে করার অনুমোদন না দেওয়াটা সেই ১৮ বা ২১ বছরের আগে বিয়ের করার মত ধর্মীয়/ব্যক্তি স্বাধীনতাকে অস্বীকার করে এবং এভাবে এরূপ বিধিনিষেধ আরোপ করাও বিয়ের মত ব্যক্তিগত বিষয়ও সেকুলারাইজেশনের একটা অংশে রূপান্তরিত হয়। এভাবে রাষ্ট্র নিজেই নিজের দেওয়া ধর্মীয় স্বাধীনতাকে অস্বীকার করে। আর রাষ্ট্র বিয়ের মত ধর্মীয় স্বাধীনতার পরিমণ্ডলকেও বয়স নির্ধারণ করার মাধ্যমে সেকুলারাইজেশন করে।
ইসলামী রাষ্ট্রকে সেকুলারাইজেশন বলি আর সেকুলার রাষ্ট্রকে ইসলামাইজেশন বলি মূলত রাষ্ট্র তার অধীন প্রতিটা সাবজেক্টের একেবারে ক্ষুদ্র বিষয়ের ক্ষেত্রেও নিজের কর্তৃত্বকে প্রতিষ্ঠিত করতে চায় । রাজনৈতিক দল রাষ্ট্রের অধীন অস্তিত্বশীল প্রতিটা উপাদানকে নিজের আদর্শ অনুযায়ী ঢেলে সাজাতে চায়, নিয়ন্ত্রণ করতে চায়; আর এভাবেই সে অন্য (রাজনৈতিক) চিন্তার সাথে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এই ‘জড়িয়ে পড়া’র ক্ষেত্রে মূল প্রশ্ন এটা নয় যে, ইসলাম ও সেকুলারিজম উভয়ই ধর্মীয় স্বাধীনতা দেয় কিনা, যার ফলে ইসলামের সাথে সেকুলারিজমের কোন সাংঘর্ষিক সম্পর্ক আছে কী নেই, সেটা নির্ণয় করা যায়। বরং প্রশ্ন এই যে, কে ধর্মীয় স্বাধীনতা দিচ্ছে— ইসলাম নাকি সেকুলারিজম? ফলে সেকুলারিজম ও ইসলাম উভয় ধর্মীয় স্বাধীনতা দেয় কি দেয় না—এই মানদণ্ডে সম্পর্কের সংঘর্ষ বা সম্প্রীতি নির্ণয় না করে বরং ‘কে’ ধর্মীয় স্বাধীনতা দেয় বা দেয় না, সে মানদণ্ডে নির্ণয় করা বেশি জরুরি।
একইসাথে ‘একটি সেকুলার রাষ্ট্র সব ধর্মের ‘সমান’ স্বাধীনতা দেয় আর ইসলামও দেয়, তাই ইসলামের সাথে সেকুলারিজমের দ্বন্দ্ব নেই’—এমন প্রশ্নে ‘সমান’ বলতে ধর্মের পুরো পরিধিকে নয় বরং অনুমোদিত পরিধির মধ্যে ‘সমান স্বাধীনতা’কে বোঝায়। এভাবে অন্য ধর্মের সাথে ইসলামের যে চিরায়ত ভিন্নতা, সেটাকে অস্বীকার করা হয়। ফলে ‘সমান’ বলতে এটা বোঝায় না যে, একটা নির্দিষ্ট ধর্মের ধর্মীয় বিধান পালনের অংশ হিসেবে যা কিছু আছে, সব কিছুই সে পালন করতে পারবে। বরং এটা বোঝায় যে, অন্য ধর্ম যেটুকু পালন করতে পারবে, ঐ নির্দিষ্ট ধর্মও সেটুকুই পালন করতে পারবে বা রাষ্ট্র যে সব নৈতিক ও আদর্শিক ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত, তার সাথে সাংঘর্ষিক বিষয়গুলো বাদ দিয়ে পালন করতে হবে। এখানে এসে সমান শব্দটির মৌলিক অর্থ পরিবর্তিত হয়ে যায়। ফলে এখানেও দেখা যায় যে, একটা সেকুলার রাষ্ট্র ‘সমান স্বাধীনতা’র নিজস্ব একটা অর্থ দাঁড় করায়, যা তাত্ত্বিকভাবে যা বোঝায় অথবা নিজেরা যে অর্থে ব্যবহার করে, প্রায়োগিকভাবে তা বোঝায় না বা নিজেরা সে অর্থে ব্যাবহার করে না।
এই দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক নির্ণয়ের ক্ষেত্রে আলোচনার বিষয়বস্তু মোটামুটি আইন, সংস্কৃতি, ধর্মীয় বিষয় ও আচার-অনুষ্ঠান পালনসহ কিছু নির্দিষ্ট বিষয়ের মধ্যে ফোকাস করা হয়। শরীয়ার সাথে সাংঘর্ষিক এমন সব উপাদান সমাজ বা রাষ্ট্রে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যে সূক্ষ্ম মাধ্যমগুলো রয়েছে, সেগুলো অনেকটাই আলোচনার বাহিরে থেকে যায় (যেমন রাষ্ট্রীয় পলিসি বা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান)। শরীয়ার সাথে সাংঘর্ষিক এসব রাষ্ট্রীয় নীতি, নির্দেশনা ও উদ্দেশ্যগুলো অধিকাংশই অপ্রকাশিত থেকে যায়। এখন ইসলাম বা শরীয়া প্রকৃতিগতভাবেই তার সাথে সাংঘর্ষিক বিষয় নিজের মৌলিক বৈশিষ্ট্যের সাথে সামঞ্জস্য রেখে সমন্বয় করতে চায় এবং এভাবে নিজের কর্তৃত্ব হাজির করে। অন্যদিকে সেকুলারিজমও ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রশ্নে সাংঘর্ষিক সব পক্ষকে সমান স্থান দিতে চায় (অন্তত অন্য ধর্ম বা সংস্কৃতির প্রভাবে অস্তিত্বহীন হতে দেয় না) এবং ‘সাংঘর্ষিক বিষয় নিজের মৌলিক বৈশিষ্ট্যের সাথে সামঞ্জস্য’ রেখে সমন্বয় করতে চাইলে (যেমন ইসলাম চায়) সেকুলারিজম সেটা (তার মৌলিকত্বের জায়গা থেকে) অনুমোদন করে না (যেমন: কোন সাংস্কৃতিক উৎসবকে ধর্মের মৌলিক বিধানের আলোকে রূপান্তরকরণ)। এই জায়গায় এসে ইসলামের সাথে সেকুলারিজমের দ্বন্দ্ব অনিবার্য হয়ে পড়ে। ফলে সেকুলারিজম (অনেক সময়) এসব দ্বান্দ্বিক বিষয় কৌশলে এড়িয়ে যায় এবং বিভিন্ন পরিভাষার মাধ্যমে সেটাকে আড়াল করে রাখে। এভাবে সমগ্র জীবন নিয়ে ইসলামের যে প্রস্তাবনা, সেটা এই দ্বন্দ্বের প্রশ্নে অনুপস্থিত থেকে যায়।
একইভাবে ‘শরীয়া বিরোধী কোন আইন তৈরি না করা বা শরিয়া অনুযায়ী আইন তৈরি করার প্রশ্নে ইসলাম ও সেকুলারিজমে কোন দ্বন্দ্ব নেই’— এমন প্রস্তাবনায় দ্বন্দ্ব হবে বিধায় ‘নির্দিষ্ট কোন আইন তৈরি না করা’ও যে দ্বন্দ্বের কারণ হতে পারে, সে বিষয়টি অনুপস্থিত থেকে যায় (যেমন: প্রয়োজন ছাড়া স্থায়ী জন্ম নিয়ন্ত্রণ যা সরকারের পলিসিগত বিষয়—যা না আইনের মাধ্যমে নিষিদ্ধ, না অনুমোদিত)। এখানে এসে দেখা যায়, শরীয়া বিরোধী কোন আইন তৈরি না করেও যে রাষ্ট্র শরীয়ার সাথে সাংঘর্ষিক কাজ করতে পারে সেটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ফলে একটা সেকুলার রাষ্ট্র ব্যবস্থা ‘শরীয়া বিরোধী কোন আইন তৈরি না করা বা শরীয়া অনুযায়ী আইন তৈরি করা’র মাধ্যমে নিজের উপর শরীয়তের কর্তৃত্ব মেনে নেওয়াকে বোঝায় না বরং নিজের পছন্দসই স্পেস দেওয়াকে বোঝায়। এভাবে সে ইসলামের সাথে প্রয়োগের জায়গায় অনবরত সংঘর্ষে থেকেও এমন আবহ তৈরি করে বা দাবি করে যেন আসলে কোন সংঘর্ষ নেই।
শরীয়ার সাথে আধুনিক সেকুলার রাষ্ট্র ব্যবস্থার দ্বন্দ্বের জায়গাটা আসলে কোথায় এটা বোঝার জন্য শরীয়া ও আধুনিক সেকুলার রাষ্ট্র ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য, উৎপত্তি ও কোন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে বর্তমান পর্যায় এসেছে, তার একটা নির্মোহ পর্যালোচনা জরুরি। এসব ক্ষেত্রে প্রশ্ন এমন হওয়া উচিত নয় যে, কে কার চেয়ে উত্তম বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত— কে আসলে কেমন এবং তাদের সম্পর্কের ভিত্তিটা কী। কী ভাল, কী মন্দ সেটা বোঝার আগে ‘কী’ জিনিসটা আসলে ‘কী’ সেটা বোঝা জরুরি।
হদিস
1) The Fall and Rise of the Islamic State, Noah Feldman, 2008, Princeton University Press.
2) Thinking about Secularism and Law in Egypt, Talal Asad.
3) State and religion, a multidimensional relationship: Some comparative law remarks, Aernout J. Nieuwenhuis, International Journal of Constitutional Law, Volume 10, Issue 1, 2012, Oxford University Press and New York University School of Law.
4) English Law, Brahmo Marriage, and the Problem of Religious Difference: Civil Marriage Laws in Britain and India, Nandini Chatterjee, 2010, University of Plymouth.
5) Custom, Islamic Law, and Statutory Legislation: Marriage Registration and Minimum Age at Marriage in the Egyptian Shari'a Courts, Ron Shaham, Hebrew University, Islamic Law and Society, Vol. 2, No. 3.
6) Freedom of religion, freedom of expression and the United Nations: recognizing values and rights in the “defamation of religions” discourse, Silvia Angeletti, 2012, Stato, Chiese e pluralismo confessionale.
7) The right to freedom of religion or belief and its intersection with other rights, Dr Alice Donald and Dr Erica Howard, Middlesex University.
11) Prohibited Identities: State Interference with Religious Freedom, HRW, 2007, Volume 19
12) Article 16 of Universal Declaration of Human Rights.
13) Article 23 of the International Covenant on Civil and Political Rights.
14) Section 2 of the Child Marriage Restraint Act, 1929.
15) Article 41 of the Constitution of the People’s Republic of Bangladesh.