মেন্যু
Menu

পুঁজিবাদ: ব্যক্তির র‍্যাশনাল আচরণ থেকে সমাজে আয় বৈষম্য; বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট | সাজ্জাদ হোসাইন খাঁন

২৬ ডিসেম্বর, ২০২৪

এডাম স্মিথের একটা উক্তি ‘মানুষের আচরণ যৌক্তিক বা র‍্যাশনাল’ এর মাধ্যমে নব্য উদারতাবাদ অর্থনীতি পুঁজিবাদের সকল কাজ-কর্মের বৈধতা দিয়েছে। অর্থাৎ মানুষ ব্যক্তিগত লাভের জন্য অর্থনৈতিক কার্যক্রম যেমন, উৎপাদন, বিনিময় ইত্যাদি কাজ করবে। ব্যক্তি যখন নিজের লাভের জন্য কাজ করবে তখন সামষ্টিকভাবে দেশের লাভ হবে। কিন্তু, কখনো কখনো ব্যক্তিগত লাভ দেশের সামষ্টিক লাভের বদলে ক্ষতিতে রূপ নেয়। আবার অনেক সময় ব্যক্তিগত লাভ সামাজিক অবক্ষয়ের কারণও হয়ে থাকে।  এটার একটা বিরাট ত্রুটি লক্ষ্য করা যায় বিভিন্ন সত্তা বা এন্টিটির অর্থনৈতিক আচরনের মধ্যে দিয়েই। পুঁজিবাদে সকল এক্টিভিটি সংগঠিত হয় সম্মতির (Consent) উপর ভিত্তি করে। এর একটা সহজ উদাহরণ হচ্ছে ফার্মাসিউটিক্যাল ও টোব্যাকো ইন্ডাস্ট্রি। ঔষধ কোম্পানিগুলো প্রচুর সতর্কতা চালাচ্ছে যে ধূমপান ফুসফুসের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর এবং ক্যান্সারের কারণ। অন্যদিকে পুঁজিবাদ টোব্যাকো কোম্পানি গুলোকে ব্যবসা লাইসেন্স দিয়ে রাখছে যা প্রথম বিষয়টির সম্পূর্ণ বিপরীত।

মানুষের প্রবৃত্তিকে কেউই র‍্যাশনাল আচরণ বলে বৈধতা দিতে পারে না। কারণ প্রবৃত্তি পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে থাকে। আপনার প্রবৃত্তি আপনাকে কোন একটা কাজ করার জন্য অনুপ্রাণিত করতে পারে যেটা অপর একজনের প্রবৃত্তির সাথে দ্বন্দ্বে  পারে। এটার সমাধান কী? বিখ্যাত ইতালিয়ান দার্শনিক থমাস  অ্যাকুইনাসের (১২২৪-১২৭৪) মতে, ন্যাচারাল স্টেটে কিছু আইন থাকে যেগুলো সকলে মেনে চলে। কেউ অন্যের জীবন, সম্পদ ও স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করেনা। যদি কারো প্রবৃত্তি অন্যের সাথে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয় তাহলে সেই ব্যক্তি তার প্রবৃত্তি সংযত করে। এতে করে দ্বন্দ্ব এড়ানো যায়। যদিও বাস্তব জগতে এটা ঘটেনা।

কিন্তু নব্য উদারতাবাদ অর্থনীতিতে এটার অনুপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। দৃশ্যত, যেহেতু দুজনের সম্মতিতেই তাদের মধ্যে লেনদেন সংঘটিত হয় তাই এখানে কারো কোনো ক্ষতি নেই। কিন্তু, অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় সেটা তিতৃীয় কারো ক্ষতি্র কারণ হতে পারে যেমন, সমাজের,প্রকৃতির অথবা আবহাওয়ার।

পশ্চিমা সভ্যতা বিশ্ব অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য নিয়ে আসলো পুঁজিবাদ এবং বিশ্ব রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য নিয়ে আসলো গণতন্ত্র। আধুনিক গণতন্ত্র ও নব্য উদারনৈতিক পুঁজিবাদের মূল ভিত্তিই হল “সম্মতি (Consent)”।

বর্তমান আধুনিক সমাজে কেউ যদি পতিতাবৃত্তি করতে চায় পুঁজিবাদ ও গনতান্ত্রিক সমাজ তাকে বৈধতা দেয়। কিন্ত এটার সামাজিক মূল্য খুবই জঘন্য। আবার বিভিন্ন খেলাধুলার সিজনে লক্ষ্য করা যায় ক্যাসিনোর প্রচুর বিজ্ঞাপন প্রচার করা হয়। অবশ্য যাদের সম্মতি আছে তারাই ক্যাসিনোতে যায় কিন্তু এর সামাজিক অবক্ষয় অনেক। যদিও এ চিন্তা দ্বারা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সংঘটিত হচ্ছে না। তবুও বিলিয়ন ডলারের ইন্ডাস্ট্রি দাড়িয়ে আছে পতিতাবৃত্তি, ক্যাসিনো, বার, ক্লাবের উপর ভর করে।

পুঁজিবাদের তত্ত্বগুলোর ধারনায় বলা আছে উৎপাদনের সকল পর্যায়ে পুঁজি হচ্ছে অপরিহার্য উপাদান। এই ধারনাকে প্রশ্ন করেছিলেন আরেক বিখ্যাত সমাজতান্ত্রিক দার্শনিক কার্ল মার্ক্স। মার্ক্স এটাকে একটা কনফিউশান ও ডিস্টোর্টশন বলে মতামত দিয়েছেন। পুঁজিবাদ এখানে কোনো ত্রুটি খুঁজে পাচ্ছে না। যদিও সামাজিক অবক্ষয়ের মূলে এসব ব্যবসায়ের হাতটাই বেশি।

Hernando De Soto তার মিস্টেরি অব ক্যাপিটাল (The mystery of capital: why capitalism triumphs in the West and fails everywhere else) বইতে লিখেছেন—

Adverse reactions to capitalism have also been growing stronger within rich countries themselves.

উন্নত বিশ্বের দেশগুলো এখন পুঁজিবাদের প্রতি নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দিচ্ছে। তারা উপলব্ধি করতে পারছে যে পুঁজিবাদ কীভাবে তাদের পরিবার ও সমাজকে ভেঙে দিচ্ছে। সারাদিন মানুষ শুধু ভোগ বিলাসিতায় লিপ্ত থাকায় তাদের পক্ষে সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখা নিতান্তই সহজ হওয়ার কথা নয়।

বর্তমানে বিজ্ঞাপন এবং প্রমোশনের মাধ্যমে মার্কেটিং অনেক জনপ্রিয়- যা ব্যাপক প্রচার ও প্রসারের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে নতুন নতুন পণ্য ও সেবার চাহিদা সৃষ্টি করছে। জঁ বি সে (Jean Baptiste Say)-র তত্ত্ব বলে “কোন পন্যের সরবরাহই সেই পন্যের চাহিদার সৃষ্টি করবে” (Supply creates its own demand) । এটাকে সে’র আইন (Say’s Law) বলা হয়। নতুন নতুন চাহিদা সৃষ্টি করে কোম্পানগুলো প্রচুর বিক্রি ও লাভ করে যাচ্ছে।  

অন্যদিকে পুঁজিবাদি সমাজে তর তর করে বেড়ে উঠছে আয় বৈষম্য। সম্পদ আটকে আছে গুটি কয়েক মানুষের হাতে। তারা দিনে দিনে হচ্ছে সম্পদশালী। যার ফলে সমাজে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের আওয়াজ তুলে ধরার লোক সমাজে দেখা যাচ্ছে না। আয় বৈষম্য নিয়ে রয়েছে আবার নানান তত্ত্ব। কেউ কেউ বলেন আয়, সম্পদের বৈষম্য সমাজের উন্নতির সহায়ক আবার কেউ বলে নেতিবাচক।

 

বৈষম্যের আলাপ

নিকোলাস কেলডর এর মতে আয় বৈষম্য সমাজের প্রবৃদ্ধির জন্য  সহায়ক (Inequality is beneficial for economic growth)।  অন্যদিকে অ্যালেসিনা ও প্যারটির মত হল, আয় বৈষম্য সমাজে অনিশ্চয়তা, হুমকি, সহিংসতার জন্ম দেয় যা সমাজের গ্রোথকে ব্যাহত করে (High income inequality can lead to policy uncertainty, threats to property rights, and an increased probability of violence)। অন্যদিকে Keefer and Knack বলেন, আয় বৈষম্য সরকারের রাজস্ব নীতির ক্ষেত্রে অস্থিতিশিলতার সৃষ্টি করে যা সামাজিক প্রবৃদ্ধিকে ধীরগতি সম্পন্ন করে দেয় (Income inequality can lead to instability in government policies, which can slow growth)।

অবাধ ব্যবসা, বিজ্ঞাপন এবং প্রমোশন মানুষের মধ্যে নতুন নতুন চাহিদার সৃষ্টি করে। সেই চাহিদা পূরণ করার জন্য মানুষ মরিয়া হয়ে পড়ে। সম্প্রতি বাংলাদেশের সাবেক ভূমিমন্ত্রীকে নিয়ে আল-জাজিরার একটি প্রতিবেদনে (The Minister’s Million) দেখানো হয়েছে যে তার ইংল্যান্ডেই ৩৬০ টি বাড়ি আছে। এত চাহিদা নিশ্চয়ই যৌক্তিক বা র‍্যাশনাল ব্যাপার হতে পারেনা। পুঁজিবাদ ব্যক্তিগত চাহিদার লাগাম ছেড়ে দিয়ে মানুষকে প্রবৃত্তির পূজারী হিসেবে গড়ে তুলেছে। আমরা যদি টেক (Tech) কোম্পানিগুলোর দিকে লক্ষ্য করি তাহলে দেখা যাবে কোম্পানিগুলো কয়েক মাস পর পর ডিভাইসের অল্প কিছু ফিচার হালনাগাদ করে বাজারে নতুন সরবরাহ নিয়ে আস। যা আবার নতুন নতুন চাহিদার সৃষ্টি করে।

এভাবে পুঁজিবাদ সমাজে অপ্রয়োজনীয় চাহিদা সৃষ্টি করে। সমাজতান্ত্রিক ও কমিউনিস্ট অর্থনীতিবিদরা পুঁজিবাদের এই উৎপাদন প্রণালীর সমালোচনা করে বলেন যে পুঁজিবাদে যেহেতু উৎপাদনের উপকরণ ব্যক্তিগত মালিকানাধীন থাকে তাই তারা ব্যক্তিগত মুনাফা বৃদ্ধির দিকে নজর দেয়। এতে সমাজের সামষ্টিক কী উপকার হল তা উপেক্ষা করে। ফলস্বরূপ, সমাজে প্রচুর অসম বন্টন (Unequal Distribution) লক্ষ্য করা যায়।

স্ট্রকচারালিস্ট অর্থনীতিবিদরা বলেন পুজিবাদ সাম্রাজ্যবাদের নয়া রূপ। সাম্রাজ্যবাদীরা কম দামে  তাদের কলোনি থেকে কাঁচামাল ক্রয় করে পণ্য উৎপাদন করে বেশি দামে আবার সেই কলোনিতে বিক্রয় করে। কলোনিগুলোতে সাম্রাজ্যবাদীরা তাদের পণ্যের নতুন নতুন বাজার সৃষ্টি করে। এ চিত্রটি বর্তমানেও লক্ষ্য করা যায়। যেখানে দেশের প্রায় সকল শিল্প প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রে (শহুরে) গড়ে ওঠে এবং প্রান্তিক কৃষকদের থেকে কাঁচামাল ক্রয় করে পণ্য উৎপাদন করা হয়, যারা কাঁচামাল উৎপাদন করে তারা (প্রান্তীক জনপদের অধিবাসীরা) উপেক্ষিত থেকে যায়। এতে শহরাঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নত হয় কিন্তু অসম বন্টন বৃদ্ধি পায়।

অর্থনীতিবিদ সাইমন কুজনেট এর মতে অর্থনৈতিক উন্নয়নের ফলে প্রাথমিক দিকে আয় বৈষম্য বাড়ে এবং পরবর্তীতে কমে (কুজনেট কার্ভ)। শিল্পোন্নয়নের ফলে প্রান্তীয় (গ্রামের) জনগন শিল্পে শ্রম দেয়ার জন্য শহরে স্থানান্তরিত হয় বেশি মজুরির আশায়। যা আমরা বাংলাদেশে দেখতে পাই অনেক মানুষ গ্রাম থেকে শহরে যাচ্ছে গার্মেন্টসে চাকরি করার জন্য। যেহেতু শ্রমিকদের আয় বাড়তে থাকে ফলে তারা শিক্ষা ও অন্যান্য সুবিধা গ্রহনের সুযোগ পায় যা অসমতা কমিয়ে আনতে কিছুটা সাহায্য করে। কিন্তু কুজনেটসের অনুমান অনুসারে, যখন গড় আয়ের একটি নির্দিষ্ট স্তরে পৌঁছানো হয় এবং গণতন্ত্রীকরণ এবং একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের বিকাশের মতো শিল্পায়নের সাথে যুক্ত প্রক্রিয়াগুলি ধরা পড়ে তখন অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাস পাওয়ার আশা করা যায়। অর্থনৈতিক উন্নয়নের এই মুহুর্তে সমাজকে বোঝানো হয় ট্রিকল-ডাউন প্রভাব এবং মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি যা কার্যকরভাবে অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাস করে।

নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিগলিজ তার দ্যা প্রাইস অব ইনইক্যুয়ালিটি (The Price of Inequality) বইতে বলেন অসমতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সৃষ্টি হয় না। সরকারের বিভিন্ন পলিসি ও সমাজের সম্পদশালী ব্যক্তিদের কেন্দ্র করে অর্থনীতির নীতি প্রণয়নের কারণেই বরং অসমতার সৃষ্টি হয়। যদিও স্টিগলিজ পুঁজিবাদকে অসমতার জন্য দায়ী করেননি বরং পলিসিকেই দায়ী করেছেন তথাপি সেই পলিসিগুলো কিন্তু বুর্জোয়া পুঁজিবাদের কারনেই গৃহিত হয়। যেমন আমরা বেশ কিছু রাজস্ব ব্যবস্থায় দেখতে পাই ধনীদের জন্য অনেক ট্যাক্স সুবিধা দেওয়া হয় যা আরো বৈষম্যের জন্ম দেয়। আবার নব্য উদারতাবাদ শৈথিল্য নীতির মাধ্যমে ব্যক্তিমালিকানায় কিংবা ব্যক্তি নিয়ন্ত্রিত অনেক সুবিধা পেয়ে থাকে। ফলশ্রুতিতে অনেকে বাজার থেকে আয় উপার্জন করে, কিন্তু তা সমাজের জন্য কোনো মুল্য বৃদ্ধি করে না। যেমন অনিয়ন্ত্রিত মনোপলি বা সিন্ডিকেট, ট্যাক্স সুবিধা, পলিসি লবিং ইত্যাদি। স্টিগলিজের মতে অসমতা অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে অন্তরায় হয়ে দাড়ায়। ফলে সমাজের উন্নতি অতটুকুই হয় যতটুকু ধনীদের উন্নতি হয়।

 

বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফি ও আর্থিক অনিয়ম

বাংলাদেশের মতো পলিসি দুর্দশাগ্রস্ত দেশে অনেক বেশিই আয় বৈষম্য লক্ষ্য করা যায়। একেতো সরকারি বিভিন্ন পলিসি নিজেদের গোষ্ঠীপ্রতিমদের জন্য নির্ধারণ করা হয় তার উপর সুযোগ-সুবিধার বিভিন্ন পারিতোষিক দেশের অর্থনীতিকে গুটিকয়েক মানুষের হাতে তোলে দেয়। অর্থনীতির জনক এডাম স্মিথের বলেন—

‘No society can surely be flourishing and happy, of which the far greater part of the members is poor and miserable.’ 

কিন্তু বাংলাদেশের বিশাল একটা জনগোষ্ঠী এখনো দরিদ্রসীমার নিচে বাস করে। গ্লোবাল ফাইন্যান্স ম্যাগাজিনের মে ৬, ২০২৪ এর রিপোর্ট অনুযায়ী বিশ্বের দরিদ্র দেশের মধ্যে বাংলাদেশর অবস্থান ৬১ তম। এই হিসাব করা হয়েছে মাথাপিছু আয়ের ভিত্তিতে। বিগত টানা তিন বছর বাংলাদেশের অতি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর হার বেড়েই চলেছে। এবং প্রাক্কলিত হিসাব অনুযায়ী ২৪-২৫ অর্থ বছরে ৭ শতাংশে গিয়ে দাঁড়াবে। এবং বর্তমানে বাংলাদেশের নিম্ন-মধ্য আয়ের মানুষের হার ২৯ শতাংশ।  এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের ২০২২ হিসাব মতে বাংলাদেশের ১৮.৭ শতাংশ মানুষ দরিদ্রসীমার  নিচে বাস করে। এবং গ্রামে বসবাস করা মানুষের মধ্যে ৩৫ শতাংশ মানুষ দরিদ্র সীমার নিচে বাস করে। জনশুমারি ২০২২ অনুযায়ী বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ২১.৪ ভাগ মানুষ শহরাঞ্চলে বাস করে এবং ৭৮.৬ ভাগ মানুষ গ্রামাঞ্চলে। আয় উপার্জন করে এমন  মানুষের ৫.৮ শতাংশের দৈনিক ক্রয়ক্ষমতা ২.১৫ ডলারের নিচে। সরকারি তথ্যের ভিত্তিতে বিশ্ব ব্যাংকর দেওয়া রিপোর্ট অনুযায়ী বাংলাদেশের দরিদ্রতার হার ২০১৬ সালের ২৪.৩ শতাংশ থেকে কমে ২০২২ সালে ১৮.৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে অতি দরিদ্রের হার ১২.৯ শতাংশ থেকে কমে হয়েছে ৫.৬ শতাংশ। কিন্তু বাজারের চিত্র এই তথ্যের বাস্তব চিত্র দেখাতে ব্যর্থ। মানুষের ক্রয় ক্ষমতা নিন্মগামী  দ্রব্যমূল্যের ক্রমাগত ঊর্ধ্বগাতির কারণে। অন্তত প্রতিদিনের পত্রিকার চিত্র একথাই বলে। ৫ই আগস্ট পরবর্তী বিভিন্ন সংস্কার কমিশনের দেওয়া রিপোর্টগুলো বলে বিগত বছরের অর্থনৈতিক বিভিন্ন তথ্য ও চলকগুলো ছিল অতিরঞ্জিত। উন্নয়নের নাম করে যে সকল প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল তা ছিল সরকারের অর্থ সরানোর মাধ্যম। ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে গঠিত কমিশনের শ্বেতপত্রের হিসাব অনুযায়ী  বিগত সরকারের শাসনামলে প্রতি বছর ১৬ বিলিয়ন ডলার করে দেশ থেকে অর্থ প্রাচার হয়েছে। ব্যাংক লুটপাটের পরিমান ৬ লাখ ৭৫ হাজার কোটি টাকা।

বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে বিভিন্ন আর্থিক অনিয়ম, দুর্নীতি, লুটপাট এবং সরকারি বিভিন্ন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের অনিয়ম।  ব্যাংকিং সেক্টর, পুঁজিবাজার এবং অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো পতিত সরকার ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে দাঁড় করে দিয়ে গেছে। গত ১৫ বছরে বাংলাদেশ থেকে ২৮ টি বিভিন্ন উপায়ে দুর্নীতির মাধ্যমে ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অবৈধভাবে পাচার হয়েছে- শ্বেতপত্রের হিসাব অনুযায়ী।
বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি)-এর মাধ্যমে উন্নয়ন প্রকল্পে বিনিয়োগ করা ৬০ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে প্রায় ১৪ থেকে ২৪ বিলিয়ন ডলার (১.৬১ থেকে ২.৮০ লাখ কোটি টাকা) রাজনৈতিক চাঁদাবাজি, ঘুস, এবং বাজেট বাড়ানোর মতো বিভিন্ন দুর্নীতির কারণে নষ্ট হয়েছে। এতে বলা হয় রাজনৈতিক প্রভাব ব্যাংকিং খাতের সংকটকে গভীর করেছে। বিগত ১৫ বছরে দেশের ব্যাংক খাতে যে মন্দ ঋণ তৈরি হয়েছে, তা দিয়ে ১৪টি মেট্রোরেল বা ২৪টি পদ্মা সেতু করা যেত।

 

বাংলাদেশের আয় বৈষম্যের চিত্র

অর্থনীতিতে একটি দেশের আয়ের বৈষম্য পরিমাপের পদ্ধতি হিসেবে গিনি সহগ (Gini Coefficient) বা গিনি সূচক (Gini Index)। এই সহগ মান ০ থেকে ১- এর মধ্যে হবে। যেই দেশের গিনি সহগের মান যত বেশি সেই দেশে তত বেশি আয় বৈষম্য বিরাজ করে। বাংলাদেশে ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) প্রথম বারের মতো আয়-ব্যয় জরিপ করে।  সেখানে গিনি সহগের মান ছিল ০.৩৬ এবং দেশের মোট আয়ের ২৮.৪ শতাংশ আয় ১০ শতাংশ ধনী মানুষ আয় করত। তারপর থেকেই জিডিপি প্রবৃদ্ধির সাথে সাথে বেড়ে চলছে বাংলাদেশের আয় বৈষম্য। ২০১৬ সালের জরিপ অনুযায়ী গিনি সহগ বেড়ে দাঁড়ায় ০.৪৮৩ শতাংশ এবং ১০ শতাংশ ধনীদের হাতে চলে যায় দেশের মোট আয়ের ৩৮ শতাংশ। সর্বশেষ বিবিএস - এর হাউজ হোল্ড আয়-ব্যয় জরিপ ২০২২ (HIES 2022) এর এপ্রিল ১২, ২০২৩ রিপোর্ট অনুযায়ী গিনি সহগ বেড়ে দাঁড়ায় ০.৪৯৯ এবং ধনী ১০ শতাংশ মানুষের হাতে মোট আয়ের ৪০.৯২ শতাংশ চলে যায়। হাউজ হোল্ড নমিনাল মাসিক গড় আয় বেড়ে ৩২,৪২২ টাকায় দাঁড়ায় যা ২০১৬ সালে ছিল ১৫,৯৮৮ টাকা। অন্যদিকে নমিনাল খরচ দাঁড়ায়  ৩১,৫০০ টাকায় যা ২০১৬ সালে ছিল ১৫,৭১৫ টাকা। মানুষের ভোগের ধরণে-ও অনেক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। খাদ্য দ্রব্য ভোগের হার ছিল ৪৫.৮ শতাংশ যা ২০১৬ সালে ছিল ৪৭.৭ শতাংশ। নিচের আয় গিনি সহগ ও ভোগ্য গিনি সহগের দিকে তাকালে বৈষম্যের ঊর্ধ্‌বগতির চিত্র দেখা যাবে। 


অন্যদিকে দারিদ্রতা পরিমাপক হেডকাউন্ট ইনডেক্স  ২০২২ অনুযায়ী উচ্চ দারিদ্র্যের হার (upper poverty line) জাতীয় পর্যায়ে ১৮.৭ শতাংশ, গ্রামাঞ্চলে ২০.৫ শতাংশ এবং শহরাঞ্চলে ১৪.৭ শতাংশ। যদি নিম্ন দারিদ্র্যের হার (lower poverty line) ব্যবহার করা হয় তাহলে দারিদ্র্যের হার জাতীয় পর্যায়ে ৫.৬ শতাংশ, গ্রামাঞ্চলে ৬.৫ শতাংশ এবং শহরাঞ্চলে ৩.৮ শতাংশ।

সিপিডির এক প্রেস ব্রিফিংয়ে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন বাংলাদেশে গত দেড় দশকে আয় বৈষম্য থেকে সম্পদ বৈষম্য বেড়েছে প্রায় দিগুণ। নির্দিষ্ট একটা গোষ্ঠীর সম্পদ শুধু বেড়েই চলেছে।যদি সম্পদ কর বাধ্যতামূলক করা তাহলে বছরে ৬ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় সম্ভব বলে মনে করে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।

বাংলাদেশে সম্পদের বণ্টন সমভাবে হচ্ছে না। অল্পকিছু মানুষের হাতে সম্পদ পুঞ্জীভূত হয়ে আছে। যদি সামগ্রিক ভাবে দেশের সম্পদ বা আয় বৃদ্ধি পায় তাহলে দেখা যায় ধনীদের সম্পদ কিংবা আয়ও বৃদ্ধি পায়।  দরিদ্র্যদের আয় বা সম্পদের তেমন বৃদ্ধি ঘটেনা। বর্তমানে বাংলাদেশের বিভিন্ন উৎপাদন ও বন্টন প্রক্রিয়ায় যেই সিন্ডিকেট ব্যবস্থা বিদ্যমান তার দ্বারা বৈষম্য দূরীকরণ সম্ভব নয় বরং বৈষম্য বেড়েই চলেছে। 

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের মার্কেট ক্যাপিটালাইজেশনের পরিমান ৩০.৩৯৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, তাও আবার কয়েকজন ব্যক্তির হাতে জিম্মি। বেক্সিমকো,  এস আলম কিংবা সামিটের মতো কোম্পানিগুলো বাংলাদেশের অর্থনীতির সকল প্রতিষ্ঠানগুলোকে অস্থিমজ্জায় পঙ্গু করে দিয়েছে যেখান থেকে কাম ব্যাক করার জন্য কিছুটা সময় ও সংস্কারের প্রয়োজন।

বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকাকে সামনে নিয়ে যাওয়ার নেপথ্যের দুটি শক্তি হচ্ছে রেমিট্যান্স ও রপ্তানি। রপ্তানির বড়ো অংশ আসে গার্মেন্টস থেকে যা আবার শ্রম নির্ভর শিল্প। বাংলাদেশে যথেষ্ট প্রাকৃতিক সম্পদ ও  শ্রম শক্তি আছে। যাদের সঠিক প্রশিক্ষণ ও দেশপ্রেমিক সম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে পারলেই বাংলাদেশের অর্থনীতি উন্নতির শিখরে নিয়ে যাওয়া সম্ভব ও সমাজের আয় বৈষম্য দূরীভূত হবে।

 

বরাত

  1. Wealth of Nations by Adam Smith

  2. The Price of Inequality by J E Stiglitz

  3. The Economics of Inequality by Thomas Piketty

  4. The Mystery of Capital by Hernando De Soto

  5. Development Finance by Stephen Spratt

  6. Household Income and Expenditure Survey (HIES) 2022 by Bangladesh Bureau of Statistics (BBS)