মেন্যু
Menu

কর্ম্মবীর মুনশী মেহেরুল্লা | শেখ ফজলল করিম

১২ ডিসেম্বর, ২০২৪

চব্বিশ বৎসর পূর্ব্বে মুনশী মোহাম্মদ মেহেরুল্লা সাহেবের মৃত্যুর পর 'সোলতানে' আমার একটি কবিতা বাহির হইয়াছিল। তাহার একস্থানে লিখিয়াছিলাম,

'অদৃষ্টের উপহাসে কোহিনূর মণি
খোয়াইনু মোর! কিন্তু আশা আছে প্রাণে
আসিবে সেদিন, যেদিন তোমার স্মৃতি
লক্ষ কোহিনূর হ’তে শ্রেষ্ঠ ভাবি’ মনে
রক্ষিবে মোস্লেমকুল বক্ষের মাঝারে।'

এতদিন পরে আমার সেই আশা ফলবতী হইতে চলিয়াছে, 'কৰ্ম্মবীর মুনশী মেহেরুল্লা' বাহির হইতেছে; ইহা কি আমার পক্ষে সামান্য আনন্দের কথা!

অনুর্ব্বর মরুপ্রান্তরে সহসা ফলজলশোভিত একটি সুরম্য উদ্যান চোখে পড়িলে পথিকের তৃষিত চিত্ত যেমন আপনা আপনি সেইদিকে আকৃষ্ট হয়, অধঃপতিত বাঙালী মুসলিম সমাজে মুনশী মেহেরুল্লার অভ্যুদয়ও অনেকটা সেই প্রকারের। তাঁহার পূর্ব্বে আর কোন বাঙালী মুসলমান বাগ্মীকে দেখিয়াছি বলিয়া মনে পড়ে না, শুনিয়াছি বলিয়াও স্মরণ করিতে পারিতেছি না। হাঁ, একজন উচ্চশিক্ষিত হিন্দুস্থানী বাগ্মীকে দেখার সৌভাগ্য হইয়াছিল, তিনি মৌলভী হাসান আলী মরহুম।

আমরা তখন খুব ছোট, শিশু বলিলেও অত্যুক্তি হয় না। কাকিনার স্বর্গীয় রাজা মহিমারঞ্জন রায় চৌধুরী মহোদয়ের আমন্ত্রণে তিনি এখানে আসিয়াছিলেন। কিন্তু তাঁহার বক্তৃতা শুনিলেও কিছু বুঝিতে পারি নাই; বুঝিবার যোগ্যতাও তখন আমাদের হয় নাই।

বাঙলাদেশে মুসলমানদের তখন সবে দু’খানা সংবাদপত্র বাহির হইয়াছে। একখানা ইংরাজী “Mohammedan Observer”, অপরখানা বাংলা “সুধাকর”। মনে পড়ে আমি যখন মদনমোহনের দ্বিতীয় ভাগ শেষ করিয়াছি, তখন বাবা আমাকে “সুধাকরের” গ্রাহক করিয়া দিয়াছিলেন। বুঝি-কি-না-বুঝি ক্রমশঃ বুঝিতে পারিব এবং জাতীয় কার্য্যের কথঞ্চিৎ সহায়তা করা হইবে ইহা ভাবিয়াই বোধ করি বাবা আমার জ্যেষ্ঠভ্রাতাকে ইংরাজি “অবজারভার” এবং আমাকে “সুধাকর” লইয়া দিয়াছিলেন।

বাঙলার মুসলমান সমাজ তখনও বহুকালের জড়তায় অঘোরে ঘুমাইতেছিল। স্কুল কলেজে মুসলমানের ছেলের নাম বড় একটা শুনিতে পাওয়া যাইত না। আরবী এবং উর্দু ফার্সির চর্চ্চা স্থানে স্থানে কিছু ছিল বটে; কিন্তু ইংরাজি বাংলা যাহা অর্থকরী বিদ্যা, তাহার ধারেও কেহ যাইতে চাহিত না। আমি একটী বৃদ্ধের কথা জানি। সে লেখাপড়া বিশেষ কিছু জানিত না। ছেলেকে স্কুলে দিবার কথা উঠিলেই সে বলিত, “সর্বনাশ, তা’ও কি কখনো হয়? উহার নাম ইস+কুল, ওখানে গেলে জাতিকুল সব যাইবে।” যদিও আধুনিক ধর্মহীন শিক্ষা অনেক স্থলে এই বৃদ্ধের আশঙ্কাকে সত্যে পরিণত করিয়াছে, তথাপি “জাতিনাশা ভাষা” শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা কত বেশী, এখন অনেকেই তাহা বুঝিতে পারিয়াছেন। ফলে স্বধর্মনিষ্ঠ এবং ধর্মসম্বন্ধে উদাসীন দুই শ্রেণীর লোকই আমরা সমাজে দেখিতে পাই।

আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞান-বিরাগী মুসলিম সন্তানেরা যখন ঐ প্রকার যৎসামান্য আরবী-ফার্সি-উদ্দুর গণ্ডীতে আবদ্ধ থাকিয়া আত্মপ্রসাদ লাভ করিতেছিল, বিরাট দুনিয়ার বিরাট কর্মক্ষেত্রের সহিত তাহাদের পরিচয় হয় নাই বলিলেই হয়, মুনশী মেহেরুল্লা সেই যুগে জন্মগ্রহণ করেন। সারা বাঙলার মুসলমান তখন অধঃপতিত, দুৰ্দ্দশাগ্রস্ত। সমাজে তাহাদের একতা নাই, উচ্চশিক্ষার অনুরাগ নাই, ব্যবসায়ে তাহারা অনেকের পশ্চাতে। জমিদার এবং মহাজনে তাহাদের সম্বৎসরের পরিশ্রমের ফল লুটিয়া লইতেছে; অর্থে, সম্মানে সকল দিকেই তাহারা হৃতসর্ব্বস্ব। ‘মুসলমান’ বলিয়া পরিচয় দিলে লোকে তাহাকে অনেক ক্ষেত্রে অসভ্য, নোংরা জীব ছাড়া আর কিছু মনে করিত না। তাহাদের সংস্পর্শ দোষের এবং তাহাদের সহিত একাসনে উপবেশন করাও তখনকার দিনে অপমানজনক ছিল। অপরদিকে ভিন্ন দেশীয় পাদ্রী সাহেবেরা খৃষ্টধর্ম প্রচারের জন্য দেশময় আপ্রাণ সাধনা করিতেছিলেন। বাঙলার অশিক্ষিত বা স্বল্পশিক্ষিত মুসলমান যখন তাঁহাদের বাক্য-বন্যায় ভাসিয়া “শ্যাম রাখি কি কুল রাখি” অবস্থায় উপনীত, ঠিক সেই সময় ইসলামের জ্বলন্ত বর্তিকা হস্তে অপূর্ব্ব মনীষা, অদ্ভুত বাগ্মিতার অধিকারী মুনশী মেহেরুল্লা আল্লার মেহেরের মতই আসিয়া উপস্থিত হইলেন। তাঁহার অলোকসামান্য প্রতিভা-রশ্মিতে সন্দেহের কুজ্বটিকাজাল সূর্যোদয়ে নীহার-কণার মত মুহূর্তে বিলীন হইল। পাদ্রী সাহেবেরা স্তম্ভিত হইলেন, বাঙলার অসংখ্য মুসলমান পথহারা হইতে হইতে সহসা সত্যপথের সন্ধান পাইয়া বাঁচিল, মুসলমান সমাজে নব জীবনের স্পন্দন জাগিল। দুই একজন কিশোর কবি জাতীয় সঙ্গীতে সুর সাধনা আরম্ভ করিলেন।

বাঙলাদেশের অনেক স্থানে যখন মুনশী মেহেরুল্লার খ্যাতি ছড়াইয়া পড়িয়াছিল, সেই সময় একদিন শুনিতে পাইলাম যে, আমাদের বাড়ী হইতে তিন ক্রোশ দূরে মহিষখচা নামক গ্রামে মুনশী সাহেব শুভাগমন করিতেছেন। তাঁহার বক্তৃতা শুনিবার ভাগ্য পূর্ব্বে আমার আর কখনও হয় নাই; সুতরাং অপরিসীম আগ্রহ লইয়া নির্দ্দিষ্ট দিনে আমি এবং আমার জ্যেষ্ঠভ্রাতা মুনশী ফজলর রহমান সাহেব, ২-১ জন বন্ধুবান্ধব সমভিব্যাহারে সভায় উপস্থিত হইলাম। লোকে লোকারণ্য। মহিপুরের স্বজাতিবৎসল জমিদার পরলোকগত খান বাহাদুর আবদুল মজিদ চৌধুরী সাহেব সভাপতির আসন অলঙ্কৃত করিলেন। মুনশী সাহেবের বক্তৃতায় শ্রোতৃমণ্ডলী মুগ্ধ, চমৎকৃত হইল। আমিও সামান্য কিছু বলিলাম। এই সূত্রে সভার পরে মুনশী সাহেবের সহিত আমার প্রথম আলাপ পরিচয় হইল। কথায় কথায় “পরিত্রাণ কাব্যের” কথা উঠিল। মুনশী সাহেব খুশী হইয়া বলিলেন, “আপনি পাণ্ডুলিপিখানি আমাকে পাঠাইয়া দিবেন, আমি নিজ ব্যয়ে উহা ছাপাইব।” তখনও আমার বই-এর শেষের কয়েকটি সর্গ লেখা হয় নাই। যতখানি লেখা ছিল তাহাই তাঁহাকে পাঠাইয়া দিলাম। কয়েকদিন পরে কড়েয়ার “রিয়াজুল ইসলাম” প্রেস হইতে প্রুফ পাইলাম এবং অল্প সময়ের মধ্যে পুস্তকের ছাপা শেষ হইল। হিন্দুসমাজে এবং তৎকালীন শ্রেষ্ঠ হিন্দুসংবাদপত্র সমূহে ইহা বহু প্রশংসা লাভ করিয়াছিল। একথা বলিলে বোধ হয় অন্যায় হইবে না যে, মুসলমানদের মধ্যে “পরিত্রাণ কাব্য” পড়িবার মত লোক তখন খুব কমই ছিল; যাঁহারা ছিলেন, তাঁহাদের কাছেও উপেক্ষা ছাড়া আর কিছু বিশেষ লাভ হয় নাই। দু’একজন ব্যঙ্গও করিয়াছিলেন। অবস্থা দেখিয়া মহাপ্রাণ মুনশী সাহেব নব প্রকাশিত সাপ্তাহিক “সোলতানের” গ্রাহকদিগকে নামমাত্র মূল্যে পুস্তকখানি উপহার দিবার ব্যবস্থা করিলেন। ইহাতে আর কিছু না হউক, অন্ততঃ বাঙলা দেশের অনেক স্থানে আমি কিঞ্চিৎ পরিচিত হইলাম এবং সাহিত্য-সেবায় আমার আগ্রহ বৃদ্ধি পাইল। সিরাজী সাহেবের “অনল প্রবাহ”, “পরিত্রাণ কাব্য” প্রকাশের অব্যবহিত পূর্ব্বেই বাহির হইয়াছিল। তখন উহা একখানি ছোট বই ছিল। মুনশী সাহেব উহা নিজ ব্যয়ে ছাপাইয়া দিয়াছিলেন বলিয়া শুনিয়াছি।

মুনশী সাহেবের সহিত আমার দ্বিতীয় বার দেখা হয় গঙ্গাচড়ার সভায়। খান বাহাদুর আব্দুল মজিদ চৌধুরী সাহেব তাঁহার বাটী হইতে কিঞ্চিৎ দূরে গঙ্গাচড়ার মাঠে একটি মেলার প্রতিষ্ঠা করেন। প্রথম বৎসর মেলায় একদিকে যেমন আমোদ প্রমোদের ব্যবস্থা ছিল, অন্যদিকে তেমনি জ্ঞান বিস্তারের জন্য মুন্সী সাহেবের বক্তৃতা-সভারও আয়োজন করা হইয়াছিল। তিস্তা নদীর দক্ষিণ পারে আমাদের বাড়ী হইতে চারি ক্রোশ দূরে মেলাস্থলে এই সভা বসিয়াছিল। আমরা প্রাণের টানে সেখানে ছুটিয়া গিয়াছিলাম এবং মনে পড়ে, জনাব খান বাহাদুর সাহেবের অনুরোধে সে রাত্রে মুনশী সাহেবের সহিত আমরাও তাঁহার আতিথ্য স্বীকার করিয়াছিলাম। এখানেও লোকে মুনশী সাহেবের বক্তৃতা শ্রবণে মোহিত হইয়াছিল।

তৃতীয়বার দেখা হয় তাঁহার সহিত তুষভাণ্ডারের সভায়। স্কুলের সম্মুখস্থ খোলা মাঠে সহস্রাধিক লোকের সমাগম হইয়াছিল। মুনশী সাহেবের সহিত মুনশী শেখ জমিরুদ্দীন বিদ্যাবিনোদ এবং শাহ্ আব্দুল্লা সাহেবান সভায় উপস্থিত ছিলেন। অন্যান্য বক্তারা যখন বক্তৃতা দিতেছিলেন তখন অনেক লোক তাহা মনোযোগ দিয়া না শুনিয়া গোলমাল করিতেছিল। মুনশী সাহেব এই অশান্তি নিবারণের জন্য উঠিয়া দাঁড়াইলেন এবং দশ মিনিটের মধ্যে যাহা বলিলেন, তাহাতে মনে হইল সমাজে যেন আর একটাও জীবিত মানুষ নাই, চিত্রার্পিতের মত সকলেই তাঁহার মুখের দিকে চাহিয়া রহিল। গোলমাল থামিয়া গেল।

শুধু এখানে নহে, সর্ব্বত্রই তাঁহার বক্তৃতার এই অসাধারণত্ব লক্ষ্য করিয়াছি। তিনি মানুষকে সম্মোহিত করিতে পারিতেন। চেষ্টার ফলে এ ক্ষমতা তিনি লাভ করিয়াছিলেন, তাহা তখনও আমার মনে হয় নাই, এখনও হয় না। ইহা খোদা দত্ত শক্তি। তা’ছাড়া বক্তৃতা আরম্ভের পূর্ব্বে তিনি দেখিয়া লইতেন যে, কোন শ্রেণীর শ্রোতার সংখ্যা কিরূপ? যে শ্রেণীর আধিক্য দেখিতেন তাহাদের উপযোগী কথাও পাড়িতেন। ফলে লোকের মন সহজে বিগলিত হইত; তিনিও যশঃলাভ করিতেন।

জীবনে বিভিন্ন জাতীয় বহু বক্তার বক্তৃতা শুনিয়াছি। তাঁহাদের কথা শুনিয়া মনে হইয়াছে, তাঁহারা বেশ ভাবিয়া কথাগুলি বলিতেছেন। কিন্তু মুনশী সাহেবের বক্তৃতার ধারা আমার কাছে অন্যরূপ মনে হইত। ভাবিয়া চিন্তিয়া তাঁহাকে কথা বলিতে হইত না, কি এক ভাবে যেন তিনি বিভোর হইয়া পড়িতেন, আর কথাগুলি অনর্গল তাঁহার মুখ দিয়া বাহির হইতে থাকিত। তিনি কথা শুরু করিলে থামিতেন না, ঝর্ণার জলের মতই তাঁহার কথার ধারা শ্রোতৃবর্গের হৃদয় সরস করিয়া স্বচ্ছন্দ গতিতে চলিত; অথচ তাহার মধ্যে একটি অসঙ্গত, অবান্তর বা সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষমূলক কথা থাকিত না। এজন্য তিনি হিন্দু-মুসলমান সকলেরই শ্রদ্ধাভাজন হইয়াছিলেন।

নিজের সমাজের দুঃখকাহিনী বর্ণনার সময় তাঁহার বাণী অগ্নিময় তীরের মত সমঝদার শ্রোতার মর্মস্থলে গিয়া বিঁধিত। এজন্য কত মানুষকে সভাক্ষেত্রে হা’ হা’ রবে ক্রন্দন করিতে দেখিয়াছি। বাস্তবিক তিনি আসিয়াছিলেন অনেক অকল্যাণের অবসান ঘটাইতে। কাজেই তাঁহার বাক্যেও এমন তেজ ছিল, যাহা মুসলমান সমাজের বহুকালের জড়তাকে ভাঙ্গিয়াছে, তাহাদের চেতনা ফিরাইয়াছে, বাঙলার আত্মবিস্মৃত মুসলমান আত্মোপলব্ধি করিতে শিখিয়াছে, তাহাদের মধ্যে নব নব প্রতিভার উন্মেষ সম্ভব হইয়াছে। এক কথায়-সমাজ জাগিয়াছে। নবযুগের জয়-পতাকাধারী অনেক তরুণ সেবক আসিয়া সমাজ-সেবায় আত্মোৎসর্গ করিয়াছেন। দেখিয়া শুনিয়া আমার মনে হয়, মুনশী সাহেবের মত বাগ্মী যদি সেই সময় আমাদের মধ্যে দেখা না দিতেন, তাহা হইলে বাংলার মুসলমানকে শিক্ষাক্ষেত্রে আজ যতটুকু অগ্রসর দেখিতেছি, ততটুকুও বোধ হয় দেখিতে পাইতাম না। তাঁহার প্রতিভার আলো সূর্যরশ্মির মৃত সমাজের সকল স্তরে ছড়াইয়া পড়িয়াছিল। তাহাতে সমাজের যতখানি কাজ করিয়া গিয়াছেন, ততখানি কাজ করিবার মত কর্ম্মবীরের আজিও অভাব আছে। মুনশী সাহেবের সহিত ঘনিষ্ঠভাবে মিশিবার সুযোগ ঘটে আমাদের পর্ণকুটীরে কাকিনার সভা উপলক্ষে। এখানকার “ব্রাহ্মসমাজ” এবং “ছাত্রসমাজের” সম্মুখে “শম্ভুসাগর” নামক প্রশস্ত সরোবর তীরে সভাধিবেশনের বাসনায় আমাদের কর্ম্মীরা বহু গুণসম্পন্ন কাকিনাধিপতি স্বর্গীয় রাজা মহিমারঞ্জন রায় চৌধুরী মহোদয়ের অনুমতি প্রার্থনা করেন। রাজা বাহাদুর স্বয়ং সুপণ্ডিত এবং সুবক্তা ছিলেন। কোন ধর্মের প্রতিই তাঁহার বিদ্বেষ ছিল না। বড় বড় সভা সমিতিতে বাগ্মিতা এবং বিদ্যাবত্তার পরিচয় দিয়া তিনি বিদ্বৎসমাজে এবং বাংলার জমিদারগণের মধ্যে বরেণ্য হইয়াছিলেন। গুণীর কাছেই গুণীর সমাগম হইয়া থাকে; তাঁহার কাছেও নানা দেশের বহু গুণী জ্ঞানী ব্যক্তি আসিতেন। মুসলমান সমাজের অধঃপতন লক্ষ্য করিয়া স্থানীয় লোকদের সন্তান-সন্ততির শিক্ষার জন্য তিনি মৌলভী আব্দুল লতীফ নামক একজন প্রবীণ আলেমকে তাঁহার দরবারে রাখিয়াছিলেন। রাজ এষ্টেট হইতে তাঁহার বেতন এবং মাদ্রাসার ব্যয় বহন করা হইত। মৃত্যুকাল পর্যন্ত মৌলভী সাহেব অতি সম্মানের সহিত এখানে ছিলেন। রাজা বাহাদুর ধর্মসম্বন্ধীয় নানা বিষয় তাঁহার সহিত আলোচনা করিতেন। যখন সভার অনুমতি প্রার্থনা করা হয়, তখন হয়ত তিনি মনে করিয়াছিলেন, চিরদিন যেমন দেখা যায়, এই মুনশী সাহেবও সেই শ্রেণীর একজন বক্তা হইবেন। তাই তিনি অনুমতি দিলেও বিশেষ আগ্রহ প্রকাশ করেন নাই। নিদ্দিষ্ট দিনে সভা হইল। প্রথমে মুনশী শেখ জমিরুদ্দীন এবং শাহ্ আবদুল্লা সাহেবান ওজস্বিনী ভাষায় বক্তৃতা করিলেন। তারপর উঠিলেন মুন্‌শী সাহেব। সমাগত সহস্রাধিক হিন্দু মুসলমান এই ছিন্নবস্ত্রপরিহিত অতি সাধারণ মানুষটির অদ্ভুত ক্ষমতা, অপূর্ব্ব বাগ্মিতার পরিচয় পাইয়া স্তম্ভিত হইয়া গেল। গুণগ্রাহী রাজা বাহাদুর উদ্বেলিত চিত্তে উঠিয়া বলিলেন, “আজ আমার অনেকদিনের একটা ভুল ধারণা ঘুচিল। বাংলার মুসলমানদের মধ্যে এমন একজন বাগ্মী আছেন, ইহা আমি এই প্রথম দেখিলাম।” মনে আছে মুনশী সাহেবের বক্তৃতার আলোচনা প্রসঙ্গে সেদিন রাজা বাহাদুরও দীর্ঘ অভিভাষণে মুসলমানদিগকে শিক্ষার জন্য উৎসাহিত করিয়াছিলেন।

মুনশী সাহেব অনেক সভায় নিজের কাহিনী অকপটে বর্ণনা করিতেন। এখানেও করিয়াছিলেন। অশিক্ষিত সমাজকে উদ্বুদ্ধ করাই বোধ হয় ইহার উদ্দেশ্য ছিল। তিনি একজন বড়দরের বাগ্মী, এ অভিমান কখনই প্রকাশ করিতেন না। অসাধারণ প্রতিভার অধিকারী হইলেও তাঁহার তিলমাত্র গর্ব্ব দেখি নাই। যখন কাহারও সহিত বাক্যালাপ করিতেন তখন তাঁহাকে নিতান্তই “মাটির মানুষ” মনে হইত; কিন্তু সভায় দাঁড়াইলে বুঝা যাইত, তিনি যে-সে লোক নহেন, পুরুষসিংহ। তাঁহার বাক্যে একদিকে যেমন অমৃতপ্রবাহ বহিত অপরদিকে তেমনি বিদ্যুদ্বর্ষণও হইত। শ্রোতার হৃদয় জয় করিবার অপরিসীম ক্ষমতা ছিল তাঁহার বাক্যে। সভার শেষে রাজা বাহাদুর পরদিন প্রাতে বক্তাদের সহিত আলাপ করিবার ইচ্ছা জানাইলেন। যথাসময়ে রাজবাড়ী হইতে জুড়ি গাড়ী আসিয়া তাঁহাদিগকে লইয়া গেল। আমরাও তাঁহাদের কথা শুনিতে গেলাম। বহুক্ষণব্যাপী ধর্মালাপে রাজা বাহাদুর নিরতিশয় আনন্দলাভ করিলেন। মুনশী সাহেবের যুক্তিপূর্ণ কথা তাঁহার মনে গভীর রেখাপাত করিয়াছিল।

মুনশী মেহেরুল্লার প্রত্যুৎপন্নমতিত্বের একটি গল্প এস্থলে বোধ হয় অপ্রাসঙ্গিক হইবে না। কাকিনার সভায় ঘটনাচক্রে আমার নূতন বিলাতী জুতা জোড়া হারাইয়া যায়। আমি জনৈক বন্ধুর জুতা পায়ে দিয়া পথে আসিতে আসিতে মুনশী সাহেবকে রহস্যচ্ছলে বলিলাম, “যান, আপনার বক্তৃতায় আজ কিছু কাজ হয় নাই। চুরির সম্বন্ধে আপনার অত নীতিকথা শুনিয়াও যখন চোরে আমার জুতা জোড়া লইয়া গেল, তখন কি করিয়া বুঝিব যে, আপনার কথায় কাজ হইয়াছে।”

মুনশী সাহেব তৎক্ষণাৎ উত্তর দিলেন, “ভাই, ওটা আমার দোষ নয়, আপনার কর্মের ফল। এইমাত্র আপনি বিলাসিতার বিরুদ্ধে কত কথা বলিয়া আসিলেন, আর আপনার নিজের পায়ে দামী বিলাতী জুতা। তাই চোর উহা চুরি করিয়া আপনাকে এই উপদেশ দিয়া গেল যে, আগে নিজে বিলাসিতা ছাড়, তারপর অন্যকে ছাড়িতে উপদেশ দিও।”

এ কথার আর উত্তর কি? তদবধি বিলাতী জুতা ব্যবহার করিয়াছি বলিয়া মনে পড়ে না।

আর একটা ঘটনার কথা মনে আছে। আমাদের বাড়ীতে সকাল বেলা মুনশী সাহেব ছেঁড়া কাপড় সেলাই করিতে বসিয়াছেন; অনেক ভদ্রলোক তাঁহার সহিত দেখা করিতে আসিয়াছেন। তিনি কাজ করিতে করিতে সকলের সহিত আলাপ করিতেছেন। এমন সময় স্কুলের বৃদ্ধ হেড পণ্ডিত স্বর্গীয় গগনচন্দ্র ঘোষ মহাশয় বলিলেন, “দেখুন আপনাদের এই পর্দা প্রথাটা বড় ভয়ঙ্কর রকমের। মুসলমানের দেখাদেখি হিন্দুর অন্তঃপুরেও এই কড়াকড়িটা ছড়াইয়া পড়িয়াছে। এতটা কিন্তু ভাল নয়।”

পণ্ডিত মহাশয় ছিলেন গোঁড়া ব্রাহ্ম। মুনশী সাহেব তাঁহার কথা শুনিয়া হাসিয়া বলিলেন, “আচ্ছা, পণ্ডিত মশাই, এই “অসূর্য্যস্পশ্যা” শব্দটা হিন্দুর না মুসলমানের? যদি মুসলমানের হইত, তাহা হইলে না হয় বলিতে পারিতেন যে, আমাদের দেখাদেখি হিন্দু সমজে পদ্দার কড়াকড়ি হইয়াছে। কিন্তু শব্দটা যে আপনাদেরই।”

পণ্ডিত মহাশয় এ কথার আর প্রতিবাদ করিতে পারিলেন না। শুধু বলিলেন “আপনি ছেলেমানুষ। কিন্তু আপনার কাছে আজ বড় জব্দ হইলাম।”

এইরূপ সামান্য দুই-এক কথায় তিনি অনেকের কঠিন প্রশ্নের এত সহজ উত্তর দিতেন যে, শুনিয়া আমরা অবাক্ হইতাম। তাঁহার সাধারণ কথাবার্তাতেও অনুপ্রাসের ছড়াছড়ি থাকিত। শব্দগুলি এমন সুসঙ্গতভাবে তিনি প্রয়োগ করিতেন, যেন তাঁহার মুখ হইতে মালাগাঁথা হইয়া বাহির হইতেছে। অধুনালুপ্ত “বিধবা গঞ্জনায়” তিনি এই শক্তির বহুল পরিচয় দিয়াছেন।

লালমনিরহাট জংশনের উত্তরপূর্ব্ব দিকে কুলাঘাট নামক স্থানে এক সময় একটি ধর্মসভার অধিবেশন হয়। আমরা সকলেই সেই সভায় উপস্থিত ছিলাম। সভা শেষ হইবার পূর্ব্বে প্রবল ঝড় এবং মুষলধারে বৃষ্টি নামিল। শামিয়ানার রশি ছিঁড়িয়া গেল। এই ব্যাপারে সকলেরই মন ক্ষুব্ধ হইল। বাধ্য হইয়া পরদিন রাত্রে মুনশী সাহেবকে আবার বক্তৃতা দিতে হইল। এই স্থানে তিনি আমাকে “বিধবা গঞ্জনা”র দ্বিতীয় খণ্ড প্রকাশের কথা বলিয়াছিলেন। বিধবাদের দুঃখ সম্বন্ধে জাতিধর্মনির্বিশেষে সকল কবির লেখা একত্র সংগ্রহ করিয়া একখানি বই বাহির করা তাঁহার উদ্দেশ্য ছিল এবং সেই উদ্দেশ্য সাধনের জন্য তিনি আমাকেও একটি কবিতা লিখিয়া দিতে বলেন। আমি তাঁহার কথামত “বিধবা-বিলাপ” কবিতা লিখি। কিন্তু উহার অল্পদিন পরেই তিনি মৃত্যুমুখে পতিত হওয়ায় সে বই আর বাহির হয় নাই। আমার লেখাটি পরে “ইসলাম প্রচারক”এ ছাপা হইয়াছে।

যতদূর স্মরণ হয়, তাহাতে তিনিই বোধ হয় বাংলা কবিতায় প্রথম গজলের সুর যোজনা করেন। এ বিষয়ে তাঁহাকে অগ্রদূত বলা যাইতে পারে। সভা সমিতিতে যখন সুরে সুর মিলাইয়া তাঁহারা গাহিতেন—

“কোথায় আরবভূমি,
কোথা বঙ্গ কোথা তুমি,
পাব কি তোমারে আমি,
মোহাম্মদ ইয়া রসুলাল্লা!
ধর্মরক্ষা, সত্যরক্ষা,
করিতে ওম্মতে রক্ষা,
পারসিলে আত্মরক্ষা,
মোহাম্মদ ইয়া রসুলাল্লা!
সমস্ত জগত মাঝে
তব ডঙ্কা জোরে বাজে,
বিধর্মীরা মরে লাজে,
মোহাম্মদ ইয়া রসুলাল্লা!
শোন রে মোস্লেম জাতি,
জ্বালো রে জ্ঞানের বাতি,
মুখে বল দিবারাত্রি
মোহাম্মদ ইয়া রসুলাল্লা!"

তখন অশীতিপর বৃদ্ধ হইতে বালক পর্যন্ত সকলের মনেই একটা উদ্দীপনার স্রোত বহিয়া যাইত।

কুলাঘাটের সভার পর মহিপুর যাইবার পথে তিনি আর একবার এই অধমের কুটীরে আসিয়াছিলেন। সম্ভবতঃ উহাই আমাদের শেষ দেখা। আমরা এক গাড়ীতে আসিতেছিলাম। বাড়ীর কাছাকাছি আসিয়া সহসা তিনি বলিয়া উঠিলেন, “কালে এই বাড়ীটা আমাদের তীর্থস্থান হইবে।” আমি চমকিয়া উঠিলাম, এ যে তাঁহার স্বপ্ন। কিন্তু বাদানুবাদেরই বা কি আছে? কানা ছেলের “পদ্মলোচন” নাম কতজনে রাখে, একটা কানাও কি তাহাতে “পদ্মলোচন” হয়? গুরুজনেরা অনেক সময় আশীর্ব্বাদ করিয়া বলেন, “রাজা হও”। কে তাহাতে সত্যিকার রাজাই হইয়া থাকে? স্নেহ, ভালবাসার ক্ষেত্রে অসম্ভবই সম্ভব হইয়া উঠে। কষ্টিপাথরে ইহার বিচার চলে না।

তাঁহার মৃত্যুর পর “সোলতান” অফিসে মেহেরুল্লা মেমোরিয়াল ফান্ড খোলা হইয়াছিল। তাহাতে আমিই বোধ হয় সর্ব্বাগ্রে আমার “লায়লী মজনু” ১০০ খণ্ড দান করি। আমার জ্যেষ্ঠভ্রাতা ৩ টাকায় উহার একখণ্ড বই কিনিয়াছিলেন বলিয়া “সোলতান” সম্পাদক মওলানা মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী সাহেব তাঁহার ভূয়সী প্রশংসা করিয়াছিলেন। কত টাকা সেই ফাণ্ডে জমিয়াছিল বলিতে পারি না। বোধ হয় বিশেষ কিছু জমে নাই এবং তাহাদ্বারা কোন কাজও হয় নাই। আধমরা জাতির কাছে ইহার অধিক আর কি আশা করা যাইতে পারে? যাহা হউক এতদিন পরে এখন যদি তাহাদের চেতনা ফিরিয়া থাকে, শিক্ষিত যুবকেরা তাঁহার স্মৃতিরক্ষার সুব্যবস্থা করেন, তাহা হইলেও আমাদের মুখের কালি অনেক পরিমাণ মুছিয়া যাইতে পারে।

কাল চলিয়া যাইতেছে, যাইবে। কিছু গুণীর গুণগৌরব কালজয়ী হইয়া থাকিবেই, সে স্মৃতি চির অমলিন। মুনশী সাহেব সম্বন্ধেও এ কথা বেশ খাটে। আমরা তাঁহাকে ভুলিতে বসিয়াছিলাম; কিন্তু তাঁহার গুণমুগ্ধ ভক্ত মৌলভী শেখ হাবিবুর রহমান সাহিত্যরত্ন সাহেব জগতের সম্মুখে তাঁহার স্মৃতিকে উজ্জ্বল করিয়া ধরিবার প্রয়াস পাইয়াছেন। এজন্য তিনি আমাদের সকলেরই কৃতজ্ঞতাভাজন। যোগ্য ব্যক্তিই এ কাজের ভার লইয়াছেন। তিনি অল্পকথায় মুনশী সাহেবের কর্মবহুল জীবনের একটি পরিপূর্ণ চিত্র আঁকিতে চেষ্টা করিয়াছেন। তাঁহার বাসনা ফলবতী হউক এবং বাংলার ঘরে ঘরে ধর্মবীর, কর্মবীর মুনশী মেহেরুল্লার জীবন কথা সযত্নে লোকে পাঠ করুক, ইহাই আমি প্রার্থনা করি।

কারুনের সাথে ধনরাশি তার পাইয়াছে চিরলয়।

ন্যায়পরায়ণ নৌশেরোঁয়ার আজো গাহে লোকে জয়।

সৎকর্মশীল মুনশী সাহেবও অমর হইয়া থাকিবেন।

কাকিনা, (রংপুর)

১লা রমজান, ১৩৫০ হিজরী

হদিস: (হোসেন মাহমুদ ও মো. আব্দুল কুদ্দুস সম্পাদিত “শেখ ফজলল করিম রচনাবলী” থেকে সংকলিত।)