ভারতের কথিত সেক্যুলারিজম ও মুসলিম ঐতিহ্যের ওপর রাজনৈতিক আঘাত | আল বাসীর
Mulla ko jo hai Hind mein sajde ki ijazat
nadan ye samajhta hai ki Islam hai Aazad
চরণটুকু কবি, দার্শনিক ও রাজনীতিবিদ আল্লামা মুহাম্মাদ ইকবালের মাশহুর কাব্যগ্রন্থ 'বাং-এ-দারা'-র অংশ। এর তর্জমা করলে দাড়ায়, "হিন্দে মোল্লার আছে শুধু সিজদার অনুমতিটুকু, নাদান সে ভাবে ইসলাম আজাদ"। ১৯২৪ সালে প্রকাশিত এই অংশটুকু পড়লে মনে হয় ইকবাল বর্তমান ভারতে মুসলমানদের অবস্থার কথাই বলেছেন। সম্ভবত, ভবিষ্যতের গভীর উপলব্ধির ফলাফলস্বরূপই তিনি মুসলমানদের জন্য একটি আলাদা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছিলেন। হিন্দু মেজোরিটি শাসনে ভারতে মুসলমানদের তাকদির কেমন হবে তা তিনি পূর্বেই উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন।
ইকবালের স্বপ্ন পরবর্তীতে বাস্তবায়িত হয় 'পাকিস্তান' নামক রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। কিন্তু, কপাল পোড়ে সেসব মুসলমানদের যারা কংগ্রেসের কথিত সেকুলারিজম বা কংগ্রেসের বয়ান শুনে ভারতেই থেকে যায়। সাতচল্লিশের দেশভাগের পর থেকেই ভারতের মুসলমানরা উপলব্ধি করতে শুরু করে কট্টর হিন্দুরা তাদের শুধুই 'মুসলিম' হিসেবে মনন করে, মানুষ হিসেবে নয়। ভারতের মুসলিমরা ক্রমাগত শারীরিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে প্রভাবিত হতে শুরু করে। পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, গুজরাট, আসাম থেকে শুরু করে প্রায় সবখানেই মুসলমানদের উপর নির্যাতন, এমনকি গণহত্যাও চলে। মুসলমানদের মৌলিক মানবিক অধিকারটুকুও ক্ষুণ্ণ হওয়া খুবই সাধারণ ব্যাপার হয়ে যায়।
তবে, গত কয়েক বছর যাবৎ ভারতে মুসলমানদের সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকট চরমে পৌঁছে গিয়েছে, নির্যাতনের পন্থাও পরিবর্তন হয়েছে। কট্টর হিন্দু ডানপন্থীরা পিটিশন ও সার্ভে(জরিপ)-এর মাধ্যমে মুসলমানদের ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক স্থানগুলোকে ক্রমাগত লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে। সাম্ভালের জামা মসজিদ থেকে আজমীর শরীফ দরগাহ ছাড়াও দিল্লির জামা মসজিদ, বাদাউনের জামা মসজিদ, জৌনপুরের আটালা মসজিদ এবং মধ্যপ্রদেশের ঐতিহাসিক কামাল মাওলা মসজিদের মতো আরও বহু উদাহরণ বিদ্যমান। একের পর এক মসজিদকে লক্ষ্য করে আক্রমণ চালানো হচ্ছে। হিন্দু কট্টর ডানপন্থীদের সংগঠিত প্রচারণা সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ও সহিংসতা সৃষ্টি করছে। এর পর আমরা বুলডোজার ইঞ্জাস্টিস দেখতে পাচ্ছি, যার মাধ্যমে মুসলমানদের বাড়িঘর, দোকানপাট ভেঙে গুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। যদিও, এটি নতুন কোনো বিষয় নয়। মুসলমানদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয় সবসময়ই হিন্দু ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলোর লক্ষ্যবস্তু হয়ে এসেছে। এই কারণেই মসজিদ, মাদ্রাসা এবং ইসলামী আইডেন্টিটির সঙ্গে সম্পর্কিত প্রতীকগুলো ধারাবাহিকভাবে নিশানা করা হচ্ছে। সমাজ, রাজনীতি ও বিচারব্যবস্থার সহায়তায় এই স্থাপনাগুলোর উপর বারবার আঘাত হানা হচ্ছে।
১৯৯১ সালে ভারতের সামাজিক কাঠামোকে শক্তিশালী রাখা ও সংঘাত এড়াতে ‘Places of Worship (Special Provisions) Act, 1991 ’ বা 'উপাসনা স্থান সংক্রান্ত আইন, ১৯৯১' কার্যকর করা হয়েছিল, কিন্তু আজ এই আইনটিও উপেক্ষা করা হচ্ছে। ১২ জানুয়ারি ২০২৪ তারিখে, Places of Worship Act-কে চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা ছয়টি আবেদনের শুনানিকালে সুপ্রিম কোর্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেয়। আদালত দেশের সমস্ত আদালতকে নির্দেশ দেয় যে, এরপর থেকে মসজিদ সার্ভে করা বা সেগুলোর নিচে কোনো মন্দির থাকার দাবি তদন্তের উদ্দেশ্যে কোনো নতুন মামলা বা আবেদন গ্রহণ করা যাবে না এবং এ বিষয়ে কোনো নতুন সিদ্ধান্তও দেওয়া যাবে না। নতুন করে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা এড়ানোর লক্ষ্যে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
একদিকে প্রাচীন হিন্দু সভ্যতার মহিমা প্রচারের চেষ্টা চলছে, অন্যদিকে পুরাণকথা(Mythology)-কে বাস্তব সত্য হিসেবে উপস্থাপন করার চ্যালেঞ্জও বেড়ে চলেছে। আজকের ভারত ও হিন্দু ডানপন্থীদের কিছু বড় প্রশ্ন হলো, “কোন মসজিদটি একটি মন্দিরের জায়গায় তৈরি?”, “কোন মসজিদে কোনো প্রাচীন মন্দিরের অংশবিশেষ আছে?”, “একটি মসজিদ কি একটি মন্দিরের সঙ্গে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকতে পারে?”। তবে, সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, “একটি মসজিদের আদৌ টিকে থাকা উচিত কি না?”। এই প্রশ্নগুলো হিন্দু ডানপন্থী সংগঠনগুলোর মাধ্যমে ধর্মীয় স্থাপনাগুলোকে নিজেদের করে নেওয়ার প্রচেষ্টার সঙ্গে মিলিত হয়ে এমন এক পরিবেশ তৈরি করছে, যা ‘সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদ(Majoritarianism)’-র স্পষ্ট উদাহরণ। এর ফলাফলস্বরূপ ভারতে মুসলমানদের তেহজিব ও সভ্যতাকে মুছে দেওয়ার প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
এই অবস্থায় মুসলিম সম্প্রদায় ভারতে তাদের ধর্মীয় স্থান এমনকি, নিজেদের পরিচয় হারানোর আশঙ্কায় ভুগছে। এই উদ্বেগ আরও গভীর হয় যখন NDA(বিজেপি-র নেতৃত্বাধীন National Democratic Alliance) সরকার ১৯৯৫ সালের ওয়াক্ফ আইনে পরিবর্তনের প্রস্তাব দেয়। এটি পরিবর্তনের চেষ্টা সরাসরি মুসলমানদের ধর্মীয় স্থানগুলোর ওপর আক্রমণের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবেই জড়িত।
এই হামলাগুলোর একটা নির্দিষ্ট কৌশল রয়েছে। এটা যেনো একটা সাজানো নাটকের প্লট। এই নাটকের ধারাবাহিকতা শুরু হয় হিন্দু ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলোর দায়ের করা জনস্বার্থ মামলা (PIL) দিয়ে, এরপর আদালত জরিপের নির্দেশ দেয়, আর এই জরিপগুলো সাধারণত কট্টর হিন্দু কর্মীদের ‘জয় শ্রী রাম’ স্লোগানের মধ্যেই অনুষ্ঠিত হয়, যা মাঠপর্যায়ে উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তোলে। এরপর পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে যায় এবং উত্তেজনা সহিংসতায় রূপ নেয়। সহিংসতার সময় পুলিশ ও প্রশাসনের আচরণও একপাক্ষিক থাকে। তারপর বুলডোজার আনা হয় এবং মুসলমানদের বাড়ি, দোকান ও ধর্মীয় স্থাপনাগুলো ভেঙে ফেলা হয়, আর এটিকে মিডিয়ায় ‘বুলডোজার জাস্টিস’ বলে চালিয়ে দেওয়া হয়। বহু ডানপন্থী গোষ্ঠীর দাবি অনুযায়ী সারা ভারতে প্রায় ৩৬,০০০ মসজিদ আসলে মন্দির ভেঙে নির্মিত হয়েছে। এমন চিন্তাভাবনা ভারতীয় মুসলমানদের জন্য কতটা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে সেটা তাদের চোখের সামনে ভাসার কথা, যারা ভারতে হিন্দুত্ববাদীদের উগ্রতা সম্পর্কে অবগত।
ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলে দেখা যায়, সবকিছুর শুরু বাবরি মসজিদকে ঘিরে। এরপর মথুরা ও কাশী, আর এখন হঠাৎ করে ৩৬ থেকে ৪০টি ধর্মীয় স্থাপনাকে মন্দির বলে দাবি করা হচ্ছে। এটি কি শুধুই কাকতালীয়? না। এসব দাবি একটি পূর্বপরিকল্পিত পরিকল্পনারই অংশ। কয়েক দশক ধরে সংগঠিত রাজনৈতিক-ধর্মীয় ন্যারেটিভ ও আন্দোলনের ফল এসব। কিছুদিন পূর্বে একটি ইন্টারনেট লিংক ভাইরাল হয়েছিল, যেখানে মুসলমানদের ধর্মীয় স্থানগুলোর একটি তালিকা ছিল—যেগুলোকে বলা হয়েছে মন্দির ভেঙে নির্মিত। যদি রাজ্যভিত্তিকভাবে বিশ্লেষণ করা হয়, তাহলে এর সংখ্যা দেখে চমকে যেতে হয়। এটি ছিল সাম্প্রদায়িকতার জন্য এক ধরনের জাতীয় রেসিপি। এই পরিস্থিতি ইতোমধ্যেই আগুনে ঘি ঢালার মতো কাজ করছে। মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়িয়ে পড়ছে এবং মানুষের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ছে। এর পাশাপাশি ভিএইচপি, বজরং দলসহ বিভিন্ন সংগঠন ও কিছু ব্যক্তির পক্ষ থেকে জনস্বার্থ মামলা (PIL)-এর বন্যা দেখা যাচ্ছে। এসবকিছু মিলিয়ে ভারতের পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলছে এবং পরিবেশকে আরও বিষাক্ত করে দিচ্ছে।
মন্দির ধ্বংস: মিথ বনাম বাস্তবতা
ইতিহাসবিদরা ইতোমধ্যেই প্রমাণ করেছেন যে, মন্দির ধ্বংস করে মুসলমান শাসকদের মসজিদ বানানোর এসব দাবি সত্যের ওপর ভিত্তি করে নয়। তাহলে প্রশ্ন ওঠে, মন্দিরগুলো কেন আক্রমণের শিকার হয়েছিল? আর কারাই বা সেগুলো ধ্বংস করেছিল?
অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক এবং “India in the Persianate Age: 1000–1765” গ্রন্থের লেখক রিচার্ড এম. ইটন যুক্তি দেন যে প্রাক-ইসলামিক যুগেও শাসক রাজবংশগুলো মন্দিরকে লক্ষ্যবস্তু করত। দ্য ডিপ্লোম্যাট-এর দক্ষিণ এশিয়া সম্পাদক সুদা রামচন্দ্রনের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে ইটন উল্লেখ করেন যে হিন্দু ও মুসলিম উভয় শাসকরাই মন্দির আক্রমণ করেছেন। যেসব মন্দিরে আঘাত হানা হতো, সেগুলো সাধারণত রাজাসংশ্লিষ্ট ছিল। ইটনের ভাষায়, “এ ধরনের মন্দির অপবিত্র করা ছিল পরাজিত শত্রুকে তার পূর্ববর্তী সার্বভৌম কর্তৃত্বের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রতীক থেকে বিচ্ছিন্ন করার স্বাভাবিক উপায়, যার মাধ্যমে তাকে রাজনৈতিকভাবে অক্ষম করে দেওয়া হতো” এবং তিনি জোর দিয়ে বলেন, এসব আক্রমণ ছিল রাজনৈতিক, ধর্মীয় নয়।1
ইতিহাস বলে, বহু ক্ষেত্রে বৌদ্ধ ধর্মীয় স্থাপনা ধ্বংস করে সেখানে হিন্দু মন্দির নির্মাণ করা হয়েছে। সমাজবাদী পার্টির নেতা স্বামী প্রসাদ মৌর্য হিন্দু মন্দিরগুলোর প্রত্নতাত্ত্বিক সমীক্ষার আহ্বান জানান, যাতে নির্ধারণ করা যায় সেগুলো বৌদ্ধ স্থাপনার ওপর নির্মিত কি না।2
ড. বি. আর. আম্বেদকর তার “The Untouchables: Who Were They and Why They Became Untouchables?(1948)” বইতে যুক্তি দিয়েছিলেন যে, প্রাচীন ভারতে বৌদ্ধধর্ম এবং ব্রাহ্মণ্যবাদের মধ্যে তীব্র সংঘাত ছিল। বইয়ের ৯ম ও ১০ম অধ্যায়ে (বিশেষ করে "Contempt for Buddhists" অংশে) তিনি এ বিষয়য়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।
ইতিহাসবিদ ডি. এন. ঝা (D.N. Jha) তার বই "Against the Grain: Notes on Identity, Intolerance and History"-তে এ বিষয়ে বিস্তারিত লিখেছেন। ডি. এন. ঝা উল্লেখ করেছেন যে, পুরীর জগন্নাথ মন্দিরটি একসময় একটি বৌদ্ধ স্তূপ বা মঠ ছিল। তিনি বিখ্যাত ব্রিটিশ ঐতিহাসিক উইলিয়াম হান্টার (William Hunter)-এর গবেষণার সূত্র টেনে দেখিয়েছেন যে, জগন্নাথের মূর্তির ভেতরে যে 'ব্রহ্ম পদার্থ' বা দেহাংশ আছে বলে বিশ্বাস করা হয়, তা আসলে বৌদ্ধদের কোনো পবিত্র ধ্বংসাবশেষ বা রিলিক।3
স্বামী বিবেকানন্দ নিজেও তার বক্তৃতায় এবং লেখায় উল্লেখ করেছেন যে, প্রাচীন বৌদ্ধ মন্দিরগুলোকে হিন্দু মন্দিরে রূপান্তর করা হয়েছিল। বিবেকানন্দ তার একটি লেখায় বলেছিলেন:
"The temple of Jagannath is an old Buddhistic temple. We took this and others, and re-Hinduised them. We shall have to do many things like that yet."4
এছাড়া, ইতিহাসবিদ রাম পুনিয়ানিও ড. মুকেশ কুমারের এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “স্বামী দায়ানান্দ সরস্বতী রচিত ‘Satyarth Prakash’-এ সরস্বতীজি উল্লেখ করেছেন যে প্রাচীন ভারতে কীভাবে বহু বুদ্ধমূর্তি ও বুদ্ধস্তূপ এভাবে ধ্বংস করা হয়েছিল।”
সম্ভবত এই কারণেই আরএসএস প্রধান মোহন ভগবত সম্প্রতি হিন্দুদের উদ্দেশ্যে এই আহ্বান জানান, “ঠিক আছে, প্রতীকীভাবে আমাদের কিছু স্থানের প্রতি বিশেষ শ্রদ্ধা ছিল, আমরা সেসব স্থান সম্পর্কে বলেছি। কিন্তু প্রতিদিন নতুন করে কোনো ইস্যু তোলা উচিত নয়। আমরা কেন বিরোধ বাড়াতে চাই? জ্ঞানবাপী নিয়ে আমাদের কিছু বিশ্বাস আছে, তা ঐতিহ্যগতভাবে চলে আসছে, আমরা সেটাই করছি—ঠিক আছে। কিন্তু কেন প্রতিটি মসজিদে শিবলিঙ্গ খুঁজতে হবে?”5
এটা বোঝা জরুরি যে হিন্দু ডানপন্থীরা দীর্ঘদিন ধরে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে এমনভাবে উপস্থাপন করে আসছে, যাতে ভারতকে একটি ‘হিন্দু-কেন্দ্রিক’ দেশ হিসেবে দেখানো যায়। যেমন, আরএসএস প্রধান মোহন ভগবত, অভিনেতা ও বিজেপি নেতা রবি কিশান, বিজেপি নেতা সুরেন্দ্র সিং-এর মতো ব্যক্তিরা প্রকাশ্যে দাবি করে আসছেন যে “ভারত একটি হিন্দু রাষ্ট্র।” এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো রাম মন্দির আন্দোলন, যা কিছুতেই ভুলে যাওয়া যায় না। এখন তাদের দৃষ্টি জ্ঞানবাপী মসজিদ, শাহী ঈদগাহ, সাম্ভালের জামা মসজিদ, আজমীর দরগাহ এবং দিল্লির জামা মসজিদের মতো স্থানের দিকে। এসব স্থানকে ঘিরে আলোচনা তীব্র হচ্ছে, বিশেষ করে একটি নির্দিষ্ট আইন, ১৯৯১ সালের Places of worship act কে কেন্দ্র করে। এখন প্রশ্ন উঠছে, এই আইনটি আসলে কী, এবং এটি বাতিল হলে ভারতের সাম্প্রদায়িক পরিবেশের ওপর কী ধরণের প্রভাব পড়তে পারে?
Places of Worship Act
Places of worship act আইনটি প্রণয়ন করা হয়েছিল এমন এক সময়ে, যখন ‘রথযাত্রা’-কে কেন্দ্র করে ভারতে ব্যাপক সহিংসতা ও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছিল। এই রথযাত্রাটি আয়োজন করা হয়েছিল মূলত রাম মন্দির নির্মাণের উদ্দেশ্যে, যেখানে বাবরি মসজিদ অবস্থিত ছিল।
তৎকালীন ভারতের প্রাক্তন উপ-প্রধানমন্ত্রী এল. কে. আদভানি এক জনসভায় বলেছিলেন,
"সোমনাথ থেকে যাত্রা শুরু হওয়া এই রথ জনগণের সংকল্পের প্রতীক। যারা ৩০ অক্টোবর অযোধ্যায় পৌঁছে করসেবা এবং মন্দির নির্মাণের সংকল্প করেছে, তাদের আটকানোর শক্তি কারোর নেই। কোনো সরকার বা শক্তি রাম-ভক্তদের এই জয়যাত্রা রুখতে পারবে না।" ৩০ সেপ্টেম্বর ১৯৯০ থেকে ৩০ অক্টোবর ১৯৯০ পর্যন্ত 'দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া', 'ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস' এবং হিন্দি সংবাদপত্র 'জনসত্তা'-র তৎকালীন প্রতিবেদনে তাঁর জনসভার এই বয়ানগুলো বিস্তারিত ছাপা হয়েছিল।
তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পি. ভি. নরসিমা রাও (১৯৯১–১৯৯৬)-এর সরকারের ওপর এই পুরোনো বিরোধের সমাধান খুঁজে বের করার জন্য প্রবল চাপ ছিল। তাই সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষতার নীতিকে ব্যবহার করে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার চেষ্টা করা হয়। নীতিগুলো রক্ষা করতে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এস. বি. চাভান ১৯৯১ সালে লোকসভায় এই আইনটি উত্থাপন করেন।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই আইন কার্যকর হওয়ার মাত্র এক বছর পরই বাবরি মসজিদ ধ্বংস করা হয়। এ ধরনের আইন শুধু ভারতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠীর মধ্যে ঐতিহাসিক বিরোধ মীমাংসার জন্য বিশ্বব্যাপী গৃহীত একটি পদ্ধতি। বহু দেশেই ধর্মীয় বিভেদের ভিত্তিতে অনুরূপ আইন বিদ্যমান। উপাসনাস্থল আইনের মূল উদ্দেশ্য ছিল ধর্মীয় স্থাপনাগুলোর বিদ্যমান অবস্থান স্থিতিশীল রাখা। এটি কেবল একটি তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি নয়; আন্তর্জাতিক সংস্থা যেমন ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালত(ECHR), আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (ICJ) এবং জাতিসংঘের বিভিন্ন রায়েও এই ধরণের নীতির প্রতিফলন দেখা যায়। যেমন, আইসিজে (ICJ) সীমানা বা ধর্মীয় স্থাপনা নিয়ে বিবাদে "Uti Possidetis" নীতি ব্যবহার করে। এর অর্থ হলো একটি নির্দিষ্ট সময়কাল বা সন্ধির পর যে পক্ষ যে অবস্থায় আছে, শান্তি রক্ষার খাতিরে তাকেই বৈধতা দেওয়া। এটি ভারতের ১৯৯১ সালের আইনের 'কাট-অফ ডেট' (১৫ আগস্ট ১৯৪৭) ধারণার সাথে তাত্ত্বিকভাবে একেবারেই মিলে যায়।
এই আইন কেন প্রণয়ন করা হয়েছিল?
১৯৪৭ সাল, অর্থাৎ ভারতের স্বাধীনতার দিনকে এই আইনের জন্য ‘কাট-অফ ডেট’ হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। এর অর্থ হলো—সেদিন যেভাবে কোনো ধর্মীয় স্থাপনার অবস্থা ছিল, তা সেভাবেই থাকবে। যদি কোনো স্থান মন্দির হয়ে থাকে, তা মন্দিরই থাকবে; আর যদি মসজিদ হয়ে থাকে, তবে তা মসজিদই থাকবে। এই আইন গুরুদুয়ারা, গির্জা এবং অন্যান্য ধর্মীয় স্থাপনাতেও প্রযোজ্য।
এই আইনের মূল উদ্দেশ্য ছিল দাঙ্গা-হাঙ্গামা প্রতিরোধ করা এবং ধর্মীয় স্থাপনাগুলোর প্রকৃত পরিচয় বজায় রাখা।
এই আইন ধর্মনির্বিশেষে সকল নাগরিকের জন্য সমতা নিশ্চিত করে। কার ধর্ম কী, তা এখানে বিবেচ্য নয়। নানা সংস্কৃতি ও ধর্মের মানুষের বসবাসস্থল একটি দেশ হিসেবে ভারতের জন্য এই আইনটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
Places of Worship Act থেকে বাবরি মসজিদের বাদ পড়া এবং এর পরিণতি
বাবরি মসজিদ ও রাম জন্মভূমি কেন্দ্রিক দাঙ্গা-হাঙ্গামার মধ্যেই উপাসনাস্থল আইন(Places of worship act) প্রণয়ন করা হয়েছিল, যাতে কোনো প্রকার বৈষম্য ছাড়াই ধর্মীয় স্বাধীনতা সুরক্ষিত থাকে। কিন্তু বাবরি মসজিদকে বিশেষভাবে এই আইনের আওতার বাইরে রাখা হয়। সে সময় যুক্তি দেওয়া হয়েছিল যে বাবরি মসজিদের অবস্থান অত্যন্ত বিতর্কিত এবং সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছিল। এটি মূলত সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের অর্থাৎ, হিন্দু ডানপন্থীদের দাবির প্রতি একটি বড় রাজনৈতিক নেগোসিয়েশনই ছিল।
রাজনৈতিক নৃতত্ত্ববিদ ইরফান আহমেদ বলেন, অযোধ্যার বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের রায় সংখ্যাগরিষ্ঠতাভিত্তিক (পপুলিস্ট) আচরণের প্রতিফলন। আদালত হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠের এই বিশ্বাসকে গ্রহণ করেছে যে বাবরি মসজিদের স্থাপনাস্থলটি ভগবান রামের জন্মস্থান; কিন্তু প্রমাণগুলোকে সমালোচনামূলকভাবে পর্যালোচনা করা হয়নি এবং বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গিকেও বিবেচনায় আনা হয়নি। এই একতরফা সিদ্ধান্তে প্রমাণের ভার মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়, যা এই রায়ের পপুলিস্ট চরিত্রকে প্রকাশ করে। তবে মানুষের মনে গভীরভাবে প্রোথিত বিশ্বাস কেবল আইনের মাধ্যমেই খণ্ডন করা সম্ভব।6
পরিস্থিতির বিশ্লেষণ এবং ২০১৯ সালের নির্বাচনের পর সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী আবেগের উত্থান লক্ষ্য করলে স্পষ্ট হয় যে হিন্দু ডানপন্থীদের কাছে ভারতের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিশেষ এক দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। তাছাড়া, আদালতের ঔপনিবেশিক ব্যাখ্যার ওপর নির্ভরতা এবং হিন্দু ডানপন্থীদের ভারতীয় ইতিহাসের ব্যাখ্যা যেমন, মুসলমানদের জন্য “মোহাম্মাদান” শব্দের ব্যবহার পপুলিস্ট বয়ানে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এই রায় ভারতের ইতিহাসকে হিন্দু বনাম মুসলিম এই দুই ভাগে বিভক্ত করেছে।
অনেক হিন্দু সংগঠন বুঝে যায় যে সমষ্টিগত সমর্থন পেলে অতীতে মন্দির ছিল বলে দাবি করা ধর্মীয় স্থানগুলোকে মন্দিরে রূপান্তর করা সম্ভব। বাবরি মসজিদ–রাম মন্দির মামলার রায়ে এই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নিয়েছে। ২০১৯ সালে অযোধ্যা রায় ঘোষণার সময় যারা নিজেদের ধর্মনিরপেক্ষ মনে করেন, তারা আশা করেছিলেন যে এতে চিরতরে এমন দাঙ্গার অবসান হবে। সম্ভবত এই আশাতেই সুপ্রিম কোর্ট রাম মন্দির নির্মাণের অনুমতি দেয়।7
যদিও আদালত বলেনি যে মসজিদটি কোনো প্রাচীন মন্দির ভেঙে নির্মিত হয়েছিল8। আদালত আরও বলেছে যে ১৯৩৯ সালে মসজিদের ভেতরে মূর্তি স্থাপন করা এবং ১৯৯২ সালে মসজিদ ধ্বংস করা উভয়ই ছিল ভুল।9
তবুও এই রায় মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে আশঙ্কা সৃষ্টি করে যে এর ফলে আরও এ ধরনের দাবি উত্থাপনের পথ খুলে যেতে পারে। তাদের সেই আশঙ্কা সত্য প্রমাণিত হয়। পরবর্তী দুই বছরের মধ্যেই মথুরার শাহী ঈদগাহ এবং জ্ঞানবাপী মসজিদ নিয়ে নতুন মামলা দায়ের করা হয়। এখন উত্তর প্রদেশের সাম্ভালের শাহী জামা মসজিদ, রাজস্থানের আজমীর দরগাহ এবং দিল্লির জামা মসজিদও এই তালিকায় যুক্ত হয়েছে। এভাবে, বছরের পর বছর আইনের দোহাই দিয়ে মুসলিম সম্প্রদায়ের সাথে মশকরা করা হচ্ছে।
জ্ঞানবাপী মসজিদ এবং আইনি ফাঁকফোকর
বারাণসীর জ্ঞানবাপী মসজিদের ইতিহাস অত্যন্ত প্রাচীন। ঐতিহাসিকদের মতে, মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব আলমগীর ১৬৬৯ সালে এই মসজিদটি নির্মাণ করেন।
২০২৩ সালের ৪ আগস্ট ভারতের সুপ্রিম কোর্ট আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়াকে জ্ঞানবাপী মসজিদে জরিপ করার অনুমতি দেয়, যা অন্যান্য ধর্মীয় স্থানেও একই ধরণের জরিপ চালানোর দাবি বাড়িয়ে দেয়।10 যুক্তিটি ছিল এই যে, যদি জ্ঞানবাপী মসজিদে জরিপ করা যায়, তবে অন্যান্য মসজিদে কেন নয়? ২০২১ সালের আগস্ট মাসে পাঁচজন হিন্দু নারী বেনারসের আদালতে একটি আবেদন দাখিল করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে, ২০২২ সালের এপ্রিলে আদালত একজন অ্যাডভোকেট কমিশনারকে বিতর্কিত স্থানটি পরিদর্শন ও গ্রাফ করার অনুমতি দেয়। ২০২২ সালের ৬ ও ৭ মে এই জরিপ চালানো হয়েছিল, কিন্তু এর ফুটেজ মিডিয়ায় ফাঁস হয়ে যায়, যা ব্যাপক বিতর্ক এবং দাবির জন্ম দেয়, বিশেষ করে 'শিবলিঙ্গ' নিয়ে; যদিও মসজিদ পক্ষ এটিকে একটি ফোয়ারা হিসেবে বর্ণনা করেছে যা মুসলিম পক্ষ 'অজুখানা' হিসেবে ব্যবহার করতেন।11
২০২৩ সালের ২১ জুলাই, আদালত ওই নারীদের দ্বিতীয় আবেদনটি শুনানি করে, যেখানে মসজিদের প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ দাবি করা হয়েছিল। এলাহাবাদ হাইকোর্ট এটি অনুমোদন করে। সুপ্রিম কোর্ট এতে হস্তক্ষেপ করা প্রয়োজন মনে করেনি। এটি এই নীতিই প্রতিষ্ঠা করে যে, ১৯৯১ সালের উপাসনাস্থল আইন (Places of Worship Act) থাকা সত্ত্বেও ধর্মীয় স্থানগুলোতে জরিপের দাবি জানানো যেতে পারে।
২০২২ সালের ২০ মে ভারতের প্রধান বিচারপতি ডি. ওয়াই. চন্দ্রচূড় 'উপাসনাস্থল আইন(Places of Worship Act), ১৯৯১' নিয়ে একটি মন্তব্য করেন। তার এই বক্তব্যটি বেশ বিতর্কের জন্ম দেয়, কারণ এটি আগেকার একটি বড় সিদ্ধান্তের সাথে সাংঘর্ষিক ছিল। চন্দ্রচূড় যে মৌখিক পর্যবেক্ষণটি দিয়েছিলেন, সেটি ছিল,
"উপাসনাস্থল আইন, ১৯৯১ কোনো উপাসনাস্থলের 'ধর্মীয় চরিত্র' (Religious Character) নির্ধারণ বা যাচাইয়ের ওপর কোনো বাধা নিষেধ আরোপ করে না।"12
অযোধ্যা বা রাম জন্মভূমি মামলার রায়ে সুপ্রিম কোর্ট পরিষ্কারভাবে জানিয়েছিল যে, ১৯৯১ সালের এই আইনটি ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতাকে রক্ষা করার জন্য অত্যন্ত জরুরি। হাস্যকর ব্যাপার, ওই রায় প্রদানকারী বিচারকদের মধ্যে চন্দ্রচূড় নিজেও ছিলেন। তাই যখন তিনি নিজেই নিজের আগের অবস্থানের বিপরীতে গিয়ে এই আইনের প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তুললেন, তখন অনেকেই মনে করেন তিনি যেন একটি নতুন সমস্যার পথ বা 'প্যান্ডোরা বাক্স' খুলে দিলেন। এর ফলে ধর্মীয় স্থানগুলোর মালিকানা নিয়ে নতুন করে আইনি লড়াইয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।13
বিচারপতি চন্দ্রচূড়ের এই পর্যবেক্ষণের প্রধান প্রভাব ছিল এই যে, নিম্ন আদালতগুলো তাদের সিদ্ধান্তে এটি অন্তর্ভুক্ত করতে শুরু করে, যা জ্ঞানবাপী মসজিদ, শাহী ইদগাহ এবং সাম্ভালে দেখা যায়। জামে মসজিদের ক্ষেত্রেও এটি দেখা গিয়েছে।14 এই মামলাগুলোতে যুক্তি দেওয়া হয়েছিল যে, এই ভবনগুলোর ধর্মীয় চরিত্র বিতর্কিত, তাই এটি একটি মসজিদ না মন্দির ছিল তা নির্ধারণ করা প্রয়োজন।15 কিন্তু, এই যুক্তি উপাসনাস্থল আইনের মূল বক্তব্যের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। যদি এই আইনের অধীনে ধর্মীয় স্থানের পরিবর্তন করা না যায়, তবে এটিও যুক্তিযুক্ত যে ১৯৪৭ সালে বিদ্যমান কোনো ধর্মীয় স্থানের ধর্মীয় চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলাই উচিত নয়।
বিচারপতি চন্দ্রচূড়ের যুক্তির সমস্যা হলো এটি দাঙ্গা বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। যে কেউ যেকোনো ধর্মীয় স্থান সম্পর্কে দাবি করতে পারে যে এটি পুনর্নিরীক্ষা করা উচিত এবং আমরা ইতিমধ্যে এটি ঘটতে দেখছি। মুসলিমদের সাথে সম্পর্কিত প্রায় প্রতিটি ঐতিহাসিক স্থানের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হচ্ছে। এসব সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা এবং দাঙ্গাকে ব্যাপকভাবে উসকে দিচ্ছে। এক সাক্ষাৎকারে সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের প্রাক্তন সভাপতি দুষ্যান্ত দাভে THE WIRE-এ জালা থাপারকে দেওয়া এক ইন্টারভিউয়ে বলেন, "আমি মনে করি চন্দ্রচূড় সংবিধান এবং এই দেশের একটি বড় ক্ষতি করেছেন"।
ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ বিভাগ (ASI) কি নিরপেক্ষ?
ভারতে সরকারি প্রতিষ্ঠান ও দপ্তরগুলোতে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠের মনোভাব ও আবেগ ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ছে। আদালত থেকে শুরু করে মিডিয়া, সংবাদপত্রের অফিস, এমনকি ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ বিভাগ পর্যন্ত সর্বত্র দৃশ্যমান পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। এই পরিবর্তনগুলো এই প্রতিষ্ঠানগুলোর ন্যায্যতা এবং স্বাধীনতার ওপর এক গুরুতর সন্দেহের সৃষ্টি করেছে। এই সন্দেহকে মুসলিম সাংস্কৃতিক ইতিহাসের সাথে যুক্ত করে এবং ASI কর্তৃক ধর্মীয় স্থানগুলোর জরিপ মাথায় রেখে, ASI-এর প্রতিবেদনের নিরপেক্ষতা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা জরুরি।
ASI এর প্রতিবেদনের ওপর প্রশ্ন তোলা হয়েছে, বিশেষ করে বাবরি মসজিদ সংক্রান্ত তাদের জরিপ পদ্ধতি এবং সম্ভাব্য 'হিন্দুত্ববাদী পক্ষপাতের' বিষয়ে, যা বর্তমান মামলাগুলোতে আদালতের কাছে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে পেশ করা ওই প্রতিবেদনগুলোর ওপর সন্দেহ তৈরি করে।16 এটা স্পষ্ট যে ASI, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ এবং পর্যটন ব্যুরোর মতো সংস্থাগুলো কেবল ভারতের প্রাচীন ইতিহাসের নিরপেক্ষতা নিয়ে কাজ করে না। এই প্রতিবেদনগুলো জনমত গঠনে বড় প্রভাব ফেলে এবং তাদের ফোকাস মূলত হিন্দুধর্মের সাথে সম্পর্কিত মিথের ওপর বেশি থাকে, যেখানে ভারতের ইতিহাসের অন্যান্য দিকগুলো একেবারে উপেক্ষা করা হয়। এটি ইতিহাসের ক্ষেত্রে একতরফা দৃষ্টিভঙ্গির জন্ম দিয়েছে।
প্রত্নতাত্ত্বিক সুপ্রিয়া ভার্মা এবং জয়া মেনন, যারা সুন্নি ওয়াকফ বোর্ডের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন, তারা ASI-এর প্রতিবেদনের সত্যতাকে চ্যালেঞ্জ করেছেন এবং খনন পদ্ধতি ও ASI-এর সম্ভাব্য পক্ষপাত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।17,18 এও বলা হয় যে, ১৮৬১ সালে আলেকজান্ডার কানিংহামের খননকার্যের মতো পূর্ববর্তী উল্লেখগুলো ASI ব্যবহার করেনি, যেখানে কোনো ভাঙা মন্দিরের উল্লেখ ছিল না।19 একইসাথে, ASI-এর প্রাক্তন মহাপরিচালক বি.বি. লাল অযোধ্যায় মন্দির ধ্বংসের গল্পটিকে জনপ্রিয় করতে বড় ভূমিকা পালন করেছিলেন। আইনি বিতর্ক সত্ত্বেও ASI জরিপ চালিয়ে যাচ্ছে, যদিও প্রতিবেদনের বিষয়বস্তু এখনো গোপন রাখা হয়েছে। জ্ঞানবাপী মসজিদের আইনজীবীরা বলছেন যে, মামলার প্রতিটি পদক্ষেপ, তা শুনানি হোক, সার্ভে কমিশনার নিয়োগ হোক, জরিপ নিজে হোক বা সম্প্রতি 'শিবলিঙ্গ' পাওয়ার দাবির পর একটি অংশ সিল করার সিদ্ধান্ত—সবই গোপনীয়তার সাথে করা হয়েছে । এই সব কিছুই ১৯৯১ সালের উপাসনাস্থল আইনের (Places of Worship Act) পরিপন্থী।
বৃহত্তর প্রেক্ষাপট আমাদের কী বলে? (উপাসনাস্থল আইন, ১৯৯১ এবং ওয়াকফ (সংশোধনী) বিল, ২০২৫)
মুসলিমদের সাথে যুক্ত প্রতিটি ঐতিহাসিক স্থাপনাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার এই প্রবণতার পর ভারতে যে ক্রমবর্ধমান বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে, তাকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখা যাবে না। একে ওয়াকফ সংশোধনী বিল এবং এর চারপাশে ছড়িয়ে পড়া বক্তব্যের সাথে মিলিয়ে দেখতে হবে। এটি কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়, বরং এটি একটি সুপরিকল্পিত পরিকল্পনার অংশ বলে মনে হয় এবং যেমনটি প্রায়ই বলা হয়—সবকিছুর একটি 'ক্রোনোলজি' বা ধারাবাহিকতা থাকে। এই ক্রোনোলজি খুব সহজেই বোঝা যায়। আইনের পরিবর্তন এবং সে সম্পর্কে গুজব ছড়ানোতে মোদী সরকারের এই মরিয়া ভাব কোনো আকস্মিক সিদ্ধান্ত নয়।
উপাসনাস্থল আইন এবং ওয়াকফ সংশোধনী বিলকে একসাথে দেখা উচিত। উপাসনাস্থল আইন নিশ্চয়তা দেয় যে ভারতে ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ধর্মীয় স্থানের যে অবস্থান ছিল, তা অপরিবর্তিত থাকবে। এর মানে হলো, কোনো মুসলিম স্থাপনা জরিপ করে বিতর্কিত ঘোষণা করা হলেও বা সেখানে মন্দির ভেঙে মসজিদ গড়ার দাবি করা হলেও, এই আইন ওই ভবনের পরিচয় পরিবর্তন করতে বাধা দেয়। এখন বিষয়টি জটিল হয়ে ওঠে যখন 'ওয়াকফ সংশোধনী বিল ২০২৪' আইনে পরিণত হয়। এই বিলটি এমন একটি কাঠামো তৈরি করে যা মুসলিম উপাসনালয়গুলোর মালিকানা এবং স্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তোলা সহজ করে দেয়। প্রকৃতপক্ষে, যেখানে উপাসনাস্থল আইন ভবনগুলোর বর্তমান অবস্থাকে সুরক্ষা দেয়, সেখানে ওয়াকফ সংশোধনী বিল মালিকানা নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষমতা কালেক্টরকে দেয়। বিল অনুযায়ী, কালেক্টর এই ভবনগুলো জরিপ করার নির্দেশ দিতে পারেন এবং সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত সম্পত্তিটি তার ওয়াকফ মর্যাদা হারাতে পারে। এটি একটি বড় আইনি ফাঁকফোকর যা উপাসনাস্থল আইনের সুরক্ষাকে দুর্বল করে দিতে পারে। এই আইনের পর, সম্পত্তির মালিকানার নামে মসজিদ এবং অন্যান্য মুসলিম স্থান জরিপ করা যেতে পারে এবং উচ্চ সম্ভাবনা রয়েছে যে এই জরিপে কালেক্টর এমন সিদ্ধান্ত নেবেন যা মন্দির-মসজিদ বিতর্কে ঘি ঢালবে।
এই দুটি বিষয়কে একসাথে দেখলে পরিষ্কার হয়ে যায় যে এটি একটি সমন্বিত কৌশলের অংশ। ওয়াকফ সংশোধনী বিল মুসলিমদের ধর্মীয় স্থানের মালিকানা নিয়ে প্রশ্ন তোলার পথ খুলে দেয় এবং উপাসনাস্থল আইনের দুর্বলতা সেই বিতর্ককে এগিয়ে নিয়ে পরিচয় পরিবর্তনের সুযোগ করে দেয়। মনোযোগ দিয়ে দেখলে এটি একটি প্যাটার্নের মতো মনে হয়, ঠিক যেমন CAA এবং NRC-কে একসাথে এনে করা হয়েছিল। এটি ভারতের সংখ্যালঘুদের ধর্মীয় স্থানের ঐতিহাসিক ও আইনি মর্যাদাকে লক্ষ্যবস্তু করে। এটি একটি বড় পরিবর্তন যা আমাদের সামাজিক কাঠামোর ওপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলতে পারে।
রামায়ণ থেকে রাম মন্দির: অতীত এবং বর্তমান
প্রশ্ন হলো, রাম মন্দির আন্দোলন কীভাবে এত শক্তিশালী হয়ে উঠল যে তা ধর্মনিরপেক্ষতাকে পেছনে ফেলে দিল? এই বিষয়ে ঐতিহাসিক মূল এবং হিন্দু ডানপন্থীদের চিন্তাভাবনা নিয়ে গভীরে কথা বলা এই প্রসঙ্গের অংশ না হলেও, ১৯৮০-র দশকের সেই সিদ্ধান্তগুলো অবশ্যই দেখা উচিত যা এই আন্দোলনকে দেশব্যাপী আন্দোলনে পরিণত করেছিল। এই আন্দোলনই শেষ পর্যন্ত বাবরি মসজিদ ধ্বংস এবং দাঙ্গার দিকে নিয়ে যায়। ডাচ পণ্ডিত পিটার ভ্যান ডের ভীর জোর দিয়ে বলেন যে ১৯৮০-র দশক হিন্দু ডানপন্থী আন্দোলনের জন্য রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল, বিশেষ করে ১৯৮৪ সাল। ১৯৮৪ সালে রামের জন্মভূমির মুক্তির জন্য একটি ট্রাক রওনা হয়। এরপর ১৯৮৬ আসে যখন জেলা আদালতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বাবরি মসজিদের দরজা হিন্দু জনতার জন্য খুলে দেওয়া হয়। ভ্যান ডের ভীরের মতে, তৎকালীন কংগ্রেস সরকারের অনুমতি ছাড়া এই বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব ছিল না।20 সেটি ছিল এমন এক সময় যখন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং সাম্প্রদায়িক ইস্যুগুলো একে অপরের সাথে জড়িয়ে পড়তে শুরু করেছিল ।
ভারতের স্বাধীনতার পর ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় ছিল এবং নামেমাত্র ধর্মনিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণের কথা বলত, কিন্তু তারপর যে যোগ করা যায় কিছু নাই গান্ধীর যুগ এলো এবং সেখান থেকে বিষয়গুলো আরও বদলে যেতে শুরু করল। তার সরকার সরকারি টিভি চ্যানেলে 'রামায়ণ' প্রচার শুরু করে। এটি কোনো ছোট বিষয় ছিল না। সমাজবিজ্ঞানী ও কর্মী অরবিন্দ রাজগোপালের মতে, এই পদক্ষেপটি ছিল মিডিয়ায় ধর্মীয় ঝোঁক না দেখানোর যে নীতি তা ভাঙার মতো এবং এটি হিন্দু জাতীয়তাবাদকে চাঙ্গা করার সুযোগ করে দেয়।21 হিন্দু ডানপন্থীরা এই বিষয়ে সচেতন ছিল। তারা একে নিজেদের সুযোগ হিসেবে দেখে এই ঢেউয়ের ওপর সওয়ার হয়।
এই ধারায়, রামায়ণ সিরিয়ালের পর রাম জন্মভূমি আন্দোলন গতি পায়। স্বেচ্ছাসেবীরা রাম ও লক্ষ্মণের ছবির মাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণা চালায়। তাদের লক্ষ্য ছিল বাবরি মসজিদের স্থানে মন্দির নির্মাণ করা। এই আন্দোলন স্বাধীনতার পর ভারতের বৃহত্তম প্রচারণার জন্ম দেয়, যা দেশের রাজনীতিকে পুরোপুরি বদলে দেয়।22 মানুষ টিভির মাধ্যমে যুক্ত হচ্ছিল এবং রামের গল্পের সাথে এক ধর্মীয় ঐক্য অনুভব করছিল। এটি ছিল হিন্দু চেতনাকে শক্তিশালী করার মতো। তাই রামায়ণ প্রচার এবং রাম জন্মভূমি আন্দোলন শুরু করা কোনো কাকতালীয় ঘটনা ছিল না। এটি একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক কৌশল বলে মনে হয়।23
বাবরি মসজিদের বিষয়টি ছিল দুটি সম্প্রদায়ের মধ্যের বিষয়। এখানে এক সম্প্রদায়কে তুষ্ট করতে অন্য সম্প্রদায়ের অধিকার দুর্বল করা হয়েছিল। কংগ্রেস এই রাজনৈতিক পদক্ষেপের মাধ্যমে হিন্দু ভোট টানার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু এর প্রকৃত সুবিধা চলে গিয়েছিল বিজেপির হাতে। হিন্দু ডানপন্থীরা বাবরি মসজিদকে মুসলিম আধিপত্যের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করেছিল, যা হিন্দুদের মধ্যে অপমানের অনুভূতি তৈরি করে। যখন মসজিদের জমি দখলের অভিযান শুরু হয়, তখন হিন্দু ডানপন্থী সংগঠনগুলো পরবর্তীতে অন্যান্য ধর্মীয় স্থানের ওপরও দাবি জানানো শুরু করে। এটি ১৯৮০-র দশকের রাজনৈতিক পরিচয় এবং সাংস্কৃতিক আন্দোলনের গল্প এবং লক্ষ্য করলে দেখবেন, সেই একই রাজনৈতিক স্ক্রিপ্ট আজও পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। এটি চলছে এবং চলবে। যেমনটা ইকবাল বলেছিলেন।
Sources:
[Richard Eaton on the Desecration of Hindu Temples in India By Sudha Ramachandran(THE DIPLOMAT- January 15, 2024]
[Did Hindu kings destroy Buddhist structures in ancient India? This is what history suggests By Arjun Sengupta(The Indian Express-August 4, 2023]
[Against the Grain- Page 44-46]
[The Complete Works of Swami Vivekananda, Vol. 3, Page 264].
[The Print– June 3, 2022]
[The Majoritarian Assumptions That Birthed a Populist Verdict by Irfan Ahmad-The Wire, November 21, 2019]
[Ayodhya verdict: Indian top court gives disputed site to Hindus-Al Jazeera, November 9, 2019]
[No, the Supreme Court did not uphold the claim that Babri Masjid was built by demolishing a temple by Shoaib Daniyal-Scroll.in, November 11, 2019]
[Supreme Court of India, Civil Appellate Jurisdiction, Civil Appeal Nos. 10866–10867 of 2010 (Ayodhya Title Dispute Case)]
[Supreme Court Allows ASI Survey Of Gyanvapi Mosque Without Excavation Or Damage To Structure; Asks ASI To Follow "Non-Invasive" Process by Padmakshi Sharma- LiveLaw.in, August 4, 2023]
[Gyanvapi survey video leaked, aired on TV channels-Hindustan Times, May 31, 2022]
[Ascertaining of religious character of place of worship not barred under 1991 law': SC on Gyanvapi row-The new Indian Express, May 20, 2022]
[Ascertainment of religious character of place of worship not barred under Places of Worship Act: Supreme Court observes by Debayan Roy- Bar and Bench, May 20, 2022]।
[Gyanvapi mosque managing committee moves SC against pleas challenging Places of Worship Act-Scroll.in, December 6, 2024]
[Why critics are blaming former CJI DY Chandrachud for turmoil in Sambhal?-Maktoob Media, November 25, 2024]
[Al Jazeera, August 25, 2003]
[Archeologist Who Observed Dig Says No Evidence of Temple Under Babri Masjid- The Wire, November 8, 2019]
[Was There a temple under the Babri masjid? Reading the archaeological 'evidence'- Economic & Political Weekly]
[Ayodhya: Evidence From Excavation Does Not Support ASI’s Conclusion About Temple-THE WIRE SCIENCE, 21 November, 2019]
[Religious Nationalism: Hindus and Muslims in India. University of California Press, by Peter van der Veer 1994, pp. xi-xii, 1-24, 203]
[Interview: Hindutva at Party - Frontline]
[The TV shows that transformed Hinduism-BBC, October 22, 2019]
[Ramanand Sagar’s Ramayan Has Once Again Helped Televise BJP’s Ram Revolution” — The Wire, May 24, 2020]