তরজমা বলতে আমরা কি বুঝি? | সিদ্দিকে আকবর
একটা ভাষা আসলে শুধু ভাষা না, একটা সম্পূর্ণ জগৎ। তার নিজস্ব তাপমাত্রা আছে, নিজস্ব রঙ আছে, নিজস্ব ছায়া আছে। এমনকি তার নিজস্ব নীরবতাও আছে। মানুষ একটা ভাষায় শুধু তথ্য বিনিময় করে না - মানুষ সেখানে প্রেমে পড়ে, রাগ করে, অভিশাপ দেয়, দোয়া করে, স্মৃতি জমায়, আল্লাহকে ডাকে, আবার কখনো কখনো নিজের ভেতরের সবচেয়ে গোপন কথাটাও ওই ভাষাতেই প্রথম চিনতে পারে। তাই এই প্রশ্নটা খুব স্বাভাবিক যে, একটা ভাষার এই পুরো জগতটাকে কি আরেক ভাষায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব কিনা? নাকি প্রতিটা অনুবাদ আসলে কিছু হারানোর শিল্প? কিছু বাঁচিয়ে, কিছু নষ্ট করে এগিয়ে যাওয়া?
অনুবাদ নিয়ে বহু পুরনো একটা ইতালীয় প্রবাদ আছে - ‘ত্রাদুত্তোরে, ত্রাদিতোরে’(traduttore, traditore)। মানে, অনুবাদক মানেই বিশ্বাসঘাতক। কথাটা একটু নিষ্ঠুর শোনালেও, এর ভেতরে বহু শতকের হতাশা জমে আছে। কারণ মানুষ বহু আগেই বুঝে গেছে, ভাষার ভেতরে এমন কিছু থাকে যেগুলো হুবহু বহন করা যায় না। একটা শব্দের সাংস্কৃতিক ওজন, একটা বাক্যের টোন, কোনো লোকজ অভিব্যক্তির গন্ধ, কিংবা একটা হঠাৎ থেমে যাওয়ার ভঙ্গি - এগুলো তো অভিধান দেখে অনুবাদ করা যায় না। একটা ভাষা কেবল শব্দের সমষ্টি না; একটা জীবনযাপনের ধরনও।
দামিয়ন সার্লস এই জায়গাটাতেই এসে হস্তক্ষেপ করেন। তাঁর বই ‘দ্য ফিলোসফি অব ট্রান্সলেশন’ পড়তে পড়তে মনে হয়, তিনি আসলে অনুবাদ নিয়ে কম, মানুষের অভিজ্ঞতা একে অন্যের কাছে পৌঁছানোর সীমা নিয়ে বেশি ভাবছেন। বইটা ২০২৪ সালে বের হয়েছে। কিন্তু এর ভেতরের প্রশ্নগুলো খুব পুরনো, এবং একইসঙ্গে খুব আজকেরও।
সার্লস নিজে কোনো সাধারণ অনুবাদক না। নীটশে, ভিটগেনস্টাইন, রিলকে, প্রুস্ত, ইয়ন ফসে - এই ধরনের লেখকদের অনুবাদ করতে গেলে শুধু ভাষা জানলেই কাজ হয় না; একটা আলাদা দৃষ্টি লাগে, ধৈর্য লাগে, আলাদা কান লাগে। কারণ এদের ভাষা শুধু ‘তথ্য’ বহনকে ছাড়িয়ে নিজেই সেখানে একটা অভিজ্ঞতা। জার্মান, নরওয়েজিয়ান, ফরাসি, ডাচ - এই ভাষাগুলো থেকে তিনি অন্তত ৬০টি বই ইংরেজিতে এনেছেন। হার্ভার্ডে দর্শনও পড়েছেন। ফলে তিনি যখন অনুবাদ নিয়ে লিখছেন, তখন সেটা বাইরের কোনো একাডেমিক পর্যবেক্ষণ মনে হয় না। বরং মনে হয়, বহু বছর ভাষার জটিলতার সঙ্গে কুস্তি করতে করতে ক্লান্ত হয়ে যাওয়া একজন মানুষের ব্যক্তিগত স্বীকারোক্তি পড়ছি।
বইটার সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং দাবি সম্ভবত এটা: অনুবাদ আসলে প্রথমত ‘লেখা’ না, বরং ‘পড়া’। আমরা সাধারণত ভাবি, লেখক লিখবেন, পাঠক পড়বেন - ব্যস। সার্লস বলেন, না, পড়া নিজেই একটা সক্রিয় অভিজ্ঞতা। একটা বাক্য কীভাবে হাঁটছে, কোথায় তার গতি কমছে, কোন শব্দটা ইচ্ছে করে একটু বেমানান শোনাচ্ছে, কোথায় লেখক নিঃশ্বাস আটকে রাখছেন - এইসবও পড়ার অংশ।
আর অনুবাদক সেই পাঠক, যার অমনোযোগী হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। একজন সাধারণ পাঠক কোনো জায়গা দ্রুত পড়ে এগিয়ে যেতে পারেন। কিন্তু অনুবাদক পারেন না। তাঁকে প্রতিটা শব্দের সামনে দাঁড়াতে হয়। একটা কমা কেন এখানে, একটা দীর্ঘ বাক্যের পরে হঠাৎ ছোট বাক্য কেন, একটা সাধারণ শব্দ হঠাৎ এত ভারী লাগছে কেন - এসবও তাঁকে ভাবতে হয়। এই অর্থে অনুবাদক সম্ভবত পৃথিবীর সবচেয়ে মনোযোগী পাঠক।
এই জায়গা থেকেই সার্লস খুব প্রচলিত একটা ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেন। আমরা সাধারণত যেটা ভাবি, মূল ভাষায় একটা ‘অর্থ’ আছে, অনুবাদক সেই অর্থটাকে আরেক ভাষায় বহন করে নিয়ে যান; যেন এক পাত্র থেকে আরেক পাত্রে পানি ঢালা হচ্ছে; সার্লস বলেন, এই রূপকটাই ভুল; কারণ অর্থ কোনো রেডিমেড জিনিস না।
অর্থ তৈরি হয় ভাষার ভেতরে। বাক্যের রিদমের ভেতরে। সাংস্কৃতিক কনটেক্সটের ভেতরে। আগের শব্দ আর পরের শব্দের অর্থ বদলালেও একটা শব্দের অর্থ বদলায়। ফলে অনুবাদক আসলে অর্থ পরিবহন করেন না। বরং নতুন ভাষায় নতুনভাবে অর্থ তৈরি করেন। এই কাজটা মোটেও যান্ত্রিক না, বরং গভীরভাবে সৃজনশীল।
‘দ্য ফিলোসফি অব ট্রান্সলেশন’ বইটার একটা বড় শক্তি হলো, সার্লস তত্ত্বের কথা বলতে গিয়েও খুব বেশি বিমূর্তায়ন করে ফেলেন নাই। তিনি বারবার বাস্তব উদাহরণে ফিরে আসেন। শব্দের গতি, বাক্যের ভর, ধ্বনির বুনন (texture) - এইসব নিয়ে কথা বলেন। বিশেষ করে ‘শব্দের আওয়াজ’ নিয়ে তাঁর আলোচনা খুব মনে রাখার মতো।
আমরা সাধারণত অনুবাদের ক্ষেত্রে জিজ্ঞেস করি - ‘সঠিক অনুবাদ হয়েছে কিনা?’ কিন্তু খুব কম মানুষ জিজ্ঞেস করে - ‘এটা কেমন শোনাচ্ছে?’ অথচ একটা ভাষার ধ্বনিগত বুনন খুব গুরুত্বপূর্ণ জিনিস। একটা দীর্ঘ বাক্যের পরে হঠাৎ ছোট বাক্য যে মানসিক প্রভাব তৈরি করে, সেটা তো শুধুই তথ্যের ব্যাপার না। একটা শব্দ কর্কশ হতে পারে, নরম হতে পারে। একটা ভাষা হাঁটে দ্রুত, আরেকটা হয়তো একটু ধীরে। অনুবাদককে এগুলোও শুনতে হয়।
বাংলা সাহিত্য নিয়ে চিন্তা করলে ব্যাপারটা আরও পরিষ্কার হয়। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মা নদীর মাঝি যখন ‘বোটম্যান অব দ্য পদ্মা’ হয়, তখন শুধু শব্দ বদলায় না - একটা সামাজিক আবহও বদলে যায়। ‘মাঝি’ শব্দটার ভেতরে যে নদীমাতৃক জীবন, শ্রেণিগত অবস্থান, লোকজ আবহ আছে, ‘বোটম্যান’-এ তার সবটা আসে না। আবার সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর লালসালু যখন ‘ট্রি উইদাউট রুটস’ হয়, তখনও একই ঘটনা ঘটে। ইংরেজি নামটা খারাপ না। কিন্তু ‘লালসালু’ শব্দটার ভেতরে যে লোকজ ধর্মীয় ইঙ্গিত আছে, সেই মিস্টিকাল ভাবটা অনেকটাই কেটে যায়।
সার্লসের ভাষায় বললে, এখানে শুধু শব্দ তরজমা হয়নি; অভিজ্ঞতাও বদলেছে।
‘দ্য ফিলোসফি অব ট্রান্সলেশন’ বইটার একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হলো লেখকের ফ্রয়েড-বিশ্লেষণ। সিগমুন্ড ফ্রয়েড জার্মানে তুলনামূলক সহজ ভাষায় লিখতেন। কিন্তু ইংরেজি অনুবাদকরা তাঁকে ‘সায়েন্টিফিক’ শোনাতে গিয়ে ভীষণ ভারী পরিভাষা ব্যবহার করেছেন। ‘das Es’, ‘das Ich’, ‘das Über-Ich’ হয়ে যায় ‘Id’, ‘ego’, ‘super-ego’। শুনতে উচ্চমার্গীয় লাগে ঠিকই, কিন্তু এতে ফ্রয়েডের ভাষার অব্যবহিকতা (immediacy) নষ্ট হয়ে যায়। মনে হয়, একজন জীবন্ত মানুষ কথা বলছিলেন - অনুবাদ তাকে লেকচার হলের কাঠের বাক্সে বন্দি করে ফেলল।
একই জিনিস আংশিকভাবে ওয়াল্টার বেনিয়ামিনের ক্ষেত্রেও ঘটেছে। তাঁর গদ্য এমনিতেই ভারী। কিন্তু অনেক অনুবাদে সেই ভারের সঙ্গে আরো অপ্রয়োজনীয় একাডেমিক জটিলতা যোগ হয়েছে। ফলে পাঠকের মনে হয়, ভাষা যেন তার দিকে এগিয়ে আসছে না; বরং দূরে সরে যাচ্ছে।
বইয়ে ফরেনাইজেশন আর ডমেস্টিকেশন নিয়ে পুরনো বিতর্কও এসেছে। একটা অনুবাদ কি পাঠককে বিদেশি অনুভূতির দিকে ঠেলে দেবে, নাকি বিদেশি জিনিসকে পরিচিত করে তুলবে? লরেন্স ভেনুতির পর থেকে এই বিতর্ক খুব প্রভাবশালী। কিন্তু সার্লস এখানে একটু সরে দাঁড়ান। তাঁর মতে, এটা আসল প্রশ্ন না।
আসল প্রশ্ন হলো: একটা লেখা পড়তে কেমন লাগে?
সেই অনুভূতিটা অন্য ভাষায় কীভাবে বাঁচিয়ে রাখা যায়?
কখনো সেটা করতে গেলে ভাষাকে একটু অচেনা রাখতে হবে। কখনো আবার খুব স্বাভাবিক করে তুলতে হবে। কোনো বাঁধাধরা দৃষ্টিভঙ্গী দিয়ে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। টেক্সট নিজেই বলে দেয়, তাকে কীভাবে বহন করতে হবে।
আলোচ্য বইটির একটা সূক্ষ্ম জায়গা হলো ‘নেটিভ স্ট্রেঞ্জনেস’ নিয়ে আলোচনা। এটা আন্তোয়ান বেরমানের কাছ থেকে নেওয়া ধারণা। ভালো সাহিত্য নিজের ভাষার মধ্যেও একটু অচেনা হয়। সত্যিকারের সাহিত্য পুরোপুরি আরামদায়ক না। তার ভেতরে সবসময় একটা অপরিচিত ভাব থাকে। অনুবাদের কাজ সেই অচেনাভাব মুছে ফেলা না; বরং নতুন ভাষায় আবার তৈরি করা।
বইয়ের শেষদিকে এসে সার্লস অনুবাদকে একটা খুব সুন্দর জিনিস দিয়ে ব্যাখ্যা করেন। তাঁর কাছে অনুবাদ মানে ‘জগতের মধ্যে দিয়ে চলা’, ভাষার মধ্যে দিয়ে হাঁটা, সংস্কৃতির মধ্যে দিয়ে হাঁটা, মানুষের স্মৃতি, অভ্যাস, ওয়ার্ল্ডভিউর মধ্যে দিয়ে হাঁটা। এই হাঁটা কখনো স্থির না; সবসময় একটু অনিশ্চয়তা থাকে, একটু টলোমলো ভাব থাকে।
কিন্তু সম্ভবত এই টলোমলো ভাব-ই অনুবাদের প্রাণ।
আলোচ্য বইটার সীমাবদ্ধতাও আছে। সার্লস মূলত সাহিত্যিক অনুবাদ নিয়ে ভাবেন। কিন্তু ধর্মতাত্ত্বিক বা দার্শনিক পাঠের অনুবাদ আরও কঠিন জিনিস। যেমন, আরবি থেকে কুরআনের অনুবাদ, বা ইবন আরাবির মতো লেখকের কাজ ট্রান্সলেট করা - এগুলো শুধু ভাষার মামলা না। এখানে জ্ঞানকান্ডও জড়িত। একটা ধারণা কোন বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যের ভেতর দাঁড়িয়ে আছে, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। অনেক শব্দ আছে যেগুলোর সমকক্ষ শব্দ অন্য ভাষায় আদৌ নেই। ফলে এখানে অনুবাদ মানে শুধু ভাষা বদলানো না; একটা সম্পূর্ণ জ্ঞানতাত্ত্বিক জগতের সঙ্গে কারবার করা।
সার্লস এই জায়গাগুলোতে খুব গভীরে যান নাই। যদিও বইয়ের সুযোগ বিবেচনায় সেটা খুব অন্যায্য ক্রিটিকও না।
তবে একটা জিনিস পরিষ্কার হয়ে যায়: অনুবাদক কোনো অদৃশ্য চাকরের নাম না। তার কাজ শুধু শব্দ বহন করা নয়। তিনি একজন পাঠক। সম্ভবত তার হওয়া উচিত সবচেয়ে মনযোগী ও দায়িত্বশীল পাঠক; একইসাথে সবচেয়ে সৃজনশীলও। কারণ এটা এতক্ষণে পরিষ্কার যে, একটা লেখাকে নতুন ভাষায় জীবিত করা মানে তার সঙ্গে দীর্ঘ, জটিল, কখনো অন্তরঙ্গ একটা সম্পর্ক তৈরি করা।
এই জায়গায় এসে রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলির কথাও মনে পড়ে। ইংরেজি গীতাঞ্জলি বাংলা মূলের অভিজ্ঞতাকে পুরোপুরি পুনরুৎপাদন করে কি না, সেটা নিয়ে বিতর্ক আছে। খুব সম্ভবত করে না। কিন্তু হয়তো সেটা তর্কের বিষয়ও না, বরং ইংরেজি গীতাঞ্জলি নিজেই একটা আলাদা সাহিত্যিক অভিজ্ঞতা হয়ে উঠেছে আলাদা পাঠকের জন্য, আলাদা ভাষার ভেতরে দাঁড়িয়ে।
সার্লস এর মূলকথা এটাই - অনুবাদের কাজ হুবহু আক্ষরিক নকল করা নয়; বরং অন্য ভাষায় আবার নতুনভাবে জীবন্ত হয়ে ওঠা।