তাজমহল ও দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি | আল বাসীর
তাজমহল বিশ্বের সপ্ত আশ্চর্যের অন্যতম স্থাপনা। মুঘল সম্রাট শাহজাহান তার প্রিয়তমা স্ত্রী মুমতাজ মহলের স্মৃতিতে নির্মাণ করেন এ সমাধিটি, যা মুঘল স্থাপত্যশৈলীর শীর্ষতম উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত। শুধু তাই নয়, তাজমহল মানব সভ্যতার ইতিহাসে প্রেমের সর্বাধিক প্রতীকী স্থাপত্যগুলোরও একটি। ভারত তো বটেই, সারা বিশ্বের পর্যটকদের কাছেও এটি এক অত্যন্ত জনপ্রিয় সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক স্মারক; প্রতিদিন প্রায় বিশ থেকে চল্লিশ হাজার দর্শনার্থী তাজমহল পরিদর্শন করে থাকেন এবং ভারতের মোট বিদেশি পর্যটকের প্রায় এক-চতুর্থাংশ আসেন শুধু এটিকে দেখতেই। ভারতের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ (ASI)-এর সুরক্ষিত স্থাপনাগুলোর মধ্যে তাজমহলই সর্বোচ্চ রাজস্ব-উৎপাদক স্থাপনা। গত পাঁচ অর্থবছরে কেবল প্রবেশমূল্যের মাধ্যমে এখান থেকে ভারতের আয় হয়েছে প্রায় ২৯৭ কোটি রুপি। তাজমহলের ক্ষুদ্র প্রতিকৃতি প্রায়শই ভারতের শৈল্পিক ঐতিহ্যের প্রতীক হিসেবে কূটনৈতিক উপহারস্বরূপ বিশ্বনেতাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। এমন একটি স্থাপনা নিয়ে একটি রাষ্ট্রের জনগণের জাতীয়ভাবে গর্ব অনুভব করাটাই স্বাভাবিক।
তবে, ভারতের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিষয়টি অত্যন্ত জটিল রূপ ধারণ করেছে। আর এই জটিলতার মূল কারণ ভারতের কট্টর হিন্দুত্ববাদী সম্প্রদায়, যারা মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতি গণহত্যাকামী মনোভাব পোষণ করে। একটি সম্প্রদায়ের গণহত্যা প্রায়শই তাদের দানবীকরণ, নাম পরিবর্তন এবং ইতিহাস মুছে ফেলার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। ভারতে মুসলমানদের গণহত্যার জন্য প্রকাশ্য আহ্বান অবাধে করা হচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে বহুদিন ধরে অনেকটাই আন্তর্জাতিক দৃষ্টির অগোচরে মুসলমানদের উপর চালানো ‘সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের বিনাশ’ এবং ‘জ্ঞান-ঐতিহ্যের বিনাশ’ বা এপিস্টেমিসাইড আরো প্রকাশ্য ও বেগবান হয়েছে। 'সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের বিনাশ' হলো কোনো সম্প্রদায়, জাতি বা সভ্যতার ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও স্থাপত্যিক সম্পদ ইচ্ছাকৃতভাবে ধ্বংস, লুট, অবমাননা বা পরিবর্তন করা। আর, ‘জ্ঞান-ঐতিহ্যের বিনাশ’ হলো একটি জ্ঞান ব্যবস্থার ধ্বংস, বিলোপ বা অবমূল্যায়ন। জ্ঞানগত অবিচার যা স্থায়ী, পদ্ধতিগত এবং সমষ্টিগতভাবে নির্দিষ্ট জ্ঞানচর্চাকে দমনের একটি সংগঠিত পদ্ধতি হিসেবে কাজ করে। আধিপত্যশীল ক্ষমতা যখন শিক্ষা ও জ্ঞানব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করে, তখন নানা উপায়ে জ্ঞান-ঐতিহ্যের বিনাশ ঘটতে পারে। ফলাফল হয় জ্ঞান ও বুদ্ধিবৃত্তিক কণ্ঠকে রোধ করা বা মুছে ফেলা।
হিন্দুত্ববাদী (hindutva) রাজনৈতিক দর্শনের একটি মূল বিষয় মুসলিম-বিদ্বেষী রাজনীতি এবং এর অংশ হিসেবে মুসলিম সালতানাতগুলোর বিভিন্ন স্থাপনাকে নিশানা বানানো। এটি একইসাথে সাংস্কৃতিক ও জ্ঞান ঐতিহ্যের বিনাশ। এছাড়া বুল্ডোজারের মাধ্যমে মুসলিম বসতিগুলোয় ধ্বংসযজ্ঞ চালানো, ভাগওয়া লাভ ট্র্যাপ, হিজাব-নিকাব বিদ্বেষী ক্যাম্পেইনসহ আরও অনেক ধরনের কার্যকলাপ তো আছেই। তবে এই প্রবন্ধের মূল বিষয় তাজমহলের ইতিহাস, একে নিয়ে উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের মিথ্যাচার আর তাজমহল কেন্দ্রিক রাজনীতি, যা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রভাব ফেলার মত যথেষ্ট শক্তিশালী। ভারতে এই রাজনীতির সূচনা হয় বাবরি মসজিদ ভাঙার মাধ্যমে। বাবরি মসজিদ ধ্বংসের এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভারতীয় জনতা পার্টি (BJP), রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (RSS) এবং অন্যান্য হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো তাদের রাজনীতির একটি কেন্দ্রীয় ভিত্তি নির্মাণ করতে অনেকাংশে সফল হয়েছে। ধর্মীয় পরিচয় ভারতীয় উপমহাদেশে অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং এ সংবেদনশীলতাকে ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে হিন্দুত্ববাদী শক্তি সাধারণ জনমতকে মুসলমানবিরোধী মনোভাবে রূপান্তরিত করার কৌশল নিয়েছে। নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চল ও সামাজিক অবস্থায় এ প্রচেষ্টা উল্লেখযোগ্য সাফল্যও অর্জন করেছে।
এই রাজনৈতিক ও মতাদর্শিক বৈরিতার ধারাবাহিকতায় তাজমহল সাম্প্রতিক সময়ে বিতর্কের প্রধান কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। তাজমহল ধ্বংস করার বাসনা হলো সরাসরি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের বিনাশ এবং এর ইতিহাস বিকৃতি ও মুসলিম পরিচয় অস্বীকার হলো জ্ঞান-ঐতিহ্যের বিনাশকরণের অংশ। তাজমহলকে কেন্দ্র করে অসংখ্য ভ্রান্ত তথ্য, ষড়যন্ত্র-তত্ত্ব ও প্রপাগান্ডা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং রাজনৈতিক আলোচনায় নিয়মিতভাবে প্রচারিত হয়েছে। এসব বক্তব্য বাস্তবে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা উসকে দিয়েছে; কেউ কেউ ঐতিহাসিক সত্য অনুধাবন করতে সক্ষম হলেও, অনেকেই এসব মিথ্যাচারকে ফ্যাক্ট হিসেবে গ্রহণ করেছে। এ প্রপাগান্ডার সাম্প্রতিকতম সংযোজন হিসেবে ২০২৫ সালের ৩১ অক্টোবর মুক্তি পায় 'The Taj Story' নামক একটি চলচ্চিত্র, যা তাজমহল-সংক্রান্ত বিতর্ককে পুনরুজ্জীবিত করার প্রচেষ্টা ছাড়া কিছুই নয়। The Taj Story–র দাবিগুলো বহু বছর আগে খণ্ডিত হয়েছে। মুঘলদের দানব হিসেবে দেখানো, মুসলমানদের কলঙ্কিত করা, এবং রাজনৈতিকভাবে সমাজে বিভাজন তৈরি করা এই চলচ্চিত্রের প্রধান ও একমাত্র উদ্দেশ্য। এটি Kashmir Files, Kerala Story, Bengal Files–এর মতোই উগ্র ডানপন্থী প্রচারণা–নির্ভর সিনেমার মতই আরেকটি সিনেমা।
এই প্রেক্ষাপটে কিছু মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপিত হয়—
তাজমহল কেন উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের মুসলিম-বিরোধিতার প্রতীকী কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে? তাজমহলের প্রকৃত ইতিহাস কী? উপমহাদেশের মুসলমানদের সাংস্কৃতিক ইতিহাস ও পরিচয়ের জন্য তাজমহল রক্ষা করা কতটা গুরুত্বপূর্ণ এবং কেন এই স্থাপনাটি সমসাময়িক ভারতীয় রাজনীতি, এমনকি বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের ভূ-রাজনৈতিক আলোচনাতেও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠতে পারে ?
এই প্রশ্নগুলোর সমন্বিত বিশ্লেষণ বর্তমান দক্ষিণ এশীয় রাজনৈতিক সংস্কৃতি, ঐতিহাসিক বয়ান পুনর্গঠন এবং পরিচয়-রাজনীতির গতিপ্রকৃতি বোঝার জন্য অপরিহার্য।
১৯৬৪ সাল। পুরুষোত্তম নাগেশ ওক নামের একজন ব্যক্তি “The Institute for Rewriting Indian History” নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। সংগঠনের নামের সাথে মিল রেখে তিনি ভারতের ইতিহাস “নতুন করে লেখা”-কে নিজের কাজ হিসেবে নির্ধারণ করেন। সেইসাথে তিনি নিজেকে গর্বের সাথে “ইতিহাসবেত্তা” হিসেবে দাবি করতে শুরু করেন। ওকের মতে, তাজমহল থেকে কুতুব মিনার, ভ্যাটিকান থেকে কা'বা সবই পূর্বে হিন্দু মন্দির ছিল এবং অন্য ধর্মের অনুসারীরা হিন্দুদের এসব মন্দির ভেঙে পরবর্তীতে নিজেদের ধর্মের প্রতীক বসিয়েছে। ওকের কল্পনা এতই বেপরোয়া ছিল যে তিনি দাবী করে বসেন, Christianity এসেছে Krishna Niti থেকে, Vatican এসেছে Vatika থেকে, Rome এসেছে Ram থেকে। তিনি সবচেয়ে বড় যে বিতর্ক সৃষ্টি করেন তাজমহল নিয়ে। ওক কখনো দাবি করেন, তাজমহল ৪র্থ শতাব্দীর মন্দির, আবার কখনো দাবী করেন ১২শ শতাব্দীর মন্দির। এটাই ছিল তাজমহলের উপর হিন্দুত্ববাদের প্রথম থাবা।
ওক তার বই 'Taj Mahal – The True Story'–তে এক আশ্চর্যজনক দাবি তোলেন। তার দাবী অনুযায়ী, 'তাজমহল কখনোই শাহজাহান তৈরি করেন নি।' তার মতে, এই স্থাপনা পূর্ব থেকেই ছিল, যা রাজপুত রাজা প্রথম জয় সিং নির্মাণ করেছিলেন। আর এটি ছিল শিবকে উৎসর্গ করা একটি মন্দির, যার নাম ছিল 'তেজো মহালয়া'। আশ্চর্যের বিষয়, মানুষের কাছে 'তেজো মহালয়া' নামটি প্রথম পরিচিতই হয় তার বই প্রকাশের পর, যা আগে কেউই কখনো শোনে নি। ওকের দাবি অনুযায়ী— সম্রাট শাহজাহান নাকি জায়গাটি দখল করে নেন, মন্দির ভেঙে ফেলেন, বেশ কিছু অংশ চেঁছে ফেলে দেন, চারটি মিনার তৈরি করেন এবং পুরো স্থাপনাটিকে কোরআনের ক্যালিগ্রাফি দিয়ে ঢেকে দেন। এর 'প্রমাণ' হিসেবে ওকে কিছু যুক্তি দেখান—
তাজমহল দক্ষিণমুখী অর্থাৎ, দক্ষিণ দিকে মুখ করে আছে, যা হিন্দু মন্দিরের একটি বৈশিষ্ট্য।
গম্বুজ দেখতে কলসের ন্যায়, আর উপরের বিদ্যমান অংশ ত্রিশূলের ন্যায়।
ভেতরের নকশা 'অষ্ট-ভদ্র' প্যাটার্নের।
এছাড়াও ওক খোলামেলা দাবী করে বসেন যে, তাজমহলের ২২টি বন্ধ ঘরে নাকি অবশ্যই 'শিবলিঙ্গ' আছে। হাস্যকর ব্যাপার, এই সব কিছুর জন্য তার কাছে না ছিল কোনো যৌক্তিক প্রমাণ, না কোনো নথি বা রেকর্ড, না কোনো শিলালিপি — একদম কিছুই ছিল না। তিনি নিজের মতো করে ডট মিলিয়ে একটি পুরো প্রপাগান্ডা–গল্প বানিয়ে ফেলে।
ওক চেয়েছিলেন, তার দাবি সরকারিভাবে স্বীকৃতি পাক। তাই তিনি সরাসরি এলাহাবাদ হাইকোর্টে যায়; এমনকি সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্তও যান — লক্ষ্য ছিল তাজমহলকে সরকারি ভাবে হিন্দু মন্দির হিসেবে ঘোষণা করা এবং 'তেজো মহালয়া' হিসেবে পুনরুদ্ধার করা। কিন্তু যখন বিচারপতি এস.পি. বারুছা এবং বিচারপতি রোমা ওক-এর কাগজপত্র দেখেন, তারা এটিকে কল্পকাহিনীর চেয়ে বেশি কিছু মনে করেননি। কোর্ট এই মামলাকে সরাসরি মিসকনসিসিভড বলে খারিজ করে দেয়। এর কিছু বছর পর, ২০০৭ সালে ওক মারা যান।
এই পর্যায়ে সকলে ভাবে যে ওক-এর এই থিওরি এখানেই শেষ। কিন্তু না, এরপরে এটাকে টেনেহিঁচড়ে আরও বড় করা হয়। ওকের অবাস্তব ধারণা বইয়ের পাতা থেকে বেরিয়ে ওয়াটসঅ্যাপ, টেলিভিশন টকশো এবং র্যালিতে প্রবেশ করে। তার পুরনো পিটিশন ভবিষ্যতের পিটিশনগুলোর জন্য এক ধরনের বেঞ্চমার্ক হয়ে ওঠে এবং এরপর আরও অনেক পিটিশন উঠতে থাকে যেন তাজমহলকে 'তেজো মহালয়া' হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। হিন্দুত্ববাদীদের কাছে ওক হয়ে যান এমন একজন, যিনি 'হিন্দু্ত্ববাদের জন্য ইতিহাসের নায়ক হিসেবে লড়েছে', আর হয়ে যান একটি তথাকথিত হারিয়ে যাওয়া মন্দিরের রক্ষক।
এখন আসা যাক বাস্তব ইতিহাসে। তাজমহল যে জমিনে দাঁড়িয়ে আছে, তার আগে সেখানে কি ছিল এবং কীভাবে তাজমহলের ধারণা এলো। আরজুমান্দ বানু বেগম, যিনি সারা দুনিয়ায় 'মুমতাজ মহল' নামে সুপরিচিত, ছিলেন মুঘল সম্রাট মির্জা শাহাবুদ্দিন মুহাম্মাদ খুররাম শাহজাহানের দ্বিতীয় স্ত্রী। তাদের বাগদান হয় ১৬০৭ সালে এবং পাঁচ বছর পর ১৬১২ সালে বিয়ে সম্পন্ন হয়। তিনি শুধু সম্রাটের একজন বেগম ছিলেন না, তিনি ছিলেন ঘনিষ্ঠ সঙ্গী, এতো ঘনিষ্ঠ যাঁকে শাহজাহান যুদ্ধেও সঙ্গে নিয়ে যেতেন। তাঁদের ১৪ জন সন্তান হয়। কিন্তু মুমতাজ ১৬৩১ সালের ১৭ জুন প্রসবকালীন জটিলতার কারণে মারা যান। শাহজাহানের পুরো দুনিয়া যেন ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। সম্রাট এতে এত বেশি কষ্ট পেয়েছিলেন যে তিনি এক বছর সম্পূর্ণ নির্জনে চলে যান এবং তাঁর রাজ দরবার প্রায় দুই বছরের জন্য বন্ধ রাখেন। এরপর তিনি এমন কিছু বানানোর কথা ভাবলেন, যা এই দুনিয়ার কোন সৃষ্টির চোখ কখনো দেখেনি—একটি মাক্ববারা, যা সম্রাটের ভালোবাসাকে অমর করে তুলবে।1
মাক্ববারা বানানোর জন্য তার একটি জমির প্রয়োজন ছিল, যা নদীর পার্শ্ববর্তী তীরে অবস্থিত। শাহজাহান আগ্রার যমুনা নদীর পাশে অবস্থিত একটি জমিকে পছন্দ করলেন। তবে, এই জমিটি ফাঁকা ছিল না, এটি ছিল রাজপুত কাচ্ছওয়া পরিবারের রাজা মান সিং-এর, যিনি মুঘল সম্রাট আকবরের অধীনে সম্মানিত সেনাপতি ছিলেন। মান সিং-এর ফুফু হারকাবাইয়ের সাথে আকবরের বিবাহ হয়। এখানেই আসে জয় সিং-এর ভূমিকা। রাজা মান সিং-এর দৌহিত্র জয় সিং থেকে শাহজাহান জমি কিনলেন। কারণ এটি যমুনা নদীর পাশে অবস্থিত। ওক-এর তত্ত্ব মতে, জয় সিং এবং শাহজাহানের সম্পর্ক ছিল সাঁপে-নেউলে। কিন্তু বাস্তবে শুধু রাজনৈতিক মিত্রতার নয়, তাদের রক্ত এবং বিয়ের সম্পর্কও চলে আসছিল সেই আকবরের সময় থেকে।
আর ‘পাদশাহনামা’—শাহজাহানের সরকারি দরবারি নথি অনুযায়ী, জয়সিং স্বেচ্ছায় জমিটি শাহজাহানের প্রকল্পের জন্য দিয়ে দেন, যার বিনিময়ে ২৮ ডিসেম্বর ১৬৩৩-এ শাহজাহান তাঁকে আগ্রায় চারটি হাভেলি উপহার দেন।2 এটি তাঁদের মধ্যে একটি চুক্তি ছিল। শাহজাহান এই জমিটি চুরি বা ডাকাতি করেন নি। তাঁরা এই চুক্তি যে নথিতে লিপিবদ্ধ করে স্বাক্ষর করেছিলেন, সেই নথি আজও 'জয়পুর প্যালেস আর্কাইভস'-এ রয়েছে। কেউ চাইলেই সেটা দেখে আসতে পারে। নথিটিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে যে, আজ যেখানে তাজমহল দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে আগে একটি হাভেলি (রাজকীয় বাড়ি) ছিল, মন্দির নয়। তাই, তাজমহল প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে না কোনো মন্দির ধ্বংস করা হয়েছে আর না কোনো প্রতিমা ধ্বংস করা হয়েছে। ওক-এর দাবীর সঙ্গে বাস্তবতার বিন্দুমাত্রও মিল নেই। ওক আরো দাবী করেন, সেখানে একটি শিলালিপি ছিল এবং 'তাজমহল একসময় শ্বেত শিব মন্দির ছিল'। শাহজাহান নাকি সেই শিলালিপি চুরি করে লখনৌ-এর জাদুঘরে লুকিয়েছেন। মজার ব্যাপার, লখনৌ যাদুঘরে শিলালিপি আসলেই আছে। কিন্তু তা তাজমহল থেকে নয়, বাটেশ্বর থেকে এসেছে, যা তাজমহল থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে। নথি থেকে দেখা যায়, এই শিলালিপি তারিখ অনুযায়ী ১১৯৫ খ্রিষ্টাব্দের, ওক যে শিলালিপির তারিখ হিসেবে ১১৫৫ খ্রিষ্টাব্দ উল্লেখ করেছিলেন তা ভুল। আর এই শিলালিপি নিয়ে লেখা হয়েছে যে, এটি রাজা পারমার্দি দেব নামে অন্য একটি শাসকের সময় নির্মিত মন্দিরের। অর্থাৎ, এটি অন্য সময়, অন্য রাজ্য, অন্য গল্পের সঙ্গে সম্পর্কিত।3 মোট কথা, ওক-এর তথ্যে দেয়া তারিখ ভুল, অবস্থান ভুল, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ— পুরো সংযোগটাই ভুল ছিল।
শাহজাহানের তাজমহল নির্মাণ
তাজমহল নির্মাণ শুরু হয় ১৬৩২ সালে, এবং পুরো স্থাপত্যকর্ম সম্পূর্ণ হতে লাগে ২২ বছর। ১৬৪৩ সালে মূল সমাধি (Main tomb) নির্মাণ শেষ হয়, আর পুরো কমপ্লেক্স—বাগান, মসজিদ ও অতিথিশালার কাজ শেষ হয় ১৬৫৩ সালে। এই বিশাল প্রকল্পের প্রধান স্থপতি ছিলেন উস্তাদ আহমদ লাহোরি। ওনার উপাধি ছিল 'নাদির-এ-আসর' যার অর্থ 'জামানার বিস্ময়'। তিনিই শাহজাহানের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেন। তাঁর নেতৃত্বে কাজ করেন প্রায় ২০,০০০-২২,০০০ শ্রমিক, যাদের মধ্যে ছিলেন রাজমিস্ত্রি, পাথর খোদাইকারী, ইনলে শিল্পী ও ক্যালিগ্রাফার—যারা এসেছিলেন পারস্য, তুরস্ক, মধ্য এশিয়া এবং ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে। তাজমহলের অপূর্ব শিলালিপি ও সাদা মার্বেলে ক্যালিগ্রাফির প্যানেলগুলোর নকশা নির্বাচন ও তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল আবদুল হক শিরাজীকে, যিনি পরে ‘আমানাত খান’ উপাধিতে ভূষিত হন। তাজমহলের কেন্দ্রীয় সমাধি–কক্ষে থাকা ক্যালিগ্রাফিক প্যানেলগুলোতেও আমানাত খানের স্বাক্ষর অঙ্কিত রয়েছে। তাজমহল নির্মাণের জন্য ব্যবহৃত মূল্যবান পাথর ও উপাদান আনা হয়েছিল বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে। যেমন— রাজস্থানের মাকরানা থেকে সাদা মার্বেল পাথর, তিব্বত থেকে ফিরোজা পাথর, আফগানিস্তান থেকে লাজওয়ার্দ (Lapis lazuli) পাথর, চীন থেকে জেড পাথর, শ্রীলঙ্কা থেকে নীলা পাথর। এই সব ভারী পাথর আনার জন্য ব্যবহার করা হয় এক হাজারেরও বেশি হাতি।4 নির্মাণব্যয় এত বিশাল ছিল যে তা মুঘল কোষাগারকে নাড়িয়ে দেয়। প্রচলিত আছে এ কারণে সাম্রাজ্যের অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়ায় শাহজাহানের ছেলে আওরঙ্গজেব পিতার ওপর ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। যদিও এর কোনো নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক রেকর্ড পাওয়া যায় না।5
তাজমহলের স্থাপত্যশৈলী খাঁটি মুঘল ধাঁচের, যেখানে মিলেমিশে আছে পারস্য, ভারতীয় ও তুর্কি নকশার প্রভাব। এই মিশ্র ধারাকে বলা হয় ইন্দো-ইসলামিক স্থাপত্য। ইউনেস্কো ১৯৮৩ সালে তাজমহলকে অভিহিত করে ইন্দো-ইসলামিক স্থাপত্য ঐতিহ্যের সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি হিসেবে।6 এসব মৌলিক ইতিহাস হলেও ওক-এর তত্ত্ব ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। তিনি দাবি করেছিলেন— তাজমহলের অষ্টভুজ কক্ষ গম্বুজের ওপরের পদ্ম, চারবাগ বাগান আর ধাতব চূড়া—সবই নাকি 'হিন্দু স্থাপত্যের নকশার প্রমাণ'। কিন্তু আসলে এগুলোর কোনোটাই তার দাবিকে সমর্থন করে না। তার দাবিগুলো একে একে খণ্ডন করা যাক। মুঘল স্থাপত্যের একজন শীর্ষ গবেষক এব্বা কচ, যিনি তাজমহল নিয়ে ৩০ বছর গবেষণা করেছেন, স্পষ্টভাবে লিখেছেন — তাজমহলের প্রতিটি উপাদানই মুঘল নির্মাণশৈলীর পরিষ্কার পরিচয় বহন করে। তাঁর ৩২০ পৃষ্ঠার গবেষণাগ্রন্থ 'The Complete Taj Mahal'-এ এসবের বিস্তারিত প্রমাণ রয়েছে। কচ তাজমহলের স্থাপত্যের বিভিন্ন দিকের প্রতীকায়ন নিয়ে বলেন:
অষ্টভুজ কক্ষ ইসলামে জান্নাতের প্রতীক। এর মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে যে মুমতাজের রূহ জান্নাতে বিশ্রাম করছে।
গম্বুজের ওপরের পদ্ম মোটেই কোনো হিন্দু প্রতীক নয়; এটি নেওয়া হয়েছে হুমায়ূনের সমাধি এবং ইতোমাদ-উদ-দৌলার সমাধির নকশা থেকে—যেগুলো তাজমহলের অনেক আগেই মুঘলরা নির্মাণ করেছিল।
আর ওক যেটাকে 'ত্রিশূল' বলেছিলেন, তা আসলে ত্রিশূল নয়—এটি অর্ধচন্দ্র(Crescent) ও চূড়া, যা ইসলামী স্থাপত্যে গম্বুজের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য।7
স্থাপত্য ইতিহাসবিদ গাইলস টিলস্টন ওক-এর তত্ত্বকে সবচেয়ে সুন্দরভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। তিনি এটিকে বলেছেন একটি বিস্ময়কর ধরনের ভুয়া-গবেষণা, সহজ ভাষায় — অন্ধ দেশপ্রেমের মোড়কে সাজানো কল্পবিজ্ঞান। তিনি আরও বলেন, তাজমহল নির্মাণে ব্যবহৃত কারিগরি ও প্রযুক্তিগুলো প্রাচীন ভারতে ছিলই না; এগুলো মুঘলরাই প্রথম ১৬ ও ১৭ শতকে বিকশিত করেছিল। কিন্তু এত শক্তিশালী ও নির্ভুল প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও ওক-এর অনুসারী এবং কিছু হিন্দুত্ববাদী নেতাকর্মী তাদের দাবি আঁকড়ে ধরে থাকে।8
২২টি সিল করা দরজার পেছনে কী আছে?
রাজনিশ সিং নামে একজন বিজেপি নেতা এলাহাবাদ হাইকোর্টে একটি পিটিশন দাখিল করে। তিনি দাবী করেন, তাজমহলের নিচের যে ২২টি ঘর বন্ধ আছে, সেগুলো খুলে দেখা হোক। কারণ সেখানে নাকি তাজমহল যে একসময় একটি হিন্দু মন্দির ছিল তার প্রমাণ লুকানো থাকতে পারে। কিন্তু শুনানির তিন দিন পূর্বেই আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া (ASI) বিষয়টিতে হস্তক্ষেপ করে। তারা সেই আন্ডারগ্রাউন্ড ঘরগুলোর ছবি প্রকাশ করে দেয়। আর ছবি দেখে হিন্দুত্ববাদী এক্টিভিস্টরা হতবাক হয়ে পড়ে। কারণ, এতদিন ধরে তাদের মাথায় ছিল—ভেতরে শিবলিঙ্গ থাকবে, মূর্তি থাকবে, পুরনো মন্দিরের খোদাই থাকবে। কিন্তু ছবিতে দেখা গেল এগুলোর কিছুই নেই। শুধু সাদামাটা বালুকাপাথরের দেয়াল, সাধারণ খিলান আর খালি ফাঁকা ঘর। ব্যস এইটুকুই। আর এরপরই আদালত সঙ্গে সঙ্গে পিটিশন খারিজ করে দেয়। এমনকি প্রধান বিচারক বিজেপি নেতা রাজনিশ সিং কে সতর্ক করে বলেন, পুনরায় যেন PIL (Public Interest Litigation) ব্যবস্থার সঙ্গে এমন ‘ঠাট্টা’ না করা হয়।
তবুও একটা প্রশ্ন ভেসে বেড়াতে থাকে, যদি ভেতরে কিছুই না থাকে, তাহলে সেগুলো সিল করে রাখা হয় কেন? এর উত্তর দেয়ার আগে জানতে হবে এই ২২টি ঘর আসলে কী। প্রথমত, এগুলো কেবলমাত্র ঘর নয়। তাজমহল একটি বিশাল স্থাপনা যার ভর প্রায় ৫৮,০০০ টন। এত ভর ধরে রাখতে শাহজাহানের প্রকৌশলীরা ১৭ মিটার গভীর ফাউন্ডেশন বানান, আর তার উপরে একটি উঁচু প্ল্যাটফর্ম তৈরী করেন, যাকে প্লিন্থ(Plinth) বলা হয়। সেই প্লিন্থের ভিতরে তারা ২২টি আন্ডারগ্রাউন্ড করিডর বানান। এগুলোর উদ্দেশ্য ছিল পুরো স্থাপত্যের ওজন ভারসাম্য বজায় রাখা, বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা রাখা এবং আর্দ্রতা থেকে মার্বেল পাথরকে রক্ষার করা। সহজ ভাষায় এগুলো কোনো 'রহস্যের ঘর' নয়। এগুলো রক্ষণাবেক্ষণের টানেল-মেইনটেন্যান্স স্পেস। আর এগুলো চিরদিন বন্ধও থাকে না। ASI-এর কর্মীরা নিয়মিতই ভেতরে ঢোকেন দেয়ালের ফাটল মেরামত করতে, আবার প্লাস্টার করতে, ক্ষতি থেকে স্থাপনাটিকে বাঁচাতে।
ASI এর তথ্যমতে, সিল করা জায়গা শুধু ২২টি নয়, তাজমহলের পুরো কমপ্লেক্সে ১০০টিরও বেশি ঘর ও চেম্বার সিল করা আছে—বেজমেন্টে, উপরের তলায়, মিনারগুলোর ভেতরে, এমনকি মসজিদের পাশেও। কেন সিল করা? কারণ খুব সহজ—এগুলো পর্যটকদের জন্য তৈরিই করা হয়নি। এগুলো ছিল কাঠামোর শক্তি বাড়ানোর জন্য, জনসাধারণের জন্য নয়। এগুলো খুলে দিলে উল্টো ক্ষতি হতে পারে। এছাড়াও বেজমেন্টে ঘর থাকা মুঘল স্থাপত্যের জন্য কোনো নতুন জিনিস নয়—হুমায়ুনের মাক্ববারা, সাফদার জাংসহ আরো বহু মুঘল স্থাপত্যে এমন ঘরের সন্ধান পাওয়া গেছে। আর তাজমহলে ইতিমধ্যেই প্রতি বছর লাখ লাখ পর্যটক আসে। সব মানুষকে যদি সরু আন্ডারগ্রাউন্ড করিডরে ঢুকতে দেয়া হয়, সেটা বিপর্যয় ডেকে আনবে।
আরেকটি বিতর্ক উঠানোর চেষ্টা করা হয় একটি কার্বন ডেটিং-কে কেন্দ্র করে। নিউ ইয়র্কের প্র্যাট স্কুল অব আর্কিটেকচারের প্রফেসর মারভিন মিলস তাজমহলের নদীপাড়ের দিকের দরজার একটি কাঠের নমুনা নিয়ে কার্বন-১৪ ডেটিং পরীক্ষা করেছিলেন। কার্বন ডেটিং হলো এমন একটি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি যা উদ্ভিদ, গাছপালা বা প্রাণীর মতো জৈব উপাদানের বয়স নির্ণয় করতে ব্যবহৃত হয়। ওকের বক্তব্য ছিল—মিলস যে ছোট কাঠের টুকরা সংগ্রহ করেছিলেন, তার পরীক্ষার ফলে দেখা গেছে কাঠটি শাহজাহানের আমলের চেয়ে আরো ৩০০ বছর আগের। কিন্তু বাস্তবে প্রফেসর মিলস নিজেই এক সাক্ষাৎকারে পরিষ্কার করে বলেছেন, তিনি যদিও নমুনা নিয়েছিলেন, তার ফল একেবারেই নিশ্চিত বা চূড়ান্ত ছিল না। এ বিষয়ে প্রফেসর মিলসের নোক্তাগুলো ছিল—
কাঠের মতো জৈব উপাদানে কার্বন ডেটিং কেবল এটা বলে যে, গাছটি কখন কাটা হয়েছিল, এটি বলে না যে সেই কাঠ কখন নির্মাণকাজে ব্যবহার করা হয়েছে।
একটি মাত্র নমুনা কখনোই সঠিক বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত দেওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়।
গাছের কোন অংশ থেকে নমুনা নেওয়া হয়েছে, তার ওপর ভিত্তি করেও ফলাফল ভিন্ন হতে পারে। ভেতরের অংশ থেকে নমুনা নিলে তা বাইরের অংশের তুলনায় ১০০ বা তারও বেশি বছর পুরোনো দেখাতে পারে।
নমুনায় অল্প পরিমাণ দূষণ পুরো ফলাফলকে ভুল পথে নিতে পারে।
তার নিজের ভাষায়, তিনি এই পরীক্ষাকে বলেছেন 'caveats & warnings'—অর্থাৎ সতর্কতা ও শর্তযুক্ত একটি পরীক্ষা। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, এটি কোনো সরকারি গবেষণা নয়, তিনি কোনো রিপোর্ট জমা দেননি এবং এটি কোথাও প্রকাশও করেননি। এটি ছিল কেবল তার ব্যক্তিগত গবেষণা।9
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যে কাঠ তিনি পরীক্ষা করেছিলেন, সেটি মূল দরজার কাঠ না-ও হতে পারে। তাজমহলের দরজার মতো অংশগুলো মেরামত ও প্রতিস্থাপন করা তখন খুবই স্বাভাবিক বিষয় ছিল। এমনকি ১৬৫২ সালের আওরঙ্গজেবের চিঠিতেও উল্লেখ আছে যে, তাজমহলের উপরের কিছু অংশ তখন এতটাই পুরোনো হয়ে গিয়েছিল যে শাহজাহানের জীবদ্দশাতেই সেগুলোর মেরামত ও পরিবর্তন দরকার হয়ে পড়েছিল।10 অর্থাৎ, একটি অনিশ্চিত, একক, অপূর্ণ গবেষণার ওপর ভিত্তি করে ওক-এর দাবি বৈজ্ঞানিক ও ঐতিহাসিক—কোনো দিক দিয়েই গ্রহণযোগ্য নয়।
কেন ওকের তত্ত্ব এখনও প্রাসঙ্গিক?
যা একসময় ছিল একটি ‘তত্ত্ব’, তা দ্রুতই একটি পরিচয়ের লড়াইয়ে রূপ নিল — ইতিহাস রক্ষা নয়, বরং ইতিহাস সংজ্ঞায়িত করার লড়াইয়ে পরিণত হল। ভারতের তৎকালীন সংস্কৃতি মন্ত্রী মহেশ শর্মা পর্যন্ত স্বীকার করেছিলেন যে, তাজমহলের নিচে কোনো হিন্দু মন্দির থাকার দাবিকে সমর্থন করার মতো প্রমাণ সরকার খুঁজে পায়নি। তবুও ২০২২ সালে আবার সেই ২২টি সিল করা ঘর খোলার দাবি উঠলো। তাহলে কি সত্যিই সত্যের সন্ধান ছিল উদ্দেশ্য নাকি তা ছিল কেবলই রাজনীতির দাবার বোর্ডে আরেকটি চাল?11
২০১৭ সালে যোগী আদিত্যনাথ সরকারের অধীনে উত্তর প্রদেশ পর্যটন দফতর নতুন একটি বুকলেট প্রকাশ করে। সেখানে রাজ্যের সব হিন্দু ও বৌদ্ধ ঐতিহ্যবাহী স্থানের নাম গর্ব করে তালিকাভুক্ত করা হয়, কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে তাজমহল সেই তালিকা থেকে উধাও। এর কিছুদিন পরই বিজেপি সাংসদ বিনয় কাটিয়ার টেলিভিশনে দাবি করেন, 'তাজমহল নির্মিত হয়েছে তেজো মহালয়া নামের একটি হিন্দু মন্দির ধ্বংস করে।' অন্য নেতা সঙ্গীত সোম আবার তাজমহলকে 'ভারতীয় সংস্কৃতির কালিমা, বিশ্বাসঘাতকদের নির্মাণ' বলে আখ্যা দেয়।12
এতক্ষণে যাদের মনে হচ্ছে আর্কিয়োলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া (ASI) খুব নিরপেক্ষ একটা সংগঠন, তাদের জানা প্রয়োজন যে, ASI ২০১৮ সালে তাজমহল কমপ্লেক্সের ভেতরের মসজিদে মুসলমানদের নামাজ আদায়ের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। বলা হয়, এখন থেকে শুধু শুক্রবারেই নামাজ পড়া যাবে, তাও আবার শুধুমাত্র আগ্রার স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য। অন্য কোনো দিন কেউ সেখানে নামাজ আদায় করতে পারবে না। এমনকি অজুর পানির ট্যাঙ্কও ASI কর্মকর্তারা তালাবদ্ধ করে দেন। ASI জানায়, এই সিদ্ধান্ত সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী নেওয়া হয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট আগে বলেছিল, তাজমহল একটি গুরুত্বপূর্ণ বিশ্ব ঐতিহ্য ও সপ্ত আশ্চর্যের অন্যতম হওয়ায় এর সংরক্ষণ জরুরি, এবং সাধারণ নামাজের জন্য শহরের অন্যান্য মসজিদই যথেষ্ট। তাজমহল শুক্রবার সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য বন্ধ থাকে, এবং তখন স্থানীয়রা পরিচয়পত্র দেখিয়ে দুপুর ১২টা থেকে ২টার মধ্যে জুমার নামাজ আদায় করতে পারেন। তাজমহল মসজিদ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি সৈয়দ ইব্রাহিম হুসাইন জাইদি এই সিদ্ধান্তকে 'অবৈধ', 'অযৌক্তিক' ও 'মুসলিমবিদ্বেষী' বলে উল্লেখ করেন এবং এটিকে সরকারের পক্ষপাতমূলক মনোভাবের প্রতিফলন বলে দাবি করেন। তাহলে এমন সিদ্ধান্ত কেন নেওয়া হল যার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই? তো ASI যদি বিন্দুমাত্রও প্রমাণও খুঁজে পায় মন্দিরের পক্ষে, তাহলে যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাই ঘটতে পারে, যেমনটা ASI বাবরি মসজিদ এর ক্ষেত্রে করেছিল।13 এ পর্যায়ে বিতর্ক আর কোনো স্থাপত্যকে ঘিরে ছিল না। তা পরিণত হয়েছিল— ভারতীয় সংস্কৃতি আসলে কার, এবং কে তা সংজ্ঞায়িত করবে— সেই প্রশ্নে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, তাজমহল তো ভারতে, তাহলে এটি বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সঙ্গে কীভাবে সম্পর্কযুক্ত? সহজ কথায় এর উত্তর হচ্ছে—ভারতের বর্তমান সরকার যে 'অখণ্ড ভারত' নীতি নিয়ে কথা বলে, সেটির কারণে। 'অখণ্ড ভারত' হলো আরএসএস (RSS) এবং তার রাজনৈতিক শাখা বিজেপিসহ ভারতের দক্ষিণপন্থী কিছু হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের বহুল প্রচারিত ধারণা। এটি মূলত ভারতের হিন্দুত্ববাদীদের সম্প্রসারণবাদী রাজনীতির একটি প্রকল্প। তাদের 'অখণ্ড ভারত'-এর মধ্যে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও ভুটানকে ধরা হয়।
আর এই অখণ্ড ভারত গড়ার সক্ষমতা দেখাতেই বিজেপি ও আরএসএস-এর মতো দলগুলো বাবরি মসজিদ, তাজমহল, কুতুব মিনার ও শাম্ভাল মসজিদের মতো মুঘল ও মুসলিম স্থাপনাগুলো ধ্বংস করতে চায়। এসব প্রচারণার পিছনে বিজেপির কোন যুক্তি দেখাতে না পারলেও ভারতের একটি বড় অংশের জনগণকে এগুলোতে বিশ্বাস করাতে পারাটা বিজেপির একটি বড় রাজনৈতিক সাফল্য। তারা ভারতের একটি বড় জনগোষ্ঠীকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছে যে, তারাই হিন্দুদের একমাত্র ত্রাতা বা ‘মাসিহা’। ইতোমধ্যেই বাবরি মসজিদ ভেঙে রাম মন্দির তৈরি করাকে বিজেপি নিজের একটি বড় রাজনৈতিক অর্জন হিসেবে চিত্রায়িত করতে সক্ষম হয়েছে।
আর যদি কখনো বিজেপি তাজমহলকে 'তেজো মহালয়া' নামক কাল্পনিক মন্দিরে রূপান্তর করতে পারে, এর পর বিজেপির যোগ্যতা নিয়ে হিন্দুত্ববাদীদের আর কোনো প্রশ্ন থাকবে না। এর ফলে ভারতীয় মুসলিম ও শিক্ষিত হিন্দু সেক্যুলার সমাজের ভারতের রাজনীতিতে তেমন কোনো প্রভাবও থাকবে না। যদি এত বড় একটি অযৌক্তিক প্রপাগান্ডা ছড়িয়ে তাজমহলের মতো স্থাপনাও ভেঙে ফেলা যায়, তার মানে দাঁড়াবে—বিজেপি সামনে যেকোনো মুঘল বা মুসলিম স্থাপনা ভাঙার পথে এগোতে পারবে। তখন মুসলিম ও সেক্যুলার হিন্দুদের সেটা ঠেকানোর প্রায় কোনো শক্তি থাকবে না।
এবং এরপর ভারত খুব সহজেই অখণ্ড ভারত গঠনের দিকে মনোযোগ দিতে পারবে। বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোতে আগ্রাসন শুরু করবে তাদের অখণ্ড ভারতের স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে। এ উদ্দেশ্যে ভারত এই দুই রাষ্ট্রে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করার চেষ্টা করবে। বাংলাদেশে ভারতের বৃহত্তম ‘প্রক্সি’ দল আওয়ামী লীগের মাধ্যমে বাংলাদেশের মুসলমানদের ওপর দমননীতির প্রয়োগ করে মোদি সরকার দেখিয়েছে—বাংলাদেশে তাদের অনুগত সরকার থাকলে ভারত আরও কী করতে পারে। একই ধরনের কাজ ভারত পাকিস্তানেও করার চেষ্টা করবে। এই দুই দেশে যদি তারা সফল হয়, তাহলে বাকিদের নিয়ন্ত্রণে নিতে ভারতের তেমন আর কসরত করতে হবে না। তাজমহল ইস্যুতে ভারতে হিন্দুত্ববাদ সফল হয় কিনা তা এটার ইঙ্গিতবাহী যে, ভারতীয় উপমহাদেশে কার রাজনৈতিক শক্তি টিকে থাকবে এবং কার রাজনৈতিক শক্তি বিলুপ্তির দিকে আগাবে।
ফুটনোট