ডায়েটের সেকাল-একাল
প্রায় চারশো কোটি বছর আগে প্রাণের সূচনা থেকেই প্রতিটি প্রাণীর প্রধানতম কাজ ছিল যথেষ্ট খাবার জোগাড় করে শক্তি ও পুষ্টি নিশ্চিত করা, যাতে সে তার বংশধর রেখে যেতে পারে। জীবনের মূল সমীকরণটি এ রকমই–শরীরকে খাবার দাও আর বিনিময়ে আরেকটি নতুন শরীর তৈরি করো। খাবারই হলো মানবশরীর পরিচালনার একমাত্র কাঁচামাল, যা সরাসরি আমাদের জৈবিক সিস্টেমে প্রবেশ করে। একজন মানুষ হিসেবে আপনার আচরণ কেমন হবে, আপনার চিন্তাধারা কতটা প্রখর হবে, আপনি জিনগতভাবে কতটুকু সামর্থ্যবান হবেন কিংবা আপনার ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কতটা সবলভাবে বেড়ে উঠবে–তার সিংহভাগই নির্ভর করে আপনি যা খান তার ওপর।
হিউম্যান ডায়েটের উৎপত্তি
প্রায় সাত কোটি বছর আগে কাঠবিড়ালির মতো দেখতে যে প্রাইমেটরা ছিল, তারা মূলত ছিল নিরামিষাশী। ফল, বাদাম, বেরি আর পাতা খেয়েই তাদের দিন কাটত। কিন্তু আজ থেকে প্রায় দুই কোটি বছর আগে বৃষ্টি কমতে শুরু করে এবং দেখা দেয় তীব্র খরা। বন ছোট হয়ে আসায় তার জায়গা দখল করে নেয় খোলা তৃণভূমি। এই সময়ই বিবর্তনের ধারায় আবির্ভাব ঘটে অস্ট্রালোপিথেকাস আফ্রিকানাস-এর, যার অর্থ 'দক্ষিণের বানর'। টিকে থাকার তাগিদে তাকে ফলমূলের জীবন ছেড়ে মৃত প্রাণীর মাংস কুড়িয়ে ও শিকার করে খেতে হলো। ধীরে ধীরে তার দাঁত ও চোয়ালের গড়নও মাংসাশী প্রাণীর মতো হয়ে উঠল। তবে অন্যান্য শিকারী প্রাণীর মতো তাদের ধারালো নখ বা দাঁত ছিল না; কিন্তু সোজা হয়ে হাঁটতে পারার কারণে তাদের হাত দুটি ফাঁকা থাকত। ফলে তারা অস্ত্র ব্যবহার করতে শুরু করে–প্রথমে হাড়, পরে পাথর এবং আরও পরে পাথরের কুড়াল।
কমপক্ষে বিশ লাখ বছর ধরে আমাদের পূর্বপুরুষেরা মূলত মাংসাশী ছিলেন। তাঁদের প্রিয় খাবার ছিল মাংস, মগজ ও কলিজা। শিকার ও সংগ্রহের মাধ্যমেই তারা জীবিকা নির্বাহ করতেন। মাংস, মাছ, বুনো ফল এবং উদ্ভিজ্জ খাবারই ছিল তাদের মূল ভরসা।
অবশ্য খাঁটি মাংসাশী প্রাণীদের তুলনায় তাঁদের একটি বড় সুবিধা ছিল–তারা নিরামিষও খেতে পারতেন। শিকার না পেলে বাদাম, বেরি, পাতা ও উদ্ভিজ্জ মূল খেয়ে তারা টিকে থাকতেন। পুষ্টির বিচারে সেই খাবারে প্রোটিন ছিল বেশি, চর্বি মাঝারি এবং শর্করা ছিল বেশ কম। যেটুকু শর্করা মিলত, তার সিংহভাগ আসত মিষ্টি ফল থেকে; কারণ পাতা বা মূল সুস্বাদু না হলেও প্রয়োজনের তাগিদেই তা খাওয়া হতো।
এরপর এল মানব ইতিহাসের প্রথম খাদ্য বিপ্লব। আজ থেকে প্রায় দশ হাজার বছর আগে মানুষ নিজেই নিজের খাদ্য উৎপাদন শুরু করে, যা বিশ লাখ বছরের শিকারী ইতিহাসের তুলনায় এই তো সেদিনের ঘটনা। কৃষি মূলত বিশ্বের তিনটি অঞ্চলে স্বাধীনভাবে শুরু হয়েছিল। প্রথমত, প্রায় দশ হাজার বছর আগে ‘উর্বর অর্ধচন্দ্র’ অঞ্চলে (বর্তমান ইসরায়েল, জর্ডান, সিরিয়া, তুরস্ক ও ইরান)। সেখানে গম, যব, ডাল ও মটর চাষ করা হতো এবং গরু, ভেড়া ও ছাগল পোষ মানানো শুরু হয়। এরপর প্রায় সাত হাজার বছর আগে চীনে শুরু হয় ধান, সয়াবিন, রাঙা আলু জাতীয় মূল এবং শূকরের চাষ। সবার শেষে কৃষি আসে মধ্য আমেরিকায়, যেখানে ভুট্টা ও শিম ছিল প্রধান ফসল, আর পোষ মানানো হতো লামা ও গিনিপিগ।
বেশির ভাগ জায়গায় কৃষির সূচনা হয়েছিল মূলত শস্য দিয়ে। মানুষ একসময় লক্ষ্য করল, বুনো ঘাসের বীজ ছড়িয়ে দিলে তা থেকে বহুগুণ বেশি ফসল পাওয়া যায়। এভাবেই জন্ম নিল আজকের শস্য, যা আজ বিশ্বের একটি বিশাল অংশের মানুষের প্রধান খাদ্য। প্রায় কাছাকাছি সময়ে শুরু হয় মূলজাতীয় ফসলের চাষ এবং ভারবহন ও খাদ্যের চাহিদা মেটানোর জন্য পশুপালন।
কৃষির এই আবিষ্কারকে বলা হয় ‘নব্যপ্রস্তর বিপ্লব’। এর প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। ফসলের ক্ষেত, চাষাবাদ, পশুপালন এবং নদীর তীরকে কেন্দ্র করে মানুষ যাযাবর জীবন ছেড়ে স্থায়ী সমাজ ও জনপদ গড়ে তুলতে শুরু করল। শিল্প, আবিষ্কার ও সভ্যতার সমস্ত ভিত মূলত এই কৃষিকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল।
আধুনিক ডায়েটের উৎপত্তি
শিকার ও সংগ্রহের তুলনায় কৃষিকাজে সাধারণত বেশি খাবার মিলত। এমনকি এমন জমিতেও খাদ্য ফলানো সম্ভব হতো, যেখানে আগে পর্যাপ্ত খাবার পাওয়া যেত না। ফলে জনসংখ্যার দ্রুত বৃদ্ধি ঘটল এবং খাদ্যাভাবে মৃত্যুর হারও কমে এল। মানুষ পৃথিবীর আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়ল। তবে বর্তমান ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপ সামলাতে গিয়ে আমাদের শিকারী পূর্বপুরুষদের আদি খাদ্যাভ্যাস সম্পূর্ণ বদলে গেল।
কৃষকরা খেয়াল করলেন, একই জমিতে মাংস, ডিম বা দুধের তুলনায় শস্য বা মূলজাতীয় ফসল প্রায় দশ গুণ বেশি ফলানো সম্ভব, এবং উদ্ভিজ্জ খাবার উৎপাদন করাও অনেক সহজ। ফলে কৃষকরা বেশি বেশি শস্য উৎপাদনে মনোনিবেশ করলেন, যার দরুণ মানুষের খাবারে শর্করার পরিমাণ অতিরিক্ত বেড়ে গেল। পেট ভরানোর তাগিদে শর্করা জাতীয় খাবারের প্রাধান্য ও চাহিদাই সবার আগে চলে এল। অবশ্য উদ্ভিজ্জ খাবারের এই প্রাচুর্যের পাশাপাশি খোলা মাঠে চরে বেড়ানো পশু এবং গৃহপালিত হাঁস-মুরগি থেকে প্রোটিন ও চর্বির জোগানও তখন যথেষ্ট ছিল। চিনি জাতীয় মিষ্টির পরিমাণ আগের মতোই বুনো ফল ও সবজির সামান্য উপাদানে সীমাবদ্ধ ছিল।
এই দীর্ঘ যাত্রায় মানুষকে বারবার খাদ্যাভিযানের সংকটেও পড়তে হয়েছে। ঝড়, খরা, বন্যা, জমির অতিব্যবহার এবং অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপের কারণে প্রাকৃতিক উপায়ে উৎপাদিত ফসল সবসময় সবার পেট ভরানোর জন্য যথেষ্ট ছিল না। এই সংকট উত্তরণে মানুষ নিজেই খাদ্য উৎপাদনের পূর্ণ দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেয়। আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির কল্যাণে একদিকে যেমন চাহিদামাফিক খাদ্যের জোগান নিশ্চিত হয়েছে, অন্যদিকে খাদ্য সঞ্চয়ের পরিমাণও বহুগুণ বেড়েছে।
তবে এই যুগান্তকারী অগ্রগতির একটি চড়া মূল্যও আমাদের দিতে হয়েছে। আজ মানুষ না খেয়ে মরছে না বটে, বরং ‘খেয়ে মরছে’। কৃষিতে বিপ্লব এলেও ক্ষুধা পুরোপুরি বিদায় নেয়নি; বরং গত কয়েক দশকে একশ্রেণির মানুষের জন্ম হয়েছে যারা এমন এক প্রাচুর্যর মধ্যে বড় হচ্ছে যে, জীবনে কখনো তারা সত্যিকারের ক্ষুধার জ্বালা অনুভবই করেনি।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির দ্বিতীয় বিপ্লবের ফলে কৃষিক্ষেত্রে এক অভাবনীয় পরিবর্তন আসে। উন্নত জাতের ফসল ও পশুর প্রজনন, সেচ ও নিষ্কাশন প্রকৌশল, কৃত্রিম সার, আগাছানাশক ও কীটনাশক এবং দ্রুতগামী যানবাহন পুরো চিত্রটাই পাল্টে দেয়। মানুষ এখন খাবার সংরক্ষণের আধুনিক সব পদ্ধতি–টিনজাতকরণ, শুকিয়ে সংরক্ষণ এবং হিমায়িতকরণ আয়ত্ত করেছে। ফলে ধনী দেশগুলোর মানুষ ঋতু পরিবর্তন নির্বিশেষে যেকোনো সময় যেকোনো ফল ও সবজি বেছে নিতে পারে। এর ফলে খাবার কেবল পেট ভরানোর মাধ্যম থাকেনি, বরং তা আধুনিক মানুষের জিভের তৃপ্তির পণ্যে পরিণত হয়েছে।
প্রযুক্তি বিভিন্ন উপায়ে খাবারের উৎপাদন বাড়ালেও এর কৃত্রিমীকরণ ঘটিয়েছে। কোনো খাবার থেকে প্রাকৃতিক উপাদান কেড়ে নেওয়া এবং তাতে কৃত্রিম উপাদান মিশিয়ে এমন সব খাবার তৈরি করা হচ্ছে, যা প্রকৃতিতে সচরাচর এ রূপে মেলে না। মানুষের শরীর এই নতুন রূপের প্রক্রিয়াজাত খাবার হজম করতে প্রস্তুত নয়। বিজ্ঞানের আধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে এখন মাংসের স্বাদ ও গঠন নিখুঁতভাবে নকল করা হচ্ছে, এমনকি ল্যাবরেটরিতে কৃত্রিম মাংস তৈরির প্রস্তুতিও সম্পন্ন। ফসলের জৈব বৈচিত্র্য দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে; গ্রামীণ ঐতিহ্যবাহী বীজগুলোর জায়গা দখল করে নিচ্ছে হাইব্রিড ও উচ্চ ফলনশীল বাণিজ্যিক বীজ। মাছ ও পোলট্রি চাষে অতিরিক্ত মুনাফার লোভে পুষ্টিগুণের তোয়াক্কা না করে অবাধে ব্যবহার করা হচ্ছে হরমোন ও অ্যান্টিবায়োটিক। যত্রতত্র খাবারে ভেজাল মেশানোর প্রবণতা আমাদের ভালো খাবারগুলো কেড়ে নিচ্ছে।
‘সাদা বিষ’ খ্যাত চিনির উৎপত্তি
মিষ্টির প্রতি মানুষের আকর্ষণ সম্পূর্ণ সহজাত। হাজার হাজার বছর ধরে মানুষের মিষ্টি খাওয়ার তৃষ্ণা মিটত কেবল ফল খেয়ে অথবা কদাচিৎ বুনো মৌমাছির মধু থেকে। নব্যপ্রস্তর বিপ্লবের পর আনুমানিক আড়াই হাজার বছর আগে মানুষ প্রথম আখের রস শুকিয়ে একধরনের কাঁচা চিনি তৈরি করতে শেখে। আখের চাষ প্রথম শুরু হয়েছিল ভারতে; এরপর তা ধীরে ধীরে চীন, আরব, ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল, আফ্রিকার দক্ষিণ ও পশ্চিম অংশ, ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জ, ব্রাজিল এবং ক্যারিবীয় অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।
চাষ বাড়লেও একসময় চিনির দাম ছিল আকাশচুম্বী। ষোড়শ শতকের মাঝামাঝি সময়ে চিনির দাম নাকি বর্তমানের দামি ক্যাভিয়ারের সমান ছিল। মাখন বা ডিমের দামের সঙ্গে তুলনা করলে পঞ্চদশ শতকের তুলনায় বর্তমান বাজারে চিনির দাম প্রায় দুইশো ভাগের এক ভাগে নেমে এসেছে। আঠারো শতকেও চিনি ছিল একটি বিলাসবহুল দ্রব্য, এমনকি একশো বছর আগেও অনেক পরিবারে চিনির কৌটা কঠোর নজরদারিতে রাখা হতো।
আজকের আধুনিক চিনি শিল্পের মূল ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল ক্যারিবীয় অঞ্চলের চিনির বাগানগুলোতে–নিষ্ঠুর দাসব্যবসার ওপর ভর করে। এর চাহিদা ও মুনাফা এত বেশি ছিল যে, আঠারো শতকের মাঝামাঝি থেকে উন্নত জাতের আখ চাষ, চিনি নিষ্কাশন এবং পরিশোধনের মাধ্যমে বিপুল মুনাফা অর্জিত হতে থাকে। চিনির দাম কমতে থাকায় এর ব্যবহার অতিমাত্রায় বেড়ে যায়। অনেক দেশের আইনপ্রণেতারা তামাক ও মদের মতো চিনির ওপরও উচ্চহারে কর আরোপ করতে বাধ্য হন। বাস্তবিক অর্থে, তামাক বা মদের মতো চিনির নেশাও স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর, অথচ মানবশরীরে এর ন্যূনতম কোনো জৈবিক প্রয়োজন নেই।
আদিম মানুষ মিষ্টির প্রয়োজন মেটাত ফল বা মধু খেয়ে, যার ফলে মিষ্টির স্বাদের পাশাপাশি ভিটামিন সি-এর মতো জরুরি পুষ্টি উপাদানও তার শরীরে প্রবেশ করত। কিন্তু বর্তমানে আমরা এমন সব পানীয় ও খাবার দিয়ে মিষ্টির ক্ষুধা মেটাচ্ছি, যাতে পুষ্টির লেশমাত্র নেই। আজকের দিনে এমন অনেক কৃত্রিম কমলা পানীয় তৈরি করা সম্ভব, যা আসল কমলার রসের চেয়ে বেশি রঙিন, মিষ্টি ও সুগন্ধযুক্ত এবং দামে সস্তা হলেও তাতে ভিটামিন সি-এর কোনো অস্তিত্ব থাকে না। মানুষ মূলত মুখের স্বাদ খোঁজে বলেই এসব অস্বাস্থ্যকর পানীয়ের বাজার ক্রমবর্ধমান।
হয়তো অদূর ভবিষ্যতে কোনো অপাচ্য পলিমার থেকে এমন এক হ্যামবার্গার তৈরি করা সম্ভব হবে, যা দেখতে আসল মাংসের চেয়েও সুন্দর, গন্ধে অতুলনীয় এবং দামে অর্ধেক; কিন্তু তাতে প্রোটিন, ভিটামিন কিংবা খনিজের কোনো বালাই থাকবে না। অনেকেই এখনো ভুলবশত বিশ্বাস করেন যে সুস্বাদু খাবারের মধ্যে নিশ্চয়ই অনেক পুষ্টিগুণ রয়েছে। মূলত, স্বাদ এবং পুষ্টির এই বিপজ্জনক বিচ্ছেদই আধুনিক ধনী সমাজে ‘প্রাচুর্যের অপুষ্টি’র মূল কারণ। জিভের তৃষ্ণা মেটানো এবং শরীরের পুষ্টির চাহিদা পূরণ করা এখন আর সমার্থক নয়। একসময় মানুষের রুচি এবং শরীরের প্রকৃত চাহিদা একই সুতোয় গাঁথা ছিল, কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তি সেই সুতো চিরতরে ছিঁড়ে দিয়েছে। ফলে যা ভালো লাগছে, তা যে পুষ্টিকর হবেই–এমন কোনো নিশ্চয়তা আজ আর নেই।
মানবদেহের আদি জিনগত গঠন এবং আধুনিক পশ্চিমা খাবারের এই বিস্তর ফারাকের সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো বর্তমান যুগের নিত্যনতুন রোগব্যাধি ও মহামারি। প্রক্রিয়াজাত খাবার ও পরিশোধিত শর্করায় ভরা খাদ্যাভ্যাসের কারণে একদিকে যেমন মানুষের শরীরের ওজন অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে, অন্যদিকে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ ও ক্যানসারের মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগগুলোও মহামারির রূপ নিয়েছে।
ব্রিটিশদের আগমনের পূর্বে ভারতীয় উপমহাদেশের ডায়েট
ব্রিটিশদের এ দেশে পা রাখার বহু আগে ভারতীয় উপমহাদেশ ছিল এক অত্যন্ত উর্বর ও স্বনির্ভর ভূমি। এখানকার নদীমাতৃক মাটি, অনুকূল আবহাওয়া এবং কৃষকদের অক্লান্ত পরিশ্রম এই অঞ্চলকে পৃথিবীর অন্যতম সমৃদ্ধ খাদ্যভান্ডারে পরিণত করেছিল। ইবনে বতুতা, আব্দুর রাজ্জাক কিংবা ফরাসি পর্যটক বার্নিয়ারের মতো প্রাচীন ও মধ্যযুগের ভ্রমণকারীরা তাঁদের ভ্রমণবৃত্তান্তেও ভারতীয় কৃষি ও খাদ্যের ভূয়সী প্রশংসা করে লিখেছেন, 'ভারত এমন এক দেশ, যেখানে মাটির উর্বরতা আর মানুষের শ্রম মিলেমিশে সৃষ্টিকর্তার আশীর্বাদ বয়ে এনেছে।'
সেকালে ভারতবর্ষের অর্থনীতি ও সমাজ সম্পূর্ণ কৃষিনির্ভর ছিল। এ দেশের মানুষ প্রকৃতির সাথে এত নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিল যে তাদের জীবন, ধর্ম ও সংস্কৃতির মূল কেন্দ্রবিন্দুই ছিল কৃষি। বিশেষ করে মুসলিম শাসনামলে কৃষিকে কেবল একটি সাধারণ অর্থনৈতিক খাত হিসেবে দেখা হতো না, বরং তা গণ্য করা হতো রাষ্ট্রীয় সমৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে।
মুঘল প্রশাসন কৃষিকে তাদের রাষ্ট্রীয় নীতির কেন্দ্রবিন্দুতে রেখেছিল। কৃষকের উৎপাদন ক্ষমতা, মাটির উর্বরতা, সেচব্যবস্থা এমনকি বীজ সংরক্ষণ পর্যন্ত সরকারি তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হতো। সম্রাট আকবরের আমলে ভারতবর্ষের প্রায় ৭৫ শতাংশ মানুষ সরাসরি কৃষিকাজের সাথে যুক্ত ছিল। সে সময় কৃষিপণ্যের বৈচিত্র্য, ফসলের ফলন এবং খাদ্যের পুষ্টিমান ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধ।
আইন-ই-আকবরি গ্রন্থে আবুল ফজল উল্লেখ করেছেন যে তখনকার কৃষকেরা বছরে দুই থেকে তিনবার ফসল তুলতেন। তিনি কেবল আগ্রা অঞ্চলেই ১৬ ধরনের রবি শস্য (যেমন গম, যব, সরিষা, মসুর) এবং ২৫ ধরনের খরিফ শস্য (যেমন ধান, বাজরা, তিল, আখ, ভুট্টা ইত্যাদি) উৎপাদনের কথা উল্লেখ করেছেন। বাবরনামায় সম্রাট বাবর ভারতীয় ভূমির উর্বরতা ও ফলের বৈচিত্র্য দেখে গভীর বিস্ময় প্রকাশ করে লিখেছিলেন:
'ভারতের মাটি এত উর্বর যে, এখানে এক মৌসুমেই এমন সব ফল জন্মায়, যা অন্য দেশে বছরের পর বছরেও দেখা যায় না।'
সুলতানি ও নবাবী আমলে সাধারণ মানুষের পাতে থাকত প্রচুর মাছ, খাঁটি তেল, ঘি, মাখন, দুধ, দধি এবং জাফরান, বাদাম, কিসমিস, দারুচিনি ও এলাচের সুবাসিত সমারোহ। ঘরে ঘরে পালিত হতো গরু, ছাগল ও হাঁস-মুরগি। এর পাশাপাশি মিলেট, বাজরা ও জোয়ারের মতো পুষ্টিকর শস্য ছিল দৈনন্দিন শর্করার প্রধান উৎস। রান্নায় চর্বির জোগান আসত সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উৎস থেকে–যেমন ঘি, তেলবীজ, বাদাম, নারকেল, মাছ ও দুগ্ধজাত দ্রব্য।
আধুনিক নগরায়নের পূর্বে গ্রামীণ মানুষের জীবনযাত্রা
গ্রামীণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ছিল পরিপূর্ণভাবে শ্রমনির্ভর। হেঁটে চলা, মাঠে-ক্ষেতে কাজ করা, নদীতে সাঁতার কাটা, কাঠ কাটা কিংবা গবাদিপশু দেখাশোনা করা–এগুলো সবই ছিল তাদের স্বাভাবিক শরীরচর্চার অংশ। সেকালে কারখানায় তৈরি বা প্রক্রিয়াজাত খাবারের কোনো অস্তিত্বই ছিল না।
খাবার তখন ছিল মানুষের মধ্যকার সামাজিক বন্ধন ও ঐক্যের প্রতীক। একসঙ্গে বসে খাওয়া, অতিথি আপ্যায়ন করা, ফসল তোলার বিভিন্ন ঋতু উৎসব একসঙ্গে উদযাপন করা কিংবা পাড়ার নারীদের একসঙ্গে মিলে রান্নাবান্নায় অংশ নেওয়া–এসব ছিল প্রতিদিনের চিরচেনা দৃশ্য। গ্রামীণ এই সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে মানুষে মানুষে গভীর আত্মিক সম্পর্ক গড়ে উঠত। খাদ্য সংস্কৃতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল আধ্যাত্মিক মূল্যবোধ। মানুষ খাবারকে প্রকৃতির এক অপার নেয়ামত ও আশীর্বাদ হিসেবে গণ্য করত এবং কৃতজ্ঞতার সাথে তা গ্রহণ করত।
এই ভারসাম্যপূর্ণ কৃষি ও সমৃদ্ধ খাদ্যসংস্কৃতি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে টিকে ছিল, যতক্ষণ না ব্রিটিশরা এসে সেই ভিত পুরোপুরি গুঁড়িয়ে দিল। এর ফলে কৃষক তার পৈত্রিক জমি হারাল, আর খাদ্য হারাল তার চিরচেনা পুষ্টিগুণ। স্প্যানিশরা আমেরিকা লুট করেও যা করতে পারেনি, ব্রিটিশরা বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও মায়ানমার লুট করে তার চেয়ে অনেক বেশি ক্ষতি করেছে। তাদের শিল্পবিপ্লবের ইঞ্জিনগুলো মূলত বাংলার কৃষকদের রক্তে ভেজা পাউন্ডের ওপরেই সচল হয়েছিল।
ব্রিটিশ আমলের খাদ্য ও কৃষিনীতি: ভাঙনের গ্যাঁড়াকল
১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধের পর থেকেই ভারতীয় উপমহাদেশে শুরু হয় ঔপনিবেশিক শোষণের এক নতুন ও অন্ধকার অধ্যায়। ব্রিটিশরা তাদের নিজস্ব অর্থনৈতিক স্বার্থে এ দেশের কৃষিব্যবস্থাকে আমূল পুনর্গঠন করল। ধান, গম ও ডালের মতো পুষ্টিকর খাদ্যশস্যের জমি দখল করে শুরু হলো নীল, আফিম, তুলা ও জুটের মতো নগদ ফসলের (Cash crops) চাষ। দেশের ভেতরে পর্যাপ্ত খাদ্য উৎপাদনের সুযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অভ্যন্তরীণ খাদ্যচক্র সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ল এবং বাংলার কৃষক রাতারাতি নিস্ব হয়ে গেল।
অষ্টম থেকে বিংশ শতাব্দী পর্যন্ত এ অঞ্চলে একের পর এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ আঘাত হেনেছে–১৭৭০ সালের ‘ছিয়াত্তরের মন্বন্তর’, ১৮৬৬ সালের উড়িষ্যার দুর্ভিক্ষ কিংবা ১৯৪৩ সালের ‘বেঙ্গল ফ্যামিন’। এই দুর্ভিক্ষগুলো কেবল কোটি কোটি মানুষের প্রাণই কেড়ে নেয়নি, বরং মানবদেহের জিনগত কাঠামোকেও চিরতরে বদলে দিয়েছে। চরম দুর্ভিক্ষের সেই দিনগুলোতে যারা কোনোমতে টিকে ছিল, তাদের শরীরে এক অভিনব জৈবিক অভিযোজন ঘটে। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় 'Thrifty Gene Adaptation' (মিতব্যয়ী জিনগত অভিযোজন), যার অর্থ হলো–আমাদের শরীর আজও ‘দুর্ভিক্ষের জন্য প্রস্তুত’ রয়েছে। এই অন্তর্নিহিত জিনগত স্মৃতির কারণেই আজ সামান্য বেশি খাবার পেলেই আমাদের শরীর দ্রুত তা চর্বি আকারে জমিয়ে রাখতে চায়, যাতে ভবিষ্যতে অভুক্ত থাকতে হলে ওই চর্বি পুড়িয়ে বেঁচে থাকা যায়। এ কারণেই আমাদের শরীর অতিরিক্ত ভাত পেলেই তার ওপর হামলে পড়ে এবং পেটের চারপাশে খুব সহজেই মেদ জমিয়ে ফেলে।
বর্তমান জমানার ডায়েট ও লাইফস্টাইলের চিত্র
শার্ট-প্যান্ট পরা, প্যান্টে ইন করা এবং পেটের ওপর গোলগাল ভুঁড়িওয়ালা মাঝারি উচ্চতার একজন অফিসগামী বাঙালি যেন এ দেশে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের এক জ্বলন্ত প্রতীক। ব্রিটিশ শাসনকালে স্থানীয় কৃষির চেহারা বদলে যাওয়ার পর থেকেই সুলতানি-নবাবী আমলের সেই সুষম পুষ্টির ঐতিহ্য ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে থাকে।
অভিজাত ও মধ্যবিত্ত সমাজের হাত ধরে এ দেশে পশ্চিমা খাদ্যাভ্যাস–যেমন পাউরুটি, বিস্কুট এবং গুঁড়া দুধ বা কনডেন্সড মিল্ক মেশানো দুধ চা খাওয়ার প্রচলন শুরু হয়। এর পাশাপাশি পরিশোধিত সাদা চাল, আটা, ময়দা, সাদা চিনি ও বিস্কুটের মতো ইউরোপীয় পণ্য এ অঞ্চলে প্রবেশ করে। ফলে মানুষের থালা থেকে ঐতিহ্যবাহী পুষ্টিকর খাবারগুলো সরে গিয়ে প্রক্রিয়াজাত ও পরিশোধিত খাবারের একচেটিয়া আধিপত্য তৈরি হয়। ক্রমেই গড়ে ওঠে উচ্চ শর্করাযুক্ত প্যাকেটজাত ও রেডিমেড খাবারের সংস্কৃতি, আর তারই হাত ধরে প্রসার লাভ করে রেস্টুরেন্টের রমরমা ব্যবসা।
যদিও পরবর্তীকালে ‘সবুজ বিপ্লব’ (Green Revolution)-এর ফলে ধান ও গমের উৎপাদন বেড়েছে, কিন্তু খাদ্যের আসল বৈচিত্র্য চিরতরে হারিয়ে গেছে। চাল ও গমের ওপর মানুষের অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা তৈরি হয়েছে। দুর্ভিক্ষকবলিত পূর্বপুরুষদের উত্তরাধিকার বহন করা আমাদের শরীর আজ শক্তি বাঁচিয়ে রাখতে চায়, অতিরিক্ত পরিশ্রম এড়াতে চায় এবং অল্পতেই মেদ ঝরিয়ে ফেলার বদলে স্টোরেজ মোডে বা ভুঁড়ি বাড়িয়ে অলস জীবন কাটাতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে।
ব্রিটিশদের তৈরি রেললাইন, অফিস-আদালত এবং শহরকেন্দ্রিক অর্থনীতি গড়ে ওঠার কারণে ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ জীবনযাত্রা। গ্রামের কর্মঠ কৃষকরা রূপান্তরিত হলো শহুরে চাকুরিজীবীতে। মাঠের রোদ-বৃষ্টিতে কায়িক পরিশ্রম করার দিন ফুরিয়ে বাঙালির শরীর আটকে গেল সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টার ডেস্ক জব-এ। শরীরের এই অবদমনের মধ্য দিয়ে আমরা যেন আজও ব্রিটিশ দাসত্বের সেই অদৃশ্য শেকলেই আটকে আছি।
আমাদের করণীয় কী?
চারপাশে রাসায়নিক ও ভেজাল মিশ্রিত খাবারের এই ভিড়ে আমাদের চোখ-কান খোলা রেখে সবচেয়ে পুষ্টিকর ও নিরাপদ খাবারটি বেছে নিতে হবে। সম্ভব হলে নিজস্ব উদ্যোগে ছোট পরিসরে ছাদবাগানে বা বারান্দায় পরিবারের চাহিদামতো কিছু শাকসবজি ও শস্য ফলানোর চেষ্টা করতে হবে। অপেক্ষাকৃত বিশ্বস্ত ও দেশীয় উৎস থেকে খাবার সংগ্রহ করা উচিত। পাশাপাশি নিজেদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ও ডায়েটে কিছু সুনির্দিষ্ট পরিবর্তন আনা জরুরি।
বর্তমান সময়ে আমাদের ডায়েট যত বেশি আটা-ময়দা, সয়াবিন তেল, চিনি ও দুধ চা নির্ভর হবে, আমরা তত দ্রুত বয়সের আগেই বুড়িয়ে যাব। হয়তো আপনার বয়স ছাব্বিশ কিংবা আটাশ, কিন্তু চেহারায় ফুটে উঠবে ৩৮ বছরের বার্ধক্য। শরীরে সর্বক্ষণ ক্লান্তি ও জয়েন্টে ব্যথা লেগেই থাকবে, স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়ে পড়বে এবং বিক্ষিপ্ত চিন্তার কারণে কাজে মনোযোগ দেওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।
তাই যথাসম্ভব এসব ক্ষতিকর খাবার বর্জনের পাশাপাশি সব ধরনের প্যাকেটজাত, বোতলজাত, ক্যানবন্দি, রেডিমেড ও ফ্রোজেন খাবার পরিহার করতে হবে। মনে রাখবেন, মোড়কে আবদ্ধ এই প্রতিটি খাবারই পরিশোধিত–যেখানে দীর্ঘকাল সংরক্ষণের জন্য এবং আকর্ষণীয় চকচকে দেখানোর জন্য ফাইবারের মতো অতিপ্রয়োজনীয় উপাদানগুলো ছেঁটে ফেলে দেওয়া হয়। এগুলোতে পুষ্টিগুণের তো বালাই থাকেই না, বরং তা স্বাস্থ্যের বারোটা বাজিয়ে দেয়।
এর পরিবর্তে পাতে রাখুন খাঁটি গরুর মাংস, কলিজা, তৈলাক্ত ও ছোট মাছ, সামুদ্রিক মাছ, দেশি মুরগি এবং দেশি ডিম। ভিনদেশি সয়াবিন তেলের বদলে রান্নায় ব্যবহার করুন খাঁটি সরিষার তেল ও গাওয়া ঘি–এগুলো আমাদের শত শত বছরের পরীক্ষিত দেশীয় উপাদান। খাওয়ার সময় পাতে রাখুন মাখন, স্বাস্থ্যকর চর্বি, ঘরে পাতা টক দই এবং দুধের সর। পেট ভরানোর জন্য রাখুন টাটকা শাকসবজি ও রঙবেরঙের সালাদ। ছোটখাটো ক্ষিদে মেটাতে কোমল পানীয় বা বিস্কিটের বদলে খেতে পারেন কাজু ও কাঠবাদাম, আমলকি, আনার, আমড়া, জাম্বুরা বা নাশপাতির মতো টাটকা দেশি ফল।
গায়ে রোদ লাগান, নিয়মিত কায়িক পরিশ্রম বা ব্যায়াম করুন। নিজেকে ব্যস্ত রাখুন কোনো সৃজনশীল, অর্থবহ ও কর্মমুখর কাজে। মানসিক চাপ কমাতে আধ্যাত্মিক সংযোগ বাড়ান, ভালো ঘুম নিশ্চিত করুন এবং ভোরের স্নিগ্ধ বাতাসে প্রতিদিন অন্তত কয়েক কিলোমিটার হাঁটার অভ্যাস করুন। পরিবর্তনের সুফল আপনি নিজেই হাতেনাতে টের পাবেন।
আধুনিক ফুড ও হেলথ ইন্ডাস্ট্রি আপনার সুস্বাস্থ্যের চেয়ে তাদের পুঁজিবাদী মুনাফাকেই বেশি গুরুত্ব দেয়। তাই আপনার স্বাস্থ্যের রজনীগন্ধার লাগাম অন্য কারও হাতে সঁপে না দিয়ে নিজের হাতেই রাখুন। অনুসরণ করুন আমাদের সেই সোনালী অতীত, যে অতীতের পূর্বপুরুষেরা সিংহের মতো তেজ ও শক্তিতে বেঁচে ছিলেন।