খেলাফত আন্দোলন: পূর্ব বাংলার মুসলমানদের রাজনৈতিক উত্থানের অধ্যায়
আবুল মনসুর আহমেদ তার আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর গ্রন্থে উনিশ শতকের শেষ ভাগ থেকে বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগ পর্যন্ত বাংলার রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার একটি গভীর অন্তর্দৃষ্টি তুলে ধরেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন, হিন্দু জমিদারদের নিপীড়ন এবং সামাজিক বঞ্চনার ফলে বাংলার মুসলমানদের একাংশ মনে করত যে, তারা 'দারুল হারব' বা অমুসলিম শাসিত ভূমিতে অবস্থান করছে। তারা খেলাফতের কোন ভূমি দারুল ইসলামে চলে যাবে।
এই পরিস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যে খেলাফতের ভবিষ্যৎ সংকটের সঙ্গে একত্রে মিলিত হয়ে বাংলার মুসলমান সমাজে এক অভূতপূর্ব উত্তেজনার জন্ম দেয়। ১৯২০-এর দশকে যখন ইউরোপীয় উপনিবেশবাদী শক্তিগুলো বিশেষ করে বৃটেন, ফ্রান্স এবং ইতালি, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষে ওসমানি খেলাফতকে ভেঙে ফেলার ষড়যন্ত্র শুরু করে, তখন এই ঘটনাকে মুসলিম উম্মাহর উপর আঘাত হিসেবে দেখা হয়। খেলাফত শুধু একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা নয়, মুসলমানদের ধর্মীয় সংহতির প্রতীক হিসেবেও কাজ করত। তাই, খেলাফত বিলুপ্তির আশঙ্কা মুসলিম জনমানসে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। শুরু হয় খেলাফত আন্দোলন।
খেলাফত আন্দোলনের বিষয়টি শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক আন্দোলনই ছিল না, বরং এটি ছিল উপমহাদেশের মুসলমানদের ধর্মীয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক আশা-আকাঙ্ক্ষার একটি জটিল সমন্বয়।
খেলাফত আন্দোলনের ধর্মীয়-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
দারুল হারব থেকে দারুল ইসলামের আকাঙ্ক্ষা:
বাংলার মুসলমানরা হিন্দু জমিদারদের শোষণ ও ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষোভ লালন করছিলেন। উসমানীয় খেলাফত ছিল তাদের জন্য একটি প্রতীকী আশ্রয়স্থল—একটি বিশ্বব্যাপী মুসলিম ঐক্যের প্রতীক। ১৯১৮ সালে উসমানীয় সাম্রাজ্যের পতন ও খেলাফতের ভাগাভাগির খবর বাংলার মুসলমানদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি করে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেনের গবেষণা অনুযায়ী, ১৯১৯-২০ সালে বাংলার মাদ্রাসাগুলোতে বিশেষ দোয়া ও খুতবার আয়োজন করা হতো খেলাফত রক্ষার জন্য, যা ধর্মীয় নেতৃত্বের সমর্থনকে প্রমাণ করে।
সাইকস-পিকো চুক্তি ও মুসলিম বিশ্বের প্রতিক্রিয়া:
১৯১৬ সালের গোপন সাইকস-পিকো চুক্তি অনুযায়ী উসমানীয় ভূ-ভাগকে ব্রিটেন ও ফ্রান্স ভাগ করে নেয়। এই চুক্তির তথ্য ফাঁস হলে সমগ্র মুসলিম বিশ্বে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। উদাহরণ: ১৯১৯ সালে কলকাতার একটি জনসভায় মওলানা আকরম খাঁ বলেছিলেন, "খেলাফতের মর্যাদা রক্ষা না করলে আমরা ব্রিটিশের গোলামি করতে পারব না।"
খেলাফত আন্দোলনের সূচনা ও বিস্তার
১৯১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর দিল্লিতে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের সম্মেলনে আবুল কাসেম ফজলুল হকের ভাষণের মাধ্যমে মূলত খেলাফত প্রসঙ্গটি প্রথমবারের মতো সংগঠিতভাবে রাজনৈতিক পরিসরে আসে। এরপর ১৯১৯ সালের প্যারিস শান্তি সম্মেলন এবং সাইক্স-পিকো চুক্তি (১৯১৬) অনুযায়ী ওসমানি সাম্রাজ্যকে ভাগ করে মধ্যপ্রাচ্যে বৃটিশ ও ফরাসি আধিপত্য বিস্তারের পরিকল্পনা যখন সামনে আসে, তখন মুসলিম বিশ্বজুড়ে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ভারতেও এর প্রতিবাদে গড়ে ওঠে খেলাফত আন্দোলন, যার মূল কেন্দ্র ছিল বোম্বে (বর্তমানে মুম্বই), যেখানে ১৯১৯ সালের সেপ্টেম্বরে মওলানা মুহম্মদ আলী, শওকত আলী, আবুল কালাম আজাদ, হযরত মোহানী, ও এম.এ. আনসারীর নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় খেলাফত কমিটি গঠিত হয়।
বাংলায় আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী, আকরম খাঁ, ফজলুল হক, এবং মাওলানা আবদুর রউফের মতো নেতারা। বঙ্গীয় প্রাদেশিক খিলাফত কমিটি শুধু কলকাতায় সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং ঢাকা, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, পাবনা ও ফরিদপুরে শাখা কমিটি গঠন করে। নাদওয়াতুল উলামার গবেষণা থেকে জানা যায়, মওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী শুধু প্রবন্ধ লিখেই ক্ষান্ত হননি, তিনি নোয়াখালী ও কুমিল্লায় স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গঠন করেছিলেন।
মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদীর “অসহযোগিতা ও আমাদের কর্তব্য” প্রবন্ধটি মুসলমানদের রাজনৈতিক চেতনা জাগরণের এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল হয়ে ওঠে।
খেলাফত আন্দোলনে নারীদের ভূমিকা প্রায়শই উপেক্ষিত। বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের লেখনীতে দেখা যায়, কলকাতা ও ঢাকায় মুসলিম মহিলারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিদেশি কাপড় বর্জন ও তহবিল সংগ্রহে অংশ নিয়েছিলেন। ১৯২১ সালের মার্চে ঢাকায় খেলাফত নারী কমিটি গঠিত হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন বেগম শামসুন নাহার মাহমুদ।
১৯১৯ সালের ১৭ অক্টোবর প্রথম খেলাফত দিবস ঘোষণা করা হয়। খেলাফত দিবস পালনের সময় কলকাতার অধিকাংশ ভারতীয় মালিকানাধীন দোকানপাট বন্ধ থাকে, বিভিন্ন মসজিদে দোয়া করা হয় এবং সারা বাংলায় জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। ২৩-২৪ নভেম্বর দিল্লিতে এ.কে ফজলুল হকের সভাপতিত্বে প্রথম নিখিল ভারত খিলাফত সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে খেলাফত সমস্যা ঝুলিয়ে রাখায় প্রস্তাবিত শান্তি সম্মেলনে অংশ না নেওয়া, ব্রিটিশ পণ্য বর্জন করা, এবং সরকারের সঙ্গে অসহযোগিতার নীতি গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ২০ ডিসেম্বর আহসান মঞ্জিলে খেলাফত আন্দোলনের ঢাকা কমিটি গঠিত হয়। কমিটির সভাপতি হন খাজা হাবিবুল্লাহ, বিকল্প সভাপতি সৈয়দ আবদুল হাফিজ এবং সম্পাদক নির্বাচিত হন গোলাম কুদ্দুস। ঢাকা শহরের নাগরিকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে একটি ‘সদর খিলাফত কমিটি’ গঠিত হয়। খাজা সুলায়মান কাদের কমিটির সভাপতি, মওলানা আবদুল জব্বার আনসারী, হাফেজ আবদুর রাজ্জাক, হাফেজ আবদুল হাকিমকে সহ-সভাপতি এবং মৌলবি সামসুল হুদাকে সম্পাদক করা হয়।
১৯২০ সালের প্রথম দিকে বঙ্গীয় প্রাদেশিক খিলাফত কমিটি গঠিত হয়। মওলানা আবদুর রউফকে কমিটির সভাপতি, মওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদীকে সহসভাপতি, মওলানা আকরম খাঁকে সাধারণ সম্পাদক এবং মুজিবুর রহমান ও মজিদ বখশকে যুগ্ম সম্পাদক করা হয়। কলকাতার কলুটোলা স্ট্রীটের হিরণবাড়ি লেনে সংগঠনের কার্যালয় স্থাপিত হয়।
২৮-২৯ ফেব্রুয়ারি কলকাতা টাউন হলে প্রথম বঙ্গীয় প্রাদেশিক খিলাফত সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে নেতৃবৃন্দ খেলাফত সমস্যা সম্পর্কিত দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত অসহযোগ ও বয়কট অব্যাহত রাখার কর্মসূচি পুনর্ব্যক্ত করেন। মার্চ মাসে খেলাফত প্রশ্নে আলোচনার জন্য মওলানা মুহম্মদ আলীর নেতৃত্বে একটি খিলাফত প্রতিনিধি দল ইংল্যান্ড গমন করে। এ দলে আবুল কাশেম ফজলুল হক বাংলা থেকে প্রতিনিধিত্ব করেন।
১৯২০ সালের ১৯ মার্চ বাংলায় দ্বিতীয় খিলাফত দিবস পালিত হয়। এ দিনে কলকাতার জীবনযাত্রা অচল হয়ে পড়ে এবং ঢাকা, চট্টগ্রাম ও ময়মনসিংহে বহুসংখ্যক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সবচেয়ে বড় সভাটি অনুষ্ঠিত হয় টাঙ্গাইলে এবং এতে সভাপতিত্ব করেন উদার জাতীয়তাবাদী মুসলিম জমিদার আবদুল হালিম গজনবী।
মওলানা আজাদ, আকরম খাঁ, মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদীর নেতৃত্বে খিলাফত আন্দোলন সারা বাংলায় একটি মুসলিম রাজনৈতিক চেতনাকে বিকশিত করে। বিদেশি পণ্য বর্জন, আদালত ও সরকারি অফিস বয়কট কার্যক্রম জোরদার করার উদ্দেশ্যে স্বেচ্ছাসেবকদের প্রশিক্ষণ দানের জন্য গ্রামবাংলায় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন গড়ে তোলা হয়। এসব স্বেচ্ছাসেবকদের চরকায় সুতা কাটা, দেশিয় দ্রব্যাদি জনপ্রিয় করে তোলা এবং খিলাফত আন্দোলনের অনুদান সংগ্রহের কাজে নিয়োজিত করা হয়। ঢাকার কিছু কিছু এলাকায় মুসলিম জমিদারগণ নিজেদের খলিফার প্রতিনিধি ঘোষণা করে।
খেলাফত আন্দোলনের বিরুদ্ধে সরকারি দমন
আন্দোলনের জনপ্রিয়তা দেখে ব্রিটিশ সরকার চরমভাবে সন্ত্রস্ত হয়ে ওঠে। ১৯২১ সালের নভেম্বরে একটি সরকারি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে খেলাফত আন্দোলনকে অবৈধ ঘোষণা করে। এরপর গণহারে গ্রেফতার, অফিস দখল, সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার মাধ্যমে আন্দোলনকে দমন করা হয়। ১৯২১ সালের ১০ ডিসেম্বর কলকাতায় প্রায় দেড় শতাধিক নেতাকর্মী গ্রেফতার হন। ঢাকায় পুলিশ খেলাফত কমিটির অফিসে হামলা চালায় এবং দৈনিক সেবাক পত্রিকা বন্ধ করে দেওয়া হয়। মওলানা আজাদকে আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে বন্দী করা হয়, যেখানে তিনি তারিকাহ-ই-খেলাফত নামে একটি বই লিখেছিলেন (যা পরবর্তীতে ব্রিটিশরা বাজেয়াপ্ত করে)।
খেলাফত আন্দোলনের প্রভাব ও উত্তরাধিকার
যদিও ১৯২৪ সালে মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক খেলাফত ব্যবস্থা বিলুপ্ত করে তুরস্ককে ধর্মনিরপেক্ষ প্রজাতন্ত্র হিসেবে ঘোষণা বাংলার মুসলমানদের মাঝে হতাশা ছড়ায়। মওলানা আকরম খাঁ মোহাম্মদী পত্রিকায় লিখেছিলেন, "এখন আমাদের নিজেদের ভাগ্য নিজেদেরই গড়তে হবে।"
তবে খেলাফত আন্দোলনের প্রভাব ছিল সূদুর প্রসারি। এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাংলার মুসলমান সমাজে একটি নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্বের উত্থান ঘটে, যারা পশ্চিম ভারতীয় মুসলিম নেতৃত্বের সঙ্গে সমানভাবে কণ্ঠ মেলাতে সক্ষম হন। বাংলার মুসলমানদের মধ্যে একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক পরিচয় গড়ে তুলতে সাহায্য করে, যা পরবর্তীতে ১৯৩৭ সালের প্রাদেশিক নির্বাচন ও ১৯৪৭ সালের পাকিস্তান আন্দোলনে প্রতিফলিত হয়।
১৯২০-এর দশকে গঠিত অনেক খেলাফত কর্মীই পরে নিখিল ভারত মুসলিম লীগ-এর সঙ্গে যুক্ত হন, যেমন—শেরে বাংলা এ.কে. ফজলুল হক।
সাংস্কৃতিক প্রভাব: খেলাফত আন্দোলনের সময় চরকা আন্দোলন ও স্বদেশি পণ্যের ব্যবহার বৃদ্ধি পায়। কবি কাজী নজরুল ইসলাম "খেলাফত নামা" নামে একটি কবিতা লিখে আন্দোলনকে সাহিত্যে স্থান দেন।
নারীদের ভূমিকা
খেলাফত আন্দোলনে নারীদের অংশগ্রহণ ছিল এক ঐতিহাসিক ব্যতিক্রম, বিশেষ করে ব্রিটিশ ভারতে নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ইতিহাসে। সাধারণত এই সময় নারীরা গৃহকেন্দ্রিক থাকলেও খেলাফত আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে তারা সক্রিয় রাজনৈতিক ভূমিকা পালন করেন, যা তৎকালীন সামাজিক বাস্তবতায় এক বিপ্লবী পরিবর্তন।
১. নারীদের রাজনৈতিক চেতনার জাগরণ
খেলাফত আন্দোলনের সময় মুসলিম নারীদের মধ্যে যে রাজনৈতিক চেতনার বিকাশ ঘটে, তা এই উপমহাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এমন সক্রিয়তায় পরিণত হয়। নারীরা ধর্মীয় দায়িত্ববোধ, খলিফার প্রতি আনুগত্য এবং উপনিবেশবিরোধী মনোভাবের মিলিত প্রভাবে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। তারা মিছিল, সভা, অনুদান সংগ্রহ, চাঁদা তোলা এবং প্রচারণার কাজে অংশগ্রহণ করেন।
২. নারীদের সভা ও মিছিল
ঢাকা, কলকাতা, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইলসহ বাংলার বহু শহর ও মফস্বল এলাকায় নারীরা পৃথকভাবে সভার আয়োজন করতেন। এসব সভায় নারীরা নিজেরাই বক্তৃতা করতেন এবং অন্য নারীদের সচেতন করতেন। এই সময়কার পত্রপত্রিকায় (যেমন, মোহাম্মদী, সওগাত) অনেক নারীর বক্তৃতা ও কার্যকলাপের উল্লেখ পাওয়া যায়। অনেক জায়গায় নারী-মিছিলে পুরুষদের প্রবেশ নিষেধ থাকত, যা ছিল নারীদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক অংশগ্রহণের প্রকাশ।
৩. অর্থ সংগ্রহ ও অনুদান প্রদান
নারীরা তাদের অলঙ্কার, বাসনপত্র, এমনকি ঘরোয়া ব্যবহারের নানা মূল্যবান সামগ্রী আন্দোলনের তহবিলে দান করেন। অনেক নারী তাঁদের বিবাহের গয়না খুলে খিলাফত আন্দোলনের চাঁদা হিসেবে দেন। এই আত্মত্যাগ শুধু রাজনৈতিক সমর্থনেরই প্রতীক নয়, বরং এ ছিল নারীদের আত্মপরিচয়ের এক অভ্যুত্থান।
৪. নারী সংগঠনের সূচনা
খেলাফত আন্দোলনের সময় কলকাতা ও ঢাকায় নারীদের সংগঠন গড়ে ওঠে। এগুলো ছিল সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র নারী নেতৃত্বাধীন সংগঠন, যেখানে নারীরা নিজেরাই কর্মসূচি পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করতেন। অনেক নারী লেখিকা ও শিক্ষিকা এই সময়ের মধ্যে আন্দোলনের পক্ষে লেখালেখি শুরু করেন।
উল্লেখযোগ্য কিছু নাম পাওয়া যায়—
কলকাতার বেগম মেহেরুননেসা, বেগম খাতুননেসা, এবং ঢাকার সিদ্দিকা খাতুন, বেগম আমেনা প্রমুখ নারীর নাম বিভিন্ন দলিলপত্রে উঠে আসে যারা সক্রিয়ভাবে আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন।
৫. নারীদের মাধ্যমে সমাজের গভীরে আন্দোলনের প্রসার
নারীরা সাধারণত পুরুষদের চেয়ে সমাজের আভ্যন্তরীণ ও পারিবারিক স্তরে বেশি প্রভাব বিস্তার করতে পারেন। তাদের সক্রিয়তা শুধু প্রকাশ্যে নয়, গৃহে ও পারিবারিক পরিবেশে আন্দোলনের বার্তা পৌঁছে দিতে বড় ভূমিকা রাখে। তাঁরা নিজেদের পরিবারকে, বিশেষ করে শিশু ও কিশোরদের আন্দোলনের চেতনায় গড়ে তোলেন।
৬. আন্দোলন পরবর্তী প্রভাব
খেলাফত আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী নারীরা পরবর্তীকালে সমাজসংস্কার, নারীশিক্ষা এবং রাজনৈতিক সচেতনতার আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে শুরু করেন। খেলাফতের অভিজ্ঞতা তাঁদের আত্মবিশ্বাস ও নেতৃত্বগুণ গড়ে তোলে। এই প্রক্রিয়াই ভবিষ্যতে বঙ্গীয় মুসলিম নারী সমাজে একটি শিক্ষিত, চিন্তাশীল ও প্রগতিশীল নারীবর্গের জন্ম দেয়, যারা ১৯৪০-এর দশকে নারী অধিকার ও মুসলিম নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণে অগ্রণী হন।
বাংলার কৃষকদের ভূমিকা
খেলাফত আন্দোলনে গ্রামের কৃষকদের অংশগ্রহণ ছিল আন্দোলনের ভিত্তিকে দৃঢ় করার একটি প্রধান উপাদান। শহরের মধ্যবিত্ত, শিক্ষিত মুসলমানদের পাশাপাশি গ্রামের সাধারণ কৃষকরাও এই আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। তাদের অংশগ্রহণ আন্দোলনকে শহরের সীমানা ছাড়িয়ে বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে দেয়। কৃষকসমাজের এই সক্রিয়তা বাংলার সামাজিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে, যেখানে তারা কেবল উৎপাদনের বাহিনী নয়, বরং রাজনৈতিক পরিবর্তনেরও এক শক্তিশালী কণ্ঠ হয়ে ওঠে।
১. ধর্মীয় আবেগ ও খেলাফতের প্রতি আনুগত্য
কৃষকদের অংশগ্রহণের পেছনে প্রধান চালিকাশক্তি ছিল ধর্মীয় আবেগ। ওসমানি খেলাফত মুসলমানদের জন্য একটি ধর্মীয় ঐক্যের প্রতীক ছিল। গ্রামবাংলার সাধারণ কৃষক, যাঁদের অনেকেই ধর্মীয়ভাবে অতি অনুগত, তাঁরা যখন শুনতে পেলেন যে ‘খলিফা বিপদে’, তখন সেটা তাঁদের জন্য এক ধর্মীয় দায়িত্বের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। খলিফাকে রক্ষা করা মানেই ইসলামকে রক্ষা করা—এই বিশ্বাস থেকেই তারা আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত হন।
২. জমিদার শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া
এই সময় বাংলার গ্রামীণ কৃষকেরা হিন্দু জমিদার ও ব্রিটিশ প্রশাসনের দ্বৈত শোষণের শিকার ছিল। উচ্চ হারে খাজনা, বিনা কারণে উচ্ছেদ, শারীরিক নিপীড়ন ইত্যাদি তাঁদের জীবনে এক অবিচ্ছেদ্য দুর্ভোগ তৈরি করেছিল। খেলাফত আন্দোলনের অসহযোগ কর্মসূচি ও ব্রিটিশবিরোধী চেতনা তাঁদের মনে স্বস্তির আশ্বাস এনে দেয়। অনেক ক্ষেত্রে কৃষকেরা খেলাফতের নামে জমিদারদের খাজনা না দেওয়ার সাহস পান এবং এটি একপ্রকার শ্রেণি-বিদ্রোহের রূপ ধারণ করে।
৩. স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীতে অংশগ্রহণ
গ্রামে-গ্রামে গঠিত খেলাফত কমিটি এবং স্বেচ্ছাসেবক সংগঠনগুলোতে বিপুল সংখ্যক কৃষক যুবক যোগ দেন। তাঁরা গ্রামে বিদেশি পণ্য বর্জন, চরকা কাটা, দেশীয় বস্ত্র প্রচার, জনসভা আয়োজনে ভূমিকা পালন করেন। মফস্বলে যে খিলাফত সভাগুলো অনুষ্ঠিত হতো, তার মঞ্চ তৈরির কাজ থেকে শুরু করে লোক জড়ো করা পর্যন্ত কৃষকরাই ছিলেন মূল কর্মী।
উদাহরণস্বরূপ, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, নরসিংদী, বরিশাল ও কুমিল্লার অনেক অঞ্চলে কৃষকদের সক্রিয় অংশগ্রহণে হাজারো মানুষের জনসভা সংগঠিত হয়। টাঙ্গাইলের খেলাফত সম্মেলনে যেখানে হাজারো কৃষক উপস্থিত ছিলেন, সেখানকার সভাপতি ছিলেন মুসলিম জমিদার আবদুল হালিম গজনবী, যিনি কৃষকদের দিক থেকে বিপুল সমর্থন লাভ করেন।
৪. আর্থিক ও সাংগঠনিক সহযোগিতা
যদিও কৃষকদের আর্থিক সামর্থ্য সীমিত ছিল, তবুও তাঁরা যৎসামান্য যা পারতেন, তাই নিয়ে খেলাফত তহবিলে দান করতেন—কখনো মুটে-মজুরদের মজুরি, কখনো চাল, ডাল, কখনো ঘরের একমাত্র গরু বা হাঁস-মুরগিও দান করা হয়েছে। কৃষকদের এই ত্যাগী ভূমিকা আন্দোলনের জনসমর্থনকে একটি গণজোয়ারে রূপ দেয়।
৫. প্রতিরোধ ও সংঘর্ষে অংশগ্রহণ
কিছু অঞ্চলে ব্রিটিশ প্রশাসনের দমননীতি ও জমিদার বাহিনীর নিপীড়নের বিরুদ্ধে কৃষকেরা সংগঠিত প্রতিরোধও গড়ে তোলেন। চট্টগ্রাম, ফরিদপুর ও দিনাজপুরের কিছু এলাকায় দেখা যায় যে কৃষকেরা পুলিশের বিরুদ্ধে বাঁশের লাঠি, দা, কোদাল নিয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। যদিও এই প্রতিরোধ সংগঠিত ও কৌশলগতভাবে পরিকল্পিত ছিল না, তবুও এটি একটি গণআন্দোলনের রূপ নেয়।
৬. আন্দোলনের রাজনৈতিক শিক্ষালাভ
খেলাফত আন্দোলনের মাধ্যমে বাংলার কৃষকশ্রেণি প্রথমবারের মতো রাজনীতির স্বরূপ সম্পর্কে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা অর্জন করে। তাঁরা বুঝতে পারেন যে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত তাঁদের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এই উপলব্ধিই ভবিষ্যতে কৃষক প্রজা পার্টি, জমিদারবিরোধী আন্দোলন, এবং পরে আওয়ামী মুসলিম লীগের মতো সংগঠনে কৃষকশ্রেণির ভূমিকা প্রসারিত করে।
উপসংহার
খেলাফত আন্দোলন শুধু মধ্যপ্রাচ্যের এক ধর্মীয়-রাজনৈতিক সংকটকে কেন্দ্র করে সংগঠিত প্রতিক্রিয়া ছিল না; এটি ছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শোষণের বিরুদ্ধে বাংলার মুসলমান সমাজের একটি সম্মিলিত আত্মপ্রকাশ। শহর, গ্রাম ও মফস্বল এলাকার সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে শিক্ষিত শ্রেণি—সবার মধ্যে এই আন্দোলন জাতীয় চেতনা ও আত্মপরিচয়ের এক নবজাগরণের সূচনা করে। যদিও শেষপর্যন্ত আন্দোলন সফল হয়নি, তবুও এর শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা পরবর্তী সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতায় গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বিশেষ করে যুবসমাজ, ছাত্রসমাজ এবং ধর্মীয় নেতারা এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক আন্দোলনের মূলধারায় প্রবেশ করেন। এই অভিজ্ঞতা পরবর্তীতে মুসলিম লীগের বিকাশ, পাকিস্তান আন্দোলনের ভিত্তি প্রস্তুত এবং মুসলমানদের পৃথক রাজনৈতিক স্বাতন্ত্র্য দাবি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।